Golpo romantic golpo প্রেম আসবে এভাবে

প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৯


প্রেম আসবে এভাবে

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_৯

“আপনি… এত রাতে এখানে?” তাড়াহুড়ো করে ফোনটা কেটে দেয় অনুজা। সামনে তার প্রিতুল। বুকের ভেতর অকারণে ধকধক করতে থাকে। এত রাতে ছাদে প্রিতুলকে দেখার কথা যদি একবার নাভিদ জেনে যায় তাহলে ভয়ংকর রাগ করবে। অনুজার অস্বস্তিকর আচরণ চোখে পড়ে প্রিতুলের।
“ফোনটা হঠাৎ কেটে দিলে কেন?”
“কারণ আমি চাই না আপনার জন্য এত রাতে নাভিদ দুশ্চিন্তায় পড়ুক।”
প্রিতুল ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি টেনে নেয়। “ওমা! ভুতের মুখে রাম নাম! আমাকে যে তোমরা দু’জন মিলে কত দুশ্চিন্তায় ফেলেছ তার কী?”

“শুনুন, বাজে কথা বলবেন না।” তার কণ্ঠে বিরক্তি জমে ওঠে। প্রিতুল এক ধাপ এগিয়ে আসে, চোখে অদ্ভুত কঠোরতা। “শোনো, আমি যতটা কষ্ট পেয়েছি তোমাকেও তার ভাগ নিতে হবে। অনেক দিন হৃদয়বান হয়ে থেকেছি, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। এবার দেখো, নিজের অধিকার আমি কীভাবে আদায় করে নিই।” অনুজার শরীর কেঁপে ওঠে। “সরুন। আমি নিচে যাব। ঘুম পাচ্ছে আমার।” প্রিতুল মুচকি হাসে। “আমাকে দেখলেই কি তোমার ঘুম আসে, ম্যাডাম?”

“এই প্রিতুল…” চোখে জল চিকচিক করে ওঠে অনুজার।

“এভাবে তাকালে আগের মতো আমার সব কষ্ট মুছে যাবে না,” প্রিতুল ধীরে বলে। “শুনেছি, তুমি যতটা কষ্ট কাউকে দাও ঠিক ততটাই একদিন ফিরে পাও।”

“হয়েছে! আপনার জ্ঞান শুনতে আসিনি।” এই কথা বলেই অনুজা দ্রুত সিঁড়ির দিকে চলে যায়।
ছাদে একা দাঁড়িয়ে থাকে প্রিতুল। কিছুক্ষণ পর পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরায়। ধোঁয়ার সাথে সাথে মাথার ভেতর হাজারো চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। শেষে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে সে নিজের রুমের দিকে যায়।
কিন্তু দরজা খুলেই থমকে যায়।
ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে নেহা। “এত রাতে তুমি এখানে কী করছ?” নেহা অস্বস্তির হাসি হেসে বলে, “আমি তো শুধু দেখতে এসেছিলাম আপনার কোনো কিছু দরকার আছে কিনা।”

“না, আমার কিছু লাগবে না।”

নেহা কিছু বলতে যাবেই, “শরীরটা ভালো লাগছে না,”প্রিতুল কণ্ঠটা নরম করে তোলে। “অনেক ক্লান্ত। আজ জার্নি করে এসেছি। ঘুমটা খুব দরকার।”

এই কথা শুনে আর উপায় না পেয়ে নেহা চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রুমে একা দাঁড়িয়ে থাকে প্রিতুল। চোখে তখন ঘুম নেই শুধু প্রতিশোধ আর অধিকার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্খা।


সকালে নাভিদ হঠাৎ করেই অনুজাদের বাড়িতে চলে আসে। এসেই অনুজাকে গিয়ে বলে, “কি গো বউ, কাল রাতে হঠাৎ ফোন কেটে দিলে কেন?”

অনুজা একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলে, “আরে, নেটের সমস্যা ছিল।” নাভিদ হালকা হাসে।

“ওহ! আমি তো কত কী ভেবে বসেছিলাম।” বলেই হাসে সে।

দুপুরে খাওয়া শেষ হতেই কাউকে কিছু না বলেই নাভিদ অনুজাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই নাভিদের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আসে। “কি হয়েছে তোমার?” অনুজা দুশ্চিন্তায় জিজ্ঞেস করে।

“জানি না… খুব অস্বস্তি লাগছে হঠাৎ।”

“চলো, ডাক্তারের কাছে যাই।” নাভিদ মাথা নাড়ে।

“না, তুমি আগে বাড়ি যাও। আমি ড্রাইভারকে বলছি তোমাকে পৌঁছে দিতে। আমি একটু রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।” অনুজার চোখে ভয় জমে ওঠে। “সত্যি ঠিক হবে তো?”

“হ্যাঁ, তুমি চিন্তা কোরো না।”

“তাহলে সাবধানে থেকো… কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিও।”

“আচ্ছা।” বাড়িতে ফিরে অনুজা দেখে প্রিতুল তার ছোট বোনের সঙ্গে নিচু স্বরে কিছু একটা বলছে। কী কথা চলছে বোঝা যায় না, কিন্তু প্রিতুলের মুখের হাসিটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। “এই! তোমরা আবার কী শুরু করেছ?” নেহা বোন হেসে ওঠে।

“কেন আপু, তোমার কি জ্বলে নাকি?” প্রিতুল ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, “মনে হয় কারও একটু জ্বলছেই। যাই হোক, কই গিয়েছিলে?”

“তোমাকে কি সব বলতে হবে?”

প্রিতুল কণ্ঠে ঠাট্টা মিশিয়ে বলে, “রাতে মনে হয় ভালো ঘুম হয়নি তোমার। যাও, আগে একটু রেস্ট নাও সব ঠিক হয়ে যাবে।” এই বলে সে হেসে ওঠে। রাগে অনুজা আর কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে যায়। কিন্তু ঘরে গিয়েও মন শান্ত হয় না তার। নাভিদকে নিয়ে অদ্ভুত এক ভয় বুকের ভেতর চেপে বসে। এর আগে তাকে কখনও এমন অসুস্থ হতে দেখেনি। তাড়াতাড়ি করে অনুজা মেসেজ পাঠায়। কোনো উত্তর আসে না। লাইনেও নেই।

উৎকণ্ঠায় সে কল দেয়। একবার… দুইবার… কিন্তু ফোন ধরা হয় না। “হয়তো রেস্ট করছে… তাই সাইলেন্টে রেখেছে,” নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে সে। তবু বুকের ভেতরের অশান্তিটা কিছুতেই কমে না।

এভাবে কয়েক দিন কেটে যায়। নাভিদের সঙ্গে অনুজার আর কোনো যোগাযোগ নেই। না ফোন, না দেখা। অনুজা বারবার নাভিদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেয়। কিন্তু প্রতিবারই বাড়ির ম্যানেজার একই কথা জানায়

“স্যার আর তার বাবা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাইরে গেছেন। কাউকে কিছু বলা হয়নি।” এই কথাগুলো অনুজার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে শূন্যতা তৈরি করে।
আর কিছুদিন পরই তাদের বিয়ে। তার আগেই নাভিদ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কোথায় গেছে—কেউ জানে না।কেন গেছে কেউ জানে না। অনুজা ভেঙে পড়ে।
এই সুযোগে চাইলে প্রিতুল সহজেই নিজের জায়গা তৈরি করতে পারত। কিন্তু সে কিছুই করে না। কারণ শত কষ্টের মধ্যেও সে অনুজাকে সত্যিই ভালোবাসে।
এক রাতে অনুজা ডায়েরিতে নিজের না বলা কষ্টগুলো লিখে ঘুমিয়ে পড়ে। হঠাৎ কারও উপস্থিতি টের পায় সে।
মাথায় হাত পড়ার আগেই অনুজা উঠে বসে।

“সে… আপনি?”

“উফফ! এবারও চমক দিতে পারলাম না দেখছি।” লাইট জ্বলে ওঠে।

“আরে… নাভিদ?!”

“হুম, জান।” নাভিদকে দেখে অনুজার চোখ ভিজে ওঠে।

“আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবো না। জানো আমি কত কষ্ট পেয়েছি?”

“আর কখনও কষ্ট দেব না,” নাভিদ নরম কণ্ঠে বলে।
“সত্যি বলছি, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। একটা বিজনেসের কাজে আব্বু আর আমাকে দেশের বাইরে যেতে হয়েছিল…”
“তাই বলে একবারও জানাবে না?”
“চেয়েছিলাম… কিন্তু ওখানে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।”
“চুপ।” এই বলেই অনুজা নিজের ভালোবাসার ছোঁয়া রাখে নাভিদের ঠোঁটে। সেই রাতটা তারা গল্পে গল্পে কাটিয়ে দেয়। সকালে সবাই অবাক হয়ে দেখে দুজন একসঙ্গে ঘর থেকে বের হচ্ছে। প্রিতুলের বুকটা হু হু করে ওঠে। সে বুঝে যায় এখানে তার আর কোনো জায়গা নেই। নিজের ঘরে ফিরে সে সিদ্ধান্ত নেয় চলে যাবে। এবার আর কেউ তাকে আটকাতে পারবে না।
হঠাৎ নাভিদ ঘরে ঢোকে। “কিরে, কোথায় যাচ্ছিস?”
“একেবারে তোদের জীবন থেকে দূরে। আর বিরক্ত করব না কখনও।”
“না গেলে হয় না?”
“এই কথা তুই বলছিস?”
“হ্যাঁ… তোর খুব দরকার আমার।”
প্রিতুল হালকা হেসে ফেলে। “মজা নিস না। সুখে থাক তোর ভালোবাসা নিয়ে। তবে মানতেই হবে তুই অনেক লাকি। কয়জনের কপালে নিজের ভালোবাসার মানুষ জোটে বল।” সবাই আটকানোর চেষ্টা করলেও প্রিতুল চলে যায়। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় নাভিদই।

সেদিন সন্ধ্যায় নাভিদ অনুজাকে বলে, “আমি তোমার সঙ্গে পুরো দুনিয়া দেখতে চাই। আমার কিছু ইচ্ছে আছে পূরণ করবে?”
“ওমা! তুমি চাইলে আমি না বলবো নাকি?”
“তাহলে রেডি হও। অ্যামিউজমেন্ট পার্ক যাব।”
“ওখানে কেন?”
“প্রশ্ন নয়—আমার সঙ্গে চলো।”

রোলার কোস্টারে উঠেই ভয় আর আনন্দের মাঝে নাভিদ চিৎকার করে বলে, “ভালোবাসি তোমাকে অনুজা! অনেক বেশি! জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত তোমার সঙ্গেই থাকতে চাই!”
অনুজার চোখ ভরে ওঠে। “আল্লাহ! এসব কেন করলে?”
“সবাই ভয় পেয়ে চিৎকার করে… আর আমি চেয়েছিলাম ভালোবাসা চিৎকার করে বলতে।”

সেদিন তারা একসঙ্গে আইসক্রিম খায়। হাঁটতে হাঁটতে অনুজা গোলাপ দেখে দৌড়ে গিয়ে একটা কিনে আনে।
“ভালো লেগেছে?”
“হুম… তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় বেলি ফুল।”
অনুজা হঠাৎ চুপ করে যায়। “এত সুখ একদিন শেষ হয়ে গেলে আমি কী করবো? দুই দিনের দুনিয়ার এত মায়া কেন?”

“এসব বলো না প্লিজ,” নাভিদ শক্ত করে হাত ধরে।

“তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না—কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

“বোকা মেয়ে,” সে হেসে বলে। কিন্তু সুখের মাঝেই নাভিদের শরীর বারবার খারাপ হতে থাকে।
অনুজার মনে সন্দেহ জমে। “তুমি সত্যিই ঠিক আছ তো? পাঁচ দিনের মধ্যে বিয়ে… কিন্তু তোমাকে খুব অসুস্থ লাগছে।” “চিন্তা কোরো না, আমি ঠিক আছি।”
তবু প্রায়ই নাভিদ পুরো দিন বা পুরো রাত উধাও থাকে কোনো না কোনোভাবে অনুজাকে বুঝিয়ে দেয়। শেষ দুই রাত সে ঘর থেকেও বের হয়নি। শরীর ভেঙে পড়েছে। চোখে মুখে অসুখ আর অজানা চিন্তার ছাপ।
সেই রাতে সে কাউকে ফোন করে…
তারপর…..

(আপনাদের কি মনে হয় নাভিদ এমন করছে কেনো?আর কাকেই বা সে কল করেছে? কি হয়েছে তার?)

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply