Golpo romantic golpo বি মাই লাভার

বি মাই লাভার পর্ব ২০


বি মাই লাভার

পর্ব-২০

সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)

খুশবু খানিকটা বিরক্ত হলো নৈঋতাকে এভাবে দেখে। সরু পা দু খানি খালি। ও কি দিলশাদকে দেখেই দৌড়ে এসেছে? ওদের দিকে এগিয়ে এসে বলল,

“দিলশাদ, একে নামিয়ে দে, তোর হাতে ব্যথা তো।”
“সমস্যা নেই।কিড্ডো, শোনো আমার কথা।শান্ত হও, আমি আছি।”

নৈঋতার নখ শক্ত করে ধরেছে ওর পিঠের দিকের শার্ট। ধীরে ধীরে অ্যাড্রেনাল হরমোনের গতি স্বাভাবিক হলো। গলার ভাঁজ থেকে মুখ তুলে হাত ছাড়িয়ে নামতে চাইলে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে দিলশাদ বলল,

“আর একটু সময় প্রিন্সেস।এখনি না।”

জ্যাক ইতিমধ্যে এক একটা পাতলা চাদর এনে দিলশাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। দিলশাদ সেই চাদরে নৈঋতার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলল,
“পিছনে ফিরবে না প্রিন্সেস। গো ব্যাক টু ইউর রুম।”

দিলশাদের কথাটা বিনাবাক্যে মেনে নিলো নৈঋতা। নিচের ঠোঁট কামড়ে নিজের করা বোকামির জন্য খানিকটা ইতস্ততও হলো।গতরাতে সিডাটিভ নেওয়ার পর কোনো রকমে পোশাকটা বদলে রাতের পোশাক পরে ঘুমিয়েছে৷ অথচ কে জানতো দিলশাদ সকাল হলেই ফিরবে।
“ওয়েট!”
নিজ পায়ে থেকে স্লিপার জোড়া খুলে ওর পায়ের নিচে হাত দিয়ে রাখলো।জুতো পরার পর নৈঋতা এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না।দিলশাদ ভাবেনি মেয়েটা এভাবে ছুটে আসবে। কিন্তু তার বুঝতে এক মুহুর্তও দেরী হলো না যে মেয়েটা কেবল রাতের পোশাক পরেই ছুটে এসেছে। ওর শরীরের উষ্ণতা সামান্য একটা মখমলের পোশাকের আড়াল ভেদ করে ঠিক ছড়িয়ে গিয়েছে নিজের পুরো শরীরে। বাকীদের মাঝে কেউ এটা না বুঝলেও খুশবুর নজর এড়ায়নি। দিলশাদের শক্ত হয়ে যাওয়া কাধ কিংবা চাদর না আসা অবধি ধরে রাখা সবটাই ও বুঝেছে।বুঝতে পেরেছে বলেই হয়তো অস্বস্তিও বাড়ছে।

দিলশাদ এবার হেঁটে এসে বন্ধুদের মাঝে বসলো।ওর হাতে বেশ খানিকটা টান লাগছে।লাগাটা স্বাভাবিক।ঘন্টা দশেক পূর্বে জ্ঞান ফিরেছে তার৷ এরপর এক মুহুর্ত অপেক্ষা করেনি। কোনো নিষেধ মানেনি। ডাক্তারদের নিষেধ অমান্য করে সে ফিরেছে এক পলক এক মেয়েকে দেখবে বলে।অথচ দশ মিনিট পূর্বেও যে যন্ত্রণা ছিল, অস্বাভাবিক কষ্ট হচ্ছিলো এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে সেসব কিছুই নেই। প্রত্যয়ের পাশে বসে দিলশাদ বলল,
” রশীদদের কি খবর?কিড্ডোর খোঁজ আরও করেছিল?”
“ঠিক রশীদরা করেনি। তবে পারত পক্ষে নৈঋ কিন্তু ওর বাবারই মেয়ে।এটা স্বাভাবিক নয় কি?”

“আঠারো বছর যে মেয়ের খোঁজ নিলো না, সেই মেয়েকে দিয়ে এখন কি করবে?”
“দিলশাদ, ওর বাবা ওকে চাইলে তোর উচিৎ ওকে দিয়ে দেওয়া। তুই সারাজীবন ওর খেয়াল রাখতে পারবি না।তাছাড়া…

” আমি কেন খেয়াল রাখতে পারবো না?”খুশবুর প্রশ্নে ভ্রু-কুঁচকে তাকালো দিলশাদ।

“সারাজীবন কিভাবে রাখবি?তুই সারাজীবন এভাবে থাকবি?বিয়ে করবি না?তোর সংসার হবে না?দেখ নির্জনার জায়গায় আমি থাকলে হয়তো আমিও তাই করতাম।”

রিয়ান মুহূর্তেই খুশবুর হাত চেপে ধরে বলল,
“খুশবু, নৈঋকে নিয়ে কোনো কথা বলিস না।”

দিলশাদ তাকিয়ে ছিল দো তলায় নৈঋতার রুমের জানালার দিকে।এখান থেকে বেশ দেখা যায়।মেয়েটা রুমে প্রবেশ করে চোখ মুখ বন্ধ করে ডিভানের উপর বসে আছে। কি একটা মনে করে সে বলল,
“তোরা কথা বল, আমি আসছি।”


দিলশাদকে প্রবেশ করতে দেখে পরিচারিকা দুজন বেরিয়ে গেল।নৈঋতার পায়ে বেশ লেগেছে। দিলশাদ ফ্লোরে বসে কোলের উপর পা নিয়ে এক হাতে মেডিসিন লাগিয়ে দিয়ে বলল,
“এখন সকাল ছয়টা দশ বাজে কিড্ডো।এসো বিশ্রাম করবে।জেদ নয় কোনো।”

নৈঋতা কোনো জেদ করলো না, বরঙ সে যেন এই শাসনটাকে বেশ মিস করছিল।বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই তার দুই চোখে ঘুম নামলো। ঘুম ভাঙলো তখন বেলা বাজে এগারোটা। ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই দেখলো সবাই নাস্তার টেবিলের দিকে যাচ্ছে। খুশবু দিলশাদের বাম পাশের চেয়ারে বসতে যাচ্ছিলো তখন একজন পরিচারিকা কিছু বলতে চাইলে দিলশাদ হাত ইশারায় না করলো। নৈঋতা গুটি গুটি পায়ে টেবিলের কাছে আসার পরেই দিলশাদ উঠে দাঁড়ালো। নিজের চেয়ারে ওকে বসিয়ে একজনকে বলল আরেকটা চেয়ার নিয়ে আসতে। নৈঋতার পাশে এক হাতেই দুধ কফিটা ওর দিকে এগিয়েও দিলো। প্রত্যয়, রিয়ানের সাথে কি নিয়ে যেন কথা হচ্ছে। নিজের প্লেট থেকে খাবার তুলে নৈঋতার সামনে ধরতেই খাবারের প্লেটে হাত থেমে গেল খুশবুর।এসব তার বেশ বিরক্ত লাগছে। ওর অস্বস্তি বুঝি নৈঋতা টের পেল।সে হাত বাড়িয়ে নিজের প্লেট নিতে চাইলে দিলশাদ খানিকটা গভীর স্বরে বলল,
“কোনো সমস্যা হচ্ছে কিড্ডো?এটা খাবে না?অন্য কিছু করে দিবে?”

দুদিকে মাথা দুলিয়ে না সূচক জবাব দিতেই সে কাটা চামচ দিয়ে খাবার তুললো ওর সামনে।খাবার শেষ করার পর নৈঋতা কফির মগটা দু’হাতে ধরে চুপচাপ বসে রইল। দৃষ্টি নিচু, কিন্তু চারপাশের অস্বস্তি সে অনুভব করছে। খুশবুর দৃষ্টি বারবার এসে ঠেকছে ওর ওপর। দিলশাদ সেটা লক্ষ্য করছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না।কেবল নরম গলায় বলল,
“আর কিছু খাবে?”
এবারো মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলো সে। দিলশাদ জ্যাককে ডেকে বলল,
“কিড্ডোকে নিয়ে একটু গার্ডেনে নিয়ে যাও জ্যাক।”

আদেশ স্পষ্ট, নৈঋতা বা জ্যাক কারোর এখানে থাকার অনুমতি নেই।সাথে সাথে সকল পরিচারিকাদেরও সরে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে।এই মুহূর্তে ওরা আটজন ডায়নিং টেবিলে বসে আছে। দূর থেকে দেখে মনে হবে সব স্বাভাবিক। কিন্তু তাই কী?
কয়েক মুহুর্ত নীরবতার পর দিলশাদ ধীরে ধীরে ন্যাপকিন ভাঁজ করে দৃষ্টি তুলে বলল,
“খুশবু!শোন তোর কিছু বুঝতে সমস্যা হচ্ছে।”
“মানে?”
“নৈঋতা কোনো দায় নয়। কেউ তাকে তুলে দিয়ে নিজের জীবন সহজ করবে—এই ভাবনাটা মাথা থেকে সরিয়ে ফেলাই ভালো।”
” আমি ভুল কিছু বলিনি।”
“ভুল সঠিকের হিসেব নয় খুশবু। ইলহামকে আমরা কেবল আমাদের ভুলের জন্য।আমরা নৈঋকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে পারবো না।”

প্রত্যয়ের কথায় রিয়ান সমেত বাকীরাও সম্মতি জানালো।ইলহামের মৃত্যুর পর অনেক ঝুঁকি গেছে তাদের সবার পরিবারের উপর।ইলহাম নিজের পুরো পরিবার প্রায় শেষ, দিলশাদ নিজের পরিবারে প্রায় দশ বছর যাবত নামমাত্র যোগাযোগ রেখেছে। প্রত্যয় একমাত্র বোনের বিয়েতে গিয়েছিল অথচ ওর বাবা ওকে পরিচয় অবধি দেয়নি।আর রিয়ান? নিজের মাকে শেষ দেখা অবধি দেখতে পারেনি।কীসের কম আছে ওদের? একেক জন বর্তমানে দেশের নামকরা ব্যক্তিবর্গ।যারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে চিকিৎসা, শিক্ষকতা পেশায় জড়িত। অথচ ওদের সেই ভয়াবহ অতীতটা!

দিলশাদের কঠিন হয়ে যাওয়া চোখ মুখ দেখে খুশবু বলল,
“তুই ওর আশেপাশে একদম বদলে যাস দিলশাদ।”
“কারণ তখন আমার ভেতরকার নর’পিশা’চটাও তখন কিড্ডোকে দেখে দৃষ্টি নামিয়ে হাটু মুড়ে বসে পড়ে।”


কিছু সময় পর নৈঋতা খেয়াল করলো গেট পেরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পরপর সাতটা কাস্টমাইজড প্রাইভেট কার। ওরা সবাই তবে চলে গেছে। জ্যাককে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি হয়েছিল সেদিন?”
“লেডি! আসলে…
” আমি সত্যিটা জানতে চেয়েছি।”
“একটা বিশেষ কাজে চিফ বেরিয়েছিল। আর তখন হুট করে একটা দূর্ঘটনা ঘটে।মাথায় আঘাত লাগে তার। এতো দিন সিঙ্গাপুর ছিল।গতরাতেই জ্ঞান ফিরেছে।”
“এতো সিরিয়াস পেশেন্ট ছেড়ে দিলো ডাক্তাররা?”

কৌতুকের স্বর শুনে জ্যাক বলল,
“চিফ নিজে নিজেই স্বাক্ষর করে এসেছেন।শরীরের অবনতি বা মৃত্যু হলে সে নিজে দায়ী।”

নৈঋতা ভিলার ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পেল দিলশাদ নেই নিচে।নিজের রুমে চলে গেছে।নৈঋতা মাস্টারবেড রুমটার দরজার বার দুই কড়া নাড়লো।মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বিরক্ত লাগে। দরজার লকে নিজের ফিংগার প্রিন্ট দিতেই সাথে সাথে খুলে গেল। দিলশাদের ড্রেসিং পরিবর্তন করছে তখন।দিলশাদ পিছন ফিরে থাকার কারণে ওকে দেখলো না।জ্যাককে জিজ্ঞেস করলো,
“কিড্ডো ফিরেছে?”
“জি চিফ।”
ফাইলটা টেবিলে রাখ—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আয়নায় প্রতিফলনে চোখে পড়ল অন্য এক ছায়া।ড্রেসিং শেষ হতেই ডাক্তার এবং জ্যাককে ইশারা করলো চলে যেতে। আসার পর থেকে এই মেয়েটা একটা বারের জন্যও একটা শব্দও বলেনি।

“ হানিবিয়ার, তুমি সাইন করে এসেছো?”
দিলশাদ ভ্রু কুঁচকালো। শার্টটা হাতে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলো, “কি?”
“মরে গেলে দায় তোমার—এই কাগজে।”
নাক টেনে টেনে বলা কথাগুলোতে দিলশাদের ঠোঁটের কোণে এক হাসি ফুটে উঠেছে। সে পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“কে বলেছে?”
“এসেছো কি না?”
নৈঋতার চোখ লালচে। রাগে না দুঃখে বোঝা যাচ্ছে না।
“তুমি নিজের জীবন নিয়ে কীভাবে এমন অবহেলা করতে পারো? আমার কথা একবারও মনে পড়েনি?”
দিলশাদ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। এতটা কাছে যে দু’জনের নিঃশ্বাস একসাথে মিশে যাচ্ছে।
“আমি যদি না আসতাম?তুমি কি আমার অপেক্ষায় ছিলে?”

দৃষ্টি নামিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা নৈঋতার দিকে ঝুঁকে সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি জ্ঞান ফিরেই প্রথম যে নামটা বলেছি জানো?”
কিড্ডো।”
“তুমি আমাকে এভাবে ভয় পাইয়ে দিতে পারো না!”

দিলশাদ ওর হাতের কব্জি ধরে বলল,
“আমাকে ছাড়া তুমি থাকতে পারবে না—এই ভয়?”
“নাহ্।”
“মিথ্যেবাদী কিড্ডো।”
দিলশাদ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার জীবন নিয়ে চিন্তা করার অধিকার তোমার আছে। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যাওয়ার অধিকার নেই।”

চলবে?( রেসপন্স করবেন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply