বেলতুলি – [২৫]
লাবিবা ওয়াহিদ
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
–“কালকে না মামার বউভাত ছিল?”
–“তা তো কইতে পারমু না ভাই। মনে হয় ভাতের লগে বউ দেয় নাই, এইল্লিগা আইয়া পড়ছে।”
নিবিড় ওপাশ থেকে ধমকাল,
–“মৌনো মামার বউ দিয়ে করবে? কিসব আজেবাজে বকিস তুই কামরুল? ভালো হবি না?”
কামরুল চকচকে টাকাটা হাতে নিয়ে পিষেপিষি করতে করতে বলল,
–“আমি তো ভালোই ভাই, এইল্লিগাই তো বাপ-মা আমার নাম “মাসুদ” না রাইখা “কামরুল” রাখছে।”
ডাক্তার পরিবার সর্বোচ্চ ছয়দিন অনুপস্থিত ছিল বেলতুলি থেকে। অথচ মনে হচ্ছে কত মাস এই শহর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কয়েকদিনের ব্যবধানে সবকিছুই অদ্ভুত আর নতুন লাগছে যেন। এশা তো ঘুম থেকে উঠে অদূরের এক বাড়ি দেখে বলে বসল,
–“আম্মু, ওই বিল্ডিংয়ের কাজ কবে ধরল? আমরা যখন চট্টগ্রাম যাচ্ছিলাম তখন তো দেখিনি।”
দেখবে কীভাবে? এশা তো তার বাঁদরামিতেই ব্যস্ত থাকে। আশেপাশে কী হচ্ছে, না হচ্ছে সেই হুঁশজ্ঞান তার মাঝে নেই। বিল্ডিং এর কাজ আরও অনেক আগে থেকে শুরু হলেও এশা দেখল সবে। জুনায়েদ তো আরেক কাঠি উপরে। সে ভীত হয়ে রাজিয়া শেখের কাছে গিয়ে বলল,
–“আম্মা, আমার স্পষ্ট মনে আছে ব্যাটটা আমি দরজার পেছনে রেখে গেছিলাম। ওটা আমার আপার ঘরে কী করে গেল? জিন-ভূতের ব্যাপার নয় তো?”
রিমঝিম তখন তার মাথায় চাটি মেরে বলল,
–“তুই যাওয়ার আগে এই ব্যাট নিয়ে এশার পিছে দৌড়েছিলি মনে নেই গর্ধব?”
জুনায়েদের টনক নড়ল, আর সে দ্রুত নিজের ঘরে দৌড় লাগাল। আজকের দিনটাও তার স্কুল বাং দেওয়ার ইচ্ছে, এখন মাকে রাগিয়ে দিলে যদি টেনে-হিঁচড়ে স্কুলে পাঠায়? ওরা ফিরেছে গতকাল দুপুরে। দুপুর থেকেই তাদের ঘুমিয়ে আর ঝিমিয়েই সময় কাটছে। রিমঝিমকে অবশ্য এক দুটো বিষয়ে এশার সাথে কথা কাটাকাটি ছাড়া আর কিছু করতে দেখা যায়নি। সে আজকাল বেশ প্রফুল্লই থাকছে। যেন ইয়ামিনের বিয়েটা তার জীবনে বসন্ত এনে দিয়েছে। দুয়েকবার তাকে ফোনে কথা বলতেও দেখা গিয়েছে।
সকাল থেকে রাজিয়া শেখের মন-মেজাজ ভালো নেই। একের পর এক সবার এসব আজগুবি কথা-বার্তা তার কপালে রাগের ছাপ বসিয়েছে। কিন্তু এখন অবধি কারো সঙ্গে তিনি রাগ দেখাননি। যেন ভেতরে ভেতরে তীব্র ঝড়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সে একভাবে তরকারিতে খুন্তি নাড়িয়েই যাচ্ছেন। সাথে কানে বাজছে সবার অহেতুক কথা-বার্তা। হঠাৎ তার টনক নড়ল। আশপাশে মেঝো মেয়েটাকে খুঁজল। মেয়েটা এখনো নিশ্চুপ। অথচ এশার উপর সবচেয়ে বেশি চেঁচামেচি তাকেই করতে দেখা যায়। এমন কি হয়েছে চট্টগ্রামে? মেয়েটার ওপর কী আসলেই এতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে?
এমন সময়ই দেখলেন মৌনো তৈরি হয়ে বেরুচ্ছে। রাজিয়া শেখ পিছুডাক দিলেন,
–“কোথায় যাচ্ছিস?”
–“ভার্সিটি। অনেকদিন যাওয়া হয়নি তাই ভাবলাম যাই।”
–“নাস্তা তো করলি না।”
–“খিদে পায়নি। ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে নিব। চিন্তা কোরো না।”
মাকে কিছু বলতে না দিয়ে মৌনো বেরিয়ে গেল। রাজিয়া শেখ হতাশ হলেন। মায়ের মন তো, সন্তানের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বিষয়ও ধরে ফেলেন। এবারও মন বলছে তার মেয়েটা ভালো নেই। অসহায় চোখে মেয়ের যাওয়া দেখলেন তিনি। স্মৃতিতে হঠাৎ নিবিড় ভেসে উঠল। নিবিড়ের মায়ের প্রস্তাব। তিনি ‘না’ করে দিয়েছিলেন এমনও না। বলেছিলেন তার মেয়ে এখনো ছোটো, এজন্য সময় চেয়েছিলেন। এছাড়া রিমঝিমকে ভুলে স্বার্থপরের মতো তিনি মেঝো মেয়ের কী করে বিয়ে ঠিক করে রাখতেন? বড়ো মেয়েটার উপরও কী কম ঝড় গিয়েছে?
মায়েরা সব সন্তানকে সমান চোখে দেখেন। তিনিও তার ব্যতিক্রম নয়। হয়তো এই দিকটা তিনি সোফিয়া খানমকে বোঝাতে পারেননি ভালো করে। যার ফলস্বরূপ সোফিয়া খানম তার সামানহ গাইগুই ইগোতে নিয়ে বসলেন। এখন তিনি এই ডাক্তার বাড়ির নামও শুনতে পারেন না। তাদের আবার ভাব তো দূরের বিষয়। বড্ড আফসোস হচ্ছে তার, ইশ! যদি সোফিয়া খানমকে আরেকটু বোঝাতে পারতেন। তাহলে কী নিবিড়ের মতো ছেলে হাতছাড়া হতো? এখন কার সাথে বিয়ে ঠিক হলো? যেই মেয়ের বাজে ব্যবহার কম-বেশি সবার কাছেই পরিচিত। রাজিয়া শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সবকিছু তিনি রবের উপরেই ছেড়ে দিলেন।
রিমঝিম আজ বাড়িতেই থাকল। কালকে থেকে আবারও তার ডাক্তারি জীবন শুরু। রাহাতের সাথে তার সকালেও কথা হয়েছে। ভদ্রলোক অফিসে যাওয়ার আগে দিয়ে তার সাথে কথা বলেছে। কেন যেন কয়েকদিন যাবৎ রাহাতের সাথে মিশতে তার মন্দ লাগছে না। লোকটা বেশ সভ্য, কথা-বার্তার ধরণও তার খুব পছন্দ। মৌনোর সাথে চট্টগ্রামে যা কাণ্ড ঘটল এতে ভদ্রলোক বেশ নিন্দা জানিয়েছে। রিমঝিম যেন তার পাশেই থাকে সেই পরামর্শও দিয়েছিল। এছাড়া তাদের কল, মেসেজেও প্রায়ই মৌনোর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে সে। এই ছোটো ছোটো বিষয়গুলো রিমঝিমকে এত শান্তি দিচ্ছে কেন তা সে জানে না। বরং মনে হচ্ছে তার ভেতর থেকে বোঝা ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে, যা নামানোর জন্য সে উদগ্রীব হয়ে ছিল গত কয়েকটা বছর। অথচ এই লোকটা আসতে না আসতেই তার দীর্ঘদিনের ক্ষত সারিয়ে দিচ্ছে একটু একটু করে।
কলিংবেল বাজল। রাজিয়া শেখ রান্নাঘর থেকে রিমঝিমকে ডাকলেন।
–“কে এসেছে দেখ তো। নীরবকে দাওয়াত করব ভেবেছিলাম। দেখ তোর বাবা মাছ পাঠাল কিনা।”
রিমঝিম দরজা খুলতেই প্রণভের মুখোমুখি হলো। তার হাতে বেশ বড়ো একটা ইলিশ। প্রণভ রিমঝিমকে দেখতেই মুচকি হাসল।
–“শুভ সকাল, ঝিম।”
–“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। কেমন আছেন?”
–“ভালো। তুমি বলো। মনে হচ্ছে এক সপ্তাহের ছুটির ব্যাপারটা কাজে দিয়েছে।”
–“হ্যাঁ। তা অবশ্য ছিল। বলা বাহুল্য এই সাতদিন আমারই ছিল।”
প্রণভ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মাছটা এগিয়ে দিল। রিমঝিম তার চোখ-মুখ দেখেই বুঝল, আজও প্রণভের তাড়া আছে। সে আজও চা খেতে আসবে না। রিমঝিম হতাশার সুরে বলল,
–“আপনি কবে ফ্রি হোন বলুন তো?”
প্রণভ রিমঝিমের কথার সুর বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বলল,
–“আজ সত্যিই তাড়া আছে, ইন্টারভিউ দিতে যাব। যাওয়ার আগে ভাবলাম মাছটা দিয়ে যাই।”
রিমঝিম এ কথা শুনে হেসে তাকাল প্রণভের দিকে। তাকে ভরসা দিতে বলল,
–“চাকরিটা হলে মিষ্টিটা পাঠিয়ে দিবেন কিন্তু।”
–“নিশ্চয়ই। তবে আমার নানী মিষ্টির বাক্স নিয়ে বসে পড়লে কি করব আগেই বলতে পারছি না।”
প্রণভের অসুস্থ নানুকে নিয়ে কৌতুক শুনে সে হো হো করে হাসল। মনে পড়ে গেল শেষবার প্রণভ যখন তাকে হাসপাতাল নিয়ে গিয়েছিল কি কাণ্ডটাই না করেছিলেন তিনি। বৃদ্ধা কিছুতেই হাসপাতালে যেতে চান না। সেখানে বেশ ঝড়-ঝাপটা পেরিয়েই নানুকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয় প্রণভের। সেবার হাসপাতাল করিডোরেই তো প্রণভের হাত থেকে বাঁচতে বলে বসলেন,
–“দূরে সইরা দাড়া। তোর থেইক্কা মাছের গুয়ের গন্দ আইয়ে। কী মাছ বেচস!”
আশেপাশের নার্স, রোগী, ডাক্তাররা সবাই হেসে দিয়েছিল সে কথায়। রিমঝিমও সেই স্থানে উপস্থিত ছিল। সে যখনই একাকী সময় কাটায় তখনই তার এই চরম হাস্যকর বাক্যটা মনে পড়ে যায়। প্রণভের মুখ তো দেখার মতো ছিল।
প্রণভ মাছ দিয়েই বিদায় নিল। রিমঝিম তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলল,
–“আপনার চাকরিটা দ্রুত হয়ে যাক প্রণভ ভাই। আপনি অনেক ভালো মানুষ।”
মৌনো এসেছে শুনে আজ জাবির নতুন শার্টটা আলমারি থেকে নামিয়েছে। সেটা দাঁড়িয়ে থেকে আয়রনও করাল বাজারের জিৎ দাদার থেকে। জিৎ দাদা বেলতুলির যাবতীয় সবার শার্ট-পাঞ্জাবি আয়রন করে দেন। মধ্যবয়সী এই লোকের ব্যবসা মন্দ নয়। তার সাথে কাজ করে অল্পবয়সী দুজন ছেলে। শোনা যায় তারই গ্রাম থেকে ওদের এনেছে। তার ভাঙাচোরা দোকানটার ভেতরে একটা ভাঙাচোড়া কাচের তাক ওয়ালা স্টিলের আলমারি আছে। সেখানে কতশত কাপড়ের স্তূপ। সব কদিনে জমেছে কে জানে। অবশ্য কারো তাড়া থাকলে তিনি দ্রুত করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। জিৎ দাদা জাবিরের এত তাড়া দেখে পান খাওয়া দাঁত বের করে হেসে বলল,
–“কী ব্যাপার জাবিরদা? সকাল সকাল ইস্ত্রিরি করাচ্ছেন? তাড়া তো ভালো দেখাইতেছে না।”
জাবির মুচকি হেসে বলল,
–“আজকে আমি অনেক খুশি বুঝছ জিৎদা। তাত্তাড়ি হাত চালাও। বখশিশও দিমু। দেরী হইলে আবার হইবে না।”
জিৎ দাদা বখশিশের লোভে নাকি অন্য কোনো কারণে, দ্রুত হাত চালাল। তার দোকানে বাজছে জিতের গান। লোকজনকে সে বলে বেড়ায়, তার নাম জিৎ, সে ভক্তও জিতের। তাদের মধ্যে জিত ছাড়া আর কোনো কথা নেই।
জাবির ঘড়ি দেখল। এই সময়েই মৌনো ভার্সিটি ফিরবে। রিপন তো তাই বলল। সে অর্ধেক শার্টটা নিয়েই গায়ে জড়িয়ে নিল। জিৎ দাকে বখশিশও দিল। জিৎ দা অবাক হয়ে বলল,
–“দেইখা পড়েন। পুইড়া যাইবেন তো।”
জাবির হো হো করে হেসে দিয়ে বলল,
–“একজনরে এক সপ্তাহ না দেইখা যেমনে পুড়তেছি, তার কাছে তো এই গরম কিছুই না জিৎ দা।”
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~~
[যারা পড়ছেন রেসপন্স করবেন। হাত কেন যেন চলছেই না আজ। হয়তো অনেকদিন পর লেখার কারণে। বারবার, থেমে থেমে লিখতে হয়েছে। এ নিয়ে মন খারাপ হলো। তবুও যেহেতু আপনাদের কথা দিয়েছিলাম ঠেলেঠুলে, ধৈর্য ধরে কয়েক ঘণ্টা লাগিয়ে এটুকুই লিখতে পেরেছি। আপনারা একটু মন্তব্য করুন তো। আজ গঠনমূলক মন্তব্য লাগবে না। শুধু বেশি বেশি কমেন্ট করুন যেন রিচ ফিরে আসে আর অন্যান্য পাঠকদের কাছে গল্প পৌঁছায়। হাতের জং তো ছোটাতে হবেই😑]
Share On:
TAGS: বেলতুলি, লাবিবা ওয়াহিদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বেলতুলি পর্ব ২৩
-
বেলতুলি পর্ব ৪
-
বেলতুলি পর্ব ৯
-
বেলতুলি পর্ব ২৪
-
বেলতুলি পর্ব ১৫
-
বেলতুলি পর্ব ১৬
-
বেলতুলি পর্ব ৮
-
বেলতুলি পর্ব ১৮
-
বেলতুলি পর্ব ২০
-
বেলতুলি পর্ব ২