Golpo থ্রিলার গল্প বজ্রমেঘ

বজ্রমেঘ পর্ব ২২


বজ্রমেঘ . ❤

পর্বসংখ্যা_২২ .

ফাবিয়াহ্_মমো .

পায়ের গোড়ালিতে মলম মাখাচ্ছে তাহমিদ। জায়গাটা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। গতকাল যে কাণ্ডটা ঘটিয়েছে শাওলিন, এরপর আর নিজেকে দমন করা যাচ্ছে না। বারবার স্মরণে ভাসছে ওই রাগারুণ মুখ। চোখে টলমল করতে থাকা অশ্রু, ঠোঁটদ্বয়ে তেজের বিচ্ছুরণ। কেমন অগ্নিবর্ণ চেহারায় একঝলক স্থির ছিল ওই মেয়েটা, যেন ওই শরীরে তাহমিদের স্পর্শ একেবারেই গ্রাহ্য করতে পারছে না। এতো ক্ষোভ, এতো ক্রোধ, এতো জেদিভাব কেন? কী জন্য? এক মুহুর্তের জন্য নিজেও বেশ খানিকটা ভড়কে গিয়েছিল তাহমিদ। বহু প্রশ্ন তাকে চিন্তাবিদ্ধ করেছিল। দুদিন পর ওরই কবুল বলা বউ হবে। ওর সবকিছুতে থাকবে একমাত্র তার আধিপত্য। অথচ ও হাতটা পর্যন্ত ছুঁতে দিতে নারাজ! ওর এই দূর্ব্যবহারটা আগের চাইতে কেমন বেড়েছে না? কেমন যেন একটা আগ্রাসী তেজ ফুটেছে না? আচ্ছা আগে তো এমন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার স্পর্ধা দেখাতো না। এমন আগুন ঝরা দৃষ্টি দিয়ে নিজের কাছ থেকে দূর দূর বোঝাতো না। কিছু একটা অতি সুক্ষ্মভাবে পরিবর্তন ঘটেছে। ওর ভেতরে যে দিকগুলো নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল, এখন সেগুলোতে সন্দেহের গন্ধ পাচ্ছে। কাল ওর চোখে ভীষণ অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ করেছে। ওই ডাগর চোখদুটো কেমন উদভ্রান্ত, অস্থির। কোনোকিছুর প্রতি নিজের অজান্তেই উন্মুখ চঞ্চল ব্যাকুল হয়ে আছে। অন্যসময় ওর চোখের দিকে তাকালে রাগ, ক্ষোভ, বিরক্তি মাখানো একটা ছটা দেখা যেত। কাল মনে হয়েছে কোনোকিছুর প্রতি ওর মনটা ব্যতিব্যস্ত। হঠাৎ একটা চিন্তা বিদ্যুতের মতো চমক দিয়ে উঠতেই সচকিত হল তাহমিদ। দ্রুত ডেস্ক থেকে মোবাইল ফোনটা তুলে একটা জরুরি কল করল সে। ওপাশ থেকে দুবার টুট টুট শব্দ হতেই রিসিভের সাড়া পেল তাহমিদ। তীব্র উত্তেজনায় প্রশ্ন ছিঁটকে বেরোল,

  • হ্যালো? . . হ্যাঁ, ভালো। আদনান, অ্যান্টনি ওরা আছে?

ওপাশ থেকে অধঃস্তন কর্মী জুয়েল পেশাদার কণ্ঠে বলল,

  • না স্যার, রিপোর্ট সাবমিটের জন্য থার্ড ফ্লোরে গেছেন। কোনো দরকার স্যার?
  • হ্যাঁ দরকার। শোনো, একটা আর্জেন্ট হেল্প দরকার আমার। হেল্পটা এখুনি শুরু করা চাই। সব কাজ সাইডে ফেলে যেটা বলছি সেটা করো।
  • ওকে স্যার। আপনি বলুন। ইন টাইম কাজ হয়ে যাবে।
  • একটা বিষয় খেয়াল রাখবে জুয়েল। এই কাজটার কোনো ডাটাবেজ রাখার দরকার নেই। একটা নাম্বার পাঠাচ্ছি, আর সঙ্গে কিছু ইনফরমেশন। এই ফোনটার সম্পূর্ণ একসেস ক্র‍্যাক করো।
  • অ্যাকসেপ্টেড স্যার। করে দিচ্ছি।

কথাটা বলতেই ওপাশ থেকে তড়িৎ গতিতে কিবোর্ডের ওপর খটাখট ঝড় তুলে দিয়েছে। সাইবার সাইটে ওর কাজের দূরদর্শিতা প্রচণ্ড তুখোড়। তুড়ি বাজাতেই ছেলেটা বড়ো বড়ো কঠিন সাইটে অ্যাকসেস নিতে পারে। সেক্ষেত্রে তাহমিদ কিছুটা নির্ভয়চিত্ত। কলটা কিছুক্ষণের জন্য কেটে ওয়াশরুমে গিয়েছে তাহমিদ। মলম দেয়া হাতটা ধুয়ে ফেলা জরুরি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে টাওয়েলে হাত মুছতে মুছতে হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। ঠোঁটের কোণে তেরছা হাসি ঝুলিয়ে ডেষ্ক থেকে ফোনটা নিয়ে কানে ধরল। মুখভরা প্রফুল্ল হাসির ছটা মাখিয়ে সাড়াটা দেয় তাহমিদ, অমনি ওপাশ থেকে ভয়ংকর একটা কথা শুনে সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। মাথার চুল থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ঝিমঝিম ঝংকার টের পেল তাহমিদ। সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা কান বদল করে দাঁতে দাঁত খিচিয়ে বীভৎস হুঙ্কার দিয়ে চ্যাঁচাল,

  • কীভাবে হলো . . কী-ভা-বে সম্ভব! আমাকে এক্ষুণি এই ঘটনার ডিটেলস পাঠাও! একসেকেণ্ডও দেরি করবা না জুয়েল। নইলে আমি তোমার চাকরি খেয়ে দিব!

ওপাশ থেকে প্রচণ্ড দিশেহারা হল জুয়েল। নিজেও একপ্রস্থ অবাক, সর্বোচ্চ সীমায় বাকরুদ্ধ। সাইবারের দুনিয়ায় এ যেন চূড়ান্ত আশ্চর্য ঘটে আছে! বসের অমন কথা শুনে সংবিৎ ফিরে পাবার মতো ঝাকুনি খেল জুয়েল। দ্রুত নিজের চাকরি বাঁচাতে হুঁশে এসে বলল,

  • আমি. . আমি দেখছি স্যার। কিন্তু এরকম কেস কোনোদিন ঘটেনি! আমার হাতে কঠিন থেকে কঠিন সিস্টেম কানাগলি দিয়ে ক্র‍্যাক হয়েছে। কিন্তু এটা অলরেডিই সিজড্! পুরো সিস্টেম অন্যের হাতে স্যার!

কণ্ঠে তরতর করে বেড়ে উঠছে বিস্ময়ের পারদ। কানে ফোন এঁটে বসকে বোঝানোর চেষ্টা করছে সে। কিন্তু তাহমিদ মর্তুজা কতটুকু বুঝতে পারছে তা নিয়ে শঙ্কায় আছে জুয়েল। এটাকে সাইবার সাইটের দিক থেকে এক্সক্লুসিভ কন্ট্রোল হিসেবে ধরে। যেখানে একবার কেউ সিস্টেম ক্র‍্যাক করলে, আর কেউ অ্যাকসেস নিতে পারবে না। এমন সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হল অ্যান্টনি আজাদ। কিছু গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট তৃতীয় তলায় পৌঁছে দিয়ে সে সবে এসেছে জুয়েলের কাছে। মনিটরের দূর্বোধ্য বিষয় বুঝতে না পেরে সে হতভম্ব জুয়েলের দিকে তাকিয়েছে। কপালের সমান অবস্থা তৎক্ষণাৎ কুঁচকে মনিটরে চোখ ফেরায় সে। ঠিক তখনি সমস্ত শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে কাঁপন টের পেল অ্যান্টনি। জুয়েলের ফোনটা থাবা দিয়ে ছিনিয়ে দ্রুত নিজের কানে চেপে বলল,

  • তাহমিদ ভাই, এটা তো শাওলিন ম্যামের নাম্বার! উনার ডিভাইস!

ওপাশ থেকে চিন্তায় জর্জরিত তাহমিদ। অ্যান্টনি গলা শুনেও কিছু বলল না। নিচের ঠোঁটে তীব্ররূপে দাঁতে চেপে ধরেছে, আরেকটু হলে ঠোঁট কেটে রক্ত বেরোবে। তাহমিদ দুবার হাঁপানি রোগের মতো দম টেনে ফুসফুস ভর্তি করল। বাঁ কানে ফোন চেপে চোখ বন্ধ করে নিজেকে স্থিরতায় এনে বলল,

  • ব্যাকফায়ার করে দিবে এটা আমি বুঝতেই পারিনি। মনে হচ্ছে আমি ওর বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি। ও আমার পার্সোনাল লাইফের প্রাইভেসি পর্যন্ত তছনছ করে দিয়েছে। আর এদিকে আমি খবরও পাইনি!

কথাগুলো অ্যান্টনিকে বলল নাকি নিজেকে, ঠিক বোঝা গেল না। অ্যান্টনি ফোনটা লাউড স্পিকারে দিয়ে রেখেছে। পুরো অফিস এখন ফাঁকাই বলা চলে। কর্মীরা ব্রেক নিয়ে নিজেদের মতো বাইরে আছে। জুয়েলের দিকে তাকিয়ে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে প্রশ্নটা করল অ্যান্টনি,

  • তুই কী সিস্টেমটাতে ডাবল অ্যাক্সেস নিতে পারবি না?

জুয়েল এবার চরম ব্যর্থতায় হাপিত্যেশ সুরে বলল,

  • এটা সম্ভবই না অ্যান্টনি ভাই। এখানে এক্সক্লুসিভ কন্ট্রোল নিয়ে রেখেছে। যেটা একেবারেই অবিশ্বাস্য! আপনি অন্যদের জিজ্ঞেস করেন, তারাও একই উত্তর দিবে। যে ব্যক্তি এই সিস্টেমে ঢুকেছে, পুরো রুট সিজড্ করে দিয়েছে। যেন আর কেউই অ্যাক্সেস নিতে না পারুক। এমন জব্বর কাজ মামুলি ব্যক্তির না ভাই। প্রচণ্ড ডেঞ্জারাস লোকের কাজ। তার কাছে এমন ক্ষমতাও আছে, সে চাইলে আমাদের পুরো ইউনিটের ডাটাবেজ লক করে দিতে পারবে। এবার বাকিটা বুঝে নেন। আমরা নিজেরাই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছি। কেউ খুব বড়ো ধরণের ষড়যন্ত্র করেছে ভাই।

জুয়েলের কথার ঠিক পরপরই অ্যান্টনির কলটা বেজে উঠল। প্যান্টের পকেট থেকে বস্তুটা বের করতেই আরেক সহকর্মী মোস্তফার কল। কানে চাপতেই মোস্তফার উদ্বিগ্ন গলা অ্যান্টনিকে ভয়ের মধ্যে ডুবিয়ে দিল,

  • কী ব্যাপার অ্যান্টনি? সিস্টেমে অ্যালার্ট স্টেট দিচ্ছে কেন? তোমরা উপরতলায় কার সিস্টেমে ক্র‍্যাক চালাচ্ছ?

মোস্তফার কথা শেষ হতে দেরি, তখুনি ঘটনাটা হুবহু ঘটতে দেখে অ্যান্টনি। জুয়েলের সামনে থাকা মনিটর লাল রঙের ঝলকানিতে ‘Alert State’ দেখাচ্ছে। বারবার সিস্টেমের ঝুঁকিপূর্ণ হবার বিষয়ে সংকেত ছুঁড়ছে। অবস্থাটা গলা কাঁটা মুরগির মতো ভয়ংকর দশায় পরিণত হল। মোস্তফাকে কোনোমতে বুঝিয়ে কলটা কেটে এক চিৎকার দিয়ে উঠল অ্যান্টনি, তাড়াতাড়ি ওই সিস্টেমে সবকিছু স্থগিত করার গর্জন ছুঁড়ে বলল,

  • জুয়েল, কুইক! আমাদের সিস্টেম রেড অ্যালার্টে চলে গেছে! তাড়াতাড়ি হাত চালা! দ্রুত পুরো সিস্টেম বন্ধ কর!
  • করছি ভাই!

পুরো পরিবেশ মুহুর্তের ভেতর ভয়ংকর হয়ে উঠল। টানটান উত্তেজনায় নিশ্বাস আঁটকে যাচ্ছিল! কেউ কোনো কথা বলতে পারছিল না! জুয়েলের হাত তুফানি ঝড়ের মতো ছুটছে। মনিটরের স্ক্রিনজুড়ে দূর্বোধ্য ভাষায় সারি সারি ক্ষুদে লেখা উপরের দিকে উঠছে। অ্যান্টনি দুহাতের মুঠি পাকিয়ে জুয়েলের মতো মনিটর স্ক্রিনে চোখ এঁটে রেখেছে। কয়েক সেকেণ্ডের ব্যবধানে লাল ঝলকানি থেমে গেল হঠাৎ। বুকের ওপর থেকে এক টনের পাথরটা যেন হঠাৎ সরে গেল। ঠোঁট গোল করে অবরুদ্ধ শ্বাসটা স্বস্তিতে ছাড়ল অ্যান্টনি। জুয়েল কিবোর্ড ছেড়ে চেয়ারের পেছনে মাথা হেলিয়ে দিয়েছে। দুচোখ বন্ধ। অনগোয়িং চলতে থাকা কলটা তখনো সক্রিয়। দুজনই তখন বিদঘুটে গলায় কারো গলা ফাটানো গর্জন শুনতে পেল,

  • শূ… বা চ্চা! তোর নাম পরিচয় যেদিন উদ্ধার করব, সেদিন তোর রূহ পর্যন্ত মৃত্যুভিক্ষায় কাতরে উঠবে! আমার চার বছরের সাধনা যদি না তুলি আমি, তাহলে আমিও তাহমিদ মর্তুজা না। শা লা, শূ.. !

.

শান্ত, বিচক্ষণ, ধীমতি। এমন সব বিশেষণ শুনে আসছেন তিনি। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্য ছুঁয়েছেন রেবেকা নেওয়াজ। নিজের জীবনকে তৎপর করেছেন এতো বেগতিকভাবে। বিধবা হিসেবে যেটুকু অবমাননা সমাজ তাকে দিতে চেয়েছিল, তার চেয়ে বহুগুণ জবাব নিজের কাজ দ্বারা বুঝিয়ে দিয়েছে রেবেকা। নিজেকে কখনো ঠুনকো, রিক্ত, অকর্মণ্য প্রমাণ করেননি। আজও স্মৃতিতে ভাসে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই গুরুত্বপূর্ণ দিনটির কথা। বুকের ভেতরটা সহসা মোচড়ে ওঠে আচমকা। উনার বুদ্ধিদীপ্ত চোখদুটো হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যায় ঘন জালের মতো কুয়াশায়। চোখের কোণ থেকে টপ টপ করে অনুভব করেন তপ্তবর্ষার অস্তিত্ব। কাঁপতে থাকা ডানহাত দিয়ে চশমাটা খুলে নেন চোখ থেকে, অপর হাতটা দিয়ে সেভাবেই চোখদুটো মুছে নেন। যদিও লাভ এতে হয় না। স্বনামধণ্য এক সম্ভ্রান্ত বংশের যৌথপরিবারে বড়ো হয়েছেন রেবেকা মর্তুজা। ছোটো থেকেই ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী এবং প্রতিভাসম্পণ্ণ। পুরান ঢাকার নাজিরাবাদ এলাকায় শৈশব কাটালেও পরবর্তীতে ঢাকা ছেড়ে বেড়ে ওঠেন গাজীপুরের শ্রীপুরে। জেঠা, বাবা ও দু চাচার যৌথ ভ্রাতৃত্বের অটুট বন্ধনে পারিবারিক আবাস হয় শেষপর্যন্ত শ্রীপুর। যে বাবা-মাকে প্রচণ্ড বেশি ভালোবাসতেন রেবেকা, একদিন তাদেরই দিলেন জীবনের ভয়ংকরতম দুঃখ। ইজিচেয়ারে ধীরভাবে দোল খেতে খেতে স্মরণ করলেন সেই যুবকের স্মৃতিকথা, যাকে আজও অকাতর চিত্তে সম্মান করেন রেবেকা। মানুষটি শাহনেওয়াজ আলম শায়খ। যার কথা, যার হাসি, যার ব্যক্তিত্ব, যার চিন্তাধারা, যার স্বতঃস্ফূর্ত নিখুঁত কর্ম প্রত্যেকটি মানুষকে শুধু আশ্চর্য করে দিতো। তার ব্যক্তিত্বের প্রবল রেশ রেখে যেতো কারো কারো বুকের কোণে। এখনো মনে আছে সেই দিনটির কথা, যেদিন শায়খ সম্পূর্ণ অন্য মানুষ হয়ে কড়া কড়া কথা বলেছিল। কাজ পাগল ওই মানুষটি কেমন গম্ভীর স্বরে কথাটা বলেছিল, তা আজও ভোলেনি রেবেকা। জেদপ্রবণ আজ্ঞা ছুঁড়ে বলেছিল শাহনেওয়াজ আলম,

  • তুমি যদি চাও, তোমার বাবাকে আরেকবার বোঝাতে যাব। কিন্তু বারবার এভাবে আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে যাব না। আমার পরিবারকে চূড়ান্ত অপদস্থ করার ব্যাপারটা আর নেব না। তুমি আমাকে সরাসরি বলো রেবা, আমার সঙ্গে বাকি জীবন কাটাতে রাজি আছ? আমার একটা বোন আছে। ও খুবই ছোটো। আমার মা-টা নেই। আমি এই স্মৃতি মনে করতে চাচ্ছি না। জোহরা আন্টি যদি না থাকতেন, আমরা দু ভাইবোন কোথায় ভেসে যেতাম জানি না। আমাদের কেউ নেই। দাদাবাড়ি থেকেও তা না থাকা। নানাবাড়িতে নানা মারা যাবার পর মামারা আমাদের দেখেন না। বলা বাহুল্য, মামারা আজ সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। নানী মামাদের ওপর নির্ভর। দু মুঠো অন্নের জন্য মুখ বুজে সহ্য করছেন। চাইলেও কিছু বলতে পারেন না আমাদের অবস্থা দেখে। চর্তুদিক থেকে বাঁধা পেয়ে আমাদের সবকিছু চলছে। আমি কলেজজীবন থেকে টিউশনি করে অভ্যস্ত, এটা তো আগে থেকেই জানো। এখন যদিও ভালো একটা পর্যায়ে নিজেকে দাঁড় করাতে পেরেছি, কিন্তু তোমার পরিবার আমার পরিবারের ব্যাকগ্রাউণ্ড জেনে সামনে এগোতে চাচ্ছে না। তারা রীতিমতো ভয় পাচ্ছে। তোমার নিরাপত্তা নিয়ে প্রচণ্ড আশঙ্কায় ভুগছে। জানি, আমার বাবার জন্য বিষয়গুলো আজও খুব জটিল। কিন্তু এতে আমার তো দোষ নেই? নাকি দোষ আছে রেবা? কথা বলো! আজ চুপ করে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করবে না।

শায়খের যুক্তিপূর্ণ কথার ঘায়ে চুপ করে থাকে রেবেকা। লজ্জায় মাথা নিচু, চোখে টলমল করছে দুর্বিনীত অশ্রু। অশ্রুতে মাখো মাখো একজোড়া চোখ ক’হাত দূরে সটান দাঁড়ানো যুবকটির পানে তাকায়। সেই যুবক তখন ক্রোধে থমথম করছে, দুহাত তার বুকের ওপর ভাঁজ করা। কার্জন হল সংলগ্ন একটি ছায়াঘেরা বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে আছে শায়খ। অটলভাবে দূরের দৃশ্যপট, সুনিবিড় নির্জনতা দেখছে সে। পরণে পরিপাটি ধোপদুরস্ত পোশাক। রেবেকা জানে, পরণের কাপড়চোপড় সবটাই নিজের হাতে ধুয়ে রাখে শায়খ। ছোটো বোনটাকে তেমনি আদর-যত্ন দিয়ে পিতার মতো আগলে রাখছে। রান্নার রসদটুকু, বাজার করাটুকু, পেশাগত কাজটুকু, বোনের পড়াশোনা, বাড়িটা দেখাশোনা, যাবতীয় সব কাজ দক্ষহাতে সম্পণ্ণ করছে শায়খ। নিজের জীবনটাকে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে তুলছে যেন আগামী দিনের পথচলা সুদৃঢ় হোক। এই কাজ-পাগল, অসহ্য, নীরবঘাতক লোকটাকে ভালোবেসে ফেলা ছাড়া আর কি উপায় আছে! লোকটার ওই পৌরুষ বুকের ভেতর বিশাল একটা মন যে আছে! একটা সৎ, দৃঢ়, পরিপূর্ণতায় ছাওয়া মন। যে মন প্রতিটি নারীর কাছেই বহুল প্রিয়। রেবেকা গলার রুদ্ধ কান্নাটুকু গিলে নিয়ে কণ্ঠে মলিনভাব ছুঁয়ে বলল,

  • আমি কী বাবার কাছ থেকে চলে আসব? তুমি কী তাই চাচ্ছ?
  • আমি তোমাকে জোর করছি না রেবা!

সাথে সাথে দূরের দৃশ্যপট থেকে মুখ ফেরাল শায়খ। তাকাল অগ্নিঝরা দৃষ্টিতে, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মেজাজে। বলতে শুরু করল এতোদিনের সমস্ত ঝঞ্ঝাট, যা এতোদিন মুখ বুজে স্রেফ সহ্য করেছে শায়খ।

  • আমি তোমাকে আজও জোর করছি না। কিন্তু পরিস্থিতি এখন সেরকমই দাঁড়িয়েছে, যা তোমার পছন্দ হচ্ছে না রেবা। আমি তোমার বাবার কাছে কতবার প্রস্তাব পাঠিয়ে অপমানিত হব, বলো? এই অপমান কীসের জন্য? আমার চরিত্র খারাপ, নাকি আমি বেকার? উনি কোনোকিছু বাছ-বিবেচনা না করেই অন্যের কথায় আমাকে নাকোচ করে দিচ্ছেন। আমাকে ভয়ংকর ভাষায় অন্যায় অপদস্থ করে যাচ্ছেন। এমন নয়, আমি তোমাকে অবৈধভাবে কোনোদিন চেয়েছি। শরিয়ত মতে, যেভাবে তুমি আমার জীবনসঙ্গী হয়ে থাকতে পারো, তোমাকে আমি সেভাবেই চেয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে তোমার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়ে দিয়েছি রেবা।

বুকে ভাঁজ করা দৃঢ় হাতদুটো সপাটে আলগা করল শায়খ। উত্তপ্ত ক্রোধের নিঃশ্বাসে একবার ফুলে উঠল নাকের অগ্র। নিজের অক্ষমতা যদি কর্মহীন, উচ্ছৃঙ্খল, বেকার যুবকের শ্রেণিতে পড়তো, তবে ব্যাপারটা একহিসেবে মানা যেতো। কিন্তু সম্পূর্ণ পাড়া-পড়শি আর কিছু ওত পেতে থাকা জনদরদী সাধুদের কথা শুনে তাকে নাকোচ? তাকে ছোটোলোক, নির্লজ্জ, রক্তের ঠিক নেই এসব বলে বিষাক্ত অপমান? এটা কী সত্যিই বিবেক মতে ভদ্র আচরণ? শায়খ কথা বলল না কিছুক্ষণ। মাটির দিকে চোখ রেখে দুদণ্ড নীরব রইল। খানিকবাদে সোজাসুজি রেবেকার দিকে তাকিয়ে বলল,

  • আমার অভিভাবক নেই। কাছের দুজন বন্ধু নিয়ে তোমাদের বাড়িতে গিয়েছি। তোমার জেঠা, চাচা, ফুপাদের কাছে নিঃশর্তে যৌতুক ছাড়া প্রস্তাব রেখেছি। তারা আমার চাইতে আমার পরিবারের সেই মানুষদের নিয়ে অপমান করল, যাদের কোনো কসুর নেই। আমারও দোষ পুরোপুরি শূন্য। আমার চরিত্র নিয়ে সমস্যা থাকলে মানা যেতো। আমি কোনোভাবে অসৎ, ভণ্ড, দুশ্চরিত্র পুরুষ হলে প্রস্তাবটা ফেরালে ঠিক হতো। কিন্তু যেখানে আমার সবকিছু ঠিক, আমি একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, আমার একটা ছোট্ট জগত আমি একাই সাজিয়ে তুলেছি, সেখানে তুমিও আমাকে বিবেচনা করেই নির্বাচন করেছ। সেক্ষেত্রে তোমার পরিবার যে আক্রমণাত্মক আচরণ করছে, আমাকে অন্য পাত্রদের সঙ্গে তুলনায় ফেলে অপদস্থ করছে, এটা কী শরিয়ত মতে বৈধ? অন্য পাত্ররা বিরাট ধনী। গাড়ি বাড়ি সহায় সম্পত্তি সব আছে। তার মানে কী এটাই দাঁড়ায়, উনারা টাকা-পয়সার দাড়িপাল্লা দিয়ে পাত্রের দোষ-চরিত্র মাপছেন? টাকা বেশি হলে পাত্রের সাতখুন মাফ? তোমাকে বিয়ে করতে চাইছি! কিন্তু তারা লতায়-পাতায় থাকা মানুষদের কথা শুনে, অন্ধ হয়ে আমাকে ঠুকরে দিচ্ছে, এটা কী যুক্তিযুক্ত রেবা? এরপরও তুমি আমাকে আর কী করতে বলো? আছে জবাব? বলো!

সেদিনের কার্জন হলের পরিবেশ ছিল বড্ড বেশি থমথম। প্রকৃতির নীরবতা কানকে যেন ঝিমঝিম ধরাচ্ছিল। একপলক চোখ তুলে শায়খের সেই দীপ্ত চোখ, দৃঢ় ঠোঁট, বাচনভঙ্গির স্পষ্টতা দেখল রেবেকা। এরপরই সমস্ত কিছু এক লহমায় বিশ্লেষণে নিয়ে সিদ্ধান্তটি নিল। শাহনেওয়াজ আলম শায়খের বধূরূপে নিজেকে জড়িয়ে নিল রেবেকা মর্তুজা। নিজের নামটাকে স্বামীর অন্য নাম দিয়ে পরিবর্তন না করে বরং শাহনেওয়াজ নামটাকে জড়িয়ে নিল সবখানে। কিন্তু শায়খ কিছু একটা চিন্তা করে শাহ শব্দটি কেটে ছোটো করে দিল স্ত্রীর সমুখে। তাকে প্রস্তাবটা দিল রেবেকা নেওয়াজ নামটার জন্যে। শায়খ কেন সেদিন রেবেকা শাহনেওয়াজ নামটা ঠিক করেনি, তা এখন এসে বুঝতে পারে রেবেকা। আর এখন আরো বেশি শ্রদ্ধা জাগে মরহুম মানুষটার জন্য। তাকে এখন সামনে পেলে বলতেন, ‘তুমি ঠিক, তুমি ঠিক। তুমি সবসময়ই ঠিক। আমি ভুল, আমি ভুল। আমি এখনো ভুল। তুমি আমার ভুল শুধরে দাও।’

হঠাৎ ঠক্ ঠক্ মৃদু আওয়াজে চোখ খুলেন রেবেকা। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু তাকান। আবছায়া দরজার কাছ থেকে উপস্থিতির জানান দেন জোহরা খালেক,

  • রেবেকা, ব্যস্ত?

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নে কেবল দুটি মাত্র শব্দ। এভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ কথা অল্প বাক্যে বলেন জোহরা। ভীষণ আত্মনির্ভর তিনি। কথা ও কাজ বেশ নিখুঁত। পরিচ্ছণ্ণ পোশাক হিসেবে আজও উনার পরণে ধূসরবর্ণ সালোয়ার কামিজ। ওড়নাটা এখন মাথায় দিয়ে রেখেছেন। একটু পর মাগরিবের আযান হবে। রেবেকা সসম্মানে ইজিচেয়ার ছেড়ে একটা চেয়ার টেনে আনেন জোহরার জন্য। নিজে বসলেন বিছানায়। জোহরা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে চেয়ারে বসতেই গলা একটু কেশে বললেন,

  • ভেবেছিলাম ব্যস্ত আছ। তাই বেশি আগে আসিনি। এখন এলাম।

চোখে চশমা তুলে নিয়েছেন রেবেকা। পরিপাটি করে ঘরোয়া একটি শাড়ি পরা। রঙটা গাঢ় নীল। কবজি পর্যন্ত ঢাকা কালো ব্লাউজের হাতা, ব্লাউজের গলাটা পাঞ্জাবীর মতো ছোট কলার, সম্পূর্ণ শালীন। জোহরার উপস্থিতিতে বেশ কৌতুহলপূর্ণ চোখে প্রশ্ন শুধোন উনি,

  • কোনো জরুরি ব্যাপার আন্টি? আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে কী যেন বলতে চাইছেন আপনি। কিন্তু বলি বলি করে কথাটা বলতে চাইছেন না।

মুখে একটা ইতস্তত ভাব প্রকটরূপে ফুটল জোহরার। তিনি বুঝতে পারছেন কথাটা না বলে থাকা সম্ভব না। তিনি চরম গম্ভীর মুখে একটা হাত বের করলেন। যে হাতটা এতোক্ষণ ছিল উনার ওড়নার অতলে। রেবেকার দিকে ভারি একটি বস্তু অগ্রসর করে তির্যক ইঙ্গিত বললেন,

  • এটার প্রথম পাতাটা দেখো। মলাটের পরপরই যে পাতাটা।

জোহরার সাবধানী কণ্ঠ শুনে গলাটা ভিজিয়ে তোলেন রেবেকা। বুঝতে পারছেন কিছু একটা অগোচরে ঘটেছে। বাড়িয়ে দেয়া বস্তুটি আর কিছু নয়, বরং একটি সুখপাঠ্য বই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত গল্পগুচ্ছ। ভারি মোটা বই। মলাটটা লাল টকটকে, সেখানে রবীন্দ্রনাথের মুখচ্ছবি। বইটা নিজের কাছে নিয়ে মলাটের প্রথম পাতা দৃষ্টিগোচর করলেন। সাথে সাথে পিঠের শিরদাঁড়া ছুঁয়ে বিদ্যুৎ চমক যেন বয়ে গেল! শিরশির করে উঠল সমস্ত গা! চশমার এপারে ভয়ংকর সীমাতে চোখ বিস্ফোরিত করেছেন তিনি, তৎক্ষণাৎ একরাশ অস্থির উদ্বেলিত চাহনি জোহরার দিকে পড়ল। জোহরা নির‍ুত্তর, নিশ্চল ভঙ্গিতে রেবেকার পরবর্তী অবস্থার উন্মুখ রইলেন। আর ঠিক তখনি অস্ফুট স্বরে প্রায় চমকে উঠলেন রেবেকা! জোহরার দিকে ক্ষীণ গলাতে বলে উঠেন,

  • এ কী!

জোহরা পুরোপুরি নির্বিকার। একপলক চোখ ঘুরালেন দরজার দিকে। কেউ নেই দেখে পুনরায় চোখদুটো রেবেকার দিকে স্থির করেন। বইটার প্রতি নিগূঢ় ইঙ্গিত বুঝিয়ে সচেতন হন জোহরা,

  • এই বইটা ওর জন্মদিনের এসেছে। আর তুমি-আমি দুজনই জানি শাওলিন নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খোলামেলা না। নিজের জন্মদিন, প্রিয় ফুল, প্রিয় খাবার, পছন্দসই রঙ কোনোটাই তুমি-আমি ছাড়া কেউ জানে না। সেখানে এই বইটা ওর বন্ধুদল যে পাঠায়নি এটুকু নিশ্চিত করলাম।

রেবেকা চূড়ান্ত বিস্ময় সামলে উঠতে পারছেন না। তিনি বইটা রেখে ধপ করে দাঁড়িয়ে পরেছেন। অন্যসময় হলে ঘরজুড়ে পায়চারি করতেন, অস্থির ভাবে ভাবতে থাকতেন। কিন্তু আজ জোহরা সামনে। বয়সে তিনি মান্য মানুষ। আজ তাঁরই দিকে রেবেকা হতবাক, স্তব্ধ, বিমূঢ় ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,

  • ওর তথ্য উদ্ধার কে করল? আমি কিন্তু এবার রীতিমতো ভয় পাচ্ছি আন্টি। এমনিই ওর ঢাকায় পড়াটা আমার কখনোই স্বস্তিদায়ক লাগেনি। সর্বক্ষণ খুনাখুনি, সংঘর্ষ, হত্যা, গুম, অবরোধ। ঢাকাটা সংঘাতপূর্ণ শহর! তার মধ্যে এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, যেখানে প্রতিবাদের জোয়ার আরো তীব্র। ও কী কোনোভাবে রাজনৈতিক মহলের কাছে নজরদারিতে আছে?

জোহরার নাকোচ স্বর,

  • না। ওসব কিছুর জন্য কিছু হচ্ছে না। মাথা পুরোপুরি ঠাণ্ডা রাখো। আমি জানি তুমি শ্বশুরের ঘটনাটা নিয়ে —
  • না, শুধু আব্বার না। আম্মারটাও। আম্মারটাই ওকে এমন বানিয়ে ছেড়েছে। ওই বয়সে যা বুঝতো না, তা তো এই বয়সে সবই বোঝে। যত দিন যাচ্ছে, ও ততবেশি ঘটনা বুঝতে পারছে। তত বেশি সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ওর ভেতরে ফুটফুটে তরুণীর চঞ্চলতা নেই। আপনার কী মনে হয় না, শাওলিন ওর বয়সের চেয়ে বেশি রুক্ষ? বেশি গম্ভীর?
  • তোমার সামনেই যতদূর সহজ, আর কারোর সামনে হাসি টাসি নেই। শ্রেষ্ঠা মেয়েটাকে একটু ঘনিষ্ঠভাবে নিয়েছে। বিশ্বাসটা বোধহয় ভালোই করে। নয়ত অতদূর পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরতে যাওয়া, এটা বোধহয় সম্ভব হতো না। তোমার ননদ জীবনে এই প্রথম প্রকৃতিবিলাসে গেল, গিয়েছে কিন্তু জংলী জায়গায়, সেখানে কী কারো সাথে মন বেঁধে এল?

চোখ যেন প্রায় কপালে উঠে যাচ্ছিল রেবেকার। তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নেন। এমন অবিশ্বাস্য কথাবার্তায় ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়িয়ে দ্বিমত পোষণ করে বলেন,

  • সম্ভব নয়। ও আর প্রেম দুটো কখনোই সম্ভব নয়। আজকাল তেরো চৌদ্দতে পা রাখা অত্যন্ত ছোট্ট মেয়েরাই পশ্চিমা কালচার অনুসরণ করছে। নিজের চেয়ে তিনগুণ বয়সি ছেলেদের সাথে সম্পর্ক করছে। দেদারসে ঘুরছে বসুন্ধরায়। সেখানে ও তাহমিদের হাতটা পর্যন্ত স্পর্শ করেনি। নয়ত সেদিন ধপাস করে খাটে ফেলল কেন? হাতটাই স্পর্শ নাকি করেছিল?

হঠাৎ ওই প্রসঙ্গ চলে আসাতে ঠোঁটে টিপে হেসে দেন জোহরা। নিজের হাসিটা কেন জানি আর থামাতে পারেন না। শাওলিনের ওইটুকু দেহের শরীরী শক্তির প্রতি হাসতে হাসতে গর্ববোধ করছেন তিনি। ওই পলকা দেহী মেয়ে যদি অমন দামড়া গরুকে ধপাস করে ফেলতে পারে, তাহলে রেবেকার ভাইয়ের কপালে সত্যিই দুঃখ আছে। তবে পরমুহূর্তে তিনি বেশ গম্ভীর হয়ে যান। এক মুহূর্ত কী যেন ভাবতে ভাবতে উদ্বিগ্ন স্বরে বলে ওঠেন,

  • মনে হচ্ছে, এই বিয়েটা সহজে হবে না। যা পরিস্থিতি অনুমান হচ্ছে, সেটা স্বাভাবিক কিছুর আভাস না। যেখানে তোমার ভাইকে নিজের হাতটা ছুঁতে দেয় না। সেখানে এই বই ওর বুকটার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে। পরিস্থিতি বুঝতে পারছ ?

.

ভোরের সূর্য তখনো পূব আকাশে উঁকি দেয়নি। শহরটা গভীর ঘুমে নিথর। মৃতের মতো অনুভূত হচ্ছে তখন। এমনি এক নিস্তেজ নীরব ক্ষণে বিছানা সংলগ্ন টেবিলের ওপর জোর কাঁপুনি তুলল একটা। বেশ বুঝতে পারছিল ওটা যান্ত্রিক কল শব্দের আভাস। ফোনটা ভুম ভুম করে কাঁপছে। অনাকাঙ্ক্ষিত কলযোগে ঘুমটা ভোর ছটার দিকে টুটে গেল শাওলিনের। দুচোখের নিভু নিভু চাহনি মেলে একরাশ বিরক্তি মাখিয়ে ফোনটা মাথার কাছ থেকে টেনে আনল ও। চোখ কচলাতে কচলাতে কলার নামটা দেখে কানে চাপল। ঘুমে চোখের পাতাদুটো ফের বুজে এলে ধীরস্বরে বলল,

  • বলো শ্রেষ্ঠা। এমন কাকভোরে কেন কল দিয়েছ?

চিন্তায় তটস্থ শ্রেষ্ঠা। কণ্ঠ প্রায় ধমকের মতো। কিন্তু ধমকানিটা শাওলিনের কানে না পৌঁছে দিয়ে, ওকে বরং সুমিষ্ট মধু দিয়ে শোনাল,

  • ছোট্ট বন্ধু?

ঝট করে চোখের পাতাদুটো মেলল শাওলিন। বিপদসংকেত! শ্রেষ্ঠা ওকে কী অনুরোধ করতে যাচ্ছে? কণ্ঠ একদম স্পষ্ট করে বলল,

  • হ্যাঁ বলো।
  • শোন্ না ছোট্ট বন্ধু?
  • আরে বলো, শুনছি।
  • একটা বিরাট সমস্যা হয়ে গেছে। সমস্যাটা কোনোভাবেই সমাধান করা যাচ্ছে না। এই মুহুর্তে পুরো আকাশটা আমার মাথার উপর চড়চড় করে ভেঙে পরেছে। আমি চর্তুদিকে অন্ধকার দেখছি।
  • কী ঝামেলা? আর চর্তুদিকে এখন অন্ধকারই। ভোরের সূর্য আলো দেয়নি। সূর্য এখন মেঘের আড়ালে।
  • আমার অবস্থা তার চেয়েও অন্ধকার, জানা! আজকের বিরাট সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামটা পুরো ভজকট পাকানো অবস্থায়। কমিটিতে সবকিছু রেডি করে আমি নিশ্চিন্তে ঘুম দিয়েছিলাম। কিন্তু জানতাম না লাষ্ট মোমেন্টে এমন জোশ মারাটা খাব। এখন সাড়ে পাঁচটার দিকে একজনের কল এল। দেবরাণী গতরাত থেকে অসুস্থ। ওর ১০৩° জ্বর। এমতাবস্থায়, এখন মঞ্চে একা একা আমি সঞ্চালনায় থাকতে পারব না। তুই প্লিজ . . কষ্টটষ্ট করে . . একটু আয়।

শেষ বাক্যটা প্রচণ্ড ইতস্তত সুরে প্রবল অনুনয়ের সাথে বলল। মঞ্চে দেবরাণী ভট্টাচার্য ও শ্রেষ্ঠা একদল এবং পরস্পরের সহযোগী। দুজন মিলে মঞ্চের প্রথমভাগ দেখবে, বাকি শেষভাগ দেখবে অন্যদল। সেখানে দেবরাণী হঠাৎ জ্বরের কবলে পড়ায় আজ সে অনুষ্ঠানে শরীকই হতে পারছে না। এখন উপায়ন্তর না পেয়ে একমাত্র ভরসা শাওলিনকে কল করেছে শ্রেষ্ঠা। কলের ওপ্রান্ত থেকে আবারও মিনতি ঝরা সুরটা বাজল,

  • তোর বড়ো না আমি? আমার কথা শুনবি না তুই? প্লিজ চট করে আমার হলে চলে আয়। আমি এখানেই তোর জন্য সমস্ত ব্যবস্থা করে রাখছি। তুই টেনশনই নিস না। উপস্থিত বক্তৃতায় তুই যথেষ্ট চটপট আছিস। রোজা নৃত্যে নাম দিয়েছে। সোহানা রবীন্দ্র সঙ্গীতে। আজ হলে সবাই আছে। তাছাড়া ডিন স্যার আমাদের দুজনকে মঞ্চে দেখলে প্রচণ্ড বেশি খুশি হবেন। প্লিজ এই আকালের দিনে বিপদে ফেলিস না ভাই। আয় আয়।

মাথার ওপর এবার ওর বাজ পরল। তবু শাওলিন সমস্তটা বুঝে নিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে জানাল,

  • ঠিক আছে। সব মানলাম। সব শুনলাম। মঞ্চে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে প্রোগ্রামও সঞ্চালন করলাম। কিন্তু প্রোগ্রামে তুমি কেমন পোশাক পরবে? শাড়ি, চুড়ি, গাজরা, মেকআপ এসব না? আমি এসবে জড়াচ্ছি না দুঃখিত। বাদ দিলাম।
  • আচ্ছা তোর কিছুই জড়ানো লাগবে না। বাদ দেয়াও লাগবে না। তুই শুধু শাড়িটা এক প্যাঁচ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকিস, তাই চলবে। তোকে দেখলে পোলাগুলো এমনিই তাকিয়ে থাকে। এক প্যাঁচ দিয়ে মাইকটা শুধু ধরলে আমার ইজ্জতটুকু বাঁচবে। পোলাপানগুলো তোর খচ্চর জামাইর গুষ্ঠি উদ্ধার করবে। আর কিচ্ছু না। জাস্ট এখন কাম ফাস্ট।
  • তোমার যুক্তি শুনে রুচির দুর্ভিক্ষ লাগছে।
  • আরে, রুচি চানাচুর এনে সব ঠিক করে দিচ্ছি। তুই খালি হলে ছুটে আয়। নাযীফ, সেলিম একটু পর মারামারি লাগাতে আমার উপর হামলা দিবে। প্লিজ দ্রুত।

খট কলে কলটা কেটে গেল। কান থেকে নামিয়ে দেখল, চতুর শ্রেষ্ঠা নিজ থেকেই কলটা দিয়েছে সুকৌশলে। কত বড়ো খারাপ! এখন এই ভোরবেলা বিনা প্রস্তুতিতে ছুটতে হবে? মঞ্চে কোনোরকম অনুশীলন না করেই মাইক ধরবে? কেমন একটা পরিস্থিতি! কোত্থেকে আসে এসব আজগুবি ধরণের ঝামেলা? কোথায় ও ভেবেছিল আজ সারাটা সকাল ঘুমিয়ে কাটাবে, ঠিক বিকেলে গিয়ে অল্প কিছুক্ষণ অনুষ্ঠানে শরীক হবে, সেখানে ওর হাতেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালন দায়িত্ব? চুলে হাতখোপা পাকাতে পাকাতে বিছানা ছেড়ে উঠে গেল।

.

একই বিভাগ, স্রেফ কয়েক কিলোমিটার দূরত্ব। ঘড়িতে তখন ছয়টা তেরো। ঢাকার অভিজাত শ্রেণির একটি হোটেল, রিজার্ভেশন রুমের নান্দনিক কক্ষ। কক্ষটা আবছা অন্ধকার। জানালাগুলোয় পাতলা পর্দা টানা থাকলেও হু হু করে ঢুকে পরছে একদঙ্গল উতলা হাওয়া। ভোরের সূর্য উঁকি দেয়নি পূব আকাশে। ফিনফিনে একটা অন্ধকার মাখো মাখো চর্তুদিকে। পাশেই একমগ অ্যামেরিকানো এসপ্রেস কফি চমৎকার ধোঁয়া উড়িয়ে তপ্ততার জানান দিচ্ছে। সেই তপ্ত তরলে দুঠোঁট ঠেকিয়ে চুমুক দিচ্ছে একজন গম্ভীর মেজাজধারী লোক। যার বহিরাগত আদল শান্ত, শীতল, নির্বিকার। সাদা শার্টের সবকটা বাটন খোলা। পালটানো হয়নি রাতের এই পোশাক। দুরন্ত বাতাসে শার্টের দুপ্রান্ত সপাটে দুদিক সরে গিয়েছে। উন্মুক্ত হয়ে গেছে তার প্রশস্ত, খাঁজ কাঁটা, সুদৃঢ় বক্ষস্থল। একদিকে দেখছে বন বিভাগের কার্যক্রম, অন্যদিকে চলছে কারোর ফোনকলের কথাবার্তা। দুটো মেয়েলি কণ্ঠ। সবটাই চুপচাপ শুনতে শুনতে সেলফোনটা তুলে নিল হাতে। যে হাতে ধরেছে সে হাতেরই বৃদ্ধাঙুল দিয়ে লকস্ক্রিন আনলক করল। ডায়াল প্যাডে আঙুল চালিয়ে কানে ফোন চেপে ধরল সেকেণ্ড ক্ষণ, সাদা মগে আরেক চুমুক দিতে দিতে বজ্রগম্ভীর গলাটা গভীরভাবে বেজে উঠল,

  • শোয়েব ফারশাদ বলছিলাম। এটা আজকের জন্য নতুন নাম্বার। বিকেলের পর পাওয়া যাবে না। সিম পুড়িয়ে দেব। গতকাল কোনো এক চামারের গোডাউনে শক সার্ভিস দেয়া হয়েছে। সাইবার সিস্টেমের কিছু করা হয়নি। তবে ইচ্ছে আছে, এখান থেকে যাওয়ার আগে আরেক ডোজ দিয়ে যাব। একপাল গরু ঘাস খেয়ে মাথায় গোবর জমাচ্ছে। ওদের পাকস্থলীতে বুদ্ধি পরে আছে। আসল মগজ ওদের বডিতে আছে কিনা শিয়োর হতে পারছি না। মেবি টয়লেটের ফ্লাশে আঁটকে আছে।

.
চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply