বজ্রমেঘ .
পর্বসংখ্যা_২০ .
ফাবিয়াহ্_মমো .
আজ সকাল থেকেই অস্থিরতা কাজ করছে। প্রচণ্ড হাঁশফাঁশ হচ্ছে, দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আজ দুপুরের ট্রেনেই ঢাকায় পৌঁছুবেন রেবেকা নেওয়াজ। তিনি একা আসবেন না। কাকে আনবেন, কেন আনবেন এ নিয়ে গোলযোগ রয়েছে। কিন্তু আপাতত সেই আলোচনা মূখ্য বিষয় না। নাশতার পাট চুকিয়ে নিজের শান্ত ছিমছাম ঘরটায় ফিরে এল শাওলিন। কড়া রোদ উঠেছে বাইরে। অথচ এই রোদ ওর মনকে স্পর্শ করছে না। বুকটা অজানা কারণে বড্ড ধক্ ধক করে ছুটছে। চাপা অস্থিরতায় হাতের তালু ঠাণ্ডা। বারবার দুহাতের তালু ঘষে ভেতরের ভয়টাকে শূন্য করতে চাইছে, কিন্তু কোনো অর্থেই লাভ হচ্ছে না। চোখদুটো বন্ধ করে দুবার গভীর করে শ্বাস টানল শাওলিন, ঠোঁটদুটো গোল করে ফুঁস করেই শ্বাসটা ছেড়ে দিল। ভেতরটা বরফ জমা হিমাগারের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আছে। গায়ের ত্বকে মুহুর্মুহু শিহরণ তুলছে বেশ! এই অস্থিরতা, এই উদ্বেগ, এই চাপা আতঙ্ক পৃথিবীর কোনো ঔষুধেই ছাড়ল না। নিজেকে সাহসী, শক্ত, কঠোর বোঝাতে গিয়ে বারবার ঠুনকো এক খড়কুটোর মতো ভেঙে পরতে হয়। পৃথিবীর সামনে শান্ত, নির্জীব, গম্ভীর হয়ে থাকাটা যত সহজ, যত আরাম বলে মনে হয়, ততটাই অসহ্য এক যন্ত্রণা এটা। ততটাই অসহনীয় যন্ত্রণা! বিছানায় বসা থেকে চুপ করে উঠে দাঁড়াল শাওলিন। ভার্সিটি যাবার সময় হয়েছে। বহুদিনের ব্যবহৃত টোটব্যাগটা ডান কাঁধে তুলে বাসা থেকে নীরবে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল। গেইটের বাইরে যখন পা রাখবে, হঠাৎ কী মনে করে আবারো ভেতরে ঢুকল ও। এই বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের গ্রাউণ্ড ফ্লোরটা ভয়ানক বড়ো, ঠিক বিরাট কোনো প্রশস্ত ময়দানের মতো। অ্যাপার্টমেন্টের অ্যালোটিরা সেসব ফাঁকা স্থানে তাদের নিজস্ব গাড়ি রাখেন। কখনো কখনো গেস্টদের গাড়িতে ভর্তি হয় সুনশান পার্কিংলট। তবু ফাঁকা জায়গার কমতি দেখেনি কখনো। শাওলিন পার্কিং লটটা পেরিয়ে একেবারে শেষের এক খুপরি ঘরে এসে দাঁড়াল। লোহার জীর্ণ গেইটে টং টং আঘাত করে বলল,
- আনোয়ার চাচা? জ্বর ভালো হয়েছে? দরজাটা একবার খুলুন। আমি আপনার জন্য খাবার নিয়ে এসেছি। আস্তে আস্তে দরজাটা খুলুন।
কথাগুলো বলার ঠিক মিনিট দুয়েকের মাঝে ঘড় ঘড় একটা আওয়াজ উঠল। লোহার জীর্ণদশার দরজাটা আস্তে আস্তেই খুলছেন দারোয়ান চাচা। মৌসুমি জ্বরে আজ দুদিন ধরে কাবু তিনি। স্ত্রী, সন্তান কেউ এখানে নেই। সকলেই থাকেন গ্রাম নামক বিশাল দূরবাসে। দরজাটা ধীরহস্তে খুলে যেতেই ভেতর থেকে অল্প আলোর একটা আভাস দেখা গেল। কম ওয়াটের হলুদ বাতিতে বৃদ্ধ মানুষটার মুখ আরো বেশি করুণ দেখাল। দুদিনের জ্বরে একেবারে মুষড়ে পরেছেন তিনি। শাওলিন চটজলদি নিজের টোটব্যাগটা খুলে একে একে দুটো বক্সভর্তি খাবার বের করল। দুটোই বৃদ্ধর হাতে গুঁজে দিয়ে বলল,
- আমি রান্না করেছি। চিন্তা করবেন না। জোহরা আন্টি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। আপনি চুপচাপ খাবারটা শেষ করে বক্সগুলো রেখে দিবেন। আমি ফিরে এসে এ দুটো আবার নিয়ে যাব। ঠিকআছে?
বলতে বলতে দ্রুত নিজের ব্যাগ থেকে বড় এক বোতল পানিও বের করল। এক লিটারের বোতলটা দরজার কাছ থেকে ঘরের মেঝেতে রেখে দিল ও। অসুস্থ অবস্থায় একগ্লাস পানি গড়িয়ে দেবার লোক নেই, সেখানে এই বৃদ্ধ নিশ্চয়ই ট্যাপের পানিটাই খেয়ে যাচ্ছেন। আনোয়ার অনেকক্ষণ যাবৎ কোনো কথা বলছেন না। তিনি এতোটাই স্তম্ভিত হয়ে আছেন যে, পারতপক্ষে কিছু বলতে গেলে কণ্ঠ কেঁপে যাবে। তিনি মাথা নিচু করে হাতের দিকে তাকিয়ে আছেন। বক্সদুটো গরম। ভেতরের খাবারটা সদ্য বানানো। কী আছে এতে, তা তিনি জানেন না। কিন্তু যা এতে দেখা যায় না, তা হলো মায়া মমতা উদারতা। বৃদ্ধ অসুস্থতার জন্যই হোক, অথবা অন্য কোনো কারণে, উনার মেয়ের বয়সি মেয়েটাকে কিছুই বললেন না। শাওলিন দ্রুতবেগে কাজ সমাধা করে ‘আসি’ বলে বেরিয়ে গেল। ওইটুকু মেয়ের নীরব যাওয়াটার মাঝে চুপ করে তাকিয়ে রইলেন। এরপর দরজাটা আগের মতোই দুর্বল হাতে আস্তে আস্তে বন্ধ করে আধ ময়লা শয্যাটায় বসলেন। তেল চিটচিটে হয়ে আছে আজ দুদিন। রাতে প্রচণ্ড জ্বর ওঠে, সকালে প্রচণ্ড ঘাম দিয়ে জ্বর নামে। এতো বড় ভবনটার আনাচে কানাচে এতোগুলো মানুষ! এতোগুলো প্রাণের উপস্থিতি, এতোগুলো ধনবান ব্যক্তিত্ব, অথচ খাবারের পসরা দুবেলা করে দিয়ে যায় এক অল্প বয়সি ব্যক্তিত্ব। যে মেয়েটার অর্থ ও বিত্ত আকাশ ছোঁয়া না হোক, খোদা তা’য়ালা আসমান ছোঁয়া হৃদয় দিয়েছেন। আনোয়ার তেল চিটচিটে চাদরের উপর পাতলা একটা দস্তরখানা বিছালেন। সেখানে বাক্স দুটো খুলতেই দেখলেন গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, সদ্য ভাঁজা দু টুকরো ইলিশ মাছ, আগুনে পুড়ানো কড়কড়ে শুকনো মরিচ, সঙ্গে ঝাল করে বানানো কয়েক পদের ভর্তা। অরুচি মুখে এ যেন রুচি ফেরানোর চমৎকার প্রচেষ্টা! বৃদ্ধ আয়েশ করে বহুদিন পর তৃপ্তি নিয়ে খেলেন। বারবার খাবারের লোকমায় উনার চোখ সজল হয়ে আসছিল।
.
ভার্সিটির জন্য প্রায়শই লোকাল বাসে চড়ে। বিষয়টা এমন নয়, ওর হাতে অর্থযোগ কম ঘটে।বরং, আট-দশজন মানুষ যেখানে অভ্যস্ত, ওর সঙ্গে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যেহেতু অভ্যস্ত, সেক্ষেত্রে ও কেন অযথা ব্যয় করবে? সামান্য একটুখানি আরামের জন্য শুধু শুধু মণির উপর বাড়তি বোঝা চাপাতে চায় না। এখনো পরনির্ভরশীল মেয়ে ও। অন্যের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। ভাবতে হয়। চিন্তাও করতে হয় ভীষণ। আজও যাত্রী ভরা লোকাল বাসে ঠেলেঠুলে চড়ল ও। সাবধানে খামচে রাখল টোটব্যাগটা। একটু পর বাসটা সামান্য ফাঁকা হলে একটা সিট পেয়ে বসে পড়ল ও। কাঁচ ঘেরা জানালাটা খুলতে যাবে, ঠিক তখনি টের পাচ্ছিল, ওর কোলের ব্যাগটা ঝিমঝিম করে কাঁপুনি দিচ্ছে। নিশ্চয়ই যান্ত্রিক বস্তুর জানান! জানালাটা আধ খোলা রেখে সেভাবেই চটপট ফোনটা বের করল শাওলিন। স্ক্রিনে দেখল একটা অপরিচিত নম্বর। সামান্য ভ্রুঁ কুঁঁচকে প্রশ্ন জড়ানো অবস্থার ভেতর কলটা কানে চাপল ও।
- হ্যালো, আসসালামুয়ালাইকুম।
ওপাশ থেকে দুটো সেকেণ্ড বিরতি। কোনো উত্তর নেই। ঝিঁঝিপোকার মতো একটানা একটা শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু সাড়াশব্দ কিচ্ছুটি নেই। নিরুত্তর অবস্থা দেখে আবারও দীপ্তকণ্ঠে বলে উঠল শাওলিন,
- হ্যালো? কে বলছেন? কথা শোনা যাচ্ছে কী? হ্যালো?
এবারও অদ্ভুত ভাবে নিরুত্তর। কোনো জবাব দিচ্ছে না কেউ। নিশ্চয়ই কেউ ঠাট্টা ফাজলামি করতে কলটা দিয়েছে ওকে! নির্ঘাত কোনো রং নাম্বারধারী পাক্কা ইতর! সামনে পেলে দুগাল লাল করে চড় দেয়া যেতো। অসহ্য! কলটা যেই কাটতে যাবে, তার আগেই ওপাশ থেকে একটি মেয়েলি গলা ভেসে এল। চট করেই সেই কণ্ঠটা যেন শুধিয়ে উঠল,
- তুমি শাওলিন?
শাওলিন আশ্চর্য হয়ে জবাবটা দিল,
- জ্বি, কিন্তু আপনি? আপনাকে চিনি বলে তো মনে হচ্ছে না। নামটা একবার বলা যাবে প্লিজ?
- নিশ্চয়ই। আমি ইরা বলছি। চিনতে পেরেছ?
শাওলিন ওর স্মৃতির ঝুলিতে ক্রমশ হাতড়াতে লাগল। ইরা . . ইরা . . কোথায় শুনেছে নামটা? নামটা তো শোনা শোনা মনে হচ্ছে, কিন্তু স্পষ্ট করে মনে পড়ছে না। ব্যাপারটা নিয়ে কোনো রাখ-ঢাক করল না। সরাসরি সেই ব্যক্তিকে অকপটে বলে উঠল,
- দুঃখিত, আপনার নাম শুনে স্পষ্ট করে চিনতে পারছি না। হয়ত একঝলক, এক মুহুর্ত কোথাও আমরা দেখা করেছি। কিন্তু এই মুহুর্তে একদম মনে পড়ছে না আমার, স্যরি।
- আমি ইলহাম বলছিলাম শাওলিন। ইলহাম আজিজ ইরা। তুমি তো আমাকে চেনো, আমার সঙ্গে কথাও হয়েছে। ওই যে? খাগড়াছড়িতে ফরেস্ট ম্যানের বাড়িতে? সেখানে আর্মিদের সেই উঁচু হেলিপ্যাডে? মনে পড়েছে?
চট করে এবার মনে পড়েছে! হ্যাঁ, ইলহাম আজিজ! ইরা নামে ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল! কিন্তু শাওলিন বুঝতে পারছে না, ওকে হঠাৎ কী কারণে কল করল? ওর ব্যক্তিগত ফোন নম্বর কোথা থেকে পেল? ও তো ইরাকে ফোন নম্বর শেয়ার করেনি! তাহলে? তাহলে হঠাৎ এই কলযোগটা ঘটল কী করে? শাওলিন চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখছে। কপাল কিঞ্চিত কুঁচকানো। দিঘির মতো গভীর কালো চোখদুটোতে একপুকুর শঙ্কা মাখানো। বাঁ কানে ফোন এঁটে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলল,
- কর্ণেল গুলজার আজিজের মেয়ে?
- হ্যাঁ, শাওলিন। এবার ঠিক ধরেছ। পার্ফেক্ট! তা কেমন আছ? অনেক দিন পর তোমার খোঁজ পেলাম জানো? দেখতে দেখতে মাস তিনেক তো পেরিয়ে গেল, তাই না?
বুকের ভেতর এবার প্রশ্ন-ঝড়ের তুফান বইছে। চোখে মুখে বিদঘুটে চিন্তার স্ফুরণ ছেয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই শাওলিন বুঝতে পারছে না, কেন ওকে কল করা? কেন ওর খোঁজখবর? এই তিন তিনটে মাসে সামান্য বার্তা পর্যন্ত আসেনি! সেখানে আচমকা এমন রহস্যজনক খবর? ওখানে কিছু হয়েছে? সেই নির্জন বাংলো, পার্বত্য অঞ্চল, পাহাড়ি পথে লোমহর্ষক কিছু? সেই ভদ্রলোক, বনকর্মী লোকটা, তার কিছু হল নাকি? হঠাৎ ওর বুকের ভেতরটা ভয়ংকর মোচড় খেয়ে উঠল! ছিঃ, কীসব ভাবছে! নিজের গালে সর্বশক্তি দিয়ে চড় কষানো দরকার। কেন ভয়ংকর কিছু ভাবছে! কী সব আজেবাজে ভাবনা, ধ্যাত্! শাওলিন নিজের অপ্রকৃতিস্থ গলাকে খানিক স্থির করে শুধাল,
- আপনি ভালো আছেন ইরা? হঠাৎ, এতোমাস পর! প্রায় তিনমাস পেরিয়ে চলল। আজ কী করে . .
হঠাৎ কথাগুলো গুছিয়ে উঠতে পারল না ও। বলতে গিয়ে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই মুখ! সেই চোখ, সেই চাহনি, সেই অবয়ব, সেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাঁপিয়ে তোলা অশনি ব্যক্তিত্ব! না, অমন একটা পুরুষের জন্য ওসব দুর্ভাবনা করাই উচিত না। ওপাশ থেকে ইরা সন্তর্পণে বলতে লাগল,
- তোমাকে বাধ্য হয়ে কল দিয়েছি শাওলিন। বলতে পারো প্রচণ্ড বাধ্য হয়ে। কেন, কী কারণ সব আমি বলব। তার আগে শুনো, বেশ কসরত করে তোমার নাম্বারটা ম্যানেজ করা। ভেবেছিলাম শেষপর্যন্ত হয়ত কথাই হবে না, তোমার খোঁজই পাব না; কিন্তু অবশেষে তোমার খোঁজ পেলাম। তুমি আশাকরি ভালো আছ?
এমন স্বরে কথাগুলো বলছিল, যা একটুও স্বস্তিদায়ক না। একচুল স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। কিছু একটা বলতে চাইছে ইরা, কিন্তু কথাটা গুছিয়ে বলতে ওর সাহসে কুলোচ্ছে না। শাওলিন ব্যাপারটা বুঝতে পারলেও ইরাকে সেটা একটুও বুঝতে দিল না। ও নিজের মতো স্বাভাবিক থেকে শান্তস্বরে বলল,
- আপনি কী কারণে বাধ্য? আমি এই মুহুর্তে ভার্সিটির উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছি। বাসে আছি। পাঁচ মিনিটের ভেতর স্টপেজে পৌঁছাব। এরই মধ্যে যদি—
কথাটা আর শেষ করতে পারেনি শাওলিন। তার আগেই ওর কথার পিঠে জোরসে একফলা কথা ছুঁড়ে দিল,
- শাওলিন, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। টাইম, প্লেস দুটোই তুমি চুজ করো। এটা আর্জেন্ট! আমি এখন ঢাকাতে আছি। চাইলে যেকোনো সময় তোমার ঠিকানায় পৌঁছাতে পারি। আমার ব্যক্তিগত স্কুটি আছে। ব্যাপারটা কষ্টকর হবে না। প্লিজ, ট্রায় টু ফিক্স দ্য টাইম অ্যাণ্ড প্লেস। না কোরো না শাওলিন, ইটস অ্যা হাম্বেল রিকোয়েস্ট!
এমন অস্থিতিশীল আচরণ, প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবহার, বারবার দেখা করতে চাওয়ার বায়না, এসব কী? হঠাৎ এই আকস্মিক রূপে কেন ইরার জরুরি তদবির? কণ্ঠ শুনে তো স্থির মনে হচ্ছে না। খারাপ কিছু যে একটা ঘটেছে, তা তো সুনিশ্চিত এখন। শাওলিন দেখতে পাচ্ছে ওর ভার্সিটি এলাকায় চলন্ত বাসটা ঢুকে পড়েছে। আর মাত্র দু মিনিটের পথ। তন্মধ্যেই চটপট একটা বুদ্ধি ভেবে, সামান্য চিন্তার চাকা ঘুরিয়ে ইরাকে সোজাসুজিই বলল,
- যদি অসুবিধে না হয়, তবে রূপনগর দেখা করো। জায়গাটা ধামরাই পড়েছে। তুমি আমার জন্য আজ বিকেলে সেখানেই অপেক্ষা করো। আমি চারটা-পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে যাব। চলবে?
হঠাৎ সম্বোধনটা ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ এসে ঠেকেছে। নিজের অজান্তেই ‘তুমি’ সম্বোধন করছে শাওলিন। এদিকে ইরা শাওলিনের কাছ থেকে যথোপযুক্ত উত্তর শুনে নিশ্চিন্ত হল। স্বস্তির একটা গভীর বায়ু শব্দ করেই যে ছাড়ল বেচারি, তা কলের এপাশ থেকেও শুনতে পাচ্ছিল শাওলিন। কলটা কেটে দিতেই স্থির চুপচাপ দৃষ্টিতে বসে রইল ও। ওর চোখে তখন ভাসছে, সাদা গাড়ির ধাওয়া, দুর্বৃত্তদের হামলা, সন্ধ্যার আঁধারে সুউচ্চ গুদামঘর, সেখান থেকে বাঁচানো, আপন বাংলোয় সেবা, পাহাড়ি পথে ঘুরিয়ে আনা, অতঃপর সেই অল্পক্ষণের স্বল্প রাত্রি। সেই অটল, সুধীর দীর্ঘকান্ত সুপুরুষ বারবার বিনা বার্তায় হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে। দেহে, মনে, মস্তিষ্কে কুয়াশার মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে তার পৌরুষ সত্তার চৌম্বকী জাল।
.
বিকেলে আকাশ গোলাপি রঙা। পশ্চিম কোণে একটুখানি সিঁদুর যেন অলক্ষ্যে ছিটিয়ে পড়েছে। তাতে উদার বিশাল সুন্দর আকাশটা লালচে আভায় অদ্ভুত একটি মিষ্টি গোলাপির রঙ ফুটিয়েছে। ঠিক যেন শাওলিনের গালদুটোর মতোন। মিষ্টি গোলাপির মাঝে অল্প একটু সিঁদুর ছিঁটানো লাল রঙ। সাদা রঙের একটি কামিজ পড়েছে ও। হাতদুটো পাকিস্তানি জামার মতো ঢিলেঢালা। তাতে ওর শুকনো হাতগুলো আরো বেশি সরু, চিকন, কোমল দেখাচ্ছে। গলায় গাঢ় নীল রঙা বাটিক প্যাটার্নের ওড়না, ওড়নার মাঝে সাদার বাটিকের চিত্র। নিচে অবশ্য পরেছে সাদামাটা নীল রঙা পাজামা। চুলটা বাঁদিকে এনে এলোমেলো ‘ম্যাসি হেয়ার’ এর মতো একটা বেণি করেছে। বেণির শেষভাগটা স্পর্শ করছে ওর কোমল ছিপছিপে কোমর। দুরন্ত বাতাসে পাপড়ি ঘন চোখদুটো আধবোজা অবস্থাতে পথ বাতলে চলছে। রূপনগর ধামরাইয়ের একটি চমৎকার পর্যটন স্থান। ব্যাপক প্রসারে সাড়া না ফেললেও এখানকার সরিষা ক্ষেতের সৌন্দর্য কেবলমাত্র শীতকালেই সম্ভব। রাস্তার দুধারে নাবাল ফসলি জমি। দূর-দূরান্তে যদ্দুর চোখ যায়, সবটাই ঢালু নিচু ফসলি মাঠ। পিচঢালা মসৃণ সড়কটা দিয়ে পায়ে পায়ে এগোচ্ছিল শাওলিন, হঠাৎ কর্ণধারে পৌঁছুল একটি সুকণ্ঠী ডাক,
- শাওলিন! এইযে, আমি। এদিকে।
শাওলিন তৎক্ষণাৎ মুখ ঘুরিয়ে দেখল ডানদিকে। ডানদিকে অস্তগামী সূর্যের মিঠে রূপ ফুটেছে। সেই মিঠে রোদ্দুরের মাঝে বসে আছে ইরা। অফ হোয়াইট রঙের লেডিস ফর্মাল প্যান্ট পরেছে, উপরে হাঁটুস্পর্শ করা সাদা-কালো চেক প্রিন্টের ফুলহাতা টপ। হাতদুটো অবশ্য বুকের কাছে আড়াআড়ি ভাঁজ করে রেখেছে। চোখদুটো বাদামি সানগ্লাসে ঢাকা। ঠোঁটজুড়ে কোরিয়ান লিপটিন্টের ফুলো ফুলো আভা নিয়ে ওকে আবার বলল,
- খুব কষ্ট দিলাম তোমাকে। এর জন্য স্যরি শাওলিন। প্লিজ, আমাকে তোমার জন্য কিছু করার সুযোগ দাও। বলো, গরমাগরম কী খাবে? চা না কফি? কোনটাতে রাজি?
- এক কাপ কড়া লিকারের চা। দু চামচ চিনি।
- ঠিকআছে। তুমি ওদিকটায় বসো।
ডানহাতের তর্জনীতে একটি নির্দিষ্ট জায়গা নির্দেশ করল। শাওলিন দেখল, জায়গাটা মন্দ না। একটা টং দোকানের পাশে কিছুটা খোলামেলা জায়গা। সেখানে দুটো সাদা চেয়ার পাতা। দর্শনার্থী কেউ চাইলে ওখানে বসে একাকি চা পান করতে পারে। সামনেই পশ্চিমাকাশের পট। শাওলিন একটা চেয়ার দখল করে সেখানে চুপচাপ বসল। তার মিনিট দুয়েক পরে ইরা নিজের চোখ থেকে সানগ্লাস খুলতে খুলতে ফাঁকা চেয়ারটা দখল করে বলল,
- তুমি বোধহয় খুব টায়ার্ড? আজ সারাদিন ক্লাসে ছিলে?
অযৌক্তিক বাড়তি কথা একেবারেই ভালো লাগছে না। সত্যিই ও খুব টায়ার্ড! আজ সারাদিন কালবোশেখি ঝড় বয়ে গেছে। গতকাল দুটো অ্যাসাইমেন্ট টপিক সারাটা রাত ভুগিয়েছে। তন্মধ্যে, এই যন্ত্রণা! ঘুমে চোখদুটো কী রকম চিড়বিড় করছে, তা তো এই মুহুর্তে বলা যাবে না। শাওলিন চোখদুটোতে শান্তভাব ফুটিয়ে যথাসম্ভব ঠাণ্ডা গলাতে বলল,
- সত্যি বললে, আমি ভীষণ টায়ার্ড। যেটুকু পথ কষ্ট করে এখানে আসা, সেটুকুতে আমি বাসায় পৌঁছে যেতাম। আমি তোমার কাছে সরাসরি জানতে চাই। কী ব্যাপারে তলব করেছ? কেন আর্জেন্ট ডাকলে?
এমন অকপট, স্পষ্ট, টানটান মেজাজে কথা বলতে শুধু একজনকেই দেখেছে ইরা। খাগড়াছড়ির সেই একজনকে। এখন আবার এই মেয়ের মধ্যে অমন ভয় ছড়ানো তেজ দেখছে। দুটো সংযোগ কী ওর মনের ভুল? ইরার কী বুদ্ধিভ্রংশ হচ্ছে? গড়পড়তা বাদ দিয়ে একেবারে সোজাসুজি প্রসঙ্গ ঢুকল সে,
- তুমি আমার বাবাকে চেনো? কী করে চেনো? কর্ণেল গুলজার আজিজকে অতো স্পষ্ট করে তোমার তো চেনার কথা না। তুমি আজ কিছুই গোপন করো না। তোমার একেকটা ইনফরমেশন আমার জন্য ভয়ংকর দামি! না বললে ভয়ানক অবস্থার মধ্যে ফেলে দিবে শাওলিন! প্লিজ, আই রিকোয়েস্ট, বলো!
শাওলিন পুরোপুরি স্তব্ধ চেহারায় তাকাল! কয়েক মুহুর্ত কোনো স্বর ফুটল না ওর। পায়ের তলায় মাটিটা যেন প্রচণ্ড জোরে কেঁপে উঠেছে! সেই সঙ্গে ভূকম্পন দিয়ে মাটিটা ফাঁকও হয়ে যাচ্ছে! নিজের কানদুটোকে এক মুহুর্তও বিশ্বাস করতে পারল না ও। বিশ্বাস করতে পারল না ইরার এই বলাটুকু! তখনো উন্মুখ কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইরা। যেন সৈনিক বাবার যোগ্য কন্যা এই অদ্ভুত মেয়েটার এপিঠ-ওপিঠ ফুঁড়ে দেখছে। ইরা পুনরায় কিছু বলতে যাবে, তার আগেই শাওলিন একপ্রস্থ উত্তর গুছিয়ে বলল,
- বাবা চিনতেন। বাবার চেনাশোনা মানুষ ছিলেন। তবে খাস বন্ধু, কলিগ ছিলেন না। আমি এটুকু নিশ্চিত।
কিছুটা সংকোচ, কিছুটা দ্বিধা নিয়ে আবারও ভাবতে থাকল ইরা। কী এক দুর্বিসহ ভয়ে সারা মুখ তটস্থ! যেন অশনি কোনো পূর্বাভাস মনের দর্পণে দেখতে পাচ্ছে! কিন্তু মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে পারছে না ও। হঠাৎ চোখ উঁচু করে শাওলিনের মলিন মুখটায় দৃকপাত করে বলল,
- তোমার বয়স কত ছিল? পাঁচ, দশ? যতদূর বুঝেছি, তোমার বয়স তখন মারাত্মক অল্প। অতো কিছু মনে রাখার মতো বয়স ছিলই না। তাহলে তুমি . . তুমি কী করে মনে রেখেছ? বাবাকে চিনেছ? আমি তো কোনোভাবে সূত্র মেলাতে পারছি না শাওলিন! ঘটনাটার প্রায় একযুগ পেরিয়ে গেছে। হিসেব করলে একযুগেরও বেশি!
চিন্তাগ্রস্ত ইরাকে উত্তর জোগালো শাওলিন। কিন্তু তার আগে দোকানির দিয়ে যাওয়া চা’টা দুহাতে তুলে নিল ও। ইরাও বাধ্য হয়ে দেখাদেখি চায়ের কাপটা বুঝে নিল। গলাটা একটু স্থির করে একটা ব্যক্তিগত তথ্য এই প্রথমবার অচেনা কাউকে দিল ও। একমুখ অস্বস্তি নিয়ে বিব্রত হয়ে বলল,
- বয়স দিয়ে সেই ঘটনাটা মাপা যাবে না আপু। আমার বয়স তখন অল্পই। আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু অতো একটা ছোট ছিলাম না। আমার অস্বাভাবিক কিছু সমস্যা আছে। একটা অদ্ভুত ডিসঅর্ডার। সচরাচর সবার এটা হয় না। আমি জন্ম থেকেই হাইপারথাইমেশিয়ায় আক্রান্ত। যাকে বলা হয়, Highly Superior Autobiographical Memory – সংক্ষেপে এইচ এস এ এম। কিছু স্মৃতি, কিছু ঘটনা আমি কখনোই ভুলতে পারব না। এগুলো আমার কাছে বিচ্ছিন্ন হবে না। আমৃত্যু আমার সঙ্গে থাকবে। এমনটা বহু আগে একজন ডাক্তারের মুখে শুনেছিলাম। তোমার বাবার মুখ সেই একদিনই দেখেছিলাম, এরপর আর ভুলিনি।
একটা দূর্বোধ্য, অজানিত, দূর্গম ভয়ে কাঁটা হয়ে রইল ইলহাম আজিজ। অনামা দূর্যোগে ওর চোখ-মুখ শঙ্কায় নির্জীব! তার মানে শাওলিন কিছুই ভোলেনি! ও না ভুলেছে সেই ভয়াল নৃশংসতার দৃশ্য, না ভুলেছে সেখানকার মানুষ! এমন এক স্মৃতিধারী মেয়ের সামনে রীতিমতো চিন্তিত হচ্ছে ও। শাওলিন তাহলে খাগড়াছড়িতেই বাবাকে চিনে ফেলেছিল? আর এই কারণেই ওরা বাবার সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করলেও শাওলিন ছিল আলাদা। কাপের প্রান্তে ঠোঁটদুটো ছুঁয়ে মৃদু চুমুক সেরে বলল,
- আমি এসব তথ্য কীভাবে জেনেছি, তা আরেকদিন জানাব শাওলিন। আজ এটা জানানো যাবে না। তুমি এক্ষুণি বাড়ি ফেরো! আর রাত করে কক্ষণো বাইরে থেকো না! আপাতত তোমায় এটুকু বলব, প্লিজ, তুমি সাবধানে থেকো। এমন তথ্য যেহেতু আমার কাছে লিক হয়েছে, আমি জানি না আর কতজন এসব জানে। সামনে কী হবে কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আজ শুধু শিয়োর হবার জন্য তোমাকে ডেকেছি।
- একটা কথা বলি?
- নিশ্চয়ই! বলো।
ভারি একবুক দম নিল শাওলিন। যেন গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলার পূর্বে নিজেকে একটু তৈরি করে নিল। শূন্য চায়ের কাপটার দিকে বিষণ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে আস্তে আস্তে বলতে লাগল,
- আমার বাবা আজও নিখোঁজ। নয় সালের সেই ঘটনার পর আর কখনো ফেরেননি। একেকটি মুহুর্ত উন্মাদের মতো অপেক্ষায় থেকেছি; ভেবেছি এইতো এসে পড়বেন। রাত জেগে প্রহর গুণেছি, হয়ত আজ নয়তো কাল ফিরে আসবেন! অথচ আর কোনোদিনই ফিরলেন না। একটা মানুষ পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, পৃথিবীর তাতে ইঞ্চি সম ক্ষতি হল না। দুদিন সমবেদনা, তৃতীয় দিন ভুলে যাওয়া। ফেব্রুয়ারি আমার জীবনে এক নৃশংসতম কালো মাস। যদি ক্যালেণ্ডারের পাতা থেকে মুছে দিতে পারতাম, আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে এক চিলতে সুখ, একফালি শান্তি পেতাম। আমার পরিবার আর স্বাভাবিক পরিবার হতে পারেনি। সংসারের মাথা কেটে গেলে, সেই সংসার অতল গর্ভে বিলীন . . .
.
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ গল্পের লিংক
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২১(২১.১+২১.২)
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৫
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৩
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৭
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৮
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৭
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৮.১
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১০