Golpo romantic golpo প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান

প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৭


প্রেসিডেন্টওয়াহেজইবনান

পর্ব : ৭

সানজিদাআক্তারমুন্নী

ওয়াহেজ উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে আনভির দিকে এগিয়ে আসে। আনভি ওয়াহেজকে আসতে দেখে চোখ নামিয়ে নেয়। তার বিশ্বাস, ওয়াহেজ কিছু বলবে না। তারপরও সংকোচ লাগছে। ওয়াহেজ দাঁত চেপে আনভির দিকে তাকায়, কিন্তু কিছু বলে না। চুপচাপ আনভির হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বাড়ির ভেতর হাঁটা শুরু করে জোরপূর্বক। আনভি ওয়াহেজের সঙ্গে যেতে চায় না, কিন্তু ওয়াহেজের হাতের টানে তাকে যেতেই হয়। ওয়াহেজ যাওয়ার আগে গার্ডদের বলে যায়,
“ওর শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত ওকে ছাড় দিও না।”

এতটুকু বলে ওয়াহেজ আনভিকে নিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। আনভি কিছু বলতেও পারছে না, আর মন চাইছেও না সঙ্গে যেতে। আনভি নিজের হাতের দিকে তাকায় এক নজর। ওয়াহেজ তার হাতখানা শক্ত করে ধরেছে। ওয়াহেজ তার হাত ধরল কেন? ওয়াহেজের কি অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল হাত ধরার আগে? অবশ্যই নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু সে নেয়নি। সে আনভিকে স্ত্রী মানে না, অথচ পুরোদস্তুর আনভির ওপর বেগমের অধিকার খাটায়। এ কেমন নিয়ম?

আনভিকে নিয়ে ওয়াহেজ ঘরে প্রবেশ করে, তারপর আনভির হাত ছেড়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। দরজা লাগিয়ে আবারও আনভির দিকে ফিরে এসে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আনভির দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোমাকে তো বলেছিলাম, সামাইরা মাঝখানে কথা না বলতে। তারপর কেন বললে?”

কথাটা ধমকের সুরে বুনে ওঠে ওয়াহেজ। ওয়াহেজের ধমক খেয়ে আনভি হালকা কাঁপতে কাঁপতে উচ্চারণ করে,
“আ… আমি আসলে এমন কিছু কখনোই সামনাসামনি দেখিনি। তাই একটু ইয়ে ইয়ে হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝুন তো, আমার অবস্থাটা।”

ওয়াহেজ আনভির এমন আমতা-আমতা শুনে দু’কদম এগিয়ে এসে ঠান্ডা চোখে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে। ওর এই হিম তাকানোই আনভিকে মেরে ফেলছে। আনভির কাঁপার পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এখন না ওয়াহেজ ওকে আচড় মেরে ফেলে। আনভি নত দৃষ্টিতে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওয়াহেজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
“দ্বিতীয়বার এমন হলে শাস্তি একটাও মাটিতে পড়বে না। তুমি আমার স্ত্রী। তোমার আমার সম্পর্ক তুমি আমার দায়িত্ব আর কাজের মধ্যে নিয়ে এসো না, সামাইরা।”

“তুমি আমার স্ত্রী” এই কথাটা আরও একবার ওয়াহেজ বলেছিল, এখনো ফের বলল। আনভি ওয়াহেজের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বসে,
“আপনি বারবার তুমি আমার স্ত্রী বলছেন কেন? আমি কি আপনার সত্যিই স্ত্রী?”

হঠাৎ এমন প্রশ্নে ওয়াহেজ থতমত খেয়ে যায়। এই মেয়েটা তাকে সবসময় লজ্জার মুখে ফেলে দেয়। ওয়াহেজ আনভির কথার কোনো উত্তর দিতে পারে না। কিছু ইতস্তততা নিয়ে বলে,
“আমি বাইরে যাচ্ছি। আজ রাতে বাড়ি ফিরব না। একা ঘুমাতে না পারলে আইরাকে নিয়ে এসো।”

এটা বলে ওয়াহেজ ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে যায়। আনভি হতাশ হয়ে ওয়াহেজের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটা এমন কেন? একটা প্রশ্ন করলে সঠিক উত্তরের তলব মেলে না।

আনভি ধীর পায়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। বেলকনিতে গিয়ে দেখে, ওহিকে ড্রাম থেকে বের করা হচ্ছে। ওহির এই শাস্তিটা প্রযোজ্য। এই যে আনভি ওয়াহেজকে বাধা দিচ্ছিল, এটা একপ্রকার চালাকি ছিল। আনভির সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে বিরক্ত লাগছিল। তার বিশ্বাস ছিল, ওয়াহেজকে কিছু বললে সে সবার সামনে আনভিকে কিছু বলবে না, নিশ্চিত আনভিকে আড়ালে নিয়ে আসবে। তাই আনভি বাধা দিচ্ছিল, আর ফলস্বরূপ ওয়াহেজ তাকে ঘরে নিয়ে এলো। এই ওহিকে আনভির নিজেরই সহ্য হয় না। বিরক্ত লাগে তার চলাফেরা।

ওয়াহেজ বেরিয়ে গিয়েছে দুপুরের দিকে। রাত এখন বাজে বারোটা। সে যখন বলেছে আসবে না, তার মানে সে আসবে না। ডিনার করে আনভি একা রুমে বসে আছে। ঘুম কেন জানি আজ চোখে ধরা দেওয়ার নামই নিচ্ছে না। আজ আনভির চোখের নিদ্রা গিয়েছে, মনে হয় বেড়াতে। ওয়াহেজ যেহেতু আসবে না, আর ঘরেও সে একা, তাই একাকিত্ব কাটাতে আনভি সিদ্ধান্ত নেয় সে সাজবে, শাড়ি পড়বে, চুড়ি পড়বে, মানে সুন্দর করে সাজবে।

আনভি বেশি সাজগোজ পছন্দ করে না, কিন্তু অতটাও না। মাঝেমধ্যে নিজেই নিজের মতো সে সাজে, ঘরের ভেতর একা একা। আনভি ভাবনামতোই কাজ করে। উঠে একখানা পিওর জর্জেট কালো বেনারসি পরে, যার পাড়ে এবং আঁচলে সোনালি রঙের সুতো দিয়ে চমৎকার ডিজাইন করা। কানে এক জোড়া এন্টিক দুল পরে নেয় শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং করে। নিজের রক্তাভ অধরযুগলে একটু লিপস্টিক দেয়, চোখের নিচে একটু কাজল টেনে দেয়। একটা ছোট্ট কালো টিপ কপালে বসিয়ে দেয়।

এতটুকু সেজে আনভি নিজেই নিজের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না। ভীষণ সুন্দর লাগছে তাকে এই রূপে। আনভি শুকরিয়া আদায় করে কয়েকবার পড়ে নেয় : اَللّٰهُمَّ كَمَا حَسَّنْتَ خَلْقِي فَحَسِّنْ خُلُقِي

নিজের দীর্ঘ, লম্বা, ঘন কেশরাশি খুলে দিয়ে হাতে পরতে শুরু করে কাচের চুড়ি। একটা আস্ত কাচের চুড়ি তাকে গিফট করেছিল তার ফ্রেন্ড তারিন। আয়নায় দেখে মুচকি হেসে চুড়ি পরছে নিজের মনের সুখে আনভি। আর তখনই দরজা ফট করে খুলে ঘরে প্রবেশ করে ওয়াহেজ।

আজ তার আসার কথা ছিল না। তথাপি কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় বাড়ি ফিরল। ঘরে পা রেখেই সে তব্দা খেয়ে গিয়েছে। কালো শাড়িতে এই হালকা সাজে আনভিকে চোখে ধরেছে বারবার। ওয়াহেজের বুক ধুকপুক করছে। ধুকপুকানি নিয়ে ওয়াহেজ ধীর পায়ে এগিয়ে আসে আনভির দিকে। মনে মনে তার প্রশ্ন জাগে, এই মেয়ে এত রাতে সাজছে কেন? মেরে ফেলবে তো ওয়াহেজকে নিজের মোহে আটকিয়ে।

তার সুন্দরী নারী কত শত চোখে পড়ে। একবার তাকালে দ্বিতীয়বার তাকাতে ইচ্ছে হয় না। তবে আনভির দিকটা আলাদা। আনভি তার হালাল নারী। তাই বোধহয় আনভির দিক থেকে চোখ ফেরানো কষ্টকর হয়ে যায়। বারবার তাকাতে মন চায়।

আনভি লজ্জাজনক একটা পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে। ওয়াহেজ তো বলেছিল সে বাড়ি ফিরবে না, তাহলে এখন এখানে কী করছে সে? আনভি মাথা নিচু করে বসে থাকে। তিরতির করে কাঁপ শুরু হয়ে গিয়েছে তার শরীরে। এতটা লজ্জা আর সংকোচকর অবস্থায় সে কখনোই পড়েনি। না জানি এখন ওয়াহেজ কী বলে বসে, আর কী ভেবে নেয়।

ওয়াহেজ ধীর পায়ে আয়নার পাশে এসে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে আনভির নতজানু মুখের দিকে কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে,
“তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে, সামাইরা। আমি কি জানতে পারি, তুমি কী জন্য এই নিরুপম রূপে সাজলে?”

ওয়াহেজের প্রশ্নে আনভি ফট করে চোখ তুলে তাকায়। ইতস্ততাবোধ নিয়ে বলে,
“না… এমনি। ভালো লাগছিল না, তাই সেজেছি। আপনি তো বললেন আসবেন না।”

“যে কাজের জন্য থাকব ভেবেছিলাম, সেটা হয়ে গিয়েছে, তাই এসে গেলাম। ভালো সাজগোজ না করলে নিরামিষ লাগে। লজ্জা পেয়ো না, আমি তোমাকে এসব নিয়ে কিছু বলব না।”

আনভি ওয়াহেজের কথায় মাথা নাড়িয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। যে লজ্জাজনক কট সে খেয়েছে, তা বলার বাইরে। আর কি এখানে থাকা যায়? এই সাজসজ্জা ত্যাগ করতে হবে। সাজার শখ মিটে গেছে আচ্ছামতো।

আনভি উঠে যেতে দেখে ওয়াহেজ প্রশ্ন করে,
“চলে যাচ্ছো কেন?”

আনভি ওয়াহেজের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“এগুলো চেঞ্জ করে আসি।”

“চেঞ্জ করবে কেন? তোমাকে তো সুন্দর লাগছে।”

“সুন্দর লাগছে বলে সারারাত এখানে এখন এসব পরে, এই সাজে বসে থাকতে তো পারি না।”

“না, একটু বসো। তোমাকে দেখতে সুন্দর লাগছে। আমি একটু তোমাকে দেখি। তোমার দিকে তাকাতে আমার ভালো লাগে।”

আনভি ওয়াহেজের এই কথায় ভুরু কুঁচকে বলে ওঠে,
“কেন আপনি আমার দিকে তাকাবেন? কেন? লজ্জা নেই? যাকে বউ মানেন না, তার দিকে তাকাবেন?”

ওয়াহেজের ফুরফুরে মেজাজটা বিগড়ে দেওয়ার জন্য আনভির এই কথাটাই যথেষ্ট। ওয়াহেজ গলার আওয়াজ চওড়া করে বলে,
“তোমার কি ঘাড়ত্যাড়ামির অভ্যাস? এত উল্টো উত্তর দিচ্ছো কেন? সেজেছো তো আমারই জন্য, তো আমি দেখব না?”

এই কথা শুনে আনভির ভীষণ রাগ হয়। এই কথা বলার মানে কী? সে তো নিজেই নিজের জন্য সাজল, ওর জন্য কেন সাজবে?

আনভি ওয়াহেজের চোখে চোখ রেখে রুক্ষ গলায় বলে,
“আপনার জন্য সাজব মানে? আপনি বাড়ি আসবেন না বলে আমি সেজেছি। আপনি কে, শুনি, যে আমি আপনার জন্য সাজব? বলতে বলতে বেশি বলে ফেলছেন।”

ওয়াহেজ আনভিকে এমন রেগে যেতে দেখে নিজেকে শান্ত করে ঠান্ডা গলায় বলে,
“আনভি, তুমি কি ভুলে যাচ্ছো, আমাদের বিয়ে হয়েছে। বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত হওয়ায় আমার জন্য মেনে নেওয়া পসিবল নয়। তাও আমি মানাতে চেষ্টা করছি। তাই আমি তোমায় সময় দেওয়ার কথা বলেছিলাম। তুমি বসো আমার সামনে। আমি তোমায় দেখি। তোমার চেহারাটার ছবি অন্তরে আঁকি, যে নিজেকে বুঝাই এই তুমিই আমার সব, তুমিই আমার ভবিষ্যৎ। অথচ তুমি আমাকে বলছো, আমি কে?”

এতটুকু নরম গলায় বলে ওয়াহেজ ধমকে ওঠে,
“আমি কে মানে? আমি তোমার মাহরাম। আর এমন প্রশ্ন আর কখনো করলে বুঝবে আমি কে, আর আমার করার কী আছে।”

এমন হুমকি দিয়ে ওয়াহেজ ওয়াশরুমের দিকে যেতে থাকে। তবে ওয়াশরুমের দরজার সামনে এসে আবারও আনভির দিকে ফিরে তাকায়, আর বলে,
“খবরদার, কিছু গা থেকে খুলবে না। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি, এসে দেখব কী করার আছে।”

আনভি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কী হলো হঠাৎ? এই লোকটা কাল রাতেও তো অসহ্য আচরণ করেছিল আনভির সঙ্গে, আর আজ এমন বাণী বকছে।

চলবে,,

জানি একটুও সুন্দর হয়নি আজকের পর্ব বিশ্রী হয়েছে হয়তো। আর রমজানের প্রথম প্রহর চলছে বাড়িতে কত-শত কাজ বুঝেনি তো। তাই দিতে দেরি হলো আর অনেক ছোটও।

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply