Golpo থ্রিলার গল্প বজ্রমেঘ

বজ্রমেঘ পর্ব ২৪


বজ্রমেঘ . ❤

পর্বসংখ্যা_২৪ .

ফাবিয়াহ্_মমো .

লোকটার একেকটি বাক্যশূলে বিদ্ধ হয় শাওলিন। আশ্চর্য হয়ে ভাষা হারায় কিছুক্ষণ। বিমূঢ় ভাবে ভাবে, কতটা ভয়ংকর জেদ পোষণ করে এই ব্যক্তি? কতটা হিংস্রাত্মক জেদি তার মন? এখনো তো স্পষ্ট কিছু বুঝে উঠতে পারেনি ও। আঁচ করতে পারছে না সম্পর্কের ঘণত্ব, দৌরাত্ম। পাতলা নরম ঠোঁটদুটিতে অবাক নিস্তব্ধতা ছুঁয়ে যায়। এমন সময় লক্ষ করল, ওই মানুষটি ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত। কানে যে একটা কালো ছোট্ট বস্তু গোঁজা ছিল, তা এতোক্ষণ খেয়ালই করেনি শাওলিন। চুপ করে জানালামুখো দৃষ্টি রেখে শুনল,

  • এখনি আসতে হবে? কেন?

এরপর কয়েক সেকেণ্ডের বিরতি পড়ল। আড়চোখে একবার ডানে তাকাতে চাইল শাওলিন। দেখতে চাইল লোকটার মুখ, তার চোখ, তার বতর্মান অভিব্যক্তি। কিন্তু কেন জানি মন বড্ড সংকোচ অনুভব করছে। ফের নিজের কানদুটোতে লোকটার ভরাট স্বতন্ত্র স্বরটা শুনতে পাচ্ছে,

  • ব্যস্ত। হ্যাঁ, এই মুহুর্তে ড্রাইভে আছি। শুনতে পাচ্ছি, বলতে পারো। ওহ। কিন্তু ব্যাপারটা আজই কেন? মনে হচ্ছে তোমার খুব তাড়াহুড়ো? সমস্যা কোথাও?

কথাগুলো বলার মাঝে ভয়ংকর একটা কঠোর ছাপ ফুটে উঠল। যেন উক্ত ব্যক্তির কথাবার্তা পছন্দ হচ্ছে না একবর্ণ। সহ্য হচ্ছে না এক ছটাক। দুটো নীল চক্ষু হিম স্থিরতায় নিশ্চল, ড্রাইভ করছে কেমন ক্ষুরধার নার্ভটা সচল রেখে। চোখের ডানকোণ দিয়ে এটুকু দৃশ্য দেখতে পেল শাওলিন। হঠাৎ ওর বুকের ভেতরটা কেমন ঝপ করে খামচে উঠল। প্রবল অস্থিরতায় ধড়ফড় করে উঠল খাঁচাবন্দি যন্ত্রটা। এ কেমন চাহনি? এ কেমন রাগের ছাপ? চেহারায় এ কেমন আর্বিভাব? ওর আড় চাহনিটা লক্ষ করেই বোধহয় চকিতে নিজের অবয়ব সহজ করেছে ফারশাদ। ভোজবাজির মতো পালটে ফেলেছে মুখ, খসিয়ে ফেলেছে একটু আগের বিপজ্জনক মূর্তি। চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে নিরুদ্বেগ সুরে বলল,

  • যদি বিশেষ দরকার বলো, আমি চেষ্টা করে দেখব। কিন্তু কথা দেয়ার ব্যাপারে ওয়াদা করব না। পারডন মি। তোমায় স্নেহ করি, এটা জানো। কিন্তু আমার পক্ষে যতটা সম্ভব, আমি চেষ্টা করব। এবার কল ড্রপ করতে হবে, জুনিয়র। এনজেঙ্গড ইন এ প্রায়োরিটি টাষ্ক।

এটুকু বলতেই কান থেকে একটানে খুলে নেয় ইয়ারপিস। গাড়ির সামনের দিকে ড্যাশবোর্ডের এককোণে ছুঁড়ে মারে বস্তুটা। যেন চাপা কোনো ক্রোধ, ক্ষোভ ওই বস্তুটার উপর পরোক্ষভাবে নিক্ষেপ হল। ব্যাপারটা নীরবে দেখা সত্ত্বেও পালটা প্রশ্ন, বাড়তি প্রসঙ্গ কিছুই তুলল না শাওলিন। বলা বাহুল্য, একটা অদ্ভুত ধরণের চোরা কাঁটা ওর মন চরাচরে খচখচ করে বিঁধে চলেছে। কার সঙ্গে রাগটা চলল? আর রাগই বা কেন? রাফান ছিল মানুষটা? খানিকক্ষণ পর নিম্ন ভাইব্রেশনে ওর হাতের বস্তুটা আচানক কাঁপতে লাগল। চট করে কলার নেম দেখে ফোনটা কানে চাপলো শাওলিন। ভীষণ বিনয়ী সুরে শান্ত গলায় বলল,

  • জ্বী, ওয়াআলাইকুমসসালাম মণি। আমি? আমি এখন—

ওপাশ থেকে রেবেকার কল। খুব সাবধানে কথা চালাচ্ছে ও। ভুলেও বুঝতে দেয়া যাবে না ও কোথায়। এই মুহুর্তের খবরটা জানানো মানেই জেরার মুখে পড়া! এদিকে চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছে শোয়েব। ডানহাত স্টিয়ারিংয়ে সচল, খেলনার মতো চালনা করছে বস্তুটা। কান সজাগ, অথচ চোখ ঘুরপাক খাচ্ছে পাশে বসা মেয়েটির ওপর। একবার আড়নজরে দেখল, ওর ডান পায়ের সর্বকনিষ্ঠ আঙুল। হিল জুতোর পিষ্টনে শেষের আঙুলটা ফোস্কা পড়ে রক্তবর্ণ। একটুখানি পাতলা চামড়া উঠে আছে জায়গাটাতে। ব্যাপারটা ভালো লাগল না। মাথাটা পাঁচ সেকেণ্ডের জন্য পিছু ঘুরায় শোয়েব, ব্যাকসিটের একটা জায়গা থেকে হাত বাড়িয়ে চারকোণা একটা বাক্স তুলে নেয়। এদিকে শাওলিন রেবেকার সঙ্গে কথা বললেও মনোযোগ ওর এমুখো ফিরেছে। এই মুহুর্তে ভয়ংকর একটা রাস্তায় গাড়ি চলছে, সামনে ট্রাক, বাস, মাইক্রো, অথচ লোকটার ভেতর কোনো বিকার নেই। সে পেছনের সিট থেকে বাক্স বের করল, যার ঢাকনার ওপর লালরঙে আঁকা যোগ চিহ্ন। বুঝতে একটুও দেরি হল না এটা চিকিৎসা বাক্স। শাওলিন ঢোক গিলে সমুখের রাস্তার দিকে তাকাল, পরক্ষণে ভীত চাহনি ছুঁড়ে পাশের লোকটার দিকে চাইল। রেবেকা সেসময় ওপাশ থেকে বলে যাচ্ছে,

  • শাওলিন, যেহেতু মঞ্চ থেকে নেমে গেছ, তাহলে এক কাজ করো। সরাসরি ধানমণ্ডিতে চলে আসো। এখানে এসে দেখা করো। কষ্ট করে কলাবাগানের দিকে যেতে হবে না। আমি এখন জেঠিমাদের এখানে আছি। তুমি বাস থেকে ধানমণ্ডিতে নেমে যেয়ো।

অন্যমনষ্ক শাওলিন কথাগুলো খেয়ালই করল না। ওর চোখ ও মন শোয়েবের কর্মকাণ্ডের দিকে। কী করছে এই লোক? বাক্সটা কোলের ওপর রেখে কী করতে মগ্ন? প্রশ্ন দুটো মাথায় ঝাপটা দিতেই সেকেণ্ডের ভগ্নাংশে চোখ বিস্ফোরিত করে ফেলল। ইয়া আল্লাহ, সর্বনাশ! একহাতে ড্রাইভিং সামলে অন্যহাতে স্যাভলন, তুলো, ব্যাণ্ডেজ নিয়ে তৈরি। শাওলিন কিছু বলতে যাবে, তার আগেই নিজের পা-টা মেঝেতে নেই! শূন্যে কিছুটা তুলে ধরেছে সে, তার বাঁহাতের তালুতে স্থান পেয়েছে। গাড়ি তখনো ড্রাইভ-রত। এদিকে রেবেকা কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে চ্যাঁচাচ্ছে রীতিমতো, ওপাশ থেকে উচুঁ গলায় ধমকে উঠতেই শাওলিন সংবিৎ ফেরার মতো চমকে উঠল। মৃদু কেঁপে উঠতেই তৎক্ষণাৎ উত্তর দিয়ে বলল,

  • নেটওয়ার্ক ইস্যু . . বলুন!

ভারী শব্দে দম ফেলল রেবেকা। কিছুটা দৃঢ়কণ্ঠে বলল,

  • তুমি কী শুনেছ আমি এতোক্ষণ কী বলেছি? হ্যালো? শাওলিন? তোমার মনোযোগ মনে হচ্ছে অন্যদিকে? তুমি কী আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? হ্যালো!

ভোঁতা মুখে কিছু বলতে চাইল শাওলিন। কিন্তু তখনো বিস্ফোরিত নয়নে প্রশ্নাতুর মুখে লোকটার অবস্থা দেখছে। সেভাবেই বেখেয়াল যুক্ত কণ্ঠে উত্তর দিয়ে চলল,

  • শুনতে পাচ্ছি। স্পষ্ট। প্রথমে ধানমণ্ডি নামতে হবে। এরপর রিকশা নিয়ে বাসার…

কথাগুলো বলে চলছিল শাওলিন। ঠোঁটদুটো নড়ছিল স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতোই। অথচ পূর্ণদৃষ্টি শোয়েবের কীর্তিকলাপের ওপর। চোখে বিস্ময়ের আধিক্য নিয়ে ঢোক গিলতে গিলতে দেখল, অমন ভয়ংকর ভাবে ড্রাইভ করা অবস্থায় তুলোর প্যাকেট থেকে তুলো ছিঁড়ল, স্যাভলনে ভেজালো, কাঁচের বোতলটা মুখ ছিপিবন্ধ করে ঠিকঠাক রেখেও দিল। এরপর আবার স্টিয়ারিংয়ে মনোযোগ। ডানদিকের একটা গতিময় ট্রাককে নির্বিঘ্নে যেতেও দিল। এরপর দৃষ্টি ঘুরল আহত আঙুলটার ওপর। নিজের বিরাট থাবার ওপর ধরে আছে বেচারীর পায়ের আঙুল। সর্বকনিষ্ঠ আঙুলটা মূল মনোযোগ আকৃষ্ট করায়, তুলোয় ভেজানো স্যাভলনে ভিজে যাবে ওটা। জায়গাটা আগুনের মতো জ্বলছে শাওলিনের, ঠোঁট খিঁচে ব্যাথাতুর কুঞ্চন পড়ছে, পা-টা চট করে সরিয়ে নিতেও যাচ্ছিল; কিন্তু পারেনি। বলা বাহুল্য, গাড়িটা তখন সিগন্যালের জ্যামে আঁটক গেল। ব্যাপারটা দেখে এমনভাবে শ্বাস ফেলল শাওলিন, যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে গেল। দুচোখ ক্লান্তভঙ্গিতে বুজে নিরুত্তাপ স্বরে বলল,

  • আপনার কর্মকাণ্ড আমার কাছে পরিষ্কার হচ্ছে না।

কথাটার বৈপরীত্যে কোনো কথা এল না। মাথা কিঞ্চিত নত করে চুপচাপ কাজ করছে শোয়েব। স্যাভলনে ভেজা তুলো ওই আঙুলটায় বুলিয়ে চলেছে ক্রমাগত। বুঝতে পারছে হাতে আছে আর মাত্র কমিনিট। সিগন্যাল ছেড়ে দিবে। দাঁত দিয়ে ওয়ান টাইম ব্যাণ্ডেজের প্যাকেটটা ছিঁড়ে সেটা ওই ছোট্ট আঙুলে মুড়িয়ে দিল। পা-টা যেটুকু উঁচুতে ধরে কাজ করছিল, তা আবার সেই জুতোজোড়ার ওপর নামিয়ে দিল সে। নিজের হাতদুটোকে লিক্যুইড স্যানিটাইজারে ক্লিন করে নিজের ড্রাইভিং ইন্সট্রিক্টে ফিরে আসে শোয়েব। পুরোটা ঘটনা স্তব্ধ বিমূঢ় চোখে দেখার পর নিজের পায়ের দিকে নজর বুলায় শাওলিন। রেবেকার একনাগাড়ে বলার পরিণামে হুঁ হ্যাঁ উত্তর দিয়ে কলটা কেটে দিয়েছে বহুক্ষণ। এই স্বল্প মুহুর্তের ভেতর যে ভয়ংকর কাজটা ঘটল, তা দেখে নিশ্চুপ ঠোঁটে নিঃসাড় রইল শাওলিন। শুধু অনুভব করল, ওর পায়ে নিঃসংকোচে কাউকে হাত রাখতে দেয়নি। কেউ বিনা অনুমতিতে হুট করে স্পর্শ রাখবে, সেটাও কল্পনার বহু উর্ধ্বে। অথচ এই একটা মানুষ, শুধু এই মানুষটাই ওর নিকটে আসার গোপন সম্মতিটুকু পায়। তাহমিদ বা অন্য কেউ যখন স্পর্শ করতে চায়, তাতে বীভৎস অনুভূতিতে ঘুলিয়ে উঠে মন। সমস্ত ইন্দ্রিয় প্রতিবাদের হিংস্রতায় দূর দূর জানায়। চকিতে দ্রুত ছিঁটকে যেতে চায়। কিন্তু এই ব্যক্তির বেলায় সমীকরণ ভিন্ন কেন? কেন ব্যতিক্রম?

মুখ তুলে ডানদিকে তাকায় ওর প্রশ্নমাখা চোখ। সেই চোখের চাহনিতে একবার নজর মেলায় নীল নয়ন। যেন চোখে চোখে বলতে চায় অব্যক্ত কিছু,

  • তুমি কী বোঝ, তোমার মন যতটা তোমার দখলে, তার চেয়ে বেশি অন্যের দাসত্ব? আমি বেপরোয়া দস্যু। আমি দুর্বৃত্তের মতো তোমাকে দখল চাইলাম, তোমার কোমল পায়ে হাত রাখলাম, তুলে নিলাম আমার এই থাবার মতো পৌরুষ হাতে, আর তুমি চেয়ে চেয়ে দেখলে কীভাবে এই বেপরোয়া দস্যু তোমায় চুরি করে নিচ্ছে। এই অবাধ্য লোকটাকে তুমি চুপচাপ প্রশ্রয় দিলে। বিনা প্রতিবাদে ছেড়েও দিলে। এর পরিণাম এখনো জানো না?

কথাগুলো চোখে চোখে বিচ্ছুরিত হয়, কিন্তু ঠোঁটে ঠোঁটে আর ফোটে না। শোয়েব আপন কর্মে প্রবৃত্ত হল। আর চোখ ফিরিয়ে তাকাল না। নিজের দোনোমনা চিত্ত, সংশয়ী মন, অস্থির অন্তরটাকে ঠিক চিনতে পারল না শাওলিন। বুঝতে পারল না, কেন এই নীরব সম্মতি, ছাড় দেয়ার প্রবৃত্তি, প্রশ্রয় দেবার ইচ্ছেটুকুর জন্ম? কেন তার হাতে নির্ভয়ী থাকে এই মন? নিজের এইটুকু জীবনে বুঝতে পারল না, আজকের এই ভয়ংকর অনুভূতিটার নাম কি। কারণ কি। উত্তর কি। কিচ্ছু জানা নেই ওর।

.

গাড়িটা যখন ধানমণ্ডির পথে থামল, তখন কিছুটা আশ্চর্য হয় শাওলিন। কপাল কুঁচকে সঙ্গে সঙ্গে ডানে তাকালে, সেসময় চালকরূপী শোয়েব উত্তরটা দিয়ে দেয়,

  • কলে বলেছ প্রথমে ধানমণ্ডি নামতে হবে। এরপর রিকশায়। এরপর বাড়ির গেটে।

কপালকে সেভাবেই কুঁচকে রেখে উত্তরটা দেয় শাওলিন। কিছুটা রাগত গলায় বলে উঠল,

  • অন্যের কথাবার্তা এভাবেই কান পেতে শোনেন আপনি? আর সেগুলো মুখস্তের মতো ঠোঁটস্থ রেখে দেন?

দুটো কড়া প্রশ্নের কাছে এই প্রথম এক টুকরো হাসল শোয়েব। চশমার দরুন ওই সুপুরুষ চেহারায় মার্জিত ছাপ পড়ল একটা। হাসিটা হালকা রেখে নিজের বজ্রভরাট স্বরটায় বলে উঠল সে,

  • দরকার না পড়লে শুনি না। কিন্তু দরকার দেখলে ছাড়িও না। আজ দরকার ছিল। ধানমণ্ডিতে কার বাড়ি? প্রশ্নটার উত্তর পেতে পারি কী, ইয়ং লেডি?

একটা শৌখিন সম্বোধনে প্রশ্নটা ছুঁড়ল ওই মানুষ। ঠোঁটের হাসিটা আর নেই। চোখদুটোতে অদ্ভুত স্থির ছাপ, চোখের মণি কেমন ভীতিকর ভাবে নিষ্পলক। বাঁহাত পাশের ডোরটার ওপর রেখে উত্তরটা দিল শাওলিন,

  • আত্মীয়ের বাড়ি।
  • কেমন আত্মীয়?

প্রশ্নটা করার বেলায় শোয়েবের একচোখ একটু খাটো হল। ডান ভ্রুঁয়ের সেই পুরোনো কাঁটা দাগটা কিঞ্চিত প্রশ্নাতুর দেখাল। ব্যাপারটায় কেমন অস্বস্তিবোধ করল শাওলিন। তবু মনকে নিস্পৃহ রেখে স্বাভাবিক স্বরে বলল,

  • আমার ভাবীর জেঠ—

ঠিক এমন সময় ভুম ভুম যান্ত্রিক কম্পনে মনোযোগ বিঘ্ন হলো। চোখ ঘুরিয়ে নিজের রাইট পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফেলেছে শোয়েব। ফোনটা বের করে কলার নেম দেখবে, ঠিক তখনি দরজা খোলার আওয়াজে চোখ বাঁয়ে ঘুরল। দেখতে পেল, শাওলিন নিজেও কানে ফোন ঠেকিয়ে কথা বলছে। কথা বলতে বলতেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে, ইশারায় ছোট্ট বিদায় জানিয়ে, একটা রিকশা থামিয়ে ফেলেছে। এদিকে নিজের সজাগ ফোনটার দিকে চোখ নিবদ্ধ করল শোয়েব। কলার ব্যক্তিটির দিকে এই প্রথম খেপাটে খুনির মতো চাহনি ছুঁড়ল। কলদাতা আর কেউ নয়, রাফান সিদ্দিকী। বিড়বিড় করে বলে উঠল শোয়েব,

  • অসময়ে কলটা দিয়েছ, রাফান! তোমার কি অবস্থাটা আমি করব!

.

রিকশার হুড তোলা। আকাশ ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন। মেঘে ঢাকা আকাশ বলে আজকের আবহাওয়াটায় বিকেল বলে কিছু নেই। যেটুকু আলো দিনের খাতা থেকে তল্পিতল্পা গুটাচ্ছে, তা এখন সন্ধ্যে নামার অধ্যায়ে। জায়গাটা ধানমণ্ডির আবাসিক এলাকা। দুধারে উঁচু ভবন বেশ আভিজাত্যের সঙ্গে দাঁড়ানো। পথচারী স্বল্প। ভেজা মসৃণ রাস্তাটা দিয়ে আপন গতিতে এগিয়ে চলছে রিকশা। কান থেকে ফোন সবেমাত্র নামায় শাওলিন। এতোক্ষণ শ্রেষ্ঠার প্রশ্নবাণে তটস্থভাবে উত্তর দিচ্ছিল। রাগে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কণ্ঠটা তুঙ্গে তুলেছিল শ্রেষ্ঠা,

  • তুই না বলে কোথায় গিয়েছিস? জানা, আমি এটা একদম সহ্য করব না! তুই আমার স্পেশাল একটা সফট কর্ণারে আছিস বলে তোকে আমি বারবার এরকম উদ্ভট কাজে ছাড় দিব, নেভার এভার। তুই আজকে যেটা করলি, আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না! হুট করে মাইক ফেলে দৌড়? কেন? কী প্রয়োজন তোর? অতো বেশি দরকার হলে কেন একটাবার কল দিলি না? কেন বললি না, শ্রেষ্ঠা আমার অমুক প্রবলে—

কথাটা ভয়ংকর ভাবে আঁটকে দেয় ও। রাগান্বিত শ্রেষ্ঠাকে নিজের সবটুকু দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,

  • প্রবলেম বলে আসে? তুমিই বলো, প্রবলেম কখনো জানিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে সমাবর্তন ঘটায়? বিশ্বাস করো, আর্জেন্ট কাজ ছিল শ্রেষ্ঠা, আমি ভীষণ দুঃখিত তোমাকে জানানোর সুযোগ পাইনি। কিন্তু আমি জানি, তুমি অন্যদের মতো আমাকে ভুল বুঝবে না। উদ্ভট কিছু ভেবে রাগ করবে না। মনে মনে এটুকু বুঝে নিবে, আমি নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আঁটকে গিয়েছি। যার দরুন, তোমার সঙ্গে স্টেজ শেয়ারের দায়িত্বটা দেখতে পারিনি। রাগ কোরো না। আমি স্বীকার করছি আমার ভুল হয়েছে। একটা কল তোমাকে দেয়ার দরকার ছিল। আমি এলোমেলো মাথায় মনেও রাখতে পারিনি।

দাঁত কিড়মিড় তখনো করছিল শ্রেষ্ঠা। বাঁহাতটা মুষ্টি পাকিয়ে আসছিল অমন কীর্তিটুকুতে। তবে আস্তে আস্তে মাথাটা শান্ত হল, যখন বুঝল শাওলিন মেকি ছুঁতোয় চলে যায়নি। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। দুবার গভীর শ্বাস ছেড়ে কিছুটা ধাতস্থ মেজাজে বলল,

  • জানা, রাগ আমার এজন্য না, তুই হুট করে চলে গেছিস। রাগ আমার এজন্যই, তুই আমাকে একটাবার ইনফর্ম করতে পারতিস। আমি তোর চিন্তায় প্রচণ্ড নার্ভাস হয়ে যাচ্ছিলাম। টেনশন করছিলাম রীতিমতো! বারবার ভাবছিলাম তুই হঠাৎ কোনো বিপদে পড়লি কিনা! এমনিই একটার পর একটা ঝামেলা তোর পেছনে লেগেই আছে। তার উপর যদি ক্যাম্পাস থেকে, ইভেন আমাদের এরিয়া থেকে কোনো বিপদ ঘটে, তখন সেটা উপেক্ষা করা যায় না। এখন বল, কোথায় আছিস? বাসায় ফিরছিস নাকি?

চোখদুটো নির্দিষ্ট একটি বাড়ির দিকে সজাগ। সামনেই গন্তব্য। কিছুক্ষণ কথা বলে কলটা কেটে দেয় শাওলিন। সমুখে চোখ তুলে দেখে সাত ফুট উঁচু ভারি গেট। লোহার গায়ে ফুলপাতার নকশা, দ্বারদুটো বন্ধ, গেটের ওপাশে মস্ত এক দালানকোঠা। হলদে সফেদ রঙে আভিজাত্যের শোভা প্রকাশ করছে। চোখ নামিয়ে গেটের বাঁদিকে চোখ পড়ল। আয়তাকার একটি নামফলকে জ্বলজ্বল করছে বাড়িটির নাম – “মর্তুজা মেনশন – Mortuza Mension ”.। ছোটো পকেট গেট ঠেলে ভেতরে পা বাড়ায়, পাশেই উর্দিধারী এক দারোয়ান অটল অবস্থায় ওকে দেখছে। চিনতে পারার দরুন সালাম দিয়ে ভেতরে যাবার সম্মতি দেয়। শাওলিন ততক্ষণে সদর দরজায় কলিংবেল বাজিয়েছে। পাখির কৃত্রিম স্বরে যখন আশপাশটা মুখর, তখন বাড়ির একদিকে হঠাৎ ওর নজরবিদ্ধ হল। বাড়ির বাঁদিকে গাড়ি রাখার বিরাট ছাউনি। সেই ছাউনি তলায় অনেকগুলো সার বেঁধে গাড়ি। ব্যাপার কী? অতো গাড়িবহর কেন? বাড়িভর্তি কী আত্মীয়-স্বজন আসলো? একমনে ভাবতে থাকলে হঠাৎ দরজাটা খুলল ভৃত্যশ্রেণীর মহিলা। মাথায় ঘোমটা টেনে পান খাওয়া লাল ঠোঁটে হাসি দিয়ে বলল,

  • ও আম্মা আইছ? অফেক্ষায় আছিলাম যে! আইয়ো আম্মা।

ঘটনার সারবস্তু সুলক্ষণ যুক্ত না। তবু কিছু না বলে ভেতরে প্রবেশ করল শাওলিন। বাতাসে রান্নার সুগন্ধি, সরব হট্টগোল ভেসে আসছে উপরতলা থেকে। কপাল কুঁচকে পাশে পাশে আসা ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করল ও,

  • বাড়িতে কিছু হচ্ছে কাকি? এতো জুতা কেন? মনেহচ্ছে এ বাড়িতে মানুষ এসেছে?

ঘোমটাটা ফের ঠিক করলেন আকলিমা। পানের রসে ছপছপ করছে মুখ। রসে টইটুম্বুর পান চিবোতে চিবোতে বললেন,

  • হায় হায় আম্মা, কিছু জানো না? কেউ কয় নাই কিচ্ছু? সর্বনাশ করছে যে! রেবু সকালে খবর পাই ছুইটা আসছে যে। তোমার হবু শ্বশুর অজ্ঞান হইয়া পড়ছিল আম্মা!

শুনে হতভম্ব শাওলিন। তীব্র উত্তেজনায় বলে উঠল,

  • কী বলছেন! কখন হয়েছে এসব?
  • কালকে ঘটছে যে আম্মা। দুপুর দিকে খানা খাইয়ে শুতে গেছে যে। সিঁড়ি দি চড়তেই মাথা পাক দিছে। ডানহাতে ব্যথা পাইছে। এখন সুস্থ আছে আম্মা। বাড়িতে উনাক দিখতে মানুষ আসছে।

কথায় কথায় আকলিমার ‘যে’ বলার মুদ্রাদোষ। প্রতি কথার শেষে একটা অনাবশ্যক ‘যে’ লাগানো চাই। ভদ্রমহিলার মুখ থেকে পুরো ঘটনা শোনার পর স্তব্ধ-মূঢ় শাওলিন। হবু শ্বশুর নামক লোকটা অত্যন্ত সম্মানীয় ব্যক্তি। কখনো ‘মা’ ছাড়া শাওলিনকে ডাকেনি। ভদ্রলোক ব্যবসায়ী মহলে বিশিষ্ট মানুষ। নাম আনোয়ার মর্তুজা। বছর তিনেক যাবৎ হৃদরোগ ধরা পড়েছে। বয়সটা যেমনি হোক, এখনো শক্ত সমর্থ শরীরে পুরো ঢাকা চষে বেড়ান। অকুতোভয় মানুষ। সেই মানুষটার হঠাৎ অজ্ঞান দশা? খবরটা শুনে মুখ কালো হলো শাওলিনের। সিঁড়ির গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে আকলিমার উদ্দেশ্যে বলল,

  • এখন কেমন আছেন উনি? দেখা করা যাবে?

আকলিমা নিচতলার দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ প্রশ্ন শুনে মাথা পিছু করলেন,

  • এতখন জেগে আছিল যে। ঘুমায়ছে কিছুখন হইছে আম্মা। তুমি উপরে যাও। আমি রেবুরে খবর দিচ্চি।
  • ধন্যবাদ, কাকি। ডেকে দিন।

ভবনটা তিনতলা। নিচতলায় ভৃত্য-দারোয়ান-চাকরদের ঘর। দোতলার পুরোটা জুড়ে থাকেন রেবেকার জেঠা। অর্থাৎ আনোয়ার মর্তুজার পরিবারবর্গ। তিনতলায় থাকেন রেবেকার বাবা ও ছোটো চাচার সদস্যবৃন্দ। শাওলিন তিনতলায় সোজা রেবেকাদের অংশে চলে গেল। বিরাট প্রশস্ত রুম, চারপাশ খোলামেলা, আলোয় ভরপুর থাকে দিনের বেলাটা, কিন্তু এখন সন্ধ্যা নামছে বলে আকাশ আঁধার আচ্ছন্ন। তিনতলার বাঁদিকে একেবারে সর্বকোণের ঘরটায় ঢুকে শাওলিন। বাবার বাড়িতে এলে এই ঘরটায় রেবেকা ঘুমোয় এখনো। ঘরটা সুন্দর, ছিমছাম, গোছানো। পশ্চিম ও দখিন দিকে দুটি বড়ো জানালা। জানালা দুটি দিয়ে শোঁ শোঁ করে আসছে ভেজা শিরশিরে বাতাস। দখিনের জানালায় আস্তে করে দাঁড়াতেই নিচের গেট, দারোয়ান, গাড়ি ছাউনিটা দেখতে পায় ও। কেন ঠিক জানে না, কিন্তু মন বারবার সেই গাড়ি ছাউনিটায় ঘুরছে। অদ্ভুত একটা বেচইন অনুভব হচ্ছে। কিছু কী আছে ওখানটাতে? এমন কিছু, যা ওর সজাগ দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে না?

  • শাওলিন? ভালো করেছ তাড়াতাড়ি এসে গেছ। আমি জোহরা আন্টিকে এদিকে আসতে বলে দিয়েছি। সঙ্গে তোমার কিছু জামাকাপড় উনি ছোট্ট একটা ব্যাগে করে আনছেন।

চকিতে মাথা পিছু ঘুরায় শাওলিন। রুমে ঢুকতে ঢুকতে কথাগুলো বলছেন রেবেকা। হাতে ট্রে, নাশতা সাজানো খাবার টি টেবিলে রাখলেন। শাওলিন কিছু বুঝে উঠতে না পেরে সরাসরি বলল,

  • হঠাৎ এতো তোড়জোড় কেন? আপনি আমাকে সকালেই বলতে পারতেন মণি, জেঠার এতো শরীর খারাপ। শুনলে তখুনি শ্রেষ্ঠাকে বলে চলে আসতাম। দেরিটা নিশ্চয়ই করতাম না।

টি টেবিলে পানির গ্লাসটা নামিয়ে রাখছেন রেবেকা। মুখে ব্যস্ত ভঙ্গির ছাপ টেনে সচকিত কণ্ঠে বললেন,

  • কিন্তু তুমি তো সময়মতোই এসেছ, শাওলিন। দেরি তো করোনি। বরং আমি ভাবছিলাম, তোমার ফিরতেই সমস্যা হয় কিনা।
  • কী সমস্যা?

প্রশ্নটা করে জানালা থেকে সরে। পায়ে পায়ে রেবেকার দিকে এগোতেই বলল,

  • আপনি সেই তখন থেকে কিছু বলি বলি করছেন। বলতে গিয়ে আড়ষ্ট হচ্ছেন। কিছু একটা জানাতে চাইছেন, কিন্তু বারবার সংকোচও ভুগছেন। কেন? হঠাৎ জরুরি তলবটা কীসের? এভাবে ধানমণ্ডি ডাকলেন কেন? বাড়িতে এতো মেহমান, এতো মানুষ। অসুস্থ রোগীকে দেখতে এলে এতো হৈচৈ হয়?

প্রশ্নগুলো অকাট্য স্বরে রাখে ও। একটা গভীর দম ছেড়ে রেবেকা শুধাল,

  • এসবে কিছু বোঝনি?

সন্দেহের গাঢ় আঁচ পড়ল মুখে। শাওলিন নিস্পন্দ। মাথাটা ডানে বাঁয়ে ‘না’ ভঙ্গিতে নাড়িয়ে উত্তর জানাল। রেবেকা অবস্থা দেখে নিজেই ননদের কাছে এসে দাঁড়ান। তবে চেহারাটা আজ ম্লান। কণ্ঠে বাষ্পরুদ্ধ অবস্থা চেপে হালকাভাবে বলেন ,

  • জেঠা চাইছেন, আজ আনুষ্ঠানিক বাগদানটা হোক। গতবার জেঠিমা তাহমিদকে নিয়ে বাসায় এসেছিল। মানুষ বলতে ছিল মাত্র পাঁচ-ছয়জন। মুরুব্বি কেউ কাছেপিঠে ছিল না। জেঠাও ঢাকার বাইরে ছিলেন। পাত্রী দেখতে এসেই পছন্দ করে ফেলায়, তখন ব্যাপারটা হালকার ওপর চুকে যায়। কিন্তু ওটা তো আনুষ্ঠানিক আংটি পরানো ছিল না। তার মধ্যে ওই আংটিটা তুমি হারিয়েও ফেলেছ। সব শুনে উনারা এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আজ ঘরোয়াভাবে ব্যাপারটা মিটে যাক। আনুষ্ঠানিক ব্যাপারটা আজই হোক।

এটুকু বলে শাওলিনের হাতটা নিজের হাতে তুলে নেন রেবেকা। যে আঙুলটায় গতবার তাহমিদের মা সাধারণ একটা আংটি পরিয়েছিল, সেই আঙুলটা দেখে নিয়ে রেবেকা বলল,

  • আত্মীয়-স্বজন কিছু এসেছে। বাকিরা মোটামুটি রাতের ভেতর জড়ো হচ্ছে। পাত্র-পাত্রী উভয় পক্ষে আংটি বিনিময়টা হয়ে গেলে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে। আর বিয়ের সম্ভাব্য তারিখটা আজই ঠিক করা হবে। জেঠামিয়ার স্বাস্থ্যটা ভালো নেই, শাওলিন। ডাক্তার বলেছে যেকোনো মুহুর্তে যেকোনো কিছুই ঘটে যেতে পারে। সবাই যেন প্রস্তুত থাকে। এরকম কথা শুনলে কেউ স্বস্তি পায়? হার্টে রিং পরানো হলে অন্য বিষয়, কিন্তু হার্টটাই খুব দুর্বল উনার। গতকাল কীভাবে কী হলো দেখো! একটা সুস্থ মানুষ সেকেণ্ডের ভেতর পড়ে গেল। আমি এসে সবকিছু সামাল দিলাম। এখন তুমি যদি সবকিছু ঠিকঠাক মনে করো, তাহলে আমি নিশ্চিন্তে সবকিছু দেখব। কোনো মতামত আছে কিনা জানিয়ো। আমি নিচে গেলাম।

খানিক বিব্রত অবস্থায় বিপণ্ণ হল। কী বলবে চট করে খুঁজে পেল না শাওলিন। হুট করেই যেন ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ল এসব। কী ঘটছে, কেন ঘটছে, কিচ্ছু ঠিকমতো ঠাহর করতে পারল না। ভাগ্যকর্তা এ কেমন পরিস্থিতিতে ছেড়ে দিচ্ছেন, কে জানেন! রেবেকা ততক্ষণে চলে গেছেন। ফাঁকা ঘরে অনির্দেশ্য চিন্তায় নিবদ্ধ হচ্ছে শাওলিন। হঠাৎ পায়ের কণিষ্ঠ আঙুলটায় নজর গেল ওর। বুকের ভেতরটা ভয়ংকর ভাবে নিংড়ে এল! কেন মনকে স্থির করতে পারছে না? কেন অস্থির লাগছে ওর? কেন উৎকণ্ঠায় ভুগছে ও? কীসের তৃষ্ণায় ছটফটাচ্ছে ওর নিগূঢ় অন্তর? বিছানায় বসে কণিষ্ঠ আঙুলটায় হাত রাখল শাওলিন। ব্যাণ্ডেজের ওপর বুলাল আঙুল। খেয়াল করল, ওর আঙুলগুলো থরথরিয়ে কাঁপছে। বীভৎস একটা উৎকণ্ঠা ঘা দিচ্ছে বুকে। একবার কী কল করবে লোকটাকে? জানাবে ওর অবাধ্য অস্থিরতা? কিন্তু কেন জানাবে? ওর কীসের অধিকার?

.

আকাশ গাঢ় বেগুণি রঙে ডুবো। কাঙ্ক্ষিত রাতটা নামবে একটু পর। একটা হুলস্থুল তাড়াহুড়োয় সবকিছু সামলে নিচ্ছেন তাহমিনা। একমাত্র পুত্রের আংটি পরানোকে কেন্দ্র করে আজ মাতিয়ে তুলেছেন মর্তুজা মেনশন। কাছেপিঠে থাকা কিছু আত্মীয়, বাবার বাড়ির পরিবার, মর্তুজাদের বন্ধুস্থানীয় পরিবার জড়ো হচ্ছে এই সন্ধ্যায়। স্বামী অসুস্থ হলেও স্ত্রী তাহমিনা যে পাক্কা গৃহিণী, সর্বেসর্বা নারী, তা যেন আরো একবার কাজে-কর্মে সাক্ষর রাখলেন। বাড়ির সমস্ত ভৃত্যদের দিয়ে চুকিয়ে ফেলেছেন রান্না, সাজিয়ে তুলেছেন দোতলার মহল, ছেলেকে খবর দিয়ে এনেছেন সন্ধ্যা ছটার ভেতর। আংটিটা পরানো হবে এশারের পর। হাতে খুব একটা সময় নেই। এমন সময় পেছন থেকে উপস্থিত হন মোর্শেদা। রেবেকা মা। ছিমছাম গড়নের ভদ্রমহিলা বেশ নম্রচিত্তে বলে উঠেন,

  • আপনার মা এসেছেন, ভাবী। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। যদি সম্ভব হয়, ওদিকটায় একটু দেখে আসেন।

চুলায় পায়েসের হাঁড়িতে কিছু বাদাম কুচি ছেড়ে দিচ্ছিলেন তাহমিনা। রান্নার সুগন্ধে মৌ মৌ করা পরিবেশ থেকে ছুটে এসে বললেন,

  • মোর্শেদা, পায়েসটার কাছে একটু দাঁড়াও তো। চুলার আঁচটার দিকে নজর রাখো। আমি তাহলে ওদিকটায় দেখে আসি। রেবেকা? রেবেকা কোথায় গেল? অ্যাই রেবেকা! রেবেকা?

জেঠির ডাক শুনে ‘জ্বী জেঠি’ বলে সাড়া দিল রেবেকা। তিনতলা থেকে যে ডাকটা ছুটে এসেছে, তা দোতলায় চড়তে চড়তে শুনতে পেলেন তিনি। দোতলায় দাঁড়িয়ে উপরতলার উদ্দেশ্যে চিৎকার ছেড়ে বললেন,

  • তোমার ভাইকে একবার ডাকো, রেবেকা। তাহমিদ সেই কখন থেকে ঘরে দুয়ার দিয়ে বসে আছে। ছেলেটা কী করছে দেখো তো। ওকে বলো মেহমান সব এসে গেছে। নিচে সবাইকে যেন দেখাশোনা করে।
  • আপনি যান। আমি দেখে আসছি জেঠি।

রেবেকার জবাব শুনে আপন কাজে প্রবৃত্ত হলেন তাহমিনা। বাড়িভরা মানুষ, ছোটো ছোটো বাচ্চারা দুরন্ত চিৎকারে খেলছে, একটা চাপা সোরশোল সমস্ত কোণে ছাপিয়ে গেছে। অতিথি আসা এখনো চলমান। রেবেকা নিজের ঘর থেকে পরিপাটি হয়ে নামতেই হঠাৎ সিঁড়িতে পথ আঁটকায় একজন। মুখে উৎফুল্ল হাসি তার, দুহাত পিঠের পেছনে লুকোনো। ভ্রুঁতে ভাঁজ ফেলে রাগী মুখে শুধালেন রেবেকা,

  • কোথায় ছিলি? মা যে তোকে তাশফিয়া তাশফিয়া করে ডাকল, তুই শুনতে পাসনি?

বড়ো বোনের চেহারা দেখে নিভল তাশফিয়া। কণ্ঠে ইতস্তত ছাপ ফেলে বলল,

  • দোতলা থেকে তো শোনা যায় না আপু। আমি তো দোতলার বড়োঘরে ছিলাম। ওখানে নানুরা সবাই এসেছে। এতোক্ষণ উনাদের কাছেই ছিলাম।

অকপটে সত্যিটা বলছে বলে রাগটা কমলো রেবেকার। তেজে ক্ষান্ত দিয়ে দৃঢ়ভাবে বললেন,

  • উপরে যা। মা কেন ডাকল শুনে আসবি। আর খবরদার! শাওলিনের ঘরে আড্ডা বসাবি না। ওর কাছে যদি ভিড়তে দেখি—

কথাটা তর্জনী উঁচিয়ে সাবধান করলেন রেবেকা। বোনের ফ্যাকাশে মুখের তাকিয়ে গটগট করে নেমে গেলেন। এদিকে তাশফিয়া হবু ভাবীর ঘরে যেতে সজাগ। রেবেকাকে দোতলায় ঢুকতে দেখে চটজলদি ধাপ ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল। তিনতলায় সেই নির্দিষ্ট ঘরের সামনে ঠকঠক করাঘাত করল তাশফিয়া। আশেপাশে নজর বুলাতেই আচানক খুট করে নব মোচড়ানোর আওয়াজ হল। কাঠের বাদামি বার্নিশ করা দরজাটা একটু খুলতেই উঁকি দিয়েছে শাওলিন। অমনেই শাওলিনের চেহারা প্রফুল্ল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল! সজোড়ে দরজা টেনে খুলে দিতেই দুরন্ত পায়ে ঢুকে পড়ল তাশফিয়া। দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল হবু ভাবীকে। আনন্দ ঝরা কণ্ঠে উৎফুল্ল হয়ে বলল,

  • কত্তোদিন পর দেখা হচ্ছে ভাবী! তোমাকে সেই কবে থেকে দেখি না। তুমি কেমন আছ? তোমাকে খুব মিস করি।

জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই দরজাটা চাপিয়ে দিয়েছে শাওলিন। হবু ননদের মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে স্নেহার্দ্র সুরে বলল,

  • আমি ভালো আছি, তাশফি। একদম ঠিক আছি। তুমি কেমন আছ? আগের মতো যোগাযোগ করাটা সম্ভব হয় না, সোনা। তুমি তো পারলে কল দিতে পারো। রাতে তো তোমায় অনলাইনে দেখি।

কঠোর করা হাত এবার একটু ঢিল দেয় তাশফিয়া। মুখ উঠিয়ে শাওলিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

  • তুমি রাত করে অনলাইনে থাকো? এজন্যই তোমার চোখদুটো এমন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আজ কী ভার্সিটি থেকে সরাসরি এসেছ? মা বলল তুমি নাকি মঞ্চে দাঁড়িয়ে উপস্থাপনা করেছ, সত্যি?
  • সত্যি।
  • কী অদ্ভুত! তুমি তাহলে পারো না কোনটা? শুধু বোধহয় আর্ট করাটাই পারো না। আচ্ছা ছাড়ো। রেবেকা আপু আজ হাইপার হয়ে আছে। সে আমাকে তোমার ঘরে ঢুকতেই নিষেধ করল। কেন করল বলো তো?
  • কী জানি। তুমি এসেছ, ভালো হয়েছে। একা একা কী বিশ্রী লাগছিল! বোসো। চকলেট খাবে? আমার ব্যাগে একটা কিটক্যাট আছে। বের করে নিয়ে নাও।
  • ধন্যবাদ, ভাবী! তুমি কখনো এই জিনিসটা মিস দাও না। তোমার জন্য তাহমিদ ভাইয়াকে দিয়ে ইচ্ছেমতো চকলেট স্টক করাব। এরপর তুমি-আমি দুই ননদ-ভাবী মিলে রাতে দিব হামলা। কেউ কিচ্ছু টের পাবে না, আহা হা হা!

উচ্ছল কিশোরি ন্যায় ফুরফুর করছে মেয়েটা। বয়স সদ্য ষোল। চঞ্চল পাখির মতো উড়ু উড়ু ওর দৃষ্টিভঙ্গিটা। মেয়েটার মুখ ও গড়ন মায়ের মতো হলেও স্বভাবে একদম চপল। কখনো একদণ্ড একদিকে স্থির থাকে না। সারা বাড়ি উড়ে বেড়ায় ডানা মেলা প্রজাপতির মতোন। আয়নায় কাছে দাঁড়াতেই নিজের প্রতিবিম্বে নজর গেল। শাড়িটি উজ্জ্বল ঘিয়ে রঙা, সমস্ত পাড় স্বর্ণালি আভায় ঝলমল করছে। একটা রাজকীয় দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে শাড়িটার রঙ, কারুকার্য, সুঁতোর বুনন থেকে। তন্মধ্যে গাঢ় খয়েরি রঙা ব্লাউজ। কনুই পর্যন্ত আবৃত সুডৌল দুটি হাত। ঠোঁটে মেরুন শেডের ম্যাট লিপস্টিক। ডাগর চোখে গাঢ় করে টানা কাজল। চুলগুলো প্রাকৃতিকভাবেই ঢেউ যুক্ত বলে পিঠময় অপূর্ব দেখাচ্ছে। হাতভর্তি সোনালি রঙা চুড়িগুলো পরতে ঠক্ ঠক্ শব্দে সচকিত হয় ও। দরজার বাইরে থেকে উঁচু স্বরে কেউ বলল,

  • শাওলিন আপু? তুমি কী এই ঘরে?
  • হ্যাঁ, এখানে। কে বাইরে?
  • আপু দরজাটা খোলা যাবে? আমি মারজিয়া। তাশফিয়া কী এখানে আছে? ওকে সিনিয়র ভাই তলব পাঠিয়েছেন।

মাথা পিছু ঘুরিয়ে তাশফিয়ার দিকে তাকাল শাওলিন। ইশারায় বোঝাল ভাইয়ের কথা শুনে আসতে। কিন্তু তাশফিয়া তখন কিটক্যাটে কামড় লাগানো ভুলে গেছে। কেমন একটা আশঙ্কিত চেহারায় ভ্রুঁ কুঁচকে আছে। ব্যাপারটা দেখে কিছু শুধাবে শাওলিন, তার আগেই তাশফিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করেই বলছে,

  • ও কী বলল?

শাওলিন নিজেও সন্দেহগ্রস্ত। ওর দিকে ‘কি হয়েছে?’ বলে জিজ্ঞেস করবে, তার আগেই ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরুয় তাশফিয়া। দরজাটা খোলা রেখেই ধুপধাপ পায়ে দৌড় লাগিয়েছে ও। বিষয়টাতে অবাক হতে গিয়ে কেমন উদ্ভট ঠেকল। ভাইয়ের ডাক পেয়ে অমন ছটফটিয়ে ছুটল? প্রশ্ন জড়ানো চাহনিটা দরজা থেকে সরাবে, ঠিক তখুনি দেখল চকলেটটা পর্যন্ত ফেলে গেছে! কী ব্যাপার?

.

জোহরা, মোর্শেদা, তাহমিনা বেশ ব্যস্ত। তবু মেহমানদারী ও অন্যান্য কাজে সজাগ মনোযোগ। এশারের ওয়াক্ত শেষ হতেই দোতলার বিরাট ঘরটা গমগম করছে। ছাদ থেকে ঝুলছে বিশাল একটি ঝাড়বাতি। তা থেকে স্বর্ণ রঙা আলো ঝিলমিল করছে সবকোণে। সফেদ গদির সোফায় বসে আছে তাহমিদ। আজ মায়ের জোরাজুরিতে পড়েছে গাঢ় খয়েরি পাঞ্জাবি। সঙ্গে গ্যাবার্ডিন সাদা প্যান্ট। বিরক্ত মুখে সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছে সে। অফিসের কিছু ফাইলে চোখ নাড়াচাড়া করতে ব্যস্ত। এমন সময় ছোটো বোন তাশফিয়া কানের কাছে ফিসফিস করে কী যেন বলল, শুনে চোখটা তৎক্ষণাৎ প্রবেশমুখের দিকে ঘুরে গেল। বুকে ঢিপঢিপে কাঁপন টের পাচ্ছে তাহমিদ। টের পাচ্ছে সে সোফা থেকে আপনা থেকেই দাঁড়িয়ে পড়ছে। হাতের ফোনটা বন্ধ করল কি করল না, প্যান্টের খাপে ঝটপট পকেটস্থ করল সে। মোর্শেদা ও রেবেকা যাকে নিয়ে ঘরে ঢুকছে, তার দিকে একদৃষ্টে শুধু স্থির ছিল তাহমিদ। আপাদমস্তক অদ্ভুত এক রাজকীয় ঐশ্বর্য বিকিরণ করছে ওর। ঘিয়ে রঙা পোশাক, স্বর্ণের মতো পাড়, মাথার অগ্রভাগ পর্যন্ত ঘোমটা আবৃত, চোখের বড়ো বড়ো পাপড়িগুলো স্পষ্ট, ঠোঁটে হাসিশূন্য ছাপ, মুখমণ্ডল নির্বিকার। তাহমিদের উলটো দিকের সোফায় বসলো শাওলিন। একবারও চোখ তুলে সমুখদিকে চাইল না। টের পেল তাশফিয়া ওর ডানপাশ ঘেঁষে বসছে। বাঁদিকে অন্য কেউ, যাকে শাওলিন চেনে না। আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবে, এমন সময় আনোয়ার মর্তুজা নিজের প্লাস্টার হাত বুকে ঝুলিয়ে উপস্থিত হলেন। একটা হাসি হাসি রব ফুটিয়ে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বললেন,

  • আজকে আমার ইচ্ছে ছিল কাজি ডাকিয়ে কাবিনে সই নেব। যেন আমার ঘরের লক্ষ্মীটাকে ঘরেই রেখে দিতে পারি। কিন্তু সবকিছুর তো সময় আছে। সবকিছুর একটা পরিবেশও লাগে। আমি গতকাল দুপুর থেকে অসুস্থ। হাতটা নাড়াতে কষ্ট পাই। যেটুকু সাধ্য আমার, আজকে এই দুই চোখে ওদের বাগদানটা দেখতে চাই। গতবার সম্ভব হয়নি। আবার গিন্নির হাতে পরানো আংটি মা-টা হারিয়েও ফেলেছে। এজন্য মনে করেন, আজকে ছোটো করে সবাইকে ডাকিয়ে সব চোখে চোখে দেখছি। আল্লাহ চাইলে আজ দুটো ডালভাত খেতে খেতে বিয়ের তারিখ ঠিক করব। হায়াত যে কদিন আছে, আমার পুত্র আর পুত্রবধূকে নিয়ে এক ছাদের নিচে থাকতে চাই। কী বলেন সবাই?

কথাগুলো বলতেই মুরুব্বি ও স্বজনরা খোশমেজাজে মতামত জাহির করল। পরিবেশ যেন আরো গমগম। শাওলিন একসেকেণ্ডের জন্য রেবেকার দিকে চোখ রাখতে যাচ্ছিল, হঠাৎ আড়চোখেই দেখল তাহমিদ এখনো একদৃষ্টে চেয়ে আছে। ওর নজরটা স্বস্তিকর নয়। কী যেন ভেবে ওই চাহনি অনুসরণ করে নিজের দিকে সাবধানে চোখ বুলায়। অমনেই ব্যাপারটা বুঝে শিরদাঁড়াটা শিরশির করে উঠল! শাড়িটা জর্জেট, তার উপর বেশ ভারি। কোমরের দুপাশ থেকে নেমে যাওয়ায় পেটের সামনের দিকটা দৃশ্যমান ওর। সেদিকে নজর ঘুরিয়ে মাঝে মাঝে ইপ্সিত তৃষ্ণা নিবারণ করছে তাহমিদ। দুষ্টু হাসি দিচ্ছে এখন। অমন সময় একজোড়া আংটি সাজিয়ে উপস্থিত হন তাহমিনা। দুজনকে আংটি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ঠিক তখুনি নিচে থেকে প্রচণ্ড হৈ চৈ শুরু হল। সবার চোখমুখ তখন উদভ্রান্তের মতো থতমত। একে অন্যের দিকে প্রশ্নচিহ্নে তাকাচ্ছে। আনোয়ার দ্বিধা চাহনিতে ‘কী হয়েছে?’ বলবেন, তার আগেই সিঁড়িতে একজোড়া পায়ের আওয়াজ ফুটে উঠল। সমবেত সবাই দরজার বাইরে দৃষ্টি ছোড়াছুড়ি করলে গলা খাঁকারি দেন আনোয়ার,

  • বাইরে কে? মাকসুদ নাকি? মাকসুদ?

ভদ্রলোক গলা উঁচিয়ে বলতেই সমস্ত ঘর যেন সহসা এক বজ্রকণ্ঠে গমগমে প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে দিল,

  • আমি শোয়েব। শোয়েব ফারশাদ, ফুপা।

অমন ভারি প্রবল কণ্ঠে সচকিত হয় উপস্থিতবর্গ। চোখে আশ্চর্যের ধক মাখিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন আনোয়ার! মুখ বিশাল হাঁ করে বিস্ফোরিত হলেন তিনি, পরক্ষণে সেই বিস্ফোরিত ভাব বাঁধভাঙা আনন্দে রূপান্তরিত হলো! কণ্ঠে বিস্ময় ছাপ নিয়ে গদগদ আনন্দে বলে উঠলেন,

  • কী দেখছি আমি! তাহমিদের মা কই তুমি?

ব্যাপারটায় গুরুত্ব না দিয়ে নিজের মতো প্রবেশ করছে শোয়েব। পালিশ করা চকচকে কালো জুতা দ্বারপ্রান্তে খুলে স্বাভাবিক মুখে বলল,

  • কেমন আছেন আপনি? দাদী না জানালে জানতাম না আপনি অসুস্থ। শরীর কেমন এখন?

আর অপেক্ষা করলেন না আনোয়ার। দ্রুত গিয়ে বুকে জড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করলেন একধাপ। পুরো চেহারায় সামান্যতম বিকার নেই শোয়েবের। সে যেন চুপচাপ যান্ত্রিকভাবে কুশল সেরে নিচ্ছে। আশেপাশে নজর বুলাচ্ছে কিছুর জন্য। হয়ত কাউকে খোঁজার, কাউকে দেখার, কিন্তু সেটাও সাবধান চোখে। অন্যদিকে বড়ো ঘরে বসা শাওলিন পুরোদস্তুর পাথর। নড়চড়, হেলদোল, চোখের পলক কোনোটাই ঘটছে না। ডানহাতের ওপর বাঁহাত রাখা ছিল, বতর্মানে সে হাতদুটো পরষ্পর মুষ্টিতে আবদ্ধ। কানে শুনতে পাচ্ছে, কেউ একজন ভারী পদক্ষেপে প্রবেশ করছে ঘরে। সেই একটু আগের গলাটা ফের কর্ণদ্বারে বাজ ফেলে বলল,

  • কেমন আছ, জুনিয়র? সব ভালো?

গায়ে শিরশির করে কাঁটা দিয়ে উঠল। সূঁচের মতো বিঁধে উঠল পশমস্তর। বুকের ভেতর জমাট বেঁধেছে ভারি একটা পাথর, সেটা সরাতে পারছে না শাওলিন। নিঃশ্বাস যেন আঁটকে আসছে ওর! ভেতরটা যেন থরথর করে কম্পনরত। সামনে থেকে তাহমিদ হাত বাড়িয়ে করমর্দন করল। সোফা ছেড়ে উঠে মানুষটার সঙ্গে কোলাকুলি করে বলল,

  • তোমাকে সত্যিই মিস করতে যাচ্ছিলাম, সিনিয়র। আমার এতো বড়ো একটা দিনে তুমি খাগড়াছড়ি ছেড়ে আসবে না, সাউণ্ডস ইমপসিবল।

কথাটা শুনে বিদ্রুপ হাসলো শোয়েব। হাসিটা বাঁকা করে বলে চলল,

  • আমাকে বাদ দিয়ে সবকিছু ঠিক করে নিয়েছ, সেখানে আমি থাকলেও কী? না থাকলেও কী? নাথিং ক্যান স্টপ দ্যাট। তোমার নানী সাহেবা কোথায়?
  • জার্নি করে নানী অসুস্থ। আগে উনার সঙ্গে দেখা করতে চাও নাকি?
  • নাহ। তোমার বিশেষ মুহুর্তটায় আগে থাকি। তারপর অন্যসব। এই মুহুর্তটা আমার জন্যও তো ক্রুশিয়াল ফ্যাক্টর। ক্যারি অন, জুনিয়র। গিভ হার এ হ্যাণ্ড।

ঠোঁটে হাসি টেনে পিছু ঘুরল তাহমিদ। হাতের মুঠোয় ভেলভেটের বাক্স, তার মধ্যে একটি আংটি। সেটি যখন দু আঙুলে তুলে প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন অপরদিকে ক্রুদ্ধ শাওলিন নিজের হাত স্থির করছিল। ক্রমাগত থরথর করে কাঁপছে আঙুল। নার্ভাস ব্রেকডাউন শব্দটার মতো ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ওর। রেবেকার কল্যাণে যখন ওর আংটিটা হাতে নিল, তখন চূড়ান্ত সীমায় নিজেকে ধাতস্থ করে ফেলেছে ও। এই প্রথম নিজের চোখদুটো সমুখদিকে রাখল, তাকাল একদম জায়গা বরাবর। ক্রোধ, অবিশ্বাস, জেদের মিশ্রণে তাকাল শোয়েবের দিকেই। যেন চোখ দিয়েই শাওলিন বলছে, মিথ্যাবাদী, অমানুষ! একটা জোচ্চর অমানুষ! একটা ঠাণ্ডা মাথার নিকৃষ্ট লোক! চোখে-মুখে শক্ত ভঙ্গিটা ফুটিয়ে মাথাটা নত করল ও। দুপাটি দাঁত ভয়ংকর ভাবে খিঁচিয়ে নিজেকে নির্জীব বানিয়ে তুলল। পুরো বাগদান পর্বে একটা শব্দ করল না শাওলিন। একবারও সামনে চোখ তুলে চাইল না। আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ চিৎকারে মুখর হচ্ছিল গোটা ঘর! আনুষ্ঠানিক বাগদান সম্পণ্ণ হওয়াতে সবাই যখন মিষ্টিমুখ করছে, তখন শাওলিন রেবেকার কানে আস্তে করে জানায়,

  • মাথাব্যথা করছে আমার। উপরে গেলাম।

কথাটা বলতে না বলতেই হুল্লোড় মহল থেকে বেরিয়ে আসে শাওলিন। ধপধপ সিঁড়ি ভেঙে সোজা উঠে গেল তিনতলার ঘরে। পেছন থেকে সবটুকু দৃশ্যই নীরব দর্শকের মতো দেখল শোয়েব। চুপ করে দেখল ওর চলে যাওয়ার দৃশ্যটুকু। ভারী নিঃশ্বাস ছেড়ে মনে মনে যেন বলে চলল,

  • “বলেছিলাম, যাবার আগে শেষ ডোজ দিয়ে যাব। না দিয়ে ফিরব না। দুঃখিত ইয়াং লেডি, পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে কিছু ডিসক্লোজ করা যাচ্ছে না। অপেক্ষা করো। তবে রেগে থাকা ভালো লক্ষণ। রাগে তোমার চেহারা আরো লোভনীয় লাগে। ”

.

নোটবার্তা — অবশেষে দীর্ঘতম যুদ্ধ নিপাত।লেখকব্লক নামক ভয়ংকর অবস্থা থেকে মুক্ত। অবশেষে বহুদিন পর সেই আগের মতো ফুরফুরে পর্ব লেখা এল, সবকিছু হল, এবার শান্তি, স্বস্তি, আলহামদুলিল্লাহ। 🖤

অপেক্ষায় আপনারা ছিলেন। তার বেশি অপেক্ষায় ছিলাম আমি। যেন ফ্লো-টা ফিরে আসুক দ্রুত, যেন আগের মতো তরতর করে লিখতে পারি। কেমন লাগল পর্বটা, জানাবেন। ছোট্ট মন্তব্য রাখবেন। পর্ব ভুলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়; তবে মনে রাখার চেষ্টাটুকুর জন্য ভালোবাসি। দেখি নিয়মিত পর্ব কতটুকু লিখতে পারি। দোয়া প্রার্থী। 🖤

শব্দসংখ্যা — ৪৭০০+ .

.

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply