Golpo romantic golpo প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান

প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৫


প্রেসিডেন্টওয়াহেজইবনান

পর্ব : ৫

সানজিদাআক্তারমুন্নী

সকাল এখন আটটার কোটায়, আনভি সোফার কোণে বসে পিরিয়ডের ব্যথায় খাচমিচ খাচ্ছে। পিরিয়ডের জন্য পেটের নিচে যে পেইন হয়, তা কাউকে কখনো বলে বোঝানোর সাধ্য কারো নেই। ওয়াহেজ ফজরের নামাজ পড়ার জন্য বেরিয়েছিল যে, এখনো বাড়ি ফিরেনি। আনভিও ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। যেখানে কেউ তাকে মূল্য দেয় না, সেখানে সে কোথায় যাবে? তাদের সাথে গায়ে পড়ে কেন কথা বলবে? এসব বউ-শাশুড়ির নাটক জি বাংলায় মানায়, বাস্তবে নয়। কেউ যদি আনভির বিষয়ে মিথ্যা একটা ধারণা পুষে, সেটিকে খুঁটি বানিয়ে যদি আনভির সাথে কথা না বলে বা খারাপ আচরণ করে, তাহলে এখানে আনভি কী করবে? আনভির তো কিছু করার নেই। সে কাউকে তেল মারতে পারে না, তাই চুপচাপ বসে আছে; যা হবে দেখা যাবে। এর মানে এ নয় আনভি বিনয়ী নয়, আনভি যথেষ্ট বিনয়ী তবে তাদের সাথেই যারা তার সাথে বিনয়ী। সে বেহায়া নয় অবশ্য। আনভি পেটে ক্ষিদা সাথে অসহ্য ব্যথা নিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকে সোফার এক কোণে। আনভি বসে আছে, কিছু সময় পার হওয়ার পর ঘরে প্রবেশ করেন উষা, মানে ওয়াহেজের মা৷ উষাকে দেখে আনভি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, তবে সালাম দেয় না আজ আর কারণ গতকাল সে তাঁকে সালাম দিয়েছিল, কিন্তু তিনি কোনোপ্রকার উত্তর শুধাননি। তো যে সালামের উত্তর দেয় না, তাকে কী জন্য বারবার সালাম দিবে? আনভি আজ তাঁকে দেখে ধড়ফড়িয়ে উঠে না দাঁড়িয়ে, সময় নিয়ে ধীরলয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে উঠে দাঁড়ায় এবং চেহারার প্রতিক্রিয়ায় উষা যেমন একটা কড়া বিরক্তির আবরণ ধরে রেখেছেন, তেমন বিরক্তির রেশ আর গাম্ভীর্য টেনে ধরে। উষা আনভিকে কাঠ গলায় বলেন, “এই যে, তুমি তো নতুন বউ হিসেবে আছো, অথচ কোনোপ্রকার দায়িত্ব পালন করছো না! আমাদের বাড়ির বউরা কিন্তু এমন না, তারা রান্নাবান্না, স্বামী সব সামলায়। যাও, আজ সকালের নাস্তাটা তুমি বানাও।”
আনভি তো ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না, নাস্তা কীভাবে তৈরি করবে সে? তারপরও কোনোপ্রকার কথা না বলে চুপচাপ উষার সাথে নিচে যায়। এইরূপ সমস্যা তো কাউকে বলে বোঝানো অসম্ভব, তাই আর না বলাই ভালো; কিড়িমিড়ি খেয়ে সহ্য করে নিক এখন। আনভি কিচেনে যেতেই তার চাচিশাশুড়ি আনভিকে দেখে একপ্রকার তাচ্ছিল্য করে কিচেন থেকে বেরিয়ে যেতে থাকেন। আনভিও উনার দিকে বিরক্তি চোখে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়, অর্থাৎ বুঝিয়ে দেয় সে তার এমন আচরণে খুবই বিরক্ত তার উপর। উষা আনভিকে কোথায় কী আছে দেখিয়ে বেরিয়ে যান। আনভি অসহ্য ব্যথাটা বয়ে নিয়ে নাস্তা তৈরি করতে থাকে। দাঁড়ালে মনে হচ্ছে বসলে ব্যথাটা কমবে, বসলে মনে হচ্ছে দাঁড়ালে ব্যথাটা কমবে; মানে আনভি শান্তি কোনোভাবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছে না। আনভি সকালের নাস্তা হিসেবে প্রথমে তৈরি করে… নাস্তা হিসেবে বেশি কিছু করতে পারেনি, পরোটা আর লাচ্ছি, সাথে দুধ চা জ্বাল দেয়। এগুলোতে তো হবে না, উল্টো খোঁচা মারা কথা শুনতে হবে। তাই ঠিক করে এখন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় খাবার ‘সারীদ’ রান্না করবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ, আনভি শুরু করে রান্নার কাজ যেহেতু সবাই নাস্তা করবেন নটায়, এরমধ্যে হয়ে যাবে। যাবতীয় উপকরণ একসঙ্গে করে প্রথমে সে একটি হাঁড়িতে ঘি গরম করে পেঁয়াজ কুচি, আদা-রসুন বাটা ও নানা রকম গুঁড়ো ও গোটা মসলার সাথে হাড়সহ খাসির মাংস ভালোভাবে কষিয়ে নেয়। মাংস কিছুটা ভাজা হলে সে এতে টুকরো করা টমেটো, আলু, গাজর, লাউ ও পর্যাপ্ত পানি দিয়ে ঢেকে দেয়, যাতে মাংস ও সবজি সেদ্ধ হয়ে দারুণ স্বাদের একটি পাতলা ঝোল বা স্টু তৈরি হয়। রান্না শেষে আনভি একটি বড় পাত্রের নিচে ছোট ছোট টুকরো করে ছিঁড়ে রাখা রুটি সুন্দর করে বিছিয়ে দিচ্ছে এবং তার ওপর গরম গরম মাংস, সবজি ও পুরো ঝোলটা ঢেলে দেয়। যার ফলে রুটিগুলো দ্রুত ঝোল শুষে নিয়ে একদম নরম তুলতুলে হয়ে সুস্বাদু সারীদ পরিবেশনের জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে যায়।
রান্না শেষ করতে করতে ন’টা বেজে যায়। উষা রান্নাঘরে প্রবেশ করেন। সারীদ দেখে বেশ খুশি হয়ে যান মনে মনে। সারীদ উনার খুব প্রিয় খাবার উনার নয়, পুরো ইবনান পরিবারেরই, বিশেষ করে ওয়াহেজ আর ওয়াজিফার। আনভি উনাকে দেখে কিছুটা ইতস্তত হয়ে বলে, “আ আর কিছু তৈরি করব?”
উষা আনভির রান্না করা সবকিছুর উপর একবার নজর বুলিয়ে আনভির দিকে তাকান আর বলেন, “না, আর কিছু করতে হবে না। যাও, এগুলো টেবিলে পরিবেশন করে দাও, সবাই বসে আছে খাবারের অপেক্ষায়।”
আনভির হাঁটার শক্তি নেই, বড্ড ক্লান্ত লাগছে। এই অল্পতে ক্লান্ত হওয়ার মেয়ে সামাইরা সিদ্রা আনভি নয়, কিন্তু অসুস্থ হওয়ায় ক্লান্তি কাজ করছে। আনভি তাও সারীদ একটা বড় বাটিতে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। পরিবারের সবাই এখানে বসে আছেন। আনভি ডাইনিং টেবিলের উপর খাবারটা রাখে, কোনোদিকে তাকায় না; কেমন অস্বস্তি লাগছে তার। আইরা সারীদ দেখে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে, “মাশাল্লাহ! সারীদ রান্না করেছো ভাবী? এটা তো আমাদের সবারই পছন্দের। খুব সুন্দর ঘ্রাণ আসছে, ইনশাআল্লাহ খেতেও ভালো হবে।”
আনভি কিছু বলে না। ওয়াহেজ মুখ তুলে একবার আনভির দিকে তাকায়। ইশশ, পুরো ফর্সা মুখটা লালচে হয়ে গেছে রান্নার কবলে পড়ে! ওয়াহেজ একপলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। মন চায় তাকাতে, কিন্তু সবার সামনে এভাবে তাকালে মান-সম্মান থাকবে বলে মনে হয় না; তাই না চোখের চাহনিকে হেফাজতেই রাখা ভালো।
আনভি কিচেনের দিকে পা বাড়ায় বাকিগুলো আনতে, তখনি উষা কিচেন থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে বলেন, “আর নিয়ে আসতে হবে না। যাও, গিয়ে চোখ-মুখ ধুয়ে আসো। পুরো লাল হয়ে গেছো এমন লাল হয়েছো, মনে হচ্ছে পুরো ইবনান বংশের জন্য রান্না করে ফেলেছো!”
আনভি হতাশা চোখে একবার উষার দিকে তাকায়, তারপর মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়, “জি।”
এতুটুকু বলে আনভি রুমে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়, তখনি পিছনে থেকে শুনতে পায় উষা বলছেন, “আজ রাতের, দুপুরের রান্না কিন্তু তোমাকেই করতে হবে। আমার যেন আরেকবার বলতে না হয়!”
আনভির পা থেমে যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে উনার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে আবারো সামনে ঘুরে হাঁটতে শুরু করে। এমন খোঁচা মারা কথা আনভির একদম পছন্দ না; যা পছন্দ নয়, তার মুখোমুখি বারংবার তার পড়তে হচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়া ব্যতীত তার আর কিছুই করার নেই। এটা শ্বশুরবাড়ি, এখানে মানিয়ে নিতে হবে। চারজন চারটে কথা বলবেই, তা শুনেও না শোনার ভান ধরতে হবে; এটাই নিয়তি, আর কিছু করার নেই। আনভি ঘরে এসে সোফায় বসে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেয়। ইতস্ততা, অপমান, লজ্জা, সংকোচ, অস্বস্তি সব রোগে আক্রান্ত হয়ে গেছে একসাথে সে। মনে মনে ভয় আরেকটা যোগ হয়েছে, তা হলো নাস্তা কেমন হলো আল্লাহই জানেন! এই বাড়ির যেই লোকরা, না জানি কোন ভুল বের করে। ফ্রেশ হতে এসেছিল, কোথায় আর ফ্রেশ হবে অলসের মতো গা এলিয়ে বসে আছে সোফায়।
নাস্তা শেষ করে ওয়াহেজ ঘরের দিকে আসে; রেডি হয়ে কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে তো হবে। ঘরের দরজার সামনে এসে ওয়াহেজের পা থেমে যায়। আড়াল থেকে দেখতে পায় আনভির ছটফটানি পেটের নিচে দুই হাত চেপে ধরে ওঠে, তো আবারো বসে। বসে শান্তি না পেয়ে সোফার কুশনে মাথা রাখে, এরকম একটু সময় জিরোয়। তারপর আবার উঠে দাঁড়ায়, দাঁত চেপে হাঁটে, তো আবার বসে যায়; পানি খায়, তো আবার উঠে হাঁটতে শুরু করে।
বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে আনভির কার্যকলাপ লক্ষ্য করে ওয়াহেজ। লক্ষ্য করে বুঝতে পারে আনভির পেইন হচ্ছে, ও ভীষণ প্যানিক করছে। ওয়াহেজ ঘরে ঢুকতে চেয়েও ঢোকে না। দ্রুত পায়ে নিচে লিভিং রুমে এসে উষার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, যিনি নাস্তা শেষে উপরে নিজের রুমে যাচ্ছেন। ওয়াহেজ উষার পথ আটকে দাঁড়িয়ে ইতস্ততা নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “মা, আজ দুপুরে সামাইরার রান্না করার কথা না? আজ না হয় তুমি করে নাও মা রান্নাটা, প্লিজ।”
কাবিননামায় আনভির নাম ‘সামাইরা সিদ্রা আনভি’ দেখে ওয়াহেজ আনভিকে ‘সামাইরা’ই ডাকে এই প্রথম তার নামই উচ্চারণ করল সে। উষা ছেলের মুখে এমন কথা শুনে রুক্ষ গলায় বলেন, “কেন, আমি করব কেন? এক জীবন তো আমিই করলাম। এখন ছেলেকে বিয়ে করিয়েছি, এখন তো ছেলের বউয়ের রান্না করার কথা। আমি কী জন্য করব? বিয়ের একদিন না হতেই বউয়ের আঁচলের নিচে চলে গেছিস?”
ওয়াহেজ তো পড়ে যায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। ওয়াহেজ উষাকে থামিয়ে বোঝানোর জন্য বলে, “মা, মা তুমি শোনো। ওর পক্ষে কথা বলছি না ওর, ওর না……..
ওয়াহেজ লজ্জায় মুখ থেকে কথাটা বের করতেও পারছে না। অনেকটা সংকট-সংকোচ নিয়ে সে উচ্চারণ করে, “মা, সামাইরার পিরিয়ড হয়েছে, এন্ড ওর পেইন হচ্ছে অনেক। ও আমাকে সেটা বলেনি, আমি ঘরে প্রবেশ করার সময় আড়াল থেকে দেখলাম। তুমি তো বোঝোই আমার থেকে ভালো, সে জন্য বললাম একটু ছাড় দাও না তাকে আজ।”
উষা আনভির অবস্থা বুঝতে পারেন। বুঝতে পেরেও কিছুক্ষণ চুপ থেকে গা-ছাড়া ভাব নিয়ে বলেন, “আচ্ছা ঠিক আছে, রান্না করতে হবে না।”
এটা বলে তিনি ওয়াহেজের পাশ কাটিয়ে উপরের দিকে এগিয়ে যান। ওয়াহেজ প্রশান্তির শান্ত শ্বাস ছেড়ে ঘরের দিকে যায়। ওয়াহেজ ঘরের সামনে এসে শুকনো কাশি দিতে দিতে ঘরে প্রবেশ করে, যাতে আনভি নিজেকে সামলে নেয়। আনভি ওয়াহেজকে দেখে সোফায় বসে থাকে চুপচাপ, একদম স্থবির হয়ে। ওয়াহেজ আনভির দিকে তাকায়, আনভিও তার দিকে তাকায়। চোখাচোখি হতেই দুজনে চোখ নামিয়ে নেয়। ওয়াহেজ বেডের দিকে এগিয়ে এসে বেডসাইড ক্যাবিনেটের উপর থেকে পানির বোতল হাতে নিয়ে এমন একটা ভান করে যেন সে পানি খাবে। এমন ভান করতে করতে আনভিকে বলে, “সামাইরা শোনো, আজ রান্না তোমার করতে হবে না, মা করবে।”
আনভি তো ভড়কে যাওয়া চোখ নিয়ে ওয়াহেজের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওয়াহেজ আনভির এমন তাকানো দেখে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কী হলো, তুমি আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছো কেন?”
আনভিও ভুরু কুঁচকে বলে, “আপনি পানি কোথায় খাচ্ছেন? এই বোতলে তো পানি নেই!”
হ্যাঁ, এই বোতলে পানি নেই। খালি বোতল নিয়ে ভান ধরছিল ওয়াহেজ। মূলত ভান ধরছিল আনভিকে এই কথাটা বলার জন্যই। সংকোচের ঠেলায় ওয়াহেজ সব গুলিয়ে নিচ্ছে; ওয়াহেজ খেয়াল করেনি যে পানির বোতলে পানি নেই। ওয়াহেজ আনভির কথায় বোতলের দিকে তাকিয়ে হাবলার মতো আমতা আমতা করে বোতলটা জায়গা মতো রেখে বলে, “ওহ! ওহ, নেই… পানি নেই।”
আনভি বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, “অদ্ভুত মিঃ প্রেসিডেন্ট! আপনি এত লজ্জা কেন পাচ্ছেন? কী বলবেন সরাসরি বলুন, লজ্জার কী এখানে?”
ওয়াহেজের খানিকটা আত্মসম্মানে আঘাত হানে আনভির এই কথাটা। তাই এবার সে সরাসরি আনভির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে, “লজ্জার কিছুই নেই। মূল কথা তোমার সাথে আমি অ্যাডজাস্ট করতে পারছি না। তো মূল কথা যখন বলছো, তাহলে শোনো, আজকের রান্নাটা তোমার করতে হবে না। আমি মাকে বলেছি তোমার পেইন হচ্ছে।”
“পেইন? কিসের পেইনের কথা বলেছেন আপনি? আমি কি আপনাকে বলেছি যে রান্না করতে পারব না? এখন উনি ভাববেন, আমি মনে হয় আপনাকে বলেছি এটা বলতে।”
“আমি বুঝি, সব বুঝি আমি। তোমার তো পেইন হচ্ছে, তাহলে কীভাবে রান্না করবে? তাই আমি না করে দিয়েছি।”
“খুব ভালো করেছেন! আপনার পা দুটো দিন, আমি সালাম করব। দেশে পণ্ডিতি করতে করতে এখন আমার বেলায়ও করছেন। এখন যদি আমাকে এই বিষয় নিয়ে কোনোপ্রকার কথা শুনতে হয়, তাহলে দেখবেন আমি আপনার পণ্ডিতি কীভাবে বের করি!”
ওয়াহেজ আনভির কথা শুনে হালকা রেগে যায়। এই জগতে কারো ভালো করতে নেই, ভালো করতে গিয়েও খারাপের তকমা লেগে গেল! ওয়াহেজ আনভির দিকে দু-কদম এগিয়ে এসে বলে, “তোমার কি কৃতজ্ঞতাবোধ নেই, অকৃতজ্ঞ মেয়ে? তোমার জন্য আমি লজ্জা-শরম গিলে মায়ের কাছে গিয়ে বললাম তোমার সমস্যার কথা।”
“আমি তো কৃতজ্ঞ, আমি আপনার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ! যদি কেউ আমায় কিছু বলে এ নিয়ে, তাহলে আসল কৃতজ্ঞতা আমি আপনাকে দেখাবো, ইনশাআল্লাহ।”
“কে কী বলবে? কেউ কিছু বলবে না। বললে বলিও, ‘আমি অসুস্থ, আমি কীভাবে রান্না করব? আমাকে ওয়াহেজ বলেছেন রান্না না করতে।'”
আনভি ওয়াহেজের হঠাৎ এমন প্রেম দেখে বিতৃষ্ণার্ত কণ্ঠে বলে, “এত শুকনো প্রেম আপনি আমার জন্য ঢালবেন না বলে দিলাম। আপনি হঠাৎ এত ভালো ব্যবহার কী জন্য করছেন?”

“দেখো আমি তোমার ভালো টা বুঝার ট্রাই করেছি এর উপরে আর কিছু নয়। “

এটা বলে ওয়াহেজ কাপড় রাখার ঘরে চলে যায় ধপাস ধপাস কদম ফেলে। আনভি স্তিমিত হয়ে বসে থাকে আর মনে মনে ভাবে নাহ লোকটা ওত খারাপ নয় ভালো আছে কিছুটা।

আগেই বলে দেই এই গল্পের সময়টা ২০২৬ সালের বেশ পরের কোনো এক কাল। বাস্তবতার সাথে এ গল্পের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। দেশের চিত্র ও শাসনব্যবস্থা এখন আমূল বদলে গেছে। বর্তমান আইনে মুসলিম নারীদের জন্য হিজাব এবং বোরকা ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নারীরা চাইলে ঘরের বাইরে বের হতে পারবে, চাকরি করতে পারবে, কিন্তু মুসলিম হলে পর্দা বজায় রাখাটা আইনের চোখে বাধ্যতামূলক। হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। এই কড়া নিয়মের প্রবর্তক প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ, আর এ কারণেই আড়ালে অনেকেই তাকে ‘স্বৈরাচার’ বলে ডাকে। তবে সময়ের সাথে সাথে সাধারণ মানুষ এই কড়াকড়ি নিয়মের মর্ম বুঝতে পেরেছে এবং সমাজ এখন এই আইনেই অভ্যস্ত।ওয়াহেজের চাচাতো বোন ওহি। তাদের ‘ইবনান’ পরিবারের নারীদের কখনো বাইরের মানুষের সামনে প্রকাশ্যে আনা হয় না, তাই ওহির পরিচয়ও সবার অজানা। ওহি এতদিন দেশের বাইরে ছিল। ক’দিন হলো দেশে এসেছে। ওহি, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকায় দেশের আমূল বদলে যাওয়া এই সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে সে অনেকটাই অজ্ঞ। তার ধমনীতে বইছে আধুনিকতার স্রোত, যা বর্তমান সময়ের এই কট্টর বাস্তবতার সাথে বড্ড বেমানান। বাড়ির দারোয়ান বা কেয়ারটেকারদের চোখ এড়িয়ে ওহি নিঃশব্দে বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়। তার গন্তব্য বাসার ঠিক পাশের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটি। উদ্দেশ্য একটু দই কেনা। কিন্তু ওহির পরনে পশ্চিমা ধাঁচের টপস আর হাঁটু ছোঁয়া ট্রাউজার। হিজাব বা বোরকার কোনো অস্তিত্ব নেই তার শরীরে। সে জানে, এই পোশাকে রাস্তায় বের হওয়া এখন আর কেবল ফ্যাশনের অংশ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আইনে এক গুরুতর অপরাধ। তারপরও এসব পাত্তা না দিয়ে বেরিয়েছে। ​দোকানে ঢুকে সে স্বাচ্ছন্দ্যেই দইয়ের খোঁজ করে। দোকানি কাজ থামিয়ে একবার ওহির আপাদমস্তক ভালো করে দেখে নেয়। তার দৃষ্টিতে বিস্ময়ের চেয়ে ঘৃণার আভাসই বেশি আছে। দোকানি ভাবলেশহীন গলায় ওহির দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
“আপনি হিন্দু, নাকি মুসলিম?”
​ওহি কিছুটা অবাক হয়, দই কেনার সাথে ধর্মের কী সম্পর্ক? তাও সহজ গলায় উত্তর দেয়, “মুসলিম।”
​দোকানি কোনো কথা বলে না। ফ্রিজ থেকে দইয়ের পাত্রটি বের করে আনে। কিন্তু কাউন্টারে রাখার বদলে সে ক্ষিপ্রহস্তে দইয়ের ঢাকনা খুলে সরাসরি ছুড়ে মারে ওহির দিকে। ​সাদা দইয়ের আস্তরণ ওহির শরীর আর পোশাকে লেপ্টে যায়। ওহি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ঘটনার আকস্মিকতায় সে বাকরুদ্ধ। দোকানি এবার গর্জে ওঠে,
“বেপর্দা নারী! কোন সাহসে তুমি এই রূপে ঘর থেকে বের হয়েছ? মুসলিম হয়ে লজ্জা করে না তোমার? তোমরা হলে সমাজের ভাইরাস!”
​দোকানির চিৎকার শুনে মুহূর্তেই ভিড় জমে যায়। উৎসুক জনতা ঘিরে ধরে ওহিকে। ভিড়ের ফিসফিসানি স্পষ্ট শোনা যায়। কেউ কেউ হয়তো মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা মেনে নিতে পারছে না, বলছে “কাজটা ঠিক হলো না, এভাবে গায়ে দই ছোড়া উচিত হয়নি।” কিন্তু অধিকাংশের কণ্ঠেই সমর্থনের সুর, “ঠিকই তো আছে! মুসলিম মেয়ে হয়ে এমন উশৃঙ্খল পোশাক পরবে কেন? এ তো পাপ!”
​দেশে এখন ওয়াহেজের শাসন। তাকে কেউ বলে স্বৈরাচার, কেউ বা মান্য করে কঠোর শাসক হিসেবে। তার প্রণীত আইনে মুসলিম নারীদের জন্য পর্দা করা বাধ্যতামূলক। অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য ছাড় থাকলেও, মুসলিম নারীদের হিজাব-বোরকা ছাড়া বাইরে বের হওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। ওয়াহেজের এই ‘লৌহ কঠিন’ আইনের বেড়াজালে আটকা পড়ে গেছে ওহির মতো বেহায়া রুপে চলাফেরা করা অনেকেই।
​হট্টগোল শুনে পুলিশের টহল গাড়ি এসে থামে। ওহি তাদের দেখে আশা করে, হয়তো এবার সে সুবিচার পাবে। গায়ে দই ছোড়ার অপরাধে দোকানি শাস্তি পাবে। কিন্তু পুলিশ পরিস্থিতি দেখে উল্টো ওহির দিকেই এগিয়ে আসে। তাদের চোখে অপরাধী ওহিই, কারণ সে আইন ভেঙেছে।
​দায়িত্বরত পুলিশ অফিসার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ওহির হাতে জরিমানার স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বলে,
“পাবলিক প্লেসে এমন অশালীন ও আইনবিরোধী পোশাকে বের হওয়ার জন্য আপনার পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হলো।”
​ওহি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

আবারো বলছি এই গল্পের সাথে বাস্তবতা টানবেন না এটা একান্ত আমার মনের মতো।

চলবে,,,,,

কেমন হলো কমেন্ট করবেন বেশি করে।

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply