শেষ পর্ব
সুখের মুহুর্ত গুলো বুঝি দ্রুত ফুরায়। কীভাবে একটা সপ্তাহ পার হয়ে গেলো টেরই পেলাম না।
একদিন দুপুরবেলা ছোট চাচা এসে হাজির। বললেন, মামলা ডিসমিস। বাড়ি চল মীরা।
এমন খবরে বোধহয় আনন্দিত হবার কথা ছিলো। কিন্তু আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেলো। রুনি আপার এই বিলাসবহুল বাড়িটা আমাদের কাছে ছিলো স্বর্গীয় রাজমহল। দোতলার এক কোণে দুজনে কতই না প্রেমের গল্প রচনা করেছি!
ঘরটা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবতেই মন কেমন করতে লাগলো। ভীষণ মায়ায় পড়ে গেছি এই ঘরের। বাবরি চুলওয়ালা নিজেই পুরো ঘরখানা যত্ন নিয়ে গুছিয়ে ফেললো। আমি স্থির হয়ে বসে বসে দেখলাম।
একসময় এসে আমাকে বললো, ‘মন খারাপ করছো কেন?’
‘আপনার মন খারাপ হচ্ছে না?’
‘একটু একটু হচ্ছে। হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। আমরা তো মানুষ, যেখানেই সুন্দর স্মৃতি জমে সেখানটার মায়ায় পড়ে যাই। কিন্তু সামনে আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতে। নিজেদের সংসার হবে। এখানকার মায়ায় আটকে থাকলে কি হবে?’
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘তাও ঠিক। এই ক’দিনে একবারও বাড়িতে ফেরার জন্য মন কেমন করে নি। মনে হয়েছিলো এখানেই আমাদের সংসার, এভাবেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেই।’
সে হাসতে হাসতে বললো, ‘ওঠো মীরা। আমার মনে তো অত মায়া নেই, তোমার মনে থাকুক। এ জীবনে এত অসংখ্যবার নিজের নীড় বদলেছি যে, মায়া পড়ে যাওয়ার অবকাশ পাইনি। শেষ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে আমার একটা স্থায়ী ঠিকানা হবে, সেটার মায়ায় পড়ার অপেক্ষায় আছি।’
তার কথা আমাকে শক্তি দিলো। এই কয়েকদিন আরাম করে খেয়েছি, ঘুমিয়েছি আর দুজন মিলে রাজ্যের গল্প করেছি। একে অপরেকে নতুন করে জানতে চেষ্টা করেছি। তার শৈশব, কৈশোর, একাডেমিক জীবনের গল্প শুনেছি। কত সংগ্রাম, কত স্বপ্ন, সেসবের গল্প। এখন নিজেদের জীবন গুছিয়ে নেয়ার পালা।
রুনি আপার কাছে বিদায় নেয়ার সময় আমরা দুজনেই খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। আপা আমাদের জন্য যা করেছে, তা আজকাল কোনো কাছের বন্ধুর কাছেও প্রত্যাশা করা যায় না। এই কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। আপা ও দুলাভাইকে বলে এলাম, ‘আমাদের সংসার হলে আপনাদেরকে অবশ্যই আসতে হবে।’
.
দাদুবাড়িতে ফিরতেই বাড়িসুদ্ধ সবাই এসে আমাদেরকে ঘিরে ধরলো। যেন আমাদের ভাবনায় ক’টা দিন কারোরই ঘুম হয়নি। সবার চোখে কৌতুহল। আমাদের হাসিমুখ দেখে তারাও হাসছে।
চাচীরা খাবারের আয়োজন করেছেন। টেবিল সাজিয়েছেন হরেক পদের রান্না দিয়ে। বোয়াল মাছ, গরুর মাংস, খাশির মাংস, শুটকি ভুনা, পায়েস, পিঠাপুলি আরও কত কী! সবার সাথে এক টেবিলে ভোজন শেষে আড্ডা দিতে বসলাম। চাচী বারবার জানতে চাচ্ছিলেন আমরা টেনশন করেছি কি না! আমি মুখে উত্তর দিলাম, তা তো করেছিই। কখন পুলিশ এসে ওকে ধরে নিয়ে যায়..
অথচ কথাটা মিথ্যা। এরকম দুশ্চিন্তা আমি একবারও করিনি। বরং এই এক সপ্তাহ ধরে আমরা সুখের রাজ্যে বিচরণ করছিলাম। যাকে বলে মধুচন্দ্রিমা। সেসব তো আর সবাইকে বলা যায় না!
সবাই খুব জোরাজোরি করছিলেন দুইটা রাত থেকে যাওয়ার জন্য। ওদিকে মা বাবাও অপেক্ষায় আছেন। দীর্ঘদিনের কাজ জমে গেছে বাবরি চুলওয়ালার। তাই শহরে ফেরার তাড়া অনেক। অবশেষে বিশাল বড় বড় দুইটা লাগেজ নিয়ে আমি আর বাবরি চুলওয়ালা আমাদের বাড়িতে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
পথেই সেই বিখ্যাত বাজারটা চোখে পড়লো। আমি বললাম, চলুন নেমে যাই। এক্সপ্লোর করবো না, শুধু দুই কাপ চা..
বাবরি চুলওয়ালা রাজি হলো। গাড়ি থামিয়ে বাজারে নামলাম আমরা। এই জায়গায় আমাদের দারুণ স্মৃতি জমে আছে। আশেপাশে হাঁটতে হাঁটতে আমি ঝরনার মতো খলখল করে বলে যাচ্ছিলাম সেই দিনটার কথা। পুরোটা সময় সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমার কথা শুনলো।
বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত নেমে এসেছে। বাড়ির গেট খুলে আমাদের জন্য শরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রোহান। বাবরি চুলওয়ালার মুখে শরবতের গ্লাস ধরে বললো, ‘এক হাজার দাও নইলে গেট ছাড়বো না।’
আমাদের কাছে এইমুহুর্তে কোনো টাকা নেই। দু’জনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবখানা এমন, যাবোই না ভেতরে। অগত্যা গেট ছেড়ে দিয়ে বিরসমুখে রোহান বললো, ‘পরে সুদ সহ দিতে হবে।’
বাবরি ওয়ালা হেসে বললো, ‘তোমাকে পনেরো দিন অংক আর ইংরেজি পড়িয়ে দিলে হবে না?’
হাসলাম আমি। রোহান বললো, ‘এখনই এরকম করলে বাকি জীবন কি করবা? আমার দুলাভাইয়ের কলিজা থাকতে হবে হাতির মতো বড়।’
‘হাতির মতো বড় কলিজা কি আমার এই ক্ষীনকায় শরীরে জায়গা হবে শালা?’
ওদের খুনসুটি চলতে লাগলো ঘরে প্রবেশ করা পর্যন্ত। ড্রয়িংরুমে এসে বসে রইলো সে। আমি খানিকটা ভাবনায় পড়ে গেলাম, এখন কোন রুমে যাবো? দোতলায় নাকি নিচতলায়? আমি কি একা যাবো নাকি দুজনে একসঙ্গে যাবো?
কী এক মধুর বিভ্রান্তি। অবশেষে রান্নাঘরে ঢুকলাম। পাতিলের ঢাকনা খুলে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এতকিছু রেঁধেছো কি আমার জন্য?’
‘না। আমার জামাইয়ের জন্য।’
‘স্বার্থপর মহিলা। এতদিন পর মেয়ে বাসায় ফিরেছে। মেয়ের জন্য নাই কিছু।’
‘মেয়ের খাওয়া লাগবে না। মেয়ে আমার জামাইয়ের মাথা খাইলেই পেট ভরবে।’
‘তুমি কিভাবে জানলা আমি ওর মাথা খাই?’
মা বিরক্ত মুখেও হেসে ফেললেন। হাসি দেখে মনে হলো উনি বলতে চান, ‘আমরা কি তোকে চিনিনা মীরা?’
হাতমুখ ধোয়ার প্রয়োজন বোধ হলে আমি দোতলায় নিজের রুমে চলে এলাম। গোসল সেরে একটা সুন্দর জামা পরলাম আমি। বহুদিন পর নিজের রুমে এসে মনটা খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। ফেরার সময় রুনি আপার ঘরের মায়ায় যেভাবে মনটা মলিন হয়ে উঠেছিলো, এইমুহুর্তে তার বিন্দুমাত্র রেশও নেই। বরং নিজের চিরচেনা ঘরে ফিরে আমার খুব স্বাধীন মনে হচ্ছে নিজেকে।
সাজগোজ শেষে নিচে নামার কথা ভাবতেই আমার মুখে হাসি চলে এলো। আগে যখন বাবরি চুলওয়ালাকে দেখতে ইচ্ছে করতো, চাইলেও হুটহাট নিচে নামতে পারতাম না। এক ধরনের সংকোচ আমাকে ঘিরে রাখতো। এইমুহুর্তে সেসবের কিছুই আর নেই।
পাখির মতো ফুড়ুৎ করে নিচতলায় আসলাম। ড্রয়িংরুমে নেই বাবরিচুল। রান্নাঘরে মা খুটুরমুটুর করছেন। আমি বললাম, ‘রোহান কই আম্মু?’
‘জানিনা। নাম ধরে ডাকলেই হয়।’
‘রোহানকে তো খুঁজছি না। যাকে খুঁজছি তার নাম ধরে ডাকা যাবে না।’
মা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। আমি খিলখিল করে হেসে উঠলাম। টের পেলাম, বেশিক্ষণ মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাসা যাবে না। কখন খুন্তি ছুঁড়ে মারে!
নাচতে নাচতে এসে দেখি বাবরি চুলওয়ালা নিজের রুমে শুয়ে আছে। হাতে মোবাইল। আমি ভ্রু নাচিয়ে বললাম, ‘আসবো?’
‘আসো। তোমার বাড়ি, তোমার ঘর। পারমিশন চাচ্ছো কেন?’
‘ওহ আচ্ছা! তাই নাকি? আমার কি এখন আর এই রুমে আসতে পারমিশন লাগবে না?’
‘না। এই রুমে আমি অতিথি পাখি।’
‘তাহলে এখন থেকে আমিও অতিথি পাখি।’
‘হ্যাঁ মীরা। আস্তে আস্তে এই বাসার মায়াও ছাড়তে শুরু করো। যত তারাতাড়ি মায়া ছাড়তে পারবা, ততই লাভ।’
আমি কোনো দ্বিধা কিংবা সংকোচ ছাড়াই তার বিছানার ওপর গা এলিয়ে দিলাম। আহ! কি যে শান্তি। একসময় এই রুমে ঘুমোবার জন্য আমার কী যে আকুলতা ছিলো! ভাবলেই হাসি পায়। আনন্দে মনটা নেচে ওঠে।
বাবরি চুলওয়ালা হঠাৎ একটা ছোট্ট বাক্স সামনে রেখে বললো, ‘এটা তোমার বাসর রাতের গিফট।’
‘সিরিয়াসলি!’
‘হুম। দাদুবাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ওখানেই বাসর হবে। এত তারাহুরো করে রুনি আপার বাসায় যেতে হয়েছে, এটা আর নেয়ার সুযোগ পাইনি।’
‘খুলে দেখবো?’
‘শিওর।’
আমি খুব কৌতুহলী হয়ে বক্সটা খুললাম। একটা স্বর্ণের চেইন জ্বলজ্বল করে উঠলো। আমি চেইনটা হাতে নিয়ে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে রইলাম। অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, ‘এটা কখন কিনলেন!’
‘ভাবীকে দিয়ে আনিয়েছিলাম।’
‘ভাইয়া ভাবীর সঙ্গে আমার সেভাবে সময় কাটানোই হলো না। একটা আফসোস রয়ে গেলো!’
‘কোনো সমস্যা নেই। এখন ওনাদেরকে কল দিয়ে কথা বলো। ভাইয়া আমাদেরকে যেতে বলেছে। কিছুদিন অফিস করার পরে সব কাজ গুছিয়ে তোমাকে আমার গ্রামে নিয়ে যাবো।’
বাবরি চুলওয়ালা খুব যত্ন নিয়ে চেইনটা আমার গলায় পরিয়ে দিলো। আমি খুশিতে ঝলমল করছি। সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, ‘কবে যে অনেক টাকা হবে! তোমার জন্য অনেক কিছু করতে পারবো..’
.
বাবা ফিরলেন খানিক বাদেই। দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকলেন ‘মুনযির’ বলে। আমি লজ্জায় মরে যাই অবস্থা। বাবার সামনে ওনার রুম থেকে বের হতে আমার এত লজ্জা লাগছে কেন জানিনা! মাথা নিচু করে চোরের মতো বেরিয়ে এসে বাবার পাশে দাঁড়ালাম।
বাবা বললেন, ‘মা মীরা, কেমন আছিস মা?’
‘ভালো আছি। তুমি কেমন আছো আব্বু? তুমি এত শুকিয়ে গেছো কেন?’
‘তুই যে বাসায় নাই। তাই শুকিয়ে গেছি। আমার মা ফিরেছে, এবার আবার মোটা হয়ে যাবো।’
বাবা আমাকে আদর করে দিলেন। আমি আবারও দৌড়ে ওপরে উঠে এলাম। মুহুর্ত যেন আর কাটে না। নিজের ঘরে পায়চারি করেও শান্তি পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে নীচতলায় আমার হার্টটাকে খুলে রেখে এসেছি। ক্ষণিকের জন্য দূরে গেলেও যদি এমন অস্থির লাগে, সে অফিসে গেলে আমার সময় কী করে কাটবে!
রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই মিলে একসঙ্গে বসে গল্পগুজব করলাম। তনয় নিজেই নাকি মামলা উঠিয়ে নিয়েছে। সবকিছু বিশদ বর্ণনা শুনতে শুনতে রাত গভীর হয়ে গেলো।
বাবা বললেন, ‘রোহান ঘুমাতে যা। মীরা মা, যাও ঘুমাও এখন। আমি রুমে যাচ্ছি।’
আমি ও বাবরি চুলওয়ালা একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। আমরা কোন রুমে যাবো? দুজনেই দ্বিধান্বিত। আমার কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগছে। বাবা ওপরে উঠে গেলেন। সবসময় আমিও বাবার সঙ্গে ওপরে উঠে যাই। আজ নির্লজ্জের মতো নিচেই বসে রইলাম। খানিকক্ষণ পর মা ও রান্নাঘরের কাজ গুছিয়ে চলে গেলেন। আমাকে বললেন, নিচতলার সব লাইট নিভিয়ে দিস।
মা ওপরে চলে গেলে আমার অসম্ভব লজ্জা লাগলো। আমি ব্যস্ত ভঙ্গীতে রান্নাঘরে এসে অকারণেই এটা সেটা হাতড়াতে লাগলাম। খানিকক্ষণ পর দেখি কোথাও কেউ নেই। গুটি গুটি পায়ে বাবরি চুলওয়ালার রুমে ঢুকলাম।
সেও রুমে নেই। আমি ভ্রু কুঁচকে ভাবতে লাগলাম, সে আবার ওপর তলায় গিয়ে বসে আছে নাকি?
খানিক বাদেই সে আমাকে চমকে দিয়ে বললো, ‘আমাকে খুঁজছো?’
‘আব্বু আম্মু যদি আমার রুমে গিয়ে দেখে আমি নেই, তখন কেমন হবে বলুন তো?’
‘ভালো হবে। এটাই তো হওয়ার ছিলো।’
‘যাহ। আমার খুব লজ্জা লাগছে।’
‘ভাগ্যিস সাতটা দিন রুনি আপার বাসায় ছিলাম।’
হো হো করে হেসে উঠলাম দুজনেই।
.
জীবনটা তার রং বদলেছে। একসময় আমার জীবন ছিল একলা। সাদামাটা রুটিনে অভ্যস্ত, একঘেয়েমিতে ভরা জীবন। দিন আসতো, দিন যেতো। হাসি ছিল, কিন্তু গভীর আনন্দ ছিল না। সবকিছু থাকার পরেও ছিলো কোথাও এক অপূর্ণতা।
বাবরি চুলওয়ালা আমার জীবনে সেই পূর্ণতা নিয়ে এসেছে। সকালগুলো আর কেবল সকাল রইলো না, হয়ে উঠলো ব্যস্ততার। রাতগুলো নিছক পড়াশোনা আর ঘুমাবার সময় না, হয়ে গেলো গল্প আর নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের। তার উপস্থিতিতে জীবনটা হঠাৎ করে অন্যরকম হয়ে গেলো।
একলা জীবনটা খারাপ ছিল না, কিন্তু তার সঙ্গে জীবনটা সুন্দর হয়ে গেছে এই পার্থক্যটা এখন খুব স্পষ্ট বুঝি। যেন রঙহীন ক্যানভাসে কেউ ধীরে ধীরে রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে।
এভাবেই দিনগুলো চলছিলো। একদিন বাবরি চুলওয়ালা এসে বললো, ‘তনয় হাসপাতালে। দেখতে যাবো?’
আমি অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন! কি হয়েছে ওনার?’
‘কাদের সঙ্গে যেন ঝামেলায় জড়িয়েছিলো। মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি।’
কারো দুঃখে হাসা উচিত না। তবুও আমার হাসি চলে এলো। আমরা কেউ কখনো তনয়ের ক্ষতি চাইনি। কিন্তু প্রকৃতি তার প্রতিশোধ ঠিকই নিয়েছে। এই বেলায় আর মুখ ফিরিয়ে রাখার মানে নেই।
বিয়ের রাতে নিজের ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে বাবরি চুলওয়ালা বলেছিলো, ‘তোমার প্রতি ভালোবাসাটা তনয়ের কারণেই টের পেয়েছি। তনয় সকাল বিকাল তোমার কথা জানতে চাইতো, ওকে তোমার ব্যাপারে বলতে গিয়েই বুঝেছি তুমি আমার কতটা নিজস্ব। তোমাকে তনয়ের হতে দিবো ভাবতেও পারতাম না। তনয় না এলে হয়তো এই ভালোবাসাটা এত তারাতাড়ি অনুভব করতে পারতাম না মীরা।’
তনয়ের প্রতি আমার যত ক্ষোভ, তা ওই কথার পরেই ফুরিয়ে গিয়েছে। আমি বেশিদিন কারো ওপর রাগ করে থাকতে পারিনা। যদি তনয়কে দোষী করতে হয়, তাহলে তো একই দোষে আমিও দোষী। সেই দোষে দোষী বাবরি চুলওয়ালাও। আজও আক্ষেপ জাগে, কেনই বা সেদিন গিয়েছিলাম বাবরি চুলওয়ালার মনে জ্বালা ধরাতে? পরক্ষণেই বুঝি, সেদিন গিয়েছিলাম বলেই হয়তো আজ প্রিয় মানুষটা আমার!
অসুস্থ তনয় আমাদেরকে দেখে শুকনো হাসি দিলো। চোখে মুখে অপরাধের ছায়া। বাবরি চুলওয়ালা এগিয়ে গিয়ে ওকে জাপটে ধরে বললো, ‘সরি বন্ধু।’
তনয় একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, ‘কিসের সরি? তুই কেন সরি বলবি রে? সরি বলবো আমি। আর তোরা শুনবি।’
আমি বললাম, ‘সরি আমিও। আমার জন্য আপনাদের মাঝখানে এই ঝামেলাটা হয়েছে।’
‘বাদ দাও মীরা। ওসব ভুলে যাও। তোমাকে নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমার সব রাগ এই চিটারের ওপর। তুই হারামজাদা আমার জায়গা দখল করে নিয়েছিস।’
আমি হেসে বললাম, ‘ওই জায়গা কখনো অন্য কারো ছিলো না। ওটা শুরু থেকেই আমার বাবরি চুলওয়ালার জন্য ছিলো। উনি নিজেও সেটা জানেনা। আমি তো প্রথম দিন থেকেই ওনাকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখতাম।’
বাবরি চুলওয়ালা স্মিত হাসলো। তনয় অবিশ্বাসের সুরে বললো, ‘এখন কত কথা বলবে!’
আমি লাজুক হেসে বললাম, ‘না রে ভাই। সত্যি বলছি। আমার বাপ জানে। আব্বু ছাড়া আর কেউ জানেনা এই অনুভূতির কথা। আমি তো ওনার প্রেমে দিওয়ানা হয়ে গিয়েছিলাম। প্রথমবার উনি যখন রাজি হয়নি, আব্বু দ্বিতীয়বার ওনাকে বাসায় ডেকে এনে আবারও প্রস্তাব দিয়েছিলো। সেটা শুধুমাত্র আমার জন্য। কারণ আমি ওনাকে না পাওয়ার চিন্তায় চিন্তায় ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম।’
বাবরি চুলওয়ালা ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালো। বোধহয় বিশ্বাস হলোনা আমার কথাটা। তবে তনয় ঠিকই বিশ্বাস করলো। শেষ পর্যন্ত বাবরি চুলওয়ালাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘সরি বন্ধু। তোকে নিয়ে থানা পুলিশ খেলার কাজটা আমি মোটেও ভালো করি নাই। মাফ করে দিস আমাকে।’
হাসপাতাল থেকে বের হয়েই বাবরি চুলওয়ালা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তনয়কে ওটা কেন বললে? তুমি আমার প্রেমে দিওয়ানা ছিলে?’
আমি মুচকি হেসে বললাম, ‘মিথ্যা তো বলিনি।’
থমকে দাঁড়ালো সে। আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। আমি মুচকি হাসছি এখনো। বাবরি চুলওয়ালা ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘এগুলো সত্যি মীরা!’
‘হুম। একদম।’
‘তুমি আমাকে শুরু থেকে…’
‘হ্যাঁ গো জনাব। একদম শুরু থেকে। যেদিন দাদুবাড়িতে এলেন আপনি, মাইশার বিয়ের অনুষ্ঠানে। সেদিন থেকে আপনার প্রতি আমার এই ফিলিংস।’
‘না! এ কীভাবে হয়..’
সে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। স্তব্ধ হয়ে গেছে একদম। আমি উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে অগণিত গাড়ি। তাদের হর্ণের শব্দ যেন আমাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। হুট করে থমকে গেছে সবকিছু। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি ঠোঁটে মুচকি হাসি নিয়ে। আর সে, অদ্ভুত চাহনিতে! যেন হুট করেই তার চিরচেনা মীরা’র এক নতুন রূপ বেরিয়ে এসেছে..
হঠাৎ আমার হাতটা খপ করে ধরে বললো, ‘তুমি এটা আগে কেন যে বলো নাই মীরা! একদিন যদি মুখ ফুটে বলতে। একদিন যদি আমাকে শুধু বুঝতেও দিতে… আমি তোমাকে এত কষ্ট কখনোই দিতাম না। কক্ষনো না।’
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘বলেছি তো। একদিন রাতে বলেছিলাম না, চোখের ভাষা শিখে ফেলুন? একদিন বলেছিলাম ভেতরের জ্বালাপোড়া কেউ দেখেনা। আরও কতবার কতভাবে বোঝাতে চেয়েছি। তাও যদি কেউ না বোঝে.. ‘
বাবরি চুলওয়ালা আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। সেই দৃষ্টিতে একসাথে জমে আছে দু’টি বিপরীত অনুভূতি, অপ্রকাশিত আনন্দ আর গভীর এক অনুতাপ। আনন্দটা যেন আমাকে কাছে পাওয়ার, আর অনুতাপটা মীরার মতো একজন মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার অপরাধবোধে সিক্ত।
.
শুরু হলো আমাদের নতুন এক জীবন। সে সকালে উঠে অফিসের জন্য বেরিয়ে যায়, সন্ধ্যায় ফেরে। এদিকে ভার্সিটি থেকে ফিরে খানিক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়ে উঠে আমি সবার জন্য নাস্তা বানাই। বাবরি চুলওয়ালা ফিরলে একসঙ্গে নাস্তা খাই, চা বানিয়ে গল্প করতে বসি। নীচতলার ছোট্ট ঘরটাতে একসঙ্গেই আমাদের দুজনার স্বপ্নের কাব্য রচনা করতে থাকি।
একদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে পাশে তাকিয়ে দেখি সে নেই! টেবিলে বসে খসখস করে কিছু একটা লিখছে। আমি ঘুম জড়ানো চোখে উঠে এসে পাশে বসি।
‘কি লিখছেন?’
‘একটা আইডিয়া এসেছে মীরা।’
‘কিসের?’
‘বিজনেস আইডিয়া।’
‘বিজনেস!’
‘হুম। আমি তো সারাজীবন এখানে জব করতে পারবো না মীরা। আমার নিজেরও অনেক স্বপ্ন আছে। বিজনেস ছাড়া শুধু জব করে ওইসব স্বপ্ন পূরণ করা যাবেনা।’
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘আমাকে দেখাবেন আপনার আইডিয়া? দেখতে ইচ্ছে করছে।’
সে উৎফুল্ল হয়ে বললো, ‘এই দেখো। আসো তোমাকে বুঝিয়ে বলি?’
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনতে মনযোগ দিলাম। সে বোঝাতে লাগলো কীভাবে কাজ হবে, কেমন সম্ভাবনা আছে, কারা হবে ক্লায়েন্ট, সবকিছু। এত চমৎকার আইডিয়া শুনে আমি বিমোহিত। কল্পনাতেই দেখতে পাচ্ছিলাম তার সাফল্য। তার কথা শেষ হবার আগেই আমি হাততালি দিয়ে বললাম, দুর্দান্ত। এই আইডিয়া নিয়ে কাজ করলে নিশ্চিত আপনি অনেক দূর যাবেন।
সে আমার চোখে উচ্ছ্বাস দেখে উল্লাসিত হয়ে বললো, আমি একা পারবো না। তুমি সবসময় পাশে থেকো। আমাকে এভাবেই অনুপ্রেরণা দিয়ে যেও মীরা।
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘কিন্তু বাবার কি হবে? বাবা তো একা অতকিছু সামলাতে পারবে না।’
সে খাতা কলমে লিখে রাখা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমাকে দেখালো, ‘আমি আগামী তিন বছর আংকেলের সঙ্গে কাজ করতে চাই। ওনার স্বপ্ন পূরণে পাশে থাকতে চাই মীরা। ততদিনে বিশ্বস্ত একজনকে নিয়োগ দিয়ে আমার কাজটা বুঝিয়ে দিবো। যখন মনে হবে আমাকে ছাড়াই কোম্পানি ভালো ভাবে চলবে, আমি ধীরেধীরে সরে আসবো। রেগুলার অফিস না করলেও সবসময় উনি আমাকে পাশে পাবেন। যে কোনো কাজে, যেকোনো প্রয়োজনে।’
‘খুবই ভালো হবে।’
বাবরি চুলওয়ালা সিরিয়াস ভঙ্গীতে খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললো, ‘আমার আইডিয়াটা নিয়ে এখন অনেক স্টাডি করতে হবে। সবকিছু বিস্তারিত চিন্তা ভাবনা শেষে পুরো জিনিসটার রোডম্যাপ এঁকে ফেলবো। এগুলোর জন্য আমি তিন মাস সময় নিবো। তিন মাস পরে আমরা আমাদের নতুন বাসায় উঠে যাবো মীরা। একদিকে সংসার গোছাবো, অন্যদিকে ছোট করে আমার বিজনেসটার কাজ শুরু করবো। কাজ কিছুদূর এগোলেই ইনভেস্টর খুঁজবো। আমার বিশ্বাস, এই আইডিয়া নিয়ে অনেকেই কাজ করতে আগ্রহী হবে। ইনভেস্টর পেতে অসুবিধা হবেনা।’
আমি মিষ্টি হেসে বললাম, ‘কংগ্রাচুলেশনস আমার বাবরি চুল ওয়ালা! এটা দারুণ হবে। আচ্ছা, আপনি যখন অনেক বড় হয়ে যাবেন, তখন কি কি করবেন?’
‘সবার প্রথমে আমার এলাকায় যাবো, আমার ভেতরে ছোট থেকে যা যা করার ইচ্ছে ছিলো, সবকিছু করবো। একদিন যারা আমাকে অপমান করেছিল, তাচ্ছিল্য করেছিলো, এটাই হবে তাদের জবাব। আমার ভাইয়াদের জন্যও কিছু করতে চাই মীরা। তারপর.. ‘
আমি উৎসুক হয়ে বললাম, ‘তারপর?’
‘আমার মীরার জন্য স্বপ্নের মতো একটা রাজপ্রাসাদ বানাবো। খুব বেশী বড় হয়তো পারবো না, কিন্তু মীরা মনের মতো করে সেই সংসারটা সাজাবে।’
‘আর?’
‘মীরাকে একটা গাড়ি কিনে দিবো, মীরাকে যখন তখন ইচ্ছেমতো গিফট দিবো আর বিদেশে ঘুরতে নিয়ে যাবো।’
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘আর?’
‘আর একটা ফুটফুটে বাবু হবে আমাদের। ওকে বড় করবো।’
আমি আরও জোরে হেসে উঠলাম। তার বাবরি চুলগুলোকে নেড়ে দিয়ে বললাম, ‘মীরা সবসময় আপনার পাশে আছে, থাকবে। মীরা কখনো আপনার জন্য এতটুকুও বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না।’
‘আমার ব্যস্ততায় মীরা অভিমান করবে?”
‘না। অপেক্ষা করবো।’
‘আমার দুশ্চিন্তায়?’
‘সঙ্গ দেবো।’
‘আমার কষ্টের দিনে?’
‘হাল ধরবো আপনার সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে। পারবো না ভেবেছেন?’
বাবরি চুলওয়ালা আমাকে পরম যত্নে বুকে টেনে নিয়ে বললো, ‘ঠিক কতটা ভালোবাসলে প্রিয়জনের দুঃখের দিনে একটা মেয়ে হাল ধরতে চায় মীরা? এত ভালোবাসো কেন আমাকে?’
আমি লাজুক হেসে বললাম, ‘যতটা বাসি, ততটা তো দেখাই নি কখনো।’
‘প্লিজ, দোহাই লাগে আর বাসিও না। এবার আমাকে বাসতে দাও।’
আমি হেসে উঠলাম। সে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। হঠাৎ খেয়াল করে দেখি তার দুচোখ সিক্ত। ছলছল চোখ দুটি দেখে আমার বুকের ভেতর ধুকপুক করে উঠলো। আমি তড়িঘড়ি করে তাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘প্লিজ প্লিজ ইমোশনাল হবেন না।’
সে আমার হাতটাকে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বললো, ‘কেন হবোনা? একটা ছেলে কোনোদিন কারো মায়া মমতা পায়নি। সবাই তাকে দূর দূর করেছে। কত অপমানিত হয়েছে, কত লাঞ্চিত হয়েছে! সেই ছেলেটাকে এই প্রিন্সেসের মতো মেয়েটা এত ভালোবাসে। আমি কেন ইমোশনাল হবো না বলতে পারো?’
আমি মুচকি হেসে বললাম, ‘আর কখনো এসব বলবেন না। আপনার জীবনে এখন কোনো অভাব নেই। আমি আছি, একটা ভালো জব আছে, আমাদের একটা সংসার হবে খুব শীঘ্রই।’
‘হুম। সবকিছু অনেক সহজ মনে হচ্ছে। তুমি না থাকলে এতটা সহজ মনে হতো না। তুমি আমার একটা শক্তি।’
আমি মুচকি হাসলাম। রাত গভীর হয়েছে। বাইরে দুয়েকটা নিশাচরী পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ ভেসে আসে। উৎফুল্ল মনে আমি লাগেজ খুলে আমাদের বিয়ের শাড়িটা বের করলাম। শাড়িটা আমার সেদিন পরা হয়নি। আজ রাতে একবার পরতে ইচ্ছে করছে।
কোনোমত শাড়িটা পরে মাথায় ঘোমটা দিয়ে এসে বসেছি, দেখি সে আমার দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। কী যে মায়া সেই চোখে! আমি মনেমনে ভাবি, এই মানুষটাকে আর কোনোদিন একলা হতে দিবো না। ছায়া হয়ে পাশে থাকবো।
সেও আমার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবছে। বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে তার ভাবনায় এখন কী চলছে? সেও কি আমার মতো ভাবছে, এই মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসতে হবে? অনেক সুখে রাখতে হবে? কি জানি!
কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি ভাবছেন?’
সে উত্তর দিলো, ‘ভাবছি, অনেক ভালোবাসতে হবে তোমাকে। যত ফোঁটা অশ্রু ফেলেছো আমার জন্য, তার প্রতি ফোঁটার দাম উসুল করে দেবো।’
আমি চমকে উঠলাম! সমস্ত চোখের জলের দাম তো এই একটি বাক্যেই উসুল হয়ে গেছে।
সমাপ্ত…
প্রিয় পাঠক, নিশ্চয়ই ভাবছেন- গল্প কি এখানেই শেষ হয়ে গেলো! হ্যাঁ, লেখিকার কলম এখানেই থেমে গেছে। কিন্তু মীরা ও তার বাবরি চুলওয়ালার নতুন জীবনের গল্প তো সবে শুরু! সেই গল্পটা নাহয় পাঠকের কল্পনায় থাকুক। সব বলা হয়ে গেলে যা বাকি থাকে, তাই তো গল্পের পূর্ণতা। সকলকে ধন্যবাদ ধৈর্য নিয়ে পুরো গল্প জুড়ে পাশে থাকার জন্য। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আর আমার জন্য দোয়া করবেন। ভালো থাকুক মীরা ও বাবরিচুল, ভালো থাকুন আপনারাও।
মিশু মনি
Share On:
TAGS: বাবরি চুলওয়ালা, মিশু মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১২
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১৩
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২০
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১৪
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ১৭
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৪
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৭
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১০
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২২
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১১