Golpo romantic golpo ভবঘুরে সমরাঙ্গন

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩১+৩২


ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৩১

তাজরীন ফাতিহা

ঘোর তমসায় নিমজ্জিত কক্ষ। বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে আছে মারওয়ান। তার হাতের লালচে উজ্জ্বল গোলকটি জ্বলে উঠছে প্রতি নিঃশ্বাসে। মৃদু কম্পমান তার শরীর। কম্পনরত একটি হাত উঠিয়ে ললাটে ঠেকালো। সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে মন্থর গতিতে মস্তক টিপতে লাগলো সে। কিছু একটা ভেবে চলছে অনেকক্ষণ। কিছুক্ষণ আগে প্যান্টের পকেটে একটা ভাঁজ করা চিরকুট পায়। চিরকুটটি খুলে সে থম মেরে ছিল কয়েক মুহূর্ত। এটা কি ছিল?

মারওয়ান,

জানি সম্বোধনে বিরক্ত হবি তাই সম্বোধনে না যাই। তোকে যেটা বার বার বলতে চাচ্ছিলাম শুনলি তো না তাই চিঠিতেই জানাতে হলো। মাহাবুব আঙ্কেল নিশ্চয় তোকে বলেছেন মানহাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্য। আশা করি বিয়ের ব্যাপারে আর রাগ নেই তোর। ওকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। আংকেল আর আমি তাদের পরিকল্পনা বানচাল করে দিয়েছি। প্ল্যান মাফিক এই বিয়েতে এগিয়েছি। আংকেল এই বিয়েতে রাজি না, আমি জোর করে বিয়ে করছি এরকম অভিনয় করে শত্রু পক্ষদের মনে কনফিশন তৈরি করেছি। আমার মনে হয় ওকে যারা পাত্র সেজে দেখতে এসেছিল ওরা ওই দলের কেউ হবে। তোর চারপাশে বিপদ ওৎ পেতে আছে। সাবধানে থাকিস।

ইতি
কেউ না।

মারওয়ান চিঠিটা পড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে। এই চিঠি কখন রেখেছে ইডিয়টটা। দুদিন ধরে খেয়াল করেনি তো? ভাগ্যিস প্যান্ট ধোয়নি নাহলে তো চিঠি ভর্তা হয়ে যেতো। কিছুই ভালো লাগছে না তার। মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। তাই ঘর অন্ধকার করে রেখেছে। নিশাত পাশের রুমে শ্বশুর আর বাবার সাথে গল্প করছে। নাহওয়ানও মনে হয় ওখানে। কবুতরের বাচ্চাটা থাকলে মাথাটা টিপিয়ে নেয়া যেতো। তখনই রুমের পর্দা সরিয়ে ছোট্ট মাথা উঁকি দিলো। অবয়বটি ধীরে ধীরে হেঁটে বিছানার কাছে এসে ডাকলো,

“বাবা, বাবা?”

মারওয়ান মাথা যন্ত্রণায় ছটফটাচ্ছিলো। ওষ্ঠে এখনো সিগারেট ধরা। ছেলের ডাক শুনে সিগারেট খাটের কোণা দিয়ে নিচে ফেললো। ছেলেকে বিছানায় উঠিয়ে তার বুকের উপর বসালো। কথা বলতে গেলে মুখ থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে গেলো। নাহওয়ান নাকে হাত দিয়ে বললো,

“ডোয়া, ডোয়া। উম পুঁচা গন্ড।”

মারওয়ান নাক, মুখ দিয়ে ধোঁয়া বার করে বললো,

“চুপ। তোর জল্লাদ নানা হাজির হয়ে যাবে সিগারেট খেয়েছি শুনে। শান্তি মতো একটু সিগারেটও টানতে পারিনা তোর মায়ের গুষ্টির জন্য। পঁচা গন্ধ আবার কি? মায়ের গুষ্টির সাথে থাকতে থাকতে সাধু হচ্ছিস? আগে তো চুপচাপ থাকতি এখন গন্ধ বলা হচ্ছে একদম আলু ভর্তা বানিয়ে ফেলবো।”

নাহওয়ান মায়া মায়া নজরে তাকিয়ে বাবার বুকের উপর শুয়ে বললো,

“ইননা। বত্তা কললে মাইল ডিবে।”

মারওয়ান ছেলেকে চেপে ধরে বললো,

“কার এতো বড় স্পর্ধা আমাকে মারবে? তাকেও ভর্তা করে ফেলবো।”

নাহওয়ান বাবার বুকে শান্ত হয়ে পড়ে রইলো। মারওয়ান ছেলেকে ডাকলো,

“ওই কবুতরের ছাও?”

“কি?”

“আমার মাথাটা একটু টিপে দে বাপ। অনেক দোয়া দিবো যেন তাড়াতাড়ি বড় হয়ে আমার মাজাটাও টিপে দিতে পারিস।”

নাহওয়ান বাবার কথার অর্থ পুরোপুরি উৎঘাটন করতে পারলো না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বললো,

“আচ্চা টিপি ডেই।

মারওয়ান বুঝলো ছেলে তার কথার মর্মার্থ বোঝে নি। ছেলের ছোট্ট ছোট্ট হাত যখন তার কপালে পড়লো তখন দারুন শান্তি লাগলো। ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখলো বাচ্চাটা দুই হাত দিয়ে বহু কসরত করে জোর দিয়ে কপাল টিপতে চাচ্ছে কিন্তু ছাওটার শরীরের এতো জোর মারওয়ানের কাছে হালকা পালকের ছোঁয়ার মতো লাগছে। আরামে কখন গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেলো ঠিক ঠাহর করতে পারলো না সে।


ইহাব মানহাকে সাদা কালো মিশেলের একটা পার্সিয়ান বিড়াল এনে দিয়েছে। বাবার বাড়ি থেকে এসে মানহার প্রায়ই মন খারাপ থাকে। একা একা বোরিং লাগে তাই উর্মি ভুঁইয়া ইহাবকে বিড়ালের কথা বলেছেন। পোষা প্রাণী থাকলে মনটা যদি একটু ভালো হয়। মানহা বিড়াল দেখে লাফ দিয়ে ওঠেছিল। তার কাছে প্রাণী দূর থেকেই সুন্দর। ওদেরকে আদর করতে গেলে মানহার হার্ট অ্যাটাক হয়। প্রচণ্ড ভয় লাগে। ইহাব তো মানহার কাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিল আর বলছিল,

“যার সামান্য বিড়ালে এতো ভয় তার তো আমাকে ভয় হবে এটাই স্বাভাবিক। তোমাকে খেয়ে ফেলবে নাকি?”

মানহা চোখ মুখ লাল করে বলেছিল,

“এটাকে সরান। আমার ভয় লাগে পশুপাখিতে। যেকোনো সময় কামড় দিতে পারে। দূরে সরান।”

ইহাব পায়ের উপর পা তুলে সোফায় হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলেছিল,

“আমি কামড়ালেও ও কামড়াবে না। She’s such a gentle and loving cat (ও অনেক শান্ত ও আদুরে)। ওকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ফ্লাফি কাম হেয়ার।”

ফ্লাফি বিড়ালের নাম। ডাক শুনেই ফ্লাফি লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে মালিকের কাছে দৌঁড়ে এসেছিল। মানহা চেয়ে চেয়ে দেখছিল আর ভাবছিল অসভ্য লোকটা নাকি তাকে কামড়াবে? ছিঃ ছিঃ কিসব কথা!

আগের কথা ভাবতে ভাবতে মানহার ধ্যান ভঙ্গ হয়। লজ্জাও লাগছিল ইহাবের ওই কথা মনে করে। বিড়ালটা বেশিরভাগ সময় তার শাশুড়ির কাছেই থাকে। উর্মি ভুঁইয়া একটু একটু করে মানহার অ্যানিমেল ফোবিয়া দূর করছেন। মানহার আস্তে আস্তে বিড়ালের প্রতি ভয় কেটে যাচ্ছে। এখন বিড়াল দেখলেই লাফ দিয়ে ওঠে না। মাথায় আদর করে দেয়। কি যে কিউট বিড়ালটা! ফ্লাফির শরীর হাতালে অনেক আরাম লাগে। ওর ঘন সাদা মোলায়েম লোমগুলো সারাক্ষণ হাতাতে ইচ্ছে করে। সাধারনত পার্সিয়ান বিড়াল দ্রুত পোষ মানে না তবে ফ্লাফি খুব দ্রুতই পোষ মেনে গেছে। দারুন মিশুক ফ্লাফি। একটু আদর করলেই চুপচাপ আদর খেতে থাকে। ওর পুরো শরীরটাই সাদা শুধু পিঠের কাছটা কালো। ফ্লাফি সারাক্ষণ উর্মি ভুঁইয়ার কোলে আদুরে বাচ্চার মতো পড়ে থাকে আর মানহা চেয়ে চেয়ে দেখে।

উর্মি ভুঁইয়া আর মানহা বাড়ির লনে বসে আছে। সকালের মিষ্টি রোদ পোহাচ্ছে দুই শাশুড়ি বউ। মানহা খেয়াল করেছে উর্মি ভুঁইয়া তার সাথে মাত্রাতিরিক্ত মিশেন এবং তাকে খুবই স্নেহ করেন। সচরাচর কোনো শাশুড়ি তার ছেলের বউকে এতটা আদর ও যত্ন করেনা। তার জানা মতে শাশুড়িরা ছেলের বউকে তেমন পছন্দ করেনা কিন্তু উর্মি ভুঁইয়া যেন ব্যতিক্রম শাশুড়ি।

মানহা এটাও খেয়াল করেছে উর্মি ভুঁইয়া বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের তুলনায় তার সাথে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার কাছে কেন যেন এটা অস্বাভাবিক লাগে। এতো চমৎকার একজন নারী তার স্বামী, সন্তানের সাথে এমন নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে থাকেন কেন? তার শ্বশুর তো যথেষ্ট যত্নশীল মানুষ তবুও শাশুড়ির এরকম বীতরাগ আচরণের কারণ কি হতে পারে? তার কেন যেন উর্মি ভুঁইয়াকে রহস্যময়ী নারী মনে হয়। মনে হয় অনেক লুকায়িত কথা জমে আছে তার মনে কিন্তু হাসির আড়ালে তা চাপা দিয়ে রাখেন। মানহা আচমকা জিজ্ঞেস করলো,

“আচ্ছা আম্মু; আব্বু তো আপনার কাজিন হন। আপনাদের কি প্রেমের বিয়ে?”

উর্মি ভুঁইয়া ফ্লাফিকে আদর করতে করতে বললেন,

“কে বলেছে তোমার আব্বু আমার কাজিন হন?”

“সেদিন বললেন না আপনারা একই বংশের। কাজিন না হলে এক বংশের কেউ হয়?”

উর্মি ভুঁইয়া মুচকি হেঁসে বললেন,

“বোকা মেয়ে। ভুঁইয়া বংশ কি খালি একটাই নাকি? তোমার শ্বশুর শাহবাজপুর গ্রামের ভুঁইয়া বংশের আর আমি রাজনপুর গ্রামের ভুঁইয়া বংশের মেয়ে।”

মানহা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। এতদিন তো সে ভেবেছে তার শ্বশুর শাশুড়ি কাজিন বর কনে। এখন তো পুরাই উল্টে গেলো। এ কিভাবে সম্ভব? একই পদবীতে ভিন্ন অঞ্চলের মানুষের বিবাহ আদৌ সম্ভব? এগুলো তার কাছে একেবারেই অদ্ভুত এবং আলাদা ঘটনা। মানহা তার শ্বশুর শাশুড়ির কাহিনী শুনতে উদগ্রীব হয়ে পড়লো। সে খুবই কৌতুহল নিয়ে শাশুড়িকে জিজ্ঞেস বললো,

“ইন্টারেস্টিং। আপনাদের বিয়ে কিভাবে হলো আম্মু? জানতে পারি কি?”

উর্মি ভুঁইয়া ফ্লাফিকে ছেড়ে শাড়ির আঁচল ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর লনের সামনের গাছ গুলো ছুঁতে ছুঁতে বললেন,

“ওগো উর্মি মালা,
তরঙ্গের ন্যায় ঢেউ খেলো
আমার মনের উঠোনে।
তোমার প্রেমেতে পড়ে
ঝাঁপ দিয়েছি মন পুকুরে।”

তোমার স্মৃতিতে কাটে আমার
সকাল বিকেল রাত্রি,
তুমি কি আমার সাথে
থাকবে দিবারাত্রি?”

কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি বললেন,

“তোমার শ্বশুরের সাথে আমার প্রথম যেদিন দেখা হয় সেদিন এই কবিতা আবৃত্তি করে তিনি ভালোবাসা নিবেদন করেছিলেন। আমি পাত্তা দেইনি। ওরকম মাস্তান রাজনীতিবিদকে কেইবা পাত্তা দিবে? মেয়েরা এতে গললেও আমার এসব পুরুষের প্রতি কোনো আকর্ষণ কাজ করতো না। যদিও তাকে আমি সেদিন প্রথম দেখেছিলাম কিন্তু তিনি আমায় বহু আগেই দেখেছেন এটা বিয়ের পর জানতে পারি। সারা রাত জেগে নাকি সে এই কবিতাটা শুধু আমার জন্য লিখেছিলো। বিয়ের পর এই কবিতাটি আমার কবিতা সমগ্র ডাইরিতে টুকে রেখেছিলাম। সে জানে না। আমার মুখস্থ হয়ে গেছে এটা। আনাড়ি হাতে একেবারে খারাপ লেখেনি। রাজনীতি কোরে এইটুকু যে লিখেছে এটাই তো অনেক। তার হয়তবা মনেও নেই এই কবিতার কথা। বহু আগের কাহিনী। মাথায় ছন্দ এসেছে আর লিখে ফেলেছে। কাগজটাও হারিয়ে ফেলেছে সম্ভবত ভাগ্যিস আমি টুকে রেখেছিলাম।”

মানহা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শাশুড়ির কথা শুনছিল। উর্মি ভুঁইয়া থেমে যাওয়ায় শাশুড়ির দিকে চোখ পড়তেই লক্ষ্য করলো তার ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি। মানহার ঠোঁটেও হাসি। শাশুড়িকে স্মৃতি মন্থন করতে দেখে ভালো লাগছে তার। শ্বশুর শাশুড়ির কাহিনী শুনতে দারুন লাগছে। সে চাচ্ছিলো তার শাশুড়ি আরও কিছু বলুক কিন্তু উর্মি ভুঁইয়া আর কিছু বললেন না। পাইপ দিয়ে গাছ গুলোতে পানি দিতে লাগলেন।

_

চেয়ারের উপর চোখ, হাত পা পিছনে বাঁধা অবস্থায় রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে একজন। তার মাথা ও মুখ থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। তার সামনেই পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে কেউ একজন। তার মুখশ্রী কঠিন। লোকটির পিছনে অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। তার শিকারী নজর চেয়ারে বাঁধা ব্যক্তির উপর। ক্ষিপ্র গতিতে উঠে বাঁধা ব্যক্তিটির চুল মুঠ করে মুখ উপরে তুলে বললো,

“তুই আমার লোককে মেরেছিস? তোর এতো বড় কলিজা কিভাবে হয়? বহুত বার বেড়েছিস তাই না? আমার প্রত্যেকটা চাল ভেস্তে দিচ্ছিস তোকে টুকরো টুকরো করে কুত্তারে খাওয়াবো কু**বাচ্চা। আমার সঙ্গে পাঙ্গা?”

চেয়ারে বাঁধা ব্যাক্তিটি রক্তাক্ত ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে বললো,

“বেশ করেছি। তুই যেমন আমার চাল ভেস্তে দিয়েছিস আমিও দিয়েছি। হলো না সমান সমান?”

বলে আবার হো হো করে হাসলো। সামনের লোকটি ব্যক্তিটির হাসির শব্দে চোয়াল বরাবর ঘুষি বসিয়ে দিলো। ব্যক্তিটির হাসি তবুও থামলো না। লোকটি ফিসফিস করে বললো,

“বহু বছর আগে সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল মনে আছে নিশ্চয়ই? তোকে কিভাবে নাচাতে হয় সব আমার জানা আছে। তোর হেডম বার করবো। আমার খেয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তোকে পিস পিস করবো শু*** বাচ্চা। তোকে খুন করতে বলেছি আর তুই আমার লোককে খুন করলি? তোকে দেখে নেবো।”

“ওকে। আয়েম ওয়েটিং।”

আশপাশ থেকে গাড়ির আওয়াজে লোকটি তার দলবল নিয়ে ব্যক্তিটিকে শাসিয়ে চলে গেলো। মানুষের পায়ের আওয়াজে চেয়ারে বাঁধা ব্যাক্তিটি নড়ে চড়ে বসলো। একটু পরে কানে বাড়ি খেলো,

“কিলার জাদ।”


মধ্যরাতে মারওয়ান বাসায় এসেছে মাথায় ব্যান্ডেজ করে। মাহবুব আলম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

“মাথায় আঘাত পেলি কি করে?”

মারওয়ান ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জবাব দিলো,

“ওই হালকা অ্যাকসিডেন্ট করেছি।”

নাসির উদ্দিন বলেলন,

“হালকা অ্যাকসিডেন্ট করেছো মানে? রাত বাজে একটা। তুমি এই রাতের বেলা কোত্থেকে এলে এইরকম গুরুতর অ্যাকসিডেন্ট করে? এতো রাতে কোনো ভদ্র বাড়ির পুরুষ বাইরে থাকে? খুন খারাবি করতে নামো নাকি এই মধ্যরাতে?”

মারওয়ান গম্ভীর কণ্ঠে শুনলো কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর করলো না। নাসির উদ্দিন বললেন,

“ভাগ্যিস মেয়েটাকে নাতি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বলেছিলাম নাহলে এর এই দশা দেখে কান্নাকাটি শুরু করতো। মেয়েটাকে জ্বালিয়ে খেলো এই ছেলে। ভাত খেয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়। এতো রাত পর্যন্ত বাইরে থাকো কিজন্য? কোনো কাজ কাম করো না সারাদিন বাসায় থাকবে তা না টইটই করে বাইরে গিয়ে আকাম ঘটানো। কাজের কাজ কিছু নেই অকাজে এক্সপার্ট।”

বলে রুমে চলে গেলেন। মাহাবুব আলম ছেলের দিকে কড়া চাহুনি নিক্ষেপ করলেন। মারওয়ান বাবার নজরকে পাত্তা না দিয়ে বেসিনে মুখ ধুয়ে ভাত বেড়ে খেতে বসলো। উফ মাথায় ভালোই আঘাত পেয়েছে। ভাত চিবোতে কষ্ট হচ্ছে। নাসির উদ্দিন হনহন করে হেঁটে এসে বললেন,

“এই ছেলে এই নাপাটা খেয়ে ঘুমিও। কোথায় মাস্তানি করতে গিয়ে গণপিটুনি খেয়ে এসেছে কে জানে দোষ দেয় অ্যাকসিডেন্টের।”

বলে আবারও রুমে চলে গেলেন। মারওয়ান মুখ কুঁচকে শ্বশুর নামক আজব চিড়িয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। মাহাবুব আলম ছেলের ভাত খাওয়া পর্যন্ত পাশে বসে রইলেন সাথে টুকটাক আলাপও করলেন।

মারওয়ান রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো। মাথা ব্যথায় টনটন করছে। ধীরে ধীরে শার্ট পাল্টিয়ে বিরক্ত মুখে কনুইয়ে মলম লাগালো। নিঃশব্দে খাটে শুতে নিলে দেখলো নিশাত তার জায়গায় শুয়ে আছে। ছেলেকে দেয়ালের পাশে কোলবালিশ দিয়ে বর্ডার দিয়ে রেখেছে। মারওয়ান একটা নিঃশ্বাস ফেলে খুব সাবধানে নিশাতকে বিছানার মাঝ বরাবর এগিয়ে দিলো। নিশাত হালকা নড়ে উঠলো। মারওয়ান কোনো শব্দ না করে ছেলেকে চুমু খেয়ে নিশাতের পাশে শুয়ে পড়লো। ঘুম একটু গাঢ় হতেই বুকের উপর কারো ভার টের পেলো। ঘুমের মধ্যেও বুঝতে পারলো কে এটা।


নিশাত ভোরে ঘুম থেকে উঠেই দেখলো মারওয়ানের পাশটা ফাঁকা। লোকটা রাতে আসেনি বাসায়? বাবা, আব্বা বাসায় থাকতেও খামখেয়ালীপনা দেখাতে হবে তার? নিশাত চিন্তিত ভঙ্গিতে ওযু করে নামাজে দাঁড়ালো। নামাজ শেষে দোয়া, দুরুদ পাঠ করে কুরআন তিলাওয়াত করলো। কেমন যেন লাগছে তার। আল্লাহর কাছে অব্যক্ত কথাগুলো পেশ করে রান্নাঘরে গিয়ে দেখলো মারওয়ান চা খাচ্ছে। মাথায় ব্যান্ডেজ। নিশাত মারওয়ানের মাথায় ব্যান্ডেজ দেখে আতঙ্কিত গলায় এগিয়ে এসে বললো,

“আপনার মাথায় ব্যান্ডেজ কেন? কি হয়েছে?”

মারওয়ান চা খেতে খেতে বিরক্ত হলো। চোখ কঠিন করে বললো,

“এতো চিৎকার চেঁচামেচি করার কি হয়েছে? সামান্য আঘাত এমন ভাব করছো যেন মরে গেছি। মরলে দুই একদিন কেঁদে আরেকটা ভালো দেখে বিয়ে করে ফেলো। তোমার বাপ তো আছেই তক্কে তক্কে। কোনদিন আমি খালাশ হবো আর তিনি তোমাকে ভালো একটা ঘরে বিয়ে দিয়ে উদ্ধার করবেন।”

নিশাতের চোখ ছলছল করে উঠলো। এতোবড় একটা কথা বলতে এই লোকের আটকালো না? আঘাত পেয়ে এসেও তার সাথে মেজাজ দেখানো হচ্ছে? নিশাতের ভারী রাগ হলো। একটা কথাও বলবে না এই লোকের সাথে। কেউ তাকে পাত্তা না দিলে ন্যাকামি করার সময় নেই। ভেবেছিল কিভাবে আঘাত পেয়েছে জানবে এখন জানার কোনো ইচ্ছেই নেই। সে চুপচাপ গম্ভীর মুখে সকালের নাস্তা বানাতে লেগে গেলো। মারওয়ান একবার নিশাতকে দেখে চা শেষ করে কাপ রেখে বেরিয়ে গেলো। নিশাত চায়ের কাপ ধুয়ে রেখে দিলো। শ্বশুড় ও বাবার জন্য চায়ের পানি বসিয়ে দিলো। সকালে ওনাদের হালকা চা, বিস্কুট দিতে হয়।


জিনান তার স্টাডি রুমে বসে পেপার পড়ছে আর কফি খাচ্ছে। তার নীল চোখ দুটো প্রথম দেখাতেই সবার নজর কাড়ে। একধরণের ঠাণ্ডা নিরপেক্ষতা বিরাজ করে সেখানে যা তাকে আরও রহস্যময় করে তোলে। সংবাদপত্র ঘেঁটে দেশের নিত্যদিনের হালচাল দেখে রেখে দিলো সে। ফোন ঘেঁটে কারো নম্বরে ডায়াল করলো। ওপাশ থেকে কল ওঠালে বললো,

“আদহাম স্পিকিং, আপনি আজকে ইন্টিলিজেন্স ইউনিটে থাকবেন মিস্টার মুনতাজির?”

“নো। আয়েম সিক। গতকাল আমি ছিলাম বাট আপনি ছিলেন না ব্যাড লাক।”

“Okay, No problem. I am eagerly waiting for you. Take care of your health.”

“থ্যাংকস মিস্টার আদহাম।”

চলবে….

(আসসালামু আলাইকুম।)

ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৩২

তাজরীন ফাতিহা

রাত দেড়টা। বেশ পুরোনো দ্বিতল বাড়ির সামনে একটি জিপগাড়ি দাঁড়ানো। বাড়িটির ভিতরে জঙ্গলে আবৃত। কেউ থাকে না বিধায় পুরো বাড়িটা ভৌতিক আবহ তৈরি করে আছে। অন্ধকারে বিলীন বাড়িটি। ঢুকতে গেলেই ভ্যাপসা ম্যাড়ম্যাড়ে একটা অদ্ভুত তীব্র গন্ধ নাসারন্ধ্রে বারি খায়। পুরোনো স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল জুড়ে রক্তের দাগ শুকিয়ে আছে। জিনান আদহাম খুবই সূক্ষ্ম নজরে দেয়ালটি পর্যবেক্ষণ করলো। হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক, চোখে নাইট ভিশন গগলস। গ্লাভস পড়া হাতে UV টর্চ জ্বালিয়ে শুকনো রক্তের পরিমাপ করে ফেললো। তার অভিজ্ঞ চোখজোড়া পুরো রুমকে স্ক্যান করে ফেললো মুহূর্তের মধ্যে। পোর্টেবল ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানারের সাহায্যে আসবাবপত্র, জালালা সবকিছু দক্ষ হাতে স্ক্যান করে গভীর ভাবনায় মগ্ন হয়ে গেলো সে।

জিনান রুম থেকে বেরিয়ে দেখলো মুনতাজির জায়েদ একটা কাঠের দরজা পোর্টেবল স্ক্যানার দিয়ে স্ক্যান করছে। জিনান তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে শুধালো,

“Did you find anything, Mr. Muntazir?”

মুনতাজির গম্ভীর মুখে বললো,

“ইয়েস। এবার মনে হয় অপরাধী খুব সহজেই ধরা পড়ে যাবে।”

জিনান নিজের লং কোটে হাত ঢুকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বললো,

“খুনি খুবই বোকামো করেছে বুঝলেন? খুনের চিহ্ন মুছতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”

মুনতাজির রহস্যময় ভঙ্গিতে হেঁসে বললো,

“উহু তার আস্তানাই এটা। তাই ভেবেছে নিজের আস্তানা সাফ করে কি হবে? প্রতিদিনই তো এখানে তার পদধূলি পড়ে। আমরা যে তার এই গোপনীয় আস্তানা পেয়ে যাবো বেচারা বোঝে নি। খুবই দুঃখজনক।”

জিনান কৌতুকপূর্ণ কথায় হালকা ঠোঁট বাঁকালো। নেওয়াজ পিছন থেকে বললো,

“খুনিকে এবার শীগ্রই আমাদের ডেরায় নেয়ার পালা কি বলেন মিস্টার জিনান অ্যান্ড মুনতাজির?”

জিনান আদহাম ও মুনতাজির জায়েদ একই সাথে উত্তর দিলো,

“ইয়েস মিস্টার নেওয়াজ।”

উভয়ই একসাথে বলায় তিনজন গম্ভীরভাবে হেঁসে উঠলো। আলো আঁধারির ওই বাড়িটি যেন তাদের হাসিতে ভৌতিক রহস্যময়তা ছড়িয়ে দিলো।

_

বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। রাত আটটার একটু কম বেশি হবে। নিশাত দ্রুত হাতে খিচুড়ি আর গরুর গোশত রান্না করছে। স্কুল থেকে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। রান্না করা হয়নি। সকালে রান্না করে গিয়েছিল সেটাই দুপুরে খেয়েছে বাবা ও শ্বশুর। মারওয়ান ঘরে নেই। এই বৃষ্টির মধ্যে লোকটা কোথায় গিয়েছে কে জানে? ইদানিং লোকটা কেমন রহস্যময় আচরণ করে। কোনো কথাই তেমন বলে না। বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকে যদিও আগেও থাকতো তবে ইদানিং একটু বেশিই বাইরে বাইরে থাকছে। এক সপ্তাহ আগে অ্যাকসিডেন্ট করে এক দণ্ড ঘরে থাকেনি। একদিন কোনরকম একটু রেস্ট নিয়ে টো টো করতে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। কি যে এতো বাইরে কে জানে? এসব ভাবতে ভাবতে গরুর গোশত কষাতে মনোযোগ দিলো। মাহাবুব আলম রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন নিশাত তাড়াহুড়ো করে রান্না করছে। তিনি এগিয়ে এসে বললেন,

“কি রাধছো মা? দারুন সুঘ্রাণ বেরিয়েছে তো।”

“এইতো আব্বা খিচুড়ি করছিলাম। বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খেতে পছন্দ করে আপনার ছেলে আর নাতি।”

নিশাতের কথা শুনে মাহবুব আলম নিশাতের পাশে দাঁড়িয়ে গোশত কষানো দেখতে লাগলেন। তার খিচুড়ির সাথে ভীষণ ইলিশ মাছ খেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু নিশাতের কষ্ট হবে ভেবে কিছু বললেন না তিনি। গোশত কষাতে কষাতে নিশাত খেয়াল করলো মাহাবুব আলম উশখুশ করছেন। গোশত কষানো হলে গোশতে পানি দিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখে মাহাবুব আলমের দিকে চেয়ে বললো,

“কিছু বলবেন আব্বা?”

মাহাবুব আলম ইতস্তত করতে করতে বললেন,

“না কিছু না। ওই আগামীকাল বাড়ি চলে যাবো তো নাতিটার জন্য মন পুড়বে। এতো মায়া লাগায় বাচ্চাটা। ভুলতে পারিনা।”

নিশাতের নিজেরও ভীষণ খারাপ লাগছে। আগামীকাল বাবা, শ্বশুড় কেউ থাকবে না। চলে যাবে ভাবতেই বুকটা কেমন কামড়ে ধরছে। নিশাত কত অনুরোধ করলো কিন্তু তাদের কাজ রয়েছে তাই চাইলেও থাকা সম্ভব নয়। নিশাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

“আপনি রুমে যান আব্বা। আমি ঝটপট রেঁধে আপনাদের খেতে দিচ্ছি। এখনই হয়ে যাবে।”

বলেই আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লো রান্নায়। মাহাবুব আলম তা দেখে বললেন,

“এতো তাড়াহুড়ো কেন মা? খেতে তো দেরি আছে। একটু আগে সন্ধ্যার নাস্তা করলাম। পেট ভরা। ধীরে ধীরে রান্না করো অতো তাড়াহুড়োর কিছু নেই।”

বলেই তিনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিশাত আবারও রান্নায় মনোযোগ দিলো।


কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরলো মারওয়ান। জামাকাপড় ভিজে জবজবে হয়ে আছে। বাসায় ঢুকেই গোসল করতে চলে গেছে। খানিক পরে নিশাত পাটিতে খিচুড়ি, গরু ভুনা, সালাদ, লেবু এনে রাখলো। নাসির উদ্দিন, মাহাবুব আলমকে ডেকে এনে প্লেটে খিচুড়ি বেড়ে দিচ্ছে। নাসির উদ্দিন তা দেখে বললেন,

“টো টো কোম্পানির ম্যানেজারটা কই? দেখলাম ভিজে টিজে এলো। তা ভবঘুরের চাকরি কেমন চলছে তার? তাকে তো দেখাই যায়না বহুত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিনা।”

নিশাত কিছু বললো না। বাবা, শ্বশুরের পাতে সালাদ, লেবুর টুকরো উঠিয়ে দিলো সে। মাহাবুব আলম বললেন,

“নাতি কই রে মা? খাবে না?”

“ও ঘুমাচ্ছে আব্বা। ওর বাবার সাথে খাবে।”

মাহাবুব আলম একটু মন খারাপ করেই বললেন,

“ওহ্ ঘুমাচ্ছে! নাতিটাকে আবার কবে না কবে পাবো।”

বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিশাত উঠে রান্নাঘর থেকে একটা প্লেট এনে মাহবুব আলমের সামনে রাখলো। মাহাবুব আলম প্লেটে তাকিয়ে দেখলেন ইলিশ মাছ ভাজা। পাশে বড় বড় ইলিশ মাছের ডিম ও ভাজা শুকনো মরিচ। তার চোখ চকচক করে উঠলো। তিনি চট নিশাতের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললেন,

“ইলিশ মাছ!!”

নিশাত একটু হেঁসে বললো,

“আপনার ছেলে নিয়ে এলো। ভাবলাম টাটকা টাটকা ভেজে দেই খিচুড়ির সাথে দারুন জমবে। আপনি, আপনার ছেলে, নাতি সবার তো আবার ইলিশ মাছ পছন্দের তাই গরম গরম ভেজে আনলাম। নিন বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করুন।”

বলেই একটুকরো ইলিশ মাছ ও মাছের ডিম শ্বশুরের পাতে তুলে দিলো নিশাত। নাসির উদ্দিন গালে হাত ঠেকিয়ে বললেন,

“হ্যাঁ হ্যাঁ সব মাহাবুব আর মাহাবুবের আওলাদের জন্য। আমি তো দুধ ভাত।”

মাহাবুব আলম হেঁসে নিজের পাত থেকে অর্ধেক ডিম ভেঙে বললেন,

“তুই দুধ ভাত হতে যাবি কেন? যে অমন আস্ত রত্নের জনক সে কি কোনদিন দুধ ভাত হয়?”

বলেই দুই বন্ধু নামক বেয়াই হেঁসে দিলেন একযোগে। নিশাতও হেঁসে নাসির উদ্দিনের পাতে মাছ, ডিম তুলে দিলো। দুই বন্ধু গল্প করতে করতে বেশ আরাম করে তৃপ্তি নিয়ে খেতে লাগলো। নিশাত তাদের তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখে নিজেও তৃপ্তি পেলো।


নিজেদের রুমে খাবারের প্লেট নিয়ে ঢুকলো নিশাত। দেখলো দুই বাপ, ছেলে ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমাচ্ছে। মারওয়ানের মাথায় ব্যান্ডেজ এখনো বিদ্যমান। রক্তে ভিজে আছে ব্যান্ডেজ। এই অসুস্থ শরীর নিয়েও প্রতিদিন বাইরে যেতে হবে কেন তার? কাজ করিস না ঘরে থাকবি তা না বাইরে বাইরে গিয়ে শরীর খারাপ করে আসিস। কি ক্লান্ত দেখাচ্ছে মুখশ্রী! ক্লান্তিতে কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে লোকটা। ভারী মায়া লাগলো তার।

প্লেটটা টেবিলে রেখে মারওয়ানের মাথার কাছে বসলো নিশাত। ব্যান্ডেজের উপরে হালকা করে হাত ছুঁয়ে দিলো। জেগে থাকলে তাকে ছুঁতেও দেয়না। এমন খিটখিট শুরু করে যেন সে ছুঁয়ে দিলে ব্যথা আরও বেড়ে যাবে। ইশ কতটা গভীর ক্ষত হয়েছে! কিভাবে যে অ্যাকসিডেন্ট করলো এখনো ক্ষত শুকায়নি। ওষুধ নিয়মিত খাচ্ছে তবুও ক্ষত তেমন একটা সারে নি। এতো গভীর ব্যথা নিয়েও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে হলে তো একমাসেও বিছানা থেকে উঠতে পারতো না। এসব ভেবে কিছুক্ষণ ওই রুক্ষ চেহারার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে ডাকতে লাগলো,

“শুনছেন? খাবেন না? উঠুন দ্রুত।”

মারওয়ান ঘুমের মধ্যে বিরক্ত হয়ে অন্যপাশে ঘুরতে নিলে নিশাত তাকে বাঁধা দিয়ে বললো,

“উঠুন, উঠুন। খিচুড়ি রান্না করেছি। গরম গরম খেয়ে নিন নাহলে মজা লাগবে না। আপনার হাতে খাবে বলে নাহওয়ানও খায়নি।”

ছেলে খায়নি শুনে মারওয়ান বিরক্ত হয়ে চোখ খুললো। মাথা ভার হয়ে আছে। উঠতে গেলে নিশাত সাহায্য করতে চাইলে মারওয়ান তাকে সরিয়ে দিলো। নিজেই উঠলো। ক্ষততে টান লেগে মাথা ব্যথায় খিঁচে উঠলো। ব্যথায় মারওয়ানের মুখ কুঁচকে গেলো তবুও ব্যথা সূচক একটা শব্দও করলো না সে। চুপচাপ বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে বের হলো। এর মধ্যে নিশাত ছেলেকে উঠিয়ে ফেলেছে। বাচ্চাটা মায়ের কোলে বসে ঘুম ঘুম চোখে বাবার দিকে চেয়ে ডাকলো,

“বাবা।”

মারওয়ান ডাক শুনে ছেলের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। নাহওয়ান ভেবেছে বাবা এসে তাকে কোলে নিবে কিন্তু তা না হওয়ায় মায়ের দিকে চাইলো। নিশাত ছেলের চাহনি দেখে বললো,

“বাবার অসুখ আব্বা। ভালো হয়ে গেলে আপনাকে কোলে নিবে কেমন?”

“উসুক?”

“জ্বি, অসুখ।”

গত সাতদিন ধরে নাহওয়ান প্রায়ই এই কথাটা শুনছে যে বাবার অসুখ। বাবা আগের মতো দুষ্টুমি করে না, মজা করে না তার সাথে। অসুখ মানেই এখন তার কাছে অনেক বড় কিছু। অসুখ হলে বাবা কথা বলে না। নাহওয়ানের এটা মোটেও ভালো লাগে না। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ছলছল নয়নে বললো,

“উসুক পুচা। বাবা কতা বলে না। উসুককে চলি যেতে বলো?”

নিশাত ছেলেকে ঝাপটে ধরে বাথরুমে নিয়ে এসে বললো,

“অসুখ সময় হলে চলে যাবে। বাবা তখন অনেক কথা বলবে, আদর করবে কেমন?”

নাহওয়ান মায়ের কথা শুনে মাথা নাড়লো। নিশাত ছেলের মুখ ধুয়ে দিয়ে বাথরুম থেকে বের হলো। মারওয়ান খাটের সাথে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। নিশাতের কথার আওয়াজে চোখ খুললো। নিশাত ছেলেকে বিছানায় দাড় করিয়ে একটা গামছা মারওয়ানের সামনে বিছিয়ে দিলো। টেবিল থেকে প্লেট এনে মারওয়ানকে দিলো। প্লেট হাতে তুলে মারওয়ান নাহওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,

“এদিকে আয় কবুতরের ছাও।”

নিশাত তা শুনে বললো,

“ওকে আমি খাইয়ে দেবো নে। আপনি খান।”

মারওয়ান সেই কথার তোয়াক্কা না করে নাহওয়ানকে আবারও ডাকলো,

“ওই পান্ডা ডাকলাম না?”

নাহওয়ান বাবার ডাক শুনে লাফাতে লাফাতে মারওয়ানের কাছে এলো। মারওয়ান ছেলেকে নিজের ভাজকৃত পায়ের উপর বসিয়ে খিচুড়ি খাওয়াতে লাগলো। ইলিশ মাছের ডিম মুখে দিলে নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে বললো,

“মুজা মুজা।”

বাবা ছেলের কাণ্ড দেখতে দেখতে নিশাত গ্লাসে পানি ঢেলে দিলো। সেও বাপ, বেটার পাশে বসে চারটে খেয়ে নিলো। খাওয়া শেষে মারওয়ানকে বললো,

“ওষুধ দিবো?”

মারওয়ান বিরক্ত হয়ে বললো,

“ওসব বড় বড় টেবলেট খেতে ভালো লাগে না।”

নিশাত ওষুধ এনে বললো,

“অসুখ যখন বাঁধিয়েছেন ভালো না লাগলেও খেতে হবে।”

বলেই মারওয়ানের হাতে টেবলেট গুলো দিলো। নাহওয়ান পাশে বসে বাবার হাতে এতো বড় বড় ওষুধ দেখে বললো,

“ইগুলো কি?”

মারওয়ান পা নাড়িয়ে বললো,

“টেবলেট।”

নাহওয়ান ঘাড় কাত করে বললো,

“টেলবেল কি?”

“ওষুধ। অসুখ হলে খায়।”

ওষুধ নাহওয়ানেরও অপছন্দ। অসুখ হলে মা যখন তাকে ওষুধ খাওয়ায় তখন তার ভালো লাগে না। তাই সে ফুলো ফুলো গাল আরও ফুলিয়ে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললো,

“টেলবেল ইট্টুও মুজা না।”

মারওয়ান ছেলের কথা শুনে বললো,

“ঠিক বলেছিস। পুরাই ফালতু।”

নাহওয়ান হাত নাড়িয়ে বললো,

“পুলাই পালতু।”

কথাটা শুনে মারওয়ান ছেলের নাক টিপে দিয়ে টেবলেট গুলো গলধঃকরণ করলো। তারপর বালিশে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজলো। নিশাত ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো। মাঝ রাতে তীব্র উত্তাপে নিশাতের ঘুম ছুটে গেলো। ঘুম ভাঙতেই খেয়াল করলো মারওয়ান তাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরা। নিশাত একটু অবাকই হলো। সচরাচর ঘুমের মধ্যে জড়িয়ে ধরে না মারওয়ান। মারওয়ানের মুখ তার গলার কাছে। মনে হচ্ছে গলাটা পুড়ে যাচ্ছে। নিশাত ঘুরে মারওয়ানের কপালে হাত দিলো। গরমে পুড়ে যাচ্ছে শরীর। মৃদু কাঁপছে দেহটা। শীত করছে দেখে ঘুমের মধ্যে তাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে।

নিশাত নিজেকে ছাড়িয়ে কম্বল এনে মারওয়ানের গায়ে দিলো। থার্মোমিটার দিয়ে মেপে দেখলো জ্বর একশো চার ডিগ্রি। বেশ চিন্তিত হলো নিশাত। মাথায় ব্যান্ডেজ থাকায় জলপট্টি দিতে পারলো না সে। নাপা এনে মারওয়ানকে একটু জাগিয়ে ওষুধটা খাইয়ে দিলো। বিছনায় শুয়েও সারারাত আর ঘুম এলো না নিশাতের। এতো জ্বর নিয়েও কোনরকম টু শব্দ ছাড়া কিভাবে একটা মানুষ থাকতে পারে। এ কি মানুষ নাকি রোবট! কোনো অনুভূতিই নেই এই লোকের। সারারাত না ঘুমিয়ে একটু পর পর কপালে হাত দিয়ে দেখলো জ্বর কমেছে কিনা। চোখে ঘুম থাকলেও জ্বরে পড়ে থাকা অসুস্থ লোকটার জন্য পুরো রাত চোখের পাতা এক করতে পারলো না সে। ভোরের দিকে জ্বর হালকা কমে ঘাম ছেড়ে দিলে নিশাত একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

__

সকাল থেকেই ইহাবের মেজাজ আজকে চড়া। সাধারণত ইহাব রাগে না কিন্তু রেগে গেলে মেজাজ হারিয়ে ফেলে। সকাল সকাল কি নিয়ে যেন তুমুল কথা কাটাকাটি হয়েছে ফোনে। মানহা ইহাবকে এই প্রথম এতো রাগতে দেখেছে। তার কাছে ভয়ংকর লাগছে লোকটাকে। যে বর্তমানে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে ফোন কানে নিয়ে সমানে চিল্লিয়ে যাচ্ছে। উর্মি ভুঁইয়া দুজনের নাস্তা তার হাতে ধরিয়ে উপরেই খেতে বলেছেন। তাই নাস্তা হাতে বর্তমানে রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে।

এদিকে ইহাব ফোন কেটে ঢিল দিয়ে বিছানায় ছুড়ে মারলো। রাগে শরীর জ্বলছে তার। একটা কাজও ঠিক করে করতে পারেনা। যা করতে বলে সব ঘেঁটে মুড়িঘণ্ট বানিয়ে ফেলে। মানহাকে দরজার সামনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“কি সমস্যা? এরকম খাম্বার মতো প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

মানহা একটু ঢোক গিলে সাহস সঞ্চয় করে বললো,

“নাস্তা এনেছিলাম।”

“তো টেবিলে রাখো। এরকম দরজার সামনে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকার মানে কি?”

মানহার কেন যেন কথাটায় খারাপ লাগলো। শরীর ঘেমে উঠছে। কাঁপা কাঁপা হাতে চুপচাপ টেবিলে নাস্তা রাখতে গিয়ে কাঁচের প্লেটটা হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেলো। প্লেট ভাঙার শব্দে ইহাব ঘুরে সেদিকে চাইলো। এমনিতেই মেজাজ কন্ট্রোল করতে পারছিল না তার উপর মানহার কাঁপাকাঁপি। মেজাজ হারিয়ে বললো,

“সবকিছুতে তোমার কাঁপতে হবে কেন? তোমাকে এখন ধরেছি না ছুঁয়েছি? বিয়ে করে মানুষ বউ আনে আর আমি রোগী এনেছি। কিছু হলেই কাঁপাকাঁপি। পুরাই ননসেস কার্যক্রম। This is absolutely ridiculous, get a grip! (এটা একেবারেই হাস্যকর, নিজেকে সামলাও!).”

বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। এদিকে মানহা ইহাবের শেষের ইংরেজি না বুঝলেও এতটুকু ভালোই বুঝেছে ইহাব তার প্যানিক অ্যাটাকে বেশ বিরক্ত। বিয়ের একমাস পেরুতে পারলো না এখনই এই ব্যবহার! সে নিজেকে শক্ত করতে চাইলো কিন্তু কেন যেন শরীরটা তার সাথে বেইমানি করছে। কাঁপা কাঁপা হাতে ভাঙা প্লেটটা ওঠাতে গেলে হাতে ভাঙা অংশ বিদ্ধ হয়ে গলগল করে রক্ত বের হতে লাগলো তবুও টুকরো টুকরো অংশ ওঠানো থামালো না সে।

ইহাব নিচে গিয়ে রুম পরিষ্কারের জন্য মেইড ডেকে এনেছে। কিন্তু রুমে ঢুকে এই দৃশ্য দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। সাথে রাগে শরীর ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। মেইড গিয়ে দ্রুত ভাঙা প্লেট উঠিয়ে পরিষ্কার করে চলে গেলো। মানহা আস্তে আস্তে উঠে বেরিয়ে যেতে নিলে ইহাব রাগে দেয়ালে ঘুষি বসিয়ে দিলো। এমনিতেই রাগ কন্ট্রোল করতে পারছে না তার উপর মানহার ত্যাড়ামি। সব মিলিয়ে নিজেকে কন্ট্রোল করা একেবারেই দায় হয়ে পড়েছে। মানহা সেদিকে কঠিন চোখে চেয়ে বেরিয়ে যেতে নিলে ইহাব শক্ত করে তার বাহু চেপে ধরে খাটে বসিয়ে হাতে ব্যান্ডেজ করে দিতে নিলে মানহা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,

“কোনো রোগীর সেবা আপনাকে করতে হবে না। আমি নিজেরটা নিজে করতে পারি। আমার রোগ নিয়ে কারো যদি সমস্যা হয় ডিরেক্ট বাবার বাড়ি রেখে আসবেন। এই বিয়ে আপনি করেছেন আমি আপনাকে জোর করিনি আমায় বিয়ে করতে।”

ইহাব মানহার কথা শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া জানালো না। চুপচাপ ব্যান্ডেজ করে রেডি হয়ে কাজে চলে গেলো। মানহা নিজের ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে চেয়ে রইলো। কোত্থেকে ফ্লাফি এসে তার পায়ের কাছে মাথা ঘষতে লাগলো। মানহা অন্য হাত দিয়ে তার মাথায় আদর করে দিয়ে বললো,

“মানুষের চেয়ে তোরা বেশি ভালো বুঝলি? সারাজীবন একসাথে থাকার পর মানুষের কাছে হওয়া লাগে বিরক্তকর আর তোদের কাছে আস্থাভাজন।”

ফ্লাফি কি বুঝলো কে জানে মানহার হাত অনবরত চাটতে চাটতে মিউ মিউ শব্দ করতে লাগলো।

__

জিনান মনোযোগ দিয়ে ফ্রিঙ্গারপ্রিন্ট দেখছে। সুইয়াব কিটের সাহায্যে DNA সংগ্রহ করেছে। খুনিদের তালিকার একজনের সাথে পুরোই ম্যাচ করছে এগুলো। নেওয়াজ ও মুনতাজির গম্ভীর মুখে কম্পিউটারের স্ক্রীনে চেয়ে আছে। খুনির ডিটেইলস স্ক্রীনে জ্বলজ্বল করছে। তারা একে অপরের দিকে সরু চোখে চাইলো। খুনির পরিবারে সদস্য মোটে দুইজন। কিন্তু দুইজন কারা কারা এই তথ্য এখনো জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।

নামের জায়গায় স্পষ্ট লেখা কিলার আজাদ। যাকে সংক্ষেপে কিলার জাদ নামে চেনে সকলে। একটা ত্রাসের নাম এই কিলার জাদ। গত পাঁচ বছরে ঢাকায় অসংখ্য খুন, অপহরণ, গুম করেছে এই ঠান্ডা মাথার খুনি। তার মুভমেন্ট দেখলে বোঝার উপায় নেই যে সে খুনি। পাক্কা খিলাড়ি সে। যাকে সাইকো বললেও কম হবে। অপরাধী, নিরপরাধী কাউকে খুন করতে বাদ রাখেনি এই কিলার জাদ। টাকার জন্য নয় খুন করা তার একধরণের নেশা। জিনান আদহাম স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে ক্রুর হেঁসে বললো,

“আপনার খেলা শেষ মিস্টার সাইকো কিলার। শীগ্রই আমাদের মোলাকাত হবে, অপেক্ষায় থাকুন।”

চলবে….

(আসসালামু আলাইকুম। ব্যস্ততায় দেরি হয়ে গেলো দিতে। দুঃখিত❤️)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply