বেলতুলি – [২৬]
লাবিবা ওয়াহিদ
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
জাবির হো হো করে হেসে দিয়ে বলল,
–“একজনরে এক সপ্তাহ না দেইখা যেমনে পুড়তেছি, তার কাছে তো এই গরম কিছুই না জিৎ দা।”
জাবির নতুন শার্ট পরে বাজারে ঘোরা-ফেরা করছে। অপেক্ষায় কখনো চা খেয়েছে, কখনো-বা পান। রাস্তা থেকে নজর একটুও সরাচ্ছে না। সময় বাড়ছে, ততই যেন ধৈর্য কমছে। মৌনোর তো দেরী করার কথা নয়, তাহলে এই দেরীর মানে কী? তার আজ চাঁদা তোলার কথা। মৌনোর জন্য সময় পিছিয়েছে। ওই সময়ও এখন হয়ে এসেছে। ওই এলাকার ছেলে-পেলেদের কল এসেছে এই অবধি দুবার। জাবিরের অনুমতি ছাড়া ওরা চাঁদাও তুলতে পারছে না। সে কি বিরক্তিকর ব্যাপার। জাবিরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঞ্জু আর রিপন আসল। রিপন মাথা চুলকে বলল,
–“ভাই, আপনে এহনো এহানে?”
–“হ। তোগো ভাবীর লেইজ্ঞা অপেক্ষা করি।”
মঞ্জু বলল,
–“ভাবী? সে তো আগেই গ্যাছে গা। দেহেন নাই?”
মঞ্জু আরও কিছু বলার আগে জাবিরের গরম চোখ দেখে চুপসে গেল। বুঝতে পারছে তাদের ভাইয়ের মনের অবস্থা। অর্থাৎ বুঝতে বাকি নেই, আজও মৌনো চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছে। সেই পালানোর ঝাল যে আজ জাবির কতভাবে তুলবে তাও অনুমান করতে পারছে। জাবির হাত মুঠো করে নিজেকে বুঝ দিল। সুন্দরী বলে আবারও তার পালানোকে ছাড় দিল সে।
–“আবার পলাইছে আমার পাখিডায়। তোগো ভাবী দেখছস, তোগো ভাইরে কত ডরায়?”
রিপন, মঞ্জু তাল মেলানো ছাড়া আর কিছু বলার সাহস পেল না। গরম মাথায় জাবির আরেক কাপ চা খেল। মঞ্জু বলল,
–“আপনে তো ভাবীরে ডর দেহান না। তইলে ভাবী ডরায় ক্যা?”
–“আমার নাম জাবির। জাবির জন্মাইছেই মাইনষেরে ডরাইন্নের লিজ্ঞা।”
–“হক কথা কইছেন ভাই।”? মঞ্জু বলল।
–“ভাবীরে কিছু কইতেন না, ভাই?” রিপন বলল।
জাবির নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
–“সুন্দরীগো দেমাগ থাকেই রে রিপন। এডা আদিমযুগ থেইক্কাই অইয়া আইতেছে। এই দেমাইগের লেইজ্ঞাই তোগো ভাবীরে মনে ধরছে, আগেই কইছিলাম। জাবিরে আগুন, পছন্দও অইব আগুন। দেখতেও তো…”
জাবির যেন মুখের লালা নিয়ন্ত্রণ করল। এটুকুতে দুই চ্যালা জবাব দিতে পারল না। জাবির যাই বলুক না কেন এখানে তারা চাইলেও তাল মেলাতে পারবে না। দেখা গেল মৌনোর ব্যাপারে একটা শব্দও এদিক ওদিক বললে তাদের হাত-পা ভেঙে দিবে। কেই বা আগ বাড়িয়ে নিজের ক্ষতি করতে চায়?
জাবিরের সাথে তখনই দেখা হলো তার এক কলেজে পড়া প্রেমিকার। সে তৎক্ষণাৎ মুখে হাসি ঝুলিয়ে ফেলল। যাক, রাগ নিয়ন্ত্রণের একটা কারণ তো পেয়েছে। সে তখনই চায়ের বিল মিটিয়ে রিপনদের উদ্দেশে বলল,
–“ওই এলাকার ছেলে-পেলেদের জানাই দে কালকা চাঁদা তুলমু। আজকা যে যার কাজে যাইতে ক। আমি আজকা ওরে নিয়া ব্যস্ত থাহুম। কি কও ময়না-টিয়া?”
মেয়েটা লজ্জা পেল। জাবির তাকে নিয়ে রিকশায় উঠে ঘুরতে বেরিয়ে গেল। মঞ্জু তা দেখে অবাক সুরে বলল,
–“ভাই একলগে কয়ডা চালায়?”
রিপন হতাশ গলায় বলল,
–“ভাইয়ের চেহারা-সূরত আছে। আমগো বইল্লা একটাও জুডে না।”
মৌনো জাবিরকে দেখে দ্রুত অন্য পথ ধরে এসেছে। এতদিন পর বেলতুলিতে এসেও শান্তি নেই। আজকে এমনিতেই তার মেজাজ ভালো নেই। কিন্তু দেখা গেল অন্য পথ দিয়ে এসেও শান্তি হলো না। তার রত্নার সাথে দেখা হয়ে যায়। রত্না তার বাড়ির সামনেই ছিল। মৌনো পাশ কেটে যেতে নিলে সে তাকে ডাক দেয়। অগত্যা, দাঁড়াতে হলো।
–“কেমন আছ মৌনো? শুনলাম চট্টগ্রাম গেছিলে?”
–“জি আপু, মামার বিয়ে।”
রত্নার যেন মৌনোর মুখে আপু ডাকটা পছন্দ হলো না। সে অসন্তোষ গলায় বলল,
–“আমি তোমার বয়সীই, আপু ডেকো না। বড়ো বড়ো শোনায়।”
মৌনো অবাক হলো। রত্না তার বয়সী কবে হলো? যতদূর জানে রত্নার বয়স বাইশ চলছে, আর তার ঊনিশ। সে কিছু বলল না। তবে রত্নাকে সে তো আপু বলবেই। কেন যেন আপু ডেকেই এখন পৈশাচিক আনন্দ পাবে। কিন্তু কেন? নিবিড়ের সাথে বিয়ে ঠিক বলে?
রত্না থেমে আবারও বলল,
–“শুনলাম, তোমার সাথে নাকি নিবিড়ের দেখা হয়েছে?”
বাপরে। আগে ‘নিবিড় ভাইয়া’ বলত আর এখন সোজা নাম ধরে ডাক? বিয়ের বিষয় তো তবে ভালোই চলছে। নিবিড় কী তাকে দেখা হওয়ার খবর বলেছে? মৌনো বলল,
–“কার থেকে শুনেছেন আপু? নিবিড় ভাই বলেছিল?”
রত্না ভাব নিয়ে বলল,
–“হুঁ, ওই বলল। প্রায়ই কথা হয় তো আমাদের। আর বোলো না, আজকাল যা ব্যস্ত মানুষটা। কথাই হয় না ঠিক মতো।”
অথচ রত্নার বাড়িতে তার বাবা প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছে নিবিড় কেন তাদের সাথে যোগাযোগ রাখছে না সেই বিষয়ে। আজকাল রত্নার বাবার মতিগতিও ঠিক নেই। এ নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় থাকছে সে। বাবা কখন কি করে বসেন? নিবিড়ের মতো ছেলে তো লাখে একটা। কিন্তু তার বাবার চরম আত্মসম্মানহীন। কাজে না মিললে ভালো ছেলেকেও দূর দূর করতে পারেন। তবুও, রত্না চায় না এমন কিছু হোক। এসব চিন্তার মাঝেও তার মৌনোর সাথে ছল করতে মন্দ লাগছে না।
মৌনো এই এলাকায় ভয়াবহ সুন্দরী, তার মতো চুল কালার, রোজ পার্লারে আসা-যাওয়া না করেও। সে হিসেবে তার ঈর্ষাম্বিত হওয়াটা অসম্ভব কিছু না। এমন কি, মৌনোকে সে আগে থেকেই দেখতে পারত না। সব ছেলেদের মাথা ঘুরিয়ে রেখেছে এই মেয়ে। তার উপর নিবিড়ের সাথেও ঘনঘন যোগাযোগ, চলাফেরা। সে বাগদত্তা হিসেবে কী করে মেনে নেয়? যদি এই মেয়েটা নিবিড়কে কেড়ে নেয়? তার অহংকার করার মতো যে শুধু নিবিড়ই আছে।
মৌনোর কেন যেন রত্নার কথা বুকে বিঁধল। এর মানে তাদের রোজ যোগাযোগও হচ্ছে? মৌনোর চেহারায় সেই বিষণ্ণতা ধরা দিল না। সে আগের মতোই নিশ্চুপ, নীরব। চেহারায় হেলদোল নেই। যেন যোগাযোগ করাটাই স্বাভাবিক। অথচ রত্না খুব করে মৌনোর চেহারার রং পালটে যেতে দেখতে চেয়েছিল। ভাবনায় জল পড়লে রাগ ভালোই হলো তার।
–“নিবিড় ভাইয়ার সাথে বিয়ের ডেট পাকা হলে অবশ্যই জানাবেন আপু।”
–“তা তো নিশ্চয়ই। প্রথম কার্ড তোমাকেই পাঠাব।”
মৌনো বিদায় নিয়ে চলে আসল। মিনমিন করে বলল,
–“আমাকে পাঠানোর কি দরকার? কার্ড গলায় ঝুলিয়ে রেখে বসে থাকুক।”
কিছুটা সামনে যেতেই তার কামরুলের সাথে দেখা। কামরুল বলল,
–“আপা, আপনের বাড়িত নাকি কালকা নীরব ভাইয়ের দাওয়াত? ভাই তো পরশুদিন যাইব গা।”
–“হুঁ। আম্মা নাহিয়ান ভাইকে দাওয়াত করে খাওয়াবেন বলেছিলেন। ভাইয়া আসবে তো?”
–“অবশ্যই যাইব আপা।”
–“তুমিও এসো, খেয়ে যাবা।”
কামরুল দাঁত কেলিয়ে হাসল। লুঙ্গিটা সামলে লাজুক গলায় বলল,
–“আপনে যেহেতু দাওয়াত দিছেন, যামু নে। এত রাখেন আপনেরা আমারে।”
মৌনো হাসল। তার নিবিড়ের কথা মনে পড়ল। সে দেখেছে নিবিড়ও কামরুলকে অনেক আগলে রাখে। নিবিড় আসলেই কামরুল সারাক্ষণ তার আগে-পিছে পড়ে থাকে।
–“আপা, আপনেরে দেখলাম রত্না ভাবীর লগে।”
রত্নাকে ‘ভাবী’ ডাকছে শুনে মৌনোর মন খারাপ হয়ে গেল। তার মন খারাপ গোপন করে বলল,
–“হুঁ, ডেকেছিল।”
–“কি কইছে আপা?”
–“এইতো, নিবিড় ভাই নাকি বলেছে আমার সাথে চট্টগ্রামে দেখা হয়েছে। ভাইয়া ব্যস্ত.. ইত্যাদি।”
কামরুল এ কথা শুনে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে দিল। তার হাসি বেশ শব্দের সাথেই হলো। কামরুল হো হো করতে করতে বলল,
–“ওনারে আপনার লগে দেখা হওনের ব্যাপারটা আমিই কইছি। নিবিড় ভাইয়ে না। নিবিড় ভাইয়ের লগে তো এক সেকেন্ডও কথা কইতে পারে নাই। মিছা কথাডি কেমনে কইল হায় হায়! কই যামু এডি শুইন্না!”
মৌনো বিস্মিত কামরুলের কথা শুনে। কামরুল রত্নাকে এই খবর দিয়েছে? তাহলে রত্না ওভাবে কেন বলল? কত নিখুঁত করে মিথ্যা বলল। কামরুল হাসি বজায় রেখে আবারও বলল,
–“আপা আপনে আমারে দাওয়াত দিছেন, এইল্লিগা আরেকটা সত্যি কথা কইয়া দেই আজকা.. কাউরে কইয়েন না।”
–“কী সেটা? বলব না কাউকে।”
কামরুল আশেপাশে সতর্ক নজরে তাকাল। তারপর মৌনোর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
–“নিবিড় ভাইরে রত্না আপায় অনেক বিরক্ত করত বইলা ভাইয়ে আমারে দিয়া আপার মোবাইল চুরি করাইছে। আমার পরিচিত চোরই আপার মোবাইল ডোবাত নিয়া গিয়া ফালাইছে।”
মৌনো বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। তাহলে ওই মোবাইল কোনো চোরই চুরি করেনি? সব নিবিড়ের বুদ্ধি? নিবিড়কে দিয়ে এত কূটচালও হয়? অস্ফুট স্বরে আওড়াল সে,
–“কিহ?”
–“হ। রত্নারে ভাইয়ে দুই চোক্ষে দেখতে পারে না। খালাম্মার জন্যই এসব অইতেছে। ভাই বাড়ি থেইক্কা ভাগছেও রত্না আপার লেইজ্ঞাই। মনে অয় না এই বিয়ার নাটক বেশিদিন চলব! ভাইয়ে যা জিনিস।”
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে—
বিঃদ্রঃ যাদের কাছে পর্বটি পৌঁছাবে অবশ্যই একটু সাড়া দিবেন। আমার পেজের রেকমেন্ডেশন বন্ধ হয়ে গেছে বোধ হয়। পোস্ট অনেকের ফিডেই যাচ্ছে না। অনেক পাঠক জানতেই পারে না গল্প দিচ্ছি। আর কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবেন।
Share On:
TAGS: বেলতুলি, লাবিবা ওয়াহিদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বেলতুলি পর্ব ১
-
বেলতুলি পর্ব ৭
-
বেলতুলি পর্ব ১৩
-
বেলতুলি পর্ব ১৬
-
বেলতুলি পর্ব ২৩
-
বেলতুলি পর্ব ২৫
-
বেলতুলি পর্ব ১৮
-
বেলতুলি পর্ব ১৪
-
বেলতুলি পর্ব ১৭
-
বেলতুলি পর্ব ৮