ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৩৭
তাজরীন ফাতিহা
মানহা কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে রান্না করছে। শাড়ি পড়ে কোনো কাজ করতে পারেনা সে। অভ্যাস নেই তার। তবে উর্মি ভুঁইয়ার ইচ্ছে তারা বউ শাশুড়ি উভয়ই শাড়ি পড়বে। তবে মানহার অস্বস্তির জন্য তিনি সপ্তাহের যেকোনো দুইদিন শাড়ি পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আজকে সেই দুই দিনের শেষদিন। শুক্রবার। সকাল থেকেই হেঁসেলে সে। এই একটা দিন পুরো তিন বেলার রান্না মানহা করে। অন্যান্য দিনগুলোতে উর্মি ভুঁইয়া রান্না করেন। গৃহকর্মীরা অবশ্য কাটা বাছা, ধোয়াধুয়ি সবকিছু গুছিয়ে দেয়। রান্নাটা শুধু উর্মি ভুঁইয়া কিংবা মানহা করে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া আবার মেইডদের হাতের রান্না খেতে পারেন না। ভীষণ ভোজন রসিক মানুষ তিনি। তাই রান্নাটা খুব আগ্রহের আনন্দের সাথেই করেন উর্মি ভুঁইয়া। তার হাতের রান্নার স্বাদ অতুলনীয়। মানহাও বেশ কিছু রান্না শিখেছে উর্মি ভুঁইয়ার থেকে। এখন মোটামুটি ভালোই রাঁধতে পারে সে।
ঘর্মাক্ত মুখশ্রী তেল তেলে হয়ে আছে মানহার। শুক্রবারের আয়োজন বিশাল হয় এবাড়িতে। প্রত্যেকদিনই বিভিন্ন পদের আইটেম থাকে তবে আজকের আইটেম গুলো স্পেশাল। তার উপর বাড়িতে মেহমান আছে দুই মামা শ্বশুর। বাড়তি পদ তো থাকবেই। পোলাও, রোস্ট, কাবাব, চিংড়ির মালাইকারি, সরষে ইলিশ, আলু পোস্ত, রুই মাছের কালিয়া, কোপ্তা, গরুর কালা ভুনা, মুড়ি ঘন্ট, সাদা ভাত। ডেজার্ট হিসেবে থাকবে চমচম, রসগোল্লা, মিষ্টি দই আর ক্ষীর। উর্মি ভুঁইয়া আজ বেশ কয়েকটা পদ নিজে করেছেন আর বাকিগুলো মানহাই করেছে।
টেবিলে এতো পদ দেখে ইহাবের জিহ্বায় পানি এসে গেছে। আশেপাশে কাউকে না দেখে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো মানহা খুব মনোযোগ দিয়ে রান্না করছে। সব আইটেম শেষে ফ্রোজেন করা কাবাব গুলো ভেজে নিচ্ছিলো সে। ইহাব চট করে রান্নাঘরে ঢুকে গরম কাবাব টিস্যু পেপারে ধরে কামড় বসিয়ে দিলো। এই মাত্র গরম গরম ভেজে টিস্যুতে উঠিয়ে রেখেছিল মানহা আর ঐসময়ই ইহাবের আগমন। মুখে ঢুকাতেই গরমে মুখ পুড়ে গেলো তার। লাফ দিয়ে উঠে মুখেরটা ফেলে দিলো। মানহা খুন্তি হাতে কোমরে হাত দিয়ে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলো। ইহাব কুলি করে মানহার দিকে তাকিয়ে বললো,
“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? চোখ নামাও। স্বামীর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায় কেউ?”
মানহা কাবাব উল্টে দিয়ে ভাজা কাবাব গুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বললো,
“আরেকবার হাত দুটো এখানে পড়লে কাঁটাচামচ দিয়ে ফুটো করে দেবো।”
“কিহ, আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমাকে থ্রেট দেয় কত্তবড় সাহস!!”
মানহা ভাবলেশহীন উত্তর দিলো,
“এটা আমারও বাড়ি।”
ইহাব তেড়ে এসে বললো,
“তোমার বাড়ি কোত্থেকে হলো? এই দুনিয়ার সব তোমার ভাই আর তোমার। আমরা হলাম ভাড়াটিয়া। যেমন ভাই তেমন বোন।”
মানহা ইহাবের বুকে চাপ দিয়ে সরিয়ে দিয়ে সালাদ কাটার জন্য চপিং বোর্ড নিয়ে এসে বললো,
“বাড়িটা আমার ভাইয়ের না। আমার শ্বশুরের। সুতরাং সেই সূত্রে এটা আমারও।
ইহাব বিড়বিড় করে বললো,
“মেয়ে মানুষের প্যাঁচের কাছে ইবলিশের প্যাঁচও ফেল। কোনোদিন স্বীকার করবে না এটা স্বামীর বাড়ি। একটা কথা প্যাঁচাতেই থাকবে। পেঁচিয়ে নেপচুনে নিয়ে যাবে।”
উর্মি ভুঁইয়ার আগমনে ইহাব রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। তিনি মানহাকে গোসল করতে পাঠিয়ে দিলেন। মানহা উপরে এসে ঘরে ঢুকতে নিলেই একটা কথা শুনে থমকে গেলো,
“লাশটা সরিয়ে দে। কাক পক্ষীও যেন টের না পায়। আমি যথাসময়ে পৌঁছে যাবো। আর বাসায় থাকাকালীন ফোন করতে নিষেধ করেছি না? মেসেজ দিবি। এখন ফোন রাখ।”
বলেই ফোন কেটে পিছনে ফিরে মানহাকে দেখে থতমত খেয়ে গেলো সাথে আতঙ্কিত হলো। মানহা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। কিছু শুনে ফেলেনি তো আবার। মানহা চিৎকার দিয়ে বললো,
“আপনি কাকে খুন করে লাশ সরিয়ে ফেলতে বলেছেন? কি করছেন সকলের অগোচরে? আল্লাহ…”
বাকি কথা শেষ করতে পারলো না অমনি ইহাব মানহার মুখ চেপে হিংস্র নজরে চাইলো। কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
“চুপ, আরেকবার চিল্লালে তোমাকেও লাশের কাছে পাঠিয়ে দেবো।”
মানহা উম উম শব্দ করে যাচ্ছে। তার চোখে ভয়। ইহাব মানহার দিকে তাকিয়ে বললো,
“চিল্লাবে?”
মানহা ঘাড় নাড়িয়ে না বোঝালো। ইহাব মুখ থেকে হাত সরিয়ে দিতেই মানহা আবারও চিৎকার দিয়ে উর্মি ভুঁইয়াকে ডাকতে লাগলো। ইহাব তড়িঘড়ি করে আবারও মুখ চেপে ধরে বললো,
“মন চাচ্ছে গলাটা কেটে দেই। দেখায় যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না এদিকে তিনি উল্টো পাশের মাছ খেয়ে দিব্যি হজম করে বসে আছে সেটা তো কেউ জানে না।”
ইহাবের কথা শেষ হতেই মানহা তার হাতের তালুতে জোরে কামড় বসিয়ে দিলো। ইহাব দ্রুত হাত সরিয়ে ফেললো। মানহা এবার চিৎকার করে বললো,
“সত্যি করে বলুন কী করছেন সবার অগচরে? আমাকে দমিয়ে রাখলেই এসব কথা মিথ্যা হবে না। যতই আমাকে দমিয়ে রাখুন না কেন আমি চিৎকার করে বলতেই থাকবো আমি লাশ সাপ্লাই করেন।”
ইহাব ঠোঁটে আঙুল রেখে বললো,
“এই একদম চুপ!! বেশি কথা বললে তোমাকেও সাপ্লাই করে দেবো।”
“দিন। ভয় পাই আপনাকে? আমার কিছু হলে ভাইয়া আপনাকে ছিঁড়ে ফেলবে।”
ইহাব দু হাত উঁচিয়ে বললো,
“ওরে বাপ্রে, ভয় পেলাম তো। বোঝে না ছাতার মাথা, জীবনটা আমার তেজপাতা।”
ইহাবের তাচ্ছিল্য শুনে মানহা ফোঁসফোঁস করতে লাগলো।
বিরাট ডাইনিং টেবিলে খাওয়ার আসর জমেছে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া, ইহাব ভুঁইয়া, উমায়ের ভুঁইয়া, উজান ভুঁইয়া সবাই নামাজ পড়ে এসেই খেতে বসেছে। রান্নার সুঘ্রাণে বসে থাকা দুষ্কর। উমায়ের ভুঁইয়া ভাগ্নের প্লেটে ইলিশ মাছ বেছে দিতে দিতে বললেন,
“কিরে এখনো মাছ বেছে দিতে হয়?”
ইহাব মাথা নাড়িয়ে বললো,
“এখন মোটামুটি ভালোই মাছ বাছতে পারি। তবে ইলিশ মাছ এখনো এভয়েড করি।”
উজান ভুঁইয়া খোঁচা মেরে বললেন,
“এখন আর মাছ নিয়ে ঝামেলা হবে না ভাগ্নের। মাছ বাছার মানুষ তো এসেই গেছে। তাই না মামা?”
ইহাবের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো। ইহাব কিছু বলার আগেই ইমতিয়াজ ভুঁইয়া বললেন,
“ঠিক যেমন তোমার উষ্টা খাওয়ার সঙ্গী হয়েছিল তাই না শালা?”
উজান ভুঁইয়া দুলাভাইয়ের কথা শুনে মুখ লটকিয়ে ফেললেন। খাবার টেবিলে বসা সকলে একযোগে হেঁসে উঠলো। উজান ভুঁইয়া উর্মি ভুঁইয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপা দুলাভাইকে নিষেধ করো। বিয়ের আগে উষ্টা খেলেও বিয়ের পর কখনোই উষ্টা খাইনি।”
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া মুরগির লেগ পিসে কামড় বসিয়ে বললেন,
“বুঝলে বিয়ের আগে উষ্টা খেতে বউয়ের অভাবে। বউ আসার পর আর নতুন করে কি উষ্টা খাবে এমনিতেই বউরা স্বামীদের যেই প্যারা দেয় কয়েকশো লাথি উষ্টাও এর কাছে কিছু না। বউয়ের চাপে রিয়েল উষ্টার কথাই ভুলে গেছো।”
উজান ভুঁইয়া বলে উঠলো,
“দেখেছো আপা, বউদের কথা বলে ইনডাইরেক্টলি তোমাকে খোঁচা দিলো।”
উর্মি ভুঁইয়া ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার দিকে শান্ত চাহনি নিক্ষেপ করলেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া মনে মনে বললেন, খবিশ গুলো আমার সংসার ভাঙতে এসেছে। মন চাচ্ছে টুটি চেপে ঘর থেকে বের করতে। এদের দুই চক্ষে সহ্য করতে পারিনা। সব জায়গায় ভেজাল লাগাবে। পাছায় লাত্থি মারতে পারলে ভালো লাগতো।
উজান ভুঁইয়া দুলাভাইকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে বেশ আনন্দিত হলেন। উমায়ের ভুঁইয়া কথা কম বলেন। তিনি চুপচাপ খাওয়া শেষ করে উঠে যাওয়ার আগে বললেন,
“প্রত্যেকটা রান্নাই মজা হয়েছে। অনেকদিন পর কব্জি ডুবিয়ে খেলাম। মজার খাবার দেখে বেশি খেয়ে ফেলেছি। গ্যাস্ট্রিকের প্রবলেম না হলেই হয়।”
উর্মি ভুঁইয়া ভাইকে বললেন,
“গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দেবো ভাইজান?”
“দে। পেটটা কেমন যেন করছে।”
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া বললেন,
“টয়লেট উপরে।”
উমায়ের ভুঁইয়া ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার দিকে তাকিয়ে উপরে চলে গেলেন। ইহাব উজান ভুঁইয়াকে উদ্দেশ্যে করে বললো,
“মামু তুমি উষ্টা খেতে কিজন্য? কোনো সমস্যা ছিল নাকি?”
“আর বলিস না। হঠাৎই হাঁটতে গেলে উল্টিয়ে পড়তাম। সোজা রাস্তাতেও এমন হতো। কেন হতো কে জানে।”
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কথা বলবেন না বলবেন করেও মুখ ফসকে বলে ফেললেন,
“ভিটামিনের অভাব ছিল। খুব সম্ভবত পোলিও টিকার ঘাটতি আছে তোমার মামার শরীরে।”
মারওয়ান সন্ধ্যার দিকে এসে গোসল করে একটু ঘুমিয়েছিল। এখন ঘুম থেকে উঠে ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঝট করে কোলে তুলে নিতেই হাতে ভেজা অনুভূত হলো। ছেলেকে কোল থেকে নামাতেই দেখলো হাতে মল। মারওয়ান রাগান্বিত কণ্ঠে বললো,
“হেগে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কোলে নেয়ার সময়েও তো বলতে পারতি বাবা আমি হেগেছি; কোলে নিও না। এখন আবার গোসল করতে হবে।”
তার কণ্ঠে বিরক্তি উপচে পড়ছে। নাহওয়ান সেন্ডুগেঞ্জি তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এক্ষুণি কেঁদে ফেলবে ভাব। মারওয়ান আবারও চোখ রাঙালে বাচ্চাটা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
“বাইল হয়ে গেচে। মা ডুয়ে ডেয়নি।”
“মা যখন ধুয়ে দেয়নি তখন আমাকে বলিস নি কেন পটলের বাচ্চা? এই জিনিস তোকে মাখিয়ে দেই?”
মারওয়ান হাতের বস্তু দেখিয়ে বললো। নাহওয়ান তার ছোট্ট শরীরটা নিয়ে আধ লেংটা অবস্থায় দৌড় দিতে দিতে বললো,
“ইচ চিহ? টুমি পুচা।”
“এখন ইছ ছিঃ, আমি পঁচা? আরেকটা কথা বললে কিল দিয়ে ডিম পাড়ায় দেবো।”
নাহওয়ান ছলছল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। নিশাত ছেলের প্যান্ট নিয়ে এসে বললো,
“ওমা বেরিয়ে এসেছো কেন? বসে থাকতে বললাম না।”
বলতে বলতেই মারওয়ানের হাতের দিকে তাকিয়ে যা বোঝার বুঝে গেলো। নিশাতের কেন যেন খারাপ লাগার বদলে পৈচাশিক আনন্দ হলো। ছেলেকে পরিষ্কার করে বেরোতেই মারওয়ান গোসল করতে ঢুকলো। নিশাত নাহওয়ানকে প্যান্ট পড়িয়ে বললো,
“এখানে বসে থাকুন। মা চট জলদি রান্নাটা সেরে ভাত খাইয়ে দেবো।”
নাহওয়ান ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। নিশাত চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মারওয়ান বেরিয়ে এলো। ছেলের দিকে আবারও চোখ রাঙিয়ে তাকালো। বাবাকে এরকম চোখ উল্টাতে দেখে বাচ্চাটা গাল ফুলিয়ে বললো,
“বাইল হয়ে গেচে।”
মারওয়ান গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বললো,
“হ্যাঁ তোর তো খালি বাইর হয়ে যায়। ঢিলা কোম্পানি।”
নাহওয়ান বাবার কথা বুঝতে না পেরে খেলায় মনোযোগ দিলো। মারওয়ান খাটের উপর শুয়ে বললো,
“দেখি পিছন দেখা, পরিষ্কার হয়েছিস তো ঠিক করে?”
নাহওয়ান দাঁড়িয়ে পিছন ঘুরে দেখালো। মারওয়ান ছেলেকে ঝট করে বুকে তুলে বললো,
“আয় ঘুমাই।”
“গুমাবো না।”
“তো কি করবি?”
“কেলবো।”
“এত খেলা লাগবে না। আয় বাপ বেটা কোলাকুলি করে ঘুমাই।”
ঘুমের কথা শুনে নাহওয়ান মোচড়ামুচড়ি করতে লাগলো। মারওয়ান চোখ রাঙিয়ে তাকালে ঠোঁট উল্টে বললো,
“ইট্টু সুসু কলবো।”
মারওয়ান ঠেসে ধরে বললো,
“মিথ্যা কথা বলার জায়গা পাস না? হাগু মুতু কি তোর মিনিটে মিনিটে আসে ঢিলার বাচ্চা?”
নাহওয়ান বুঝলো বাবার হাত থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে না। তাই মুখ ফুলিয়ে বললো,
“ভাতু কাবা না?”
“খাবো। দারুন সুঘ্রাণ আসছে। দেখে আসি তোর মা কি রান্না করছে।”
বলে ছেলেকে নামিয়ে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিলো। নিশাত আজকে দুপুরে রান্না করেনি। মাথা ব্যথায় শুয়ে ছিল। তাই রাতে ডাল চাল মিলিয়ে কালকের একটু বেঁচে যাওয়া মুরগির গোশত দিয়ে খিচুড়ি রান্না করছে। এমনিতেই বাপ, বেটার ভালো মন্দ নাহলে মুখে খাবার রোচে না তাই এই শর্ট টেকনিক ইউজ করলো। সময়ও কম লাগলো সাথে খেতেও সুস্বাদু হয়। এদিকে মারওয়ান রান্নাঘরে উঁকি মেরে দেখলো খিচুড়ি রান্না হচ্ছে তাই আর ভেতরে না গিয়ে রুমে চলে গেলো। নিশাত কয়েকটা আলু ভাজা করে নিলো। খিচুড়ির সাথে মুচমুচে আলু ভাজা কিংবা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে মজাই লাগে। আলহামদুলিল্লাহ রাতের খাবার তৈরি।
রাতের খাবার খেয়ে নিশাত পরীক্ষার খাতা কাটতে বসে গেলো। কয়েকদিন ধরে একেবারেই অন্যদিকে সময় দিতে পারছে না। ইস্তেখারাও করা হচ্ছে না। ইস্তেখারার রেজাল্ট এখনো আসেনি। নিশাত চিন্তায় আছে। আল্লাহ কি তার প্রতি নারাজ? এর আগে ইস্তেখারা করার কয়েকদিনের মধ্যেই ফলাফল পেতো। এবারই বিলম্ব ঘটছে। নাকি ঠিকমতো ইস্তেখারা করা হয়নি বুঝতে পারছে না সে। পরীক্ষার খাতা দেখতে দেখতে বেশ রাত হলো। অন্য রুমে বাবা, ছেলে ঘুমিয়ে আছে। নিশাত আর না গিয়ে তাহাজ্জুদ পড়তে দাঁড়িয়ে গেলো। তাহাজ্জুদ পড়তে পড়তেই জায়নামাজে কখন ঘুমিয়ে পড়লো বলতে পারবে না।
ফজরের আজানের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। ঘেমে একেবারে অস্থির হয়ে গেছে সে। কি স্বপ্ন দেখলো এটা! এটা কি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ইশারা ছিল? ইশারা বুঝি এত ভয়ংকর হয়! আল্লাহ! কান্না গলায় দলা পাকিয়ে আসছে। বুকটা ধরফর করে কাঁপছে অনবরত। হাপরের মতো বুকটা ওঠানামা করছে। চারদিক কেমন অন্ধকার লাগছে। এত ভয়ংকর স্বপ্ন কোনোদিন না দেখুক সে। জায়নামাজে শুইয়ে আল্লাহ তাকে এ কি স্বপ্ন দেখালো? হাতটা বারবার দেখছে সে। বুকটা ভেঙে কান্না আসছে। শরীর ছেড়ে জায়নামাজে ঢলে পড়ার আগে অস্পষ্টভাবে বললো,
“নাহওয়ানের বা…”
__
হাইরোডের উপরে ফ্লাইওভারে দাঁড়িয়ে আছে কেউ একজন। উপর থেকে যান্ত্রিক গাড়ি গুলোর চলাচল দেখে চলেছে একমনে। পাশ দিয়ে সাই সাই করে অসংখ্য গাড়ি চলে যাচ্ছে এতে তার কোনো ভাবাবেগ নেই। সে শিকারী নেত্রে এক ধ্যানে কিছু দেখে চলছে। পরনে ওভারকোট তার। বাতাসে উড়ছে। পকেটে ফোন ভাইব্রেট হলে রোবটের মতো ফোন কানে লাগিয়ে আগের ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে রইলো। ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো। সব শুনে ফোন কেটে দিয়ে কাউকে কল দিলো। কিছুক্ষণ বাদেই একটি কালো গাড়ি এসে দরজা খুলে দিলে সে চড়ে বসলো। অতঃপর চলে গেলো নিজ গন্তব্যে। গাড়িটি বিলীন হয়ে গেলেও পিছনে তিনজন জ্বলন্ত চোখের অধিকারী ব্যক্তিদের চক্ষু এখনো সেই বিলীন হওয়া গাড়ির শেষ সীমানায় আটকে আছে। মুনতাজির গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,
“এই তবে কিলার আজাদ? আইমিন কিলার জাদ?”
জিনানের নীল নয়ন জ্বলজ্বল করছে। যেন শিকারকে ধরার এক অদ্ভুত তাড়া সেই চোখে। নেওয়াজ বললো,
“লোকটার চেহারায় ধার আছে। একে তো কেউই খুনি বলবে না। সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও আমাদের তীরন্দাজ দৃষ্টি ফাঁকি দেয়া অত সোজা না।”
জিনান রহস্যময় হেঁসে বললো,
“উইলিয়াম শেক্সপিয়রের কিং জন নাটকের একটা ডায়লগ মনে পড়ে গেলো, Be stirring as the time, be fire with fire অর্থাৎ যুদ্ধ বা হুমকির সময় কোমলতা নয় কঠোর প্রতিক্রিয়া জরুরি।”
মুনতাজির ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কি প্রতিক্রিয়া নিতে বলছেন?”
“হেড যেটা অলওয়েজ বলেন। তার গ্যাং বিশাল বড় বোঝাই যাচ্ছে। চেহারা যেহেতু দেখেই ফেলেছি এখন ডিরেক্ট একশনে যাবো তবে ঠান্ডা মাথায় কৌশলে আগাতে হবে। ওদের দলের যাকে ধরা হয়েছে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করে একেবারে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করতে হবে যেন পালানোর পথ না পায়। আমাদের কর্মজীবনে কিলার জাদের মতো ঘোল খাওয়ায়নি কেউ। সে ইচ্ছে করেই নিজেকে ধরা দিচ্ছে কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন থেকে যায়? তাকে ধরতে গিয়েও ধরতে মানা যেন। নাহলে যাকে এতদিন ধরে খুঁজে হয়রান হয়েও সন্ধান কিংবা হদিশ পাওয়া যায়নি হঠাৎ করে তার আস্তানার খোঁজ পাওয়া, চেহারা দেখা দ্যাটস এ বিগ ডিল গায়েজ।”
মুনতাজির ও নেওয়াজ উভয়ই সম্মতি জানালো। আসলেই তো হঠাৎ করেই সবকিছুর খোলাশা হওয়া অদ্ভুত ও সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। মুনতাজির মাথা নাড়িয়ে বললো,
“Wait… are you saying this is a trap? (ওয়েট..আপনি বলতে চাচ্ছেন এটা একটা ট্র্যাপ?)”
“সেরকমই মনে হচ্ছে কেন যেন। দেখা যাক কি হয়।”
নেওয়াজ হিংস্র কণ্ঠে বললো,
“আ…..Killer Jad, you’re a deadly player!”
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৩৮
তাজরীন ফাতিহা
৩ আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ।।
চোখে কাপড় বেঁধে বাড়ির উঠানে খেলছে এক উচ্ছল চটপটে তরুণী। তার সখীদের ধরার জন্য উঠানের এ মাথা হতে ওমাথা দুরন্ত গতিতে ছুটছে সে। মাথায় ওড়না প্যাঁচানো থাকলেও দৌড়ানোর তালে তা মাথা থেকে খুলে পড়ে গেছে। ছুটতে ছুটতে সামনে বাধা পেয়ে ঝাপটে ধরে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো,
“ধরেছি ধরেছি।”
তারপর টান দিয়ে চোখের পট্টি খুলে ফেললো সে। সামনে নিজের পিতৃমহোদয়কে দেখে মুখ কালো করে ফেললো। মুখ ফুলিয়ে বলতে লাগলো,
“বাবা তুমি এই সময়ে?”
পিতা মহাশয় মুচকি হেঁসে বললেন,
“কেন আমি আসাতে মায়ের মন খারাপ হলো নাকি?”
মেয়েটি মুখ কালো করে বললো,
“না, আমি ভেবেছিলাম আমি এখন চোর থেকে ইস্তফা নেবো।”
পিতা মেয়ের মুখ কালো দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“এখন সন্ধ্যে প্রায় হয়ে এসেছে। পুকুরে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফেলো যাও। আর খেলতে হবে না।”
মেয়েটি বাবার আদেশ শিরোধার্য করে হাত মুখ ধুতে পুকুরে চলে গেলো। ওযু করে উঠতে উঠতে চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। পাখিরা সব নীড়ে ফিরছে। সে ঘরে গিয়ে সব বাতি জ্বালিয়ে দিলো। মাগরিবের আজান দিলে আজানের উত্তর দিয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে মনোযোগ দিলো। অন্যদিকে পিতা নামাজের জন্য মসজিদে চলে গেছেন।
নামাজ শেষে পিতা তার বাল্যকালের বন্ধুকে নিয়ে হাজির হলেন বাড়িতে। গুনগুন করে পড়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। পিতা মহোদয় মেয়ের পড়ার আওয়াজ শুনে মেয়েকে আর ডাকলেন না বন্ধুকে নিয়ে তার ঘরে চলে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর মেয়েটির মা ডেকে উঠলো,
“এই নিশাত শুনে যা,,,,”
নিশাত বই বন্ধ করে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে হাটা দিলো। সে কেবল অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হয়েছে। নতুন নতুন বই পড়ার মজাই আলাদা। রাবেয়া খাতুন মেয়েকে কিছু নাস্তা বানিয়ে দিতে বললেন।
“পিঁয়াজ আর আলু কুচি করে দিয়েছি নুডুলস আর পাকোড়া বানিয়ে দে। আমি পাশের চুলায় সেমাই বসিয়েছি। তারপর চা বানাবো।”
নিশাত মায়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে নাস্তা বানাতে লেগে গেলো। সেই ফাঁকে মায়ের কাছে বাবার বন্ধু মাহাবুব আলমের আসার খবরও শুনে ফেললো। নাজিয়া সবে ফাইভে পড়ে। বড় বোনের পিছু পিছু সেও রান্নাঘরের দাওয়ায় এসে বসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে নিশাত নুডুলস, পাকোড়া তৈরি করে ফেললো। সে বিকেলের নাস্তা টুকিটাকি করতে পারলেও ভারী রান্নাটা এখনও তেমন ভালো পারেনা। এদিকে রাবেয়া খাতুন সেমাই নামিয়ে চুলায় কেটলি বসিয়ে দিলেন। দুধের প্যাকেট ছিঁড়ে কেটলিতে দিয়ে দিলেন। একটু পর দুটো কাপে দুধ চা ঢেলে ট্রেতে সাজিয়ে দিলেন। নিশাত আগেই প্রিচে নুডুলস, পাকোড়া আর সেমাই সাজিয়ে দিয়েছে। নাসির উদ্দিন এসে ট্রে নিয়ে গেলেন।
নিশাত কেঁদে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। পাশেই নাসির উদ্দিন ও রাবেয়া খাতুন বসা। রাবেয়া খাতুন বললেন,
“তুই কি এখনো বাচ্চা আছিস? বিয়ে তো একদিন করতেই হবে। এভাবে কেঁদে কুটে চোখ মুখের বারোটা বাজাচ্ছিস কেন?”
নিশাত মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে বললো,
“আমি বিয়ে করতে চাইনা। তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবো না আমি।”
নাসির উদ্দিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“এটা কখনো হয় মা? মেয়ে যেহেতু হয়েছো একদিন তো বিয়ে করতেই হবে। তাছাড়া মেয়েকে তো বেশি দূরে পাঠাচ্ছি না। এক জেলাতেই রাখছি। মনে পড়লেই টুপ করে দেখে আসা যাবে। তোমার মাহাবুব চাচাকে তো চেনোই। ছোট বেলায় যার কোলে বেশি থাকতে তার বড় ছেলের জন্য তোমাকে চেয়েছে। আমিও ভেবে দেখলাম ছেলে ভালো, কোনো দোষ নেই। মাহাবুবের ছেলে খারাপ হতেই পারে না। শিক্ষিত ধার্মিক পরিবার। আর তাছাড়া তোমার গায়ের রঙ কিংবা বেটে হওয়ার জন্য যারা বিয়ে ভেঙে দিতো, নাক ছিটকাতো এই বিয়ে হলে তাদের মোক্ষম জবাব দেয়া হবে। আমার মেয়ে একটু শ্যামলা আর খাটো বলে তারা অনেক অপমান, অপদস্ত করেছে এবার তাদের থেকেও শিক্ষিত, সুন্দর, ভদ্র ছেলেকে মেয়ে জামাই করে দেখিয়ে দেবো আমার মেয়ে কোনো ফেলনা নয়।”
সমাজের চোখে মাহাবুব আলমের বড় পুত্র মহাশয়ের দোষের পাল্লার চেয়ে গুণের পাল্লাই বেশি ভারী ছিল। ছেলে যেমন উচ্চশিক্ষিত তেমন সুদর্শন। গাম্ভীর্য ও আভিজাত্যে মোড়ানো বলিষ্ঠ গড়নের এক লম্বা পুরুষ কায়া। অপরিচিতা গল্পের অনুপমের মতো বলা যায়, কন্যার পিতা দেখা মাত্রই শিকার করিবে সে সুপাত্র। যেমন নাসির উদ্দিন করেছিলেন। নিশাত তাকে বিয়ের আগে এক ঝলক দেখেছিল। নিজের থেকে অত ফর্সা, লম্বা পুরুষ তার জীবনসঙ্গী হবে ভেবেই অস্বস্তি হচ্ছিলো আর লজ্জায় কান গরম হয়ে উঠছিল।
নিশাতকে যেদিন বিয়ে করতে এলো দিনটি ছিল ৫ আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। মারাত্মক চড়া মেজাজ ছিল লোকটার। মুখ দেখলে যে কেউ ভয় পেয়ে যাবে। নিশাতও পেয়েছিল অমন গম্ভীর খিটমিট মেজাজ দেখে। তার ধারণা নিশাতকে দেখে পছন্দ হয়নি বিধায় এমন খিটমিট করছিল আর একটু পর পর এর ওর সাথে গরম দেখাচ্ছিল তবে কবুল বলার পরে সেই ধারণা পরিবর্তন হয়েছিল। লোকটার মেজাজ খারাপের কারণ সে ছিল না বরং ছিল সুয্যি মামার তেজ। বিয়ের সময় নাম শুনেছে লোকটার। মাহাবুব আলমের বড় পুত্র মারওয়ান আজাদ।
বিয়ে দেয়া শেষ হলে নাসির উদ্দিন সবাইকে ডেকে এনে মেয়ে জামাইকে দেখাচ্ছিলেন। মারওয়ানকে দেখে অনেকেই মনে মনে হিংসা করছিল। কালো, বেটে মেয়ের অমন রাজপুত্রের মতো পুরুষ জুটবে কেন? নানারকম কানাঘুষা করতে লাগলো আশপাশের মানুষজন। এক প্রতিবেশী তো নিশাতকে বলেই বসলো,
“দেখিস বিয়ের পর জামাই যেন আবার পরকীয়ায় জড়িয়ে না যায়। তোর জামাইয়ের পাশে তোকে বড্ড বেমানান লাগছে। কম তো আর সম্বন্ধ ভাঙেনি এই বেটে হওয়ার জন্য। তার উপর জামাই জুটেছে লম্বা, তাগড়া, তোর থেকে উজ্জ্বল, শিক্ষিত, নায়কের থেকে কোনো অংশে কম নয়।”
সেই প্রতিবেশীর কথায় তাল মিলিয়ে আরেকজন বললো,
“তা যা বলেছো চাচী। ওরকম সুপাত্র ছেলে বাইট্টানিকে কেন বিয়ে করলো কে জানে? কোনো খুঁত টুত আছে নাকি কে জানে? চরিত্রে দোষ নেই তো আবার?”
“থাকতে পারে, চেহারা ছুরত তো খারাপ না। লাইন টাইন আছে সম্ভবত। দেখলি না কেমন মেজাজ দেখালো।”
এরকম নানা কটূক্তি, কথা যখন নিশাতের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছিল তখন তার বুক এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছিলো যা আজীবন গেঁথে থাকবে হৃদয়ে। মানুষ খোঁচা দিতে ছাড়ে না। সমাজ কালো, বেটে, মোটা, শারীরিক কিংবা মানসিক ত্রুটিযুক্ত মানুষদের তিরস্কার করতে ছাড়ে না। যে যেভাবে পারে কথার বানে পিষে ফেলতে চায়। মানুষকে খোঁচানোতে সমাজের মানুষ এক পৈচাশিক আনন্দ পায়!
বিয়ের রাত নিয়ে মেয়েরা নানারকম স্বপ্ন দেখে। বাবার বাড়ি থেকে সব ছেড়ে ছুড়ে যেই মানুষটার হাত ধরে আগমন ঘটে শ্বশুরবাড়িতে সে মানুষটাকে নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা করে। প্রত্যেক মেয়ে কল্পনায় জীবনসঙ্গীকে নিয়ে একপ্রকার ফ্যান্টাসিতে ভোগে। বাস্তবে তেমন হয়না। পুরুষ মানুষের সাইকোলজি আর মহিলা মানুষের সাইকোলজি পুরোটাই ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা উভয়কে এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে জীবনসঙ্গী বুঝতে চায় মেয়েটিকে, সময় দিতে চায় এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে। তবে নিশাত ঠিক কোন ক্যাটাগরিতে মারওয়ান আজাদকে ফেলবে বুঝতে পারছে না। ঘরে ঢুকেই কোনো ভালো কথা নেই, কুশলাদি নেই ডাইরেক্ট বলে উঠলো,
“এই মেয়ে ঘোমটা দিয়ে আছো কেন? আর এসব জর্জেট পড়ে আমার সামনে থাকবে না। শরীর জ্বলে এসব দেখলে। গরমে পাগল হওয়ার দশা আরেকজন বস্তা গায়ে জড়িয়ে ঘোমটা টেনে রেখেছে। অসহ্য! বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াও, আমি বসবো।”
নিশাত ধমক শুনে ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বললো,
“দাঁড়িয়ে আছো কেন? শাড়ি পাল্টে এসো। এসব ত্যানা পড়ে থাকলে ঘুম আসবে না আমার।”
নিশাত তার কথামতো শাড়ি পাল্টে একটা গোল জামা পড়ে আসলো। মারওয়ান নিশাতকে আগা গোড়া পর্যবেক্ষণ করে শক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কিসে পড়?”
নিশাতের অনেক অস্বস্তিবোধ হচ্ছিলো। একা রুমে একজন অচেনা পুরুষের সামনে থাকতে তার ভয় লাগছিল তার উপর লোকটার ধমক, জিজ্ঞেসায় অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে যাচ্ছিলো সে। বার বার ঘেমে উঠছিল। মারওয়ান জবাব না পেয়ে ফের ধমকে উঠলে নিশাত মিনমিন করে বললো,
“অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে।”
“দেখে তো মনে হচ্ছে না। সাইজ তো মনে হচ্ছে আমার হাঁটুর সমান। বয়স লুকিয়েছো নাকি?”
কথাটায় নিশাতের কেন যেন চোখে জল এলো। ঠোঁট চেপে বললো,
“জ্বি না। আমি একটু বেটেই তাই আপনার ওরকম মনে হচ্ছে।”
মারওয়ানের উত্তরটা কেন যেন পছন্দ হয়নি। সে আর কোনো কথা না বলে বালিশে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। নিশাত হতবুদ্ধির মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। এ কেমন বাসর রাত!
বিয়ের দুইদিনের মাথায় নিশাত বুঝতে পারলো মারওয়ান আজাদ নামক লোকটা মাকাল ফল টাইপ। উপরে ফিটফাট হলেও কাজকর্মে পুরাই ভাদাইম্মা, অলস প্রকৃতির। ঘর থেকে বেরোয় না বলতে গেলে। সারাদিন ঘুমায়। নিশাত নতুন বউ দেখে আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেসও করতে পারেনা লোকটা আদৌ কিছু করে কিনা? নাসির উদ্দিন এই নিয়ে প্রশ্ন করলে শ্বশুর মশাই তাকে জানিয়েছেন মারওয়ান বর্তমানে বেকার। কয়েকদিনের মধ্যে কাজ হবে। নাসির উদ্দিন বন্ধুর কথায় আশ্বস্ত হয়ে মেয়ের ওয়ালিমা খেয়ে মেয়েকে নিয়ে ফিরতি নাইওর আসেন। সেদিনও মারওয়ানের মেজাজ চড়া ছিল।
টেবিলের উপরে গামলা ভর্তি হলুদ দলা পাকানো বস্তুগুলোর দিকে তাকিয়ে মারওয়ান মায়মুনা বেগমের দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় শুধালো,
“এটা কি রেধেছো মা?”
মায়মুনা বেগম ছেলের কঠিন চেহারার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললেন,
“বিরিয়ানি।”
মারওয়ান পাতের হলুদ রঙের ভর্তা ভর্তা জিনিস গুলো হাতে নিয়ে বললো,
“এটাকে কোন স্টাইলের বিরিয়ানি বলে?”
“নিশাত স্টাইল বিরিয়ানি।”
একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিশাত কাচুমাচু ভঙ্গিতে ফট করে বলে বসলো। মারওয়ান তার দিকে শক্ত মুখে একবার চেয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ইয়ার্কি হচ্ছে? এসব কি খাওয়ার যোগ্য? সারাদিন পর খেতে বসেছি নিশ্চয়ই এসব খেতে নয়। যে রাঁধতে জানে না তাকে দিয়ে রান্না করানোর মানে কি? রুচিই তো মরে গেলো।”
মায়মুনা বেগম তাড়াহুড়া করে বললেন,
“এভাবে বলছিস কেন? মেয়েটা পানির পরিমাণ বেশি দিয়ে ফেলেছে। তাই একটু ভর্তা ভর্তা হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে শিখে যাবে। নতুন একটু মানিয়ে তো নিতেই হবে। অমন করিস না।”
মারওয়ান ‘ধ্যাৎ’ বলে পাতের প্লেট ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে চলে গেলো। নিশাত ফোঁপাতে ফোঁপাতে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। বিয়ের পর প্রথম শ্বশুর বাড়ির মানুষের জন্য রাঁধলো এতেই গণ্ডগোল করে ফেলেছে। রান্নাটা ভালোভাবে আয়ত্ত করা উচিত ছিল তার। মায়মুনা বেগম নিশাতের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“কেঁদো না। ও ভালো খাবার না পেলে রাগারাগি করে। খাবারের বেলায় এদিক থেকে ওদিক হলে চেঁচামেচি করে। তুমি কষ্ট পেও না। কালকের একটু মুরগির গোশত আছে আর ডিম বেজে দিচ্ছি ভাতের সাথে খাবে। তুমি নিয়ে যাও।”
নিশাত ভয় পেয়ে বললো,
“আমাকে দেখে যদি মারে?”
“মারবে কেন?”
নিশাত চোখ নামিয়ে মিনমিন করে বললো,
“ঐযে বিরিয়ানি ভর্তা বানিয়ে তার খাওয়ায় অরুচি ধরিয়েছি সেজন্য।”
মায়মুনা বেগম নিশাতের থুতনি উপরে উঠিয়ে বললো,
“বোকা মেয়ে। ওর রাগারাগি চিল্লাচিল্লি, ভাংচুর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। গায়ে হাত তোলার শিক্ষা আমরা দেইনি। তুমি খাবার নিয়ে যাও।”
নিশাত তবুও বললো,
“আম্মা আপনি নিয়ে যান। আমার ভয় করে।”
“ভয়কে জয় করতে হবে। যেহেতু সংসার করতে হবে সেহেতু এখন থেকেই ভয়কে টা টা বায় বায় করে দাও। ভয় পেলে চলবে না।”
শাশুড়ি মায়ের সেই কথা নিশাতের কানে এখনো বাজে। তারপর থেকে ভয়কে জয় করে কিভাবে কিভাবে যেন চারটা বসন্ত কাটিয়ে দিলো। পড়ালেখা শেষ করলো, নাহওয়ান এলো। ভাবতেই অবাক লাগে এই কাঠখোট্টা পুরুষের সাথে তার বিবাহিত জীবনের চার চারটে বছর শেষ। কয়েকদিন বাদে পাঁচ বছরে পদার্পণ করবে। অতীতের স্মৃতি মন্থন শেষে জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখায় মনোনিবেশ করলো। নাহওয়ান ছোট্ট গুলুমুলু শরীরটা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে এসে হাতের আঙুল দেখিয়ে বললো,
“ইনদি বেতা।”
নিশাত ছেলের হাত মুখে ঢুকিয়ে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করলো। খানিক পর ফোপানোর আওয়াজ পেলে নিশাত মুখ থেকে আঙুল বের করে বললো,
“কিভাবে ব্যথা পেয়েছো?”
“ডরজা চিপা ডিচে।”
“দরজা চিপা দেয় আবার কিভাবে? তুমি দরজার পাশে হাত কেন দিয়েছিলে?”
নাহওয়ান কোনো জবাব না দিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দিলো। নিশাতের আবারও অতীতের কিছু খণ্ডাংশ চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
**
বিয়ের কিছুদিন পরেই নিশাত মারওয়ানের সাথে ঢাকায় ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করে। যেহেতু মারওয়ানের কোনো ইনকাম ছিল না সেহেতু মাহাবুব আলম সমস্ত খরচ নিজ কাঁধে তুলে নেন। নিশাতকে ভর্তি করান। গ্রাম থেকে ট্রান্সফার করিয়ে ঢাকার একটা সরকারি কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি করায় তার শ্বশুর। প্রতিদিন ক্লাস করা সম্ভব না হলেও চেষ্টা করতো উপস্থিত থাকার। তখন মারওয়ান আনা নেয়া করতো তাকে। সে যখন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল এক্সাম দেয় তখন বুঝতে পারে তার শরীরে আরেকটি প্রাণ বেড়ে উঠছে। মারওয়ানকে এই কথা জানালে অদ্ভুতভাবে লোকটা শিথিল হয়ে গিয়েছিল। কোনো প্রতিক্রিয়া জানায় নি। কথায় কথায় মেজাজ দেখাতো না। কেমন যেন নিষ্প্রাণ, নির্লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। নিশাত ঠিক ঠাওর করতে পারছিল না সন্তান আসায় লোকটা খুশি নাকি বেজার।
যেদিন তার লেবার পেইন উঠলো সেদিন মারওয়ান আজাদের চোখে কি যেন একটা ছিল। ওই চোখ বেশিক্ষণ দেখতে পায়নি সে। রাত দেড়টা তখন গভীর রাত বলতে গেলে। ব্যথায় তার শরীর অবশ হয়ে গেছিলো। চিৎকার করতে করতে গলা ব্যথা বানিয়ে ফেলেছিল সে। কাঠখোট্টা, রসকষহীন কঠোর মারওয়ান আজাদ কি করবে বুঝতে পারছিলো না। নিজের আরামের ঘুম বাদ দিয়ে তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটেছিল। সেই রাতে গাড়ি পেতে কষ্ট হয়েছিল অনেক। বাইরে ছিল ঝুম বৃষ্টি। কারণ দিনটি ছিল ১০ই শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। বৃষ্টিতে ভিজে অত রাতে কোত্থেকে গাড়ি জোগাড় করে এনেছিল নিশাত জানে না। গাড়ির মধ্যে যখন পানি ভাঙছিল নিশাতের ছটফটে দেহটা নিজের দেহের মাঝে চেপে ধরেছিল নির্লিপ্ত সেই পুরুষ যুবা। কানের কাছে শুধু বলে চলছিল,
“কিছু হয়নি, কিছু হয়নি…. আল্লাহ আছেন!”
নিশাতের তখন হুশ ছিল না। কাঁদতে কাঁদতে বেঁহুশ প্রায়। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে মারওয়ানের বুকে কত কিল যে দিয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। তখন তার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। একজন মা’ই বলতে পারবেন লেবার পেইনের ব্যথা কত কষ্টের। প্রচলিত আছে একটি শিশু জন্ম দিতে গেলে একজন মায়ের ২০টি অথবা ২৭ টি হাড় ভেঙে ফেলার মতো যন্ত্রণা অনুভূত হয়। ব্যথায় পিঠ, তলপেট, পা এবং সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল তার। এই অসহনীয় যন্ত্রণা দেখে মারওয়ান আজাদ তলপেটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। হাসপাতালে ওটিতে ঢোকার আগ পর্যন্ত নিশাত হাত ছাড়িনি মারওয়ানের। যখন ওটি রুমে ঢোকানো হচ্ছিলো সে চিৎকার করে সেই হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বেহুশের মতো বলছিল,
“আমার সাথে থাকুন। আমার ভীষণ ভয় করছে।”
নার্স, ডাক্তাররা হাত ছাড়ানোর জন্য জোরাজুরি শুরু করছিলেন তখন মারওয়ান তার মাথায় হাত বুলিয়ে কানে বিড়বিড় করে বলেছিল,
“আল্লাহ ভরসা। আল্লাহ আছেন ভয় নেই।”
সেই দুই বাক্য এখনো নিশাতের কানে বাজে। বাক্য দুটিতে কি ছিল জানা নেই তবে একেবারে শক্ত হয়ে শান্ত হয়ে গিয়েছিল সে। আলহামদুলিল্লাহ দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার কষ্টকে স্বার্থক করে চারিদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনির সাথে প্রতিধ্বনি হচ্ছিলো একটি নবজাতকের কান্নার। নিশাতের কোল জুড়ে আগমন ঘটে এক পুত্র সন্তানের। নরমাল ডেলিভারি হয়েছিল তার। জ্ঞান ফিরে শ্বশুরের কোলে একটা ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চা দেখেছিল সে। যে তখন হাত, পা ছড়িয়ে চিৎকার করায় ব্যস্ত। সেই অম্লান স্মৃতি এখনো জীবন্ত যেন।
প্রথম প্রথম বাচ্চাকে কোলে নিতো না মারওয়ান আজাদ তবে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। নিশাত জানে না কেন কোলে নিতো না। জন্মের সাত দিনের দিন যখন আকীকা করা হয় তখন নাসির উদ্দিন ও মাহাবুব আলম অনেক ভেবে চিন্তে মারওয়ানের সাথে মিলিয়ে বাচ্চার নাম রাখে নাহওয়ান। যার আরবি অর্থ জ্ঞানী, বুদ্ধিমান। নিশাতেরও ভীষণ পছন্দ হয় নামটি। কিন্তু মারওয়ানের সেই নাম পছন্দ হয়না। এই নাম রাখায় ভীষণ আপত্তি ওঠায় সে। তখন সবাই ক্ষেপে গেলে সে ফাইয়াজ নাম রাখার প্রস্তাব দেয়। অনেক বাকবিতণ্ডার পর শেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বাচ্চার নাম হবে ফাইয়াজ নাহওয়ান। মারওয়ান এনিয়ে আর আপত্তি ওঠায় না। ইসলামী বিধান অনুযায়ী বাচ্চার মাথা মুণ্ডন করে দুটি খাসি জবাই দেয়া হয়। নিজেদের জন্য কিছু গোশত রেখে বাকিটুকু গরীব ও আত্মীয় স্বজনদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হয়।
নাহওয়ানের বয়স যখন একমাস তখন মাহাবুব আলম জোর করে ছেলের কোলে নাতিকে উঠিয়ে দেন। মারওয়ান কোলে নিয়ে দেখে তুলোর মতো নাদুস নুদুস চেহারার একটা বাচ্চা তার দিকে চেয়ে আছে। তার কোলে দেয়া মাত্র দন্তবিহীন কি নির্মল হাসি! যেন এতদিন বাদে বাবার কোল উঠতে পেরে আনন্দ আর ধরে না। মারওয়ান খুবই মোলায়েমভাবে তার কোলের মাংসপিণ্ডটা আঁকড়ে ধরে তাকিয়ে ছিল। বাচ্চাটাও একদৃষ্টিতে তার জনকের দিকে চেয়ে ছিল। মাহাবুব আলম কিছু বলার জন্য জোর করলে মারওয়ান কি বলবে বুঝতে না পেরে অনেকক্ষণ বাদে মুখ খুলে ভারী গলায় বলে উঠেছিল,
“এইটুকু আন্ডা বাপের চোখের দিকে তাকাস? চোখ নামা।”
বলা শেষ করতে না করতেই মারওয়ান ভিজে একাকার। সংবাদপত্র ছাপানো হলে নিশ্চয়ই হেডলাইন থাকতো,
“পিতার কথা অপছন্দ হওয়ায় পুত্রের মূত্র বিসর্জন।”
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১১+১২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৯+৪০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৩
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৩+৫৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৪৯.১+৪৯.২)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন ১৯+২০