Golpo romantic golpo ভবঘুরে সমরাঙ্গন

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৪+২৫


ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_২৪

তাজরীন ফাতিহা

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া চিন্তিত ভঙ্গিতে ঘরময় পায়চারি করছেন। তার চোখ মুখ গম্ভীর। দু’হাত পিছনে মুড়ে পুরো ঘর হেঁটে বেড়াচ্ছেন। উর্মি ভুঁইয়া অসুস্থ বিধায় আজ বেলা করে শুয়ে ছিলেন। চোখ মেলে ইমতিয়াজ ভুঁইয়াকে অনবরত পায়চারি করতে দেখে কিছুটা আশ্চর্য হলেন। তিনি আস্তে আস্তে শোয়া থেকে উঠে বসে বললেন,

“কি হয়েছে?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার চলন্ত পা থেমে গেলো। তিনি তড়িঘড়ি করে হেঁটে স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,

“আরে উঠছো কেন? শুয়ে থাকো। তোমার জ্বর এখনো কমেনি। ডাক্তার কল করেছি। একটু পরই এসে যাবেন।”

উর্মি ভুঁইয়া শান্ত চোখে চেয়ে বললেন,

“প্রয়োজন নেই। এখন ভালো লাগছে। অযথা কোনো ডাক্তার ডাকবেন না। এখন ডাক্তারের সামনে বসে থাকতেও বিরক্ত লাগবে। তাই আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। আপনি এরকম অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন কেন?”

“এমনিতেই।”

উর্মি ভুঁইয়া আর কিছু বললেন না। ধীরে ধীরে খাট থেকে নামতে লাগলেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেলেন। উর্মি ভুঁইয়া কয়েকবার ‘প্রয়োজন নেই’ বলেছিলেন কিন্তু ইমতিয়াজ ভুঁইয়া শুনলে তো।


ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীকে ধরে ধরে সিঁড়ি বেয়ে নামাচ্ছেন। মানহা টেবিলে সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখছিল। শ্বশুর শাশুড়িকে সিঁড়ি ভেঙে নামতে দেখে এগিয়ে গেলো। মানহা উর্মি ভুঁইয়াকে ওপর পাশে ধরে বললেন,

“আব্বু বললেন আপনি অসুস্থ। এই অবস্থায় নামতে গেলেন কেন? “

উর্মি ভুঁইয়া কিছু বললেন না। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“তোমার ধরতে হবে না। আমি আছি সামলাতে। তুমি তোমার কাজ করো। যাও।”

মানহা মন খারাপ হলো ভীষণ। এই বাড়িতে আসার পরে বুঝেছে তার শ্বশুর তাকে পছন্দ করেনা। দেখলেই দূর দূর করেন। মানহা মুখ নামিয়ে চলে গেলো। উর্মি ভুঁইয়া সবই লক্ষ্য করলেন। বিষয়টা তিনি পছন্দ করলেন না। ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার ধরা হাতটা ছাড়িয়ে নিজেই হাঁটতে লাগলেন আস্তে আস্তে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া বোকা বনে গেলেন। স্ত্রীর পিছন পিছন যেতে যেতে বললেন,

“কি সমস্যা? হাত ছাড়ালে কেন? সবকিছুতে তোমার জেদ দেখানো লাগে কেন উর্মি?”

উর্মি ভুঁইয়া পিছনে না ফিরেই বললেন,

“আমার ইচ্ছে।”

“সবসময় তোমার ইচ্ছা হলে তো হবে না।”

উর্মি ভুঁইয়া সোফায় বসতে বসতে বললেন,

“নিজের ব্যবহারের দিকে আগে তাকান। আপনার মেয়ের বয়সী পুত্রবধূর সাথে আপনার বিহেভিয়র এমন কেন? ভুলে যাবেন না আপনারাই তাকে পছন্দ করে এই বাড়িতে এনেছেন তাই অন্য বাড়ির মেয়ের অসম্মান হয় এমন কিছু করবেন না আশা করি।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীর পাশে বসতে বসতে বললেন,

“শোনো আমরা সবাই যদি তুলুতুলু করি তাহলে বিগড়ে যাবে। তাই একজনকে কঠোর হওয়া লাগে। যেহেতু প্রায় বাড়িতে শাশুড়ি, ননদ, ননাসরা ভিলেন হয় আর শ্বশুর ভালো হয় সেহেতু এবারের চিত্রটা একটু ভিন্ন হোক। তুমি কিংবা ইনাবা তো ওরকম ভিলেনগিরি করতে পারবে না তাই আমিই নাহয় সেই দায়িত্বটুকু নিলাম।”

কথাটুকু শুনে উর্মি ভুঁইয়া বেশ বিরক্ত হয়েছেন তা তার চেহারা দেখেই আন্দাজ করতে পারছেন ইমতিয়াজ ভুঁইয়া। উর্মি ভুঁইয়া কিছু না বলে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া আরও কিছুক্ষণ স্ত্রীর পাশে থাকতে চেয়েছিলেন কিন্তু জরুরি ফোনকল আসায় বেরিয়ে যেতে হলো তাকে। এদিকে শ্বশুরকে বেরিয়ে যেতে দেখে মানহা রান্নাঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে শাশুড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বললো,

“আম্মু নাস্তা এখানে দিবো নাকি টেবিলে?”

উর্মি ভুঁইয়া চোখ খুলে চোখের সামনে দাঁড়ানো মায়াবী মুখাবয়বের ওড়না পেঁচানো মুখটার দিকে চাইলেন। মেয়েটার চেহারায় একটা নূর আছে। দেখলেই খালি তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। উর্মি ভুঁইয়ার সাথে অতটা সখ্যতা হয়নি তবুও আম্মু বলে যখন ডাকে তখন মনটা জুড়িয়ে যায়। তার ইহাব, ইনাবাও তাকে আম্মু ডাকে কিন্তু এই মেয়েটার মুখে আম্মু ডাকটা কেমন যেন মায়ায় মেশানো। মানহার ডাকে বাস্তবে ফিরলেন তিনি। বললেন,

“টেবিলেই দাও। আমি আসছি।”

মানহা ‘জ্বি আচ্ছা’ বলে চলে গেলো। উর্মি ভুঁইয়া কিছুক্ষণ বসে থেকে টেবিলে গিয়ে বসলেন। মানহা ইতোমধ্যে সবকিছু রেডি করে ফেলেছে। উর্মি ভুঁইয়া বসতে বসতে বললেন,

“তুমি খেয়েছো?”

“জ্বি আম্মু।”

“ইহাব কোথায়?”

“উনি খুব সকালে নাস্তা করে বেরিয়ে গেছেন।”

উর্মি ভুঁইয়া ‘ও আচ্ছা’ বলে খাবার খাওয়ায় মনোযোগী হলেন। খাওয়া শেষ করে উঠতে নিলে মানহা বাঁধা দিয়ে বললো,

“আম্মু ওষুধটা খেয়ে যান।”

উর্মি ভুঁইয়া দেখলেন পুত্রবধূ ওষুধ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আবার বসে ওষুধগুলো গলধঃকরণ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে বাইরের লনে গিয়ে বসলেন। এখানে বসলে তার শরীর, মন দুটোই ভালো হয়ে যায়। আজকেও ভালো লাগছে। আশপাশের প্রকৃতি যেন তাকে ডাকে তার সাথে মিশে যাওয়ার জন্যে। তিনি নাক টেনে প্রকৃতির সোঁদা গন্ধ নিলেন। আজকের আকাশটা মেঘলা মেঘলা। বৃষ্টি হলে দারুন হবে। তিনি ভিজবেন আজ। এই বৃষ্টির পানি তার সমস্ত রোগ, মন খারাপ শুষে নিক। তার ইচ্ছেকে বাস্তবায়ন করতে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। ইশ কি আরাম লাগছে! গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে এক ধরনের মনমাতানো তরঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে। বাতাসে গাছের পাতাগুলো হেলতে দুলতে তাদের আনন্দ জানান দিচ্ছে। দূরে হালকা বজ্রধ্বনি শোনা গেলো।

উর্মি ভুঁইয়া দাঁড়িয়ে দু’হাত দুপাশে ছড়িয়ে গগণমুখী হয়ে দাঁড়ালেন। বৃষ্টির ফোঁটাফোঁটা তার মুখে পড়ছে। তার ভীষণ স্বস্তি লাগছে। জুতো খুলে ভেজা ঘাসের উপর হেঁটে হেঁটে গাছগুলোকে ছুঁয়ে দিতে লাগলেন তিনি। মুখে মুখে আওড়াতে লাগলেন,

“আজি বসুন্ধরা সাজিয়াছে বর্ষণে,
ধরিত্রী থমকিয়াছে তীব্র গর্জনে।
বারিধারা বাহিত হয় মৃত্তিকায়,
আনন্দ বহিছে মন পিঞ্জিরায়।

পুষ্প ছড়িয়াছে সুবাস,
ধরণির ঘ্রাণ চিত্ত করে উপবাস।
নবরূপে করিছে স্নান ধরা।
নিসর্গ সিক্ত করে জলকণা,
সুললিত হয় মননধারা।”
~ তাজরীন ফাতিহা

মানহা মনোমুগ্ধ হয়ে আবৃত্তি শুনছিল। সে বৃষ্টি পড়ছে দেখে শাশুড়িকে ডাকতে এসেছিল তখনই উর্মি ভুঁইয়াকে গাছের পাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে কবিতা আবৃত্তি করতে শুনে এগিয়ে গিয়ে কবিতা শুনতে শুরু করেছে। বেশ চমৎকার উর্মি ভুঁইয়ার আবৃত্তির কণ্ঠ। উর্মি ভুঁইয়া আবৃত্তি শেষে গাছ থেকে ভিজে ফুল ছিঁড়ে কানে গুঁজলেন। মানহা বললো,

“মাশাআল্লাহ আম্মু, এতো সুন্দর করে আবৃত্তি করতে পারেন আপনি?”

উর্মি ভুঁইয়া চমকে গেলেন। পিছন ফিরে মানহাকে দেখে হাসলেন তিনি। তারপর গাছ থেকে আরেকটু ফুল ছিঁড়ে মানহার কানে গুঁজে দিয়ে বললেন,

“চলো বৃষ্টিতে ভিজি দুই শাশুড়ি, বউমা।”

বলেই মানহাকে নিয়ে ভিজতে লাগলেন। মানহা অনেক বাঁধা দিতে চাইলো কিন্তু উর্মি ভুঁইয়া শুনলেন না। মানহা ভিজতে ভিজতেই বললো,

“আম্মু বৃষ্টির সময় দোয়া কবুল হয়। আপনি আল্লাহর কাছে আপনার প্রয়োজনীয় কিছু চাইতে পারেন।”

উর্মি ভুঁইয়া ভাবলো কিছুক্ষণ। তারপর মনেমনে মহান রবের নিকট কিছু চাইলো। মানহাও চাইলো।


অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজায় মানহা, উর্মি ভুঁইয়া দুজনেরই হাঁচি শুরু হয়েছে। বাড়ির সার্ভেন্ট দুজনকে আদা, চা করে দিয়ে গেলো। দুজন এখন সোফায় বসে চা পান করছে। মানহা হাঁচি দিয়ে বললো,

“আম্মু নাবা আপু কবে আসবে?”

উর্মি ভুঁইয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,

“ওর এক্সাম শেষ হলে আসবে। ওতো আমাদের সাথে বেশি থাকে না। তবে ছুটি পেলেই হয়েছে তাকে কেউ ধরে বেঁধে আর ঢাকায় রাখতে পারেনা।”

মানহা বললো,

“আচ্ছা আম্মু একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

“করো।”

“আপনার পুরো নাম কি উর্মি ভুঁইয়া?”

“হ্যাঁ। কে বলেছে? ইহাব?”

“না। আব্বু আর আপনার ম্যারেজ ডিটেইলস যে লিখা আছে দুতলার সিঁড়ি মুখে ওখান থেকে জেনেছি।”

“ও আচ্ছা। কি জানতে চাও বলো। সাধ্যের মধ্যে থাকলে অবশ্যই বলবো।”

মানহা একটু ইতস্তত করতে করতে বললো,

“আসলে আম্মু ইসলামে স্বামীর পদবী স্ত্রীর নামের পাশে ব্যবহার করা উচিত নয় তবে হারামও নয় যদি না তা বিভ্রান্তি বা বংশগত পরিচয় বিকৃতি না ঘটায়। মোটকথা এটি ইসলামিক আদর্শ নয়, পিতার পদবীই সন্তানের ব্যবহার করা উচিত।”

কথাটুকু বলে মানহা শাশুড়ির দিকে চাইলো কিন্তু উর্মি ভুঁইয়া তৎক্ষণাৎ কিছু বললেন না। চুপচাপ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,

“তোমাকে কে বলেছে ভুঁইয়া তোমার শ্বশুরের পদবী?”

মানহা অবাক হয়ে তাকালো। অবাক হয়েই বললো,

“তাহলে কি আব্বু আপনার পদবী ব্যবহার করেছেন?”

উর্মি ভুঁইয়ার মানহার বোকা বোকা কোথায় হাসলেন। বললেন,

“না।”

মানহা কৌতূহলী হয়ে বললো,

“তাহলে?”

উর্মি ভুঁইয়া চা শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন,

“আমিও ভুঁইয়া পরিবারের মেয়ে।”

মানহা ভীষণ অবাক হয়ে বললো,

“আপনিও ভুঁইয়া আব্বুও ভুঁইয়া? দুই ভুঁইয়া পরিবার মিললো কিভাবে?”

“তোমার শ্বশুরের পাগলামিতে।”

বলেই আর না দাঁড়িয়ে উপরে চলে গেলেন তিনি। মানহা এখনো হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মাথায় কেমন জট পাকাতে লাগলো। এরকমটা এই প্রথম শুনলো মানহা। মানুষ যখন প্রথম কিছু শোনে তখন অবাকই হয় বটে।

__

নাসির উদ্দিন বাজার থেকে এসে মারওয়ানকে দেখে রাগে ফেঁটে পড়লেন। চিৎকার করে বললেন,

“তুমি আমাদের বাড়ি কেন এসেছো?”

মারওয়ান শ্বশুরকে দেখে কদমবুসি করতে এলে নাসির উদ্দিন দূরে সরে গেলেন। মারওয়ান হেঁসে মুখেই লম্বা সালাম দিলো। নাসির উদ্দিন জবাব দিলেন না। বললেন,

“আমার মেয়েকে তোমাকে দিবো না। এমন ছেলের কাছে একবার দিয়েই ভুল করেছি। দ্বিতীয়বার আর সেই ভুল করবো না।”

মারওয়ান কথাটা শুনেইনি এমন ভাব করে শাশুড়িকে বললো,

“আম্মা, আব্বাকে পানি দিন।”

রাবেয়া খাতুন ভীষণ ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আজকে বড় কিছু না ঘটে যায় আবার। মারওয়ানকে তিনি চেনেন। মাত্রাতিরিক্ত ঘাড় বাঁকা স্বভাবের। প্রথম প্রথম ঠান্ডা থাকবে কিন্তু শেষে রেগে গেলে ত্যাড়ামি করে বসবে। প্রথমবার যেবার এসেছিল সেবারই বুঝেছেন তিনি। তিনি দ্রুত নিশাতকে ডাকতে ঘরে গেলেন। নাসির উদ্দিন বললেন,

“আমার কথা তুমি শুনতে পাওনি?”

“আরে আব্বা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি। আপনি উত্তেজিত না হয়ে রেস্ট নিন। এই বয়সে এতো উত্তেজনা ভালো না।”

নাসির উদ্দিন রাগে গজরাতে গজরাতে বললেন,

“বেয়াদব কোথাকার, আমার সাথে মস্করা করতে আসলে পিটাতে পিটাতে তালগাছে ওঠাবো।”

মারওয়ান যেন মজা পেলো কথাটায়। বললো,

“দ্রুত উঠান। ঢাকায় যাওয়ার পর থেকে তাল খাওয়া হয়নি। কয়েকটা তাল পেড়ে আম্মাকে দেই। পিঠা বানিয়ে দিবে। সেই মজা হবে।”

বলে জিহ্বা বের করে মজা বোঝালো। মারওয়ানের এমন কথা শুনে নাসির উদ্দিনের মন চাচ্ছে সামনে দাঁড়ানো বেহায়া ছেলের মুখের জবান বন্ধ করে দিতে। তিনি রাগান্বিত স্বরে বললেন,

“শুধু গায়ে গতরে বেড়েছো বুদ্ধি এক আনাও বাড়েনি। কোথায় কি বলতে হয় সেটাও জানো না।”

মারওয়ান দুঃখ পাওয়ার ভঙ্গিতে বললো,

“আপনি আমার গতরের দিকে নজর দিচ্ছেন কেন আব্বা? মানলাম আপনি আমার থেকে খাটো, স্বাস্থ্য কম তাই বলে এভাবে নজর দিবেন? ইটস নট ফেয়ার।”

নাসির উদ্দিনের পুরো শরীর রিরি করতে লাগলো। মেয়েকে আসতে দেখে তিনি আর একমুহুর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে ঘরে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে মারওয়ানকে ‘বেয়াদব’ বলতে ভুললেন না। নিশাত শেষের সব কথাই শুনেছে। সে মারওয়ানের দিকে কটমট করে চাইলো। মারওয়ান মুখ গম্ভীর করে ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে ঘরে চলে গেলো।

নিশাত নিজের ঘরে ঢুকে দেখলো মারওয়ান পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে। নিশাত রাগী কণ্ঠে বললো,

“বাবার সাথে ওরকম করলেন কেন?”

মারওয়ান পা নাড়াতে নাড়াতে বললো,

“কি করলাম?”

“কি করলাম মানে? বেয়াদবি করলেন কেন?”

মারওয়ান অবাক হয়েছে এমন ভাব করে বললো,

“কবে, কখন? এতো মধুর সুরে কোনো জামাই আজ পর্যন্ত কথা বলেছে কিনা ইতিহাস ঘেঁটে দেইখো।”

“ওটাকে মধুর সুর নয়, বেয়াদবি বলে। তিনি আপনার গুরুজন। আপনি গুরুজনের মুখে মুখে তর্ক, মজা করে কোন অসাধ্য সাধন করলেন শুনি?”

“তো কি বসে বসে গালি খাবো নাকি?”

“অবশ্যই খাবেন। গালি খাওয়ার কাজ করলে গালি খাবেন না?”

“মেয়ে জামাইকে গালাগালি করে কে?”

নিশাত ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,

“আসছে মেয়ে জামাই। এরকম মেয়ের জামাই শত্রুরও না হোক।”

মারওয়ান হামি দিতে দিতে বললো,

“আমিন।”

নিশাত বললো,

“দ্রুত উঠে বাবার কাছে মাফ চান। যান।”

মারওয়ান শুয়ে থেকেই বললো,

“কখনোই না। তিনি আমার সুন্দর গতরের দিকে নজর দিয়েছেন। আমার প্রেস্টিজে লেগেছে ব্যাপারটা। যেখানে এতো লম্বা, সুদর্শন, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী জামাইকে নিয়ে গর্ব করবেন সেখানে তিনি নজর লাগিয়ে অসুস্থ বানাতে চাচ্ছেন।”

নিশাত বললেন,

“শুধু বাহ্যিক দিক দিয়ে ফিট হলেই হয় না, আগাগোড়া সুপুরুষ হতে হয়। যেটা আপনি নন তাই আপনাকে নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। আর আপনার খাম্বা সাইজ নিয়ে যে বড়াই, মগোমা। সরি টু স্যে আমার পরিবারের কারো এমন খাম্বা সাইজের দরকার নেই।”

মারওয়ান ঠ্যাং নাড়াতে নাড়াতে বললো,

“বুঝি, বুঝি সবই বুঝি। চাইলেও কি আর আমার সমান হতে পারবে? হিংসায় জ্বলে পুড়ে যাচ্ছো দুই বাপ, বেটি। দেখি আমার কবুতরের ছাও কই। এখনো লিলিপুট সাইজ হয়ে আছে ছাওটা। টেনে টেনে লম্বা বানাই গিয়ে।”

বলে উঠে বাইরে চলে গেলো। নিশাত রাগে চেঁচিয়ে বললো,

“খাম্বার বাচ্চা..আ।”

মারওয়ান পর্দা সরিয়ে মাথা ঢুকিয়ে বললো,

“তাকেই আনতে যাচ্ছি। দেখলে আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমার কথা রপ্ত করে ফেলেছো। গুড চালিয়ে যাও।”

বলে দ্রুত প্রস্থান করলো। নিশাত বুঝলো মারওয়ান তাকে রাগাতে ইতরামি করছে। নিশাত বাথরুমে ঢুকে তাড়াতাড়ি ওযু করে নিলো। মাথায় এখনো রক্ত চড়ে আছে। রাগ কমাতে ওযু করেছে। জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো সে।


নাহওয়ান তার ছোট্ট শরীরটা নিয়ে মুরগির পিছনে দৌঁড়ে দৌঁড়ে ছুটছিল। মারওয়ান দেখেই ছেলেকে উল্টো করে কাঁধে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললো,

“এই কবুতরের ছাও, তুই কোথায় কোথায় ঘুরিস?”

নাহওয়ান বাবার কাঁধে উল্টো ঝুলে ফিচফিচ করে হেঁসে বললো,

“মুনির কাচে চিলাম।”

“ওহ শালির কাছে ছিলি। তোর মুনিকে চিপস দিয়েছিলি?”

নাহওয়ান মাথা কাত করে বললো,

“ডিয়েচি।”

“গুড, ভেরি গুড। গোসল করবি?”

নাহওয়ান খুশিতে ফাল দিয়ে উঠলো। মারওয়ান বললো,

“জামা, কাপড় তো কিছু আনিনি। কি পড়বো?”

নাহওয়ান বাবার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে মারওয়ান চিন্তিত ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকলো। উদ্দ্যেশ্য নিশাতের কাছে জামা কাপড় পাওয়া যায় কিনা তা জানতে। একটু পর মুখ কালো করে বেরিয়ে এলো। নিশাতের কাছে কিছু নেই। হতাশ হলো সে। নাহওয়ান দৌঁড়ে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরলো। মারওয়ান তাকিয়ে দেখলো নাহওয়ানের হাতে লুঙ্গি। তার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। জিজ্ঞেস করলো,

“কই পেয়েছিস রে ফাইয়াজ?”

নাহওয়ান আঙুল দিয়ে ঘরের সামনের সিঁড়ি দেখিয়ে দিলো। মারওয়ান খুশি হয়ে গামছা নিয়ে ছেলেকে কাঁধে উঠিয়ে পুকুরে চলে গেলো। নিজের জামা, কাপড় খুলে রেখে লুঙ্গি পড়ে নাহওয়ানকে সিঁড়িতে দাঁড় করিয়ে পুকুরে ডুব দিলো। তারপর পানি থেকে মাথা উঠিয়ে ছেলের দিকে হেঁসে চাইলো। নাহওয়ান বাবাকে মাথা ওঠাতে দেখে হাত তালি দিয়ে লাফাতে লাগলো। বেশিক্ষণ না থেকে নিজেকে ও ছেলেকে গোসল করিয়ে পুকুর থেকে উঠলো। লুঙ্গি ও নাহওয়ানের গেঞ্জি, প্যান্ট ধুয়ে ছেলেকে গামছায় জড়িয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলো।

বাড়িতে ঢুকার সাথে সাথেই শ্বশুরের চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেলো। তিনি জোরে জোরে বলেছন,

“মাত্র গোসল করবো বলে লুঙ্গি গামছা সিঁড়ির উপরে রেখে সাবান আনতে ঘরে ঢুকেছি এসে দেখি লুঙ্গি গায়েব। লুঙ্গি চুরি করতে কে আসবে এখানে? জীবনে যা হয়নি। রাবেয়া তোমার মেয়ে জামাইকে জিজ্ঞেস করো আমার লুঙ্গি নিয়েছে কিনা? সে ছাড়া বাড়িতে আর কেউ নেই যে লুঙ্গি ধরবে। চরম মাত্রায় বেয়াদব ছেলে।”

রাবেয়া খাতুন কিছুতেই স্বামীকে শান্ত করতে পারছেন না। নিশাত আর নাজিয়া পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নাজিয়া দুলাভাইকে দেখতে পেয়ে নিশাতকে বলে দ্রুত ঘরে চলে গেলো। নিশাত মারওয়ানকে দেখে দ্রুত এগিয়ে গেলো। হাতে ভেজা লুঙ্গি দেখে বললো,

“আপনি না বলে বাবার লুঙ্গি ধরেছেন কেন? আপনি কি আমাকে একটুও শান্তি দিবেন না। আমাকে তো জ্বালিয়ে কয়লা কয়লা বানিয়ে ছেড়েছেন এখন বাবাকে পাগল বানাতে এসেছেন?”

মারওয়ান নিশাতের হাতে লুঙ্গি দিয়ে বললো,

“এটা তোমার বাবার লুঙ্গি আমি কিভাবে জানবো। সামনে পেয়েছি নিয়ে গোসল করতে গেছি। তাছাড়া লুঙ্গি আমি আনিনি এই পোটকার বাচ্চা এনে দিয়েছে আমাকে। তাই আমাকে না ধরে ওকে ধরো।”

বলেই নাহওয়ানকে নিশাতের কোলে দিতে গেলে নাহওয়ান শক্ত করে বাবার গলা জড়িয়ে রাখলো। যেন বোঝাতে চাচ্ছে এখন কোনভাবেই মায়ের কোলে যেতে ইচ্ছুক নয় সে। মারওয়ান ছেলেকে চেপে ধরে বললো,

“তোর কারণে কথা শুনলে, খবর আছে।”

নাসির উদ্দিন এতক্ষণে খেয়াল করলেন মারওয়ানকে। নিশাতের হাতে ভেজা লুঙ্গি দেখে তিনি হুংকার দিয়ে বললেন,

“শেষ পর্যন্ত লুঙ্গি নিয়ে টানাটানি। তোমাকে ছাড়বো না বেয়াদব ছেলে।”

মারওয়ান শ্বশুরের হুংকার শুনে ছেলেকে নিয়ে পগারপার।

চলবে,

(আসসালামু আলাইকুম।)

ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_২৫

তাজরীন ফাতিহা

বিকেল নাগাদ নিশাত তেলের বোতল হাতে নাহওয়ানকে কোলে নিয়ে ঘরে আসলো। আজ সকালে তার মাথায় একগাদা তেল দিয়ে দিয়েছে তার মা রাবেয়া খাতুন। পুরো মাথা তেল চিটচিটে হয়ে আছে। মায়েরা তেল দিতে গেলে এরকম জবজবে করেই দেয়। নিশাতের চুল দ্বিগুণ থেকে এখন আধাগুনে নেমেছে। আগামীকাল শ্যাম্পু করে ফেলবে। তাই ভাবলো ছেলের মাথাও কিছুটা তেল দিয়ে নিক। তেল দিয়ে শ্যাম্পু করলে চুল সিল্কি সিল্কি দেখায়। ধরলে রেশমের মতো কোমল, ঝরঝরে লাগে। যেই ভাবা সেই কাজ। বিছানায় বসে ছেলেকে সামনে বসিয়ে যত্ন নিয়ে তেল দিয়ে দিচ্ছে। এরমধ্যেই মারওয়ান ঘরে ঢুকে ছেলেকে তেল দিয়ে দিতে দেখে বললো,

“ইয়া মাবুদ আমার ছাওয়ের মাথায় এসব কি ছাইপাশ দেয়া হচ্ছে?”

নিশাত তেল দিতে দিতে শান্ত কণ্ঠে বললো,

“ছাইপাশ না তেল দেয়া হচ্ছে।”

“ছেলেরা চুলে তেল দেয় বাপের জন্মে শুনিনি। তেল দিলে মেয়েদেরই বিশ্রী লাগে আর ছেলেদের কথা নাইবা বললাম। লিটারেলি মুরগি মুরগি লাগে।”

“আপনার আজাইরা কথা শেষ হলে ঘর থেকে যান।”

নাহওয়ান মা, বাবার কথা কাটাকাটি দেখছে। মাথায় হাত দিয়ে বাবার দিকে চাইলো। মারওয়ান ছেলেকে ইশারায় ডাকলো। নাহওয়ান হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যেতে নিলে নিশাত আটকে ধরলো। বললো,

“কোথায় যাচ্ছো? তেল দেয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এক ইঞ্চি নড়বে না। দুপুরে নানার লুঙ্গি চুরি করেছিলে কিচ্ছু বলিনি এখন কথা না শুনলে মাইর চলবে।”

নাহওয়ান মায়ের কথা শুনে কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে বাবার দিকে চাইলো। মারওয়ান ছেলেকে কাঁদতে দেখে রেগে গেলো। জোরে বললো,

“ওই আমার ছেলেকে ছাড়। বেশি বাড়াবাড়ি করলে কিক দিয়ে তেলের বোতল বাইরে ফেলবো। আমার এতোটুকু ছাওকে তেল দিয়ে আরও এট্টুক বানিয়ে ফেলছে। ছাওটাকে কোনোমতেই বড় হতে দিচ্ছে না। সব এই লিলিপুট পরিবারের ষড়যন্ত্র।”

মারওয়ানের কথার আওয়াজ নাসির উদ্দিনের কান পর্যন্ত গিয়েছে। তিনি হনহন করে ঘরে এসে নিশাতকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“নিশাত তেলের বোতল দে তো।”

নিশাত অবাক হয়ে বাবার পানে তাকালো। নাসির উদ্দিন আবারও একই কথা বললেন। নিশাত তেলের বোতল বাবার হাতে দিলো। নাসির উদ্দিন মারওয়ানের এক হাত বগলদাবা করে নিশাতকে বললো,

“ওকে ঐপাশ থেকে টাইট করে ধর।”

নিশাত বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলো। মারওয়ানকে ওপাশ থেকে শক্ত করে ধরলো। মারওয়ান চিৎকার করে বললো,

“কি করতে চাইছেন আপনি? পুরুষ হয়ে একটা ছেলের বয়সী পুরুষকে এরকম চেপে ধরছেন কেন? লজ্জা নেই আপনার? শ্বশুরবাড়ি এসেছি কি নির্যাতিত হতে?

নাসির উদ্দিন কোনো কথা না বলে বোতল উবু করে মারওয়ানের মাথায় তেল ঢালতে লাগলো। মারওয়ান বোবা হয়ে গেলো। সম্বিত ফিরে এলে চেঁচিয়ে বললো,

“আমার চুল!”

তেল মাথায় ভালোভাবে ডলে নাসির উদ্দিন বিজয়ীর বেশে বেরিয়ে গেলেন। মারওয়ানের কোকড়া কোকড়া চুল এখনো কয়েকটা খাড়া হয়ে আছে। নিশাত মারওয়ানের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেঁসে দিলো। নাহওয়ানও বাবার দিকে তাকিয়ে লাফ দিয়ে উঠে হাসতে লাগলো। মারওয়ান কিড়মিড় করতে করতে বললো,

“তোমাদের নামে আমি পুরুষ নির্যাতনের মামলা করবো। আমাকে একা পেয়ে চেপে ধরে ধরেছো, টর্চার করছো? এর শোধ আমি তুলবো।”

নিশাত হাসতে হাসতে মারওয়ানকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো। মারওয়ান আয়নায় নিজের বলদ বলদ চেহারার দিকে তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে বললো,

“এই আবুল আমি না। ইয়াক কেমন চোর চোর লাগছে। ছিঃ!”

নিশাত পিছন থেকে বললো,

“শুধু চোর না একেবারে তেলাচোরার মতো লাগছে।”

বলেই হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো। মারওয়ান খিটমিট করতে করতে বিছনায় চাইলো। দেখলো নাহওয়ান ফোকলা হেঁসে চেয়ে আছে তার দিকে। মারওয়ান চোখ রাঙিয়ে হাত উঠিয়ে মাইর বোঝালো।


সন্ধ্যা একটু আগেই নেমেছে। তেলের ঘটনার পর মারওয়ান আর ঘর থেকেই বেরোয়নি। রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে নিশাত চটপটি বাটিতে বাটিতে বেড়ে নিচ্ছে। পাশে রাবেয়া খাতুন শসা, পিঁয়াজ কুচি, সেদ্ধ আলু, ডিম এনে রাখলো। নিশাত এক এক করে প্রত্যেক বাটিতে ফুচকা ভেঙে দিলো। তারপর সব উপাদান দিয়ে চটপটি তৈরি করে ফেললো। বিয়ের আগে চটপটি সপ্তাহে একদিন বানিয়ে না খেলে নিশাতের পেটের ভাত হজম হতো না। বিয়ের পর সবকিছুই পরিবর্তন হয়েছে। শখ, আহ্লাদ বলতে কিছুই ছিল না তার। এখন বাবার বাড়ি এসে মায়ের উদ্যোগে আবারও সেই পুরোনো দিনে ফিরে পেয়েছে যেন। চটপটির সুঘ্রাণে নিশাতের জিভে পানি এসে গেছে।

নিশাত সব বাটি ট্রেতে করে সাজিয়ে রেখে বসার ঘরের টেবিলে রাখলো। রাবেয়া খাতুন স্বামী নাসির উদ্দিনকে ডেকে এনে বসালেন। সবাই একসাথে খাবার খাওয়ার মজাই আলাদা। নাসির উদ্দিন দেখেই বললেন,

“আরে তোর চটপটি খাওয়ার স্বভাব এখনো যায়নি? তোর হাতের চটপটি ভীষণ মিস করেছি এতো বছর। আজকে মজা করে খাবো আমার মায়ের হাতের রান্না।”

নিশাত বাবার কথা শুনে হেঁসে বললো,

“তোমার বাচ্চামি এখনো গেলো না বাবা?”

নাসির উদ্দিন ইতোমধ্যেই দুই চামচ পেটে গলধঃকরণ করে বললেন,

“মায়ের রান্না খেলে সব বাচ্চাই বাচ্চামি করবে স্বাভাবিক।”

নিশাত হেঁসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো। নাসির উদ্দিন মেয়ের মুখের সামনে এক চামচ ধরলেন। নিশাত মুখে নিলো। তিনি বললেন,

“গুষ্ঠির শত্রুটা কই?”

“ঘরেই আছে। আমি ডেকে আনি। তোমাকে দেখলে আসবে না মনে হয়। দাঁড়াও বলে আসি।”

নিশাত কথাটুকু বলে নিজের রুমে গিয়ে দেখলো মারওয়ান ছেলেকে নিয়ে খেলছে। নিশাত ঘরে ঢুকে বললো,

“এই বসার ঘরে চলুন। নাস্তা দেয়া হয়েছে আসুন।”

মারওয়ান ছেলেকে কোলের মধ্যে ঢুকিয়ে বললো,

“তোমার ঐ জালিম বাপ থাকলে আমি যাবো না। আমাকে রীতিমত অপমান করছেন উনি। মুরুব্বী আর শ্বশুর না হলে উড়িয়ে ফেলতাম আজ। আমাকে জোকার বানিয়ে ছেড়েছে। সবাই দেখে লুকিয়ে লুকিয়ে হেসেছে। সব দেখেছি আমি। এতবড় অপমান হওয়ার পর এই বাড়িতে থাকার প্রশ্নই আসেনা। কালকেই চলে যাবো। আজকেই যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু যায়নি কারণ তোমার জালিম বাপ ভাবতে পারে আমি তার ভয়ে ময়দান ছেড়ে পালিয়েছি। তাকে বলে দিও আমি ভীতু নই। এমনিতেও জামাইয়ের খাতির, যত্ন করতে পারেনা এই পরিবার।”

নিশাতের এতো হাসি পেলো বলার বাইরে। শ্বশুরের ভয়ে বসার ঘরেই যাচ্ছে না আর এখানে বসে বসে ডায়লগ দিচ্ছে আমি ভীতু নই। কোনোমতে হাসি চেপে বললো,

“ভয় না পেলে বসার ঘরে যাচ্ছেন না কেন?”

মারওয়ান ফুঁসে উঠলো। কত বড় সাহস তাকে ভীতু ইঙ্গিত দিলো। ছেলেকে কোলে নিয়ে বসার ঘরে গিয়ে শ্বশুরের বিপরীত চেয়ারে থমথমে মুখে বসলো। নাসির উদ্দিন জামাইকে আড়চোখে দেখলেন। মারওয়ানও আড়চোখে দেখলো। দুজনের কেউই কথা বললো না। নিশাত হালিমের বাটি হাতে ঘরে ঢুকলো। তারপর মারওয়ানের হাতে দিলো। নাসির উদ্দিন ভ্রু কুঁচকালেন। বললেন,

“হালিমও রেঁধেছিস নাকি?”

নিশাত বললো,

“হ্যাঁ তোমার জামাই চটপটি খায়না। তাই তার জন্য আলাদা করে হালিম রাঁধতে হয়েছে। তোমার নাতিরও পছন্দ।”

নাসির উদ্দিন চটপটি খেতে খেতে বিড়বিড় করে বললেন,

“ওরে সিরাজউদ্দৌলার বংশধর! এক টাকা কামানোর মুরোদ নাই অথচ খাবার বাছাইয়ের কমতি নাই।”

মারওয়ান শ্বশুরকে বিড়বিড় করতে দেখে বুঝলো তাকেই গালি দিচ্ছে এই বুড়ো। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সে আর নাহওয়ান হালিম খেলো। হালিম খাওয়া শেষ করে মারওয়ান ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে নাসির উদ্দিন মেয়েকে উদ্দ্যেশ্য করে বললেন,

“বুঝলি নিশাত মাহবুবের বেটাকে আমাদের পরিবারের বানিয়ে দিলাম আজ। এসেই বহুত ফটরফটর শুরু করেছিল এখন একটু ঠাণ্ডা করে দিলাম। তেল দেয়াতে মাসুম মাসুম লাগছে বাপ, বেটাকে কি বলিস?”

নিশাত হাসতে লাগলো। বাবাকে হাত উঁচিয়ে বললো,

“একদম।”

বলেই ফাঁকা বাটিগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেলো। রাবেয়া খাতুন দুই বাপ, মেয়ের কাণ্ড দেখে বললেন,

“আপনি কি শুরু করেছেন বলুন তো? ছেলেটা এমনিতেই আমাদের বাড়িতে আসেনা এরকম করলে আর আসবে? শত হলেও মেয়ের জামাই। যেমনই হোক যত্নআত্তি, অ্যাপায়নে ত্রুটি রাখা উচিত না কিন্তু আপনি আর আপনার মেয়ে ছেলেটাকে অপমান করছেন। এগুলো কেমন কথা?”

নাসির উদ্দিন হালিম চটপটি শেষ করে হালিম খেতে খেতে বললেন,

“ওর মান আছে যে অপমান করবো? আমার মেয়েটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছে গত চার বছর। ওকেও একটু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে কয়লা করি। দেখুক কেমন লাগে জ্বলতে, পুড়তে। মেয়ে আমার ফেলনা নাকি? কত যত্ন করে ওর হাতে তুলে দিয়েছিলাম আর সেই মেয়েকে দিয়ে ও রোজগার করিয়ে পায়ের উপর পা তুলে খায়। এসব বাবা হয়ে মোটেও বরদাস্ত করবো না আমি। ওকে যদি ঘোল না খাইয়ে ছেড়েছি আমার নামও নাসির উদ্দিন না।”

রাবেয়া খাতুন হতাশ হলেন। ছেলে, বুড়ো সবাই যদি পাগলামি করে তাহলে কিভাবে হবে?

__

মানহা টেবিলে বসে বই পড়ছে। ইহাব কালকে তার জন্য বই কিনে এনেছে। তার সেমিস্টার ফাইনাল একমাস পর। পড়ালেখা তার তেমন ভালো লাগেনা।পড়তে বসলেই ঘুম ধরে। আজকেও ব্যতিক্রম নয়। বই খুলে আছে ঠিকই কিন্তু কোনো মনোযোগ নেই তাতে। ইহাব আজকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলো। রুমে ঢুকে দেখলো থ্রিপিস পড়ুয়া ছোটখাটো গড়নের একটি নারী তার স্টাডি টেবিলে বই খুলে বসে আছে। তবে বইয়ে যে ধ্যান নেই বুঝলো সে। জামাকাপড় পাল্টে ফ্রেশ হয়ে এসে মানহার পাশে চেয়ার টেনে বসলো। মানহা ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলো। ইহাব বললো,

“কোনটা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে বলো?”

মানহা ভ্রু উঁচিয়ে বললো,

“আপনি কি মানবিক বিভাগের? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আপনি কি বুঝবেন?”

ইহাব রহস্যময় হেঁসে বললো,

“মানবিক বিভাগের না হই কিন্তু তোমার চেয়ে আমার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উপর ভালোই দক্ষতা আছে।”

মানহা বেশ অবাক হলো। রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে না পড়েই কিভাবে দক্ষতা থাকতে পারে? মানহার সামনে তুড়ি বাজিয়ে তার ধ্যান ভঙ্গ করলো ইহাব। মানহা হঠাৎ কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। ইহাব কিছুই বুঝলো না। অমন তাড়াহুড়ো করে কোথায় গেলো মানহা?

একটু পর একটা প্লেট হাতে ঘরে ঢুকলো সে। প্লেটটা টেবিলে রেখে ইহাবকে বললো,

“নিন খান।”

ইহাব তাকিয়ে দেখলো নাগেটস্ আর সসেজ ফ্রাই। সে একটা মুখে পুড়লো। নাগেটস্ আর সসেজের টেস্টটা ভিন্ন লাগছে আজকে। মানহা উৎসুক নয়নে ইহাবের দিকে চেয়ে আছে। ইহাব সবগুলো খেয়ে টিস্যু দিয়ে হাত মুছলো। মানহা তার খাওয়া শেষেও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল কিছু শোনার আশায় কিন্তু ইহাব কিছুই বললো না। তার মনটা হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে গেলো। শ্বশুরবাড়িতে আজই প্রথম নাস্তা বানিয়েছে সে। শাশুড়ি বাদে কেউই প্রশংসা করলো না ব্যাপারটা তার মনে খুবই আঘাত করলো। সে চুপচাপ খালি প্লেট হাতে বেরিয়ে গেলো।

উর্মি ভুঁইয়া স্বামীর জন্য চা নিয়ে রুমে যাচ্ছিলেন। মানহাকে মন খারাপ করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে বললেন,

“কি হয়েছে?”

মানহা একটু হেঁসে বললো,

“কিছু না আম্মু।”

“ইহাব কিছু বলেছে নাকি?”

“জ্বি না।”

উর্মি ভুঁইয়া বললেন,

“আচ্ছা যাও।”

মানহা ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়ে চলে গেলো। উর্মি ভুঁইয়া সেদিকে কিছুক্ষণ চেয়ে নিজেদের রুমে চলে এলো। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া গ্রামের একটা রাস্তার কাজ ধরেছেন। সেটারই কাগজ পত্র ঘাটছিলেন মনোযোগ দিয়ে। উর্মি ভুঁইয়া চায়ের কাপ স্বামীর হাতে দিলেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া বললেন,

“তুমি খাবে না?”

“উহু, এখন চা খেতে ইচ্ছে করছে না।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া আর কিছু না বলে চা খেতে লাগলেন। উর্মি ভুঁইয়া বেশ কিছুক্ষণ পর বললেন,

“গ্রামে যে কয়েকমাস আগে খুন হয়েছিল এটার মেইন কালপ্রিটের বিচার হয়েছিল?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলেন। তারপর নিজেকে স্বাভাবিক করে বললেন,

“ওই কেস তো কবেই বন্ধ হয়ে গেছে।”

উর্মি ভুঁইয়া ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“বন্ধ হলো কেন? দুজোড়া মার্ডার রেপ কেস কীকরে বন্ধ হতে পারে?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া চা অর্ধেক খেয়ে স্ত্রীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,

“সবই টাকার খেল। হয়তবা যারা খুন করেছে তারা প্রশাসনের মুখ টাকা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। এদেশে এসব অস্বাভাবিক তো না।”

উর্মি ভুঁইয়া চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন,

“তাই বলে ধর্ষণ হয়ে মারা যাওয়া লাশ চারটার কোনো বিচার হবে না?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া অনেকক্ষণ পর বললেন,

“এ দেশে লাশের বিচার কবেই বা হয়েছে? জীবিতদের বিচারই হয় না আর লাশের বিচার হওয়া তো বিলাসিতা।”

“আপনি না চেয়ারম্যান। দেখুন কোনোভাবে কেসটা আবার রিওপেন করা যায় কিনা।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীর কথার বিপরীতে কিছু বললেন না।


মানহা টেবিলে বসে বইয়ের ভাঁজে খুলে দেখলো হাজার টাকার দুটো নোট রাখা। সে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। ঘাড় ঘুরিয়ে ইহাবের দিকে তাকিয়ে দেখলো ল্যাপটপে টাইপিং করছে সে। মানহা টাকাটা হাতে নিয়ে ইহাবের সামনে দাঁড়িয়ে বললো,

“এটা কিসের টাকা?”

ইহাব টাইপিং করতে করতেই বললো,

“নাস্তা খাওয়ালে তার বখশিস।”

মানহা গম্ভীর মুখে টাকাটা ইহাবের কোলে রেখে বললো,

“আমি কোনো ওয়েটার নই যে আমাকে বখশিস দিতে হবে।”

ইহাব অবাক হয়ে বললো,

“ওয়েটার হতে যাবে কেন?”

“একজন ওয়েটারকে যেমন খাওয়া শেষে বখশিস দেয়া হয় ঠিক তেমনই আপনি জাস্ট টাকা রেখে ফর্মালিটি পূরণ করেছেন। এটা আমাকে বেশ অপমানিত করেছে। বাবার বাড়িতে থাকতে বিকেল বা সন্ধ্যে হলেই নানা রকম আইটেম বানিয়ে পরিবারের লোককে খাওয়াতাম সেই প্রেক্ষিতে পরিবারের একটু প্রশংসা বাক্য আমার মনে আনন্দের ঝড় বইয়ে দিতো কিন্তু আপনাদের পরিবারে আম্মু বাদে সবাই অনুভূতিহীন। যেন একটু প্রশংসা করলে আপনাদের বংশে দাগ লেগে যাবে। আর শুনুন টাকা দিলেই সবাই খুশি হয়না। খুশি করতে একটু মিষ্টি বাক্যই যথেষ্ট।”

বলেই মানহা পড়ার টেবিলে গিয়ে পড়ায় মনোযোগ দিলো। ইহাবের মনে হলো আসলেই কাজটা ঠিক হয়নি। এভাবে কিছু না বলে টাকা রেখে আসা আসলেই অপমান। বেচারি তো যত্ন নিয়ে খাবারটা বানিয়েছে তাদের জন্য অথচ সে ভেবেছে শুধু টাকা দিলেই খুশি হবে।

মানহা এশার নামাজ পড়ে দোয়া, দুরুদ পড়ে উঠলো। আজকে খিদে লাগছে না তার। সম্ভবত গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। নামাজ শেষে বিছানায় শুয়ে পড়লো। মাথাটাও ব্যথা করছে। ইহাব কয়েকবার ভাত খেতে সাধলেও মানহা ওঠেনি। অগত্যা ইহাব ঘরেই তার খাবার নিয়ে আসলো। মানহাকে উদ্দ্যেশ্য করে বললো,

“ভাত না খেলে তোমার ভাই বলবে তোমাকে না খাইয়ে অসুস্থ বানিয়ে ফেলেছি। পরে আমাকে ব্লেম দেবে শ্রদ্ধেয় শ্লা ব্রো। এমনিতেই আমাকে দেখলে সিংহের মতো তর্জন গর্জন শুরু করে এখন যদি শোনে তার বোনকে ভাত না খাইয়ে রেখেছি তাহলে বাঘের মতো থাবা দিয়ে ধরে ছিঁড়ে ফেলবে। নিজের স্বামীকে ছেঁড়াবেড়া দেখতে না চাইলে দ্রুত ভাতটা খেয়ে নাও।”

‘ছিঁড়ে ফেলবে’ কথাটা শুনে মানহার গম্ভীর মুডেও হাসি পেয়ে গেলো। মানহা আর কথা না বাড়িয়ে উঠে অর্ধেকেরও কম ভাত খেলো বাকিটুকু ছুঁয়েও দেখলো না। প্লেটেই রেখে দিলো। তারপর মুখ ধুয়ে আবার কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে পড়লো। ইহাব আর নিচে গেলো না। মানহার প্লেটেই খেতে বসলো। বাকি ভাতটুকু খেয়ে প্লেট রেখে এসে নিজেও শুয়ে পড়লো।

_

ইন্টিলিজেন্স ডিপার্টমেন্টের হেডের রুমে তিনজন গম্ভীর মুখে বসে আছে। হেড তিনজনকেই ডেকে পাঠিয়েছেন আজ। অনেকক্ষণ একটা ফাইল ঘেঁটে হেড তিনজনকে উদ্দ্যেশ্য করে বললেন,

“জিনান আদহাম, নেওয়াজ শাবীর আর মুনতাজির জায়েদ তোমাদের তিন জনকে কিছু তথ্য জোগাড় করতে হবে। এবারের মিশনটা রাফ এন্ড টাফ হতে পারে। তোমাদের আন্ডারের সবাইকে এবিষয়ে জানিয়ে দিবে। উপর থেকে অর্ডার এসেছে খুবই গোপনে প্রত্যেকটা ডেটা কালেক্ট করবে। তোমরা তিনজন আমার বিশ্বাসভাজন। আশা করি তিনজনই সফল হবে। তিনজনের কাজ ভিন্ন ভিন্ন ধারায় এগোবে। মনে রাখবে কোনোভাবেই কেউ যেন সন্দেহ না করে। তোমাদের এর বেশি ইন্সট্রাকশন দিতে হবে না আশা করি।”

জিনান পেপার ওয়েট ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,

“কিন্তু এই ডেটা সংগ্রহ তো অন্য গ্রুপের করার কথা। আমাদের তো অলরেডি হাতে একটা কাজ আছেই। দুটো দায়িত্ব আমাদের হাতে দেয়াটা রিস্ক এন্ড হার্ড হয়ে গেলো না?”

হেড মুচকি হেঁসে বললো,

“এজন্যই তো তিনজনকে ভাগ ভাগ করে কাজ দেয়া হয়েছে। তবে তোমাদের জন্য সুখবর আছে।”

নেওয়াজ শাবীর ভ্রু বাকিয়ে বললো,

“কেমন সুখবর স্যার?”

হেড টেবিলে হাত দুটো রেখে বললেন,

“এটা জায়েদ বলবে।”

জিনান আদহাম ও নেওয়াজ শাবীর উভয়ই মুনতাজির জায়েদের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চাইলো। মুনতাজির গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,

“আমাদের সাথে আরেকজন যুক্ত হবেন এই মিশনে। তার ফাইটিং স্কিল মারাত্মক এবং বিধ্বংসী ইন্টিলিজেন্ট এজেন্ট। খুব শীগ্রই সে আমাদের সাথে অ্যাটেন্ড হবেন। সে আগে অন্য ডিপার্টমেন্টে কাজ করেছে। মাঝখানে সে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড হয়ে গিয়েছিল। সাসপেন্ড শেষে আবারও ব্যাক করেছেন তিনি।”

জিনান আদহামের নীল চক্ষু জ্বলজ্বল করে উঠলো। নেওয়াজ শাবীর অবাক হয়ে শুধালো,

“সাসপেন্ড হয়েছিল কেন?”

“কোনো এক অভিযোগ তার উপর আরোপিত হয়েছিল। যদিও শোনা যায় ওই অভিযোগ তাকে ফাঁসাতে করা হয়েছিল। তার ট্যালেন্টের জন্য তিনি আবারও ব্যাক করতে পারছেন নাহলে আজীবনের জন্য সাসপেন্ড করে দেয়া হতো। তার স্কিল দেখে IMF (Intelligence & Mission Forum) ডিপার্টমেন্ট এই সিদ্ধান্ত নেন নি।”

জিনান পেপার ওয়েট মুঠ করে ধরে বললো,

“ইন্ট্রেসটিং!”

নেওয়াজ নড়েচড়ে বসে বললো,

“আপনি তার সম্পর্কে এতো তথ্য জানেন কিভাবে?”

“কারণ তার সাথে আমার একটা মিশনে কাজ করতে হয়েছিল।”

নেওয়াজ বললো,

“আচ্ছা। আমরা তাকে অবশ্যই সম্মানের সহিত গ্রহণ করবো। তার নামটা কি?”

মুনতাজির গম্ভীর স্বরে বললো,

“Azarak Cipher.”

জিনান ও নেওয়াজ দুজনেই চমকে গেলো। নেওয়াজ বললো,

“উনি কি বিদেশী?”

“No.”

“তবে নাম এমন রহস্যময় বিদেশীদের মতো কেন? আজারাক সাইফার।”

“এটাও একটা রহস্য হয়তবা।”

বলেই মুনতাজির জায়েদ থামলো। ডিপার্টমেন্টের হেড এবার মুখ খুললেন,

“তো বয়েজ তোমরা তোমাদের কাজে লেগে পড় তাহলে। অবশ্যই সাবধানে করবে সবকিছু। আজারাক সাইফার দ্রুতই জয়েন হয়ে যাবে তোমাদের সাথে। তোমাদের টেবিলে ফাইল চলে গিয়েছে। সব তথ্য ভালোভাবে পড়ে নিবে। এবার যাও।”

তিনজনই উঠে দাঁড়ালো। মুনতাজির জায়েদ ও নেওয়াজ শাবীর বেরিয়ে গেলেও জিনান দাঁড়িয়ে রইলো। হেড তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,

“কিছু বলবে আদহাম?”

জিনান তার হাতের ফাইল হেডের দিকে বাড়িয়ে বললো,

“স্যার এই ফাইলে কিছু সন্ত্রাসীর নাম উল্লেখ আছে। আমার পরবর্তী টার্গেট এরা। আপনার মতামত কি?”

“আগাতে পারো তবে যে মিশনটা দেয়া হয়েছে ওটার দিকে ফোকাস বেশি দিতে হবে মনে রেখো? তাই এসব কাজ দ্রুত সমাধান করে ফেলো তিনজনে মিলে। বেস্ট অফ লাক।”

“ওকে স্যার।”

বলেই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে নীল চক্ষুদ্বয় রহস্যময় করে বাঁকা হেঁসে মনে মনে বললো,

“ইন্ট্রেসটিং ক্যারেক্টার। আয়েম ওয়েটিং।”

চলবে,

(আসসালামু আলাইকুম। মুহায়মিন নামটি আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামের একটি হওয়ায় নামটি পরিবর্তন করে দেয়া হলো। আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নাম এভাবে ব্যবহার করা উচিত নয় তাই মুহায়মিন পাল্টে মুনতাজির রাখা হলো। পুরো নাম মুনতাজির জায়েদ।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply