বজ্রমেঘ . ❤
পর্বসংখ্যা_২৯ .
ফাবিয়াহ্_মমো .
মধ্যরাত অতিক্রান্ত। বাতাসে ঝড়ের ঝাঁঝ। আকাশ ফেটে বিদীর্ণ দশা। এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত চৌচির হয়ে নীলচে বিদ্যুৎ ঝলকে উঠছে। পুরো রাত্রির চেহারা বদলে যাচ্ছে দিনের উজ্জ্বল ভূমিকায়। কেউ জানতে পারল না সেই রাতে কী ঘটেছে। কেউ টের পেল না বাড়ি থেকে কে অদৃশ্য হয়েছে। শুধু রাস্তার দুটি বোবা কুকুর রক্তের ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে একটি ভেজা জায়গায় কুঁই কুঁই করতে লাগল। মুখে জবান থাকলে বলতো, এখানে জ্যান্ত মানুষের রক্ত! কেউ কিছু করো! এখানে টাটকা রক্ত পড়ে আছে! কেউ দেখে যাও মনুষ্য! হঠাৎ জোর বাতাসে এক পশলা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ধেয়ে এল। ঝপ করে ভিজিয়ে দিল রক্তের থকথকে জায়গাটা। এরপর প্রবলবেগে শুরু হলো মুষল বর্ষণ, সন্তপর্ণে রাস্তা থেকে ধুয়ে গেল পানির নির্মল ধারায়।
পরদিন একই সমারোহে আকাশ অন্ধকার। গাঢ় সন্ধ্যার মতো ঝুপসি হয়ে আছে চারপাশ। সূর্যের দেখা মিলবে না আজ গোটা দিন। এমনটাই আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে সকালে। তাহমিনা কোনোভাবেই স্থির হতে পারছেন না এ দুঃসংবাদে। একদিকে তুমুল বৃষ্টি, অপরদিকে বিয়েটা আজই শুক্রবার বিকেলে। কী হবে এখন? অতিথিরা এই ঘোর বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে বের হবে? ইতোমধ্যে রাস্তায় জলাবদ্ধতা শুরু হয়েছে। জায়গায় জায়গা জমা হচ্ছে ড্রেন রুদ্ধ পানির স্রোত। তাহমিনা একবার স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত সুরে বলে উঠলেন,
- তাহমিদের বাবা, আমি কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছি না। আজকের দিনেও কী ভয়ংকর বৃষ্টিটা হয়েছে দেখলেন? এটা কী বৃষ্টির মৌসুম? এ কেমন তাজ্জব কাণ্ড বলুন তো আপনি!
ভদ্রলোক স্ত্রীর কথায় তেমন মনোযোগ দিলেন না। তিনি হার্ট সংক্রান্ত অসুস্থতায় এমনিই ভীষণ তটস্থ থাকেন। কিন্তু আজ বাইরে আকাশ কাঁপানো বৃষ্টিটা দেখে তিনিও বেশ বিচলিত কণ্ঠেই বলে উঠলেন,
- বুঝতে পারছি না। অতিথিরা কেমন করে আসবেন সেটাই ভাবছি। এভাবে চললে তো ঢাকার রাস্তাগুলো ঘণ্টাখানেকের ভেতর পানিবন্দি হয়ে যাবে। একটা গাড়িও চলতে পারবে না ঠিকমতো! কী মুশকিলে পড়া গেল…
হতাশ ভরা চেহারায় আফসোস করতে লাগলেন আনোয়ার মর্তুজা। তিনি নিজেও এখন আকাশের হাল হকিকত দেখে নিরুপায়। জুম্মা ওয়াক্তের পর প্রায় আশি শতাংশ মেহমানরা উপস্থিত হতে চলেছে। ঘড়িতে এখন বাজে কেবল সাড়ে এগারোটা। রান্নাবান্নার পর্বখানি বার্বুচিদের কল্যাণে সম্পণ্ণ হয়ে যাচ্ছে। গাড়ি রাখার বিরাট ছাউনি-তলায় মোটা পুরুষ্টু তেরপল টাঙিয়ে রান্নার সাজ সরঞ্জাম সবকিছু প্রস্তুত হচ্ছে। খাসি, গরু, মুরগি, হরেক পদের মাছের সম্মিলনে খাবারের মেন্যু আজ দীর্ঘ। কিন্তু সমস্ত আয়োজন কী আজ বৃষ্টির বিরোধে পণ্ড হয়ে যাবে? তাশফিয়া বৃষ্টি ও বিয়ে এ দুটোর মিলমিশ দেখে প্রচণ্ড খুশি হয়ে গেছে। বৃষ্টির ভেতর বিয়েটা নিশ্চয়ই রোমাঞ্চকর হবে? কিন্তু সকাল থেকে এখনো পর্যন্ত নিজের ভাই তাহমিদকে দেখেনি তাশফিয়া। সহোদর বড়ো ভাইটা কোথায় যে ব্যস্ত হয়েছে, এ নিয়ে বাড়ির বড়োদের তেমন ভ্রুঁক্ষেপই নেই। এমন সময় হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে গেল সে। উদ্দেশ্য ছিল ছোটো চাচি মোর্শেদার ঘরে উঁকি দিয়ে আসবে। রেবেকা আপু আজ কবুলনামার পর এ বাড়িতেই শাওলিন ভাবীর সঙ্গে থেকে যাবে। এ খবরটা শোনার পর থেকে তাশফিয়ার যেন খুশির অন্ত নেই। কিন্তু বেচারি যখন তিনতলায় পৌঁছে সবে ছোটো চাচীর ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েছে, কেবল ডানহাত উঁচিয়ে একটা শব্দময় কড়াঘাত করবে, ঠিক তখুনি ওর হাত এক অদ্ভুত কারণে স্থির হয়ে গেল। শূন্যে হাত থামিয়ে তাশফিয়া নিজের সজাগ দুকানে শুনতে পেল,
- শোয়েব বাড়িতে নেই। কোথায় গিয়েছে কেউ বলতে পারে না। আমি এই মুহুর্তে ভাবছি ও কী সত্যিটা জেনে গেল? নাকি সব জেনেশুনেও একদম চুপ হয়ে গেছে? দেখুন ভাবী, একটা সোজা কথা বলি আপনাকে। এটাকে খারাপ ভাবে নিবেন না।
গলাটা চিনতে পেরে অবাক হয়ে গেল কিশোরী তাশফিয়া। এটা মোর্শেদা চাচির কণ্ঠ। উনি এসব কাকে বলছেন? কেন বলছেন? হঠাৎ শোয়েবের ভাইয়ার ব্যাপারে কী নিয়ে প্রসঙ্গটা উঠল? এরপরই তাশফিয়া সজাগ শ্রবণে দ্বিতীয় গলাটিকে প্রত্যুত্তর করতে শুনল। বেশ ব্যগ্র গলায় উত্তেজিত ভাবে বলে উঠলেন মেজো চাচি সুলতানা,
- না ছোটো বউ। খারাপ ভাবে নেয়ার কী আছে? তুমি তো আর ভুল কিছু বলছ না। যা বলছ একদম ঠিক কথাটাই বলছ। নির্দ্বিধায় বলো।
একটু থেমে সামান্য দম নিলেন বুঝি রেবেকার মা। এরপরই ভদ্রমহিলা সতর্কভাবে নিচুকণ্ঠে বলতে লাগলেন,
- তাহমিদের মা যে কাজটা করল এটার খেসারত উনি পাবেন। আমার কথাটা শুধু মিলিয়ে নিয়েন। মানুষের সাথে অমানুষগিরি করলে খোদা ছেড়ে দেয় না। নিজের আপন ভাইয়ের ছেলে, সম্পর্কে ছোটো ভাতিজা হয়, সেই ছেলেটার জন্যে ঠিক করা সম্পর্ক নিয়েও উনার হিংসামি! কী পরিমাণ নিচু চিন্তার মহিলা ভাবতে পারেন? একটা সাধারণ পাত্র-পাত্রী বিষয়ক ব্যাপারেই যেরকম ছোটোলোকির পরিচয় দিয়েছেন, এখন তো আমার ভাবতেও অবাক লাগে উনার মা ফাতিমার ঘরে এমন মেয়ে কী করে হয়! বৃদ্ধ মহিলাটা এখনো টনটনে আছে বলে, মেয়ে মনেহয় অতো ছড়ি ঘোরাতে পারছে না। নয়ত নেহাত দেখতেন এই পাগল মহিলা ভাইদের সংসারে আগুন লাগিয়ে দিতো।
রেবেকা মা মোর্শেদা যখন পুরোনো ঘটনার স্মৃতি তুলে আনছেন, তখন আর পাশ কাটালেন না মর্তুজা বাড়ির মেজো বউ সুলতানা। তিনি বেশ আগ্রহদীপ্ত স্বরে কণ্ঠটাকে চাপা করে বললেন,
- হাতের পাঁচ আঙুল সমান হয় না জানো তো। নইলে পাঁচটা ছেলে যার যার জায়গায় ভালো অবস্থানে আছে, সুখে শান্তিতে সংসার করছে, মাকে নিয়ে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছে, এই সুখছবি কী অন্য কোথাও দেখেছ? আমি এতো বছরের জীবনে দেখিনি, তাই বলতে পারছি মা-টা বেঁচে আছে বলেই উনার ছেলেগুলো শান্তিতে সংসার করতে পারছে। নয়ত বড়ো ভাবী যেখানে চোখ দেন সেদিকেই তো ধ্বংস ডেকে ছাড়েন।
কথার প্রত্যুত্তরে সায় জানিয়ে এবার একটু গভীর আলাপ পাড়লেন মোর্শেদা। তিনি যথেষ্ট দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন বিবেকবান মহিলা। এ মর্তুজা সংসারে স্বামী নেই বহুবছর। অথচ বড়ো ভাবী তাহমিনা, মেজো ভাবী সুলতানা দুজনের সঙ্গে বেশ ব্যালেন্স করে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখেন। চোখের সামনে বহু অন্যায় অপকর্ম নির্দ্ধিধায় করতে দেখেছেন, কিন্তু মুখ ফুটে সরব প্রতিবাদ করার সাহসটা উনাকে সবসময়ই কুণ্ঠাতে পরিণত করেছে। ফলস্বরূপ ঘটনা যখন শোয়েব আর তাহমিদের মাঝে বৈষম্যের রেখা টানলো, তখন তিনি আর সহ্য করতে পারলেন না এসব। শোয়েবকে তিনি চোখে দেখেননি তেমন। কিন্তু কানে শুনেছেন ছেলেটা বাবার মতোই ব্যক্তিত্বসম্পণ্ণ, মায়ের মতো প্রচণ্ড শিষ্টতাসুলভ। কখনো কোনোকিছু উগ্র জেদের বশে অমানবিক হতে দেখেননি। বেশ কর্তৃত্ব পরায়ণ একটি গুণ আছে, কিন্তু ছেলেটা নিজের সদ্ভাবকে পরিবেশ, পরিস্থিতি, মানুষ বুঝে পরিমাপ করে। এমন একটা সুপাত্র সুযোগ্য ছেলেকে নিয়ে বিশ্রী একটা কাজ করা হয়েছে। ফাতিমা নাজের প্রতি আক্ষেপ প্রকাশ করে মোর্শেদা ফের বলে উঠলেন,
- বৃদ্ধা বোঝেনি উনার মেয়ে কীরকম চালাক। সবার সামনে হাসিখুশি মূর্তি, অথচ চিন্তা করতে পারবেন কী পরিমাণ নোংরা পরিকল্পনা করে? রেবেকাকে পর্যন্ত নিজের মতে মতে ভিড়িয়েছে। নিজের সন্তানকে একটা ভালো কথা বোঝাতে পারি না। টাকা-পয়সা থাকলেই যে মানুষ মানুষ হয়ে যায়, এ কথা ভুল। ছোটোলোকরা হঠাৎ পয়সা চিনলে যাকে তাকে অপমান করে বেড়ায়। এরকম নোংরামিতে গা ভাসায়। নয়ত আপন ফুপু হয়ে ভাইয়ের ছেলেকে কেউ বলে ‘নাস্তিক’? আমি তো ছেলেটার ভেতরে দেখলাম না ওরকম কিছু? আপনার চোখে পড়েছে?
মুখে আর্তনাদের মতো অস্ফুট শব্দ করে উঠেছে সুলতানা। বিপুল বিস্ময়ে আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলেন,
- নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ মিন যালেক। ইয়া আল্লাহ, এ কেমন কথা শোনালেন?
চোখদুটো বড়ো বড়ো করে বিস্ফোরণে ফেটে পড়লেন সুলতানা। বিছানায় ধপ করে শব্দ হলো একটা। মনে হলো দাঁড়িয়ে থাকা থেকে বসে পড়েছেন তিনি। খানিকটা সময় পর সুলতানাই প্রথম কথা বলে উঠলেন,
- তাই তো বলি! সবকিছু ঠিকঠাকের পর কীসের ভিত্তিতে রেবেকা মুখ ফিরিয়ে নিল। ও তো আর বাড়ি-গাড়ি-অর্থ-বৈভবের চিন্তা করে না। ননদের জন্য ভালো একটা ছেলে খুঁজছে, সেই ছেলেটা মনের মতো হলেই পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে দিতো। ওর স্বামী তো কম অর্থসম্পদ রেখে যায়নি। এখন ঘটনার আসল রহস্য জানতে পারলাম। কী আজগুবি মানুষ! খোদা দুনিয়ায় কে আস্তিক কে নাস্তিক এসব নিয়ে মানুষের প্রশ্ন তোলা জায়েজ? যদি ওই ব্যক্তি ভেতরে ভেতরে স্রষ্টা মেনে থাকে, তাহলে কেমন পাপকাজটা হয়েছে ভাবো!
- সেটাই। মানুষ হয়ে তো সেটা উনি ভাবেনি। যা মন চায় তাই উনি বলে যাচ্ছেন গড়গড় করে। এতটুকু লজ্জাবোধ থাকলে হাঁটুর বয়সি ছেলেটার সাথে এই রকম জঘণ্য কাজটা করতো না। ওই ছেলের কানে যদি এই খবরটা পৌঁছায়, আপনার কী মনেহয় কুরুক্ষেত্রে একটা বাঁধবে না? শোয়েব না বলুক, ওর দাদী কী এসব শুনলে ছেড়ে দিবেন মনে করেন?
- কখনোই না। এগুলো এমন ধরণের ভয়ানক গুনাহ, যার পাপের শাস্তি আল্লাহ ভুলেও মাফ করবে না! যে পর্যন্ত ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজে অপরাধীকে মাফ না করবে, সেই পর্যন্ত আল্লাহ এই পাপের ওজন ভয়ংকর ভাবে ঝুলিয়ে রাখবেন। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, কপালে কালো দাগ ফেলে, মুখে হাদিস কোরআনের বক্তব্য নিয়ে এমন দুষ্কৃতির আচরণ?
প্রশ্নটা অদৃশ্য কাউকেই করা হলো বলে প্রত্যুত্তর করলেন না মোর্শেদা। কিছু নারীর অপকর্ম নিয়ে মুখ খুলতেও ঘেন্নাবোধ হয়, কেননা দুর্গন্ধ ঘাঁটালে সেই গন্ধে নিজের হাত নোংরা হয়। কিন্তু যিনি আসলেই একটা দুর্গন্ধযুক্ত কীট, অসুস্থ মানসিকতার, বিকৃতরূপী চিন্তার জীব, সেই মনুষ্যের কোনো লজ্জাবোধ হয় না কিঞ্চিত। উলটো নিজেকে সৎ, শুদ্ধ, খড়কুটো, নির্দোষ প্রমাণের জন্য জনে জনে গিয়ে মায়াকান্নার স্তুস্তি ফোটায়। তার কোনো অপরাধ নেই, সে নির্দোষ খড়কুটো মানুষ, কোনো স্বার্থ নেই তার। অথচ মানুষ কত খারাপ, তাকে অপমান করছে, তুচ্ছ করছে, কতই না গর্হিত আচরণ পেয়েছে। এমন নিখুঁত মিথ্যায় গবেট নির্বোধ পক্ষটা গলে যায়, আর বুদ্ধিমান পক্ষটা বসে বসে চুপ থেকে দেখে। চুপ থাকাটা শক্তিশালী অস্ত্র; যে অস্ত্রের ধারালো আঘাতে ফেরাউনেরও পতন হয়েছিল।
দরজার ওপাশ থেকে সম্পূর্ণ কথাগুলো শুনে তাশফিয়া স্থবির হয়ে গেল। বয়সে পরিণত না হলেও বুদ্ধি ও মনষ্কতায় তাশফিয়া যথেষ্ট পরিণত। কাকে নিয়ে, কী বিষয়ে, কেন আলাপ করেছে এ সবই ওর কিশোরি মাথাটা ধরতে পেরেছে খাপে খাপ। নিজের মা কেমন এ নিয়ে তাশফিয়া কখনো কাউকে কিছু বলবে না। কখনো জানানো হবে না মা সবসময় পুত্রকেই বেশি আদর যত্ন করে, কন্যাসন্তান সবসময়ই বৈষম্যের স্বীকার। শুধু বাবা ছাড়া তাশফিয়া মার কাছে সেভাবে গুরুত্ব পায় না। কিন্তু আজ তাশফিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে জায়গাটা থেকে সরে পড়ল। মা জননীর ব্যাপারে যতই মানুষ মন্দ বলুক, তাশফিয়া তো নিজ মুখে কিছু বলবে না। মেয়ে হয়ে মাকে নিয়ে কিছু বলা, কিছু শোনা এ যে আরেক অন্যায়!
.
শুক্রবার, বেলা বারোটা। জুম্মার আযান শুরু হবে কিছুক্ষণের ভেতর। মুখের অবস্থা প্রচণ্ড মাত্রায় গম্ভীর। নিজেকে শান্ত রাখার সর্বোপরি চেষ্টায় আজ দুঘণ্টা নিয়ে শাওয়ার করেছে শাওলিন। উদ্দেশ্য একটাই, মাথা ও মন দুটোকে শীতলীকরণ। শান্তকরণ। ভয়, সংকোচ, দুশ্চিন্তা, আশঙ্কা সবকিছুর উর্ধ্বে ভেতরের জগতটাকে স্থির করা। কিন্তু দুঘণ্টার টানা গোসলে মাথা কিছুটা ঠাণ্ডা হলেও শরীরে জ্বর আগমনী উত্তাপ টের পেল। বুঝতে পারল এন্টিবায়োটিক ক্যাপসুল যথাসময়ে না খেলে আজ ভয়ংকর গা পুড়িয়ে জ্বর আসবে। ভেজা চুলগুলোকে টাওয়েলে মুছতে মুছতে ঘরে পা দিল শাওলিন। টানটান বিছানার ওপর বিয়ের পোশাক, জড়োয়া গহনা, সাজসজ্জার বিভিন্ন জিনিস, ব্রাইডার লুকের জন্য পূর্ণাঙ্গ একটি রাজ্য সাজিয়ে রাখা। বুক ভর্তি করে গভীর শ্বাস টেনে সেটা সশব্দে ফেলল শাওলিন। শাড়িটার রঙ টকটকে লালবর্ণ, পাড়টা ভীষণ মোটা। সোনারঙে ঝিলমিল করছে ওটা। কাপড়টা ঘন বুননের দামি কাতান। পুরো শাড়িজুড়ে সোনালি জরির পুরু কাজ শোভা পাচ্ছে, প্রচণ্ড কারুনৈপুণ্যে এমব্রোডারির সুক্ষ্ণ সৌন্দর্য ফুটে আছে, আঁচলটা যেন এক লোহার চাদর। প্রচণ্ড ভারযুক্ত! শাড়িটার ওজন কম করে সাড়ে তিন-চার কেজির সমতুল্য। চোখ ঘুরিয়ে জড়োয়া গহনায় নজরবিদ্ধ করল। লাল রঙা ভেলভেটের কয়েকটি গহনা-বাক্স খোলা, তাতে কানের ঝুমকো, গলার হার, মাথার সিথিপাটি ও হাতভর্তি করা চুড়ির অলঙ্কার। ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত ভয়ে সিঁটিয়ে গেল শাওলিন। এগুলো পরলে ওকে খুঁজে পাওয়া যাবে? জীবনে কানে দুটো ভারি ঝুমকো পরেনি, সেই মেয়ে এখন চার-পাঁচ কেজি ওজন চাপাবে এই দেহে? মুখখানা কাতর ভঙ্গিতে অসহায় দেখাতে লাগল। চুল থেকে কখন যে টাওয়েল সরিয়ে ফেলেছে সেদিকে ধ্যান নেই শাওলিনের। হঠাৎ ঘরের দরজায় নক করে ভেতরে প্রবেশ করল সোহানা,
- জানা, গোসল হয়েছে?
প্রশ্নটা করতে করতেই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে ও। সোহানার বাঁহাতে ঝুলছে ওর পোশাক-আশাক। অন্যহাতে একটি শপিংব্যাগ ধরা। দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দুহাত বিছানার ওপর ছেড়ে দিল। শাওলিনের উদভ্রান্ত চাহনিটা দেখেই বোধহয় সোহানা মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
- বিয়ের দিন পরতে হয় রে ছোট্টবন্ধু! এভাবে ইনোসেন্ট চেহারা বানিয়ে আপসেট হোস না। শাওলিন টাওয়েলটা নিজের কাঁধে ফেলে বলল,
- তুমি কী বুঝতে পারছ এখানে কী ধরণের কাপড় দেয়া হয়েছে? এগুলো আমি পরব? কীভাবে পরব? আমাকে কখনো দেখেছ এতো ভারি কাজ করা পোশাক পরতে?
সোহানা নিজের জামাটা নিয়ে বাথরুমে যেতে যেতে বলল,
- বিয়ের দিন সব মেয়েকেই এরকম সিচুয়েশন ফেস করতে হয়। একমাত্র তুই ভুক্তভোগী, এরকমটা একদম ভাববি না। আমার মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে ভাবীকে দেখেছি মাথা থেকে পা পর্যন্ত হেভিওয়ার্ক করা লেহেঙ্গা পরতে। উনার কী পরিমাণ কষ্ট হয়েছে! সেখানে তো তোকে যথেষ্ট হালকা শাড়িই দিয়েছে। হু, এখন কথা বাড়াস না। আমাদের এক্ষুণি পার্লারে যেতে হবে। দ্রুত সবকিছু ব্যাগ ভর।
কথাটা বলেই চটজলদি বাথরুমে ঢুকে দরজা দিল সোহানা। আর একমুহুর্তও দেরি করা চলবে না। একটার ভেতর যে করেই হোক, পার্লারের আসীন হতেই হবে। ঠিক এমনটাই গুরু নির্দেশ দিয়েছে রেবেকা। রেবেকা এই মুহুর্তে কলের পর কলে ব্যস্ত, কানে ও কাঁধের মাঝখানে ফোনটা চেপে সেভাবেই সে কথা বলছে দক্ষভাবে। দুহাতে কাজ করেই যাচ্ছে ঝটপট। জোহরা সবকিছু এগিয়ে দিতে তৎপর, অন্যদিকে মর্তুজা মেনশন থেকে রেবেকার খালাবাড়ির বোনরা এখানে উপস্থিত। কলাবাগানের ফ্ল্যাটে পুরোদস্তুর হইচই অবস্থার ছড়াছড়ি। রোজা ও শ্রেষ্ঠা ইতোমধ্যে রেবেকার গাড়িতে আসন গেড়ে দুজন দুদিকে তাকিয়ে আছে। যেন তাদের ভেতর সতিন সুলভ কোনো শত্রুতা, একজন আরেকজনের চেহারা দেখা মহা পাপ। গাড়িটা চালাবে একজন ড্রাইভার। তিনি তাড়া দেয়া গলায় উনার পাশে বসা শ্রেষ্ঠার দিকে বললেন,
- আম্মারা? আফনাদের কী আরো দেরি হইবে? রাস্তায় কিন্তু হাঁটুজল জমা হইবে। এই বৃষ্টি সুবিধার বৃষ্টি না। এখন যদি না বেড়ন, তাহাইলে ফৌঞ্চাইতে ফারবেন না।
লোকটার কথায় যেন কোন অঞ্চলের দেশীয় টান আছে। সোহানাটা থাকলে চট করে ধরে ফেলতে পারতো। শ্রেষ্ঠা ডানদিকে মুখ ফিরিয়ে দুহাত বুকের ওপর উপবিষ্ট করে বলল,
- কাক্কু, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
ড্রাইভার জহিরুল সরল নরম মানুষ। শ্রেষ্ঠার চটান কথায় কিছুটা ব্যাক্কল বনে বললেন,
- কী কথা জিজ্ঞেইস কইরবেন আম্মা?
- ধরেন একটা মহিলার বয়স পঁয়তাল্লিশ। পড়াশোনায় ডিগ্রী ধারী। নিজের যোগ্যতা আর ক্ষমতা ভালোই আছে। মহিলা একটা বাচ্চা মেয়েকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। বাচ্চা মেয়েটার বয়স উনিশ-বিশ ধরেন। মানে বয়সটা এখনো পচিঁশই হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো সাবজেক্টে পড়তেছে। মেয়েটার পোটেনশিয়াল আর আই কিউ কিছু কিছু জায়গায় প্রচুর শার্প। এই বাচ্চা মেয়েটাকে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সি মহিলা খুব পছন্দ করল। কী কারণে পছন্দ করছে এটা ধরেন আল্লাহ ভালো জানে। কথা ঠিক আছে না কাক্কু? বুঝতে পারছেন তো?
জহিরুল এবার বুদ্ধি বিবেচক কণ্ঠে বলে উঠলেন,
- জ্বি আম্মা। বুঝতে ফারছি।
- আচ্ছা। এখন ধরেন এই মহিলার সাথে এই বাচ্চা মেয়েটার মতের অমিল হলো। কোনো কারণে দুজনের চিন্তা, মতামত একরকম হলো না। এখন এই মহিলা যদি ভুল করে তাহলে কী এই বাচ্চা মেয়েটার কর্তব্য কী? মহিলার ভুলকে ভুল বলা না? নাকি ভুলটাকে সঠিক বলে একটা অন্যায় করে ফেলা?
- ভুলটারে ভুলই বলা। ভুলরে কেন সঠিক বলতে যাইবে? বয়সে বড়ো হইয়েছে বলে পার পাবে কোন সাহসে?
- তাহলে এখন মনে করেন, এই বাচ্চা মেয়েটা এই কাজটাই করল। মহিলা যখন নিজের অহংকারে নিজের ভুল কাজকে শুদ্ধ বলে বোঝাতে লাগল, তখন মেয়েটা প্রতিবাদ করে দূরে সরলো। তখন এই মহিলা এটা সহ্য করতে পারল না। সে তখন কী করল সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার কাছে সরাসরি ধরা দিল। ওই বাচ্চা মেয়ের সামনে নিজের অন্যায়টাকে একবার স্বীকার করল, কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা না ঘুরতেই সেটাকে মনে করেন মানুষের সামনে অস্বীকার করল। এখন বলেন এখানে দোষ কার?
- আম্মা, ওই বেডি মহিলার। মহিলা কিন্তু ফল্টিবাজ। কী আকাম করল এইটা চিন্তা করো!
- চিন্তা তো করছিই। নাহলে এই আলাপ আপনার সঙ্গে করি কেন? আমি মানুষটা খুবই সরল সহজ। মানুষের মুখ থেকে এমন নারীঘটিত শয়তানি যখন শুনি, তখন কী করতে মন চায় আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমার আব্বু একটা কথা বলে, নারীর ক্ষতির পেছনে নারী দায়ী। পুরুষ যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে বেশি নারীরা এগিয়ে। এইটা হচ্ছে সমাজের উন্নয়ন। পড়াশোনা করে শিক্ষিত হয়ে শীর্ষে উঠেছে, কিন্তু কোনটা অন্যায় কোনটা ভুল এই বুঝজ্ঞান এমন পঁয়তাল্লিশেই হয়নি। চিন্তা করেন হাঁটুর বয়সি বাচ্চা পোলাপানের সাথে কী তামাশাটাই না করে! আরে বাবা, তোমার যদি এতোই অপছন্দ হয়; তাহলে অতো গদোগদো ভালোবাসা দেখাতে গেছ কী জন্যে? তখন জহুরি চোখে দেখোনি? নাকি চোখ পুকুরে ফেলে আসছিলে? এখন আবার কীসের ভড়ং ধরো?
- ছুটুলোক ছুটুলোক। এইগুলারে নিয়ে কিসু করতে পারবেন না। কিসু বললেই দেখবেন আফনার উফরে কী কী চাফাতে আসে।
- আমি কাক্কু ভয় টয় পাই না। আব্বু আমাদের দু বোনকে যথেষ্ট শিষ্টাচার শিখিয়েছে। নইলে ওই ভণ্ড মহিলার মুখোশ কবেই আমি ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলতাম। বাচ্চা মেয়েটা আমার বান্ধবি শেহজানার সমান। আমাদের ক্যাম্পাসে আসে, আড্ডাগল্প চলে। বড়ো আপু ডাকে। চমৎকার একটা প্রাণচঞ্চল মেয়ে। কিছুদিন আগে এই সমস্ত ঘটনা আবছা ভাবে কানে আসলো। ওই বাচ্চা মেয়েটাকে বস্তি, নর্দমা পর্যন্ত বলেছে। কাহিনি তো জানতাম না। কিন্তু খোদার কসম! শরীরটা রাগে জ্বলে যাচ্ছিল। আমি তো ওকে চিনি। অথচ ওর এক চেনা মানুষ এসে আমার কাছে বলল মেয়েটা নাকি এসব এসব করেছে। এখন আমি তো ওদের চাইতেও এই বাচ্চা মেয়েটাকে চিনি। চেনার জায়গায় আমার ভুল হবে না। ওকে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, ওর চেনা লোক যে ওর নামে এসব ছড়াচ্ছে সব বললাম, বাধ্য হয়ে আমার কাছে সব বলল। কিন্তু ও-ই কিছু করতে আপাতত ‘না’ করল, মূর্খের সাথে ফকিন্নির মতো লেভেলে নামিয়ে ঝগড়া চলে না। কিছু করলাম না আপাতত। নাহলে ওই ভণ্ড মহিলার দাপট কতদূর, এটা আমাদের ক্যাম্পাসে এনে ডাইরেক্ট বুঝিয়ে দিতাম।
পেছনে থেকে রোজা সমস্ত কথাই শুনল। শ্রেষ্ঠা যে কী পরিমাণ মিশুকে এবং এক্সট্রোভার্ট, মানুষের প্রতি ওর একটা সরল চিন্তা আছে, এ ঘটনা শুনে আরো একবার বুঝতে পারল সে। জহিরুল কিছু বলার আগেই রেবেকা আসতে দেখল দ্রুতপায়ে। ফোনে ব্যতিব্যস্ত ভাবে কথা বলছে। কপালে ভ্রুঁ কুঞ্চিত। নিজেই গাড়ির ব্যাকসিটের দরজা খুলে শাওলিনকে গাড়িতে চড়িয়ে ধপ করে দরজাটা লাগিয়ে দিল। জহিরুলের জানালার কাছে মুখ নামিয়ে ফোন ধরা অবস্থাতেই বলল,
- সাবধানে গাড়ি চালাবেন। বৃষ্টির মধ্যে গতি তুলতে যাবেন না। ঠিক আছে?
- জ্বি আম্মা। ঠিক আছে।
এরপরই গাড়িটা বৃষ্টি মেখে এপার্টমেন্ট ভবনের পাকিংলট ছেড়ে শোঁ করে বেরিয়ে গেল। ভবনের লৌহ গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হলো ধূসর গাড়িটা।
.
বেলা এক ঘটিকা। মসজিদে নামাজের জন্য বেরোচ্ছে পুরুষরা। সবার পরনে ধবধবে ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবি। গা থেকে ভুরভুর করে বেরোচ্ছে আতরের মিষ্টি খুশবু। বাড়িজুড়ে বিয়ের আমেজ ঘনানো উচ্ছলতা, অপরদিকে পবিত্র জুম্মার শান্তি মাখানো স্নিগ্ধবেশ। বাইরে প্রবল আকারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির ঢাল যেন চোখের সমুখে সবকিছুকে ঝাপসা বানিয়ে দিয়েছে। যেখানে আকাশের চেহারা ফরসা হবার জায়গায় ঘনীভূত হচ্ছে কৃষ্ণবরণ মেঘে। কড় কড় করে বাজ পড়ছে ক্রমাগত। ভূমি সর্বস্ব কেঁপে উঠছে দালানকোঠা, কিছু কিছু সদস্যবৃন্দ। হ্যাঁ, অতিথিরা সমাগম হচ্ছে যে যার মতো। কেউ গা মাথা ভিজে, কেউ পাজামা ও জুতোয় কাদা মেখে। এমন সময় মেজো বউ সুলতানা বরের খবরাখবর নিতে দোতলায় ভিড়লেন। নিচে সবাই জড়ো। বন্ধ দরজায় ডানহাতে টোকা দিলেন, কিন্তু আশ্চর্যভাবে দরজাটা ক্যাঁচ করে আপনাআপনি খুলে গেল। অবাক বিস্ময়ে ভ্রুঁজোড়া কুঁচকে ভেতরে মাথা গলালেন সুলতানা, কণ্ঠ সুপরিসর করে ডেকে উঠলেন,
- তাহমিদ? বাবা তুমি তৈরি হয়েছ? গোসল করেছ বাবা? . . . তাহমিদ?
শেষ ডাকটা দিয়ে হঠাৎ কেমন থমকে গেলেন তিনি। মনের ভেতরে যেন কু ডেকে উঠল! ঘরদোর এতো নিস্তেজ কেন? মনে হচ্ছে মানুষ ঘুমায়নি? বিছানা পরিপাটি, চাদরে একটা ভাঁজ পর্যন্ত নেই। কী ব্যাপার, তাহমিদ কী ঘরে আসেনি? ও কী কালরাতে হলুদ ছোঁয়ানোর পর ব্যস্ত হয়ে গেছে? সুলতানা একে একে বারান্দা ও বাথরুম খুলে প্রতিটি কোণ দেখে নিলেন। কিন্তু তাহমিদের পদচারণার কোনো চিহ্নই যেন নেই! অদ্ভুত ভয়ে গা কাঁটা দিয়ে উঠলে তাড়াতাড়ি তিনি দৌড়ে ছুটে যান! দোতলা থেকে কান ফাটানো চিৎকারে ‘ বড়ো ভাবী! তাহমিদের মা! ভাবী আপনি কোথায়? বড়ো ভাবী!’ বলে একটানা চ্যাঁচামেচি করতে থাকেন। ধপধপ করে সিঁড়ি ভেঙে নামতেই তিনতলা থেকে সেই স্বর শুনতে পেল তাহিয়া। কানে ঝুমকো পরতে গিয়ে হঠাৎ ভ্রুঁ কুঁচকে দরজা মুখো তাকাল! ‘কী ব্যাপার? কী হলো? গলাটা মেজো চাচির না?’ প্রশ্নটা ঘরে উপস্থিত মিথিলার দিকে ছুঁড়ে দিল তাহিয়া। মিথিলা শাড়ির কুচি শেষবারের মতো ঠিক করছে। একদিকে প্রশ্ন অন্যদিকে সুলতানা বাড়ি কাঁপানো চিৎকারে মিথিলাও সন্দিহান। আশ্চর্য সুরে বিস্ময় ঢেলে বলল,
- উনি চিল্লাচ্ছেন কেন? কী হলো আবার? চলো তো নিচে। কী অঘটন ঘটলো আল্লাহ মালুম!
মিথিলা দ্রুতপদে নিচে যেতে চাইলে হঠাৎ খুট করে দরজা খুলল কেউ। বাথরুমের দরজাটা খুলে ঘরে ঢুকছিল অধরা। চোখে-মুখে উপচে পড়ছে উত্তেজনা! সেও যে সুলতানার গগনচুম্বী চিৎকার শুনেছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অধরা ভেজা হাতদুটো দ্রুত টাওয়েলে মুছে নিয়ে বলল,
- কী হয়েছে ভাবী? চিৎকারটা করল কে? গলাটা সুলতানা চাচিমার নাকি?
তাহিয়া তখন কানের ঝুমকো সেভাবেই ফেলে রেখে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছিল। দরজা দিয়ে যেতে যেতে বলে গেল,
- কিছু একটা অঘটন ঘটেছে! সুলতানা চাচি স্বাভাবিক গলায় চেঁচাচ্ছেন না!
কথাটা শুনতে দেরি একমুহুর্তে টাওয়েল ছুঁড়ে ঘর থেকে বেরোয় অধরা। সকলেই মোটামুটি তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ অমন ভয়াতুর চিৎকারে কারোরই যেন স্বস্তি স্বাভাবিক অবস্থা নেই। দুদ্দাড় করে সিঁড়ি ভেঙে নামতেই নিচতলায় সবাইকে সমবেত হতে দেখল। অতিথিবৃন্দরাও সেখানে উপস্থিত হয়েছে এটুকু সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই সুলতানা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠেন,
- তাহমিদ . . ওর ঘর সম্পূর্ণ খালি। বিছানা পর্যন্ত ঝাড়ামোছা টানটান। গতরাত ওকে শেষ দেখেছিলাম, কিন্তু.. কিন্তু . .
গলায় নিঃশ্বাস আঁটকে আসছিল উনার। কোনোমতে দম টেনে নিজেকে সুস্থির করলেন মহিলা। তাহমিদের মা তখন উত্তেজিত ভঙ্গিতে সুলতানাকে ‘তারপর? তারপর? ‘ শুধিয়ে চলেছেন। সুলতানার অমন ভীতিগ্রস্ত চেহারায় বাড়ির পুরুষরাও খবর পেয়ে রাস্তা থেকে ফেরত চলে আসছে। পুরো ঘর যখন মানুষে মানুষে ভর্তি, ঠিক সেসময়ই প্রচণ্ড গর্জনে গমগম করে উঠল চারপাশ! কান তব্দা করা বিকট শব্দে বাজ পড়েছে একটা। সবাই সেই প্রকৃতির শব্দে চমকে উঠলেও তাহমিনা যেন যক্ষের ধণের খবর শুনতে মরিয়া! সুলতানা দুকাঁধে তীব্র ঝাঁকুনি খেতেই গড়গড় করে বলতে লাগলেন,
- তাহমিদ ঘরে নেই! ওকে ফোন দেন ভাবী। ছেলেটা বিয়ের দিন ঘরে নেই, ওকে সকাল থেকে কেউ দেখে নি!
কথাটায় সায় জুগিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন ফাতিমা। তিনি কখন যে ভীড়ের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন কেউ দেখেনি। তিনি প্রচণ্ড উদ্বেলিত হয়ে তাহমিনার দিকে দীপ্ত গলায় বলে উঠলেন,
- তাহমিনা, ছেলে কোথায়? কালরাতে তোমাকে বলেছিলাম ছেলেটাকে খাইয়ে আসো! ও কাল হলুদ অনুষ্ঠানে কিচ্ছু মুখে দেয়নি। তাহমিনা, এখন যেন তোমার মুখ থেকে মিথ্যা না শুনি!
পুত্রের নিখোঁজ সংবাদে স্তম্ভিত মূর্তি ধারণ করেছেন ফাতিমা। তিনি যারপরনাই হতভম্ব, নির্বাক, রিক্তপূর্ণ মূহ্যমান! কানে যেন কোনো কথাই প্রবেশ করছে না। ধপ করে মেঝেতে গা ছেড়ে দিলেন, কিন্তু পথিমধ্যে মিথিলা ‘জেঠিমা, সামলান!’ বলে দ্রুত হাতে ধরে ফেলল। হাঁটু ভাঁজ করা অবস্থা থেকে সোজা দাঁড় করিয়ে দিল মিথিলা উনাকে। কিন্তু তিনি যেন শূন্য চোখে ফ্যাকাশে স্বরে বলে উঠেন,
- আমার বাচ্চা . .
পরম মমতায় ছেলের প্রাণপ্রিয় সম্বোধনটা বলে উঠলেন তিনি। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পাবার মতো মিথিলার হাত ঝাড়া দিয়ে নিজেকে শক্তদৃঢ় বানালেন। ঢোক গিলে থরথর করে কাঁপুনে গলায় বলে উঠলেন,
- আমার ছেলেটা কালরাতে ঘরে গিয়েছে। আমাকে বারবার নিষেধ করে বলেছে ওকে কেউ যেন বিরক্ত না করে। ও জরুরি কাজ করবে। গুরুত্বপূর্ণ কাজ! আমিও সে কথা মেনে কাউকে ত্রিসীমানায় যেতে দিইনি!
এবার রুদ্র স্বরে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন ফাতিমা।ধমকের সুরে প্রচণ্ড ঝাঁঝিয়ে বললেন,
- তাই বলে তুমি ছেলেটার খোঁজ নিবে না? এ কেমন দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছ? তুমি জানো না ও আজ বিয়ের বর! ওকে সবপ্রকার দেখভালে রাখাটা তোমার মা হিসেবে কর্তব্য!
ফাতিমা কেন যে এতো রেগে গেলেন এটা একমাত্র শুধু বুঝতে পারল তাহিয়া। এই মুহুর্তে বিয়েটা ভেস্তে যাওয়া মানেই ওই মাসুম মেয়েটার কপালে কলঙ্ক জোটা! সোসাইটি লোকজন নিন্দা, ঠাট্টার মশকারি করতে ছাড়বে না! কিন্তু তাহমিনার ভেতরে ওসব নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই, সে নিজের গর্ভের পুত্রের বিপদের আশঙ্কায় মুর্হুমুহু কাঁপতে লাগলেন। একমুহুর্তের ভেতর স্বামী আনোয়ার মর্তুজাকে পাগল করে ফেললেন ছেলের খোঁজাখুঁজি নিয়ে।
ভদ্রলোকও এই বয়সে দমবার পাত্র নন। শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে তিনি লোক লাগালেন চর্তুদিকে। কল করে ক্ষমতার ব্যবহার প্রয়োগ করলেন সর্বত্র। উনার ছেলে গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত। এভাবে এভাবে হারিয়ে যাবে, নেই হয়ে যাবে, এমন অমূলক ঘটনা তিনি ঘটতেই দেবেন না। ছেলের যদি কিছু হয়, তবে তিনিও সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার মর্তুজা, সার্টিফাই গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির শিল্পপতি।
ঘড়িতে দুপুর আড়াইটা। বাইরে ঝমঝমিয়ে নেমেছে বৃষ্টি। বৃষ্টি তোড় কমবার কোনো লক্ষণ নেই। অভিজাত একটি পার্লারে উপস্থিত হয়েছে ওরা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শীতল ঘরে একটা নীরব নীরব পরিবেশ বিরাজ করছে। একেকটি ডেস্কে ডেস্কে ব্যস্ত রয়েছে কিছু ব্রাইড ও মেকআপ আর্টিস্টরা। শাওলিন যে ডেষ্কে পড়েছিল, সেটি ছিল কিছুটা প্রাইভেট কর্ণার। কিছুটা স্পেশাল প্যাকেজ বুকিংয়ে নিজের মতো একটি কোণকে বাকিসব ডেষ্ক থেকে আলাদা পাওয়া সম্ভব। রেবেকা ফোনে কথা বলছেন। সিলেট থেকে কলেজের কোনো জটিলতায় বারবার কথা বলছেন। শ্রেষ্ঠা, রোজা ও সোহানা শাওলিনের বাঁপাশে একটি বসার স্থানে বসে আছে। ওরা নিজেরা নিজেরা ছবি তুলছে সেলফি ভঙ্গিতে। শ্রেষ্ঠার পরনে দীর্ঘ ঘেরবিশিষ্ট গোল জামা, প্রায় মেঝে ছুঁয়েছে জামার শেষপ্রান্ত। জামাটির রঙ মেরুন বর্ণ। মেরুনের ওপর রূপোলি রঙে দারুণ কারুকাজ খচিত। ওড়নাটা পিঠের পেছন থেকে দুহাতে জড়িয়ে রেখেছে। চুলটা কার্ল মেশিনে কোকড়া করেছে কিছুটা। ঠোঁটে ডিপ মেরুন লিপস্টিক, চোখে ঘন করে মাশকারা ও আইলাইনার সরু সাজ। ডানহাতে একটি রূপোলি রঙের লেডিস ওয়াচ। রোজার পরনে ধবধবে সাদা রঙের লেহেঙ্গা। তার ওপর কালচে লালের কারুকাজ। ওড়নাটা খয়েরি লালের মধ্যে সম্পূর্ণ হেভি কাজ করা। মুখে ‘নো মেকআপ’ স্টাইলে একটা সাজ নিয়েছে ও। ঠোঁটদুটো টুকটক করছে লাল রঙে। মিষ্টি দেখাচ্ছে আজ। সোহানার গায়ে কালো রঙের অপূর্ব সুন্দর একটি পাকিস্তানি সালোয়ার-কামিজ। কালো ওপর সোনা রঙে ঝিকমিক করছে কারু নৈপুণ্যটা! গলায় ওড়না, রেশম কালো স্ট্রেট চুলগুলো ছেড়ে রেখেছে পিঠ জুড়ে। ডাগর চোখদুটো ভীষণ সুন্দর করে কাজল টানা। চোখদুটোতেই যেন সম্মোহন লুকিয়ে আছে। ঠোঁটে হালকা রঙের ভেতর মানানসই লিপস্টিক। দুহাত ভর্তি রিনঝিন করা চুড়ি পরেছে, কাঁচের কালো চুড়ির বহর। তিনটি তরুণীকে অদ্ভুত রকম সুন্দর দেখাচ্ছে, আর অপরদিকে ব্রাইডাল সাজে সজ্জিত তখন শাওলিন। লাল টকটক করা চোখ ধাঁধানো শাড়িতে অপূর্ব দেখাচ্ছে ওকে। মেকআপ আর্টিস্ট নিজের চোখকেই বারবার সামলে চলছেন ওকে সাজাতে গিয়ে। একবার মুখ ফসকে বলেই দিল মেয়েটি,
‘ আপনার চোখদুটো খুব মায়া মায়া। আপনার গোলাপি ঠোঁটদুটোতে মেরুন রঙ দিলে খুব মানাবে ম্যাম।’
প্রত্যুত্তরে সাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ শাওলিন ঠাণ্ডা গলায় বলল,
- আপনার যেমন খুশি আপু। আমার রঙ নিয়ে তেমন রিকোমাণ্ডেশন নেই।’
আর্টিস্ট মেয়েটি চঞ্চল একটি হাসি উপহার দিয়ে একটু গাঢ় স্বরে বলল,
- ম্যাম একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
শাওলিন কাজল ছোঁয়ানো চোখ, মায়াবি পূর্ণ চাহনিটা রাখল। আর্টিস্ট মেয়েটি ওর ওই চোখে চোখ স্থাপন করে বলল,
- আপনার বিয়েটা কী অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ?
একটু ভাবল শাওলিন। মনের ভেতর প্রশ্নটাকে নাড়াচাড়া করে সামান্য সংকোচ জড়িয়ে বলল,
- জি আপু। পারিবারিক।
এমন উত্তরে মুখ উদ্ভাসিত করে হাসলো মেয়েটি। আশপাশে নজর বুলিয়ে কী যেন দেখে নিয়ে হঠাৎ শাওলিনের কানের কাছে ঝুঁকল। নিচুস্বরে ফিসফিসে জানাল,
- আপনার অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হলে আপনি ভীষণ সুখী হবেন। আমার প্রেডিকশন কখনো ভুল হয় না। তেরো সাল থেকে শখের এ পেশাটায় যুক্ত। আপনাকে দেখে মন বলছে, আপনার বর ভীষণ ভালো মানুষ হবেন।
কথাটা শুনে সহসা শিউরে উঠে শাওলিন। বুকের ভেতর যেন হাতুড়ি পড়ল একবার! ব্যথায় শ্বাসযন্ত্রটা সংকুচিত হতে চাইল, কিন্তু অস্থির অবস্থাটা প্রাণপণ চেপে বলল,
- আপনি . . আপনি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন? আমার বর এখানে আসেননি! বাকি ব্রাইডদের মতো আমার কাছে তিনি কল পর্যন্ত করেননি। তবে আপনি . .
হঠাৎ কথাটা মাঝপথে আঁটকে দিল আর্টিস্ট। ফের কানের কাছে মুখ নামিয়ে আলতো স্বরে বললেন,
- আমি নিশ্চিত করে কীভাবে বলছি এটা আমি জানি না। আপনি সময়ের ওপর ছেড়ে দিন। কিছু জিনিস মানুষ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখে। মন বলে একটা স্বতন্ত্র জগত থাকে। সেই জগতটা থেকে উত্তর আসে কখনো সখনো। মেয়েদের সহজাত ইন্দ্রিয় বেশ প্রখর, এটা তো জানা কথা। সেই অনুমান থেকে বলছি আপনি সুখী স্ত্রী হবেন। অবশ্য এটাকে অনেকে জহুরি চোখও বলে।
আর্টিস্টকে অমন কানে কানে কথা বলতে দেখে ভ্রুঁ কোঁচকালেন রেবেকা। কী ব্যাপার? ওর কানে অমন পুটুর পুটুর কীসের? কী বলছে ওই মেকআপ আর্টিস্ট? রেবেকা এক গর্জন দিয়ে ডেকে উঠবেন, ঠিক তখুনি উনার কাছে একটা কল আসে। নামটা দেখে কপালের কুঞ্চন সরল হয়ে যায়। হাসিমাখা সুরে সালাম দিতেই কানে চেপে ধরল কলটা। কয়েক মিনিট নিস্তব্ধ রইলেন। কোনো আওয়াজ করলেন না। মুখ থেকে ধীরে ধীরে হাসির প্রদীপটা নিভে গেল উনার। মুখ ঘুরিয়ে ডেস্কের দিকে সোজা আয়নার ভেতরে তাকালেন। বধূ সাজে তৈরি শাওলিন। আর্টিস্ট মেয়েটা ওর মুখ ঢেকে দিচ্ছে দোপাট্টা দিয়ে। মলিন মুখে হতবিহ্বল হয়ে গেছেন। কান থেকে ধীরে ধীরে ফোন নামিয়ে জোরালো কণ্ঠে ডাকলেন,
- শাওলিন,
মাথা পিছু ঘুরিয়ে চাইল শাওলিন। বাঁপাশ থেকে তিন বান্ধবিও চোখ তুলে তাকাল। রেবেকা শুধু শাওলিনের দৃষ্টি স্থির রেখে প্রচণ্ড নিরুত্তাপ স্বরে বললেন,
- চলো।
.
বিয়ের দিন বর নেই। বাড়িজুড়ে থমথমে আবহ। প্রত্যেকের চেহারা পাংশুটে। যেন মুখ থেকে সমস্ত ঔজ্জ্বল্য কেউ শুষে নিয়েছে। হইচই হট্টগোল সব যেন ঠাণ্ডা। পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে আছে প্রতিটি কোণ। একমাত্র বজ্রবৃষ্টির উন্মত্ত শোর কাঁপিয়ে তুলছে ঘরের অভ্যন্তর। এমন সময় ধূসর একটি গাড়ি বাড়ির ঠিক সিঁড়ি সংলগ্ন ধার ঘেঁষে থামল। সদর দরজাটা হাঁট করে খোলা। থমথমে ম্লান চেহারার মূর্তিগুলো সেদিকে তাকিয়ে বুঝল রেবেকা এসেছে। রেবেকার পিছু পিছু মেরুন পোশাকধারী, কালো জামা, সাদা পোশাকে তিন তরুণী প্রশ্নবিদ্ধ চেহারায় ঢুকল। সবশেষে মুখ আবৃত ফিনফিনে পাতলা দোপাট্টায় প্রবেশ করল বধূবেশী। ফাতিমা নাজ আর কোনোদিকে নয়, বরং সঙ্গে সঙ্গে রক্তবর্ণ শাড়ি পরিহিতার নজর নিবিষ্ট করলেন। তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অধরার দিকে চক্ষু ইশারা করলেন। যেন বোঝাতে চাইলেন, ‘ মেয়েটাকে আগলে নাও একটু। খবরটা ওকে স্থির রাখবে না!’ অধরা মাথা নাড়িয়ে দ্রুত বধূবেশীর পাশে ঠাঁই নিল। এরপরই প্রথম কোপ ফেললেন রেবেকা,
- তাহমিদ কোথায়?
কে একজন যেন উত্তরটা দিয়ে দিল,
- সবাই বলছে কালরাত থেকেই নাকি দেখেনি। হলুদ ছোঁয়ানোর পর ওকে কেউ দেখতে পায়নি। রাতে ওকে খেতে ডাকাও হয়নি। বারণ করা ছিল। রেবেকা হুংকার ছেড়ে বলে উঠেন,
- কীসের বারণ? বর যদি কালরাত থেকে ঘরেই না থাকে, তাহলে সে যাবে কোথায়? অফিস ছাড়া ওর অন্যদিকে নজর ছিল না, এসব আমি কী শুনছি জেঠিমা? জেঠা! আপনি বলুন, বিয়ের আসর থেকে কন্যা পালিয়ে গেলে দায়গ্রস্ত হতেন না, কিন্তু এখন যে বর নিখোঁজ হয়ে গেল এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?
আনোয়ার ভীষণ ভারসাম্য বজায় রেখে চর্তুপাশ সামলে চলেন। কিন্তু এখন রেবেকার সামনে নিজের নাক কাটা যাওয়ায় আর কিচ্ছু বলার সুযোগ পেলেন না। তবু স্ত্রী ও সবার দিকে নজর বুলিয়ে ভীষণ ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
- দেখো রেবা, পরিস্থিতি এখন খারাপ। এই খারাপ সময়ে কোনো কথাবার্তা বলাটা ঠিক মনে হচ্ছে না। তাহমিদ যে বাড়ি থেকেই গুম, এটা আমি নিজেই একটার সময় জানতে পারলাম। কাজেই বুঝতে পারছ যতটা ধাক্কায় তুমি আছ, তার চেয়ে বেশি ধাক্কায় আমরা আছি।
- আপনারা ওর অফিসে জানাননি? উনাদের বললেনি তাদের একজন কর্মকর্তা গায়েব? আজ ওর বিয়ে, আর সেই ব্যক্তি কিনা বিয়ের একদিন আগেই নিখোঁজ?
- রেবা, তুমি কি দিকটা ইঙ্গিত করে বলছ, এটা বুঝতে পারছি। ভয়টা আমাদেরও হচ্ছে। কিন্তু এখন তুমি জানো এই বিয়ে হবার চাইতে তাহমিদের খোঁজ পাওয়াটা ভীষণ জরুরি। আমি চাইব তুমি তোমার ননদ নিয়ে ফিরে যাও। এই বাড়িতে থাকলে তোমারই ভীষণ অস্বস্তি হবে। তোমার জেঠিমার দিকে তাকাও। ভেঙে পড়েছে!
মুখের ওপর নিজের জেঠা ফিরে যেতে বলল। তাও এমন একটা ঘটনায় যেখানে ওর ভূমিকাই আজ সর্বাধিক মূখ্য! কোথায় জেঠা বলবে আজ এদিকে থাকো, তাহমিদকে আমার কয়েক ঘণ্টার ভেতরে হাজির করব, এই বিয়েটা হবেই হবে! অথচ সেখানে উচ্চারণ করছেন ‘ফিরে যাও?’। রেবেকা স্তব্ধমূর্তি হয়ে কিয়ৎক্ষণ নীরব রইলেন। গলায় ঢোক গেলার দৃশ্যটা ফুটে উঠল। তিনি জেঠার দিক থেকে চোখ সরিয়ে ঘরে উপস্থিত বাকি মেহমানদের দিকে দৃষ্টি ঘুরাতে লাগলেন। কানে কান ঠেকিয়ে কানাঘুসো, ফিসফিসে আলাপ, ঠেস মারা দৃষ্টিগুলো দেখতে পেলেন। সবশেষে জেঠার দিকেই নজর স্থির করে হিম গলায় বলে উঠলেন,
- আপনি কী জানেন বিয়ের দিনে একটা মেয়ের বিয়ে ভাঙা কেমন অপমান? কত বড়ো একটা অভিশাপ? আপনি শুধু তাহমিদের কথাই ভেবে দেখলেন, অথচ এই মেয়ের দায়িত্বের জায়গাটা ভেবেই দেখলেন না! আমরা তো একটা সোসাইটিতে বাস করি জেঠা, সেখানে নিত্যপ্রহর যে কানাকানিটা চলবে, সেটা কী একঝলক আপনার আশপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারছেন না?
ভ্রুঁ দুটো একত্র করে কপাল কোঁচকান আনোয়ার। তিনি এই মুহুর্তে একমাত্র শুধু পুত্রের চিন্তা করছেন। হ্যাঁ, পুত্র ছাড়া বাকিসব বকওয়াজ ঠেকছে উনার কাছে! তিনি কপাল কুঁচকে রেখেই প্রশ্নটা শুধিয়ে উঠলেন,
- তুমি কী বলতে চাইছ রেবা? তুমি কী এখন ভাইয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে ননদের চিন্তায় আছ? এ কেমন দুর্ব্যবহার তোমার? এগুলোই এতোবছর ধরে তোমাকে আমরা শিখিয়েছি, বুঝিয়েছি? ছেলেটা যে নেই, কোথায় গেছে কেউ জানে না, ওর অফিস থেকে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে; আর তুমি বলছ তোমার সোসাইটির মনগড়া চিন্তা?
এবার খুব নিষ্ঠুর দেখাল রেবেকাকে। নিজের মা মোর্শেদাকে অবাক করে দিয়েই ভয়ংকর কথাটা উচ্চারণ করে বললেন সে,
- জেঠা যদি মনে মনে ধরে নেন, তাহমিদ আর কখনোই ফিরবে না তখনো কী কথাটা এভাবেই বলবেন? একমাত্র আপনার অনুরোধে এই মেয়ের সমস্ত বিয়ের সম্বন্ধ আমি ফিরিয়ে দিয়েছি। কারণ, আপনি আমাকে অনুরোধ করে বলেছিলেন একটা মেয়ে চাই, শুধু একটা মেয়ে! তাহমিদ ভীষণ পছন্দ করে শাওলিনকে, তাই তিনি বিয়েটা এই পক্ষেই সারতে চান। আমি দ্বিমত করিনি আপনি জানেন। এখন যদি বলেন ফিরে যাও, এটা কেমন শোনায় আপনি বলেন? কেমন শোনায়? আমার হাতে কী সুপাত্র আর কয়টা ছিল না?
এবার জেঠি তাহমিনা ভূমিকা অবতীর্ণ করলেন। এতোক্ষণ চোখমুখ একাকার করে অশ্রু ঝরাচ্ছিলেন ঠিকই, কিন্তু দুকানে শ্রবণ করছিলেন রেবেকার জিভের ধার। এবার নিজেই একহাতে নিলেন রেবেকার জবান। উগ্রস্বরে উন্মাদিনীর মতো চ্যাঁচিয়ে উঠলেন,
- আমার বাচ্চার যদি কিছু হয়, তোমার ননদের গোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়ব! আমার ছেলেটাকে খেয়েছে এই খা- মা*! নইলে আমার ছেলেটা অতো সুপাত্রী থাকতে এই জোঁকের দিকেই মুখ ঘুরালো? আর মেয়ে ছিল না? ফক্কিনির বাচ্চা আর কিছু পাক বা না পাক, পুরুষ বশ করা রূপটা ঠিকই পেয়েছে। মধু মধু কথা আর চুপ থেকে পুরুষ আকর্ষণ করাটা ঠিকই শিখেছে! বস্তি কোথাকার বস্তি!
মুখের ভাষা এমন নির্মম হতে পারে কারোর? কোনো নারীর মুখ থেকে? এ যেন নিজ জাতির আরেক নারীকে কলুষিত ভাষায় দগ্ধ-বিদগ্ধ করা! নির্মম নিষ্ঠুরতায় সকলের সামনে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া। শাওলিন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল। ঘোমটার আব্রুটা থাকলেও ওর চাহনি ওই ফিনফিনে লাল দোপাট্টা ভেদ করে স্থির হয়ে আছে। ওর ওই অবস্থায় অধরা ওকে সাবধানে জাপটে ধরে। কিন্তু শাওলিনের ভেতর কান্নার মতো কোনো বিস্ফোরণ দেখা গেল না। বরং পাথর। ও যেন সাক্ষাৎ পাথর। শ্রেষ্ঠা এবার চুপ থাকতে পারেনি। চুপ থাকেনি সোহানাও। চিৎকার করে দুই বান্ধবি ধেয়ে আসে তাহমিনার সামনে। এক রণচণ্ডী হুংকার দিয়ে আঙুল তুলে দেয় শ্রেষ্ঠা, চোখ রাগারুণ, ঠোঁটদুটো কাঁপছে। রাগে ওর ফরসা চেহারা লালবর্ণ দেখাচ্ছে। আঙুল উঁচিয়ে উত্তপ্ত গলায় বলল,
- জায়গা মতো বুঝিয়ে দিব আন্টি! মুখ সামলান! আমার সামনে ওকে অপমান আপনার গোষ্ঠিই আমি ছাড়ব না। বলে দিলাম স্পষ্ট করে!
শ্রেষ্ঠা রণমূর্তি দেখে থমকে গিয়েছিলেন রেবেকা। ভাবতেও পারেনি শাওলিনকে আড়াল করে এমন দেয়ালও তৈরি আছে। এক নারী যখন আরেক অল্পবয়সি নারীকে মা-বাবা তুলে গালিগালাজ করছে, তখন যেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছেড়ে দিল আরেক প্রাপ্তমনষ্ক বুদ্ধিদীপ্ত নারী। শ্রেষ্ঠা তখনো উঁচানো। আঙুলটা কাঁপছে। রাগে কতটা বিধ্বংসী দেখাচ্ছে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দূর থেকে এই দূশ্য দেখে স্থির হয়ে গেছে রাফান। সদর দরজা দিয়ে সবে ঢুকছিল নামাজ শেষ করে। সে ও পার্থ সবার আগে মসজিদে গিয়েছিল, তাই ঘটনার পেছনদিক কিছুই জানেনি। রাফান আশ্চর্য হলেও কণ্ঠ আজ পুরোপুরি শান্ত রেখে বলল,
- শ্রেষ্ঠা, আঙুল নামাও। শান্ত করো এখুনি। ওভাবে রাগারাগি করে কিছু হবে না। তোমার বান্ধবিকে সাহায্য করো।
রাফান আজ এই প্রথম ‘আপনি, মিস, রগচটা’ বিশেষণগুলো ব্যবহার করল না। পুরোপুরি অন্য ভূমিকায় শ্রেষ্ঠাকে তুমি সম্বোধন করল। শ্রেষ্ঠাও যেন ক্ষণিকের জন্য দরজায় তাকিয়েছিল, পরক্ষণে দীর্ঘকায় পুরুষটিকে দেখে সামলে গেল। আঙুলটা নামিয়ে নিল আচমকা। দৃশ্যটা দেখে একমাত্র বিহ্বল হলো রোজা। এই শ্রেষ্ঠাটা কে? এ কোন শ্রেষ্ঠা? কার কথায় আঙুল নামাচ্ছে? নিজেকে পিছিয়ে নিচ্ছে? শ্রেষ্ঠা তখন উপযুক্ত নীরবতায় শাওলিনের কাছে ফিরে এল। সোহানা কিছু খারাপ কথা বলতে চাচ্ছিল, কিন্তু এই পাষণ্ড ফালতু মহিলার সাথে মুখে মুখে তর্ক করতেও প্রচণ্ড ঘেন্না হচ্ছিল। রেবেকা যখন অপমানে নীল হয়ে গেছে, যখন পরিবেশ ও পরিস্থিতি তাকেই উলটো বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে, তখনি বাইরে সগর্জনে গমগম করে একটি আওয়াজ হলো। যান্ত্রিক স্বরে প্রত্যেকেই আগ্রহবোধ করল। তাহমিদ এসেছে! এমন ভাবনায় যখন তাহমিনা মাথা তুলে হইহই করে উঠলেন, ঠিক তখুনি একটি অভিজাত দর্শন কালো গাড়ির দরজা খুলে বেরোল কেউ। মানুষটা আর কেউ নয়, স্বয়ং শোয়েব ফারশাদ। ধুলোমাখা দেহ। ক্লান্ত চাহনি। ঠোঁটের ডানকোণ কাঁটা, রক্ত গড়িয়ে থুতনি বরাবর লম্বাটে দাগ ছেড়েছে। সাদা শার্ট তার স্বকীয় বর্ণ হারিয়েছে। তার ডানবাহুর বাইসেপ্স রক্তাক্ত। শার্ট চিড়ে রক্তাক্ত মাংসটা ফুটে উঠেছে। বাঁহাতে হ্যাঙারের মতো ঝুলছে পরনের কালো স্যূটটি। ক্লান্ত পায়ে তবু দীপ্ত ভঙ্গিতে বাড়িতে প্রবেশ করল মানুষটি। তাকে দেখে ফাতিমা আর বসে থাকতে পারলেন না, ‘ফারশাদ! কী হয়েছে তোমার? কাঁটাছেঁড়া অবস্থা কেন দাদু? ও দাদু কোথায় গিয়েছিলে তুমি?’। দাদুর কাতরস্বরকে উপেক্ষা করেনি শোয়েব। বৃদ্ধার মাথায় হাত বুলিয়ে ভরাট কণ্ঠটায় বলে উঠল,
- ঠিক আছি। টেনশন করবে না। রাস্তায় একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। কিন্তু এখানে . .
কথাটা শেষ করে না শোয়েব। দ্রুত নীল চোখদুটো রাফানের দিকে ঘুরে। আজ স্যারের চোখে চশমা নেই। নিশ্চয়ই চশমাটা খোয়া গেছে। অমন নীল তীক্ষ্ম চাহনিকে উপেক্ষা করবার সাহস রাফানের নেই। কথা সমীহ করে শান্তসুরে বলল,
- স্যার, আপনার ছোটো ভাইকে পাওয়া যাচ্ছে না। কালরাত থেকে সম্ভবত নিখোঁজ। বাড়ির বাইরে যে সিসিটিভি ফুটেজ আছে, সেখানে কালরাতে তাহমিদ স্যারকে বেরোতে দেখা গেছিল।
- কোথায় বেরিয়েছে?
- জানা নেই স্যার। সম্পূর্ণ নন ট্রেসেব্যাল। এই মুহুর্তে পুলিশ আর স্যারের ডিপার্টমেন্টে খবর দেয়া হয়েছে।
তথ্যটা জানার পর এবার শাওলিনের দিকে তাকাল। বুঝতে বাকি রইল না কী অনর্থটা এখানে ঘটেছে। নিজের ফুপু, ফুপা, রেবেকার দিকে নজর বুলিয়ে ফাতিমার দিকে আস্তে করে শুধাল,
- তুমি বলো, কী হয়েছে এখানে? কণে এখানে কেন?
ইচ্ছাকৃত শাওলিনের নামটা উচ্চারণ করল না। বুঝতে দিতে চাইল না এই নামের ওপর তার কেমন কণ্ঠস্বর ফুটে। ফাতিমা রেবেকার দিকে দৃকপাত করে অবশেষে শোয়েবের কাছে সংক্ষিপ্তে জানান। ঠিক এ সময় রেবেকার অপমানিত মূর্তির দিকে চেয়ে শোয়েব গাঢ় গলায় বজ্রস্বরে বলে উঠে,
- রেবা, পাঁচ মিনিট দাদীর সঙ্গে কথা বলবে। দাদী যা বলবেন কোনো তর্ক না করে শুনবে। তোমাকে আরো পাঁচ মিনিট দেয়া হবে। এরপর যা বলবে তা-ই সিদ্ধান্ত। আমি আসি।
শেষবাক্যে ইস্তফা বুঝিয়ে জায়গাটা ছাড়ল শোয়েব। রেবেকাকে পালটা উত্তরে কিছু বলবারই সুযোগ দিল না। ঘরে উপস্থিত মানুষগুলোর ভেতর আবারও গুনগুন গুঞ্জনের সাড়া ফিরে এল। শোয়েব কোনোদিকে না তাকিয়ে হাতে স্যূট ঝুলিয়ে সিঁড়িপথে গেল। এদিকে কথা মোতাবেক ফাতিমা রেবেকাকে নিয়ে একটি আলাদা ঘরে এলেন। দরজাটা ভেতর থেকে আঁটকে স্বাভাবিক স্বরে বললেন,
- তোমাকে একটা সুযোগ দিতে চাইছি। আশা করছি, এই সুযোগটা তোমার সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হবে। তোমার ননদের প্রস্তাব আমি ফারশাদের জন্যে দিয়েছিলাম। তুমি ওকে কী কারণে ফিরিয়েছ, আমি তা আজও জানি না। ভাগ্য আরো একবার সেই একই পাত্রীর জন্যে প্রস্তাব রাখতে দিচ্ছে। অতএব, মির্জা বাড়ির শেষ উত্তরাধিকার, শোয়েব ফারশাদ মির্জার জন্যে তোমার ননদ শেহজানা আলমকে দিবে? আমার নাতী ওকে কক্ষণো দুঃখী রাখবে না, এটুকুর আশ্বাস তোমাকে আমি দিচ্ছি!
নোটবার্তা — ভাগ্য বনাম লীলাখেলায় স্বাগতম। এরপর শুরু হচ্ছে এস এফ এম সিণ্ড্রোম! কেমন লাগল আজকের পর্ব? জানাবেন ঝটপট! দেরির জন্য গোস্তাকি মাফ! ❤
FABIYAH_MOMO .
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৭
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৪
-
বজ্রমেঘ গল্পের লিংক
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১১
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৮
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৬
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১০
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২০