Golpo থ্রিলার গল্প বজ্রমেঘ

বজ্রমেঘ পর্ব ২৩


বজ্রমেঘ . ❤

পর্বসংখ্যা_২৩ .

ফাবিয়াহ্_মমো .

সূর্যটা মেঘে ঢাকা। আলো ফোটেনি। নিঃসাড় শূন্যতায় থমথম করছে ঘর। ঘরের এককোণে চুপটি করছে তৈরি হচ্ছে কেউ একজন। চওড়া দীঘল আয়নায় তার নমনীয় মূর্তিটি অদ্ভুত সুন্দর করে ফুটে ওঠেছে। ঘর জুড়ে উত্তুরে হাওয়ার দাপট। জানালার পর্দাগুলো ফড় ফড় শব্দ করে হুটোপুটি লাগিয়েছে। বাইরে বেজায় ঠাণ্ডা বাতাস। প্রকৃতিতে বৃষ্টি আসি আসি মুহুর্ত। ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া ওকে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে দুষ্টু প্রবল প্রেমিকের মতো। আধ ভেজা চুল তখনো ছেড়ে রাখা। চঞ্চল হাওয়ার দল চোখে-মুখে ঝাপটা মাখিয়ে বিরক্ত করছে ওকে। বারবার চোখে চুলের ঝাপটা পেয়ে আঙুল থেকে কুচি ফসকে যাচ্ছে। পুনরায় বিরক্ত মুখে ঠিকঠাক করতে হচ্ছে একদম শুরু থেকে। ডানহাতটা কার্যরত রেখে বাঁহাতটা কানের পেছনে একগুচ্ছ চুল গুঁজে দিল। দৃষ্টি নত, মাথা ঈষৎ ঝুঁকানো, মনোযোগ গুটিকয়েক কুচি গুছোনোর দিকে ব্যস্ত। কিন্তু হতচ্ছাড়া বাতাসটা আবারও প্রবলবেগে ঝাপটা মেরে সমস্ত চুল মুখে ছড়িয়ে দিল। হাত থেকে খসে পড়ল দুটি কুচির ভাঁজ। মুখে অগ্নিচ্ছটা মাখিয়ে সরাসরি ডাগর ক্রুদ্ধ চোখদুটো বাঁদিকের জানালায় পড়ল। মেঘে মেঘে ঢেকে যাওয়া আকাশ, আকাশের বুকে দলবদ্ধ দুষ্টু বাতাস, সেই বাতাসের প্রতিই যেন তীব্র আক্রোশে খেপে খেপে বলল,

  • ইচ্ছে করছে ধাম করে জানালাটা বন্ধ করি! ভাঙলে ভাঙুক। থাইগ্লাসটা এমন শক্ত। এই বিল্ডিংয়ের বিচ্ছিরি মালিকের মতো এক নম্বর শক্ত, জঘণ্য, গোঁয়ার। টানলে একটুও জায়গা থেকে সরানো যায় না। অসহ্য! আঠার মতো ঝিম মেরে লেগে থাকে!

কথাগুলো যে কাকে আর কেন বলল তা বোঝা গেল না। কিন্তু ওর মেজাজ আজ গণগণে উনুনের মতো গরম। কণ্ঠের উচ্চতা বেজায় সাংঘাতিক ছিল কিনা জানা নেই, তড়িঘড়ি পায়ে ত্রস্তবেগে ঘরে ছুটে আসেন রেবেকা। চোখে কৌতুহলী ছটা মাখিয়ে ননদের দিকে শুধান,

  • চ্যাঁচাচ্ছ কেন?

মুখে কোনো কথা উচ্চারণ না করে সরাসরি একটা আঙুল বাঁদিকের জানালায় তাক করল। চোখের ক্রুদ্ধ স্থির চাহনিতে বুঝিয়ে দিল, জানালাটা খারাপ। থাইগ্লাস শক্ত। টানলে এদিক-ওদিক নড়চড় হয় না। আরেকটু হলে আমি এটা ভেঙে ফেলব। রেবেকা ওর চাহনির ভাষা বুঝে শক্ত মুখে তাকালেন, দুটো হাত বুকে ভাঁজ করলেন। ওর দিকে আপাদমস্তক নজর বুলাতেই হঠাৎ কপালে কুঞ্চন ফেললেন ধীমতি রেবেকা। যে কথাটা বলার জন্য হাত ভাঁজ করেছিলেন, তিনি সে কথাটা আর বলতেই পারলেন না। বরং অন্য কথাটা এমন আশ্চর্য স্বরে বললেন যে, কেউ একজন অজান্তেই সর্বশরীরে হিম হয়ে গেছে।

  • এই শাড়ি পরেছ কেন? তোমার তো এই রঙ মারাত্মক অপছন্দ। তুমি তো এই রঙটা দু চোখে সহ্যই করতে পারো না। আজ . . হঠাৎ কী ভেবে পরেছ তুমি?

ঢোক গিলে বুকের দ্রিম দ্রিম কাঁপন ধাতস্থ করছিল শাওলিন। কিন্তু লাভ হল না একরত্নি। আরো ব্যগ্রগতিতে মাংসল পিণ্ড চাবুক কষিয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাসে ভয়ংকর টান পড়ছে। দাঁতে দাঁত পিষ্ট কণ্ঠনালীটা ভিজিয়ে নিল ও। তীক্ষ্মদর্শী রেবেকার সামনে প্রচণ্ড শান্ত একটা স্বরে বলল,

  • ড্রেসকোড নীল। আমাদের ডিপার্টমেন্ট টসে নীল রঙ পেয়েছে।

চমৎকার একটা নির্ভেজাল মিথ্যে অকপট স্বরে ঝেড়ে দিল শাওলিন। টস তো দূরের কথা, ডিপার্টমেন্টের সিআর ওকে কিছুই বলেনি। দ্রুত চোখদুটো সাবধানে বাঁচিয়ে রাখল ও। ঠোঁট মিথ্যে বললেও ওর চোখ মিথ্যে বলতে পারে না। আর এখানটাতেই বাজেভাবে ধরা খেয়ে যায় ও। রেবেকা ওর উত্তর শুনে কিছুক্ষণ দোনোমনা করল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণে এটাও ভেবে নিল আজকালকার ছেলেপিলেরা যথেষ্ট আধুনিক-মনা। তারা সাজ, পোশাক, সমস্ত কার্যক্রম পূর্ব পরিকল্পিত রাখে। তবু হালকা একটা সন্দেহে বিদ্ধ হয়ে হাত শিথিল করলেন রেবেকা। খুব সাবধানে তিনি কথার চাল ছেড়ে বললেন,

  • আচ্ছা শাওলিন, টসে এমন কোনো রঙ এলে ওরা কী তা মানতে জোর প্রয়োগ করে? রঙ মোতাবেক না পরলে সমস্যা হবে, র‍্যাগ দেবে, এমন কিছু?

দুটি হাত সক্রিয় ভঙ্গিতে কাজ করে যাচ্ছিল। মনোযোগ থিতু ছিল একগুচ্ছ কুচি পেটের কাছটায় গুঁজে নিতে। সেভাবেই মগ্ন থেকে উত্তরটা দিয়ে বসল ও,

  • না মণি, সেরকম কোনো ফোর্স করা হয় না। আপনার ইচ্ছে হলে আপনি পরবেন। কিন্তু না পরলেও কেউ কিচ্ছু বলবে না। দিনশেষে আপনার ইচ্ছের উপরই সবকিছুর নির্ভর। সিআর আর ডিপার্টমেন্ট এদিক থেকে যথেষ্ট ভালো।
  • তার মানে কেউ চাইলে না পরতেও পারে? এতে কোনো সমস্যাই নেই?
  • হ্যাঁ। কোনো সমস্যাই নেই।

ব্যস। বুকের ওপর হাতদ্বয় শিথিল করে নেন রেবেকা। সমস্ত মুখ ও চোখ এমন ভঙ্গিতে স্বাভাবিক হয়ে গেল যেন আকাঙ্ক্ষিত জবাবটা পেয়ে গেছেন। শাড়ি পরিহিতা ননদের দিকে খুব সাবধানী দৃষ্টিতে তাকান রেবেকা। আজ আর একটুও বুঝতে বাকি রইল না, শাওলিন একটু একটু করে অতি সুক্ষ্মভাবে পরিবর্তন হচ্ছে। কোনো এক অনির্দেশ্য কারণে ওর ভেতর ভয়ানক পরিবর্তনী হাওয়া শুরু হয়েছে। অথচ খালি চোখে এটা ধরাও সম্ভব না। কেউ বুঝতেই পারবে না। কী সাংঘাতিক ভয়ংকর! চোখ স্থির করে ঢোক গিলে ওর অবস্থাটুকু চুপচাপ দেখছেন রেবেকা। গাঢ় নীল বর্ণের শাড়ি, যার পাড় রূপো রঙা। পাড়ের ব্যসটা বেশ চওড়া। রূপো রঙা পাড়ের সঙ্গে গাঢ় নীল রঙটা অদ্ভুত ধরণের মায়া বিকরিত সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। দুচোখকে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করছে ওর ভুবনমোহিনী বেশভূষা। এমনিই মেয়েটা ওর মায়ের মতো রূপ, বাবার মতো ঘন চুল, পরিবারগত কিছু নজর-মুগ্ধ বৈশিষ্ট্য পেয়েছে। বলা বাহুল্য, মৃত শ্বাশুড়ীর চেয়ে এই মেয়ের রূপযৌবন বড্ড বেশিই উচ্ছল নদীর মতো লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওকে বোধহয় প্রথম দেখাতেই তাহমিদ পছন্দ করে ফেলেছিল। কিন্তু ছেলেটা রেবেকার ভয়ে কোনোদিন মুখ ফুটে বলেনি। তার ওপর ছিল রেবেকার অমন অমত বিয়ের সমস্যা। যখন বলার সময় ও সুযোগ পেয়েছে, ততদিনে তাহমিদ নিজের পায়ে কর্মক্ষম এক মর্যাদাপূর্ণ স্থান দখল করে ফেলেছে। নিজ যোগ্যতা ও পরিশ্রমের বলে ছিনিয়ে এনেছে উচ্চপদস্থ সম্মান। বতর্মানে দেশের প্রধান সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মপদস্থ। উপর্যুপরি কর্মদক্ষতায় শাণিতে উঠছে পদোন্নতির ক্রম। কিন্তু বিগত বছর চারেক ধরে দুঃসহ সাধনায় যুদ্ধ করছে জেঠাতো ভাইটা। কারো কাছে কিছু বলেনি, কিন্তু তবু রেবেকা নিজ বুদ্ধিতে বুঝতে পেরেছে কোনো একটা কেস নিয়ে বেজায় তটস্থ তাহমিদ। ডিপার্টমেন্টের উপরওয়ালা ভয়ংকর চাপ দিচ্ছে দিনকে দিন। কিন্তু ফলাফল গুছিয়ে তুলতে পারেনি তাহমিদ। অতঃপর সেই রহস্যজনক কেসের সমাধান আজও উদঘাটন হয়নি। এদিকে সবচেয়ে বেশি অদ্ভুত ঘটনা, শাওলিন আজ পর্যন্ত নিজের নারীদূর্গের কাছে কাউকে ঘেঁষতে দেয়নি। তাহমিদের স্পর্শ ও বাক্য সবসময় পাথর রেখেছে ওকে। কিন্তু ইদানিং তিনিও জোহরার কথা শুনে সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। গতকাল রাতে সামান্য দরজা ফাঁক করে দেখেছেন রেবেকা। চরম আশ্চর্য হলেও সত্যি, একটা সাধারণ বই, খুবই সাধারণ, একেবারে সাধারণ, সেই বইটাকে দুহাতে আগলে বুকে চেপে ধরেছে। সেভাবেই দুচোখের পাতা বন্ধ। গভীর ঘুমে আচ্ছণ্ণ। গায়ে পাতলা একটি কাঁথা দেহের কোমর পর্যন্ত মুড়োনো। একটা সামান্য বইকে যদি এভাবে যত্নে রাখে, তবে সেই বই প্রেরককে পেলে ও কি করবে? বইটার মতোই কী দুহাতে যত্ন করবে? ওভাবে বুকের মধ্যে আগলে চেপে রাখবে?

  • আমি চুড়ি পরব না। আপনি এগুলো কাঠের বাক্সে তুলে রেখে দিন।

কথাটা শুনতেই বিদ্যুৎ চমকের মতো কেঁপে উঠে সংবিৎ ফিরে পান। মাথাটা কিঞ্চিত ঝাঁকা দিয়ে নিজের বাস্তব মুহুর্তে চোখ বুলান। শাড়িটা বড্ড নিখুঁতভাবে পরেছে। ওর বয়স যখন ষোল, তখন থেকেই একটু একটু করে শাড়ি পরাটা শিখিয়ে দিয়েছেন রেবেকা। মেয়েদের সবচেয়ে সুন্দর লাগে শাড়িতেই। আয়নায় বড়ো বড়ো চোখদুটোতে কাজল কালো সৌন্দর্য দেখতে পাচ্ছেন। গোলাপি দুটো ঠোঁটে গাঢ় রঙের ছোঁয়া। মেরুন রঙের ম্যাট লিপস্টিক ঠোঁটদুটোতে দখল করা। বাতাসে উড়ু উড়ু মেঘে খেলানো চুলগুলোকে দেখতে পেয়ে প্রশ্নসুরে বললেন রেবেকা,

  • চুলে কিছু একটা পরবে না? আমার একটা গাজরা ফুলের মালা আছে। ওটা কী চুলের পেছনে বেঁধে দেব?

এবারও খারিজ করার সুর ফুটল। চুড়িগুলোর মতো তেমনি না সূচকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

  • না। আমার ওসব ভালো লাগে না। ফুলের ঝামেলা ওভাবে থাকুক। আচ্ছা, আপনি না আজ বলেছিলেন সন্ধ্যায় কী একটা কাজ আছে? আমারও নাকি সঙ্গে যেতে হবে? কাজটা কী মণি? ওটা কী জরুরি?

কথাগুলো বলতে বলতে চুলের ডানদিকে একটা সিঁথি তুলল শাওলিন। পিঠজুড়ে সেভাবেই লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হয়ে গেল। রেবেকা তখন জরুরি কাজটার ব্যাপারে কিছু বলতে গেলেন না। আজ থাকুক। অনুষ্ঠানের দায়িত্বটা ঠাণ্ডা মাথায় সেরে আসুক। এখনো তো বেশ কিছুটা সময় আছে। ওই কাজটার জন্য আবার তাহমিদের উপস্থিতিও লাগবে। মনে মনে চিন্তাগুলো কষে রেবেকা শাওলিনের দিকে নিরুদ্বেগ সুরে বললেন,

  • আপাতত আজকে সেটার দরকার নেই। তুমি এখন যাও। ভার্সিটির অনুষ্ঠান সামলে এসো। আচ্ছা শোনো, রোজা বা অন্যদের বলবে একটা ভিডিয়ো করে রাখতে। তোমার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলার ভঙ্গিটা স্মৃতি থাকা চাই। আবার কবে না কবে এই সৌভাগ্যের ভাগ জুটে। হায়াতের কথা তো আর বলা যায় না। পরে নাও জুটতে পারে।

এমন অদ্ভুত বিচিত্র কথায় কিছুটা থমকে যায় শাওলিন। চোখদুটো কিছুক্ষণের জন্য অপলক হল ওর। যেন ওর মস্তিষ্ক প্রসেস করতে পারছে না এই মানুষটা কয়েক সেকেণ্ড আগে কী বলল। বোধহয় শাওলিনের ওই ভীতবিহ্বল স্থির চাহনিতে অপ্রস্তুত বোধ করলেন রেবেকা। এভাবে হঠাৎ বেফাঁস কিছু বলাটা উনার নিজের কাছেও অপরাধের মতো লাগল। ওসব শব্দ ওর সামনে কখনো উচ্চারণ করতে চাই। অথচ ভুলে বেভুলে আজ আবারও বলে ফেলেছেন। চোখদুটোতে অনুতাপ মিশ্রিত চাহনি রেখে প্রসঙ্গটা বদলে দিলেন রেবেকা। এক টুকরো রোদ্দুরের মতো ঝলমলে হাসিটা দিয়ে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করে বললেন,

  • মাফ চাচ্ছি ননদিনী বুজুর্গ মানুষ। এবার ক্ষান্ত দেন। দয়াকরে ব্যাগটা গুছিয়ে বেরিয়ে পড়েন। আর কিন্তু হাতে সময় বেশি নেই।

চোখের পলক বহুক্ষণ পর পড়তে লাগল ওর। ভাষাহীন চোখদুটো ঠোঁটের শব্দ উচ্চারণের চাইতেও খতারনক। এই ভয়ানক দুটো মায়া ঘেরা চাহনির জন্যই কিছুতে কিছু চটেন না রেবেকা। একেবারে নিঃশব্দে নিজের চোখ নামিয়ে কালো রঙের একটি হ্যাণ্ডব্যাগ গুছিয়ে নিল ও। সোনালি রঙা শেকল প্যাটার্নের হ্যাণ্ডব্যাগ স্ট্রিপটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। বাসা থেকে যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন ড্রয়িং রুম থেকে অপলক বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে ছিলেন জোহরা। আরো একবার আশ্চর্য হয়ে মানতে বাধ্য হলেন, এই মেয়ের বিয়েটা বিলম্ব হলে বিপদ। আরো কত যে প্রস্তাব আসতে থাকবে জানা নেই! অবিবাহিত মেয়ে মানেই ভারি দুশ্চিন্তা। মহা বিপত্তি!

.

ঘড়িতে সোয়া একটা। আকাশের লক্ষণ সন্ধ্যা ছ’টার মতো। অন্ধকার হয়ে এসেছে, দমকা প্রবল বাতাস বইছে, চর্তুদিকে ধূলোর পর্দা। চোখে সবারই হাত, ধূলো থেকে চোখকে বাঁচাতে তৎপর উপস্থিতবৃন্দ। চোখে হাত দিয়ে ধূলো আড়াল করে সংলাপের কাগজটা দেখছে রোজা। পরনে হালকা গোলাপি রঙের চমৎকার একটি জামদানি শাড়ি। শাড়িতে আজ সত্যিকার অর্থে নজরকাড়া সুন্দর লাগছে রোজা হায়দারকে। চমৎকার করে সেজে এসেছে আজকের অনুষ্ঠান উপলক্ষে। ওকে দেখে আলুর মতো মুখ হা করে তাকিয়ে ছিল জিদান। ওর দিকে তর্জনী তাক করে শ্রেষ্ঠার দিকে প্রশ্নটা শুধাল সে,

  • এটার কোরিয়ান ড্রেসাপ কই? এ দেশি বাংলাদেশি ললনা সেজে আসছে?

হাতে সংলাপের কাগজ ছিল শ্রেষ্ঠার। সেটায় চোখ বুলিয়ে মুখস্ত রাখছিল পয়েন্টগুলো। এদিকে ব্যাচমেট বন্ধু জিদানের প্রশ্নবাক্যে মুখ ঘুরিয়ে রোজার দিকে চাইল, পরক্ষণে চোখ ফিরিয়ে জিদানের জিজ্ঞাসু চোখে স্থির করে বলল,

  • শাড়িতেই আজকে সুন্দর লাগছে। এতোদিন মনে হচ্ছিল ভিনদেশের কোন সাদা চামড়াকে সাথে নিয়ে ঘুরছিলাম। এখন ওকে ভাল্লাগতেছে।

কথাটায় সায় জানিয়ে উপর নিচ দুবার হ্যাঁ সূচকে মাথা দোলাল জিদান। রোজাকে সত্যিই আজকের এই মিষ্টি বেশভূষাতে চমৎকার দেখাচ্ছে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি অপেক্ষায় আছে আরেকজনের জন্যে। যার সাজ ও পোশাক সবসময়ই জিদানের কাছে অর্থবহ। সর্বদাই সেই রুচিশীলতার কাছে মুগ্ধ হয় জিদানের মন। আজকে ও কী পোশাকে আসবে? ওদের মতোই কী শাড়ি পরে উপস্থিত হবে? মঞ্চে মাইক হাতে নিয়ে মৃদুহাস্যে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করবে? কেমন দেখাবে আজকে সেই রমণীকে? বুকের ভেতরটা দুরুদুরু হাওয়ার মতো দুলে উঠছে খুব। অশান্ত বেচইন হচ্ছে প্রচুর। এমন সময় জিদান খেয়াল করল আজ রোজা বড্ড বেশি নিঃশ্চুপ বনে আছে। অদ্ভুত কোনো রহস্যজনক কারণে ওর চোখদুটি এদিক ওদিক অভিযান চালাচ্ছে। ক্রিস্টাল ক্ল্যাচ ব্যাগটা থেকে একটা টিস্যুর নিয়ে ঠোঁটের ওপরকার ঘামটুকু মুছে নিল। ধবধবে ফরসা গলাটা ঢোকের তালে ক্রমাগত অস্থির হচ্ছিল। ও কী কারোর অপেক্ষায় আছে? কারো জন্য বিশেষ সমীপে পথ চেয়ে আছে? এমন বিশেষ স্থানীয় ব্যক্তি রোজা হায়দারের জীবনে কে হতে পারে? ওর মতো হাই স্ট্যান্ডার্ড মেইনট্যান করা মেয়ে সেলিমকেই শেষপর্যন্ত বেঁধে রাখেনি, সেখানে ও আজ ব্যাকুলচিত্তে প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে? ক্ষণিকের জন্য জিদানের মনে কেমন বিচিত্র ভাবনার উদয় হল। ও কার কারণে দেশী সাজে বদলে এল? এই রূপ, এই সাজ, এই পরিবর্তনী বেশবাস কার জন্য? এখন তো জিদানের মনে হচ্ছে রোজা ওরই মতো কারোর প্রতি চুপিচুপি দুর্বল রয়েছে। এই দুর্বলতার আভাস সামান্যতম বুঝতে দেয়নি কাউকে। কিন্তু রোজার সেই চুপিচুপি পছন্দের ব্যক্তিটা কে? সেটা কে হতে পারে? নাযীফ?

  • জিদান, এক মিনিট এদিকে আসো তো।

চকিতে নিজের প্রশ্ন সাজানো দুনিয়াটা ধূলিসাৎ হল। বালির মতোই ঝুরঝুর করে ভেঙে গেলে সামনে তাকিয়ে দেখল সোহানা ডাকছে। হাতভর্তি পিজ্জার বাক্স, কোকের ক্যান, দু বাক্স মুরগীর গ্রিল। ওদের সকলের সকালবেলার নাশতা। এখনো পেটে একফোঁটা পানি যায়নি। নাযীফ জিদানের বাইকটা ঘুরিয়ে সোহানাকে নিয়ে খাবারগুলো কিনে এনেছে। জিদান দ্রুত ওর হাত থেকে সবকিছু বুঝে নিয়ে স্রেফ পিজ্জার বক্সটা সোহানার হাতে রাখতে দিল। সোহানা ওদের চিরচেনা আড্ডাখানার দিকে পা বাড়াতেই পেছনে একবার মাথা ঘুরিয়ে বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল,

  • তোরা দুজন কাজ শেষ করে আড্ডাখানায় চলে আয়। আমি আর জিদান খাবারগুলো রেডি করছি। প্লিজ, নাযীফের মতো অসহ্য দেরিটা করিস না। তাহলে আমরা আগালাম! সেলিমকে কল দিস।

কথাটা বলেই জিদান ও সোহানা চিরপরিচিত স্থানের দিকে অগ্রসর হল। এদিকে রোজা কথা কটা কানে নিলেও আজ ওর খাবারের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। গতরাতেও কিছু খায়নি। তৎসত্ত্বেও ক্ষুধার প্রতি পেট চোঁ চোঁ অবস্থা ওর একটুও হচ্ছে না। বারবার নিজের ফোনটার দিকে হন্য হয়ে দেখছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেষ্ঠা দু-তিনবার সন্দেহের চোখেও ব্যাপারটা লক্ষ করেছে। একবার তো বলেই বসেছিল,

  • কী দেখছিস? তুই কখন থেকে ফোনের ভেতর চোখ বিঁধিয়ে বসে আছিস? কিছু হয়েছে?
  • কিছু না। এমনি।

এভাবেই শ্রেষ্ঠার কথাকে ম্লান করে দিয়েছে রোজা। কিন্তু ওর যে গতরাত থেকে অস্থির বেচইন অবস্থা, তা কী করে ওদের জানাবে? সেই ঘটনাটার পর থেকে ওর নিজের মনটা বিকল আচরণ করছে। উদ্ভট উদ্ভট লাগছে নিজের সবকিছুকে। ও কী শ্রেষ্ঠাকে জানাবে ওর সমস্যাটা? বললে যদি এক তুড়িতেই সমাধান করে দেয়? ওর কাছে তো সমস্ত কিছুরই চমৎকার সমাধান থাকে! ব্যাপারটা চট করে মাথায় আসতেই শ্রেষ্ঠার দিকে ঘুরল রোজা। বুকে দম ভর্তি করে বেশ দুঃসাহসী গলায় বলল,

  • শ্রেষ্ঠা, আই নিড ইয়োর হেল্প। ক্যান ইয়্যু হিয়ার মাই প্রবলেম অ্যাণ্ড গিভ মি সাম অফ সলিউশন ফর দ্যাট?

হঠাৎ ইংরেজি বাক্যের প্রগল্ভ শুনে চকিতে মুখটা বাঁপাশে ফেরাল শ্রেষ্ঠা। নিজের সংলাপের কাগজটা মাঝামাঝি ভাঁজ করতেই রোজার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে চাইল। কিছু বলার জন্য প্রচণ্ড চঞ্চল দেখাচ্ছে চোখ। ঠোঁটের ওপর অস্থিরসূচক কাঁপন। শ্রেষ্ঠা একটা হাত রোজার হাতে রেখে অভয় সূচকে বলল,

  • কি হয়েছে বল? তোকে এমন টেন্সফুল দেখাচ্ছে কেন? কিছু যে একটা বলবি তা তো আমি শুরুতেই আঁচ করেছি। কিন্তু জোর দিয়ে কিছু জানতে চাইনি। বল, সমস্যাটার কথা এ টু জেড ডিফাইন ডিটেলসে বল।

বেশ নির্ভার, শান্ত, হালকা দেখাল রোজাকে। মনে হল সামান্য এই কথাতে ওর বুকের ওপর থেকে এক টন ওজনের পাথর সরে গেছে। ভারহীন ভেতরটা নিরস্ত অনুভব করলে রোজা ধাতস্থ গলায় জ্বলজ্বলে দীপ্ত চোখে বলল,

  • দেয়ার ইজ সামথিং রং। বাট আই ওয়ান্ট টু হেভ দেম। সামথিং ইজ রিয়েলি ডিট্যাচিং মি ফ্রম এভ্রিথিং হোয়াট আই লাভ। আই নো, আ’ম প্রিটেন্ডিং লাইক অ্যা সাসপিশিয়াস পার্সন, বাট সামথিং ইভেন মোর সাসপিশিয়াস ইজ হ্যাপিনিং এরাউন্ড আস। অ্যাণ্ড আই লাভ দ্যাট কাইণ্ড অফ ইউনিক থিংস হুইচ হ্যাজ নো বাউন্ডারি, নো রুলস, নো অ্যাটাচমেন্ট লাইন। দ্যাট পার্সন ইজ ফার বেটার দ্যান সেলিম অ্যাণ্ড বেটার দ্যান এনি টাইপ অফ ফেক ম্যান।

অনর্গল একটানা স্পষ্ট শুদ্ধ ইংরেজিতে বলে চলল রোজা। বলতে গিয়ে বড্ড বেশি হাপাতে শুরু করল। গলায় জোর দিয়ে ঢোক গিলল। চোখদুটো বারকয়েক বন্ধও করল নিজের অজ্ঞাতে। এদিকে শ্রেষ্ঠার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় ধড়ফড় করে শব্দ ছুঁড়ে মারছে। মনে হচ্ছে কানের বড্ড কাছে হৃৎপিণ্ডের চাবুক পেটানি চলছে। নিঃশব্দে নিজেও একটা শুকনো খরখরে ঢোক গিলে ও। রোজা নিজের ইতঃস্তত ভাবটা বহুকষ্টে কাটিয়ে নিচু গলায় ফের বলল,

  • ওই লোকটাকে আমার ভালো লাগে। সে নাকি আজ বিকেলে আমাদের ক্যাম্পাসে আসবে। জানার ওই অ্যাঙ্গেজমেন্ট আংটিটা খুঁজে পাওয়া গেছে। ওটা আজ দিয়ে যেতে আসবে।
  • তততুই. . ?
  • হ্যাঁ, শিয়োর। আসবে. . মানে এসেও হয়ত গেছে।

.

মঞ্চে উঠার পর থেকেই শ্রেষ্ঠাকে স্বাভাবিক দেখছে না শাওলিন। কেমন একটা ভীতিগ্রস্থ চলাফেরা, চিন্তিত ভারাক্রান্ত মুখ, উদভ্রান্ত অস্থির চোখ, কথার বলার সময়ও দু একটা শব্দ জড়তার ভঙ্গিতে আঁটকে যাচ্ছে। আগে এরকম বিচিত্র মূর্তি ওর বেলাতে কক্ষণো দেখেনি। বরং সবচেয়ে দুরন্ত ভঙ্গির চঞ্চলতা ওর ভেতরেই দেখেছে শাওলিন। মাইকটা ওর ডানহাতের ছোটো মুঠোতে আবদ্ধ, বাঁহাতে সংলাপ সম্বলিত একটি সাদা কাগজ। শ্রেষ্ঠা যে কেমন করে উদ্বিগ্ন চেহারায় ওর কাজটুকু সম্পণ্ণ করছে, তা-ই অল্প দূরত্বে লক্ষ করছে শাওলিন। কিন্তু এখন কিছু বলা বা জিজ্ঞেস করার মুহুর্ত নেই। দুজনের হাতে অনুষ্ঠান আরম্ভের দায়িত্ব এসে গেছে। মাইক হাতে সর্বপ্রথম বলে উঠল সকলের পরিচিত মুখ শ্রেষ্ঠা,

  • শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমণ্ডলী, সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, আমার প্রাণপ্রিয় সহপাঠীরা, সকলকে রোদেলা দুপুরে শুভেচ্ছা।

বেজায় করতালিতে শব্দময় হয়ে উঠল পরিবেশ। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল আনন্দ হুল্লোড়। দর্শক সারি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে আজ। সেদিকপানে দৃষ্টি রেখে মাইকটা ঠোঁট সংলগ্ন ধরল শাওলিন। চোখে বাকপটুত্বের দীপ্তি নিয়ে চমৎকার সম্ভ্রম স্বরে বলে উঠল,

  • আজকের এই বিশেষ দিনে, আমাদের প্রাণপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের পরিবার সমতুল্য মানুষদের সঙ্গে একত্র হয়েছি আমরা। আমরা একত্র হয়েছি আমাদের এই প্রতীক্ষিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে। আমি শেহজানা আলম শাওলিন। বায়োটেকনোলজি অ্যাণ্ড মলিকিউলার বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে। স্নাতক প্রথম বর্ষ।
  • আমি নূপুর ইসলাম শ্রেষ্ঠা। ডিপার্টমেন্ট অফ ফার্মাকোলজি, স্নাতকোত্তর প্রথম বর্ষ।

পুরো অনুষ্ঠান বর্ণিল আমেজে সরগরম হতে লাগল। দিগ্বিদিক এক খুশিয়াল মুহুর্তের প্রাণোচ্ছল আবেশ ছড়িয়ে পড়তে থাকল। শ্রেষ্ঠা মাইক হাতে বড্ড বেশি সংকোচ ও জড়তায় ভুগছিল, মনে মনে তীব্র আশঙ্কা করছিল হয়ত দু একটা বাক্য জিভে আঁটকা পড়বে। কিন্তু সেই অলুক্ষণে শঙ্কা একটু একটু করে দূরে ঝেটিয়ে দিল শাওলিন। ঠোঁটদুটোর কাছে মাইক রেখে এমন অপূর্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপন করল, ওর সেই মিষ্টি হাসিতে মুগ্ধ হল উপস্থিত দর্শকমহলও। ওর কাজল কালো চোখদুটো সমুখের প্রতিটি দর্শক-কোণে নজর ছুঁয়ে পুনরায় মাইকের কাছে ঠোঁট রেখে বলল,

  • সবার আগে থাকছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা। মঞ্চে আসছে একটি দলগত গান, যা আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে দিতে প্রস্তুত। করতালির মাধ্যমে তাদের স্বাগত জানাই।

প্রথম পর্বের দলগত গানের ঘোষণা দিয়ে পিছু হটে এল উপস্থাপকরা। ব্যাকস্টেজ নামক জায়গাটিতে পর্দার আড়ালে চলে গেল শাওলিন ও শ্রেষ্ঠা। তবে দুজন দুদিকে চলে যাওয়াতে সামান্য ব্যাঘাত ঘটল শ্রেষ্ঠার কাছে। এখন শাওলিনের যেতে হলে মঞ্চের পেছনটা ঘুরে অনেকখানি পথ হেঁটে যেতে হবে, নয়ত মঞ্চের ওপর দিয়েই ছুট দিতে হবে, যা সম্পূর্ণ হবে অশোভন। অন্যদিকে শাওলিন ডানদিকের অংশে পর্দার আড়ালে যেতেই কেউ একজন ওর দিকে ফোন বাড়িয়ে বলল,

  • জানা, কে যেন তোমাকে বারবার কল করছে। একটু ধরো তো। নামটা সেভ করা না। এজন্য আর ধরিনি।
  • কী বলছ? কখন থেকে দিচ্ছে? নাম সেভ করা না . .
  • হ্যাঁ, সেভ করা না। নাম্বারটা আননোন। কোনো নাম সেভ নেই। তুমি যখন শ্রেষ্ঠার কৌতুকের পরের অংশটা স্টেজে বলছিলে, ঠিক তখন থেকে ফোনটা বাজছে।
  • আচ্ছা ঠিক আছে, রূপন্তি। তোমাকে ধন্যবাদ খবরটা দিয়েছ। তুমি কী দুই মিনিট আমার স্ক্রিপ শিটটা ধরবে? আমি একটু বাইরে যেতাম। এখানে প্রচুর শব্দ . . কথা বললে শোনা যাবে না।
  • অবশ্যই জানা, থ্যাংকিউ আবার কীসের! তুমি যাও, আমি এদিকটা দেখে দিব।
  • ঠিক আছে রূপন্তি। আসছি আমি।

কথা বলতেই পেছনের সিঁড়ি কটা দিয়ে ধপধপ করে নেমে গেল শাওলিন। জায়গাটায় মাত্রাতিরিক্ত ভীড়। একক ও দলগত পরিবেশনায় শিক্ষার্থীদের একটা অংশে এখানে ঘুরাঘুরি করছে। তাদের ভীড় ঠেলে কিছুটা দূরে ও ফাঁকা অংশে চলে এলে এবার হাতের ফোনটা বের করল ও। নাম্বারটায় চট করে কলব্যাক করবে ঠিক এমন সময় কী একটা দেখে ওর বৃদ্ধাঙুল থমকে গেল। এই নাম্বারটা… এই নাম্বারটা তো . . ভাবনাটা স্থির হতে তড়িৎ বেগে আননোন নাম্বারটায় ডায়াল বসাল ও। কানে চেপে ধরতেই মুহুর্তমাত্র পেরোল না, তৎক্ষণাৎ কলটা রিসিভ হয়ে ওপাশ থেকে বজ্রগম্ভীর সুকঠোর গলাটা বেজে উঠল,

  • তুমি চমৎকার উপস্থাপনা করতে পারো। মাইক হাতে মখমলী হাসি . . চমৎকার।

মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ভয়ংকর ভাবে শিউরে উঠল শাওলিনের। ক’সেকেণ্ড কোনো কথা বলতে পারল না। ডান কানে চেপে রাখা ফোন ওদিক থেকেও নীরব, ওর উত্তরটা শোনার জন্য ভারিকণ্ঠের মালিক নিজেও চুপ করে আছে। শুধু শোনা যাচ্ছে অখণ্ড নৈঃশব্দ্যের ভেতর কারো ভারি নিঃশ্বাস। ফোনটা কী ঠোঁটের কাছে ধরে আছে? কানে না চেপে লাউড স্পিকারে রেখেছে? সহসা ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে সারামুখ রক্তিম হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ওর বেজায় অশান্ত। স্টেজের স্পষ্ট গলাটা কেমন বদলে গিয়ে এক অদ্ভুত ধীর গলা ফুটে উঠল,

  • আপনি সেদিন ফার্মগেট এসেছিলেন?

প্রশ্নটা কেন করল জানে না। কেন ওর মন এই প্রশ্নটায় ঝুঁকিয়ে দিল নিজেরও অজানা। কিছুটা সেকেণ্ড নিশ্চুপ থেকে ভারি গলাটা ওকে নির্ভার ভঙ্গিতে জানাল,

  • আমি এসেছিলাম। সেদিন সন্ধ্যে ছিল।

বুকের ভেতরটা মোচড় তুলে ওকে প্রচণ্ড রূপে বিবশ ব্যাকুল করে দিল। চোখদুটো ক্ষণিকের জন্য বন্ধ করে ফেলল শাওলিন। বুক ভর্তি করে দম টেনে ভীষণ শ্বাসরোধ অবস্থায় বলতে লাগল,

  • কেন এসেছিলেন?

ওপাশ থেকে আবারও নির্ভয়ী সুর,

  • তোমাকে একবার দেখতে।
  • কী দরকার তাতে?
  • দরকার বোঝো না এতে?

আর কোনো উত্তর এল না এপাশে। কানে ফোন চেপে তখনো শাওলিন নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে। চোখদুটি বন্ধ, বাঁহাতটা মুষ্টিবদ্ধ, ডানহাতটা কানের ওপর এমনভাবে ফোনটাকে চেপে ধরেছে যেন এর চেয়ে বিশেষ প্রিয় বস্তু আর কিচ্ছুটি নেই। এমন সময় স্টেজ থেকে শ্রেষ্ঠার পেশাদার কণ্ঠ শুনতে পেল, ওর নাম ধরে ক্রমাগত স্টেজে উপস্থিত হবার অনুরোধ জানিয়ে যাচ্ছে। চট করে অস্থির চোখদুটি পিছু ঘুরালে ডান কানে গলা খাকারির আওয়াজ পেল। পুনরায় সবটুকু ধ্যান ও মনোযোগ ফোনের দিকে বিদ্ধ হলে ওর নামটা ধরে সে-ই এবার ডেকে উঠল,

  • শাওলিন?
  • শুনছি।
  • স্টেজে ডাকছে?
  • জ্বী।
  • যেতে চাও?
  • যেতে হবে।
  • ধরো, স্টেজটা হচ্ছে তাহমিদ মর্তুজা। সেখানে তোমাকে ডাকা হচ্ছে। অন্যদিকে শোয়েব ফারশাদ। যে তোমাকে এক্ষুণি গেটের বাইরে আসতে বলছে। তুমি কাকে প্রায়োরিটি দিবে ইন এ শর্ট টাইম সিদ্ধান্ত নাও। সময় বেশ অল্প আমার। আমি খাগড়াছড়িতে আজই ব্যাক করব।

লক্ষভেদী তীড়ের মতো কথাগুলো ছুঁড়ল যেন। নিশানা বরাবর বিদ্ধ করল একেকটি বাক্যরূপী তীড়। শ্বাসরুদ্ধ করে স্থিরবৎ দাঁড়িয়ে রইল শাওলিন। একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না। শুধু ক্ষয়ে আসা মোমের মতো নিষ্প্রভ স্বরে বলে উঠল,

  • নামটা জানেন কীভাবে? আমি এটা—

টুট টুট টুট . . যান্ত্রিক শব্দগুলো একনাগাড়ে প্রত্যুত্তর ঘটাতে লাগল। কান থেকে ঝটিতি নামাল ফোন। দেখল কলটা কেটে গেছে। অন্যদিকে অদূর স্টেজ থেকে আরেকবার ডাকল ওকে। শ্রেষ্ঠার কণ্ঠের বদলে একজন ফ্যাকাল্টির গলা শোনা যাচ্ছে। ডীন স্যার। আস্তে করে একটা দুর্বল ঢোক গিলল। কী করবে ও? যাবে কোন্ মুখো? সময় কী আছে?

.

প্রান্তিক গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অফ হোয়াইট প্রাডো। শ্বেতাঙ্গীর মতো চকচক করছে গাড়িটির ধবল দেহ। ড্রাইভার আসনে গা এলিয়ে চোখদুটো বন্ধ করা শোয়েবের। প্রশস্ত কঠোর বুকের ওপর কালো সিটবেল্ট বাঁধা। গভীর ঘন নিঃশ্বাসের তালে ওঠা-নাম করছে সিটবেল্টটা, তার চেয়ে বেশি রূঢ়মূর্তি দেখাচ্ছে তার চোয়ালের প্রাবল্য। টানটান হয়ে আছে বলিষ্ঠ সুঠাম পেশিবহুল দীর্ঘাঙ্গ। সম্পূর্ণ দেহ ডার্ক নেভিব্লু ফর্মাল থ্রিস স্যুটে আবৃত আজ। মনে মনে হিসেব কষে চলেছে শোয়েব ফারশাদ। তার উর্বর মস্তিষ্ক খাপে খাপে গুণছে সেকেণ্ডের প্রতিটি ঘর। আঠারো মিনিট তেত্রিশ . . চৌত্রিশ . . পঁয়ত্রিশ . . হিসেবি ঘড়ির মতো চলছে তার ক্ষুরধার মগজ। আর এক মিনিট পচিঁশ সেকেণ্ড বাকি। এরপরই বিশ মিনিটের সীমা শেষ। সময় অতিক্রমের পর আর একমুহুর্ত সুযোগ নয়। গাড়িটা ইতোমধ্যে রাস্তা বরাবর নাক ঘুরিয়ে রেখেছে। বিশের ঘরে এলেই স্টিয়ারিং ঘুরাতে শুরু করবে তার দক্ষ হাত। ইঞ্চিন চালু প্রথমেই। খরচ হচ্ছে ফুয়েল। হোক, পরোয়া করছে না। শুধু ও আসুক! একবার আসুক! বিশ মিনিটের এই শেষ মিনিটে চলে আসুক ও! কিন্তু তার গণনাকার্য শেষের দিকে। . . পাঁচ . . চার . . তিন . . দুই . . এবং . . এক। চশমাধারী চোখদুটো খুলে গেল। দৃষ্টি দিয়ে শেষবারের মতো দূরের গেটটা দেখছে। ডানহাতটা বজ্রমুঠো করে খামচে ধরেছে স্টিয়ারি, হাতের সবকটা সবুজ রগ ফুটে ওঠেছে। তখনো গেটটার দিকে স্থির তার চোখ, ডান ভ্রুঁয়ের ওপর সেদিনের কাঁটা চিহ্ন, চোয়ালে রাগ সর্বস্ব ছাপ। ভীতিকর! যার আশাতে বিশটি মিনিট খরচ করেছে, তার চিহ্নমাত্র কোথাও নেই। দৃষ্টিটা আস্তে করে সরিয়ে সমুখের রাস্তার পানে মনোযোগ দিল শোয়েব। এক্সেলেটরে যেই পায়ের চাপটা বাড়াতে গেল, ঠিক তখনি ঠক্ ঠক্ করে মৃদু আওয়াজ ফুটে ওঠল। কেউ যেন কাঁচের গায়ে আঙুলের টোকা দিচ্ছে। মুখ গম্ভীর করে শব্দ উৎসের দিকে তাকাল শোয়েব, বাঁদিকে চোখ ঘুরাতেই সময় থমকানোর মতো সবকিছু স্থির হয়ে গেল। সময় ও কালের মাঝখানে যেন আঁটকা পড়ল গতি। একটা মুহুর্ত দোলাচলে ফাঁসল শোয়েব। জড়বৎ পাথর মূর্তি হয়ে রইল সে। তার ধারালো মুখ, ক্রোধ মিশ্র চাহনি, হাতের বলিষ্ঠ বলয় সমস্তই কেমন ঢিল পড়তে লাগল। স্টিয়ারিং থেকে খামচানো হাত সরে গেল অজান্তে। বাঁদিকের আনলক দরজাটা খুলে প্রবেশ করেছে কেউ একজন। সমস্ত গাড়িতে ছড়িয়ে দিয়েছে তার মিষ্টি মেয়েলি সৌরভ। অভিভূত মূর্তি করে দিয়েছে গাড়ির মালিক পুরুষকেও। জোরে জোরে মাথা নুয়ে হাঁপাচ্ছে সেই রমণী। একহাত দিয়ে কোনোমতে খোলা দরজাটা ধপ করে বন্ধ করে। গাড়ির এসিতেও সংকুলান হচ্ছে না দুরবস্থা। থরথর করে কাঁপছে কোমল হাতদুটো। সারা চেহারায় দৌড়ে আসার প্রকট ছাপ। নিঃশ্বাসে ভয়ংকর টান, ফুসফুস ভর্তি করে অক্সিজেনটুকু শুষে নিতে তৎপর। তেমনি দুর্বল গলায় আস্তে করে বলল,

  • পানি!

ডান হাতের উলটোপিঠে মুছে নিল কপালের ডানদিক। ঘামে ভেজা ভাবটুকু কবজি ঢাকা ব্লাউজের হাতায় শুষে গেল। চোখ বন্ধ করে সিটের হেডরেস্টে মাথাটা ছেড়ে দিল শাওলিন। ওর সেই বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে এসিটা তুলনামূলক বাড়িয়ে দিল শোয়েব। গাড়ির এক জায়গা থেকে পানির বোতলটা বের করল। কিন্তু ওর হাতে তুলে দিতে গিয়ে সামান্য বিব্রত মুখে থমকাল। এটা অক্ষত বোতল নয়। ক্যাপটা খুলে পানি খাওয়া হয়েছে। তার ঠোঁট বোতলের মুখ ছুঁয়েছে। ও কী এই পানিটা পান করবে? এদিকে পানির তেষ্টায় হাহাকার শাওলিন ছোঁ মেরে বোতলটা একদম ছিনিয়েই নিল। ক্যাপটা খুলতেই ওর ঠোঁটদুটো চেপে ধরল বোতলের মুখ। অবশিষ্ট পানিটুকু ঢকঢক করে সাবাড় করল শাওলিন। শূন্য বোতলটা যখন ফিরিয়ে দিল, তখন পাশের মানুষটা ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বহুক্ষণ পর গাড়ির নিস্তরঙ্গ নীরবতাকে ভঙ্গ করল মানুষটা। তার কর্তৃত্ব মাখানো স্বরটা আজও বজ্রস্বরে ফুটল, বদ্ধ গাড়ির ভেতর কেমন গর্জনরূপে শোনাল,

  • কনফার্ম করো। তুমি কি এখন ঠিক আছ?

চমকে বন্ধ চোখদুটো খুলে গেল ঠিকই , কিন্তু সাথে সাথে ডানদিকে চোখ ফেরাল না। কিছুটা সেকেণ্ড নিজের সাথে বোঝাপড়া করে সন্তর্পণে ধীরে ধীরে ডানে তাকায় শেহজানা। ওর এই নামটা কোনোদিন এই লোকটা ঠোঁটে আনলো না। এখনো না। অথচ প্রথম সাক্ষাতে ওর বন্ধুসঙ্গীরা ‘শেহজানা আলম’ এবং সংক্ষিপ্ত নাম ‘ জানা’ জানিয়েছে। লোকটা সরাসরি ওর চোখের তারায় চেয়ে আছে। যেন ওই তারাদুটো তার কাছেই সব কথা জানিয়ে দিচ্ছে। ওর চোখ তার চোখে জবাব ব্যক্ত করছে। ওর নিজের বলতে যেন এখানে কিছু নেই। সেই নিশ্চল ভঙ্গিতেই আরেকবার প্রশ্নটা করে উঠল শোয়েব,

  • ঠিক আছ নাকি না ?

অস্থির নিঃশ্বাসে তখনো আসেনি শিথিলতা। হাতে ঝিম ধরা অনুভূতি। আয়রন শূন্যতার প্রভাব। মাথাটা খানিকট ভার ভার লাগছে। তবু সেই মাথাটা ধীরভাবে উপর-নিচ দুবার নাড়িয়ে দিল সে, বুঝিয়ে দিল, ঠিক আছে একদম। ওর উত্তর পাবার পরও ঝাড়া পাঁচটা সেকেণ্ড একদম পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকল শোয়েব। ওই চোখদুটো যেন ভয়ংকর লাই ডিটেক্টের মতো ওর সত্য-মিথ্যা যাচাই করছে। ক্ষণিকের জন্য শাওলিন নিজেও কিছুটা শিউরে উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু পরক্ষণে নিজেই সে দৃষ্টিজোড়া সরিয়ে নিল শোয়েব। গাড়িটা স্টার্ট দেবার আগে একবার ওর দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,

  • মানুষের কাছে মিথ্যা বলা যায়, অমানুষের কাছে না। আমি হচ্ছি অমানুষ। তুমি সেই অমানুষকে খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকায় টেনে এনেছ।কাজেই যা জানতে চাইব সেটার মিথ্যা বলতে যেয়ো না। সিটবেল্ট বেঁধে নাও।

চারপাশ ভয়ংকর অন্ধকার। ঝিরঝির করে বৃষ্টিফোঁটা পড়ছে। গাড়ির কাঁচ ঘোলাটে হয়ে আসছে। বাইরে ঠিক তখুনি এফোঁড় ওফোঁড় করে আকাশটা চিঁড়ে গেল, তৎক্ষণাৎ দিনের আলোয় ফরসাটে হল চারধার। সেই ক্ষণিকের আলোয় স্থির মুখটা দমবন্ধ করে দেখল শাওলিন। তার উজ্জ্বল নীল চোখদুটো ওকে অসন্তুষ্টি বোঝাচ্ছে। যেন একটু আগে বলা হালকা ধাঁচের মিথ্যাটাও সে পছন্দ করতে পারছে না। ওই চোখদুটো একবার নিচের দিকে নিবদ্ধ হল, শাওলিন সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের পায়ের দিকে লক্ষ করল। কলটা কাটার পর একটা সেকেণ্ডও ব্যয় করেনি। শ্রেষ্ঠাকে ‘একটা জরুরি কাজ’ লিখে ম্যাসেজ পাঠিয়ে অমনেই ছুট দিয়েছিল। হিলজুতোর দরুন পায়ের সর্বকণিষ্ঠ আঙুলটায় ফোসকা দেখা যাচ্ছে। জুতা থেকে ডান পা’টা বের করে রেখেছিল। বারবার ঘষা না লাগার জন্য। কিন্তু কোন্ ফাঁকে যে আরেকজনের চোখে পড়ে গেছে, তা নিজেও জানে না ও। ঈগলের পাশে যেন বসে আছে এখন। একটা কিছু চোখ এড়ায় না!

.

বুকের ওপর সিটবেল্ট বেঁধে চুপচাপ বসে আছে শাওলিন। গাড়িটা কলাবাগানের অভিমুখে ছুটছে। বাইরে ঝুম বৃষ্টির প্রাবল্য। এসির ঠাণ্ডাটা গায়ে শীতালু পরশ ছড়িয়ে দিচ্ছে। গাঢ় নীল আঁচলটা বাঁপাশ থেকে পিঠময় টেনে ডানপাশে এনে রাখল। অবশিষ্ট বাড়তি আঁচলটুকুতে ঢেকে নিয়েছে দুহাত। জানালার বাইরে স্নানরত শহরের ভেজা ভেজা দৃশ্য দেখছে, এমন সময় এসির ঠাণ্ডাটা কমে যেতেই পাশ ফিরে তাকাল শাওলিন। দেখল ডানহাতে স্টিয়ারিং সামলে বাঁহাতে এসির পাওয়ারটা বন্ধ করে দিচ্ছে ভদ্রলোক। ওর চোখে চোখাচোখি হতেই বিদ্যুৎ চমকের মতো প্রচণ্ড চমকে চোখ সরিয়ে নিল শাওলিন। পুনরায় জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলে শীতল স্বরটা ওর কর্ণধার ছুঁয়ে বলল,

  • তুমি আজ শাড়ি পরে আছ। কিন্তু আমার ইচ্ছে, তুমি আমার সামনেই শুধু শাড়ি পরো।

কথাটা শুনতেই প্রচণ্ড শিউরে চোখদুটো খিঁচিয়ে ফেলল শাওলিন। কর্ণকুহর পর্যন্ত ঝিমঝিম করছে ওর। বুকের ঠিক কোনখানটায় বিদ্ধ করেছে তা অস্ফুট স্বরে উচ্চারণও করতে পারল না। জানালার কাঁচে চোখবন্ধ রক্তিম চেহারাটা ফুটে ওঠেছে। দুহাত নীল আঁচলের তলায় মুঠো। সেই জানালার দিকে কপট ক্ষোভে আবার বলে উঠল শোয়েব,

  • ওই জানালার কাঁচ ঠিক মর্তুজার মতো। আজ আচরণটাও ঠিক সেরকম। তোমার লজ্জারাঙা মুখ আমিই দেখতে পাচ্ছি না।

.

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply