প্রেয়সীর_অনুরাগ
লেখনিতে —#সাদিয়াজাহানসিমি
পর্ব_০৭ ( প্রথম অংশ)
কেটে গেছে ছয়টা মাস। এই ছয় মাসে অনেক কিছু পাল্টেছে। উদ্যান সুইজারল্যান্ড যাওয়ার আজ ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। সবাই দৈনন্দিন জীবনের কাজের ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। উদ্যানের সাথে বাড়ির সবার কথা হয় নিয়ম করে। শুধু রাফসা বাদে। উদ্যান কখনো রাফসার সাথে কথা বলেনি বা বলতে চায়নি। রাফসার সাথে বাড়ির কেউ কথা বলতে — বললে উদ্যান সবসময় এড়িয়ে গেছে। রাফসা কিছু মনে করেনা। ও নিজেও কথা বলতে চায়নি। এখন আর হুটহাট করে কাঁদে না রাফসা। নিজেকে যেন পাথরে তৈরি করেছে। কেউ চাইলেও সহজে ভাঙ্গতে পারবে না। আসলেই কি তা? কিশোরী মনের প্রথম ভালোবাসা এতো সহজে ভোলা যায়? যারা বলে — স্ট্রং হতে, সেই মানুষটাকে ভুলে যেতে,, তারা কখনো ভালোবাসার মানে বোঝেনি। প্রথম ভালোবাসা ভালো এতো সহজ নয়। প্রথম ভালোবাসা পূর্ণতা না পেলেও — তা সারাজীবন মনের এককোনে রয়ে যায়। যদি আবার হয় একতরফা ভালোবাসা —
আজ এপ্রিলের সাত তারিখ। দশ তারিখ থেকে রাফসার এসএসসি পরীক্ষা আরম্ভ হবে। এখন রাফসা পড়াশোনায় খুব মনোযোগী। ওদের স্কুল থেকে বিদায় দিয়েছে আরো অনেক আগেই। তবুও আজ একবার সবাই স্কুলে যাবে।
রাফসা স্কুল ড্রেস পড়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে গিয়ে খেয়াল করে, চুল আর আগের মতো নেই। এখন কোমড় ছাড়িয়ে নিচে নেমেছে। কখনো মাথায় তেল না দেওয়া মেয়েটা , চুলে তেল দিয়েছে। যত্ন করেছে নিজের। গায়ের রং টা এখন শ্যামলা না — অনেকটা উজ্জ্বল হয়েছে। আগের থেকে কিছুটা মুটিয়েছে।
চুল আঁচড়ে রাফসা বেণি করে নেয়। তারপর ক্লিপ দিয়ে বেঁধে নিল। হিজাব নিয়ে বাঁধতে শুরু করে। এমন সময় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে হুমাইরা ফরাজী। নাস্তা গুলো হাত থেকে নামিয়ে টেবিলে রাখে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল।”আমার মেয়েটা কত পরিবর্তন হয়েছে। চেনাই যায় না। আগের রাফসা আর এখনকার রাফসা আকাশ পাতাল পার্থক্য।”
মায়ের কথা শুনে রাফসা পেছনে ফিরে। এই কথায় রাফসার মুখে বিষাদের হাসি ফুটে উঠে। পুনরায় হিজাব বাঁধতে বাঁধতে মৃদু হেসে বলল।সময় মানুষকে পরিবর্তন করে দেয় আম্মু। সব পরিস্থিতির স্বীকার।”
হুমাইরা ফরাজী নুডুলস এর বাটি নিয়ে রাফসার সামনে এসে দাঁড়ায়। বাটি থেকে এক চামচ নুডুলস নিয়ে মুখের সামনে ধরে। রাফসা তা মুখে পুরে নেয়। হুমাইরা ফরাজী মেয়ের মুখ পানে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল।”তুই কি এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিস মা? তোর এই পরিবর্তনের পিছনের কারণটা কি?”
“তেমন কিছু না।”
রাফসাকে যতবার হুমাইরা ফরাজী এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছে ততবারই এড়িয়ে গেছে। এই ছয় মাসে হুমায়রা ফরাজী মেয়েকে হাজার বার এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছে। তবে ফলাফল শূন্য সবসময়ই। ওনি আর কিছু জিজ্ঞেস করেননি। রাফসাকে খাইয়ে দিয়ে চুপচাপ চলে যায় রুম থেকে। রাফসা হাসে। অবাক হয় এমন পরিবর্তনে। বয়স কত ওর? ষোলো চলছে। তবে ম্যাচিউরিটি যেন আকাশ ছুঁয়েছে। আয়নায় নিজেকে আর একবার দেখে নিল। তারপর কিছু টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। রাফসাকে দেখে রিশান এগিয়ে আসে।
“নাস্তা করেছিস?”
রাফসা মাথা নাড়িয়ে বলল।”হ্যাঁ। নুডুলস খেয়েছি।”
“আয় আমি নিয়ে যাচ্ছি স্কুলে।”
রাফসা বাঁধা দিয়ে বলল।”না। তুমি গিয়ে রেস্ট করো। জ্বর নিয়ে এইভাবে টইটই করবে না। যাও।”
রিশান বোনের কেয়ার দেখে হাসে। মায়ের মতো শাসন করে।হেসে বলল।”কিছু হবে না। চল, ভাইয়া দিয়ে আসি।”
রাফসা কিছু শোনে না। বেরিয়ে যেতে যেতে বলল।”আমি চলে যাচ্ছি। তুমি রুমে যাও। আল্লাহ হাফেজ।”
রিশানকে আর কিছু বলতে না দিয়ে চলে যায় রাফসা। রিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
.
সুইজারল্যান্ডের সেই হাসপাতালটা যেন শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়—একটা নীরব, শুদ্ধ সভ্যতার প্রতিচ্ছবি। আল্পস পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা কাঁচে মোড়া বিশাল ভবনটি দূর থেকেই ঝকঝক করে। ভেতরে ঢুকলেই নাকে আসে জীবাণুমুক্ত বাতাসের শীতল গন্ধ, চারপাশে নিঃশব্দে চলা আধুনিক যন্ত্রপাতির হালকা শব্দ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি।
উদ্যানের কেবিনটা হাসপাতালের একদম উপরের ফ্লোরে। কেবিনের একপাশ জুড়ে বিশাল কাচের জানালা—সেখানে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বরফে ঢাকা পাহাড়, ধীরে ধীরে ভেসে যাওয়া মেঘ, আর নিচে ছোট ছোট কটেজের ছাদ। দিনের আলো কেবিনে ঢুকে পড়ে নরম রুপালি ছায়া হয়ে।
কেবিনের ভেতরে সবকিছু পরিমিত ও পরিশীলিত—হালকা ধূসর রঙের দেয়াল, কাঠের মসৃণ মেঝে, একপাশে আধুনিক হাসপাতালের বেড। পাশে মনিটর, যেখানে হৃদস্পন্দনের রেখা ওঠানামা করে—টুপটাপ শব্দে যেন জীবনের হিসাব রাখছে। দেয়ালের পাশে একটি ছোট বুকশেলফ, সেখানে মেডিক্যাল জার্নাল, হার্ট সার্জারির রেফারেন্স বই, আর একটা পুরনো নোটবুক—যেখানে উদ্যান মাঝেমধ্যে নিজের ভাবনা লিখে রাখে।
উদ্যান শুধু একজন ডাক্তার নয়—সে হৃদয়ের ভেতরের ভাষা বোঝে। তার হাতের স্পর্শে অসংখ্য হৃদয় নতুন করে ছন্দ পেয়েছে। অপারেশন থিয়েটারে দাঁড়ালে তার চোখ ভীষণ শান্ত, কণ্ঠ সংযত কিন্তু দৃঢ়। স্ক্যালপেল হাতে নিলে তার আঙুল কাঁপে না—কারণ সে জানে, একটুখানি ভুল মানেই কারো জীবনের শেষ অধ্যায়।
হার্ট সার্জারির সময় উদ্যান ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকে। বুক খোলা, হৃদয় দৃশ্যমান—রক্তের গন্ধ, যন্ত্রের তীক্ষ্ণ শব্দের মাঝেও তার মন স্থির থাকে। বাইপাস হোক কিংবা ভালভ রিপ্লেসমেন্ট—প্রতিটা ধাপে তার মস্তিষ্ক চলে নিখুঁত অঙ্কের মতো। সে জানে কোন ধমনী কতটুকু চাপ সহ্য করতে পারে, কোন মুহূর্তে হৃদয়কে থামিয়ে আবার চালু করতে হবে।
সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে রাতে বাড়ি ফিরে শূন্যতা অনুভব করে কিছুর। জিহান, উদ্যান একসাথে এক ফ্লাটে থাকে। উদ্যান কেবিনে এসে বসেছে — দীর্ঘ সাত ঘণ্টার অপারেশন সাকসেসফুল হলো। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলো। ওয়ার্ড বয় সকালের ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। স্যুপ, সালাদ, সকালের হালকা নাস্তা। উদ্যান এইসব খেতে বিরক্তবোধ করল। পেটের খিদে থাকায় স্যুপ খেয়ে নেয়। উদ্যানের খাওয়ার মাঝেই ফোন বেজে উঠলো। ফোন হাতে নিয়ে কাঙ্ক্ষিত নাম্বার দেখে দ্রুত রিসিভ করে।
“জ্বী আঙ্কেল। সব রেডি তো?”
ওপাশের ব্যক্তির কথা শোনে উদ্যানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। টুকটাক কিছু দরকারি কথা বলে ফোন রেখে দিল। উঠে এসে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত শহরের রাস্তা দেখে ঠোঁটে মৃদু হাসি এনে বলল।”অপেক্ষার প্রহর শেষ। ফাইনালি।”
ঠোঁটে মুচকি হাসি বিদ্যমান। একটা খবরে যেন দীর্ঘ সাত ঘণ্টার কষ্ট দূর হয়ে গেছে।
.
রাফসা স্কুলে এসে পৌঁছায়। কিছুটা দেরি হয়ে গেছে আসতে। সবাই ইতোমধ্যে ক্লাসে ঢুকে পড়েছে। রাফসাও সেই পানে ছুটে। ক্লাসছর সামনে এসে দাঁড়ায়। অনুমতি নিয়ে বলল।
“স্যার মে আই কামিন?”
উজ্জ্বল স্যার কথায় বাঁধা পেয়ে থামে। রাফসাকে দেখে আফসোস করে বলল।”স্কুল জীবনের শেষ দিনটায় ও তুমি লেইট করে এসেছো। তুমি লেইট লতিফ থেকে গেলে। আসো।”
ক্লাসের সবাই হাসে। রাফসা অনুমতি পেয়ে ভেতরে ঢুকে। আজ সাবিকুন সায়মা একসাথে বসেছে। রাফসার জন্য জায়গা ধরে রেখেছিল। ও আসতেই চেপে বসে বসার জন্য জায়গা করে দিল। রাফসা বসে পড়ে। উজ্জ্বল স্যার তার মূল্যবান কথা শেষ করে বলল।”তোমরা যদি পরীক্ষায় ফেইল করো। কি হবে?”
সাতারুল হায় হুতাশ করে বলে।”স্যার এমন পাপের কথা বলবেন না। বাড়ির থেকে বের করে দিবে।”
“সমস্যা নেই। বের করে দিলে একটা উপায় আছে। আমাদের স্কুলের সামনে চায়ের দোকান খুলবো। যেই ছেলেরা ফেইল করবে তারা ওখানে কাজ করবে।”
মেয়েরা সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। ছেলেরা ওদের দিকে গরম চোখে তাকায়। আশরাফুল বলল।”আর স্যার যদি মেয়েরা ফেইল করে তাহলে?”
“তাহলে আর কি। রিক্সায় আলার সাথে বিয়ে কনফার্ম।”
এইবার ছেলেরা হেসে উঠলো। মেয়েদের মুখটা চুপসে যায়। উজ্জ্বল স্যার বলল।”আচ্ছা। আজ আমাদের শেষ দিন। একটু মজা করা যাক।”
ভরা ক্লাসে উজ্জ্বল স্যারের নজর পড়ে রাফসার পানে।ওকে বলে ।
” রাফসা, আমাদের একটা গান গেয়ে শোনাও তো।”
রাফসা চোট করে দাঁড়িয়ে যায়। যেন অপেক্ষায় ছিল। ও জানতো, ওকেই বলবে গান গাইতে। দাঁত কেলিয়ে হেসে, সুর টানে।
ইঁদুর মারেন,তেলাপোকা মারেন, ছাড়পোকা মারেন
জাদুর মলম,ম্যাজিক মলম।
দাগ দিলেই মরে ঘোষা দিলেই মরে
চোরার ঘরের চোরা, তেইলা চোরা, জায়গায় খায়, জায়গায় ব্রেক।
কাইত হইয়া খায়,চিত হইয়া মরে,লাফাইয়া খায়,দাপাইয়া মরে।
ময়নার মার ঘুম নাই, সখিনার মার খেতা নাই।
ইঁদুর চিকার মারামারি নষ্ট করে বাসাবাড়ি, ওষুধ লাগান তাড়াতাড়ি।
ধরা পড়লে জামিন নাই, ইঁদুর তোর রক্ষা নাই।
একদাম ২০ টাকা, ২০ টাকা,২০ টাকা..!!!
গানটা বলেই বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল রাফসার। আর সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। উজ্জ্বল স্যারের যেন অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম। কেশে বলল।”তোমায় গান গাইতে বলেছি। বিজ্ঞাপন করতে না।”
রাফসা ভাব নিয়ে বলল।”স্যার একই। যেই লাউ সেই কদু।”
এইভাবে ক্লাসে মাতিয়ে তুলেছে সবাই। আজ যেন স্বরণীয় করবে দিনটা।
গতকালের রাতটা অস্বাভাবিক রকমের ভারী ছিল। বাতাসে যেন নিঃশ্বাস নেওয়ারও শব্দ ছিল না। শহরের এক প্রান্তে, সরু গলির মুখে আলো–আঁধারির ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকজন ছায়ামূর্তি। তাদের চোখে ছিল ক্রোধ, মুখে ছিল ক্ষমতার দম্ভ। রাজনীতির নামে জমে ওঠা দীর্ঘ দিনের বিদ্বেষ সেই রাতে রূপ নিয়েছিল ভয়ংকর এক সিদ্ধান্তে।
বিরোধী সেই কর্মী—একজন সাধারণ মানুষ, দিনের বেলায় যে চা খেত দোকানের বেঞ্চে বসে, সন্ধ্যায় পাড়ার ছেলেদের খোঁজ নিত—সে বুঝতেই পারেনি কী অপেক্ষা করছে তার জন্য। হঠাৎ করেই চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলা হয়। চারপাশে তখন নীরবতা, শুধু দূরে কোথাও কুকুরের কান্নার মতো শব্দ।
কোনো কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক পরিচয়টাই হয়ে উঠেছিল তার সবচেয়ে বড় অপরাধ। ভয়ের মধ্যে সে পেছাতে চেয়েছিল, কিন্তু পথ ছিল বন্ধ। মুহূর্তের মধ্যেই গলি রূপ নেয় আতঙ্কের মঞ্চে। আশপাশের ঘরগুলো দরজা জানালা বন্ধ করে নেয়—মানুষ দেখেও না দেখার ভান করে, কারণ এই শহরে রাজনীতির রাগ মানে মৃত্যু ডেকে আনা।
কিছুক্ষণ পর গলিটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। শুধু পড়ে থাকে নিস্তেজ শরীর, ছড়িয়ে থাকা স্যান্ডেলের একটা জোড়া, আর মাটিতে গড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক পোস্টারের টুকরো। যেন রাজনীতিই তার শরীর ঢেকে দিয়েছে শেষবারের মতো।
খবর ছড়াতে বেশি সময় লাগেনি। সকালে মানুষ জড়ো হয়, ফিসফাস শুরু হয়—
“কে করেছে?”
“কেন করেছে?”
কেউ জোরে বলে না, সবাই জানে। ভয়টাই এখানে সবচেয়ে বড় শাসক।
এই হত্যার পর শহরটা আর আগের মতো থাকে না। মায়েরা ছেলেদের রাজনীতি করতে বারণ করে, বাবারা রাতে দেরি হলে ফোন দেয় বারবার। দেয়ালে লেখা স্লোগানগুলো আর আদর্শের কথা বলে না—সেগুলো এখন কেবল রক্তের স্মৃতি।
এই গল্পটা কোনো এক দলের নয়, এই গল্পটা ক্ষমতার রাজনীতিতে পিষে যাওয়া সাধারণ মানুষের। যেখানে মতের ভিন্নতা মানেই শত্রু, আর শত্রু মানেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
দলের নেতাকর্মীরা হুংকার শুরু করেছে। দলের সেই ছেলেগুলোকে হন্নে হয়ে খুঁজছে। রাজীব ফরাজীর খুব কাছের মানুষ ছিল নিহত ব্যক্তি। ওনার মৃত্যুতে তিনি নিজেকে দায়ী করছেন। যত দ্রুত সম্ভব খুনিদের বিচার চাইছে।
অন্য দিকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা আনন্দে আত্মহারা আজ। যেন বিশাল কিছু জয় করেছে। তাদের আস্তানায় আজ যেন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এই মিলনমেলায় ফরাজী বাড়ির সেই ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সকলে মদ্যপানে ব্যস্ত।আনিস সিকদার বললেন।”এই মানিক কে মেরে আজ বিরোধী নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দিয়েছি। এইভাবে বিরোধী দলকে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দেবো।”
রহস্যময় মানব উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল।”আপনার ছেলে কোথায়? ওনাকেই তো ভবিষ্যতে সব সামলাতে হবে। এতো কিছুর মাঝেও উনি অনুপস্থিত।”
আনিস সিকদার বেজার গলায় বলল।”ছেলে এখন দেশে নেই। ঘুরে আসুক। আমার একটা মাএ ছেলে। আস্তে ধীরে দায়িত্ব বুঝে নিবে।”
ব্যাস কারো মধ্যে আর তেমন কিছু নিয়ে কথা হয়নি। তারা ফুর্তিতে মজে উঠলো।
……….
রাত দশটা,,,
রাফসা ধুমিয়ে পড়ছে। প্রথম পরীক্ষা বাংলা। সব পড়াগুলো বার বার করে রিভাইস দিচ্ছে। তার এখন কিছুতে খবর নেই। এমন সময় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে রিশান। তাও রাফসার খেয়াল নেই। রিশান বোনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিছুক্ষণ মুখ পানে তাকিয়ে বলল।”বোনু। আমার একটু কাজ ছিল।”
রাফসা পড়া থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।”কি কাজ ভাইয়া? আমার অনেক পড়া বাকিই। প্লিজ যাও।পরে করে দেব।”
“এই মিনিট লাগবে না। তুই একটু এইখানে সাইন করে দে।”
“কিসের সাইন? “
“এতো কিছু বলতে পারব না। বাবার সব সম্পত্তি তোর নামে করে দিবে। তাই আগে আগেই আমার নামে করে নিচ্ছি। প্লিজ বোনু সাইন করে দে।”
রাফসা হাসে ভাইয়ার কথায়। রিশান দেখিয়ে দেয় সাইন করতে। রাফসা না দেখেই সাইন করে দিল। পুনরায় পড়ার মন দেয়। রিশান বোনের পানে তাকিয়ে চলে যায়। পেছনে রেখে যায় পড়ায় ব্যস্ত রাফসাকে।
চলবে…?
শেষ বার এবং শেষ বারের মতো বলছি। ভালো না লাগলে ইগনোর করবেন। আজাইরা প্যারা দিবেন না প্লিজ। পর্ব দেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। আমার পাঠিকাদের এওো এওো ভালোবাসা দেখে গলে গেছি। আজকের পর্বটা ভালো লাগতে না পারে। মন মানুষিকতা ছিল না লেখার।
প্রেয়সীর_অনুরাগ
লেখনিতে —#সাদিয়াজাহানসিমি
পর্ব_৭ ( দ্বিতীয়াংশ)
এপ্রিলের দশ তারিখ। আজ থেকে রাফসার পরীক্ষা শুরু। গত দু’দিন পড়তে পড়তে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে। সারাদিন রুমে বসে পড়েছে। প্রয়োজন ব্যতীত রুমের বাইরে পা রাখেনি। খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত রুমে হয়েছে। হুমাইরা ফরাজী মেয়ের দরকারি সব কিছু হাতের কাছে এনে রাখছে। যেন রাফসার কষ্ট না হয়।
ভোর চারটা,,,
রাফসার এলার্ম এর শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। রাতে শোয়ার আগেই এলার্ম দিয়ে রেখেছিল। বেশি রাত অবধি জেগে পড়াশোনা করেনি। দশটা পর্যন্ত পড়ে ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। রাত জেগে পড়াশোনা করা বোকামি। রাফসা সেটা করেনি। রাফসা চোখ মেলে পিটপিট করে। চোখ খুলতেই আজ সর্বপ্রথম উদ্যানের কথা স্মরণ হয়েছে।চোখে মুখে এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। বিরক্ত হয়ে জোড় করে চোখজোড়া খুলে রাখার চেষ্টা করছে। সময় নিয়ে উঠে বসে। জিরো লাইটের সাহায্যে বিছানা থেকে নেমে এনার্জি লাইট জ্বালিয়ে দিল। পুরো রুমটা দিনের আলোর মতো চকচকে করে উঠলো।ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে ওযু করে একেবারে বের হয়। তারপর জায়নামাজ বিছিয়ে ফজরের সালাত আদায় করে নেয়। মোনাজাতে অনেক কিছু চেয়েছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে উঠে দাঁড়ায়।
পড়ার টেবিলে বসে। বাংলা বই বের করে প্রথমে লেখক পরিচিতি গুলো সব মনোযোগ সহকারে দেখে। লেখকের জন্ম, মৃত্যু ছদ্মনাম, ইত্যাদি ইত্যাদি তে বেশি ইফেক্ট দেল। লেখক পরিচিতি থেকে একটা না একটা এমসিকিউ কমন থাকবেই বোর্ডে। তারপর দাগানো লাইনগুলো চোখ বুলিয়ে নিল। কফির প্রয়োজন পড়ে।মাকে বলবে ভাবলো।সময় দেখে নিজেই চলে যায় কফি বানাতে।
মিনিট দশেক পর কফি নিয়ে ফিরে।কফি নিয়ে চুমুক দিতেই বিছানায় বালিশের উপর রাখা ফোনের আলো জ্বলে উঠলো। ফোনটা ভাইব্রেশন করছে। এতো সকালে ফোন আসাতে ভ্রু কুঁচকে ফেলে রাফসা। ঘড়ির পানে তাকিয়ে দেখে পাঁচটা বাজতে আরো পনেরো মিনিট বাকি। কি যেন ভেবে পড়ার টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ায়। হয়তো সাবিকুন বা সায়মা কল করেছে। বেডের কাছে এগিয়ে যায়। ততক্ষনে ফোনটা বাজতে বাজতে কেটে যায়। পুনরায় ফোন ,আসতেই রাফসা ফোন হাতে তুলে নিল। অচেনা নাম্বার দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলে। কেমন অদ্ভুত নাম্বার। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে।
“হ্যালো,,,
ফোনের ওপাশে কেউ কথা বলছে না। শুধু নিঃশ্বাস—ভারী, ধীর, মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠা। যেন প্রতিটা শ্বাসের সঙ্গে আটকে থাকা হাজারটা কথা বেরিয়ে আসতে চায়, কিন্তু গলায় এসে থেমে যায়। কানের ভেতর সেই শব্দ ঢুকে বুকের গভীরে গিয়ে ধাক্কা মারে।
নিঃশ্বাসগুলো কখনো লম্বা, ক্লান্ত; কখনো হঠাৎ দ্রুত—ভয়ের মতো, কিংবা দমিয়ে রাখা কান্নার মতো। মনে হয়, ওপাশে কেউ অন্ধকার ঘরে বসে আছে, চোখের সামনে শূন্যতাকে তাকিয়ে দেখছে। শব্দহীনতার ভেতরেও এক অদ্ভুত আর্তনাদ লুকিয়ে থাকে, যা শব্দের চেয়েও বেশি তীব্র।
এই নিঃশ্বাসে প্রশ্ন আছে, অভিযোগ আছে, অপূর্ণ ভালোবাসার চাপা দীর্ঘশ্বাস আছে। কথা না বলেও সে যেন সব বলে দেয়—হারানোর বেদনা, বলা না-পারার অসহায়ত্ব, আর দূরত্বের নির্মম সত্য। ফোনের এই নীরবতাই সবচেয়ে বেশি চিৎকার করে, কারণ এখানে শব্দ নেই, কিন্তু কষ্টের ওজন অসীম।
ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে কপালে বিরক্তির ছাপ পড়ে রাফসার। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে সামনে ধরে। সেকেন্ড চলছে— তবে কথা বলছে না। রাফসা আবার ফোনটা কানে নিয়ে হ্যালো বলে। তবে ফলাফল শূন্য। বিরক্তি যেন আকাশ ছুঁয়েছে রাফসার। নখ খুঁটতে খুঁটতে নিজেও কিছুটা সময় শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওপারের — এপারের , নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে শুধু। দুজনেই শান্ত নিশ্চুপ। নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে ওদের মধ্যে। রাফসা এইবার ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল।
“এই শালা , কেরে তুই? ভোরে কল দিয়ে বিরক্ত করছিস। জুতা দিয়ে পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলবো। বেয়াদব, অসভ্য, ইতর কোনখানের। তোকে সামনে পেলে মেরে হাড়গোড় ভেঙ্গে, তোর পকেটে ঢুকিয়ে দেবো। আমার পড়ায় বিরক্ত করছিস। দোয়া করি, তোর বউ যেন তোরে যাইতে এক লাথি মারে, আইতে এক লাথি মারে। শ্লা বেওমিজ। কল রাখ মিয়া।”
একদমে কথাগুলো বলে ফোন কেটে দিল রাফসা। হাঁপিয়ে গেছে বোধহয়। বিরক্তও বেশ। ফোনটা রাখতেই যাবে তার আগেই আবার আলো জ্বলে উঠলো। রাফসা কি মনে করে দেখলো। মেসেজ এসেছে সেই নাম্বার থেকে। মেসেজটা অন করতেই সামনে ভেসে উঠলো।
“শুভকামনা রইল পরীক্ষার। ভালো করে পরীক্ষা দেবেন। ঘড়ি দেখে সিকিউর উওর লিখবেন। এমসিকিউ মনোযোগ সহকারে দেখে মার্ক করবেন। সিকিউ কমনগুলো আগে লিখে ফেলবেন। ঠান্ডা মাথায় পরীক্ষা দিবেন। আর মুখের ভাষা তো দেখি আপনার ফাটাফাটি।দেখা গেলো আপনার হাসবেন্ড উঠতে বসতে, ধুপধাপ মেরে দিল আপনায়। সেটা ভবিষ্যতে দেখা যাবে। আর আমি কে , সেটা ভেবে মাথা নষ্ট করবেন না। সময় হলে জানতে পারবেন।টেক কেয়ার।”
মেসেজটা পড়ে রাফসা ভারী অবাক। বিরক্তিতে ফোনটা ছুঁড়ে মারে বিছানায়। পুনরায় গিয়ে টেবিলে বসে। কফির কাপ থেকে এক চুমুক দিতেই চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল। কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ধুপধাপ পায়ে বেরিয়ে যায় কফি বানাতে।
.
.
উদ্যানের এপার্টমেন্টটা শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, তবু আকাশের আলো আর বাতাসের সঙ্গে যেন গভীর এক আত্মীয়তা আছে। উঁচু তলার এই এপার্টমেন্টে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ে প্রশস্ত ড্রইংরুম—মেঝেতে হালকা কাঠের রঙ, দেয়ালে নরম ধূসর ছোঁয়া, আর বড় কাচের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া বিকেলের আলো। পর্দাগুলো পাতলা, সাদা—বাতাসে দুলে দুলে ঘরের ভেতর একটা শান্ত সুর তৈরি করে। কোণায় ছোট একটা বুকশেলফ, সেখানে গল্পের বই আর কিছু পুরোনো নোটবুক। পাশে একটা আরামচেয়ার, যেখানে বসে উদ্যান প্রায়ই চুপচাপ ভাবনায় ডুবে থাকে।
আজ ঘরটা অন্যরকম। ড্রইংরুমের এক পাশে ক্যানভাস বসানো, সামনে কাঠের ইজেল। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে রঙের টিউব, তেলরঙের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। উদ্যান রঙ মিশাচ্ছে ধীরে ধীরে—কখনো তুলি থামিয়ে দূরে তাকায়, যেন স্মৃতির ভেতর থেকে কোনো অনুভূতি তুলে আনছে। সে আঁকছে তার রুহির ছবি।
ক্যানভাসে রুহি শাড়ি পরিহিতা। শাড়ির রঙ হালকা ঘাসফুল সবুজ, তাতে সূক্ষ্ম সোনালি পাড়—আলো পড়লে ঝিলমিল করে ওঠে। আঁচলটা কাঁধের ওপর আলতো করে রাখা, যেন একটু পরেই নেমে আসবে। রুহির চুল খোলা, লম্বা কালো ঢেউ কাঁধ ছুঁয়ে নেমেছে পিঠের দিকে। মুখটা সামান্য পাশ ফেরানো, চোখে একধরনের নরম দৃষ্টি—না পুরো হাসি, না পুরো বিষণ্ণতা।মাঝখানের সেই অনুভূতি, যা কেবল কাছের মানুষই পড়তে পারে।
উদ্যান খুব যত্ন করে চোখের গভীরতা আঁকে। চোখের কোণে হালকা ছায়া, যেন সেখানে জমে আছে না বলা কথা। ঠোঁটের রেখায় নরম গোলাপি, বেশি উজ্জ্বল নয়—রুহির স্বভাবের মতোই শান্ত। তুলি চালানোর সময় উদ্যানের কপালে ভাঁজ পড়ে, আবার কখনো ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে ওঠে। এই ছবিটা তার কাছে শুধু একটি পেইন্টিং নয়; এটা তার অনুভূতির মানচিত্র।
ঘরের ভেতর তখন নিস্তব্ধতা। শুধু জানালার বাইরে দূরের শহরের শব্দ আর মাঝে মাঝে তুলির ঘষাঘষি। সময় থেমে গেছে যেন। আলো ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে ক্যানভাসে পড়ছে, রুহির আঁকা মুখটাকে আরও জীবন্ত করে তুলছে। উদ্যান বুঝতে পারে—এই এপার্টমেন্ট, এই নিঃশব্দ সকাল,আর এই শাড়ি পরা রুহির ছবি—সব মিলিয়ে আজকের সময়টা তার জীবনের সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে সত্য ।
জিহাদ ঘুম থেকে উঠে ড্রয়িং রুমে আসে। উদ্যানকে রংতুলি দিয়ে হাত চালাতে দেখে এগিয়ে যায় সেদিকে। উদ্যানের যেন কোনো হুঁশ নেই আশেপাশে। জিহাদ পেছন থেকে ডেকে উঠে।”সারারাত দেবদাসের মতো এখানেই পড়েছিলি। ঘুমাসনি কেনো?”
উদ্যানের চলতে থাকা রংতুলি হাতটা থেমে যায় ক্যানভাসে। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো। জিহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ওর পানে । উদ্যান নিঃশব্দে রংতুলি রেখে উঠে দাঁড়ায়। ক্যানভাসের উপর কাপড় টেনে দিলো। পেছনে ঘুরে ঠান্ডা গলায় বলল।”তোকে কয়বার বলেছি। আমার কাছে ডিস্টার্ব করবি না।”
জিহাদ ভ্রু নাচিয়ে বলল।”কেনো ভাবীর ছবি দেখে ফেলেছি। তাই কলিজায় লাগছে?”
উদ্যান চোখ গরম করে তাকালো। সারারাত না ঘুমানোর ফলে চক্ষুজোড়া লাল হয়ে আছে। চোখের পাতা কাঁপছে। এক ভ্রু উঠিয়ে কিড়মিড় করছে। জিহাদ ওর এহেন অবস্থায় ঠোঁট চেপে হাসলো খানিক।
“সত্যি ভাই, আমি দেখেনি ওকে। বিশ্বাস কর ভাই। তবুও এমন করে আজরাঈলের মতো খপ করে তাকাস না। আমি অসহায় এক মাসুম বাচ্চা।”
উদ্যান বিরক্ত চোখে তাকিয়ে ক্যানভাসটা হাতে তুলে নিল। রুমের পানে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল।”গাদা, বলল।”
জিহাদ অসহায় ফেস নিয়ে তাকিয়ে রইল। শালার বন্ধু চার আনার দাম দেয় না। জিহাদ পেছন থেকে গলা উঁচিয়ে বলল।”দেখিস, তুই আমার মতো এই বউ হীন এতিম পোলার উপর যে জুলুম করছিস। তোর বউ, ঠিক তেমনি করবে। উঠতে বসতে সকাল বিকাল নিয়ম করে ঝাটা দিয়ে পেটাবে।”
উদ্যান থেমে যায়। শান্ত চোখে পেছনে ফিরে জিহাদের পানে তাকায়। উদ্যানের চাহনি দেখে শুকনো ঢোক গিলল জিহাদ। উদ্যান ফের ঘরের দিকে যেতে থাকে। ঠোঁট কামড়ে মৃদু হেসে ক্যানভাসের পানে তাকিয়ে বলল।”সেটা সময় হলে দেখা যাবে।”
পরীক্ষা শেষে শতশত শিক্ষার্থীদের ঢল নামে। দুপুর দেড়টায় পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তিনতলা থেকে নামতেই প্রায় দশ মিনিটের বেশি লেগেছে। এতো এতো ছাএ ছাএী। ওরা তিনজনই নিচে নেমে এসে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল আশরাফুল এবং সাতারুল এর জন্য। ওরা এখনো আসেনি। এক দূরেই দেখা যায় ওরা আসছে। দুজনের মুখ চলছে অনবরত। হয়তো কিছু বকছে। কাছে আসতেই রাফসা বলল।
“পরীক্ষা কেমন হয়েছে তোদের?”
দুজনেই চেতে উঠলো যেন। চোখে মুখে বিরক্ত। আশরাফুল খেকিয়ে বলল।”আমার জাওড়া হালারা, লেখক পরিচিতি থেকে তিনটা এমসিকিউ দিছে। একটাও পারিনা। হুদায় দাগাইছি।”
মেয়েরা হাসে। সায়মা বলল।”আর বলবি না? ক্লাসে কি বলছি যেন, মেম ওদের জন্মসাল মৃত্যুসাল পরিচয় জেনে আমাদের কাজ কি। মরেই তো গেছে। এইবার বুঝেছিস , কেন পড়তে হয়।”
সাতারুল ধমকে বলে।”তুই আর কথা কইস না। জিন্দেগি বরবাদ।”
সাবিকুন বলল। আচ্ছা বাদ দে। চল কিছু খাই। খিদা লাগছে।”
আশরাফুল দাঁতে দাঁত চেপে বলে।”হহ। তোরে তো সারা দুনিয়া খাওয়াইলেও পেট ভরবে না।”
সাবিকুন মুখ বাকালো। ওরা পঞ্চপান্ডবের দল চলে খেতে। প্রথমেই পাঁচ টা শরবত নিল। খেয়ে গলা ভেজায়। সাতারুল পাঁচজনের জন্য পাঁচটা কোণ আইসক্রিম কিনল। পাঁচজন খাচ্ছে দাঁড়িয়ে। মেইন রোডের সাথেই ওদের কেন্দ্র পড়েছে। এটা একটা বড় কলেজ। পাশে পাম্প রয়েছে।
একটা গাড়ি যাওয়ার সময় সায়মার গা ঘেঁষে যেতে নিল। রাফসা তা খেয়াল করে হাত দিয়ে টেনে সরিয়ে ফেলল। সবাই সেদিকে তাকায়। গাড়িটাও থেমে গেছে। রাফসা চেঁচিয়ে বলল।”লাইসেন্সটা কোন লটারিতে পেয়েছেন। ব্রেক ছাড়া গাড়ি চালায় কোন আবালরে।”
রাফসার চেঁচানোতে ভরকে গেল গাড়িতে থাকা ড্রাইভার। ততক্ষনে সায়মা সাবিকুন ও চেঁচিয়ে উঠলো। ড্রাইভার বেরিয়ে এসে বলল।”রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে এমনই হবে।”
রাফসা ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল।”চোখ কি কপালে নাকি পকেটে? চোখগুলো চোখের জায়গায় রেখে ভালো করে দেখেন। “
ওদের মধ্যে হুড়োহুড়ি ঝগড়া শুরু করেছে। আশরাফুল শুকনো ঢোক গিলল। গাড়ির ভেতরে থাকা ব্যক্তির এইবার বিরক্তি বাড়ে। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে।”কি হয়েছে? এতো চেঁচামেচি কেন?”
ড্রাইভার ইশারা তুলে বলল।”ভাই, এই মেয়েটা আমাকে আবাল বলেছে। আমি নাকি চোখ কপালে তুলে হাঁটি।”
ব্যক্তিটি চোখ তুলে সামনে তাকাতেই একটা মায়াবী মুখ সামনে পড়ল। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে । কপালে শীতল ভাঁজ পড়ে। চোখে থাকা রোদচশমা টেনে খুলে। রাফসা কোমড়ে হাত দিয়ে বলল।”আবালকে, আবাল বলব না তো কি বলব? আর আমি যেন ভয় পাই আপনার মালিককে। কিছু বলতে আসলে মেরে পুঁতে ফেলবো।”
রাফসা আরো কিছু বলতেই যাবে সাবিকুন পেছন থেকে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে। ফিসফিস করে বলল।”থেমে যা সাদু। আর বলিস না। তাকিয়ে দেখ মালিক বয়সে আমাদের অনেক বড়।”
সাবিকুনের কথায় তাকালো রাফসা। ব্যক্তিটা এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। রাফসা এই দৃষ্টিতে যেন আরো বিরক্ত হলো। হাত থেকে মুখ ছাড়াতে চাইলেও পারেনা। ওরা জোড় করে রাফসাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। রাফসা কোনো রকম মুখ থেকে হাত সরিয়ে চেঁচিয়ে ব্যক্তির পানে তাকিয়ে বলল।” এই আঙ্কেল। আপনার ড্রাইভার যদি আমার সামনে আর পড়েছে না? একেবারে ঠ্যাং ভেঙ্গে রেখে দিব।”
ওরা গাড়িতে উঠে চলে যায়। এদিকে রাফসার মুখে আঙ্কেল ডাক শুনে ভরকে গেল লোকটি। পাশে থাকা ড্রাইভার বিচার দিয়ে বলল।”দেখেছেন ভাই । কি ইঁচড়ে পাকা মেয়ে। আমাকে আবা,,,
বাকিটা বলার আগেই জোরে থাপ্পর মেরে বসে লোকটি। ড্রাইভার হতবাক হয়ে গালে হাত দিয়ে বলল।”ভাই আমি কি করলাম?”
“চুপ কর শালা। তোর জন্য, আজ আমার মায়াবীর মুখ থেকে আমায় আঙ্কেল ডাক শুনতে হয়েছে। তুই আসলেই একটা আবাল। সর সামনে থেকে, আবাল কোনখানের।”
আভিয়ান রাগে গজগজ করতে করতে গাড়িতে গিয়ে বসে। পেছনে ড্রাইভার এখনো গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বেচারা বুঝতে পারছে না, ওর দোষটা কি। আঙ্কেল তো ডেকেছে ওই মেয়েটা।
চলবে…?
অনিকের নাম চেঞ্জ করে জিহাদ দিয়েছি। আর জিহাদের নামটা হবে অনিকের। আসলে জিহাদ আমার ভাইয়ের নাম 😩। ওর ক্যারেক্টার চরিত্রহীন দিতে পারবো না। তাই চেঞ্জ করেছি।
Share On:
TAGS: প্রেয়সীর অনুরাগ, সাদিয়া জাহান সিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৯
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১০
-
প্রেয়সীর অনুরাগ গল্পের লিংক
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৬
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৪
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৮