Golpo romantic golpo প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান

প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ১৩


প্রেসিডেন্টওয়াহেজইবনান

পর্ব : ১৩

সানজিদাআক্তারমুন্নী

সকাল নয়টা।
ঘড়ির কাঁটায় সকাল নয়টা বাজলেও, দিনের আলোয় এখনও ভোরের আড়মোড়া ভাঙার ক্লান্তি। আকাশের ক্যানভাসে আজ নীলের বদলে একচেটিয়া রাজত্ব করছে ধূসর আর কালচে মেঘের দল। রোদ আর মেঘের চিরচেনা লুকোচুরি খেলা আজ স্তব্ধ সূর্য মামা মনে হয় অভিমান করে মেঘের পুরু চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। চারপাশ জুড়ে ভেসে যাচ্ছে স্নিগ্ধ, স্যাঁতস্যাঁতে হাওয়া। সে হাওয়ায় মিশে আছে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর বুনো পাতার ঘ্রাণ। রাস্তার ধারের গাছগুলো স্থির দাঁড়িয়ে আছে, কোনো এক অজানা বিষণ্ণতায় বা নিবিড় অপেক্ষায় ডুবে আছে তারা। মাঝে মাঝে হঠাৎ দমকা হাওয়া এসে গাছের পাতাগুলোকে কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, আর টুপটাপ ঝরে পড়ছে পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির দু-এক ফোঁটা।
সকাল নয়টার যে চেনা ব্যস্ততায় আনভি থানায় এসেছে। থানার পরিবেশটা ভারী উত্তেজিত। আনভি একটা সেলের বাইরে বসে আছে, আর ওপাশে ওর বাবা, ইয়াহিয়া। দুজনের মাঝখানে লোহার মোটা গরাদ। কেউ কোনো কথা বলছে না। আনভি তীক্ষ্ণ, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাবা নামক মানুষটার দিকে। মাত্র এক দিনেই তার কী করুণ দশা হয়েছে! দেশের আইনের এখন যে কঠোর রূপ, তার নির্মমতা ইয়াহিয়ার সারা শরীরে খোদাই করা। মারের চোটে সামনের তিন-চারটে দাঁত পড়ে গেছে, মুখমণ্ডল এমনভাবে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে যে তাকানোর মতো অবস্থা নেই। বেশ কিছুক্ষণ এই শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতার পর ইয়াহিয়া মুখ খোলেমভাঙা, ঘড়ঘড়ে গলায় প্রশ্ন করেন, “আমার এই পরিণতি দেখে তোমার অনুভূতি কেমন?”
আনভি এক পলকের জন্য শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে উনার দিকে। তিনি যতই অপরাধী হোক, একসময় তো তাকে নিজের বাবা বলেই জেনে এসেছে। আনভির বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সে শান্ত কণ্ঠে বলে, “আপনার এই পরিণতি দেখে আমার ভালোও লাগছে, আবার খারাপও লাগছে। তবে, এটাই আপনার প্রাপ্য! আমার মায়ের সাথে আপনি যা করেছেন, তার জন্য এই শাস্তিটুকুও যথেষ্ট নয়।”
কথাটা শুনে ইয়াহিয়া হঠাৎ হেসে ওঠেন। ফাটা ঠোঁট নিয়ে বীভৎসভাবে হাসতে থাকেন তিনি। আনভি ভীষণ ভাবে ভড়কে যায়। বাবার হলো কী? এমন উদ্ভট আচরণ করছে কেন তিনি?হঠাৎই হাসি থামিয়ে দেন ইয়াহিয়া। তার চোখদুটো বরফের মতো শীতল হয়ে ওঠে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে তিনি বলেন, “তোমার মায়ের সাথে আমি কিছুই করিনি! আর তুমি তুমি আমার আসল মেয়ে নও। এতদিন আমার আর তোমার মায়ের সম্পর্ক কিংবা তোমার জন্ম পরিচয় নিয়ে যা যা জেনে এসেছ, তার সবটাই ছলনা।”
কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই আনভির মনে হয় ওর মাথার ভেতর বাজ পড়েছে। নিজের জন্মপরিচয় নিয়ে এমন একটা কথা শোনার পর কার মাথা ঠিক থাকে! আনভির গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে সে কাঁপা গলায় বলে, “আপনার মাথা কাজ করছে না। অহেতুক আজেবাজে কথা বলবেন না।”
ইয়াহিয়া এবার একটা মোক্ষম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, “তোমার মায়ের সাথে আমার কোনো ছবি দেখেছ কখনো? বা আমাদের একসাথে থাকার কোনো প্রমাণ? জেসমিনও তোমার কেউ না।”
নিজের খালামণি জেসমিনের নাম শুনে আনভি আর স্থির থাকতে পারে না। অস্থিরতা তাকে গ্রাস করে। সে ছটফট করতে করতে গরাদের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে, “তাহলে আমার আসল বাবা কে? সত্যটা বলুন আমাকে!”
“বলব না। তবে এতটুকু জেনে রাখো, তুমি আমার বসের মেয়ে।”
এই একটা কথা ছুঁড়ে দিয়েই ইয়াহিয়া উঠে সেলের পেছনের দিকে চলে যান। আনভি পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকে। কী শুনল সে এইমাত্র? সে কার সন্তান? তার আসল পরিচয় কী? জেসমিন খালামণি কেন তার নিজের হবে না? ইয়াহিয়ার কথাগুলো কি সত্যি, নাকি স্রেফ একটা চাল? মাথাটা প্রচণ্ড ভনভন করতে শুরু করে আনভির। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাড়াতে পারে না। হন্তদন্ত হয়ে সেলের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। পুরো পৃথিবীটা যেন তার চোখের সামনে দুলছে, ভীষণ অশান্ত লাগছে চারপাশ। বাইরে বেরোতেই ওয়াহেজের সাথে মুখোমুখি ধাক্কা লাগে ওর। আনভি থানায় এসেছে জেনে ওয়াহেজ ওকে মানাতে ছুটে এসেছে এখানে। আনভিকে এমন বিধ্বস্ত আর হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে ওয়াহেজ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সে আনভির দুই বাহু শক্ত করে ধরে বলে, “কী হয়েছে সামাইরা? তুমি ঠিক আছো?”
আনভির গলাটা এখনও শুকনো সে এক ঝটকায় ওয়াহেজের হাত সরিয়ে দেয় নিজের বাহু থেকে। তারপর ওয়াহেজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রুক্ষ গলায় বলে, “আপনি এভাবে সবার সামনে আমার হাত ধরছেন কেন? ছাড়ুন হাত! কিচ্ছু হয়নি আমার।”
ওয়াহেজ একপ্রকার টেনে আনভিকে পাশের একটা বেঞ্চে বসিয়ে দেয়। তারপর একজন গার্ডকে ইশারা করে পানি আনতে বলে। আনভির ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে সে উদ্বিগ্ন গলায় বলে, “কী কথা হয়েছে, বলো তো? কী হয়েছে তোমার? এত আপসেট কেন? যে কারণেই হোক, আমাকে খুলে বলো।”
আনভি ওয়াহেজের বাঁধন থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বিরক্তির সুরে বলে, “ছাড়ুন আমার হাত! কিচ্ছু হয়নি আমার।”
ওয়াহেজ এবার উঠে এসে ধীর পায়ে আনভির সামনে একেবারে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। আনভির কোলের ওপর রাখা হাতদুটো নিজের দুই হাতে আলতো করে আঁকড়ে ধরে ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলে, “রাগ কোরো না সামাইরা, প্লিজ বলো কী হয়েছে। আমাকে মাফ করে দাও না!”
থানাভর্তি পুলিশ, কত কত নারী ও পুরুষ অফিসার, সাথে এত এত গার্ড সবার সামনে দেশের প্রেসিডেন্ট এভাবে হাঁটু গেড়ে বসে মাফ চাইছে! বিষয়টা আনভির কাছে প্রচণ্ড অস্বস্তিকর ঠেকে সে চোখ রাঙিয়ে ফিসফিস করে বলে, “উঠুন বলছি!”

ওয়াহেজ তো নাছোড়বান্দা,
“আগে কথা দাও আমার সাথে বাড়ি যাবে। মাফ না হয় পরে করলেও চলবে,”
আনভিরও এখন ওয়াহেজকে প্রয়োজন। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে যে ওয়াহেজ তার সাথেই থাকতে চায়। একটা সুযোগ তো দেওয়াই যায়! তা ছাড়া বাড়ি থেকেই তো সে মনে মনে পণ করে এসেছে, ওয়াহেজ নিতে এলে তার সাথেই চলে যাবে। আনভি তাই সামান্য মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলে, “আচ্ছা, উঠুন এবার।”
সম্মতি পেয়ে ওয়াহেজের চোখেমুখে রাজ্যের খুশি উপচে পড়ে। সে দ্রুত উঠে আনভির ঠিক পাশটিতে বসে। আনভি স্থির দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। একবার ভাবে ওয়াহেজকে সব খুলে বলবে, পরক্ষণেই আবার মনে হয়, ‘না থাক, এখন এসব বলার কোনো প্রয়োজন নেই।’ এর মাঝেই গার্ড পানির বোতল নিয়ে আসে। ওয়াহেজ সেটা আনভির হাতে দেয়। আনভি বোতলটা হাতে নিয়েই উঠে দাঁড়ায়, “আমি বাড়ি যাব।”
থানায় ওয়াহেজের বেশ কিছু জরুরি কাজ ছিল, কিন্তু এখন সেসবে মন দিলে আনভিকে নিয়ে যাওয়া হবে না। তাই সেও তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “হ্যাঁ, চলো।”
কথাটা শুনে ওয়াহেজের উত্তরের অপেক্ষা না করেই আনভি হনহন করে থানা থেকে বেরিয়ে যায়। সোজা গিয়ে ওঠে ওয়াহেজের গাড়িতে। ওয়াহেজ আজ নিজেই ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে সাথে আনভি আছে বলে কথা! ওয়াহেজের গাড়ির আগে সাতটা গাড়ির বহর চলতে শুরু করে, সবগুলোই গার্ডদের। আনভি সিটে বসেছে ঠিকই, কিন্তু সিটবেল্ট বাঁধেনি। ওয়াহেজ সেটা খেয়াল করে আনভির দিকে ঝুঁকে আসে বেল্টটা আটকে দেওয়ার জন্য। আনভির হঠাৎ ভীষণ অস্বস্তি হতে শুরু করে। ওয়াহেজ একদম ওর খুব কাছে চলে এসেছে, ওর ভারী নিশ্বাসের আঁচড় এসে পড়ছে আনভির মুখে। আনভি চোখ বুজে, দাঁত চেপে বলে, “এতক্ষণ লাগে নাকি একটা বেল্ট বাঁধতে? সরুন, আমি নিজেই বেঁধে নিচ্ছি।”
আনভির কথা শুনে ওয়াহেজ আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারে না। সিটবেল্ট বাঁধাটা তো একটা বাহানা মাত্র! সে টুপ করে আনভির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। আনভি মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় কী হলো এটা! ওয়াহেজ কী করল! আনভির ঠোঁটে পর পর কয়েকবার গভীর চুম্বন এঁকে দিয়ে ওয়াহেজ নিজের সিটে গিয়ে বসে। ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি ঝুলিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলে, “আহ্! শান্তি!”
আনভি রাগী চোখে ওয়াহেজের দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে ওঠে, “কী করলেন এটা? শয়তান পুরুষ! একটুও লজ্জা করে না আপনার? নির্লজ্জ, বেহায়া কোথাকার!”
ওয়াহেজ গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে আড়চোখে আনভির দিকে তাকায়। তারপর বেশ রসিকতার সুরে বলে, “কী? আবার করে দেখাব? দেখাই না, প্লিজ? তোমার ওই ঠোঁটজোড়া না আমাকে চুম্বকের মতো টানে! আমি আর কী করব বলো, সব দোষ তো তোমার ঠোঁটের, আমার না!”
একে তো বাবার কাছে শোনা ওই ভয়ংকর সত্যিটার ধাক্কা, তার ওপর ওয়াহেজের এই ফাজলামো সব মিলিয়ে আনভি একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সে ওয়াহেজের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। আনভিকে একদম চুপ মেরে যেতে দেখে ওয়াহেজ এবার গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে, “কী হলো? এত চুপ যে? কী হয়েছে তোমার? তোমার বাবার সাথে কী কথা হলো ভেতরে?”
আনভি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “কিছু হয়নি। জাস্ট একটু কষ্ট লাগছিল। লোকটা তো আমার বাবা, যতই অপরাধী হোক না কেন!”
ওয়াহেজ স্পষ্ট বুঝতে পারে আনভি কিছু একটা গোপন করছে। তারপরও সে বিষয়টা নিয়ে আর ঘাঁটায় না। প্রসঙ্গ পাল্টে দিয়ে সহজ গলায় বলে, “কিছু খাবে?”
“না, কী আবার খাব! প্রেসিডেন্টের গাড়ি রাস্তায় থামিয়ে খাবার কেনাটা বড্ড বেমানান দেখাবে। আপনি বরং আপনার এই উদ্ভট চিন্তাভাবনাগুলো নিজের কাছেই রাখুন।”

এ শুনে ওয়াহেজ ভ্রু কুঁচকে বলে,

“উদ্ভট হতে যাবে কেন?আমি আমার স্ত্রীর জন্য খাবার কিনব। বাইরের পৃথিবীর কাছে আমি প্রেসিডেন্ট হতে পারি, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত জীবনে আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। কারও সন্তান, কারও স্বামী, আর আর কয়দিন পর হয়ে যাব একজন বাবা!”
‘বাবা হয়ে যাব’ কথাটা কানে যেতেই আনভি চট করে ওয়াহেজের দিকে তাকায়। ওর এই আকস্মিক দৃষ্টি দেখে ওয়াহেজের কপালে ভাঁজ পড়ে ও বলে, “কী হলো, এভাবে তাকাচ্ছ কেন? আমি তো বাবা হবই, তাই না? আর তুমি হবে মা!”
কথাটা শুনে আনভির মনের গহিনে আলাদা এক আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। তবুও সে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “হুম, শখ তো দেখছি ষোলো আনা! স্বপ্ন একটু কমই দেখুন না!”
ওয়াহেজ শব্দ করে হেসে ওঠে বলে, “এভাবে মুখ ঘোরালে তো চলবে না বেগম সাহেবা! আপনাকে আমার বাচ্চার মা তো হতেই হবে।”
“তো আমি কি না করেছি নাকি? বিয়ে যখন হয়েছে, বাচ্চা তো হবেই।”
ওয়াহেজ এবার একটু নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, “আপনি কি আমাকে মাফ করেছেন ম্যাডাম?”
“না, করিনি। আপনার সাথে বাড়ি ফিরে যাচ্ছি মানেই যে আপনাকে মাফ করে দিয়েছি এমনটা ভাববেন না কিন্তু!”
“না না, তা আমি ভাবছিও না। বাপরে বাপ, কী অভিমান তোমার! তুমি আমাকে শাস্তি দিয়ো, কোনো সমস্যা নেই। আমি সারাজীবন মাথা পেতে নেব সেই শাস্তি। জানো, গতকাল রাতে তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে পারিনি বলে আমার একটুও ঘুম আসেনি। বারবার শুধু মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি সব হারিয়ে ফেলেছি. সব!”
কথাগুলো শুনে আনভি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। গত রাতে তো তার বুকের ভেতরটাও ভীষণ যন্ত্রণায় দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই কষ্টের কথা সে ওয়াহেজকে বোঝাবে কী করে? নীরবতা ভেঙে আনভিকে আনমনা হতে দেখে ওয়াহেজ নিচু স্বরে ডেকে বলে, ‘ সামাইরা শান্তি দিও, শাস্তিও দিও তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সঙ্গ দিও ছেড়ে যেও না আমায়।”

আনভি এ কথা শুনে মুচকি হেসে বলে, “আচ্ছা। “
।।।

আনভিকে নিয়ে নিজের বাড়িতে পা রাখে ওয়াহেজ। সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই বাড়ির পরিবেশটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। উপস্থিত প্রতিটি মানুষের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ফলার মতো বিঁধতে থাকে আনভির গায়ে। একে তো আনভিকে বাড়ির কেউ আগে থেকেই খুব একটা পছন্দ করে না, তার ওপর আনভির বাবাকে সদ্যই দেশদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চারপাশের বাতাসে এক চাপা ক্ষোভ আর বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
ওয়াহেজ বুঝতে পারে, এই মুহূর্তে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে এরা আনভিকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। বাড়ির লোকেদের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার বিষয়টা পরে ভাবা যাবে, আপাতত আনভিকে এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তাই কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই আনভিকে নিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে যায় সে।
ঘরের দরজা বন্ধ হতেই আনভির বুকের ভেতরে আটকে থাকা শ্বাসটা যেন সশব্দে বেরিয়ে আসে। সে অসহায় দৃষ্টিতে ওয়াহেজের দিকে তাকিয়ে বলে, “ওয়াহেজ, আপনি কি আমায় এখানে এনে কোনো ভুল করলেন? দেখলেন না সবাই আমার দিকে কেমন চোখে তাকাচ্ছে! তারা তো এখন আমার সাথে স্বাভাবিকভাবে কথাই বলবে না।”
ওয়াহেজ এগিয়ে এসে পরম মমতায় আনভির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “তুমি গিয়ে আগে বোরখাটা খুলে এসো। কে কী ভাবল বা কী বলল, এসব দেখে কোনো লাভ নেই। তাদের যদি তোমাকে নিয়ে এতই সমস্যা থাকে, তবে আমি তোমাকে নিয়ে আলাদা থাকব। তবুও এসব নিয়ে তুমি আর টেনশন নিও না, সামাইরা।”
ওয়াহেজের এমন কথায় আনভি যেন থমকে যায়। বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে ভাবে, এই মানুষটা তার জন্য এতটা সংবেদনশীল? তার জন্য নিজের পরিবার ছেড়ে আলাদা হতেও দ্বিধা করবে না! কিন্তু না, এমনটা হতে দেওয়া যায় না। এতে আনভিকেই তার পরিবারের কাছে প্রধান অপরাধী হয়ে উঠতে হবে। এমনিতেই তারা আনভিকে দেখতে পারে না, এরপর তো একেবারে চোখের বিষ হয়ে উঠবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আনভি নিজেকে শান্ত করে। তারপর কাপড় রাখার ঘরে প্রবেশ করে বোরখা বদলে বেরিয়ে আসে। এখন আর অন্য কিছু ভাবার সময় নেই। আজ তার বাবা তাকে যে ভয়ানক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, তা এখনই ওয়াহেজকে জানানো খুব জরুরি।
আনভি তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসতেই ওয়াহেজ তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে পেছন থেকে দুহাতে আনভির কোমর জড়িয়ে ধরে। আনভির ঘাড়ের কাছে মুখ ডুবিয়ে আলতো করে কয়েকবার চুমু এঁকে দেয়। আনভিও বাধা না দিয়ে নিজের হাতটা উঁচিয়ে ওয়াহেজের চুলে বিলি কাটতে কাটতে ডাকে, “ওয়াহেজ, আপনাকে আমার কিছু বলার আছে।”
আনভির ঘাড়ের কাছে মুখ রেখেই ফিসফিস করে ওয়াহেজ বলে, “জি, বলুন ম্যাডাম।”
আনভি এক বুক গভীর শ্বাস টেনে নিয়ে নিজের ভেতরের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে বলে ওঠে, “আমি… আমি না আমার বাবার আসল সন্তান নই ওয়াহেজ। আমার বাবা আজ নিজেই আমাকে এ কথা বলেছেন। আমি কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না, কী করব বুঝতে পারছি না। তিনি কি সত্যিই বলছেন?”
আনভির এমন বিস্ফোরক কথায় ওয়াহেজের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা যায় না সে একদম শান্ত থাকে, এ খবর তার কাছে মোটেও নতুন কিছু নয়। বিন্দুমাত্র অবাক না হয়ে সে আনভিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করায়। আনভির দুই বাহুতে হাত রেখে, সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে স্থির কণ্ঠে বলে, “হ্যাঁ, কথাটি সত্য।”
আনভির চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যায়। অবিশ্বাসের সুরে সে প্রশ্ন করে, “আপনি আপনি কী করে জানেন?”
ওয়াহেজ একবার সতর্ক দৃষ্টিতে ঘরের চারপাশটা দেখে নেয়। তারপর আনভির মুখের দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় শান্ত ভঙ্গিতে বলে, “তোমার আসল বাবাকেও আমি খুব ভালো করেই চিনি, আর তুমিও তাকে চেনো। দেখা করবে তার সাথে?”
কথাগুলো শুনে আনভি আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়ে। ওয়াহেজ এত কিছু কী করে জানে? বুকের ভেতরটায় তোলপাড় শুরু হয়ে যায় তার। অস্থির হয়ে ছটফট করতে করতে ও বলে ওঠে, “হ্যাঁ, দেখব। আমাকে নিয়ে চলুন তার কাছে এখনই নিয়ে চলুন!”
ওয়াহেজ আনভির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে আগলে ধরে। এক অদ্ভুত দৃঢ়তার সাথে বলে, “চলো, সময় এসে গেছে।”
এটুকু বলেই আর কালক্ষেপণ না করে আনভির হাত ধরে তাকে নিয়ে ঘরের বাইরে পা বাড়ায় ওয়াহেজ।

চলবে,

আর মাত্র দুই পর্ব তারপর গল্প টা শেষ সবাই রেসপন্স করিয়েন তো

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply