#ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
#পর্ব_১১
তাজরীন ফাতিহা
সকাল সকাল বাজার করে এনেছে নিশাত। ঘামে শরীর জবজবে হয়ে গেছে তার। এসেই ফ্যান ছেড়ে ফ্লোরে বাজারের সকল সদাইপাতি ঢেলে নিলো এক এক করে। এক কেজি মুরগি, আলু, পিঁয়াজ, কিছু শাকসবজি এগুলোই বাজার করেছে আজ। কয়েকদিন চলে যাবে এতে। ফ্লোরে বসে মাসের বাজারের হিসেবটা করে ফেললো সে। সবকিছু গুছিয়ে সকালের নাস্তা বানাতে লেগে গেলো নিশাত। যেহেতু শুক্রবারের দিন তাই আগেই সবকিছুর জোগাড় করে রান্না বসাতে হবে। শুক্রবারের আমল করতে হবে। সপ্তাহের এই দিনটায় কুরআন তিলাওয়াত, দুরুদ পাঠ বেশি বেশি করে নিশাত।
কালকের রাতের এক্সট্রা ভাত ছিল। সেটাকে ডিম, সবজি দিয়ে ভেজে নামালো নিশাত। ছেলেকে ঘুম থেকে জাগানোর জন্য রুমে গেলো। রুমে গিয়ে দেখলো বাবা ছেলে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। মাঝে মাঝে এই পুরুষটির দিকে চাইলে নিশাতের বড় মায়া হয়। এতো পরিমাণে অলস এই পৃথিবীতে কেউ আছে বলে মনে হয়না। কাজ করার প্রতি এতো অনাগ্রহ কেন এই লোকের? নিশাত ভেবে কোনো কূলকিনারা পায় না। ঘুমন্ত ছেলের কপালে চুমু দিয়ে নিশাত ডেকে উঠলো,
“আব্বা উঠবেন না। উঠুন তাড়াতাড়ি। ক্ষুধা লাগেনি বাবা? উঠে পড়ুন আমার মানিক।”
নাহওয়ান মোড়ামোড়ি করে চোখ পিটপিট করে খুললো। নিশাত তা দেখে বললো,
“আমার ছানার ঘুম ভেঙেছে?”
নাহওয়ান চোখমুখ কচলে গড়াগড়ি খেয়ে বাবার কোলের উপর হাত, পা উঠিয়ে দিলো। নিশাত বললো,
“আমার আব্বা কি আরও ঘুমাবে?”
“এট্টু এট্টু।”
“আরও ঘুমাবেন? আজকে শুক্রবার। আল্লাহর ঘরে যাবেন না?”
নাহওয়ান চোখ আবারও কচলালো। তারপর মৃদুস্বরে বললো,
“যাবো। বাবা উটে নাই।”
“না তোমার বাবাকে ওঠাও।”
নাহওয়ান মোড়ামোড়ি করে বাবার গায়ের উপরে উঠে ডাকলো,
“বাবা উটো। সুকলোবাল আচকে। উটো।”
মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বললো,
“ঘোড়ার আন্ডা। জ্বালাস না তো। ঘুমা। আমিও ঘুমাই।”
“আচকে আল্লাহর কাচে যাবে না?”
নিশাত মন ভরে তার ছানাকে দেখে। আল্লাহ তার সন্তানকে অনেক বড় বানাক। নাহওয়ান বাবার গায়ের উপর একবার উঠে আবার নামে। এটা তার কাছে একটা খেলা। মারওয়ান বিরক্ত হয়ে চোখ খুললো। নাহওয়ান বাবাকে চোখ খুলতে দেখে ফিচফিচ করে হেঁসে দিলো। মারওয়ান ছেলেকে চ্যাংদোলা করে তার কোলের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেললো। নাহওয়ান বাবার কোল থেকে বের হওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো। মারওয়ান বললো,
“আজকে তোকে বের হতে দিবো না আলুর বাচ্চা। থাক এখানে।”
নাহওয়ান হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে লাগলো। নিশাত বললো,
“ছাড়ুন আমার ছেলেকে। ওকে এরকম লেপ্টে ধরেছেন কেন? ব্যথা পাচ্ছে ও।”
মারওয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,
“আমার ঘুম ভাঙতে তুই শিখিয়েছিস? লেপ্টে ধরা তো তোকে দরকার। আয় ধরি।”
নিশাত মেজাজ খারাপ করে উঠে চলে গেলো। এখন কথা বাড়ালেই ছেলের সামনে উল্টাপাল্টা কথা বলে মেজাজ আরও খারাপ করে ফেলবে। তখন বিরাট একটা ঝগড়া বেঁধে যাবে তাই আগেভাগেই প্রস্থান করলো সে। মারওয়ান নিজের ঝাপটে ধরা হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো একজোড়া ছোট্ট ছোট্ট গোল গোল মায়াবী চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। মারওয়ান বললো,
“বের হতে চাস?”
নাহওয়ান মাথা নাড়ালো। মারওয়ান বললো,
“আমার পিঠের উপর দাঁড়িয়ে পিঠটা মেসেজ করে দে তাহলে।”
বলেই বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিলো মারওয়ান। নাহওয়ান ছাড়া পেয়ে বাবার পিঠের উপর দাঁড়ালো। লাফিয়ে লাফিয়ে পাড়া দিতে লাগলো। মারওয়ান আরামে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। নাহওয়ান কতক্ষণ লাফিয়ে ক্লান্ত হয়ে বিছনায় বাবার পাশে বসলো। বাবাকে আবার ঘুমিয়ে যেতে দেখে আর ডাকলো না। ছোট্ট শরীরটা নিয়ে আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নামলো। রান্নাঘরে মাকে কাজ করতে দেখে মাকে ডেকে উঠলো। নিশাত সামনে তাকিয়েই বললো,
“আব্বা উঠেছেন। আসুন এখানে। আপনার আব্বা কই?”
“গুমায়।”
“আবারও ঘুমাচ্ছে। এই লোক এতো ঘুমায় কিভাবে?”
শেষের কথাটুকু মিনমিন করে বললো। তারপর ছেলেকে কোলে নিয়ে রুমে গিয়ে মারওয়ানকে ঝাড়া দিয়ে বললো,
“এই উঠুন। তাড়াতাড়ি উঠুন।”
অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর মারওয়ান চোখ খুললো।বললো,
“আবার কি?”
“উঠুন তাড়াতাড়ি। আজকে শুক্রবার শুনে বেশি বেশি আলসেমি করছেন তাই না?”
“ধুরু ঘুমাতে দে। শান্তি নাই, শান্তি নাই কোথাও শান্তি নাই লিলিপুট আর লিলিপুটের বাচ্চার যন্ত্রণায়।”
নিশাত কটমট করতে করতে বললো,
“উঠুন। আপনি এখন না উঠলে আমি সারাক্ষণ ডাকতে থাকবো নাহয় ছেলেকে রেখে যাবো আপনাকে জ্বালিয়ে কয়লা করে দিতে।”
মারওয়ান এক চোখ খুলে নিশাতকে একবার দেখে নিশাতের কোলে হা হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ঐ কবুতরের বাচ্চা তুই আমাকে জ্বালাবি?”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানিয়ে মায়ের ঘাড়ে মুখ লুকালো। মারওয়ান ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে নিশাতের দিকে তাকালো। নিশাত বললো,
“ওকে আবারও উল্টাপাল্টা নামে ডাকলেন কেন?”
“কবুতরের বাচ্চা মোটেও উল্টাপাল্টা নাম না। কি আদুরে সম্বোধন! তুই কি বুঝবি এসবের?”
নিশাত আর কথা না বাড়িয়ে বললো,
“প্লিজ একটু উঠুন। আমার শরীর ভালো লাগছে না। বাচ্চাটার হাতমুখ ধুইয়ে নিজেও মুখ ধুয়ে খাবার খান। দয়া করে আর কথা বলাবেন না। ঘরের সমস্ত কাজ আমার করতে হয়। বাজার করা থেকে শুরু করে রান্নাবান্না, ঘর গোছানো, স্কুল করানো। বিশ্বাস করুন প্রচুর হাঁপিয়ে উঠি। আমারও বিশ্রাম করতে মন চায়, সারাদিন কাজকর্ম ফেলে ঘুমিয়ে থাকতে মন চায় কিন্তু ঐযে দায়িত্ব শব্দটা আমাকে ঘুমাতে দেয়না কিন্তু আপনি দিব্যি সবকিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ঘুমান। অথচ বিয়ে দুজনের সম্মতিতেই হয়েছিল।”
কথাটুকু বলে নিশাত ছেলেকে নিয়ে প্রস্থান করলো। মারওয়ান কিছু বলার মতো পেলো না। আসলেই তো নিশাত যা বলে গেলো একটুও মিথ্যা ছিল না এতে। বিছানা থেকে উঠে ছেলেকে নিয়ে আসলো। তারপর ব্রাশ করিয়ে জামা কাপড় বদলিয়ে দিলো। নিজেও মুখ হাত ধুলো। সকালের নাস্তা ছেলেকে খাইয়ে তারপর সে খেলো। সারা সকাল নিশাতকে আর টু শব্দ করতে হয়নি। সব আগ বাড়িয়ে মারওয়ান নিজেই করলো।
______
মাহদী আজকে বাজার থেকে পোলাও, গরুর গোশত কিনে এনেছে। সপ্তাহে একটা এই একটা দিন নিজের হাতে বাজার করার সুযোগ পায় সে। অন্যান্য দিন বিভিন্ন কাজে থাকে। যেহেতু কৃষি উদ্যোক্তা তাই এদিক সেদিক তাকে সময় দিতে হয়। বাজার মাকে দেখিয়ে বললো,
“মা আজকে গোশত কষা আর পোলাও করো। অনেকদিন ধরে খেতে ইচ্ছে করছে।”
মায়মুনা বেগম বললেন,
“এতো মজাদার খাবার তোরা খাবি আমার বড় মনিকটা তো খেতে পারবে না। হ্যাঁরে বাবা ওকে একটা ফোন দেনা। ওকেও আসতে বলি।”
মাহদী বললো,
“সব কথায় ভাইয়াকে না টানলেই নয় মা? তোমার বড় মানিক ফোন ধরলে তারপর তাকে আসতে বোলো। এতদিন বলে কোয়েও আনাতে পারো নি এখন তোমার পোলাও গোশত খাওয়ার জন্য তিনি এসে বসে থাকবেন। সহজ সরল হওয়া ভালো কিন্তু এতো সহজ সরল হওয়া ভালো না আম্মা।”
বলেই মানহাকে হাক ছেড়ে ডাকতে ডাকতে মুখ হাত ধুতে কলপাড়ে গেলো। মানহা ভাইয়ের ডাক শুনে গামছা নিয়ে কলপাড়ে গেলো। তারপর বললো,
“ভাইয়া তোরা বিয়ে করবি কবে? আমাকে খালি খাটাস তুই আর ছোট ভাইয়া।”
মাহদী বললো,
“আগে তোকে বিদায় করি তারপর আমরা করবো। ভালো করে কল চাপ। গায়ে শক্তি নাই?”
মানহা মুখ ফুলিয়ে বললো,
“তোর কল তুই চাপ। আমি তোর কামলা লাগি? এমন চোখ রাঙিয়ে কথা বলিস কেন?”
“একশোবার বলবো। পাজি, বদ কাজ করার বেলায় ফাকিবাজি খালি। আমার পা’টা ওই ডলোনি দিয়ে ডলে দে। সওয়াব কামা।”
মাহফুজ কোথাথেকে এসে যেন বললো,
“আমারটাও ডলে দে।”
মানহা ফোঁসফোঁস করতে করতে বললো,
“পারবো না। নিজেরটা নিজেরা ডল।”
মাহফুজ চোখ রাঙিয়ে বললো,
“ডলবি না তাইনা। দেখিস স্বামীর গুতা খেতে খেতে জীবন পার হয়ে যাবে তোর। বড়দের সেবা করবি তানা করে চটাং চটাং করছিস।”
মানহা চোখমুখ ফুলিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো। মাহদী বললো,
“এভাবে বললি কেন? ও ছোট। আমাদের আদরের। মাঝে মাঝে ওকে ক্ষেপালেও ও মনে কষ্ট পায় এমন কিছু বলিনি। তুই এভাবে বললি কেন? কষ্ট পেয়েছে না?”
মাহফুজ বললো,
“মেজো এসব ওর নাটক। একটু পরই দেখবে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে হাজির হয়ে যাবে। তাছাড়া আমাদের কাউকে সম্মান দেয়না। ডিরেক্ট তুই করে বলে কত বড় বেত্তমিজ ভেবেছো একবার।”
মাহদী বললো,
“থাক বাদ দে। একমাত্র বোন। একটু আধটু দুষ্টুমি করবেই। মুখ ধুয়ে যা।”
_______
গরুর গোশত কষানো হলে মানহা বাটি নিয়ে বললো,
“আম্মা আমাকে একটু দাও। দেখি লবণ ঠিক হলো কিনা?”
মায়মুনা বেগম বাটিতে একটুকরো গোশত উঠিয়ে দিলেন। মানহা খেতে ধরতেই মাহফুজ কোত্থেকে এসে বাজের মতো খাবলে গোশতের টুকরো হাতে নিলো। মানহা চিল্লিয়ে বললো,
“তুই পাতিল থেকে নিতে পারতি না? আমারটা নিলি কেন? দে আমার গোশত ফেরত দে।”
বলেই মাহফুজকে তাড়া করতে লাগলো। মাহফুজ গোশতের টুকরো মুখে পুড়ে গোশত আবার বের করে বললো,
“নে খা।”
মানহা ভাইয়ের হাতের বাজুতে বারি দিয়ে বললো,
“গিদর, খবিশ।”
মাহফুজ হেঁসে গোশত চিবোতে লাগলো। মানহা আরেক টুকরো গোশত ও চর্বি নিয়ে অন্যপাশে চলে গেলো।
______
নাহওনাকে পাঞ্জাবি পড়িয়ে চুল আঁচড়ে দিলো নিশাত। আতর পাঞ্জাবিতে ডলে দিলো। মারওয়ান গোসল করে বের হলো মাত্র। নিশাত বললো,
“দ্রুত করুন। খুতবা শেষ হলো বলে। নামাজ শুরু হয়ে যাবে। এতো সময় লাগান কেন সবকিছুতে। সপ্তাহের একটা দিন নামাজে যান তাও এতো আলসেমি?”
মারওয়ান বিছানা থেকে পাঞ্জাবি নিয়ে পড়ে নিলো। নিশাত নাহওয়ানের হাতে আতর দিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করলো বাবাকে দিতে। নাহওয়ান আতর নিয়ে বাবার পা জড়িয়ে ধরলো। মারওয়ান ছেলেকে বললো,
“কিরে ইঁদুরের মতো পা ধরে আছিস কেন?”
নাহওয়ান হাত এগিয়ে দিয়ে বললো,
“ইটা নাও।”
মারওয়ান আতর নিয়ে পাঞ্জাবিতে মাখলো। তারপর জায়নামাজ নিয়ে ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বের হলো। নাহওয়ান মাকে ডেকে বললো,
“মা যাই। আল্লাহর কাচে যাই।”
নিশাত মারওয়ানকে বললো,
“একটু ঝুঁকে দাড়ান।”
মারওয়ান “লিলিপুট” বলে একটু ঝুঁকলো। নিশাত ছেলেকে আদর করে বললো,
“যান আব্বা। আল্লাহ আপনাকে পুরস্কার দিবে।”
“আচ্চা।”
নিশাত দোয়া দুরুদ পড়ে উভয়কে ফুঁ দিয়ে দিলো।
______
—-
নামাজ পড়ে এসে খেতে বসেছে মারওয়ান। নিশাত আজকে চিকেন কারী, শুঁটকি ভুনা করেছে। নাহওয়ান মায়ের কোলে বসে আছে। নিশাত মুরগির টুকরো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছেলের মুখে দিলো। নাহওয়ান মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে খেতে লাগলো। নিশাত বললো,
“আব্বা হাড্ডি খাবেন?”
“কাবো।”
নিশাত গোশত ছাড়িয়ে হাড় আলাদা করে রাখলো। নাহওয়ান বাবার প্লেটের হাড্ডির দিকে তাকিয়ে আছে। মারওয়ান তা দেখে বললো,
“ঐ তুই আমারটার দিকে নজর দিচ্ছিস কেন? এটা আমি খাবো।”
নাহওয়ান হেঁসে বললো,
“আমি আমি।”
“তোর গুলো আছে না। ওগুলো খা।”
নাহওয়ান মায়ের কোল থেকে নেমে বাবার প্লেটে থাবা বসিয়ে দিলো। মারওয়ান চোখ বড় বড় করে বললো,
“সর্বনাশ আসল জায়গায় হাত দিয়ে দিয়েছে। কি বুদ্ধি এই পন্ডিতের! ছাড় আমার হাড্ডি।”
রাতারাতি বাবা ছেলের লড়াই লেগে গেছে হাড্ডি নিয়ে। সবসময় হাড্ডি নিয়ে বাবা ছেলের যুদ্ধ লেগে যায়। নিশাত ভালোই ফেসেছে। সে কপালে হাত দিয়ে বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। বাপ, বেটা উভয়েরই হাড্ডি পছন্দ। কেউ কাউকে দিতে রাজি না। এরকম কতক্ষণ খাবলাখাবলি চলবে তারপর মারওয়ান পরাজিত ভঙ্গিতে হাড্ডি দিয়ে দিবে। বাচ্চা ছেলের সাথে এরকম করতে হবে কেন এই আধবুড়োর। বুড়ো বেটার লেদা বাচ্চার মতো কার্যক্রম।
চলবে…
(আসসালামু আলাইকুম। দেরি করে দেয়ার জন্য দুঃখিত। পর্বটি কেমন লেগেছে? মন্তব্যের আশা করছি।)
#ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
#পর্ব_১২
তাজরীন ফাতিহা
উর্মি ভুঁইয়া বাড়ির সামনের লনে বসে বই পড়ছেন এবং চা খাচ্ছেন। অবসর পেলেই তিনি বইয়ের মধ্যে ডুবে যান প্রায়। খুবই মনোযোগ দিয়ে যখন বই পড়ছিলেন তখন সেখানে ইহাব পরিপাটি হয়ে হাতে বাইকের চাবি নিয়ে মায়ের পাশে বসলো। উর্মি ভুঁইয়া ছেলের উপস্থিতি টের পেলেন না। তিনি বইয়ের গভীরে একেবারে ডুবে রয়েছেন। ইহাব মাকে বইয়ের পাতায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করতে দেখে ডেকে উঠলো,
“আম্মু, ও আম্মু।”
উর্মি ভুঁইয়া বইয়ে চোখ রেখেই বললেন,
“কি দরকার? দ্রুত বলে যেখানে যাচ্ছিলে যাও।”
ইহাব বললো,
“কোথাও যাচ্ছিলাম জানলে কিভাবে? বইয়ের মধ্যেই তো ডুবে আছো।”
উর্মি ভুঁইয়া বললেন,
“সেটা জেনে তোমার কাজ কি? তোমরা বাপ, ছেলে আমার সামনে চোরের মতো হয়ে থাকো অথচ গ্রামের মানুষের সামনে বাঘ এর কারণ আগে বলবে তারপর বলছি কিভাবে জানলাম।”
বলেই বইয়ের একটা পৃষ্ঠা ভাঁজ করে বইটি বন্ধ করলেন। তারপর চশমা খুলে চারপাশের গাছগাছালি, প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। এরপর চায়ের ফ্ল্যাক্স থেকে চা ঢেলে ছেলের দিকে চায়ের কাপ ঠেলে দিলেন। ইহাব ঢোঁক গিলে চায়ের কাপ হাতে নিলো। মা সবকিছু কিভাবে জেনে যায় সেটাই তার মাথায় ঢোকে না। উর্মি ভুঁইয়া বললেন,
“কি ভাবছো? মনে মনে ফন্দি করে লাভ নেই। সোজাসাপ্টা বলো।”
ইহাব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো,
“এটা তোমার ভুল ধারণা আম্মু। আমরা নরমাল থাকি অলওয়েজ।”
“ভুল হলে তো ভালোই। কিছু বলতে চাও?”
“নাহ। এমনিতেই তোমার পাশে বসতে ইচ্ছে হলো।”
উর্মি ভুঁইয়া চায়ের কাপে আবারও চুমুক দিয়ে ছেলের দিকে চাইলেন। তারপর বললেন,
“তোমার চোখ তো ভিন্ন কথা বলছে।”
ইহাব ইতস্তত করতে করতে বললো,
“আমার পছন্দের মেয়ে সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলে না আম্মু?”
উর্মি ভুঁইয়া চায়ের কাপ রেখে ছেলের বিপরীত পাশের চেয়ারে বসলেন। ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এবার বলো।”
ইহাব মাকে অন্য চেয়ারে বসতে দেখে বললো,
“ওপাশে গেলে যে আম্মু?”
“আই টু আই কন্ট্রাক্ট করতে। যেন কথাটা সহজে আয়ত্ত করতে পারি। আর এমনিতেও যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা আই টু আই হলে অপর পাশের মানুষটি কথাটা ঠিক কি অর্থে বললো তাও সহজে ক্যাপচার করা যায়।”
ইহাবের হঠাৎ করেই গরম লাগতে শুরু করে করেছে। আচমকা কথার তাল হারিয়ে ফেললো যেন। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হবে ভেবে তার ইতস্ততভাব আরও বেড়ে গেলো। যদি তার পরিকল্পনা আম্মু ধরে ফেলে তাহলে সবকিছু ভেস্তে যাবে। উর্মি ভুঁইয়া চোখ সরু করে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি গূঢ় স্বরে বললেন,
“Any problem?”
“No, no problem।”
“এবার বলো তোমার পছন্দের মেয়েটি সম্পর্কে?”
“একটা কাজে যাচ্ছি আম্মু। বাসায় এসে বলবো।”
বলেই ইহাব চেয়ার ছেড়ে উঠতে নিলে উর্মি ভুঁইয়া বলে উঠলেন,
“উহু, চেয়ারে বসো। এখন শুনতে চাচ্ছি এখনই বলবে। তোমার জন্য সারাদিন অপেক্ষা করার সময় আমার নেই। If you want to say it, say it now; otherwise, I will never listen to you again.”
এই কথার পরে ইহাবের বলার আর কিছু থাকে না। এখন মাকে না বললে আর কোনোদিনও যে এটা শুনবে না সেটা ইহাব খুব ভালো করেই জানে। ইহাব শক্ত হয়ে চেয়ারে বসে গ্লাসে পানি ঢেলে খেলো। তারপর জোরে শ্বাস টেনে রোবটিক গলায় বললো,
“আসলে আম্মু, মাহাবুব আংকেলের মেয়েকে আমার ভীষণ পছন্দ।”
উর্মি ভুঁইয়া ছেলের দিকে অবিশ্বাস্য নজরে চেয়ে আছেন। তিনি হতভম্ব গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“Are you joking?”
“No, not joking. I’m serious.”
উর্মি ভুঁইয়া এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না ছেলের কথা। কিভাবে সম্ভব? উনি তটস্থ ভঙ্গিতে বললেন,
“তোমার পাপা জানে?”
ইহাব মুখ নিচু করে বললো,
“না।”
উর্মি ভুঁইয়া বললেন,
“তুমি কি জানতে না এই সম্পর্ক তোমার বাবা কোনোদিনও মেনে নিবে না? এমনকি তুমি হঠাৎ করে ধনী ফ্যামিলি ছেড়ে ওই ফ্যামিলির মেয়েকে পছন্দ করতে কেন গেলে? তোমার বন্ধু গ্রামে এসেছে?”
ইহাবের চোয়াল শক্ত হলো। মাকে রাজি করাতেই হবে। মা রাজি না হলে তার কোনো পরিকল্পনা সফল হবার নয়। ইহাব মায়ের চেয়ারের পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসলো। তারপর খুব সফটলি বললো,
“আম্মু, প্লিজ পাপাকে রাজি করানোর দায়িত্ব তোমার। কিভাবে পছন্দ হলো জানি না তবে তাকে ভালো লেগেছে।”
উর্মি ভুঁইয়া বললেন,
“এই কথা জানলে তোমার পাপা একটা খুনাখুনি বাঁধিয়ে ফেলবে। ওদের স্ট্যাটাসের সাথে আমাদের স্ট্যাটাস যাবে না বলে নানা হাঙ্গামা করবে।”
“তুমি আছো না। পাপা কিচ্ছু করবে না। প্লিজ আম্মু, প্লিজ।”
খুব অনুনয় করে বললো ইহাব। উর্মি ভুঁইয়া বিভ্রান্ত হলেন মনে হলো। তার হিসেব কিছুতেই মিলছে না। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার বন্ধু বাড়িতে এসেছে? তার কোনো খোঁজ পেয়েছো? কথা হয় তোমার সাথে? কি কারণে গ্রাম ছেড়েছে এই বিষয়ে কিছু জানো?”
ইহাব উত্তর দিলো না। শুধু তার চোখের সাদা অংশটুকু লাল হয়ে উঠলো।
_______
—–
মানহা বই নিয়ে বসেছে। ছাত্রী হিসেবে মোটামুটি ভালোই সে। মায়মুনা বেগমের ডাকে বই বন্ধ করে উঠোনে দৌঁড় দিলো। মাকে উঠোন ঝাড়ু দিতে দেখে বললো,
“জ্বি মা।”
মায়মুনা বেগম বললেন,
“উঠোনটা ঝাড়ু দে। আমি তোর মেজো ভাইকে ভাত দিয়ে আসি।”
“তুমি এই হাঁটুর ব্যথা নিয়ে ভাত দিতে যাবে? মেজো ভাইয়া আজকে খেতে আসবে না?”
“আসলে তো এতক্ষণে এসে পড়তো। হয়তবা কাজের চাপে আছে। শুনেছি ঢাকা থেকে “কৃষি সম্প্রসারণ প্রযুক্তি” থেকে লোক এসেছে। মনে হয় তাদের সাথে আলোচনা করছে। রাত হবে সম্ভবত। তাই খাবারটা দিয়ে আসি ঠান্ডা হওয়ার আগে।”
“আচ্ছা আমিই যাচ্ছি। তোমার যেতে হবে না।”
“তুই যাবি? একা যেতে পারবি? তোকে ছাড়তে সাহস পাচ্ছি না। রাস্তা এই ভর দুপুরে এমনিতেই ফাঁকা থাকে।”
“আরে ভয় পেয়ো নাতো। বোরকা পড়ে এক দৌঁড়ে খাবার দিয়ে চলে আসবো।”
মায়মুনা বেগম তারপরও কেমন যেন আগ্রহ পেলেন না। যুবতি মেয়ে। একলা অতখানি পথ যাবে? বিপদ আপদের এনিতেই রাখ ঢাক নেই। চারদিকে যে পরিমাণে খারাপ খবর শোনা যায় তার বুকে কামড় দিয়ে উঠলো। তিনি নিজেও মেয়ের সাথে বোরকা পড়ে নিলেন। মানহা জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি বোরকা পড়লে যে? আমি যাচ্ছি তো।”
“আরে তোর বাবা ঘুমোচ্ছে নাহলে তাকেই পাঠাতাম। তোকে একলা ছাড়তে ভয় করছে আমার। চল যাই।”
মানহা আর কিছু বললো না। মাকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। দুই মা, মেয়ে গল্প করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে সামনে। পথিমধ্যে ইহাব বাইক থামিয়ে মায়মুনা বেগমকে সালাম দিলো। মানহা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে মায়ের দিকে সেটে রইলো। ইহাব এক পলক সেদিকে চেয়ে মায়মুনা বেগমের দিকে তাকালো। মায়মুনা বেগম সালামের জবাব দিয়ে বললেন,
“কিছু বলবে বাবা?”
“না আন্টি, আপনাদের দেখে থামলাম। কোথায় যাচ্ছেন এই ভর দুপুরে?”
ইতোমধ্যে পাঁচটি বাইক এসে ইহাবের বাইকের পিছনে থামলো। বাইক পাঁচটি ইহাবের বন্ধুদের। মানহা প্রচণ্ড অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। মায়মুনা বেগমও বিব্রত হলেন। বললেন,
“বাবা তোমরা কোথাও যাচ্ছিলে মনে হয়। যাও। আমরা মাহদীর কাছে যাচ্ছিলাম খাবার দিতে।”
“আপনি আমার কাছে দিন। আমি দিয়ে আসবো। আপনারা বাসায় চলে যান। জনমানবহীন এখানে আপনাদের জন্য সেইফ না। আশা করি বুঝেছেন?”
মানহার দিকে তাকিয়ে কথাটুকু বলে থামলো। মায়মুনা বেগম কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ইহাবের কাছে খাবারটা দিতে তিনি সাহস পাচ্ছেন না। ইহাব সেটা বুঝতে পেরে মায়মুনা বেগমকে আশ্বস্ত করে বললো,
“আগের কথা ভুলে যান। আমিও মনে রাখি নি। আপনারাও মনে না রাখলে খুশি হবো। ভরসা করে দিতে পারেন। খাবারটা আপনার ছেলের হাতেই পৌঁছুবে।”
মায়মুনা বেগম কাঁপা হাতে টিফিন ক্যারিয়ারটা ইহাবের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ইহাব মুচকি হেঁসে নিলো। মানহা মাকে খামচে ধরে দিতে নিষেধ করলো কিন্তু তার আগেই ইহাবের হাতের করতলে টিফিন ক্যারিয়ারের হাতল ঝুলছে। ইহাব মানহার দিকে তাকিয়ে বললো,
“আপনার আম্মুকে নিয়ে বাসায় যান। মায়ের হাত খামচে লাভ নেই। টিফিন ক্যারিয়ার নিশ্চয়ই আমি চুরি করবো না, করলে বিরাট কিছুই করবো। সামান্য টিফিন ক্যারিয়ার আমার চাহিদা নয়।”
মানহা মুখ কঠিন করে মাকে টেনে বাড়ির উদ্দেশ্যে উল্টো ঘুরে হেঁটে চলে গেলো। ইহাব মুখ থেকে হাসি সরিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বাইকে বসলো। সাব্বির, পল্লব, আসিম, মুহিব ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ। একমাত্র হাসান টিফিন ক্যারিয়ারটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার শয়নে স্বপনে একমাত্র খাবার ঘোরে। সাব্বির বললো,
“এই তাহলে তোর কান? মাথাটা তাহলে…”
ইহাব চোখ রাঙিয়ে চাইলো।
______
—-
নিশাত আজকে ঘরের প্রয়োজনীয় কিছু কিনতে মারওয়ানকে বলে এসেছিল। টাকাও দিয়ে এসেছে। কে জানে ভাদাইম্মাটা কিনেছে কিনা? স্কুলে আজকে প্রোগ্রাম ছিল। বিকেল চারটা বাজে এখন। অনেক বেলা হয়ে গেছে। চারপাশ জনশূন্য প্রায়। নিশাতের কিছুটা ভয় লাগছে। কিছুদূর হাঁটতেই তিনজন বখাটে ছেলেকে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে দেখলো। নিশাত চুপচাপ পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় একজন বলে উঠলো,
“আমগো এলাকার বিয়াত্তা কড়া মাল!”
নিশাতের গা গুলিয়ে বমি চলে আসলো এই নোংরা কুরুচিপূর্ণ কথায়। দ্রুত কদম ফেলে প্রস্থান করতে নিলেই কারো শক্ত হাত তাকে থামিয়ে দিলো। নিশাত চোখ বন্ধ করে ব্যাগ দিয়ে জোরে বারি দিলো হাতে।
“হ্যাঁ আমাকেই মারতে পারবি। জীবনে শুধু আমার সাথেই পেরেছিস। ওদের চোপা বরাবর কয়েকটা লাগিয়ে আসতে পারিস নি?”
নিশাত মারওয়ানের কঠিন কণ্ঠ শুনে চোখ খুললো। মারওয়ানকে ওদের দিকে চোখ মুখ লাল করে তাকাতে দেখে বললো,
“চলুন বাসায়।”
“ছেলেকে ধর।”
বলেই ছেলেকে এগিয়ে দিলো নিশাতের দিকে। নিশাত কোলে তুলে নিলো ছেলেকে। মারওয়ান হাতের হ্যাঙ্গার একত্র করে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। ছেলে গুলো মারওয়ানকে দেখে কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না। মারওয়ান বললো,
“কি বলছিলি?”
“কেন রে? তুই জেনে কি করবি? তোর মতো বেডার কপালে এতো মাখনের মতো কর্মঠ বউ কিভাবে মিললো কে জানে?”
আরেকজন তাল দিয়ে বললো,
“ভাদাইম্মার রাজকপাল। বউরে বোরকা পড়াইয়া আবার আকাম কুকাম করায় কিনা কে জানে? এসব লাইনে তো আবার টেকা বেশি। নইলে ঢাকা শহরের মতো এইখানে এহনও আছে কেমনে? শা*লা… “
ব্যাস আর কিছুই বলতে পারলো না। খালি চপাৎ চপাৎ আওয়াজ এবং চিল্লানোর শব্দই শোনা গেলো বিগত আধা ঘণ্টা। সবগুলো হ্যাঙ্গার ভেঙে রাস্তার উপর পড়ে আছে। নিশাত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। কোলে নাহওয়ানকে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। থরথর করে কাঁপছে তার পুরো শরীর। মারওয়ানকে সে কখনোই এতো রাগান্বিত হতে দেখেনি। বিবাহিত জীবনের চার বছরে এই প্রথম মারওয়ানের কঠিন রাগ দেখলো। মারওয়ান যে বখাটে কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছে তার গলায় পাড়া দিয়ে বললো,
“তোর ভাগ্য ভালো মারামারি ছেড়ে দিয়েছি নাহলে তোর জবান টেনে ছিঁড়ে ফেলতে দুই মিনিটও সময় লাগতো না আমার। মেয়েছেলে দেখলে বাজে কথা, বাজে ইঙ্গিত দিতে জিহ্বা লকলক করে? আর কোনোদিন যদি মায়ের জাতের দিকে চোখ তুলে কু*ত্তার নজরে চেয়েছিস সেদিনই তোদের চোখ উঠিয়ে ফেলবো বা*স্টার্ড।”
বলেই মুখের উপর লাথি দিলো। মুখ থেকে গলগল করে রক্ত বের হতে লাগলো বখাটের। মারওয়ান কপাল থেকে ঘাম মুছে হাত নাড়ালো। মারামারি করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের আঘাতও পেয়েছে সে। নিশাতের থেকে ছেলেকে নিয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিলো। নিশাত রোবটের মতো তার পিছনে হাঁটতে লাগলো। নিশাত টলছে। বাসায় এসে পাথরের মতো বসে থাকলো কিছুক্ষণ। নাহওয়ান মায়ের কাছে ঘুরঘুর করছে। মারওয়ান মুখ ধুয়ে এসে দেখলো নিশাত মূর্তির মতো বসে আছে। নাহওয়ানকে কোলে নিয়ে অন্যরুমে গেলো। খেলনা বের করে ছেলের হাতে দিয়ে বললো,
“বাবা না আসা পর্যন্ত খেলো।”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে খেলতে লাগলো। মারওয়ান নিজেদের রুমে গিয়ে নিশাতের পাশে বসে বললো,
“গোসল করে ফেলো নাহলে মুখ হাত ধোও। ক্ষুধা লেগেছে?”
নিশাতের কোনো নড়চড় নেই দেখে মারওয়ান নিজের বাহু দিয়ে বারি দিলো। তারপরও কোনো কথা বললো না নিশাত। মারওয়ান বললো,
“আজকের সব কথা ভুলে যাও। কিচ্ছু হয়নি।”
নিশাত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো,
“কতকিছু হলো।”
“কিছু হয়নি।”
“এতো জঘন্য কথা, চাহনি আমাকে ঘুমাতে দিবে না।”
“গোসল করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“হবে না।”
মারওয়ান চোখ লাল করে বললো,
“মেজাজ খারাপ করিস না।”
তারপর স্ত্রীর বোরকা খুলে জামাকাপড় নিয়ে নিশাতকে নিয়ে বাথরুমে ঢুকলো। ঝর্না ছেড়ে নিশাতকে ডলে ডলে গোসল করাতে লাগলো। নিশাত কেঁদে উঠে মারওয়ানের গলার শার্ট খামচে ধরলো। মারওয়ান কিছু না বলে গোসল করিয়ে গা মুছিয়ে জামাকাপড় পড়িয়ে দিলো। ভাত বেড়ে নিশাতকে খাইয়ে দিলো। তারপর বললো,
“ঘুমিয়ে পড়। এইযে জড়িয়ে ধরেছি পৃথিবীর শত বাজে কথা, বাজে চাহনি আর তোমার গায়ে লাগবে না। আমি লাগতে দিবো না।”
বলেই নিশাতকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরলো। তার বুকের শার্ট ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে মারওয়ান নিশাতকে আলাদা করলো। তারপর কপালে চুমু দিলো অনেকক্ষণ। স্ত্রীর পাশ থেকে আস্তে করে উঠে পাশের রুমে গেলো। ছেলেকে গাড়ির সাথে গাড়ি বারি লাগাতে দেখে বললো,
“ঘুমাবি না পেঙ্গুইন?”
নাহওয়ান বাবাকে দেখে হেঁসে দিলো। বললো,
“বাবা ডিচুম ডিচুম করে।”
“তাই?”
“হু।”
গাড়ি দুটোকে বারি দিয়ে বললো নাহওয়ান। মারওয়ান বললো,
“ওরে বাবা। আয় তোর সাথে ডিসুম ডিসুম করি।”
নাহওয়ান ঘাড় কাত করে ছোট ছোট হাত দিয়ে বাবার শরীরে কতগুলো থাবা মারলো। মারওয়ান হেঁসে ছেলের মার খেলো। তারপর হাতা গুটিয়ে যেই ছেলেকে ধরতে যাবে অমনি নাহওয়ান “ওলে বাবা” বলে ফুড়ুৎ করে দৌঁড় দিলো।
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম। অনেক কষ্টে আজকের পর্ব লিখেছি। কয়েকদিন গল্প নাও দিতে পারি। কেমন হয়েছে জানাবেন পর্বটি। মন মেজাজ ভীষণ খারাপ।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৩+১৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫১+৫২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪১+৪২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন গল্পের সব লিংক
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৩+৫৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৭+বোনাস
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৩