বেলতুলি – [২২]
লাবিবা ওয়াহিদ
[কপি অন্যত্র সম্পূর্ণ নিষেধ]
–“আপু বলছে, আপনি নাকি অনেক নির্দয় আর পাষাণ.. স্যার। আপনি নাকি আপুকে বুঝেন না।”
ওপাশ থেকে মনে হলো দীপ্তর মাথায় কেউ জোরে বারি দিল তার বোকা কথাবার্তার জন্য। নাহিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“তোমার পাশে শুহারা, তাই না দীপ্ত?”
শুহারা তৎক্ষনাৎ দীপ্তর হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে বলল,
–“হ্যাঁ আমি। আপনি আমার কল ধরবেন না বলেই দীপ্তকে দিয়ে কল দেওয়া।”
নাহিয়ান ফোঁপানোর শব্দ পেল ওপাশ থেকে। কিন্তু সেই কান্নার শব্দ তাকে টলাতে পারল না। যেন সে শুহারার বলা নির্দয়, পাষাণ চরিত্র নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করছে। কাঁদছে কেন তাও জিজ্ঞেস করল না। যেন নাহিয়ান আগে থেকেই জানে।
–“কেন কল করেছ?”
–“আপনি কী সত্যিই এত নির্দয়?”
–“তুমিই তো বললে, আমি নির্দয়। পাষাণ?”
–“কেন এমন করছেন আমার সাথে? আমি আপনাকে ভালোবাসি।” শুহারা কাঁদছে।
–“তুমি আমার স্টুডেন্ট হও, শুহারা।”
–“স্টুডেন্টের আগেও আমি একজন মেয়ে। আমার বুঝি কারো প্রতি অনুভূতি থাকতে পারে না?”
–“পারে, তবে ভুল মানুষের জন্য নয়।”
–“আর কত ছোটো, স্টুডেন্ট বলে তাড়িয়ে দিবেন? আমি কী একদমই ভালোবাসা ডিজার্ভ করি না? প্লিজ নাহিয়ান ভাই, ফিরে আসুন। আমি আপনাকে সত্যি ভালোবাসি।”
নাহিয়ান জবাব দিল না, নীরব রইলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেললে বার দুয়েক। শুহারা আকুতি ভর্তি গলায় ডাকল তাকে। নাহিয়ান থেমে বলল,
–“এসব ভেবো না। বিয়ে হচ্ছে, সেটার প্রস্তুতি নাও।”
–“নাহিয়ান ভাই..”
–“বিয়ের জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা। বিয়ে হলে দীপ্তকে বলবে আমাকে আপডেট দিতে।”
ওপাশ থেকে শুহারা খট করে কলটা কেটে দিল। যেন তার এই কল কাটা চিৎকার করে বলছে, “লাগবে না আপনার এই তুচ্ছ শুভ কামনা। লাগবে না আপনাকে। আমি ভালো থেকে দেখাব।”
নাহিয়ান মোবাইল রেখে সেভাবেই থম মেরে বসে রইলো। তার চোখে ভাসছে শুহারার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা। মেয়েটার পাগলামি, লাজুক মুখ, তাকে ভাইয়া বলে ডাকা, নাহিয়ানের বকাতে মুখ ভার করে ফেলা, নিত্যনতুন রেসিপি বানিয়ে নাহিয়ানকে দিয়ে টেস্ট করানো। ফাঁকিবাজ মেয়েটা কীভাবে যেন ভদ্র হয়ে গেছিল নাহিয়ানের ছায়াতলে। নাহিয়ান ঘড়ি দেখল। রাত দশটা বেজে গেছে। অথচ মাথায় তখনো শুহারার বিচরণ। খুব কী ক্ষতি হয়ে যেত, যদি শুহারা তার ছাত্রী না হতো? মেয়েটার বয়সই বা কত?
সংসার ঘর সামলানো, এসব নিয়ে মেয়েদের স্বপ্ন সবসময়ই আকাশচুম্বী হয়ে থাকে। শুহারাও হয়তো কোথাও না কোথাও এই ছোটো মাথা নিয়ে সেই আকাশচুম্বী দিবাস্বপ্নে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। কিন্তু.. কিন্তুর জবাব নেই নাহিয়ানের কাছে। সে বড্ড বিশ্বাস করে শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীর জন্য পিতা সমতুল্য। সে বোধ হয় এই প্রবাদে নিজেকে গভীর ভাবে আটকে নিয়েছে। নয়তো আজ তার বুক পোড়া সত্ত্বেও সে কেন কিছু করতে পারছে না? তার মন বলছে, শুহারা যে ঘরেই যাক, খুব খুশি থাকবে। নাহিয়ান দোয়া করল তার জন্য। জীবনে সব ফুলের ভাগ পেতে হয় না। কিছু ফুলকে ছেড়ে দিতে হয়। যেন সেই ফুল হাসতে পারে, ভালো থাকতে পারে, সুগন্ধ ছড়াতে পারে। নাহিয়ানের সামর্থ্য নেই সেই ফুলকে নিজের করে আগলে রাখার। তার সবচেয়ে বড়ো বাঁধা শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্ক। সে যদি কখনো শুহারাকে মেনেও নিত, সে নিজের কাছে খুব ছোটো হয়ে যেত। তার মনে আছে, তার এক বন্ধু তার ছাত্রীকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছে। কি বিচ্ছিরি কথা শুনেছে দুই পরিবারের মানুষজন। চরিত্রহীন, শিক্ষকতার নামে প্রেম করতে আসে, নিয়্যত খারাপ ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই থেকে কোনো না কোনো ভাবে নাহিয়ানের ওপরও একটা প্রভাব বসে যায়। সেই থেকেই পণ করেছিল, সে কখনো ছাত্রীকে মন দিয়ে বসবে না। এটা অসম্ভব তার জন্য।
কামরুল তখনই ঘরে ঢুকে পড়ল। গুণগুণ করতে করতে বলল,
–“ভাইজান নিচে আহেন। খাবার জন্যে ডাহে।”
নাহিয়ান কামরুলের দিকে তাকাল। কামরুল কোনো এক কারণবশত বেশ খোশমেজাজে আছে। নাহিয়ান প্রশ্ন করল,
–“এত খুশির কারণ কী?”
–“খুশি তো কইতারি না। তবে খালু মানে আপনের বাপে কইল কালকা উঠান পরিষ্কার কইরা দিলে বেশ ভালো বখশিশ দিব। ওডা দিয়া সানগেলাস কিনুম।”
–“সানগ্লাস?”
–“হ। এবার আইয়েন নিচে।”
–“খেতে ইচ্ছে করছে না। খাবার ফ্রিজে রেখে দিস।”
কামরুল অবাক হয়ে তাকাল। এতক্ষণে খেয়াল করল নাহিয়ানকে কেমন অন্যমনস্ক, ভার লাগছে। এটা অবশ্য আসার শুরু থেকেই লাগছে। তবে এখন একটু বেশিই। জিজ্ঞেস করেছিল সে কয়েকবার, নাহিয়ান প্রতিবারই ক্লান্ত বলে কাটিয়ে দিয়েছে। তবে এবার কামরুল নিশ্চিত কিছু তো হয়েছে। নয়তো নাহিয়ান হুট করে এক সপ্তাহের ছুটিতে আসবে না। কামরুল অবশ্য জিজ্ঞেস করল না। নিবিড় শিখিয়েছে, “কেউ কোনো গোপন কথা বলতে না চাইলে তাকে স্পেস দেওয়া উচিত। ভদ্রতার খাতিরে দু’তিন বার জিজ্ঞেস করা যায় কিন্তু এর বেশি না।”
কিন্তু কামরুল কী করে নিবিড়কে বোঝাবে তার পেটের ভেতর গুড়গুড় করে মানুষের সমস্যা শোনার জন্য। তাকে জোকের মতো হাত-পা ধরে থাকতে ইচ্ছা করে। যতক্ষণ না বলবে কামরুল এক ইঞ্চিও নড়বে না। কামরুলের এই অস্থিরতাকে গলা টিপে দিতে হলো। সে শুকনো গলা ছ্যাপ দিয়ে ভিজিয়ে বলল,
–“চা কইরা আনি ভাই, খাইবেন?”
নাহিয়ান মাথা নাড়ায়,
–“দে। মাথাটা ধরেছে।”
কামরুল একটুও দেরী করল না। ছুটে চলে গেল নিচে। চা আনল মালটা চা। নাহিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“চায়ের রং এমন কেন?”
–“এটা মালটা চা। কমলা ভিজাই দিলেই মালটা চা অইয়া যায়।”
কামরুলের মুখভর্তি হাসি। নাহিয়ান চুমুক দেওয়ার সাহস পেল না। সে চোখ পাকিয়ে কামরুলের দিকে চেয়ে আছে। ভার্সিটিতে শুনেছিল তেঁতুল চায়ের কথা। মালটা চায়ের কথা শুনেনি। কামরুল জোর করেই চুমুক দেয়াল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে চা খেতে খারাপ না। তা কামরুল মুখ দেখেই বুঝে নিল।
–“এডা ভাবছি আগে নিবিড় ভাইরে দিয়া টেশ করামু। কিন্তু আপনের লগে বৈষম্য কইরা কাম আছে, কন তো?”
কামরুল থামল। সুযোগ বুঝে বলল,
–“আপনের মন খারাপ ক্যা নীরব ভাই? নামের মতো এমন নীরব থাহেন কেন?”
–“আমি ঠিক আছি কামরুল।”
–“উঁহু, আপনে ঠিক নাই। কামরুলের চোখরে একটা মশাই ফাঁকি দিতে পারে না, আপনে তো মানুষ। সত্যি কইরা কন।”
নাহিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
–“মনের সাথে বিবেকের বোঝাপড়া, খুব কঠিন।”
কামরুল হুট করে এই শক্ত কথা বুঝল না। নাহিয়ান খুব চতুরতার সাথে কামরুলের চায়ের প্রশংসা করে কামরুলকে এই ব্যাপারে ভুলিয়ে দিল।
রাতে কামরুলকে যতটা না খুশি দেখাচ্ছিল সকালে উঠে তাকে ঠিক ততটাই ক্ষিপ্ত দেখাচ্ছে। কোনো এক কারণে তার মুখ ভার, চোখ গরম, থেমে থেমে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। শেইনা অর্থাৎ নাহিয়ানদের ছোটো বোন তা লক্ষ্য করে বলল,
–“ভাইয়া, আমি শিওর কামরুল ভাইকে জ্বিনে আছড় করেছে। আম্মার থেকে শুনেছি একা একা কথা বলা জ্বিনের লক্ষণ। ভাইয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে নাকি?”
শেইনার মাথায় গাট্টা মেরে নাহিয়ান বলল,
–“কামরুল আমাদের আজকের চেনা নয়, ছোটো থেকেই ওকে দেখে আসছি। কোনো কারণে রেগে গেলেই একা একা গালিগালাজ করে। তুই না স্কুলে যাবি বললি?”
শেইনা মুখ ভার করে বলল,
–“তুমিই না বললে আমাকে দিয়ে আসবে? তৈরি হতে যাব?”
–“হুঁ, যা।”
শেইনা চলে গেল। নাহিয়ান ততক্ষণে কামরুলের দিকে এগোচ্ছে। কামরুল আর তার লুঙ্গির গিট্টু খুব শক্ত করে বেঁধেছে। সেই নিয়েই চেয়ারে উঠে একটা লাইট ঠিক করছে। নাহিয়ান শব্দ করে আসতেই কামরুল “ও মাগো” বলে চেঁচিয়ে তার লুঙ্গি খিঁচে ধরল। চোখ বড়ো বড়ো নিচের দিকে চাইতেই দেখল নাহিয়ান মুখ বিকৃত করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নাহিয়ানকে দেখতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চেয়ার থেকে নামল সে।
–“এমন অদ্ভুত আচরণ করছ কেন?”
কামরুল মুখ ঝামটা মেরে একটা গালি দিয়ে বলল,
–“মহাবিপদে পড়ছি ভাই। আতঙ্ক, আতঙ্ক।”
–“মানে কী?”
–“মানে অইলো, ইজ্জতহরণের পরিকল্পনা চলতেছে ভাইজান। আল্লাহ’র গজব পড়ার মতো ইজ্জতহরণ।”
–“কার, তোমার?”
–“তা নয়তো কী? ওইযে, খোরশেদ আলমের বাঈত্তে কাম করে না মাইয়াডা। কী জানি নাম, ও হো.. দোয়েল। মাইয়াডার সাথে তো প্রায়ই আমার ঝগড়া-ঝাটি চলে।”
–“তো?”
–“আজকা বাইরে আমি লাইট লাগাইতেছি, এই মাইয়া কইত্থেইক্কা আইয়া আমার লুঙ্গি ধইরা টান দিছে। আমি সময় মতো না ধরলে বেলতুলিতে আমার মুখ দেখান লাগত না ভাই।” শেষের কথাগুলো কামরুল কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল। তার গলা প্রায় ভেঙে আসছে আতঙ্কে।
নাহিয়ান ভেবেছিল কামরুল চুপ থাকবে, কিন্তু দেখা গেল সে দুপুর অবধি সেই কাজের মেয়ে দোয়েলকে ডিটারজেন্ট ছাড়া ধুঁয়ে দিল। আজকে সে নিজের লুঙ্গি নিয়ে বড্ড সচেতন। আবারও যদি এই অকাজ করে ফেলে কেউ? কামরুল নিবিড়কেও দু’বার কল করল, নিবিড় হয়তো ডিউটিতে.. তাই তার মোবাইল বন্ধ বলছে। নাহিয়ান তা লক্ষ্য করে বলল,
–“ভাইকে কল দিচ্ছ কেন?”
–“ইজ্জতহরণের অপরাধে মামলা দিলে ওই ফকিন্নির কত বছরের জেইল অইব এইডা জানার জন্যে।”
–“সে কথা তো তুমি আব্বাকেও জিজ্ঞেস করতে পারো।”
কামরুল জিভে কামড় দিল। আইলা, সে তো ভুলেই গেছে তার নাকের ডগায় মশিউর সাহেব আছেন। তাকে জিজ্ঞেস করলে তো আরও ভালো ভাবে জানা যাবে। রিটায়ার্ড অফিসার কিনা! কিন্তু দেখা গেল, আজ তার ভাগ্য সহায় নেই। মশিউর সাহেব খুব গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করছেন বেলতুলির বিভিন্ন বড়ো বড়ো মানুষদের নিয়ে। আজকাল বখাটেপনা বেড়ে গেছে জাবিরদের। এদের কারণে আজকাল মেয়েরা চলাফেরা করতে পারছে না। এমন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং-এ কামরুলের মতো চুনোপুঁটির দাম পাওয়া গেল না। অগত্যা, হতাশ হয়ে ফিরতে হলো।
দুদিন পর নাহিয়ান ঠিকই খবর পেল, শুহারার বিয়ে হয়ে গেছে তারই কাজিনের সাথে। আপাতত কিছুদিনের জন্য শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে সে। পড়াশোনার জন্য আবারও ফিরে আসবে। দুই পরিবারের মধ্যে এমনই আলাপ হয়েছে। নাহিয়ানকে এই খবর দিল দীপ্ত নিজেই। নাহিয়ান সেই খবর শুনে দীপ্তকে তার মাকে ডাকতে বলল। দীপ্তের মায়ের সাথে কথা বলে জানাল, দীপ্ত এবং শুহারাকে সে আর পড়াবে না। এহেম হঠাৎ সিদ্ধান্তে দীপ্তের মা অবাক হলেও নাহিয়ান তার সিদ্ধান্তে অনড় রইলো। সে চায় না শুহারার মুখোমুখি হতে। হয়তো সে চোখে চোখ মেলাতেও পারবে না।
সূর্য অস্ত, মাগরিবের নামাজ শেষ হতে না হতেই শেখ বাড়িতে গান-বাজনা শুরু হয়ে গেল। ইয়ামিনের আজ গায়ে হলুদ। গায়ে হলুদের বিভিন্ন রীতিনীতি থাকলেও ইয়ামিনকে এই অনুষ্ঠানের আশেপাশেও দেখা যাচ্ছে না। সেটা লক্ষ্য করে মৌনোর সেঝো মামা ইয়াসীন বললেন,
–“দাঁড়ান আপা, পাগলাটারে আমি ধরে আনি।”
ইয়াসীন মামা সেই যে গেল, এখনো আসার খবর নেই। এদিকে ইয়ামিন থাকা, না থাকা নিয়ে কী থোরাই কেয়ার করে বাড়ির ছোটোরা? ওরা তো গানের তালে সাজগোছ করতে ব্যস্ত। মেয়েদের পার্টি এক ঘরে একজন আরেকজনের ওপর উঠে সাজছে। মেয়েরা নিজেদের সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করে, তার চেয়েও বড়ো কথা.. ইয়াসীন মামা বলেছেন ক্যামেরা আনাবেন ছবি তোলার জন্য। সম্ভবত তার জন্যই আরও উদগ্রীব তারা। একসাথে সব এক ঘরে থাকায় কয়েক দফা ঝগড়াঝাটিও হয়ে গেছে। কেউ মেকআপ ব্রাশ পাচ্ছে না, কেউ চুলের ক্লিপ পাচ্ছে না, কেউ সেইফটিপিন পাচ্ছে না, কেউ কাজল পাচ্ছে না ইত্যাদি। বুশরার তো হলুদ রেশমি চুড়িই ভেঙে গেল দুইটা। সে নিয়ে সেও চেঁচামেঁচি লাগিয়েছে। এসবের মাঝে থেকে মৌনো বেরিয়ে আসতে চেয়েও আসল না। তার হলুদ চুড়ির ডজন সে বুশরাকে দিয়ে দিল। চুড়ির সাইজ একদম খাপে খাপ মিলে যায়। তাই এই মুহূর্তের জন্য বুশরা ক্ষান্ত হলো। তবে হুট করে বুশরা কী ভেবে বলল,
–“আমাকে হলুদ চুড়ি দিয়ে দিলে তুই কী পরবি?”
–“আমার চুড়ি আছে।”
মৌনো তার হাতের সাদা চুড়ি দেখাল। বুশরা অবাক হয়ে বলল,
–“এই বোকা মেয়ে, হলুদ শাড়ির সাথে কেউ সাদা চুড়ি পরে?”
–“পরে আপা। আমি পরব। দেখবে, আমাকে সুন্দর লাগবে।”
বুশরা লক্ষ্য করেছে মৌনোর এই চুড়ির প্রতি প্রচণ্ড কৌতুহল, আদর। এশা অবশ্য বলেছিল এই চুড়ি নিবিড় তাকে দিয়েছে। বুশরা সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে মৌনোকে লজ্জায় ফেলতে চাইল না। আমাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব পছন্দ আছে। সেই পছন্দে হস্তক্ষেপ না করাটাই যুক্তিযুক্ত। তবে সে নিজেও হাসল মৌনোর চোখ ভরা উচ্ছ্বাস দেখে। মেয়েটা প্রেমে টেমে পড়েছে নাকি? নিবিড়ের ওপর? কিন্তু মৌনো না বলল নিবিড়ের বিয়ে ঠিক? হঠাৎই তার মাথায় চিন্তা ভর করল। হিসেব তো কোনো দিকেই মিলছে না তার।
মৌনো হাতে চুড়ি পরে হাত নাড়িয়ে চুড়ির শব্দ শুনল। তার আগে থেকেই চুড়ির ঝুনঝুনি শব্দ পছন্দের। এই সাদা চুড়ির সুর তো আরও আদুরে হয়ে গেছে। সে কতবার, কতভাবে এই এক সুর শুনেছে। তার এত খুশি হচ্ছে কেন? নিবিড় দিয়েছে বলে? অবশ্য, সে এখন নিজেও স্বীকার করে সে নিবিড়কে পছন্দ করে। সে জানে, পছন্দ করাটা কোনো পাপ নয়। তবে নিবিড়ের মতো মানুষকে সে কী করে পছন্দ করে ফেলল এটাই মূলত ভাবনার বিষয়।
নিবিড়ের সাথে তার শেষ দেখাটা সেই রেললাইনেই ছিল। এরপর মৌনো ব্যস্ত হয়ে গেল ইয়ামিনের বিয়ে উপলক্ষ্যে। শুধু রাতের আঁধারেই তাকে ভাবার মতো ফুরসত ছিলো। আজ যে নিবিড় আসবে না তা সে জানে। তাই নিবিড়ের দেওয়া চুড়ি পরে ঘুরতে দ্বিধা নেই। অবশ্য, নিবিড় আসলে সে লজ্জার সম্মুখীন হতো। সে কখনোই চায় না তার এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুখগুলো নিবিড়ের কাছে ধরা দিক। এমনিতেও সে টিনেজ বয়সের সবচেয়ে বড়ো ভুলটা করে ফেলেছে প্রেমে পড়ে। অথচ মন-ভালোবাসা কি আর এত বয়সে নিয়ন্ত্রণ হয়?
রিমঝিম এশাকে নিয়ে অনুষ্ঠানের এক পাশে বসা। রাজিয়া শেখ তার আত্নীয়দের সাথে চুটিয়ে আলাপ করছেন। ওনাকে বহুদিন পর এতটা খুশি দেখছে সে। বাড়িতে তো প্রায়ই কেমন খিটখিটে হয়ে থাকেন। অবশ্য, তিনি চার ছেলে-মেয়ের মা। এত ছেলে-মেয়ে থাকলে মায়েদের মেজাজ খিটখিটে থাকাটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে তিনি এশা আর জুনায়েদকে নিয়ে যা ঝড়-তুফান তোলেন রোজ রোজ। সেক্ষেত্রে তাকে এখানে খুশি দেখতে মন্দ লাগছে না। নারী-পুরুষ যেকোনো বয়সেই বহুদিন পরপর তার আপন মানুষ দেখলে নিজেদের সর্বোচ্চ সুখী মানুষ হিসেবে অনুভব করেন। অথচ এখানে ভিন্ন চিত্র রিয়াজ সাহেবের ক্ষেত্রে। ভদ্রলোক ভীষণ চিন্তিত হয়ে একপাশে বসে আছেন বড়ো মামার সাথে। বড়ো মামা সবেই ব্যস্ততা ছেড়ে বসেছেন। বিয়ের আয়োজনে সবচেয়ে বেশি ছুটছেন তিনি নিজেই। বসারই সুযোগ মিলছে না ভদ্রলোকের।
রিমঝিম জানে তার বাবার এহেম মুখ ভার করে থাকার কারণ। দুইদিন যাবৎ বাবার পেশেন্টরা বেশ চাপ দিচ্ছেন। রোজই তিন বেলা করে কল করছেন। রিমঝিম খেয়াল করে দেখেছে, সারা বছর রিয়াজ সাহেবের রোগীর চাপ না থাকলেও কোথাও বেড়াতে আসলেই তার রোগীর সংখ্যা হুড়মুড়িয়ে বেড়ে যায়। আর তিনিও তাদের নিয়ে ছুটে রওনা হন বাড়ির উদ্দেশে। এ নিয়ে রাজিয়া শেখ প্রায়ই চেঁচামেচি করতেন। রিয়াজ সাহেব এবারও এই কাজ করত, কিন্তু ছোটো শালার বিয়ে। বসতেও পারছেন না আবার যেতেও পারছেন না। দুই নৌকায় পা দিয়ে থাকার মতো অবস্থা। প্রায়ই তিনি রিমঝিম, রাজিয়া শেখকে জিজ্ঞেস করছেন, বিয়েশাদির কেচ্ছা মিটবে কবে? রিমঝিম সঠিক উত্তর দিলেও রাজিয়া শেখ সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভাইয়ের বিয়ে পুরোপুরি না দেখে তিনি এক পাও নড়বেন না। অগত্যা, স্ত্রীর খপ্পরে তিনিও থেকে গেছেন।
রিমঝিমের এই ছুটির দিনগুলো মন্দ কাটছে না। বরং ঢাকার জীবন থেকে বেশ রিফ্রেশ দিচ্ছে এই দিনগুলো। চারপাশে পছন্দের মানুষেরা, কাজিনদের সাথে আড্ডা, সময় করে বাংলোর পেছন দিক থেকে বিভিন্ন ফল কুড়িয়ে খাওয়া, ডাব খাওয়া, কানামাছি খেলা সবই কী দারুণ কাটছে। রিমঝিমের মনে হচ্ছে সে যেন কোনো স্বপ্নের ভুবনে বসবাস করছে। ঢাকার মরিচিকার জীবনও যে তার ছিল সে প্রায় ভুলেই বসেছে। তার বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে প্রণভের বলা শেষ কথাগুলো।
–“এই সাতদিন আপনি নিজের মতো করে কাটাবেন, রিমঝিম।”
রিমঝিমের গভীর ভাবনার মাঝে এশা তার কোল থেকে ছুটে পালিয়েছে। রিমঝিম তার পিছু নিতে গিয়ে এক অপরিচিত ভদ্রলোকের মুখোমুখি হলো। তামাটে বর্ণের লম্বাটে লোক সে। বয়স সম্ভবত ত্রিশ ছুঁইছুঁই। ভদ্রলোক তাকে সৌজন্যতার সাথে সালাম দিয়ে বলল,
–“দুঃখিত, আমি কনেপক্ষের। অফিস থেকে এসেছি তো, হয়তো ওরা আসার আগেই চলে এসেছি।”
কনেপক্ষের কথা শুনে রিমঝিম দমে গেল। নিজেও গলায় বিনয় ঢেলে বলল,
–“দুঃখিত বলার কিছু নেই। আপনি এসে ভালোই করেছেন। দাঁড়ান, বড়ো কাউকে ডেকে দিচ্ছি।”
–“না না। ব্যস্ত হবেন না প্লিজ। আমি ঠিক আছি। আপনার শুধু ইয়ামিনকে ডেকে দিলেই হবে।”
ইয়ামিন? সে তো এখনো ফিরেইনি। ইয়াসিন মামা সেই কখন তাকে খুঁজতে গেছে। এখন এই কথাটা ভদ্রলোককে কীভাবে বোঝানো যায় সে ভেবে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। রিমঝিম যথাসাধ্য সৌজন্যতা বজায় রেখে বলল,
–“মামা আসলে এদিকে নেই। আপনি এই চেয়ারটায় বসুন।”
চারপাশে উচ্চস্বরে তখনো গান-বাজনা চলছে। সবাই সবার মতো করে ব্যস্ত। ভদ্রলোক রিমঝিমের কথা মেনে নিয়ে বসল। সে নিজেও কিছুটা ইতঃস্তত হয়ে বলল,
–“যদি কিছু মনে না করেন আপনিও আমার পাশে বসতে পারেন। আমার আসলে অদ্ভুত লাগছে একা একা।”
রিমঝিম এশাকে খুঁজতে চেয়েও পারল না। ভদ্রতা বজায় রেখে কিছুটা দূরত্বের চেয়ারে বসল। ভদ্রলোক প্রশ্ন করল,
–“আপনি পাত্রের কী হন?”
–“জি, ইয়ামিন আমার মামা হন।”
–“ওহ। আমি ইয়ামিনের বন্ধুও হই, আবার পাত্রীর দুর্সম্পর্কের আত্নীয়। আমার নাম রাহাত। আপনি মাইন্ড না করলে আপনার নাম জানতে পারি?”
–“আমার নাম রিমঝিম।”
ওদের মধ্যে আরও অনেকক্ষণ কথাবার্তা হলো। ভদ্রলোক অত্যন্ত নমনীয়তা বজায় রাখল। রিমঝিমকে অস্বস্তিতে ফেলার মতো কোনো প্রশ্নও করল না। রিমঝিম থেকে স্বস্তি পেল, সাথে অনুভব করল ভদ্রলোক মন্দ নয়। তাদের মধ্যে হালকা আন্ডাস্ট্যান্ডিং হতেও বেশি সময় লাগল না।
মৌনো একপাশে জুনায়েদের মাথায় চড় দিচ্ছে বারবার। জুনায়েদ নাকি কোন মেয়েকে বাজে কথা বলেছে। কিন্তু জুনায়েদ তা অস্বীকার করছে। বারবার বলছে,
–“বিশ্বাস করো আপা, আমি লুকিয়ে সিগারেট খেতে পারি কিন্তু কখনোই কোনো মেয়েকে বাজে কথা বলিনি। ওটা এখানকারই কোনো এক ছেলে বলেছে। ওর নামটা খেয়ালে আসছে না।”
–“চুপ! আবারও মিথ্যে কথা? দোষ করছিস আবার অস্বীকারও করছিস? দিব মায়ের কাছে বিচার? ঠ্যাং ভেঙে দিবে একদম।”
জুনায়েদের মুখ করুণ দেখাল।
–“আল্লাহর কসম কাটছি আপা, সত্যি আমি কাউকে কিছু বলিনি। আমার তিনজন বোন আছে, আমি জানি মেয়েদের কীভাবে সম্মান করতে হয়। তুমি আর রিমঝিম আপাই তো শিখিয়েছ আমাকে। তোমাদের ভাই হয়ে আমি এরকম কিছু করতে পারি?”
দেখা গেল জুনায়েদ সত্যিই বলছে। সেই আসল বদটাকে ধরতে মৌনোর সময় লাগল না। ছেলেটা এখানকার স্থানীয়, তবে মৌনোর থেকে ছোটো। মৌনো বেশ বকে দিল ছেলেটাকে। এর মাঝে কনেপক্ষের মানুষরা চলে এলো, সাথে ইয়ামিন নিজেও। ইয়ামিন আসল কনেপক্ষ আসার দুই মিনিট আগে। মৌনো এবং তার কাজিনরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল তাদের আপ্যায়ন করতে। এর মাঝে এক বদনজরের শিকার হলো সে। সম্ভবত কনেপক্ষের ছেলেটা। এই ছেলেটা বারবার তাকে রসিয়ে রসিয়ে “বেয়াইন” ডাকছে আর কাছে আসার ইশারা করছে। মৌনোর আগে থেকেই বেয়াই বেয়াইন নামের ঘেষাঘেষি পছন্দ না। তবুও সে চাইল না ঝামেলা করতে। ঝামেলা এড়াতে সে ছেলেটাকে এড়িয়ে গেল। কিন্তু আফসোস, মৌনোর সৌন্দর্য বরাবরই তার জন্য অভিশাপ। এই বিয়ে বাড়িতেও সে মানুষের নজর থেকে স্বস্তি পাচ্ছে না। এর মাঝে হঠাৎ কেউ তার হাত চেপে ধরতেই চুড়ি ভেঙে গেল। হাতে চুড়ি ঢোকার আগেই ওপাশের মানুষটা সরে গেল। বেয়াইন বলে ফ্লার্ট করা ছেলেটা মুচকি হেসে বলল,
–“সরি সরি। আমি বুঝতে পারিনি ভেঙে যাবে।”
মৌনো লাল হয়ে এক নজরে ঘাসের ওপর ভাঙা চুড়ির দিকে চেয়ে রইলো। সে অনুভব করল, মানহীনে তার কান গরম হয়ে গেছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে তার। মাথা তুলল না পাছে অসভ্য ছেলেটা তার চোখের পানি দেখে ফেলবে। মৌনো মোটেও অচেনা কারো স্পর্শ সহ্য করতে পারে না, সেখানে আজ তার সাথে এমন সম্মানহানী হয়ে গেল? চেনা নেই জানা নেই একটা ছেলে এসে তার হাত ধরে টান দিল? এটা কী ধরণের অভদ্রতা। তার বুক পোড়ার আরও একটা কারণ হচ্ছে নিবিড়ের দেওয়া চুড়ির কয়েকটা এই ছেলেই ভেঙে দিয়েছে। মৌনোর অতি যত্নের চুড়ি এখন ভেঙে অবহেলায় ঘাসের ওপর পড়ে আছে।
–“কী হচ্ছে এখানে?”
মৌনো বিমূঢ় হয়ে গেল পরিচিত ভরাট কণ্ঠস্বর শুনে। সে তৎক্ষনাৎ পিছে ফিরে তাকাল। মুহূর্তেই টুপ করে মৌনোর চোখের এক ফোটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়াল। অবিশ্বাস্য চোখে দেখল। নিবিড়!? নিবিড়ের চোয়াল শক্ত। সে স্থির নজরে মৌনোর লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখল। পরপর শক্ত চোখে তাকাল ছেলেটার দিকে। ছেলেটা আমতা আমতা করল,
–“আসলে আমি ওনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।”
–“কথা বলতে চাচ্ছিলেন কেন অচেনা অজানা মেয়ের সাথে? কমনসেন্স কিংবা ম্যানারস নেই? কোন সাহসে আমাদের বাড়ির মেয়ের হাত ধরে টান দিয়েছেন আপনি? হাতটা ভেঙে দিলে বুঝি ব্রেইন খুলবে??”
©লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে—
[যাদের সামনে এই পোস্ট পৌঁছাবে, আপনারা সাড়া দিবেন। এত বড়ো পর্ব উপলক্ষ্যে নিশ্চয়ই আপনাদের সুন্দর সুন্দর মন্তব্য ডিজার্ভ করি?]
বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর নজরে দেখবেন। প্রায় ৩ হাজার শব্দের কাছাকাছি এই পর্বটা। আশা রাখছি আপনারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবেন। যারা আগের পর্ব পড়েননি তারা পড়ে আসুন। আমি রিচেক পরে দিব। এখন ঘুমাসছে, মেডিসিনের জন্য চোখ খুলে রাখা দায় হয়ে পড়েছে।
Share On:
TAGS: বেলতুলি, লাবিবা ওয়াহিদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বেলতুলি পর্ব ৬
-
বেলতুলি পর্ব ৮
-
বেলতুলি পর্ব ১৪
-
বেলতুলি পর্ব ২
-
বেলতুলি পর্ব ২০
-
বেলতুলি পর্ব ২১
-
বেলতুলি পর্ব ১৯
-
বেলতুলি পর্ব ১৫
-
বেলতুলি পর্ব ১০
-
বেলতুলি পর্ব ৪