Golpo romantic golpo ভবঘুরে সমরাঙ্গন

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৩+১৪


#ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

#পর্ব_১৩

তাজরীন ফাতিহা

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্টাডি রুমে বসে মনোযোগ দিয়ে বিভিন্ন কাগজপত্র ঘাটছেন। টেবিলের উপর কফির মগ রাখা। কাগজপত্র ঘাটাঘাটির চক্করে তা ঠান্ডা প্রায়। উর্মি ভুঁইয়া আরেক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে ওই কক্ষে হাজির হলেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়াকে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে দেখে আবার চলে যেতে চাইলেন কিন্তু ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার ডাকে তার চলন্ত পা জোড়া থেমে গেলো।

“উর্মি চলে যাচ্ছো যে?”

উর্মি ভুঁইয়া কিছুটা কাঁপলেন মনে হলো। একটু নিঃশ্বাস ছেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন,

“ভেবেছিলাম আপনি বোধহয় কোনো কাজ নেই দেখে বই পড়তে এসেছেন। তাই কিছু কথা বলতে এসেছিলাম কিন্তু আপনি তো কাজ করছেন এজন্য চলে যাচ্ছিলাম পরে বলবো ভেবে।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কাগজপত্র বন্ধ করে স্ত্রীর দিকে এগিয়ে গেলেন। স্ত্রীর হাত থেকে কফির মগ নিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে স্টাডি রুমের বিশাল বারান্দায় গেলেন। স্ত্রীকে দোলনায় বসিয়ে নিজেও পাশে বসলেন। তারপর বললেন,

“তোমার পাশে বসেছি দেখে রাগ করেছো?”

উর্মি ভুঁইয়া কথা বললেন না। চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে রইলেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীর মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে বললেন,

“উর্মি তুমি এতো রাগী কেন?”

উর্মি ভুঁইয়া এবারও কথা বলতে পারলেন না। তার মুখ দিয়ে কথা মূলত বের হচ্ছে না। তিনি ঢোঁক গিললেন। এখন সে যে কথাটা বলবেন সেটায় ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ঠিক কি রিয়েক্ট করবেন সেটাই তিনি ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না। তার কিছুটা ভয়ও লাগছে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার রাগ মারাত্মক ভয়ানক। একবার উঠলে থামানো মুশকিল। এখন তাকে জিজ্ঞেস করছে রাগী কেন? একটু পর নিজেই না ফায়ার হয়ে বসে থাকে তখন সামলাবে কে? উর্মি ভুঁইয়ার মনে হচ্ছে কথাটা বলা ঠিক হবে না। কি করবেন না করবেন এসবই ভেবে চলছেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার কোনো কথা তার কানে ঢুকছে না। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীকে ঝাঁকিয়ে বললেন,

“কি হয়েছে উর্মি? এতো আপসেট কিজন্য? কি যেন বলতে চেয়েছিলে বলো। তোমার জন্য আমি সদা প্রস্তুত।”

উর্মি ভুঁইয়া এবার মুখ খুললেন,

“না থাক অন্যদিন বলবো। আপনি নিজের কাজ করুন।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কফি মগে চুমুক দিয়ে স্ত্রীর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। উর্মি ভুঁইয়া ভ্রু কুঁচকে নিলেন। বললেন,

“আমি কারো এটো খাই না। আপনি খান।”

“অথচ একসময় তুমি প্রচুর এটো খেতে উর্মি।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কথাটা বলেই মগ রেখে স্ত্রীর পাশ থেকে উঠে গেলেন। উর্মি ভুঁইয়া মগটা হাতে তুলে চুমুক দিলেন। তার মাথা অলরেডি ব্যথা করছে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীকে কফি খেতে দেখে মনে মনে খুশিই হলেন তবে মুখে কিছু বললেন না। তিনি বললেন,

“কি বলতে এসেছিলে বলো উর্মি? তোমার এরকম থতমত ভাব অদ্ভুত লাগছে।”

উর্মি ভুঁইয়া নিজেকে ঠান্ডা করলেন। কফির মগ পাশে রেখে বললেন,

“ইহাবের বিয়ের ব্যাপারে কি ভাবছেন?”

“কি ভাববো আর ভালো মেয়ে দেখা শুরু করতে হবে। ঘটককে বলেছি আমাদের স্ট্যাটাস অনুযায়ী মেয়ের সন্ধান দিতে। ঘটক মেয়েদের বায়োডাটা হাজির করলেই পছন্দ করে যাচাই বাছাই করে মেয়ে সিলেক্ট করবো আমাদের আদরের পুত্রের জন্য ব্যাস।”

উর্মি ভুঁইয়া এবার আসলেই ভয় পাচ্ছেন কিছু বলতে। যদিও ইমতিয়াজ ভুঁইয়াকে তিনি ভয় পান না তবে ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার রাগটা মারাত্মক ভয়ানক। যেটা তিনি সামলাতে পারেন না। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীকে অদ্ভুতভাবে বসে থাকতে দেখে কাছে গিয়ে বসলেন। বললেন,

“উর্মি কি হয়েছে তোমার? এমন অদ্ভুত বিহেভিয়ার করছো কেন? তোমার পছন্দের কোনো মেয়ে আছে?”

উর্মি ভুঁইয়া শক্ত হয়ে বললেন,

“হ্যাঁ আসলে, আছে একজন।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার ভ্রু কুঁচকে গেলো। বললেন,

“কে সে? নাম বলো। তাহলে সেই মেয়েকেই বউ করবো তোমার যেহেতু পছন্দ।”

উর্মি ভুঁইয়া শাড়ির আঁচল দিয়ে কপাল একটু মুছে নিলেন। তার হাসফাঁস লাগছে কথাটা বলতে। শক্ত হয়ে রোবটিক গলায় বললেন,

“মাহাবুব ভাইয়ের মেয়েকে আমার পছন্দ।”

ইহাবের নাম নেয়নি কারণ ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ইহাবকে মারতে দ্বিধা করতেন না। অতো বড় ছেলের গায়ে মা হয়ে মার খেতে কিছুতেই দেখতে পারবেন না তিনি। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কথাটা শোনা মাত্র স্ত্রীকে ছেড়ে দিলেন। শীতল গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“কি বললে?”

উর্মি ভুঁইয়ার বুকে কামড় দিয়ে উঠলো। আল্লাহ জানেন কি ঘটবে আজকে ঘরে। চোখ বন্ধ করে আবারও খুললেন। বললেন,

“মাহাবুব ভাইয়ের মেয়েকে আমার পছন্দ। মেয়ে যথেষ্ট ভদ্র। হয়তবা স্ট্যাটাস মিলে না আমাদের সাথে কিন্তু ওকে আমার ছেলের বউ হিসেবে চাই।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। কফির মগ এক আছাড়ে ভেঙে ফেললেন। উর্মি ভুঁইয়া ভয় পেলেন না তবে কেঁপে উঠলেন। যা সন্দেহ করেছিলেন তাই হলো। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীকে শক্ত করে চেপে বললেন,

“তুমি কি বলছো ভেবে বলছো কি? ওই পরিবার আমার দুই চোখের বিষ? তুমি কোন জ্ঞানে ওই পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করতে চাও উর্মি? ইনফ্যাক্ট ইহাবও ওই পরিবারকে দুই চোখে সহ্য করতে পারেনা তুমি তবুও ওই পরিবার থেকে মেয়ে আনার কথা ভাবলে কি করে?”

উর্মি ভুঁইয়ারও মনে এই প্রশ্ন যে আসেনি তা না। কয়েক বছর আগে ইহাব একটা নাম যেন তার সামনে কখনো না নেয়া হয় এ নিয়ে তুমুল গ্যাঞ্জাম করেছিল। উর্মি ভুঁইয়া সঠিক জানেন না ঠিক কি কারণে ইহাব ও ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ওই পরিবারকে দুই চোখে সহ্য করতে পারে না যেখানে ইহাবের সাথে ছিল ওই পরিবারের একজনের আত্মার সম্পর্ক। ইহাব হঠাৎ করে ওই পরিবার থেকে মেয়ে আনতে চাচ্ছে কেন? এই বিষয়ে আরও খোলাশা করে ইহাবের সাথে কথা বলবেন ভাবলেন।

______

নিশাতের ঘুম ভাঙলো রাতে। রাত আটটা বাজে। সেই যে দুপুরে গোসল করে খেয়ে ঘুমিয়েছে এখন চোখ খুললো সে। মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড খারাপ লাগছে তার। দুপুরের ঘটনা মনে করলেই বুকটা ছ্যাত করে ওঠে। কেমন যেন দুনিয়াটা ঘুরে ওঠছে তার। পেটে ভীষণ রকমের ব্যথা করছে। সে পেটে হাত চেপে গোঙাতে লাগলো। মারওয়ান রুমে প্রবেশ করে দেখলো নিশাত পেটে হাত চেপে আছে। দ্রুত নিশাতের কাছে গিয়ে বললো,

“কি হয়েছে তোমার?”

নিশাত আস্তে করে বললো,

“পেটে প্রচণ্ড ব্যথা।”

“হঠাৎ পেটে ব্যথা কেন?”

“জানি না।”

মারওয়ান কি করবে ভেবে পেলো না। হঠাৎ বিছানার দিকে তাকিয়ে যা বোঝার বুঝে গেলো। নিশাতকে কানে কানে আস্তে করে কিছু বললো। নিশাত চমকালো কিছুটা। মারওয়ান নিশাকতে ধরে টয়লেটে নিয়ে গেলো। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এগিয়ে দিয়ে ছেলের কাছে গেলো। নাহওয়ান কতগুলো খেলনা ছড়িয়ে খেলছে আর ‘আল্লাহ আল্লাহ’ করছে। মায়ের কাছ থেকে শিখেছে এটা নিশ্চয়ই। মারওয়ান ছেলেকে কাঁধে চেপে ঘোরাতে লাগলো। নাহওয়ান মজা পেয়ে খিলখিল করে হাসলো।

নিশাত রুম থেকে বেরিয়ে কোনো রকম হেঁটে রান্নাঘরে আসলো। যতই খারাপ লাগুক রাঁধতে তো তাকেই হবে। নিশাত দেখলো চুলোর উপরে দুটো পাতিল রাখা। এগুলো এখানে কে রেখেছে? ভাবতে ভাবতে পাতিলের ঢাকনা উঠিয়ে দেখলো ভাত আর তরকারি রান্না করা। নিশাতের কপাল কিছুটা প্রশস্ত হলো। কে রান্না করলো? মারওয়ান পিছন থেকে বললো,

“আমি রেঁধেছি। একটু কষ্ট করে খাও আজকে। হয়তবা অতটা ভালো হয়নি তবুও আজকে চালিয়ে নেয়া যায় কিনা দেখো।”

নিশাত আজকে অবাকের উপর অবাক হচ্ছে। মারওয়ানকে চিনতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। হঠাৎ এরকম অদ্ভুত আচরণের কারণ কি? এসব ভাবতে ভাবতে খেয়াল করলো মারওয়ান চুলোয় ছোট একটা পাতিলে পানি বসিয়ে দিয়েছে। মারওয়ান নিশাতকে এরকম ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো,

“যাও শুয়ে থাকো। আমি গরম পানি নিয়ে আসছি।”

নিশাত কোনো কথা না বলে আস্তে করে হেঁটে চলে গেলো। নাহওয়ান মাকে দেখে দৌঁড়ে আসলো। মায়ের পা জড়িয়ে ফিক করে হেঁসে মায়ের দিকে তাকালো। নিশাত ছেলের চোখের ভাষা বুঝলো। ছেলেকে কোলে নিলো। অনেকক্ষণ পর মায়ের কোল পেয়ে আরামে বাচ্চাটা কাঁধে মাথা ফেলে পড়ে রইলো। নিশাত বললো,

“আব্বা ভাত খেয়েছেন?”

“কেয়েছি। বাবা কাইয়ে ডিচে।”

নিশাত মন ভরে তার ছানাকে আদর করলো। তার কলিজার টুকরা এই বাচ্চাটা। আরেকটু শক্ত করে ঝাপটে ধরলো ছেলেকে। ছেলেও মায়ের ওম পেয়ে আরো সেটে গেলো মায়ের বুকে। মায়ের শরীরের ঘ্রাণেই সবকিছু ভুলে যায় সন্তানরা। নিশাতের আজকে অনেক মায়ের কথা মনে পড়ছে। কতদিন হলো মা, বাবার খোঁজ নেয়া হয়না। খোঁজ নিলে আরেক বিপদ তারা নিশাতকে মারওয়ানের সংসার ছেড়ে চলে আসতে বলেন। নিশাত এসব শুনতে চায়না বিধায় ফোন দেয়া বন্ধ করেছে। তারা ফোন দিলেও এড়িয়ে চলে। ফোন ধরে না। সাইলেন্ট করে রেখে দেয়। সবাই যতটা সহজ ভাবে বলে সংসার ছেড়ে চলে আসতে সংসার ছাড়া কি অতটা সোজা?

নিশাতের বাবা মায়ের প্রতি অদৃশ্য একটা ক্ষোভ আছে। তখন ছেলেকে যাচাই বাছাই না করে কেন বিয়ে দিলো আর এখন বা তাকে সংসার ছেড়ে আসতে বলে কেন? তার একটা সন্তান আছে ওকে বাবা মায়ের আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করার অধিকার নিশাতের নেই। এতে আল্লাহ তায়ালা ভীষণ নারাজ হন। তালাক হলো আল্লাহ তায়ালার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল কাজ। এই নিষ্পাপ ফুলের মতো বাচ্চার কি দোষ? ওর তো বাবা মা দুজনকেই প্রয়োজন। এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো নিশাত।

মারওয়ান পানি নিয়ে এসে দেখলো ছেলে মায়ের কোলে ঘাপটি মেরে আছে। গামছা ভাঁজ করে গরম পাতিলে ছ্যাঁকা দিলো। তারপর নাহওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,

“ওই পান্ডা তুই মায়ের কোলে উঠেছিস কেন?”

নিশাত ও নাহওয়ান উভয়ই চমকে উঠলো। মারওয়ান তাদের দিকে এগিয়ে এসে বললো,

“আমার কোলে আয় নাটবল্টু।”

নাহওয়ান মাথা একটু বের করে আবারও মাকে ঝাপটে ধরলো। মাথা নাড়িয়ে না বললো অর্থাৎ সে যাবে না। মারওয়ান কিড়মিড় করতে করতে বললো,

“তুই আসবি তোর মাও আসবে। দ্রুত কোলে আয় চিলোমচির বাচ্চা। “

নিশাত চোখ রাঙিয়ে বললো,

“ও থাকতে চাইছে থাকুক। আপনি আমার বাচ্চাকে উল্টাপাল্টা নামে ডাকা বন্ধ করুন।”

“হ্যাঁ নিজের একার বাচ্চা। আমিতো দুধ ভাত।”

বলেই নাহওয়ানকে জোর করে কোলে নিলো। নাহওয়ান হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে লাগলো মায়ের কোলে যাওয়ার জন্য। মারওয়ান গরম গামছাটা নিশাতের হাতে দিয়ে বললো,

“এটা পেটে চেপে ধরো। আর এইযে গরম পানি এটা খেও।”

বলেই গ্লাস আর গামছা নিশাতের দিকে এগিয়ে দিলো। তারপর ছেলেকে নিয়ে বাইরে বের হতে হতে বললো,

“তোকে কিন্তু মারবো ফাইয়াজ।”

নাহওয়ান কেঁদে হাত পা ছুড়তে লাগলো আর বললো,

“মার কাচে যাবো।”

“না বাবার কাছে থাক। মা মধু নিয়ে বসে নি। তোর মা যা দিতে পারবে তা আমিও পারবো। সুতরাং সুন্দর করে কোলে ঘাপটি মেরে থাক।”

নাহওয়ান বাবার দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,

“ডুডু কাবো। ডুডু ডাও।”

মারওয়ান এতোই অবাক হলো যে মুখ থেকে কথা বের হলো না কোনো। কিছুক্ষণ পর চোখ রাঙিয়ে বললো,

“দুই দিনের আন্ডা আমার সাথে ইয়ার্কি করিস? কত বড় বদ!”

নাহওয়ান বাবার কোনো কথা কানে ঢুকালো না। দুধ খাওয়ার বায়না করেই যেতে থাকলো। শেষে আর না পেরে মারওয়ান নিশাতের কাছে দিয়ে বললো,

“খা যতো খুশি। আর আসিস বাবার কাছে তোকে আলু ভর্তা বানাবো।”

নাহওয়ান মায়ের কোলে ঘাপটি মেরে ছোট্ট ছোট্ট চোখ বের করে উঁকি দিয়ে বাবার দিকে চেয়ে ফিচফিচ করে হাসলো। মারওয়ান চোখ রাঙিয়ে তাকালো।

______

—–

ইহাব বাসায় ঢুকে বাসার পরিবেশ একেবারে থমথমে দেখলো। উর্মি ভুঁইয়াকে সোফায় বসে থাকতে দেখে মায়ের দিকে এগিয়ে গেলো। মায়ের পাশে বসে বললো,

“কিছু হয়েছে আম্মু?”

উর্মি ভুঁইয়া ছেলের দিকে শীতল চোখে চাইলেন। ইহাব মায়ের চাহুনি দেখে কিছুটা ভড়কালো। বললো,

“কি হয়েছে আম্মু?”

“তোমার মাহাবুব আলমের মেয়েকে বিয়ে করার রিজন কি ইহাব?”

ইহাব কেঁপে উঠলো ভিতরে। বললো,

“কোনো রিজন নেই আম্মু। তার মেয়েকে পছন্দ ব্যাস এইটুকুই।”

“কিন্তু আমি যতটুকু জানি তুমি ঐ পরিবারের কাউকে সহ্য করতে পারো না তাহলে হঠাৎ করে ওই পরিবারের মেয়েকে পছন্দ করার কোনো কারণ তো আমি দেখি না। আর তোমার সাথে ঐ ফ্যামিলির কি হয়েছিল যার জন্য ওদের তুমি দেখতে পারো না?”

ইহাবের চোখের কোণা লাল হয়ে গেলো। হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে আবার খুলে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। নরম সুরে মাকে বললো,

“একটু ঝামেলা চলছিল তখন, এখন সব ঠিক হয়ে গেছে। তুমি তোমার ছেলেকে অবিশ্বাস করো আম্মু?”

উর্মি ভুঁইয়া ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর বললেন,

“অবিশ্বাস করিনা কিন্তু বিশ্বাসও পুরোপুরি করতে পারছি না। কোথাও বাঁধছে মনে হচ্ছে।”

বলেই তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললেন,

“শোনা তোমার বাবার সাথে আমার এই বিষয়ে বিরাট ঝগড়া হয়েছে। তোমার বাবা প্রচণ্ড ক্ষেপে গেছেন ওই পরিবারের মেয়েকে বউ করতে চাই শুনে। কাপ, মগ, ড্রেসিং টেবিলের আয়না সব ভেঙেছেন তিনি। এখন তুমি কিভাবে তাকে ম্যানেজ করবে বা রাজি করাবে এটা একান্তই তোমার ব্যাপার। তোমাদের বাপ, ছেলেকে যেন আমার ত্রিসীমানায়ও না দেখি।”

বলেই উপরে চলে গেলেন তিনি। ইহাব মনে মনে তার পরবর্তী পরিকল্পনা ভেবে ফেললো। বাবাকে রাজি করাতেই হবে।

______

—–

মাহাবুব আলমের বাড়িতে ঢাকা থেকে বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে পাত্রের মা ও তার পরিবার। মাহাবুব আলম মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে এখনই ভাবেন নি কিন্তু পাত্র পক্ষ কিভাবে যেন খোঁজ নিয়ে চলে এসেছেন। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। দেখতে শুনতে ভালোই। হাইক্লাস ফ্যামিলি। কিন্তু মাহাবুব আলমের মেয়েকে অতো দূরে পাঠাতে দারুন আপত্তি। তাই পাত্রের পরিবার থেকে কিছুদিন সময় চেয়ে নিয়েছেন তিনি। এখনই বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলেননি। মেয়েকেও দেখান নি। মানহা নিজেও বাবা মাকে ছেড়ে অতদূর যেতে রাজি না। কলেজ যাওয়ার আগে মাকে বার বার বলছে,

“আমি অতদূর কিছুতেই বিয়ে করবো না। তোমরা যদি আমার বিয়ে দাও তাহলে আমি আর কোনোদিন তোমাদের এখানে আসবো না।”

বলেই হনহন করে হেঁটে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো। মায়মুনা বেগম নিজেও কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না তাই মেয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলেন।

মানহা মন মেজাজ খারাপ করে কলেজে যাচ্ছে। পথিমধ্যে বাইক নিয়ে ইহাব তার পথ আটকে দিলো। মানহা কিছুটা ভয় পেলো। সে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে ইহাব বললো,

“শুনলাম তোমার বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে?”

মানহা কোনো কথা না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে ব্যাগ শক্ত করে চেপে ধরে ‘ফালতু লোক’ বলে পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে গেলো। ইহাব তা দেখে হাসলো। বললো,

“যাও কলেজে। খুব শীগ্রই দেখা হবে আমাদের। তখন এই ফালতু লোক তোমায় মন ভরে দেখবে। তুমি হবে শুধুই আমার অধিকার। আর কারো তোমার উপর কোনো অধিকার থাকবে না। সেই দিন খুব বেশি দূরে নয় মানহা আফরিন। যত খুশি ছটফটিয়ে নাও। ধরা তুমি আমার খাঁচায়ই দিবে।”

চলবে…

(আসসালামু আলাইকুম। দেরি করার জন্য দুঃখিত। কেমন লেগেছে আজকের পর্ব জানাবেন।)

#ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

#পর্ব_১৪

তাজরীন ফাতিহা

আজকে তিনদিন পর স্কুলে যাচ্ছে নিশাত। তিনদিন মারওয়ান যথেষ্ট খেয়াল রেখেছে তার। আজকে একটু স্বাভাবিক হয়েছে সে। এতদিন মানসিক একটা ট্রমার মধ্যে ছিল। সেদিনের কথাগুলো হজম করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে নিশাতকে এই কয়দিন পূর্ণ সাপোর্ট দিয়েছে মারওয়ান আজাদ নামক বিড়ি’খোরটা। তার এই রূপ ভীষণ অবাক করেছে নিশাতকে। এবার বুঝি লোকটা একটু মানুষ হবে। রান্নাবান্না সারতে সারতে এসবই ভেবে চলছে নিশাত। আল্লাহ যদি তাকে সংসারের প্রতি এবার একটু মনোযোগী করে তাতেই আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া।

মারওয়ান আজকে ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠেছে। উঠেই বিড়ি টানা শুরু করে দিয়েছে। কয়েকদিন বিড়ি টানতে পারেনি এই শোকে আজকে আরও কয়েকটা বিড়ি বেশি টানবে বলে পণ করেছে। নিশাত রুমে ঢুকে মারওয়ানকে আয়েশ করে বিড়ি টানতে দেখে অবাক হয়ে তাকালো। মারওয়ান নিশাতকে এরকম হা হয়ে তাকাতে দেখে বললো,

“কি হলো? খাবে?”

হাতের সিগারেট নিশাতের দিকে বাড়িয়ে বললো। নিশাত মুখ কুঁচকে বললো,

“আপনার গায়ে কি আবারও ইবলিশ ভর করেছে?”

মারওয়ান নিজেকে ভালোভাবে দেখে বললো,

“কই না তো। তুমি দেখতে পাচ্ছো?”

নিশাত হাত ভাঁজ করে বললো,

“দেখতে পাওয়া লাগবে কেন? যার গায়ে শয়তান ভর করে সে খারাপ কাজ বেশি বেশি করে এতেই বোঝা যায় ভর করেছে নাকি করেনি।”

মারওয়ান হাতের ফাঁকে সিগারেট গলিয়ে মুখ থেকে ধোঁয়া ছেড়ে আয়েশ করে বললো,

“কি জানি। অতো হাদিস জানি না আমি। তুমি স্কুলে যাচ্ছো? যাও, সাবধানে যাবে কেমন।”

নিশাত হতাশ হলো প্রচুর। এই লোক ভালো হওয়ার নয়। ভেবেছিল বোধহয় ভালো হয়ে গেছে এখন দেখি আবার বিড়ি টানতে লেগে গেছে। তাহলে এই কয়দিন ঢং করছিল তার সাথে। সে বেশ শান্ত স্বরে বললো,

“আপনি কি কাজবাজ কিছুই করবেন না?”

মারওয়ান খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে বললো,

“আসলে কাজ করতে আইলসেমি লাগে। যেদিন আইলসেমি কমবে সেদিন কাজ করবো পিংকি প্রমিজ।”

নিশাতের আর কথা বলতেই ইচ্ছে হলো না। ছেলেকে উঠাতে লেগে গেলো। তার ছানাকে খাইয়ে সে স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হবে। নাহওয়ানকে উঠিয়ে হাত মুখ ধুইয়ে দিলো নিশাত। বাচ্চাটা মাকে আকড়ে ধরে আছে। মুখ ধুয়ে এসে বাবাকে বসে থাকতে দেখে মায়ের কোলে থেকেই বললো,

“উইত্তো বাবা।”

বলেই ছোট্ট ছোট্ট দাঁত বের করে হাসলো। মারওয়ান ছেলেকে দেখে নজর সরিয়ে ফেললো। বাচ্চাটা বাবাকে চোখ সরিয়ে ফেলতে দেখে মুখ চুপসে ফেললো। বাবার দিকে চেয়ে কানে হাত দিয়ে ডলতে লাগলো। নিশাত ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো,

“নাস্তা খাইয়ে দিবো আব্বা?”

নাহওয়ান বাবার দিকে ছলছল নয়নে তাকিয়ে আছে এখনো। বাবা তাকে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো কেন? বিষয়টা বাচ্চা হৃদয়ে আঘাত এনেছে। নিশাত ছেলেকে মারওয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেঁটে মারওয়ানের কাছে গেলো। বললো,

“ছেলেকে ধরুন।”

মারওয়ান হামি দিয়ে বললো,

“পারবো না। কোলে নিতে আইলসেমি লাগছে।”

নিশাত বললো,

“আমার স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছে। আপনার এসব আলগা ঢংয়ের আলাপ অন্য কোথাও করবেন। আসছে ডায়লগ দিতে আইলসেমি লাগছে।”

বলেই ছেলেকে মারওয়ানের কোলে দিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেলো। নাহওয়ান মায়ের যাওয়ার দিকে চেয়ে মাথা ঘুরিয়ে বাবার দিকে চাইলো। মারওয়ানও তার দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। বাচ্চাটা অবুঝের মতো বাবার দিকে চেয়ে আছে। মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে রেখেই বললো,

“তুই যেভাবে ইনোসেন্ট মুখ করে থাকিস তুই তো এতো ইনোসেন্ট না পটলের বাচ্চা।”

বাচ্চাটা বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,

“পুটল কি?”

“জানি না। তোর সাথে রাগ করেছি।”

“লাগ কচ্চো?”

“হ্যাঁ।”

“কেনু?”

“তুই মাকে খুঁজিস শুধু, বাবাকে তোর কি দরকার?”

নাহওয়ান মাথা চুলকে বাবার শরীর বেয়ে উঠে ঘাড়ে মাথা ফেলে গলা জড়িয়ে ধরলো। মারওয়ান কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি খেলে গেলো তার। এটা তার বাচ্চা। ভেবেই জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। নাহওয়ান বাবার ছোঁয়া পেয়ে আরো সেটে গেলো। মারওয়ান ছেলেকে জড়িয়ে রেখেই বললো,

“এই বয়সেই ব্রিটিশ বুদ্ধি নিয়ে চলিস। কিভাবে বাপ, মাকে পটাতে হয় ভালো করে জানিস লিলিপুটের বাচ্চা।”

নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেঁসে দিলো। মারওয়ান ছেলের নাকে নাক ঘষে আদর করে দিলো।

_______

সকাল থেকেই ইহাব এবং ইমতিয়াজ ভুঁইয়া খুবই খোশমেজাজে আছে। গুরুত্বপূর্ণ খবর ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ইহাবের পছন্দকে হ্যাঁ জানিয়েছেন। ইহাব বাবাকে ঠিক কি বলে রাজি করিয়েছে সেটা অজানা সকলের। খবরটা শুনে ভুঁইয়া বাড়ির একমাত্র কন্যা ইনাবা ভুঁইয়া শহর থেকে ব্যাগপত্র সবকিছু নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। এসেই চিল্লাচিল্লি জুড়ে দিয়েছে সে। মায়ের কাছে গিয়ে বললো,

“আমার কি এই বাসায় কোনো গুরুত্ব নেই আম্মু? কিভাবে পারলে আমাকে ছাড়া ভাইয়ের জন্য পাত্রী পছন্দ করতে?”

উর্মি ভুঁইয়া গম্ভীর গলায় বললেন,

“এসব নিয়ে আমার সাথে উচ্চশব্দ করবে না। তোমার বাপ, ভাইকে জিজ্ঞেস করো গিয়ে। এসব সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। এসেছো রেস্ট নাও তবে খবরদার আমার সাথে এসব বিষয়ে কথা বলবে না। যাও হাত মুখ ধুয়ে রেস্ট নাও।”

বলেই পাশকাটিয়ে চলে গেলেন। ইনাবা হতবাক হলো কিছুটা। মায়ের এমন নির্লিপ্ততা তাকে ভাবাচ্ছে। সে দ্রুত গিয়ে বাবাকে বললো,

“পাপা কাহিনী কি? তুমি ফোন দিয়ে বললে ভাইয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাবে কিন্তু আম্মুর কোনো হেলদোল নেই কেন? ঘটনা কি?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া হতাশ ভঙ্গিতে বললেন,

“তোমার আম্মুর সাথে ইহাবের পাত্রী দেখা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে। যেই সেই কথা কাটাকাটি না একেবারে ভাংচুর করেছি। রাগ উঠেছিল প্রচুর। তোমার মায়ের সাথে তো চাইলেও রাগারাগি করতে পারিনা কিন্তু সেদিন মারাত্মক রাগ উঠে গিয়েছিল। কন্ট্রোল করতে পারিনি। সেইদিন থেকে এখনো একটা শব্দ আমার সাথে বলেনি তোমাদের আম্মু।”

ইহাব এবং ইনাবা উভয়ই হতাশ হলো। ইনাবা বাবার পাশে বসে বললো,

“এবার তুমি গেছো পাপা। তোমার ওরকম করার কি দরকার ছিল? আম্মুর রাগ সম্পর্কে তোমার ধারণা নেই? এখন কিভাবে আম্মুর রাগ ভাঙাবে দেখো?”

বলেই ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার গলা জড়িয়ে গালে চুমু দিয়ে উপরে চলে গেলো ব্যাগপত্র নিয়ে। ইহাব বাবার দিকে তাকিয়ে দুঃখী দুঃখী নজরে চেয়ে বললো,

“সো স্যাড পাপা।”

“তোমার জন্যই তো হলো এতো কিছু। তোমার প্ল্যানের কথা আগে জানলে নিশ্চয়ই আমি ভিমরুলের বাসায় ঢিল ছুড়তাম না।”

ইহাব মাথা নাড়িয়ে বাবাকে সহমত জানালো। স্বীকার করে নিলো দোষটা তারই। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন,

“মেয়ে দেখতে কবে যাবো?”

“খুব শীঘ্রই গেলে ভালো হয় পাপা। এখন বাকিটা তোমার মন মর্জি। মেয়ের আবার পাত্রের অভাব নেই। যেকোনো সময় বিয়ে হয়ে যেতে পারে তাই আগেভাগেই আকদটা করিয়ে ফেললে ভালো হতো।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া বললেন,

“আচ্ছা ব্যাপারটা দেখছি আমি।”

“হ্যাঁ পাপা। প্ল্যান অনুযায়ী আগাতে হবে। এমনভাবে সবকিছু করবে যেন কেউ ধরতে না পারে আমরা কোনো নাটক করছি।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ক্রুর হেঁসে বললেন,

“ওসব তোমাকে ভাবতে হবে না। নিশ্চিন্তে থাকো। সব সামলে নিবো। তাছাড়া চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে সম্বন্ধ যাচ্ছে কার সাধ্যি তা ফিরিয়ে দেয়।”

_____

নিশাত স্কুলে যাওয়ার পর ছেলেকে নিয়ে তৈরি হয়ে বাসা থেকে বের হলো মারওয়ান। নাহওয়ান বাবার গলা জড়িয়ে আছে। মারওয়ান একটা গোডাউনের মতো জায়গায় এসে দাঁড়ালো। আশেপাশে নজর বুলিয়ে মাস্ক ঠিকঠাক করে নিলো। নাহওয়ানকে নিয়েই গোডাউনের ভিতরে ঢুকে পড়লো। বেশ কিছুক্ষণ পর ধীর পায়ে হেঁটে গোডাউন থেকে বের হয়ে এলো। কোলে বাচ্চাটা ঘুমিয়ে আছে। মারওয়ান ছেলেকে ঢেকে ওখান থেকে চলে গেলো।

বাসায় এসে ছেলেকে বিছানায় রেখে কিছু কাগজ কলম নিয়ে বসলো মারওয়ান। অনেকক্ষণ ধরে কি যেন আঁকাবুকি করলো। তার চেহারায় অসম্ভব রহস্য খেলা করছে। চোখ দুটো সংকীর্ণ হয়ে আছে। চোখের পাতা আন্দোলিত হচ্ছে। তারপর একসময় তার চেহারা স্বাভাবিক হয়ে গেলো। সে চুপচাপ জিনিসপত্র গুছিয়ে গোপনীয় স্থানে সবকিছু রেখে দিলো।

ছেলেকে দেখে গোসল করতে চলে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ গোসল সেরে বের হলো। নাহওয়ান উঠে গেছে। উঠেই কাউকে না দেখতে পেয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছে। মারওয়ান ধীর পায়ে হেঁটে বললো,

“কি হলো?”

নাহওয়ান বাবার কণ্ঠ শুনে বিছানার উপর দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বললো,

“বাবা নাই।”

“এইতো বাবা।”

বলেই ছেলেকে কোলে নিলো। বাচ্চাটা বাবাকে পেয়ে কোলের মধ্যে গুটিয়ে গেলো। মারওয়ান গম্ভীর নয়নে চেয়ে আছে। কি যেন ভাবছে সে। বোঝা বড়ই মুশকিল। তাকে দেখলে যে কেউ অবাক হবে কারণ আগের মারওয়ানের সাথে এই মারওয়ানের বিস্তর ফারাক। সেই মারওয়ান ছেলের সাথে চঞ্চল আর এই মারওয়ান এতোটাই গম্ভীর যে মুখাবয়ব শক্ত কঠিন হয়ে আছে। নাহওয়ান বাবাকে ডাকলো,

“বাবা, বাবা।”

“জ্বিই।”

“কিডা লাগচে। কাবো।”

মারওয়ান ভাবনা থেকে বেরিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো,

“ভাত খাবি?”

নাহওয়ান ঘাড় নাড়িয়ে বললো,

“কাবো।”

ছেলের কথা শুনে মারওয়ান ভাবনাচিন্তা বাদ দিয়ে বললো,

“আগে গোসল করিয়ে দেই তারপর ভাত খাওয়াবো। চল।”

বলেই ছেলেকে নিয়ে গোসলে ঢুকলো। গোসল শেষে গায়ে বেবি লোশন মেখে দিয়ে ভাত বেড়ে নিলো। ছোট্ট ছোট্ট লোকমা তুলে খাইয়ে দিতে লাগলো। বাচ্চাটা পা ছড়িয়ে বসে খাচ্ছে চুপচাপ। মারওয়ান ছেলেকে খাইয়ে খেলনাপাতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিলো। বাচ্চাটা খেলনা পেয়ে খেলতে লাগলো। মারওয়ান কিছু সরঞ্জাম নিয়ে অন্যরুমে চলে গেলো।

দরজায় টোকা পড়ায় মারওয়ান কিছুটা হকচকালো। হাতের কাজ বন্ধ করে জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখলো। তারপর স্বাভাবিক হয়ে গেট খুলে দিলো। নিশাত দাঁড়িয়ে। নিশাত মারওয়ানকে দেখে কিছু বললো না এমনকি মারওয়ানও কোনো টু শব্দ করলো না। নিশাত চুপচাপ হেঁটে ঘরে ঢুকলো। বিরক্ত লাগছে তার সবকিছু। ব্যাগ রেখে স্কুলের পরীক্ষার খাতা টেবিলে রাখলো। মারওয়ান আজকে কিছু বলছে না। নিশাতও আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

নামাজ পড়ে দোয়া দুরুদ পড়ে উঠলো নিশাত। আজকে ঘরে কোনো আওয়াজ নেই। এরকম শান্ত কেন আজকে? তার ছানা আজকে কথা বলছে না তেমন। প্রতিদিন তো বাবা ছেলের কথোপকথনে ঘর মুখরিত থাকে আজকে এতো শান্ত কেন সবকিছু? মারওয়ানেরও সাড়া শব্দ নেই। নিশাত জায়নামাজ ভাঁজ করে পাশের রুমে গিয়ে দেখলো বাবা ছেলে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশাত আর ডাকলো না। খেয়েই ঘুমিয়েছে তার মানে। এসব ভেবে নিশাত খেয়ে নিলো। তারপর বিশ্রাম নিতে বিছানায় শুয়ে পড়লো। ইস্তেগফার, দরুদ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেলো।

আসরের আজানের মধুর কণ্ঠে ঘুম ভেঙে গেলো নিশাতের। এখন একটু ফ্রেশ লাগছে। মন খারাপ থাকলে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ বান্দার মন খারাপ খুব দ্রুতই ভ্যানিশ করে দেন বলে নিশাতের ধারণা। আজকে তার মন ভীষণ খারাপ ছিল। সংসার জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেজায় চিন্তিত ছিল সে। বাবা ফোন দিয়েছিল তাকে আজ।

বহুদিন পর বাবার ফোন পেয়ে নিশাত আপ্লুত হয়ে পড়েছিল। ফোন ধরতেই বাবার কণ্ঠস্বর শুনে জরজর করে কেঁদে দিয়েছিল সে। স্কুলের অফিস কক্ষে তখন কেউ ছিল না। বাবা নাসির উদ্দিন মেয়ের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছেন আজ। মেয়েকে আজও এই অলস, অকর্মা পুরুষের সংসার ছেড়ে আসতে বলেছেন। নিশাতকে সে পালতে পারবে বলে অনেক বুঝিয়েছেন। কিন্তু নিশাত কোনো প্রতিউত্তর করেনি। মায়ের সাথেও কথা বলেছে। তবে সবার এক কথা ছিল যদি মারওয়ান এরকমই থাকে তাহলে ঐ কাপুরুষের সংসার করার কোনো প্রয়োজন নেই।

নিশাত কিছু বলেনি শুধু শুনে গেছে। একটা ডিভোর্সি মেয়েকে এই সমাজ কি চোখে দেখে তা নিশাত ভালো করেই জানে। তাই তাদের কথায় সায় জানাতে পারিনি সে। আল্লাহ চাইলে মারওয়ান একদিন ভালো হবে। এটা তার দৃঢ় বিশ্বাস। ওই পুরুষটা আর যাইহোক তাকে কখনো আঘাত করেনি। তার ছেলের যত্ন করে, আগলে রাখে শুধু কাজই করতে আগ্রহী নয়। তার কাজের প্রতি প্রচুর অনিহা। এই অনিহার কারণ নিশাত জানে না। কেন তার এই অনাগ্রহ? কাজের প্রতি এতো বিতৃষ্ণা কেন এই পুরুষের?

নিশাত উঠে ওযু করে আসরের নামাজ পড়ে নিলো। পাশের রুমে গিয়ে দেখলো ছেলে, ছেলের বাপ কেউই বাসায় নেই। নিশাতের কপাল কুঁচকে গেলো। কোথায় গেছে এই সময়ে?

একটু পর দরজা খুলে মারওয়ান ঘরে ঢুকলো। বাচ্চার হাতে চিপস, চকলেট। নাহওয়ান মাকে দেখে হাতের চিপস, চকলেট দেখিয়ে মাথা নাড়িয়ে বললো,

“মুজা মুজা।”

নিশাত হেঁসে বললো,

“খান মজা।”

মারওয়ান ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই বাচ্চাটা সবকিছু নিয়ে অন্যরুমে দৌঁড়ে চলে গেলো। নিশাত মারওয়ানের দিকে ভ্রু ভাঁজ করে চাইলো। মারওয়ান নিশাতের চাহনি দেখে বললো,

“কি?”

“আপনাকে অস্বাভাবিক লাগছে আজকে।”

“কই? আমি ঠিক আছি। চোখে সমস্যা তোমার।”

“আমার চোখ তো মিথ্যা বলে না। আমার দৃঢ় সন্দেহ আপনার মনে কোনো কিছু চলছে সেটা অবশ্যই জটিল কিছু।”

মারওয়ান কিছুটা চমকালো। পরক্ষনেই স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,

“তোমার ভুল ধারণ এটা।”

“উহু, ঠিক ধারণা।”

মারওয়ান রেগে তাকিয়ে বললো,

“আজাইরা কথা বলবি না। রাগ উঠাস কেন সবসময়? যতই ভালো বিহেভ করতে চাই ততই মেজাজ গরম করিয়ে দিস।”

নিশাত মারওয়ানের এই কথায় টললো বলে মনে হয়না। হাতের জিনিসটা মারওয়ানের সামনে ধরে বললো,

“আপনার কাছে এসব কি করে?”

মারওয়ান জিনিসটি দেখে ঘেমে উঠলো। কাঁপা কণ্ঠে বললো,

“এটা কোথায় পেয়েছো?”

“আপনাকে আমার যথেষ্ট সন্দেহ হয়। এর আগেও আমি রুমে অস্বাভাবিক অনেক কিছুই দেখেছি। ওসব আমার বাসায় থাকার প্রশ্নই আসে না। আপনি কি করছেন লুকিয়ে লুকিয়ে সত্যি করে বলুন?”

মারওয়ান কিছুই বললো না। শান্ত কণ্ঠে বললো,

“এটা ছেলের জন্য এনেছি। ওর পিস্তল ভালো লাগে বলেছিল একদিন তাই আজকে একজন আর্টিস্টকে দিয়ে আঁকিয়ে এনেছি। এতো রিয়েক্ট করার কি আছে? এটা নাটক, সিনেমা না যে আমি বিরাট কিছু বের হবো। আমি অকর্মা অকর্মাই থাকবো। তবে তোমার যদি আমাকে নিয়ে উচ্চভিলাষী জল্পনা কল্পনা করার থাকে তাহলে যেকোনো কিছুই ভাবতে পারো। I don’t care.”

বলেই নিশাতের পাশ কেটে চলে গেলো। নিশাতের বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করলো না কিন্তু অবিশ্বাস করতেও ইচ্ছে হলো না। নিশাত তো ঘরেই থাকে স্কুল বাদে। কই মারওয়ানকে তো তেমন অস্বাভাবিক লাগে নি কখনো? সারক্ষণ রুমে বসে সিগারেট টানে। তবে রাতে বাইরে বেরোয় কয়েক ঘণ্টার জন্য এটুকু সময়ের মধ্যে কিছু করা সম্ভব? নিশাত জানে পার্ট টাইম যে জব করতো ওটা ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু ওটা ছেড়ে আবার কোনো কাজ ধরেছে কিনা সেটা নিশাত জানে না। নিশাতকে কিছুই বলেনি। কই ঘরের কোনো সওদাপাতির খরচ, বাসা ভাড়া কিছুই তো দেয়না। সিগারেট, ছেলের চিপস, চকলেটের খরচ আর বাসা ভাড়া তো শশুর আব্বাই দেন। কাজ যদি করতো তাহলে নিশ্চয়ই এসবের খরচ আব্বার কাছ থেকে নিতো না? ধুর উল্টাপাল্টা বেশিই ভেবে ফেলেছে সে। হয়তবা ছেলের জন্যই এটা এনেছে। তাই বেশি কিছু আর না ভেবে এটা টেবিলের উপর ভাঁজ করে রেখে দিলো। এসব নিয়ে ভাবার সময় তার নেই। আজাইরা চিন্তাভাবনা তার যত্তসব!

_______

—–

সকাল সকাল মাহবুব আলমের বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ ভুঁইয়া। খবরটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নিলো না। মাহাবুব আলম কথা বলতে ভুলে গেছেন প্রায়। সে উঠোনের মাঝখানে চেয়ারে বসা ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার দিকে থতমত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন। মাহদী, মাহফুজ একপাশে বিব্রত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মায়মুনা বেগম ঘরের পর্দার ফাঁক দিয়ে সব কিছু দেখছেন। মানহা শক্ত হয়ে বসে আছে।

চলবে….

(আসসালামু আলাইকুম। দেরি করার জন্য দুঃখিত। আজকে বড় পর্ব দিলাম। মন্তব্য করবেন সবাই।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply