প্রেয়সীর_অনুরাগ
লেখনিতে —#সাদিয়াজাহানসিমি
পর্ব_০৪
অন্ধকার রুমটা যেন ইচ্ছাকৃত ভাবেই আলোকে দূরে ঠেলে রেখেছে। চারপাশে ঘন ছায়া, বাতাসে পুরোনো কাঠ,আর স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের গন্ধ। মাঝখানে একটা লম্বা টেবিল — তার ওপর ছড়িয়ে আছে মানচিত্র, নথিপত্র, কিছু ভাঙা সিগারেট আর আধখালি কফির কাপ। হলুদ আলোর শুধু একটা বাল্ব ঝুলছে, দুলছে ধীরে ধীরে, আর সেই দোলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মুখগুলো কখনো স্পষ্ট হয়, কখনো আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।টেবিল ঘিরে বসে আছে কয়েকজন মানুষ। তাদের কারো মুখে ক্ষমতার আত্ববিশ্বাস, কারো চোখে হিসাবি দৃষ্টি। কেউ কেউ কথা বলে না — চুপচাপ শুনে যায়, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই সবচেয়ে ভয়ংকর সিদ্ধান্তগুলো জমে ওঠে। একজন আঙুল দিয়ে টেবিলের উপর টোকা দিয়ে, নিচু গলায় বলে ওঠে—
“আমাদের আর কোনো ভয় নেই। ফরাজী বাড়ির এমন কেউ আছে, যে প্রতিমূহুর্তে প্রতিটা পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানায় আমাদের ।”
সবার ঠোঁটে কুটিল হাসি ফুটে ওঠে। একজন ফিসফিস করে বলে উঠল।
“সেই ব্যক্তির সম্পর্কে ফরাজী বাড়ির আরো এক ব্যক্তি অবগত। যদি পুরো খেলা ভেস্তে যায়?”
সোফায় বসা এক কোণে,এক ব্যক্তি উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। যেন কোনো মজার কাহিনী শুনেছে। পাক্কা খেলোয়াড় সে। অ্যালকোহল একহাতে,অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। এক চুমুক অ্যালকোহল খেয়ে, সিগারেটে লম্বা টান মেরে শূন্যে ধোঁয়া উড়িয়ে দেয়।
কুটিল হেসে বলে ওঠে।”সেই ব্যক্তি আবার কিছুই করতে পারবে না। আমরা সবসময় মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিই। সেই দুর্বলতার ভয়ে চুপ থাকতে হয়। এমন দুর্বলতা যা , আমাদের বিজয়ের প্রান্তে নিয়ে যাবে।ফরাজী বাড়ির সেই ব্যক্তির দুর্বলতা সম্পর্কে আমি অবগত। তার জোরেই, এখনো ফরাজী বাড়ির সেই রহস্যময় মানবের সব পথ বন্ধ। তবে, যা করার খুব শীঘ্রই করতে হবে। বিরোধী দলের চায় জয়, আর আমার চাই ফরাজী বাড়ির ধ্বংস।”
আওয়ামীলীগ এর প্রার্থী আনিস সিকদার টেবিলে টাশ ফেলে এক রহস্যময় হাসি দেয়। ঠান্ডা ধারালো কন্ঠে বলল।”কি সেই দুর্বলতা? যার জন্য, ফরাজী বাড়ির আদর্শবান ব্যক্তি মুখে তালা ঝুলিয়ে রেখেছে?তার সেই দুর্বলতা আমরা হাত করে নিয়ে লাভ করতে পারি?”
সেই ব্যক্তি খেকিয়ে উঠল। যেন কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা ভয়। আনিস সিকদারকে সাবধান করে কঠোর গলায় বলল।”খবরদার।সেই দুর্বলতার পানে ভুলেও হাত বাড়াবেন না। নয়তো,সব শেষ করে দেবে । তার দুর্বলতার প্রতি আঘাত হানলে মহা প্রলয়া ঘটাতেও একবার পিছু হটবে না। ধ্বংস করে দেবে সব। তাই সাবধান।”
সবাই এইবার অনেকটা আগ্রহী হয়ে উঠছে। সেই দুর্বলতার সম্পর্কে জানতে। আনিস সিকদার কন্ঠ খাদে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল।”কি সেই দুর্বলতা?”
মানবটি উচ্চ স্বরে হেসে বলল।”সেই দুর্বলতা সম্পর্কে আমি কখনোই বলব না। আপনাদের সেটা জানার দরকার নেই। ফরাজী বাড়ির শএু কেবল আমিই, একমাত্র আমি।”
অন্ধকার রুমে ফন্দি আঁটটে ব্যস্ত বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা। একজন চায় ফরাজী বাড়ির কর্তাদের টপকে দিতে। অপরজন চায় ফরাজী বাড়ির ধ্বংস।
.
.
.
ড্রইং রুমে খেয়ে সবাই আড্ডা দিচ্ছে। সবাই বলতে ছোটরা। বাড়ির বড় সদস্যরা তাদের রুমে চলে গিয়েছে। উদ্যান,ঊষা,মিম,রোহান,জায়িন,জারা ওরা সবাই আছে। রোহান,জায়িন,জারা উদ্যানের বড় আব্বুর ছেলে মেয়ে। অর্থাৎ কাজিন। উদ্যান বাংলাদেশে কালকের দিনটা আছে। তাই কাজিনরা মিলে আড্ডা দিচ্ছে। এমন সময় কলিংবেল বেজে ওঠে। সকলে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।ঊষা উঠে দরজা খুলে দিল। বাইরের ব্যক্তিদের দেখে চেঁচিয়ে উঠল। দরজার বাইরে মিমের ভাই মাহিন এবং বোন মাইশা দাঁড়িয়ে আছে।মাইশা ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে।”এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে নাকি ভেতরে ঢুকতে দিবি?”
ঊষা এবং মাইশা সমবয়সী। একে অপরকে তুই করে বলে। মাইশাকে জড়িয়ে ধরে বলল।”হারামি। ভুলেই তো গেছিস। কেনো এসেছিস?”
মাইশা ভেংচি কেটে বলল।”মামার বাড়ি এসেছি। তুই কে?সর সামনে থেকে।”
ঊষা ওদের ভেতরে নিয়ে আসে। ওদের দেখে সবাই খুশী হলেও একজনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। মাহিন কে মোটেই সহ্য হয় না উদ্যানের। এই ছেলেকে দেখলেই পেটাতে ইচ্ছে করে। জায়িন মাইশাকে জিজ্ঞেস করে।”কিরে পেত্নী,কেনো এসেছিস? ফরাজী বাড়িতে তোর কাজ কি?”
মাইশা মুখ ঝামটা মেরে বলল।”তোমার সমস্যা কি তাতে? আমি আমার মামার বাড়ি এসেছি। তোমাকে বলতে আগ্ৰহী না।”
জায়িন আফসোস করে বলল,
“পেত্নী আর ভালো হলো না।”
সবাই হাসে ওদের ঝগড়া দেখে। জায়িন মাইশা এক হলেই পারেনা একজনের চুল আরেকজন টেনে ছিঁড়ে ফেলে।রোহান হঠাৎ করে বোম ফাটালো।”এই চল আজ আমরা যেহেতু সবাই আছি। তাহলে কিছু খেলি।”
রোহানের কথায় মাহিন ভাবুক হয়ে বলল।”কি খেলা যায়?এতো রাতে তো বাইরে যেতে পারব না। আম্মু ঠ্যাং ভেঙ্গে রেখে দিবে। তাহলে কি খেলা যায় ভাইয়া?”
সবাই ভাবতে থাকে। জারা চেঁচিয়ে বলল।”এই চলো। আমরা সবাই যেহেতু আছিই। একটা খেলা হক। ট্রুথ ডেয়ার খেলি।”
ওর কথায় সবাই রাজী হয়ে গেল। এতো কিছুর মাঝেও উদ্যানের খেয়াল নেই। সে এক মনে ফোন দেখতে ব্যস্ত। যেন আশেপাশে কেউ নেই। পারছেও না এখান থেকে উঠে যেতে। ছোট ভাই বোনদের অনুরোধে বসে আছে। নয়তো এইসবে থাকার মতো ব্যক্তি সে নয়।
মাহিন একজনের অনুপস্থিত পেয়ে জিজ্ঞেস করল।”সবাই এখানে আছে। তবে, রাফসা নেই কেনো? ও কোথায়?”
এতোক্ষণ ফোনের মাঝে ডুবে থাকলেও চোখ তুলে তাকায় উদ্যান। মাহিনের মুখে রাফসা নামটা শোনতেই বোধহয় তাকিয়েছে। দৃষ্টিটা ভারী, বিরক্ত না রাগ ঠিক বোঝা যায় না। ভ্রু দুটি সামান্য কুঁচকে আছে, ঠোঁটের কোণে এক ফোঁটা অসহিষ্ণুতা।সে চুপ করে মাহিনের পানে তাকিয়ে রইল। মাহিন সামনে বসে আছে। উদ্যানের কাছে মাহিন মানেই এক রাশ বিরক্তি। কেনো জানে না, কিন্তু ওকে সহ্য করতে পারে না। মাহিন কথা বললেই মনে হয় শব্দগুলো কানে গিয়ে খচখচ করে। অকারণ হাসি, অতিরিক্ত আগ্রহ — সবকিছুই উদ্যানের চোখে বাড়াবাড়ি। বিশেষ করে রাফসার প্রসঙ্গ এলেই রাগে, বিরক্তিতে চিবুক শক্ত হয়ে আসে। রাফসা নামটা শুনলেই ভেতরে জ্বলোচ্ছ্বাসে পরিণত হয়। উদ্যান মাহিনের পানে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে। “অপ্রয়োজনীয় কথা বলিস না। সবাই গিয়ে শুয়ে পড়।”
সবাই অবাক হয়ে তাকালো। উদ্যানের এহেন আচরণে বিরক্ত হয়ে গেল মাহিন। ও দেখেছে রাফসার নাম নিলেই ফোঁস ফোঁস করে। বিরক্তে কপাল কুঁচকে বলে।”ভাইয়া তুমি রাফসার সাথে এমন করো কেন? আমার মনে হয়, রাফসা এখানে তোমার কারণেই আসেনি। তুমি নিশ্চয়ই সারাদিন ওকে ধমকাধমকির উপর রাখো।”
মাহিনের এহেন কথায় চোয়াল শক্ত হয়ে আসে উদ্যানের। কপালের রগ গুলো টান টান হয়ে ফুলে উঠেছে। হাতে ধরা ফোনট শক্ত করে চেপে ধরে।রাগ নিবারণ করার চেষ্টা করছে। ঠোঁট চেপে বসে রইল। ঘাড় বাঁকিয়ে মাহিনের পানে চাইল। জিভের অগ্ৰভাগ দ্বারা গালের অভ্যন্তরীণ ত্বক স্পর্শ করলো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে হুমকিস্বরূপ বলল।”প্রশ্ন করা আমার মোটেই পছন্দ নয় মাহিন। আর সবসময় রাফসা রাফসা করবি না। তুই আর ওই বাদুড় এক। পড়ালেখা লাটে তুলে দিব্বি ঘুড়ে বেড়াস।তোরা দুই বলদ এক নৌকার মাঝি।”
উদ্যানের কথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে মাহিন। আর বাকিরা ঠোঁট চেপে হাসছে। মাহিন ও পড়াশোনা করতে চায় না। তবে ভালো স্টুডেন্ট। উদ্যান উঠে চলে যেতে চাইলে ঊষা বাঁধ সাধলো। সোফা থেকে উঠে ভাইয়ের হাত জড়িয়ে আবদার করে বলল।”ভাইয়া প্লিজ। তুমি তো চলেই যাবে। আজ রাতটা আমাদের সাথে কাটাও। কত বছর পর আবার তোমাকে পাবো জানি না। প্লিজ ভাইয়া।”
বোনের এহেন আবদারে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে উদ্যান। একটা মাএ বোন। আবদার করলে ফেলে দিতে পারে না। দোটানায় পড়ে গেল এখন। বোনের পানে তাকিয়ে দেখল উওরের আশায় চেয়ে আছে। উদ্যান মাথায় হাত বুলিয়ে বলে।”আচ্ছা। থাকবো বাচ্চা।”
ঊষা আবার বলল।”ট্রুথ ডেয়ার খেলবে কিন্তু। নয়তো তোমার সাথে কথা নেই।”
“ওকে বাচ্চা। খেলবো। আমার বোন বলবে, আমি পূরণ করব না তা কি করে হয়?”
ঊষা খুশিতে ভাইকে জড়িয়ে ধরে। উদ্যান হেসে ওকে মাথায় চুমু খেলো। রোহান বলল।”তবে,ছাদে যাই। সেখানেই জমবে খেলা।”
জায়িন বলল। “দাঁড়াও আমি মাদুর নিয়ে আসছি।”
বলেই মাদুর আনতে চলে যায়। মাইশা এক ধ্যানে উদ্যানের পানে চেয়ে রইল। কিশোরী বয়সেই মন দেওয়া হয়ে গেছে। তবে এই পুরুষ কখনোই বুঝতে পারেনি। উদ্যানের ওর চোখে চোখ পড়তেই ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে কি। মাইশা হেসে মাথা নাড়িয়ে কিছু না বলে। মাথা নিচু করে মৃদু হাসে।জায়িন মাদুর নিয়ে আসলে ওদের উপরে যেতে বলে চলে যায়। মাহিন ঊষাকে বলল।”আমি রাফসাকে ডেকে নিয়ে আসছি। তোরা যা।”
উদ্যান চিবুক শক্ত করে বলল।”দরকার নেই। ঊষা গিয়ে ডেকে আনবে। তুই চল ছাদে।”
মাহিন দাঁড়িয়ে যায়। উদ্যান ঊষাকে ইশারা করে রাফসাকে ডাকতে বলে। ভাইয়ের ইশারা বুঝে ঊষা রাফসার ঘরের পানে এগিয়ে যায়। ওর সাথে মাইশা ও ছুটে। উদ্যান গটগট পায়ে চলে যায়। মাহিন আহম্মকের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল। রাফসার নাম শুনলেই উদ্যান তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে কিছু ভেবে মৃদু হাসে।
.
.
.
ঊষা রাফসার ঘরে সামনে দাঁড়িয়ে দরজা মৃদু ঠেলা দিতেই খুলে গেল। রাফসা কখনো দরজা বন্ধ করে ঘুমায় না। হুমাইরা ফরাজী বারণ করেছে। রাফসা অনেক ঘুমকাতুরে। একবার ঘুমালে কেউ ডেকে তুলতে পারে না।ঊষা ঘরে ঢুকে দেখে আলো জ্বলছে। তবে রাফসা বিছানায় নেই। এতে ঊষা খানিকটা অবাক হলো। মাইশা জিজ্ঞেস করল।”রাফসা কোথায়?ও তো দেখছি রুমে নেই।”
“দাঁড়া। বারান্দায় গিয়ে দেখি।”
ঊষা বারান্দার পানে এগিয়ে যায়। জিরো লাইট জ্বলছে বারান্দায়। রাফসা দোলনায় বসে আছে। আশে পাশে কোনো ধ্যান নেই। এক মনে তারাবিহীন আকাশের পানে চেয়ে আছে। পেছনে কারো উপস্থিত টের পেয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো। ঊষার পাশে মাইশাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছে। ঘন্টাখানেক আগেই তো মাএ ডিনার করেছে। তখন মাইশা ছিল না। দোলনা থেকে উঠে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।”আপু। তুমি এসেছো? নাকি আমি ভুল দেখছি!!”
মাইশা মৃদু হেসে বলল।” অবাক হচ্ছিস কেনো? আশা করিসনি তাই তো ।”
রাফসখ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে। ঊষা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাফসাকে দেখে জিজ্ঞেস করল।”তুই এখনো ঘুমাসনি কেনো? সেই অনেকক্ষণ আগেই তো রুমে চলে এসেছিস।”
রাফসা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মৃদু হেসে বলল।”আপু ঘুম আসছিল না। তাই বারান্দায় এসে বসেছি।”
ঊষার যেন বিশ্বাস হলো না। কিছু বোঝার চেষ্টা করে তাকিয়ে রইল। উষার চাহনিতে ভরকে যায় রাফসা। মাইশা ওর এক হাত টেনে বলল।” আর ঘুমাতে হবে না।ছাদে চল। আজ আড্ডা হবে ভরপুর।”
রাফসা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।”এতো রাতে ছাদে যাবো? আম্মু দেখলে বকবে।”
মাইশা ওর কথায় থোরাই কেয়ার করল না। টেনে নিয়ে যেতে লাগল। তিনজনে ছাদের উদ্দেশ্য পা বাড়ায়।
ছাদে এসে দেখে মাদুর পেতে জাহিন রোহান জারা মাহিন বসে হাসাহাসি করছে। ওদের সবাইকে এতো রাতে ছাদে দেখে অবাক হয় রাফসা। মাহিন রাফসাকে দেখতেই উঠে আসে। কপালে টোকা দিয়ে বলল।”কোথায় ছিলেন মহারানী? আপনি না থাকলে কি খেলা জমবে?”
মাহিনের কথায় সবাই হাসে। রাফসা নিজেও হেসে ফেলে।সবাই গিয়ে মাদুরে বসে। রাফসার ডান পাশে ঊষা বসেছে। বাম পাশে মাহিন বসেছে।জাহিন বোতল ঘুরাতে গেলেই বাঁধ সাধলো মাইশা।
“একি পাগল হলে নাকি? উদ্যান ভাই তো নেই। আর তুমি খেলা শুরু করে দিচ্ছো।”
ঊষা মাথা নাড়িয়ে বলল।”তাই তো। ভাইয়া কোথায়?”
উদ্যানের নাম শুনে বুকটা কেঁপে উঠলো রাফসার। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করছে। উদ্যান আছে জানলে কখনোই আসতো না। রাফসা নিচের দিকে তাকিয়ে হাত কচলাতে লাগে। সামনে একজোড়া পা এসে থামে। রাফসা মাথা উঁচিয়ে তাকালো। উদ্যান বিরক্ত হয়ে ওর পানেই তাকিয়ে রইল।রাফসা চোখ নামিয়ে নিল। সেই চোখে চোখ রাখার সাহস যে ওর নেই। ওই চোখের পানে চাইলেই সেদিনের করা অপমান মনে পড়ে যায়। উদ্যান ওর মুখোমুখি বসে পড়ে। রাফসার পাশে মাহিন কে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলে। বিরক্তি যেন আরো জেঁকে বসে। জাহিন বোতল ঘুরায়। তা এসে থামে মাইশার দিকে। সবাই চেঁচিয়ে উঠলো। জাহিন ভ্রু নাচিয়ে বলল।”কি পেত্নী? ট্রুথ নিবি নাকি ডেয়ার?”
মাইশা ভেবে চিন্তে বলল।”ট্রুথ।”
ওমনি জাহিন দুম করে প্রশ্ন করে।”প্রেম করিস?”
ওর প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় মাইশা। বড়দের সামনে এই প্রশ্ন কিছুটা অস্বস্তিকর। তবে, বলতেই হবে। খেলার নিয়ম। উদ্যানের দিকে চেয়ে বলল।”প্রেম করি না। তবে একজনের প্রতি ক্রাশ।”
সবাই বাহ বাহ বলে চেঁচিয়ে উঠলো। আবার বোতল ঘুরালে ঊষার সামনে এসে থামে । ও ট্রুথ নেয়। এমন করে একে একে সবার কাছেই যায়। এইবার বোতল ঘুরালে উদ্যানের সামনে এসে থামে।সবাই খুশীতে ইয়াহু বলে । রোহান বলল।”উদ্যান তোকে কিছু নিতে হবে না। ট্রুথ দিলাম আমি। ট্রুথ হলো, তুই কি কাউকে পছন্দ করিস? আর যদি করে থাকিস তবে তার জন্য একটা গান গেয়ে শোনাবি।”
রোহানের কথায় সবাই এক্সসাইটেড হয়ে উদ্যানের দিকে তাকালো। সবাই তাকালেও রাফসা চোখ তুলে তাকায়নি। উদ্যান নিচু রাফসার পানে একবার তাকালো। দৃষ্টি সরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল।”পছন্দ করি না। ভালোবাসি। আমার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ। আমার ভালোবাসা।”
উদ্যানের এহেন সরল উক্তিতে সবাই বেশ চমকেছে। তবে রাফসা অত্যন্ত ঠান্ডা। ও জানে সে মানুষটা কে। মিম আসলেই ভাগ্যবতী।
জাহিন বলল।”ভাই আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? আমাদের ভাই কাকে ভালোবাসে? কে সে ভাগ্যবতী নারী?”
উদ্যান ভালোবাসা কন্ঠে বলল।”সেই নারী আমার ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার জন্ম থেকেই নিয়ে এসেছে।”
সবাই যেন অবাকের চরম পর্যায়ে চলে গেছে। রোহান বলল।”তাহলে তোর সেই নারীর জন্য একটা গান উৎসর্গ কর।”
উদ্যান কিছু সময় চুপ থেকে খালি গলায় সুর টানে।
~ঝড়ের বেশে এলো কে সে
~কাজল চোখ সে দুটি
~দিলো কঠিন কথায়, বিষন্নতার ছুটি..
উদ্যানের গানের গলা খুব ভালো। দেখতে যেমন সুন্দর গুণেও ঠিক তেমনি। উদ্যানের গান শুনে বুক ধড়ফড় করে উঠে রাফসার। উদ্যান ওর পানে তাকিয়ে উঠে দাড়ালো। গম্ভীর কন্ঠে বললা।”অনেক রাত হয়েছে । আর কোনো বাহানা না। সবাই রুমে যা।”
বলেই গটগট পায়ে ছাদ থেকে নেমে গেল। একে একে সবাই নেমে আসে।
.
.
.
রাফসা সকালে না খেয়ে চলে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার। হাফ ক্লাস। একটা দশে ছুটি দিয়ে দেবে স্কুল। আজও সাতারুল, আশরাফুল স্কুলে আসেনি। সাতারুল নানার বাড়ি বেড়াতে গেছে। আর আশরাফুল ফ্যামিলির সাথে ট্যুরে। স্কুল ছুটি দেওয়ার পর সাবিকুন সায়মা রাফসা বেরিয়ে আসে। কিছুটা রাস্তা ওরা এক সাথেই যায়। তারপর যার যার বাড়ির উদ্দেশ্যে বাড়ির রাস্তায় চলে যায়। ওরা কথা বলতে বলতে আসছে। তবে সাবিকুন বোধহয় শান্ত থাকতে চায়নি। রাস্তা থেকে পাথর কুঁড়িয়ে নিল। এখান থেকেই তিনজন তিন মোড়ে চলে যাবে। সাবিকুনকে পাথর নিতে দেখে সায়মা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।”এই শালী। পাথর দিয়ে কি করবি তুই?”
সাবিকুন হেসে বলল।”আমি ওই টিনের বাড়িতে পাথরা ছুঁড়ে মারবো। তারপর যে যার রাস্তায় দৌড় লাগাবি। ওকে?”
কথাটাই বলতে বলতেই টিনের বাড়িতে পাথর ছুঁড়ে মারলো। সায়মা সাবিকুন দুজন দুই রাস্তায় দৌড় লাগায়। তবে রাফসা বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে রইল। বুঝতে পেরে নিজেও দৌড় লাগায়। তবে ভাগ্য খারাপ থাকায় এক ছেলের সাথে ধাক্কা খায়। রাফসা কপালে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে বলল।”কোন হ্লারে। আমার সামনেই মরতে আসছে।
ছেলেটা রাফসার কথায় ফিক করে হেসে দেয়। এতো ছোট মেয়ের মুখে শালা শব্দটা ইউনিক ভাবে শুনে অবাক হয়। রাফসা চোখ তুলে তাকাতেই ছেলেটা থমকে যায়। ডাগড় ডাগড় ঘন পাপড়ি যুক্ত একজোড়া চোখ। সেই চোখে যেন সর্বনাশ দেখেছে। রাফসা আর দাড়ায়নি। ছেলেটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। যুবকটা বুকে হাত দিয়ে মুখ ফুটে বলল।”মায়াবী।”
রাফসা একটু সামনে আসতেই কেউ ওর সামনে ঝড়ের বেগে হাজির হয়। সামনে কাউকে দাঁড়াতে দেখে চোখ তুলে তাকায় রাফসা। উদ্যান কে দেখে অবাক হয়। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আগেই রাফসার গালে জোড়ালো এক থাপ্পর পড়ে। রাফসা অবাক হয়ে গালে হাত দিয়ে তাকায় উদ্যানের পানে। উদ্যান দাঁত কিড়মিড় করে বলে।
“বেহায়া মেয়ে মানুষ। এমন ভাবেই ছেলেদের নিজের প্রতি সিডিউস করিস? কতটা জঘন্য। ডিজগাস্টিং গার্ল।”
ঝড়ের বেগে যেভাবে ছুটে এসেছিল। ঠিক তেমন ভাবেই হাওয়া। রাফসা এখনো গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কথাগুলোর মানে বুঝতে পেরে ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠলো।
চলবে…?
যদি মনে হয় কাহিনী ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এক জায়গায় রেখেছি।তাহলে পড়ার দরকার নেই। আমি যেভাবে ভেবে রেখেছি সেইভাবেই লিখব। তবে, আমার মনে হচ্ছে আমি ঠিকঠাক লিখতে পারছিনা। এখানে রাজনীতি আছে। রহস্যময় হবে।
Share On:
TAGS: প্রেয়সীর অনুরাগ, সাদিয়া জাহান সিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১০
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৭(প্রথমাংশ + দ্বিতীয়াংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৯
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৮
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৬
-
প্রেয়সীর অনুরাগ গল্পের লিংক