বেলতুলি – [২১]
লাবিবা ওয়াহিদ
এশা মূলত গোলাপী রঙের হাওয়াই মিঠাই দেখেই সে এতটা খুশি। মৌনো এশাকে চুপ করতে চেয়েও বিশেষ সুবিধা হলো না। নিবিড় এবারও এশাকে বাঁধা দিল না। নিবিড় টাকা দিয়ে বলল,
–“দুটো দিন।”
–“দুটো কেন? একটাই..”
নিবিড় মৌনোর দিকে তাকিয়ে বলল,
–“তোর জন্যও একটা।”
মৌনো অবাক হয়ে বলল,
–“আমি কেন? আমি কী বাচ্চা নাকি?”
–“তুইও বাচ্চা। শুধু হাতে-পায়েই একটু বড়ো হয়েছিস, দ্যাটস ইট!”
হাওয়াই মিঠাইয়ের সাথে রেললাইন ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতা মৌনোর এবার প্রথম হয়েছে। তার তো ইচ্ছে করছে লাইনের ওপর দিয়ে হাঁটতে। কিন্তু শাড়ি নিয়ে এবং পায়ের তাজা ব্যথা নিয়ে তা সম্ভব নয়। তবে সে নিয়ে তার আফসোস নেই। সে তো দিব্যি বিকালের শীতল বাতাস ছুঁয়ে নিবিড়কে দেখছে। নিবিড় তার থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে, শুধু সেই ধীরে-সুস্থে পাথর দেখে হাঁটছে। এশা নিবিড়ের হাত ধরে রেললাইন ধরে হাঁটছে আর খিলখিল করে হাসছে। এশার বেলায় নিবিড়ের ধৈর্য বেশ প্রশংসনীয়। নয়তো নিবিড়ের যা মেজাজ, এশার বায়নাতে নির্ঘাত তুলে আছার দিত। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, তেমন কিছুই হচ্ছে না। উলটো নিবিড় তাকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।
এশার প্রতি কেন যেন তার একটু ঈর্ষা অনুভব হলো। আচ্ছা, এশাকে নিবিড়ের দেওয়া এক শতাংশ প্রশ্রয় সে পেলে কি করত? নিবিড়ও কী তাকে হাত ধরে লাইন ধরে হাঁটতে সাহায্য করত? সেও কী খিলখিল করে হাসত? কিন্তু কেন যেন এই দৃশ্য তার কল্পনায় এলো না। কল্পনায় এলো অন্যরকম কিছু। কল্পনায় সে নিবিড়কে তার আবদারের কথা বলতেই মনে হলো নিবিড় আবার তাকে বকে মুখ ভোতা করে দিয়েছে। ভালোই হয়েছে, বাস্তবে কিছু বলেনি। তার ইচ্ছেও হয়নি রেললাইন ধরে হাঁটার। সে মানুষ হিসেবে ছোটো হলেও মাঝেমধ্যে মান-সম্মানেরও খুব চিন্তা হয়। নিবিড় তাকে ঘুরতে নিয়ে এসেছে, হাওয়াই মিঠাই কিনে দিয়েছে এও তো অষ্টম আশ্চর্যের থেকে কমকিছু নয়।
–“আপু, তুমি এত ঢিলেমি করে খাচ্ছ কেন? হাওয়াই মিঠাই তো তোমার নাকের মতো বোচা হয়ে যাচ্ছে।”
মৌনোর গা জ্বলে উঠল এশার ত্যাড়া কথায়। তাদের হাঁটা আপাতত শেষ, মৌনোও থেমে গেল।
–“তুমি না খেতে পারলে আমাকে দাও। আমারটা অনেক আগেই শেষ।”
–“এশা, নিষেধ করেছি এই ধরণের কথা-বার্তা বলতে। সুন্দর করে কথা বলতে শিখাইনি?”
এশা মৌনোর রাগ দেখে দমে গেল। সে নিবিড়ের কাছে বিচার দেওয়ার চেষ্টা চালাল,
–“ভাইয়া, দেখেছ। আপা আমাকে আবার বকছে। সবসময় বকে।”
এশার বিচারে নিবিড়ের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া হলো কিনা বোঝা গেল না। মৌনো অন্যদিকে ফিরে দ্রুত বাকি হাওয়াই মিঠাইটুকু মুখে পুরে নিল। এর মাঝে হঠাৎ ফোনের ক্যামেরা ক্লিকের শব্দ শোনা গেল। মৌনো তড়িৎ পেছনে ফিরে দেখল নিবিড় তার পিঠমুখী, আঁকাবাঁকা সামনের ট্রেন লাইনের ছবি তুলছে। এশা তখন পাথর কুড়াতে ব্যস্ত। সে নিমিষেই ভুলে গিয়েছে নিবিড়কে সে বিচার দিয়েছিল। মৌনো দীর্ঘশ্বাস ফেলল, অথচ সে বোকার মতো ভেবেছিল নিবিড় বোধ হয় তার ছবি তুলেছে। এই অকেজো ভাবনা মৌনোর মতো ভদ্র মেয়ের মাথায় উঁকি দিয়েছে জানলে নিবিড় নিজেই হয়তো কপাল অস্বাভাবিক কুঁচকে তার দিকে তাকাবে, কি লজ্জার।
ট্রেন আসতে বেশি সময় নেই। এজন্য নিবিড় আগেই দুই বোনকে ট্রেন লাইন থেকে কিছুটা দূরত্বে সরিয়ে নিয়েছে। এর মাঝে এশা আবারও অস্ফুট স্বরে চেঁচাল। সে দূরে লেইসফিতা দেখতে পেয়েছে। লেইসফিতাও নিজের পণ্য বিক্রির লোভে এদিকেই এলো। এশা মৌনোর হাত না ধরে উলটো নিবিড়ের ডান হাত ধরে ঝুলছে। মৌনো এতে বেশ বিরক্ত লাগল। সে নিজেই এশার হাত ছুটিয়ে নিল নিবিড়ের থেকে।
–“যা লাগবে আমাকে বল। ওনাকে বিরক্ত করছিস কেন?”
লেইসফিতা ততক্ষণে তার জাদুর বাক্স খুলে বসেছে। মৌনোর কথাতে নিবিড় ভ্রু কুঁচকালেও কিছু বলল না। এশা তাই করল। আবদার করল টিপ আর খেলনার। আরও কিছু কিনতে চাইলেও মৌনো কিনতে দিল না। কিন্তু টাকা দেওয়ার সময়ে দেখা গেল নিবিড় টাকা দিতে দিল না। কী আশ্চর্য, নিবিড় এমন করছে কেন?
–“আমি তো কিনে দিচ্ছিই..”
–“আমার মেইল ইগো আছে মৌনো। আমি থাকতে একটা হাঁটুর বয়সী মেয়ে কেন টাকা দিবে? দূরে সরে দাঁড়া।”
মৌনো বেশ রাগ হলো। সে উলটো ভাবতে লাগল সে কীভাবে নিবিড়ের এই টাকা শোধ করবে? ভাবনার মাঝে নিবিড় ডাকল তাকে।
–“মৌনো, সাদা চুড়িটা হাতে দিয়ে দেখ তো মাপে হয় কিনা?”
মৌনোর মনে হলো সে আকাশ থেকে শব্দ করে জমিনে এসে পড়েছে। সে লেইসফিতার বাক্সের দিকে তাকাল। সেখানে কিছু রেশমি চুড়িও উঁকি দিচ্ছে।
–“মানে? চুড়ি..”
–“প্রশ্ন করতে বলেছি? বাংলা বুঝিস না?”
মৌনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো একটা চুড়ি পরল।
–“সবগুলা পর।”
মৌনো সবগুলো পরতেই নিবিড় তীক্ষ্ণ নজরে তার হাতে চুড়িগুলো দেখল। অতঃপর সে দাম মিটিয়ে দিল। এতে মৌনো কিছু বলার বদলে নির্বাক রইলো। নিবিড় শুরুতে কিছু না বললেও ধীরে-সুস্থে অন্য দিকে ফিরে বলল,
–“কেমন বোকা তুই, শাড়ি পরেছিস অথচ হাত খালি। স্টুপিড!”
মৌনো তখন অবাকের চরম পর্যায়ে। সে কী ভুল শুনল? এই কথা কী আদৌ নিবিড় বলেছে? নিবিড়!! মৌনো অনুভব করল তার হাত মৃদু কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ কাঠ হয়ে আছে। এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ট্রেন দ্রুত গতিতে ছুটে এলো। ট্রেনের গতিতে জমিন অসম্ভব কাঁপছে। এশা মৌনোকে শক্ত করে ধরে নিবিড়কে জিজ্ঞেস করছে মাটি কাঁপছে কেন, নিবিড় খুব স্বাভাবিকভাবেই তার উত্তর দিচ্ছে। এদিকে মৌনো শূন্য চোখে ট্রেন দেখছে। হাতে তখনো চুড়িগুলো তার জড়িয়ে আছে।
নাহিয়ান দাঁতের ডাক্তার অর্থাৎ মৌনোদের ফাঁকা বাড়িটায় চোখ বুলালো। গতকাল সে ছুটিতে এসেছে ঢাকায়। সেই থেকেই এই বাড়িটা নীরব দেখছে। মায়ের থেকে শুনেছে ওরা নাকি বিয়ে খেতে চট্টগ্রামের গিয়েছে। নিবিড়কে ভোরে কল করেছিল, সেখান থেকে শুনেছে তার সাথে নাকি মৌনোর দেখা হয়েছে। সম্ভবত ওরা ফিরতে ফিরতে নাহিয়ান আবারও রাজশাহী চলে যাবে। সেমিস্টার শেষের কারণে ক’টাদিন ছুটি পেয়েছে। ছুটি পেয়ে তাই দেরী করেনি।
কামরুল এমন সময়ে ডাকল,
–“ছোটো ভাইজান আহেন। বাজারে যাইতেন না?”
নাহিয়ান কামরুলের দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে বলল,
–“বিকাল বেলা কে যায় বাজারে?”
–“চিনি শ্যাষ! চিনি ছাড়া সন্ধ্যায় চা জমেনি? এইল্লিগা আপনের মা পাঠাইল। আপনে গেলে একটু ঘুইরাও আইলেন।”
নাহিয়ান কিছু একটা ভেবে বলল,
–“চলো।”
কামরুল লুঙ্গিতে গিট্টু দিতে দিতে আগাচ্ছে। তার ভাবসাবই যেন আলাদা। নিবিড় বা নাহিয়ান থাকলে তার আবার বুকের সাহস খুব বেড়ে যায়। চুরি-বাটপারি সবই করতে পারবে এই দুই ভাইয়ের কোনো একজনের হাত কাঁধে থাকলে। সে জানে না, কেন এত ভরসা খুঁজে পায় দুজনের মাঝে। এই পরিবারের কেউই তাকে কাজের লোকের মতো ট্রিট করে না। যেন সে তাদের পরিবারেরই একজন। এই পরিবারের জন্য কামরুল যেন জীবন দিয়ে দিতে পারবে।
কামরুল গলির মাঠে রত্নাকে দেখতেই নাহিয়ানকে বলে উঠল,
–“ভাইসাব ওই দ্যাহেন। আমগো ভাবী। দ্যাহেন মোবাইল ছাড়া কেমন এতিম এতিম লাগতাছে। আহারে, কলটল দিতে পারে না বড়ো ভাইরে।”
শেষ বাক্যটা বড্ড আফসোসের সুরে বলল কামরুল। নাহিয়ান ভ্রু কুঁচকে দেখল রত্নাকে। রত্নার রঙিন চুলই তার চোখে লাগল সবার আগে৷ নিবিড়ের সাথে এই রত্নাকে ভাবতেই তার মুখ তেতো হয়ে উঠল। সে বড়ো ভাইয়ের রুচি সম্পর্কে অবগত। নির্ঘাত এই মেয়েকে দেখেই নিবিড় পালিয়েছে।
–“মোবাইল ছাড়া এতিম বলতে?”
–“আ! জানেন না? এই কামরুল কি করছে? আমি মোবাইল চুরি করাইছে!” কামরুল হো হো করে হেসে উঠল।
–“চুরি? মানে কী?”
–“লম্বা কাহিনী, বাড়ি গিয়া কমু।”
–“কামরুল! বেশি পণ্ডিতি কোরো না। খাদে পড়লে বুঝবা।”
কামরুল দাঁত কেলিয়ে বলল,
–“এবারকার পণ্ডিতি আমি করি নাই ভাই, নিবিড় ভাই করাইছে। বখশিশও পাইছি মাশাআল্লাহ।”
নাহিয়ান হতভম্ভ।
–“নিবিড় ভাই..?”
–“হ। কি আর করব বেচারায়। আপনের মা ত পারতেছে গলায় ছু(১)রি চালায়ে ভাইরে এই রত্না থুরি, ভাবীর লগে বিয়া করাই দিতে চাইতেছে।”
জাবির চা খেতে খেতে আলস্য চোখে কামরুল আর নাহিয়ানকে দেখছে। তার আজকাল বেশ বিরক্ত লাগছে। প্রায় চারদিন ধরে মৌনো নেই। কবে, কোথায় গেছে তাও বলতে পারবে না। তবে সে যখন এলাকায় ছিল না তখনই গেছে সেটা নিশ্চিত। সে নেতার কিছু কাজে অন্য এলাকায় গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরতে না ফিরতেই শুনে মৌনো নেই। মেজাজটা গরম হয় না? সেই থেকেই আজারে ঘুরছে, ফিরছে আর চা খাচ্ছে। পান-সিগারেট সেসব তো নিত্যদিনের সঙ্গীই।
জাবির তার চ্যালা রিপনকে কামরুলের পাশেরজন দেখিয়ে বলল,
–“এই মালটা কেরে? আগে দেখছিলাম?”
–“কি কন ভাই। এডা পুলিশের আরেক পুত। নীরব-সরব নাকি কি জানি নাম!”
–“এই মাল কই থেইক্কা টপকাইছে? থাকে কই?”
–“হুনছি পড়ালেহা করে। কই করে ওইডা কইতে পারি না। মনে হয় ছুটি ফুটিতে আইছে।”
–“আইলে আহুক, আমার কি। আমার তো মৌনোরে লাগল।”
মঞ্জু দাঁত বের করে বলল,
–“আহা, আমাগো ভাই ভাবীর লেইজ্ঞা কত পাগল। এবার ভাবী আইলে বিয়াডা কইরালান ভাই।”
বিয়ের কথা শুনে জাবির মুখের রং পালটে গেল। অত্যন্ত রেগে বলল,
–“হারামজাদা, তোরে কইছিলাম বিয়া-টিয়ার নাম না নিতে। কথায় না হুনলে ক, কয়ডা দিয়া মাথায় ঢুকাই!” শা**।”
জাবির চায়ের খালি কাপটা রেখে বলল,
–“পিছে আইবি না। আমি আরেকদিকে যাইতেছি।”
রিপন কিছু একটা আন্দাজ করে বলল,
–“কোচিং সেন্টারের দিকে নাকি ভাই? ওই মাইয়াডা?”
জাবির পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হেসে চলে গেল। এতক্ষণে কোচিং ছুটি হয়ে যাওয়ার কথা।
রাতে নাহিয়ানকে দীপ্ত কল করল। নাহিয়ান এক পলক নামটার দিকে চেয়ে কল রিসিভ করল। গলা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল,
–“হ্যালো?”
–“স্যার, আমি দীপ্ত।”
–“জানি, বলো।”
–“আপনি কোথায় স্যার?”
–“ঢাকাতে।”
–“ঢাকা? ঢাকা কবে গেলেন স্যার? পরশু তো শুহারা আপুর বিয়ে। আপনি বিয়ে খেতে আসবেন না?”
নাহিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
–“যাওয়া তো সম্ভব না, তাই দূর থেকে দোয়াই দিয়ে দিলাম।”
কলের ওপাশ থেকে কেউ ফিসফিস করে কিছু বলল। দীপ্ত মুখ ফসকে বলল,
–“আপু বলছে, আপনি নাকি অনেক নির্দয় আর পাষাণ.. স্যার। আপনি নাকি আপুকে বুঝেন না।”
ওপাশ থেকে মনে হলো দীপ্তর মাথায় কেউ জোরে বারি দিল তার বোকা কথাবার্তার জন্য। নাহিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“তোমার পাশে শুহারা, তাই না দীপ্ত?”
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~~
বিঃদ্রঃ রিচেক পরে দিচ্ছি। কেমন লেগেছে জানাবেন।
Share On:
TAGS: বেলতুলি, লাবিবা ওয়াহিদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বেলতুলি পর্ব ১৬
-
বেলতুলি পর্ব ৪
-
বেলতুলি পর্ব ৫
-
বেলতুলি পর্ব ৮
-
বেলতুলি গল্পের লিংক
-
বেলতুলি পর্ব ৯
-
বেলতুলি পর্ব ১৪
-
বেলতুলি পর্ব ১৮
-
বেলতুলি পর্ব ১২
-
বেলতুলি পর্ব ১