প্রেসিডেন্টওয়াহেজইবনান
পর্ব : ৩
সানজিদাআক্তারমুন্নী
সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি, আর তার সাথে উপরি পাওনা হিসেবে জনগণের একগাদা গালাগাল সব মিলিয়ে এক আকাশ বিষণ্ণতা কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফেরে ওয়াহেজ। ভেবেছিল বাড়ির চৌকাঠে পা দিলেই বুঝি একটু স্বস্তি মিলবে। কিন্তু হায়! ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই শুরু হয়ে যায় আরেক প্রস্ত নাটক। মা আর আার ছোট চাচী ওত পেতেই ছিলেন। ওয়াহেজকে দেখামাত্রই তাঁরা শুরু করেন নালিশের পাহাড়। অভিযোগের কাঠগড়ায় আর কেউ নয় সে আনভি। ওয়াহেজের ভেতরটা তিক্ততায় ভরে ওঠে। ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে মনে মনে ভাবে, ‘শালা, বিয়ে করাটাই কি তবে ভুল হলো? দুনিয়ার প্রতিটি পুরুষের কপালেই কি এই একই জ্বালা লেখা থাকে?’ বিয়ের বয়স চব্বিশ ঘণ্টাও পেরোল না, এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বউয়ের নামে বিচার সভা! আর কী সেই বিচার? বিচার হলো আনভির মৌনতা। অভিযোগের ফিরিস্তি বেশ লম্বা। আনভি নাকি সারাদিনে একবারও ঘর ছেড়ে বের হয়নি। ঊষার বান্ধবীরা এসেও ওকে ওই চার দেয়ালের মাঝেই দেখে গেছে। এখানেই শেষ নয়, সে সারাদিনে মাত্র একবেলা ভাত মুখে দিয়েছে, বাড়ির কারো সাথে দুটো কথা পর্যন্ত বলেনি। নতুন বউয়ের কাছ থেকে এমন আচরণ উনাদের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত। হাসিখুশি, চঞ্চল বউয়ের বদলে এমন গুমোট আচরণ দেখে উনারা তাই ক্ষোভে টগবগ করছেন। আর সেই ক্ষোভের আগুনের আঁচ এখন সরাসরি এসে লাগছে বিধ্বস্ত ওয়াহেজের গায়ে।
ওয়াহেজ সব অভিযোগ নীরবে হজম করে রুমে আসে। উদ্দেশ্য আনভিকে জিজ্ঞেস করা, কেন সে এমন করছে? কী কারণে অহেতুক এই যন্ত্রণা সৃষ্টি করছে? এসব ভাবতে ভাবতে সে ঘরে প্রবেশ করে, কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখে আনভি নেই। ওয়াহেজ হাতের কোটটা বিছানায় রেখে ওয়াশরুমের দিকে তাকায়। নাহ, সেখানেও নেই, ওয়াশরুমের দরজা বাইরে থেকে লক করা। তাহলে বোধহয় বারান্দায় আছে এই ভেবে ওয়াহেজ বারান্দার দিকে পা বাড়ায়।
বারান্দার দরজায় আলতো পায়ে এসে দাঁড়াতেই তার চোখে পড়ে আনভিকে। আনভি বারান্দার ফ্লোরে বসে টেবিলে রাখা ল্যাপটপে ‘Bangladesh Connect’-এ লগইন করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ল্যাপটপের পাশেই তার আইডি কার্ড পড়ে আছে। আজ সকালেই আনভির খালামণি তার আগের বাসা থেকে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র দিয়ে গেছেন, তাই ল্যাপটব আর আইডি কার্ড এখন তার হাতে। নিজের কাজের জন্য একটা সোশ্যাল মিডিয়া খুব প্রয়োজন, কিন্তু ফেসবুক বা টিকটক বর্তমানে ব্যান থাকায় বাধ্য হয়ে ওয়াহেজদের টিমের তৈরি করা এই সাইটে লগইন করার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু কিছুতেই পারছে না। একবার ব্যর্থ হয়ে আনভি নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলতে শুরু করে,
“এই প্রেসিডেন্ট একটা আস্ত বলদ! এসব বন্ধ করার কী খুব প্রয়োজন ছিল? এখন মানুষ লগইন করতে পারছে না, সবার কত সমস্যা হচ্ছে এগুলো কি তার মাথায় আসে না? সারাক্ষণ প্যাঁচার মতো মুখ বানিয়ে রাখে আর কাজ-কর্ম করে গাধার মতো। আরে ভাই, এখন আমাদের মতো মানুষের কী হবে? এটা তো লগইনই হচ্ছে না! ধুর ধুর ধুর… চলে যাব এই দেশ ছেড়ে। একটা কিডনি বিক্রি করে হলেও এই দেশ থেকে চলে যাব।”
বিরক্তিতে সব ছেড়ে যেই না আনভি উঠে দাঁড়ায় এবং আড়মোড়া ভাঙতে পেছনে তাকায়, অমনি তার হুঁশ উড়ে যায়। এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায় সে। যার ব্যাপারে এতক্ষণ এতকিছু বলছিল, সেই মানুষটিই তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে! ওয়াহেজকে দেখে আনভি আমতাআমতা করে বলে, “আ… আ… আপনি… আ…
ওয়াহেজ আনভির কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। একদম কাছে এসে আনভির দুই বাহু নিজের দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে। আনভি বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। জীবনে প্রথম কোনো পুরুষের স্পর্শ পুরুষালি ছোঁয়া কেমন হয়, এই মুহূর্তে সে হাড়াহাড়ি টের পায়। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে, মুখ দিয়ে একটা ‘টু’ শব্দ বের করার সাধ্যও তার নেই। ওয়াহেজ আনভিকে শক্ত করে ধরে একটু পাশে সরিয়ে দেয় এবং নিজে ল্যাপটপের সামনে বসে পড়ে। এরপর দ্রুত ‘Bangladesh Connect’-এ সঠিকভাবে লগইন করে দেয়। আনভি এখনো সেই আগের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কাজ শেষে ওয়াহেজ উঠে দাঁড়ায় এবং আনভির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, “ভালোভাবে নিজে করতে পারো না, আর কিছু হলেই সরকারের দোষ?”
আনভিও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। ওয়াহেজের কথার পিঠে চট করে উত্তর দেয়, “তো দোষ তো সরকারেরই। সে এমন নিয়ম চালু না করলে তো এত কিছু হয় না।”
ওয়াহেজ ঠান্ডা গলায় শুধায়, “সরকার তো বলেছে কী জন্য, কেন এসব করল। সব তো নথিপত্রেও লিখে দিয়েছে। তুমি কি সেটা পড়োনি?”
আনভি আসলে কিছুই পড়েনি, কিন্তু এখন ‘পড়িনি’ বললে তো অপমান হবে। তাই আমতাআমতা করে বলে, “পড়েছি তো তাও বললাম আরকি। আমি তো প্রেসিডেন্টকে বলেছি, আপনি কেন এত ক্ষেপে যাচ্ছেন? আপনাকে কিন্তু আমি ঘরের ভেতর প্রেসিডেন্ট মানি না। তাই প্রেসিডেন্ট হিসেবে কোনো কথা বলবেন না।”
“আমি কি তোমাকে একবারও কোনোপ্রকার কথা বলেছি?”
প্রশ্নটা আনভির দিকে ছুড়ে দিয়েই ওয়াহেজ বারান্দার এক কোণে রাখা সোফাটায় আছড়ে পড়ে। শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই, নিজের সমস্ত ভার সে সঁপে দেয় সোফার গদিতে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে মাথাটা এলিয়ে দেয় পেছনের কুশনে।
আনভি তার প্রশ্নের উত্তরে কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে যায়। শব্দগুলো গলার কাছেই দলা পাকিয়ে ওঠে, কারণ তার দৃষ্টি এখন স্থির হয়ে আছে ওয়াহেজের ওপর। লোকটা কী ভীষণ ক্লান্ত! সারাদিনের অমানুসিক ধকলে শরীরটা মনে হচ্ছে আর বইতে পারছে না, একদম নেতিয়ে পড়েছে। চোখদুটো মুদে আছে সে, চোখের নিচে স্পষ্ট কালচে ছায়া। মুখটা কেমন রক্তশূন্য, ফ্যাকাশে হয়ে আছে তার। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম আর উশকোখুশকো চুলগুলো তাকে আরও বেশি বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে। শার্টের হাতাটা কনুই পর্যন্ত গুটানো, বুকের ওপরের কয়েকটা বোতাম খোলা সেখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে ওর ক্লান্ত বুকটা কেমন ঘনঘন ওঠানামা করছে।
এই মুহূর্তে ভালোভাবে বিধস্ত ওয়াহেজ কে দেখে আনভির বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। তার মনে হয়, দিনশেষে পুরুষ মানুষের এমন নিঃস্ব, ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত চেহারার চেয়ে বোধহয় কষ্টদায়ক কোনো দৃশ্য পৃথিবীতে নেই। আনভিকে ওভাবে করুণ চোখে, পলকহীন তাকিয়ে থাকতে দেখে ওয়াহেজ খুব কষ্ট করে চোখের পাতা দুটো একটু ফাঁক করে। ক্লান্তিতে জড়িয়ে আসা গলায় ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কি হলো? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
ওয়াহেজের প্রশ্নে আনভির হুঁশ ফেরে। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে সে বলে, “না, কিছু না।”
এবার ওয়াহেজ আনভিকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি ঘর থেকে বের হওনি কেন? তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ কেন শুনলাম? শোনো মেয়ে, তোমাকে বিয়ে করেছি বাবার চাপে আর সম্মান বাঁচাতে। এখন আবার তোমার নামে কোনো অভিযোগ আমি সইতে পারব না।”
ওয়াহেজের কথাগুলো শুনে আনভি এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এরপর ম্লান হেসে বলে, “কোথায় বের হবো? কেউ তো আমায় দাম দেয় না। আমি তো যেচে বলিনি আমাকে বিয়ে করুন। আমার বাবা নামক তকমাধারী মানুষটা আমায় বাধ্য করেছেন। এখন আপনার পরিবারের মানুষ আমার সাথে এমন আচরণ করে যেন মনে হয় আমি আপনার সাথে পালিয়ে এসেছি! আপনার মা আমাকে বলেছেন, আমার মা নাকি আমার বাবার সম্পত্তির লোভে তাকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে তার মিসট্রেস হয়েছেন! অথচ আমি আমার বাবার প্রথম সন্তান। আমার মা আমার বাবার সাথে তখন ছিলেন, যখন আমার বাবা আমার সৎ মায়ের বাবার কোম্পানিতে মাত্র সাত হাজার টাকা স্যালারিতে চাকরি করতেন। আচ্ছা, এরপরও কি আপনি আমাকে বলতে পারবেন আমি কীভাবে কিছু বলব?”
এসব শুনে ওয়াহেজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। সে বুঝতে পারে তার মায়ের ভুল ছিল। কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় ওয়াহেজ। তারপর আনভিকে শান্ত গলায় বলে, “আমার মায়ের বলাটা ঠিক হয়নি আমি জানি। কিন্তু আমার মা তো এত কিছু জানেন না। তোমার বাবা সবাই কে এটাই বলেছেন আর আমার মা তিনি তা-ই বিশ্বাস করেছেন। এতে আমার মায়ের কী দোষ, তুমি বলো?”
এতটুকু বলে ওয়াহেজ রুমের ভেতরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। আনভির কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। তার মা বড়ই হতভাগ্য, মরে গিয়েও বদনামি ঘুচল না। হায়রে কপাল! আনভি কাতর গলায় পেছন থেকে ডেকে ওঠে, “ওয়াহেজ, শুনছেন?”
আনভির ডাকে ওয়াহেজের পা থেমে যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে আনভির দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ সুরে বলে, “জি, শুনছি।”
আনভি ওয়াহেজের চোখের দিকে তাকিয়ে বেদনার্ত সুরে বলে, “আমি না অবৈধ সন্তান নই। আমার মা চরিত্রহীন ছিলেন না। বিশ্বাস করবেন আমার এই কথাটা?”
ওয়াহেজ কিছুক্ষণ মৌন থাকে, তারপর ধীর গলায় বলে, “করলাম।”
এটুকু বলেই ওয়াহেজ দ্রুত রুমে চলে আসে। রুমে এসে কোনোদিকে না তাকিয়ে আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে শাওয়ার নিতে। শাওয়ার ছেড়ে পানির নিচে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। কী করবে বুঝতে পারছে না। সারাকে তার পছন্দ, বেশ পছন্দ। বিষয়টা এমন না যে সারাকে সে আগে থেকে পছন্দ করত। তাদের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর যখন দেখা-কথা হয়, তখন থেকেই সারাকে নিয়ে তার মনের কোণে আলাদা একটা অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে। সবার ক্ষেত্রেই এমনটা হয়। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর সারাকে সে নিজের স্ত্রী ভেবে নিয়েছিল। কাজকর্মের বাইরে তার সব ভাবনাই সারাকে ঘিরে আবর্তিত হতো। তাই হঠাৎ আনভিকে মেনে নিতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। আবার আনভি মেয়েটাকেও তার কেন জানি খুব অসহায় মনে হয়। আনভির অবস্থাটা সে বুঝতে পারছে, খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। কিন্তু তারপরও এই মুহূর্তে আনভিকে মেনে নেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব।
গোসল শেষে একটা সাদা টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার পরে ওয়াহেজ ওয়াশরুম থেকে বের হয়। বের হয়েই দেখে, আনভি রুমে রাখা টেবিলের ওপর খাবার সাজাচ্ছে। আনভিকে খাবার রাখতে দেখে ওয়াহেজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করে, “তুমি খাবার কেন আনলে? নিচে গিয়ে খেয়ে আসতে।”
আনভি পেছনে ঘুরে ওয়াহেজের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি খেতে গিয়েছিলাম। খাওয়া শেষে আপনার মা বললেন আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসতে, তাই এলাম।”
“ওহ।”
ছোট্ট করে উত্তর দিয়ে ওয়াহেজ চেয়ারে বসে পড়ে। তারপর ‘বিসমিল্লাহ’ বলে খেতে শুরু করে। ওয়াহেজকে খেতে দেখে আনভি মনে মনে ভাবে, বিছানায় রাখা ওয়াহেজের কোটটা ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে আসি। এতটুকু ভেবে সে সরল মনেই ওয়াহেজের কোটে হাত বাড়ায়। কোট স্পর্শ করতেই ওয়াহেজ একপ্রকার ধমকে ওঠে, “এই! আমার জিনিসে হাত দেবে না। স্ত্রী হওয়ার চেষ্টা একদম করো না।”
চলবে,,,
কেমন হচ্ছে বলবেন কিন্তু 😊 আগামীকাল পাবেন ৪ নাম্বার পর্ব ইনশাআল্লাহ।
Share On:
TAGS: সানজিদা আক্তার মুন্নী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান গল্পের লিংক
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ১
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৪
-
তুষারিণী পর্ব ৪
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ২
-
তুষারিণী পর্ব ৬
-
তুষারিণী পর্ব ২
-
তুষারিণী পর্ব ১
-
তুষারিণী পর্ব ৩
-
তুষারিণী পর্ব ৫