বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৪
২৪
রাত নেমেছে।
বিয়েবাড়ির কোলাহল সন্ধ্যার আলোর সাথেই হারিয়ে গিয়েছে যেন। আমি অন্ধকার ঘরে চুপচাপ শুয়ে আছি। কতক্ষণ কেঁদেছি জানিনা!
ছোট চাচা ফিরলেন রাত নয়টার পরে। আমি আপডেট শোনার জন্য চাচার সঙ্গে দেখা করতে এলাম। চাচা আমাকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলেন। নিস্তব্ধ আঙিনায় দাঁড়িয়ে চাচা বললেন, ‘মা মীরা, ভাইয়ারা সবাই এখন তোদের বাসায় আছে। তনয় ছেলেটার নাম্বার বন্ধ। ওর বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। ভদ্রলোক আশ্বাস দিয়েছেন, বিষয়টা উনি যেভাবেই হোক সমাধা করবেন। আশা করা যায় রাতের মধ্যে তনয়ের খোঁজ পাওয়া যাবে।’
আমি খানিকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললাম, ‘থানায় যাও নাই তোমরা?’
‘একজন ভালো লইয়ারের সঙ্গে কথা বলেছি। তুই কোনো প্রেশারই নিস না। যা করার আমরা করবো।’
‘হু। উনি কোথায় আছে জানো?’
‘না। তোর বাবা জানে শুধু। ভাইয়া কাউকে কিছু বলে নাই।’
কয়েক সেকেন্ড থেমে চাচা বললেন, ‘মা শোন। রাতে বাসায় পুলিশ আসতে পারে। তোকে স্বাভাবিকভাবেই নানান জেরা করতে পারে। এইমুহুর্তে এমনিতেই মানসিকভাবে অনেক এলোমেলো আছিস, পুলিশের প্রশ্নের মুখে পড়লে একটা বাজে অভিজ্ঞতা হবে। তুই এক কাজ কর, আশেপাশে কারো বাসায় গিয়ে রাতটা থাক।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘ঠিক আছে। ওনার সঙ্গে কথা হলে প্লিজ আমাকে একটা কল দিতে বোলো।’
‘বলবো রে মা। আরেকটু অপেক্ষা কর, ও তোকে নিশ্চয়ই ফোন দেবে।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছে। সেদিন তনয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো। জানিনা আরও কতভাবে এর খেসারত দিতে হবে আমায়!
ঘরে ফিরে দেখি মা চুপচাপ বসে আছেন। চোখের কোণে ভেজাভাব। ছোট চাচার সিদ্ধান্ত জানাতেই মায়ের মুখটা আরও কঠিন হয়ে গেল।
আমি মাথা নুইয়ে শুধু বললাম, ‘আমার জন্য পুরো ফ্যামিলির সবাইকে সাফার করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্য আমি দায়ী..’
মা আমার হাতটা ধরে বললেন, ‘বলিস না এসব। দেখবি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’
চোখের কোণা দিয়ে গড়িয়ে পড়া এক বিন্দু অশ্রু মা নিজের হাত দিয়ে মুছে দিলেন। এরপর শাড়িটা খুলে রেখে একটা সাধারণ জামা পরলাম আমি। হঠাৎ আয়নার দিকে চোখ যেতেই দেখলাম আমার গায়ের রং হলুদাভ। নিজের জন্যই ভীষণ মায়া হলো আমার।
হলুদের রঙটা এইমুহুর্তে বেমানান লাগছে শরীরে। এই আমি তো আজ দুপুরেও বিয়ের কনে ছিলাম। এখন কেন নিজেকে এমন বেখাপ্পা লাগছে!
মাকে একবার জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করলাম যেন একবার আমাকে মুনযিরের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া হয়। মা আশ্বাস দিলেন। তবে আমার ফোনটাও বন্ধ করে নিজের কাছে রেখে দিলেন মা! কল আসার শেষ পথটাও রুদ্ধ হয়ে গেলো..
নিঃস্ব আমি খালি হাতে ছোট চাচার সঙ্গে বাড়ির বাইরে বের হতেই রাতের নীরবতা আমাকে গ্রাস করলো। এই আঙিনায় আজ সকালেও কত হাসি, কত শব্দ! এখন শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরের অন্ধকার। মনে হলো, আমি যেন বাড়ি নয় বরং নিজের জীবন থেকেই চুপিচুপি পালিয়ে যাচ্ছি।
আকাশের দিকে তাকালাম। অগণিত তারায় ভর্তি। এত বিশাল আকাশের নিচে আমার সমস্যাগুলো হয়তো খুব ছোট। তবুও এই মুহূর্তে আমার কাছে এই কষ্টের ভার পাহাড়ের সমান।
আমি জানি না, আগামী সকাল কী নিয়ে আসবে। জানি না আমার স্বামীর সঙ্গে কখন কথা হবে। জানি না, এই বিয়ের পরিণতি কী!
শুধু জানি, এই রাতটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না।
কারণ এই রাতেই প্রথমবার বুঝলাম, সব ভুলের শাস্তি সঙ্গে সঙ্গে আসে না। কিছু ভুল ভুল ধীরেধীরে মানুষকে একা করে দেয়।
.
ছোট চাচা আমাদের আত্মীয়া রুনি আপার হেফাজতে আমাকে রেখে চলে গেলেন। রুনি আপার বিশাল বড় বাড়ি। বাড়িতে ঢুকেই মনে হলো অন্য কোনো জগতে চলে আসলাম। আপা বারবার বলতে লাগলেন হাতমুখ ধুয়ে ভাত খাও মীরা।
আমার গলা দিয়ে ভাত নামবে না। এক গ্লাস পানি খেয়ে আমি বিশাল বড় ড্রয়িংরুমের এক কোণায় বসে রইলাম। গলার কাছে আটকে থাকা কান্নাটা ঝেড়ে ফেলতে হবে। একটু একা থাকার প্রয়োজন আমাকে তাড়া করতে লাগলো।
আপা এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কিছু লাগলে বলবে মীরা।’
আমি চুপচাপ ঘাড় নাড়লাম। আপা আমাকে রুমের সামনে নিয়ে এসে বললেন, ‘রেস্ট নাও। আমি খাবার রেডি করি। অল্প হলেও খেতে হবে।’
আপা চলে যেতেই আমি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকি। সামনে যা দেখতে পাই, তাতে কলিজা ধড়াক করে উঠলো। বাবরিচুল ওয়ালা এখানে!
আমাকে দেখে সে মলিন হাসি দিয়ে বললো, ‘হাই মীরা..’
আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি! জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ আমার জন্য।
দম আটকে আসছে আমার। এক হাতে মুখ চেপে ধরে অন্যদিকে তাকালাম। নড়াচড়া করার শক্তি পাচ্ছিনা। মুনযির উঠে এসে আমার মুখ থেকে হাত সরাতে চেষ্টা করতেই আমি নরম পাখির ছানার মতো গলে উড়ে চলে গেলাম ওর বুকে।
সে এক হাতে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে অন্যহাতে আমাকে বুকে আগলে নিলো। নিষ্পাপ শিশু মাকে হারিয়ে ফেলার পর আবার ফিরে পেলে যেমন হয়ে যায়, এইমুহুর্তে আমার অবস্থাও ঠিক তাই।
আবেগে, আনন্দে, অশ্রুতে, আমি পাগলপারা। আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আমার কপাল, চুল, আর চিবুক জুড়ে চুম্বনের বন্যা বইয়ে দিলো সে। আমি যেন অসাড় হয়ে গেছি। তার বুকের ভেতর নিজেকে এলিয়ে দিয়ে জগতের সবকিছু ভুলে নতুন এক প্রাণ ফিরে পেয়েছি আমি। জগতের আর কিছুই আমি দেখতে চাইনা, বুঝতে চাইনা। নিজেকে সম্পূর্ণ তার বুকের ভেতর সঁপে দিয়ে পরম নির্ভরতায় আমি চুপটি হয়ে রইলাম।
সে আমাকে বিছানায় এনে বসালো। আমি এখনো তার বুকেই মুখ লুকিয়ে আছি। কখন কাঁদতে শুরু করেছি জানিনা। পাগলের মতো কান্না। হাউমাউ করে কান্না। এ জীবনে আর কোনোদিন এমন প্রাণ উজাড় করে কেঁদেছি কিনা মনে পড়ছে না।
বাবরি চুলওয়ালা আমাকে থামালো না। কাঁদতে দিলো অঝর ধারায়। ঠিক কতক্ষণ ধরে কাঁদলাম আমি জানিনা। একসময় কান্না নিজে নিজে থেমে গেলো। আমি প্রবল ঝড় বৃষ্টির পর শান্ত প্রকৃতির মতো চুপ হয়ে গেলাম।
‘মীরা..’
‘হু।’
‘কান্না শেষ?’
‘হু।’
‘আরেকটু কাঁদো?’
আমি ফিক করে হেসে ফেললাম। সে দুইহাতে আমার মুখটা তুলে ধরে বললো, ‘দেখি, হাসিটা দেখি..’
আমি আবারও হাসলাম। সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মুগ্ধ হয়ে! যেন কত জনম পর প্রেয়সীর দেখা পেয়েছে। তার চোখে অদ্ভুত খুশির ঝিলিক।
আমি এবার অভিমানী সুরে বললাম, ‘ফোন দেননি কেন আমায়? আমাকে না জানিয়ে কেন চলে এসেছেন?’
‘সুযোগ ছিলোনা।’
‘আপনি পঁচা। এই কয়েকটা ঘন্টা আমার ওপর দিয়ে কি চলে গেছে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।’
‘সরি মীরা।’ বলে সে আবারও আমার চুলে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
আমি খানিকটা সরে এসে তার মুখোমুখি বসলাম। এরপর কতক্ষণ সময় যে পেরিয়ে গেলো, কেউই জানিনা। একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম নির্বাক দৃষ্টিতে। যেন কারোরই কিছু বলবার নেই, কোনো তাড়া নেই, কোনো সংশয় নেই। শুধুই সীমাহীন আনন্দ নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা!
খানিকক্ষণ পর সে বললো, ‘বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। পূর্ণ করে দাও, আসো।’
আমি লাজুক হেসে বললাম, ‘না, যাবো না।’
‘ওমা! একটু আগেই তো না চাইতেও এলে।’
‘ওটা কান্নার কারণে।’
‘তাহলে আবার কাঁদো।’
‘না…’
‘কাঁদো না প্লিজ?’
আমি ফিক করে হেসে বললাম, ‘এভাবে বুঝি কেউ কাউকে কাঁদতে বলে?’
‘কেউ কাঁদলে যদি আমার দিলটা শান্ত হয়, তবে কান্নাই ভালো।’
‘ইচ্ছে করে আমাকে কাঁদিয়েছেন আজ। একটা কল দিলেই হতো।’
‘আংকেল নিষেধ করেছিলেন। কেউ যেন কিচ্ছু জানতে না পারে।’
‘আমি কি কেউ? আমি তো আপনার বউ।’
‘আহারে, আমার বউটা। অনেক কষ্ট পেয়েছে।’
সে এগিয়ে এসে হাত দিয়ে আমার চিবুক ছোঁয়ার চেষ্টা করতেই আমি মাথা সরিয়ে ফেললাম। সে বললো, ‘পারমিশন লাগবে নাকি?’
‘লাগবে বৈ কি! পারমিশন ছাড়াই এতগুলো চুমু খাওয়ার অপরাধে জরিমানাও হবে।’
‘আর পারমিশন ছাড়াই যে আমার বুকের ওপর এসে হাউমাউ করে কাঁদলো? তার বেলায় কোন আইন?’
আমি লজ্জা পেয়ে হাসলাম। এতটাই লজ্জা পেলাম যে মুখ তুলতে পারলাম না। সারাদিনের সমস্ত পেরেশান, গ্লানি, একাকীত্ব, সবকিছু ছাপিয়ে তার মুখখানা দেখার পর নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। এতগুলো দিন কেবল অপেক্ষায় ছিলাম তাকে একটিবার জড়িয়ে ধরার আশায়। অবশেষে, আজ!
আমি পাখির ছানার মতো আবারও ফুড়ুৎ করে তার বুকে ঢুকে গেলাম। এবার তার কী হলো জানিনা। আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আমার কাঁধে মাথা রেখে সে কাঁদতে আরম্ভ করলো। আমি এত করে বোঝাই, এত করে চোখ মুছে দেই, তবুও কান্না থামার লক্ষন নেই। সেই আমার মতোই, অনেক্ষণ ধরে বুক ছেড়ে দিয়ে কান্না করতে লাগলো। জীবনে প্রথম আমি কোনো পুরুষ মানুষকে এভাবে কাঁদতে দেখছি।
তার কান্না আমাকেও ছুঁয়ে গেলো বাতাসের মতো। আমিও হু হু করে কেঁদে উঠলাম। এই অশ্রু দুঃখের, এই অশ্রু আনন্দের, এই অশ্রু হারানোর, এই অশ্রু প্রাপ্তির..
দুজনে একে অপরকে জড়াজড়ি করে কাঁদতেই থাকলাম। সময় নিয়ে আমাদের কোনো তাড়া নেই। মনপ্রাণ উজাড় করে কান্না করার এই সুখ উপলব্ধি করতে পেরে দুজনেই একসময় শান্ত হয়ে গেলাম।
গুটিশুটি মেরে তার বুকের ভেতর লুকিয়ে আছি আমি। সে বললো, ‘মীরা..’
‘হু..’
‘কান্নার মাঝেও যে সুখ আছে জানতাম না তো..’
‘হু। আমিও এ কথাই ভাবছি।’
‘তোমারও কি সুখ সুখ লাগছে?’
‘খুউউউব।’
‘তুমি কি জানো, তুমি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো মীরা?’
আমি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, আবার জিগায়! আমি যে তাকে ভালোবাসতে বাসতে ফতুর হয়ে গেছি। এই আমার নিজের বলতে আছেটা কি? সবই তো তাকে উজাড় করে দিয়ে বসে আছি। কত প্রতীক্ষা তাকে একটিবার দেখার, কত আয়োজন তাকে একটিবার কাছে পাবার!
সে আমার চিবুকের কাছের চুল নিয়ে খেলা করতে করতে বললো, ‘তোমার গায়ে হলুদের রং। সুন্দর লাগছে তোমাকে।’
‘সুন্দর না ছাই। আজ আমার বউ সাজা হলোনা।’
‘দুঃখ কোরো না প্রিয়া। আমার চোখে তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বধূ। কারণ তুমি একমাত্র আমার।’
‘দুঃখ সব ফুরিয়েছে। আপনাকে দেখার পর আমার আর কোনো দুঃখ নেই।’
‘দেখার পর নাকি কান্নার পর..’
‘দেখার পর, কান্নার পর। এইমুহুর্তে বড্ড হালকা লাগছে নিজেকে।’
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। কী যে অসম্ভব মায়া সেই চোখে। আমি স্থির থাকতে পারলাম না। তার গলাটা জড়িয়ে ধরে কান্নাভেজা স্বরে বললাম, ‘আমাকে ছেড়ে আর কক্ষনো কোথাও যাবেন না। এক মুহুর্তের জন্যও না।’
‘যাবো না। আজকেও তো আসতে চাইনি। আংকেলকে বলেছিলাম, মীরাকে ছাড়া আমি বাড়ির বাইরে এক পা ও দিবোনা। আংকেল বলেছেন রাতে মীরাকে পৌঁছে দিয়ে আসবো। এরপর এসেছি।’
আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, ‘তারমানে সারাটা দিন আপনার বিরহে আমি কাতর হয়ে আছি এগুলো সব বৃথা? আপনি চাইলেই আমাকে রুনি আপার ফোন থেকে একটা মেসেজ করতে পারতেন।’
‘তোমার ফোনে যোগাযোগ করাটাও রিস্কি হয়ে যেতো।’
‘তা ঠিক। থ্যাঙ্কিউ।’
‘কেন?’
‘এইযে আমাকে এখানে আনার জন্য। সত্যি বলছি, দেখা না হলে আমি মরেই যেতাম।’
‘বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিয়ে করেছি পাখি, মরে যাওয়ার জন্য না।’
তারপরের মুহুর্তটুকু আমি আর লিখে প্রকাশ করতে চাইনা। ওই মুহুর্তটুকুর বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। ঠিক কতটা কাছে পেলে দূরে যাওয়ার সমস্ত কষ্ট ম্লান হয়ে যায়, আজ জেনেছি!
.
হাতমুখ ধুয়ে ভাত খেতে বসলাম। রুনি আপা ও দুলাভাই আমাদের সম্মুখে বসে গল্প করছেন। প্রচণ্ড ক্ষিধে পেয়েছে। আমি মাংস কষা তুলে নিচ্ছি আর গপাগপ গিলছি। মাঝেমাঝে দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হু হা করছি।
দুই প্লেট ভাত খেয়ে আরও খানিকটা ভাত চাইলে রুনি আপা বললেন, ‘কে যেন বলছিলো কিছু খাবেনা? ক্ষুধা নেই?’
আমি মুখ টিপে হাসলাম। সত্যিই একটু আগেও আমার কোনো ক্ষুধাবোধ ছিলোনা। এইমুহুর্তে এই গরুর মাংস, সাদা ভাত আর শসার স্লাইসকে মনে হচ্ছে অমৃত। আমার পেটে আর জায়গা নেই, নয়তো আরও খেতাম নিশ্চিত।
দুজন মিলে এক গামলা ভাত খেয়ে উঠে ঢেকুর তুললাম। রুনি আপা ও দুলাভাই দুজনেই খুব মজার মানুষ। আমাদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কোনো প্রশ্নই করলেন না। বরং অনেকদিনের পুরনো বন্ধুর মতো আড্ডায় মেতে উঠলেন।
খাওয়াদাওয়ার পর খানিকক্ষণ গল্প করে দুলাভাই বললেন, ‘রুনি, চলো ওদেরকে রুম দেখিয়ে দেই।’
আমি আর বাবরি চুলওয়ালা একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। দুজনেরই মুখে মুচকি হাসি। সে বললো, ‘আপু, আমাকে যেই রুম দিয়েছেন ওটাতেই থাকি। আর কোনো রুম লাগবে না।’
দুলাভাই হাসতে হাসতে বললো, ‘আরে ধুর। তোমরা মনে করো হানিমুনে আসছো। ওইটুকুন মুরগীর খুপরিতে কি জমে নাকি? যে কয়েকদিন আছো, দোতলায় থাকো। আমরা নীচতলায় থাকবো। পুরো দোতলা তোমাদের। কেউ তোমাদেরকে ডিস্টার্ব করবে না। নিজের মতো থাকবা।’
আমি আড়চোখে বাবরি চুলওয়ালার দিকে তাকিয়ে দেখি সেও আমাকে দেখছে। দুলাভাই আমাদের রুমে নিয়ে আসলেন। দরজা খুলতেই আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! বিশালাকার কক্ষের একদিকের দেয়াল জুড়ে সাদা পর্দা ঝুলছে। পর্দার ওপাশে নিশ্চয়ই জানালা। ঘরে জ্বলজ্বল করছে বেশ কয়েকটা হলুদাভ ক্যান্ডেল লাইট।
ভেতরে ঢুকতেই এক ধরনের ফুলের সুঘ্রাণ নাকে এসে লাগলো। দুলাভাই বললেন, ‘ফুল আনার টাইম পাই নাই বুঝলা। পাইলে বাসর ঘর সাজায়া দিতাম।’
বাবরি চুলওয়ালা বললো, ‘এটা বাসর ঘরের চাইতে কম কীসে! এমন রাজকীয় ঘরে বাসর করার স্বপ্ন তো দুনিয়ার সব ছেলেরাই দেখে।’
দুলাভাই হেসে বললেন, ‘ভুল বললা মিয়া। ছেলেরা কোনো স্বপ্ন দেখেনা। স্বপ্ন দেখে মেয়েরা। ছেলেদের স্বপ্ন শুধু বউ। একটা বউ হইলেই চলে। তাতেই ওদের ষোলকলা পূর্ণ।’
আমরা হেসে উঠলাম। রুনি আপা আমার জন্য দুই সেট আরামদায়ক জামা ও বাবরি চুলওয়ালার জন্য দুই সেট টিশার্ট ও কোয়ার্টার প্যান্ট রেখে গেলেন। সঙ্গে দিলেন তোয়ালে, সাবান ও শ্যাম্পু।
আমি অভিভূত রুনি আপার এমন আতিথেয়তায়। আপা বললেন, যেকোনো কিছু লাগলে আমাকে জোরেসোরে ডাক দিবা। তোমাদের কারো কাছেই তো ফোন নাই। ভালোই হইছে। দুজনে শুধু দুজনকে নিয়ে থাকো। পুরা পৃথিবী ভুলে যাও।
আপা ও দুলাভাই বেরিয়ে গেলে বাবরি চুলওয়ালা দরজা বন্ধ করে দিলো। আমি ঘুরে ঘুরে পুরো রুমটা দেখতে দেখতে বললাম, ‘মনে হচ্ছে ট্যুরে এসেছি। ফাইভ স্টার রিসোর্ট।’
‘আমার শ্বশুর একটা জিনিস ভাইরে ভাই।’
‘আমার বাবাকে জিনিস বলবেন না।’
‘আচ্ছা সরি। আমার শ্বশুর একটা জিনিয়াস। উনি না থাকলে আজকে বিয়েও হতো না, আর এইভাবে আমাদের বাসর..’
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, ‘আর আমি? আমি বুঝি কিছুই করিনি?’
‘হু। সব তোমারই ক্রেডিট। যাইহোক, আপু কি বললেন শুনেছো? পুরা পৃথিবীকে ভুলে শুধু দুজন দুজনকে নিয়ে থাকো?’
‘হুম। ভালো বলেছে।’
‘তাহলে চলো পুরো পৃথিবীকে ভুলে যাই?’
তারপরের মুহুর্তটুকু আমি আর লিখে প্রকাশ করতে চাইনা। ওই মুহুর্তটুকুর বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। ঠিক কতটা কাছে পেলে দূরে যাওয়ার সমস্ত কষ্ট ম্লান হয়ে যায়, আজ জেনেছি!
চলবে..
Share On:
TAGS: বাবরি চুলওয়ালা, মিশু মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১৪
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ১৮
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৩
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১১
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১৩
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ১৬
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৬
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১২
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৭