Golpo romantic golpo বেলতুলি

বেলতুলি পর্ব ২০


বেলতুলি – [২০]

লাবিবা ওয়াহিদ

[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]

পাঁচটা নয়, মৌনো একদম চারটা পঞ্চান্নতে তৈরি হয়ে বাইরে দাঁড়ানো। তবে তার মুখে হাসি নেই। একরাশ বিরক্তি, খারাপ মেজাজ তাকে জড়িয়ে রেখেছে। ওইযে বলে না, অতিরিক্ত পরিকল্পনা আমাদের স্বাস্থ্য-মনের জন্য ক্ষতিকর? তার মনের ভেতর যত ঘুরে বেড়ানোর কল্পনা, পরিকল্পনা ছিল তা সব ভেস্তে গিয়েছে। ভেস্তে দিয়েছে তাও চার ফুট দুই ইঞ্চির এশা! ইদানীং আমিতাভের বলিউড সিনেমা “ভূতনাথ” দেখেছে। সেই দেখার পর থেকেই আজকাল রাগ উঠলেই এশাকে “চার ফুট দুই ইঞ্চি” বলে কটাক্ষ করে।

এশা অবশ্য এখনো এটাকে কটাক্ষ হিসেবে নেয়নি। সে উলটো সবাইকে বলে বেড়ায়,
–“জানো, মৌনো আপু আমাকে চার ফুট দুই ইঞ্চি বলে ডাকে। আমার আর কাউকে আমার হাইট বলতে হবে না ইয়ামিন মামার মতো।”

নিবিড়ের সাথে ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে এশা একপ্রকার মাটিতে গড়াগড়ি করেছে। রীতিমতো বুশরা এবং মৌনোকে হুমকি দিয়েছে, যদি সে না যায় তবে মৌনো আর বুশরাকে ফাঁসিয়ে দিবে। বুশরাও তখন অবাক হয়ে বলেছিল,
–“এই হাঁটুর বয়সী মেয়ে এত চতুর কী করে?”

এর উত্তর অবশ্য মৌনোর কাছে নেই। তাদের তিন ভাই-বোনও এত চতুর ছিল না, যতটা এশা একা হয়েছে। এশা যখন বুঝল মৌনোদের দিয়ে কাজ হচ্ছে না, সে চলে গেল মায়ের সামনে গড়াগড়ি খেতে। সে বের হবেই, নয়তো সে খাবে না, ঘুমোবে না। বিয়ে বাড়িতে মেয়ের এমন গড়াগড়ি, উচ্চ গলায় কান্নাকাটির তোপে পড়ে রাজিয়া শেখও অতীষ্ঠ হয়ে মেঝো মেয়ের গলায় ঝুলিয়ে দিলেন। অথচ মৌনোর কথা ছিল, সে আর বুশরা একসাথে বের হলেও বুশরা অন্য কাজে চলে যাবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি, হাড্ডিটাকেও কাবাবের সাথে টানতে হবে।

হাত ঘড়ির কাটা চারটা বেজে আটান্ন। এশা মৌনোর পাশেই চারপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে গুণগুণ করছে। এতে মৌনোর আগুনে ঘি পড়ল যেন। সে নাক কুঁচকে বলল,
–“এই চার ফুট দুই ইঞ্চি! তোকে বলেছিলাম আসার সময়ে চিপস আনব। তোকে কে বলেছে আমার লেজ ধরে বেরিয়ে আসতে?”

মৌনোর কথায় এশাকে খুব চিন্তিত দেখাল। মানুষের তো লেজ নেই, তাহলে সে মৌনোর লেজ কখন ধরল? সে উলটো মৌনোর পিছে লেজ খুঁজল। মৌনো তা বুঝতে পেরে তখনই এশার মাথায় গাট্টা দিল। এশা মুখ গোমড়া করে বলল,
–“মারো কেন, তুমিই তো বললে লেজের কথা।”

–“এতকিছু বুঝিস অথচ এটা বুঝিস না আমি কথার কথা বলেছি? বলদ! এখনো সময় আছে, বাড়ি ফিরে যা। নয়তো তোকে রাস্তায় ফেলে আসব।”

এশা তার জেদে অনড়, সে কিছুতেই যাবে না।
–“যাব না।”
–“যাবি।”

–“তুমি সাথে না নিয়ে গেলে আমি বাড়িতে বলে দিব তুমি নিবিড় ভাইয়ের সাথে একা একা ঘুরবে।”

–“বল গিয়ে যা খুশি। ইয়ামিন মামা আগে থেকেই জানে।”

এশা বুঝল, সে তার অতি বুদ্ধমতী বোনের সাথে কথায় পারবে না। এজন্য আরও কিছু ভাবতে চাইছিল কিন্তু তখনই নিবিড় রিকশায় করে এসেছে। নিবিড় ভাড়া না মিটিয়ে রিকশাতেই বসে রইলো, মৌনোকে দেখল। মৌনো খুব সুন্দর করে সাদা শাড়ি পরেছে। শাড়ি সাদাই কেন, তা মৌনোর নিজেরও জানা নেই। এই মেয়েকে দেখে কেউ বলবে না গতকাল সে খুড়িয়ে হাঁটছিল।

নিবিড়কে দেখতেই এশা খুশিতে ডেকে উঠল,
–“নিবিড় ভাইই!”

নিবিড় হালকা মাথা নাড়িয়ে মৌনোর উদ্দেশে বলল,
–“এক্সট্রা রিকশা পাইনি। উঠ।”

–“এশাকে আমি ফিরিয়ে দিয়ে আসছি, এক মিনিট।”

কিন্তু এতে নিবিড় বাঁধ সাধল,
–“এশা আসুক। তোকে সময় নষ্ট করতে বলিনি। অলরেডি পাঁচটা বাজছে!”

নিবিড়ের গম্ভীর সুরে মৌনোর মুখ গোমড়া হলো। সে সময় নষ্ট কখন করল? সে উলটো একদম ঠিক সময়ের পাঁচ মিনিট আগে থেকে এখানে দাঁড়ানো। মৌনো আলাদা করে কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগ পেল না। এশা আগে আগেই রিকশাতে উঠে গেছে নিবিড়ের সাহায্যে। মৌনোও ধীরে ধীরে রিকশার কাছে এসে দাঁড়ায়, কিছুটা ইতঃস্তত অনুভব হচ্ছে। অথচ সে তো তাই চেয়েছিল।

নিবিড় মৌনোকে আপাদমস্তক লক্ষ্য করে বলল,
–“তোর সমস্যা হবে না তো, পাশে বসতে?”

মৌনোর মনে হলো সে মন থেকে গলে গেছে। তার সমস্ত অস্বস্তি কাটানোর জন্য নিবিড়ের এইটুকু যত্নমাখা কথাই যথেষ্ট ছিল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলল,
–“না।”

নিবিড় হাত বাড়িয়ে দিল। খুবই ইতঃস্তত সেই হাত বাড়িয়ে দেওয়া, তবুও তার সাহায্য করার চেষ্টা। মৌনো সেই বাড়িয়ে দেওয়া হাত ছুঁয়ে সাহায্য নিল। নিবিড় এক টানে তাকে রিকশায় বসাল। তাদের দুজনের বাহু মিশে একাকার। মৌনোর হালকা শিহরণ হয়। এশা তখন নিবিড়ের কোলে বসেছে। মৌনো এই মিশ্র অনুভূতির পাল্লায় পড়ে চুপসে গেল। নিবিড় রিকশাওয়ালাকে প্যাডেল টানার নির্দেশ দেয়।

–“শাড়ি পরে এত ঝামেলার কী দরকার ছিল? কালকের পা মচকে শিক্ষা হয়নি? এবার ভাঙার পরিকল্পনা আছে নাকি?”

শেষ! মৌনোর মনে যত ফুলের কলি ফুটেছিল সব এই এক কথাতেই দুমড়ে মুচড়ে গেল। শাড়ি পরে তার অনেক দৌড়ঝাপের অভ্যেস আছে। এছাড়া নতুন জায়গায় যাচ্ছে তা শাড়ি ছাড়া জমবে নাকি? মৌনো মুখ গোমড়া করে কঠিন কিছু শোনাতে চাইল, কিন্তু এশা আছে বিধায় সে কিছু বলল না। তবে সেই রাগের জের ধরে বলল,
–“এশাকে আমায় দিন। আপনার কষ্ট করতে হবে না।”

নিবিড় একটুও নড়চড় হলো না। এশাকে নিয়েই দিব্যি বলল,
–“দরকার নেই। পরে আবার তোর শাড়ির কুচি নষ্ট হলে আবারও টাইম ওয়েস্ট!”

মৌনো টের পেল তার নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে রাগে। জীবনে অনেক পুরুষ মানুষ দেখেছে। কিন্তু এরকম খচ্চর স্বভাবের পুরুষ সে আগে কোথাও দেখেনি। মানুষ অন্তত একটু সুন্দর করে কথা বলতে পারে, কিন্তু এই লোক কখনো নরম সুরে কথা বলেছে কিনা সন্দেহ। এই ভালো আবার এই কখনো খারাপ। মোটকথা— অনুভূতিকে একদম ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

ভাঙা রাস্তা আসতে বেশি সময় লাগল না। রিকশার ঝাকুনিতে সম্ভবত মৌনো পড়েই যেত। কিন্তু নিবিড় একাই দুই বোনকে আগলে রেখেছে। মৌনোকে সাবধান করে বলল,
–“শক্ত করে ধরে বস।”

নিবিড় এটুকু যত্নে আবারও মৌনো গলে গেল। মৌনো দেখল নিবিড় কি নিখুঁতভাবে দুজনকে আগলে রেখেছে। এশারও একদমই নড়চড় নেই, পড়ে যাওয়ার ভয়ই নেই। কিছু মানুষ আছে, যারা শুকনো কথাই বলতে জানে কিন্তু তাদের কথার দম নেই। নিবিড় সবসময়ই কথায় নয়, কাজে বড়ো একজন মানুষ। এইযে, নিবিড় মৌনোর দিকে তাকাচ্ছে না, আর মৌনো.. সে তো চোখ ফেরাতেই পারছে না। কে বলবে কিছুক্ষণ আগেও এই মানুষটার তিক্ত কথায় সে প্রচণ্ড রেগে ছিল?

তাদের পৌঁছাতে পনেরো মিনিট লাগল। ভাড়া মিটিয়ে নিবিড় মৌনোর দিকে তাকাল। নিবিড় আজ তেমন কিছুই পরেনি। শুধু একটা কালো শার্ট গায়ে জড়িয়েই চলে এসেছে, ক্লান্ত মুখে কোনো আয়োজন নেই। নির্ঘাত ট্রেনিং সেরে কোনো রকমে ইউনিফর্ম বদলে সোজা এখানে এসেছে? মৌনো অবশ্য নেভি অফিসারদের এত নিয়ম-নীতি জানে না।

এশা গাছ-গাছালির ফাঁকে সরু ট্রেনের রাস্তা দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ছুটে চলে যায়। মৌনো আপাতত তাই ভাবে। সে নিজেও মুগ্ধ, এত সুন্দর এক দৃশ্য নিজ চোখে দেখার ফলে। এই স্থানে এই ট্রেন লাইনে অনেকেই বিকাল কিংবা ভোরের সময় কাটাতে আসে। তবে ছুটির দিনে বোধ হয় এখানে মানুষে ভর্তি থাকে। ভাগ্যিস সপ্তাহের মাঝামাঝিতে এসেছে। নিবিড় বলল,
–“এখানে আধঘণ্টার বেশি থাকবি না। বিশ মিনিট পর ট্রেন যাবে, সেই ট্রেন দেখিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। গট ইট?”

আধঘণ্টা? মৌনোর জন্য দশ মিনিটও অনেক সময়। আজ সে সিদ্ধান্ত নেয়, সমস্ত রাগ-অভিমান পাশে ছুঁড়ে সে এই আধঘণ্টা পুরো উপভোগ করবে, নিবিড়কে অনুভব করবে। কে জানে, হয়তো কোথাও না কোথাও ‘নিবিড়’ উপলক্ষেই সে শাড়ি পরেছে?

মৌনো ভেবেছিল এশা ট্রেনের পথ দেখে খুশি হয়ে গেছে। কিন্তু তার দৌড়ের কারণ বুঝল পরবর্তীতে। এশা মূলত গোলাপী রঙের হাওয়াই মিঠাই দেখেই সে এতটা খুশি। মৌনো এশাকে চুপ করতে চেয়েও বিশেষ সুবিধা হলো না। নিবিড় এবারও এশাকে বাঁধা দিল না। নিবিড় টাকা দিয়ে বলল,

–“দুটো দিন।”

–“দুটো কেন? একটাই..”

নিবিড় মৌনোর দিকে তাকিয়ে বলল,
–“তোর জন্যও একটা।”

মৌনো অবাক হয়ে বলল,
–“আমি কেন? আমি কী বাচ্চা নাকি?”

–“তুইও বাচ্চা। শুধু হাতে-পায়েই একটু বড়ো হয়েছিস, দ্যাটস ইট!”

®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে—

বিঃদ্রঃ রিচেক একটু পরে দিচ্ছি। সত্যিই দুঃখিত ১১০০+ এর বেশি আমি লিখতেই পারিনি। আমার ডানে-বামে মেহমান, আমি মনোযোগ দিতে পারছি না। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর নজরে দেখবেন। কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবেন।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply