প্রেম আসবে এভাবে
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_৮
নাভিদ কাছে আসতে আসতে চোখ বন্ধ করে ফেলল অনুজা। নাভিদ কেবল তাকিয়ে রইল অনুজার মায়া ভরা ক্লান্ত মুখটার দিকে। আহা কত মায়া এই মুখে। আর কিছু ভাবল না। নেশায় সেও ডুবেছে। শরীরটা তারও যে এইবার ঝিমিয়ে আসছে।
সকালের নরম আলো ঘরের পর্দা গলে ভেতরে ঢুকছে। ঘুম ভাঙতেই অনুজার শরীরে একটা পুরুষালি শার্টের স্পর্শ টের পেল সে। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে—ওটা নাভিদের শার্ট। হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠে তার।
“এই নাভিদ? এসব কী সর্বনাশ করেছো তুমি আমার?” কণ্ঠে ভয় আর লজ্জা একসাথে কাঁপছে। নাভিদ তখনো আধঘুমে। কোমরে শুধু একটা প্যান্ট, চোখ দুটো ঝিমানো। “কি হয়েছে জান?” ক্লান্ত হাসি লেগে আছে মুখে। “জান-টান বলো না। আগে বলো কাল রাতে কী হয়েছিল?” অনুজার চোখে অস্থিরতা।
নাভিদ কিছু বোঝার আগেই অনুজার হাত টেনে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। বুকের উষ্ণতায় মুহূর্তের জন্য অনুজার রাগ গলে যায়। সে আর বাধা দেয় না। শুধু নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে। কিছুক্ষণ পর নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অনুজা ফিসফিস করে বলে, “কাল রাতে… তুমি আমার সঙ্গে কী করেছ?”
নাভিদ চোখ বড় করে তাকায়। “ওমা! সব ভুলে গেছো নাকি?”
“প্লিজ জান বলো না। সিরিয়াস হয়ে বলো কি হয়েছিল?” — কণ্ঠে ভয় জমে ওঠে। নাভিদ হালকা হেসে উঠে বসে।
“আরে পাগলি, কিছুই হয়নি। তুমি এত ড্রিংক করেছিলে যে সারা রাত বমি করেছো। লেডি ওয়ার্কার এসে তোমাকে পরিষ্কার করে আমার একটা শার্ট পরিয়ে দিয়েছে। এখানে তো তোমার কাপড় ছিল না।”
এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে অনুজা। তারপর দীর্ঘশ্বাস। “ও আল্লাহ… আমি কী না কী ভেবে ফেলেছিলাম। বাসার সবাই কী ভাবছে বলো তো! সারা রাত বাড়ি ফিরিনি…”
নাভিদ শান্ত গলায় বলে, “চিন্তা করো না। রাতে বাবা ফোন করে বাড়িতে সব জানিয়ে দিয়েছে।” অনুজার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসে। চোখ নামিয়ে লজ্জাভরা স্বরে বলে, “আমি অকারণেই তোমাকে দোষ দিলাম…”
নাভিদ মৃদু হাসে। “প্রেম যে জন করে সে জন দোষীই হয় বেলিফুল।” অনুজা কেবল হাসল তবে জবাব দিলো না৷। তবে সে কি জানে, এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাভিদ আর তার সম্পর্ক যেমন গভীর হচ্ছিল, ঠিক তেমনি অন্যদিকে প্রিতুলের জীবনটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল? মানসিক আঘাত আর হতাশা তাকে নেশার দিকে ঠেলে দেয়। শরীর-মন দুটোই দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষমেশ ভালো চিকিৎসার জন্য তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুরু হয় নানা ধরনের থেরাপি। শারীরিক, মানসিক, পুনর্বাসনের লড়াই।
এই পুরো সময়টায় রুশদা এক মুহূর্তের জন্যও তাকে একা ছাড়েনি। দিন-রাত পাশে বসে থেকেছে, ওষুধ খাইয়েছে, ভেঙে পড়লে শক্ত করে হাত ধরেছে। মেয়েটা সত্যিই তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতো। একেবারে নিঃস্বার্থভাবে। প্রায় তিন মাস লেগে যায় প্রিতুলের নিজেকে আবার আগের মতো দাঁড় করাতে। সে ধীরে ধীরে ভাগ্যকে মেনে নেয়। জীবনে যা হওয়ার ছিল তাই হয়েছে। এই ভাবনাতেই শান্তি খুঁজে নেয়। কিন্তু একটা জায়গা আজও শূন্য… অনুর জায়গায় কাউকে বসানো যায় না। হাসপাতাল থেকে ফিরে সে সিদ্ধান্ত নেয় আগে চট্টগ্রাম যাবে। অনু আর নাভিদ কেমন আছে দেখে আসবে। বুকের ভেতরে অজানা শঙ্কা কাজ করছিল।
“ছেলেটা খুব চালাক… যদি অনুর কোনো ক্ষতি করে বসে?” মাস কয়েক তো কেটেই গেছে। হয়তো এখন অনু তার স্ত্রী হতে চলেছে। ভাবতেই বুকটা হাহাকার করে ওঠে। জীবনটা বড় অদ্ভুত… দুই দিনের এই ছোট্ট জীবনের মাঝেই কত কষ্ট, কত না বলা যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে। শেষমেশ নিজেকে বোঝায়
“অনু সুখে থাকলেই হবে।” বাড়ির সবাই তাকে চট্টগ্রাম যেতে বারণ করে। কিন্তু কারও কথা না শুনে কোনোভাবে অনুর বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে সে সেখানে হাজির হয়। কিন্তু অনু তখন বাড়িতে ছিল না। সে নাভিদের সঙ্গে বিয়ের কেনাকাটা করতে গেছে। কারণ আর মাত্র পনেরো দিন পরেই তাদের বিয়ে।
বাড়িতে ছিল শুধু নেহা আর তার মা। নেহা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলে, “মা, আর পনেরো দিন পরই আপুর বিয়ে! কী বড়লোক আর হ্যান্ডসাম জামাই পাবে! আমার কপালে কি কখনো এমন ছেলে জুটবে না?” মা আদর করে বলে, “চিন্তা করিস না মা, তোর ভাগ্যে আরো ভালো কিছু লেখা আছে।”
ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে ওঠে। নেহা ভাবে বোন এসেছে। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে ফেলে। কিন্তু সামনে প্রিতুলকে দেখে থমকে যায়। জিজ্ঞেস করে, “আপনাকে তো চিনলাম না…” প্রিতুল ভদ্রভাবে বলে, “আমি অনুর বন্ধু। ভেতরে আসতে বলবেন না?”
“হ্যাঁ… আসুন।”
সে একটু দ্বিধায় জিজ্ঞেস করে,”অনুকে একটু ডেকে দিবে?”
“সে বাসায় নেই। বিয়ের শপিং করতে গিয়েছে। আর মাত্র পনেরো দিন পর আপু আর নাভিদ ভাইয়ার বিয়ে।”
এই সময় অনুর মা এসে দাঁড়ায়। “কে বাবা তুমি?”
প্রিতুল শান্ত গলায় মিথ্যে আশ্রয় নেয়, “আমি অনুর ফ্রেন্ড প্রিয়ার ভাই। একটা বিজনেসের কাজে এখানে এসেছি। যাওয়ার আগে অনুরর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম।”
“ও আগে বলবে না! তোমরা তো অনুজাকে আশ্রয় দিয়েছিলে না হলে কী যে হতো!”
“আন্টি, আমার একটু ইমারজেন্সি আছে। অনুর সঙ্গে দেখা করেই চলে যাব।”
মা সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি করে ওঠে, “ওমা এসব কী কথা! অনুর বিয়ের আগে তোমাকে এই বাড়ি থেকে ছাড়ছি না!”
“আন্টি, তা কেমন করে হয়…”
“হবে, হবেই!” মনের ভেতরে তখন মহিলার নানা হিসাব চলছে। ছেলেটাকে দেখেই বুঝে গেছে—বড়লোক।
“আমি একটু আসছি,” বলে নেহাকে নিয়ে সে নিজের রুমে ঢুকে পড়ে। ফিসফিস করে বলে, “দেখেছিস ছেলেটাকে? একবার যদি ওকে তোর পেছনে লাগানো যায় তাহলেই আমাদের ভাগ্য খুলে যাবে!”
নেহা দ্বিধায় বলে, “মা, বড়লোক আর হ্যান্ডসাম ঠিকই… কিন্তু আমরা তো ওকে চিনি না। এমন করা কি ঠিক হবে?”
“চুপ কর! তোর মা কখনো তোর খারাপ চায়?”একটু থেমে হিসেবি হাসি হেসে বলে, “এই পনেরো দিনই যথেষ্ট। যেভাবেই হোক ছেলেটাকে এই বাড়িতে আটকে রাখবো। আর এই সময়ের মধ্যেই তুই প্রিতুলকে নিজের করে নিবি।”
নেহা ধীরে বলে, “জানি না কী হবে… তবে চেষ্টা করতে দোষ নেই।” এই বলে সে খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে প্রিতুলের দিকে যায়।
“আপনি বাড়িতে জানিয়ে এসেছেন তো?”
প্রিতুল অবাক হয়ে বলে, “না আন্টি…”
“কি সব কথা বলছো! আচ্ছা আগে খাও, তারপর সব দেখা যাবে।”
হঠাৎ করেই বাড়ির দরজায় শব্দ হয়। মুহূর্তের মধ্যেই অনুজা আর নাভিদ ভেতরে ঢুকে পড়ে। দুজনের মুখেই কেনাকাটার আনন্দ। হাসতে হাসতেই অনুজার চোখ সামনে গিয়ে থেমে যায়। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে প্রিতুল। হৃদয়টা কেমন করে ওঠে।
“আপনি এখানে?” বিস্ময় আর অস্বস্তি একসাথে গলায় ধরা পড়ে। প্রিতুল ধীরে তাকায়। “কেন অনুজা? আমাকে দেখে খুশি হওনি বুঝি?” প্রিতুল কিছু বলার আগেই নাভিদ অনুজার হাত শক্ত করে ধরে নেয়। কণ্ঠে ইচ্ছে করেই বাড়তি উচ্ছ্বাস,“দেখ বন্ধু, আর ক’দিন পরই তো আমার আর অনুজার বিয়ে। সেদিন কিন্তু তুই পাশে থাকবি। তুই না থাকলে তো আনন্দই অসম্পূর্ণ!” এই কথার সঙ্গে নাভিদের ঠোঁটে একটা অদ্ভুত হাসি খেলতে থাকে যেন ইচ্ছা করেই আগুনে ঘি ঢালছে সে। প্রিতুল সব বুঝে যায়। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট আর ঈর্ষা একসাথে জ্বলে ওঠে। “আমি তো চলে যাওয়ার কথাই ভাবছিলাম।” কণ্ঠে চাপা রাগ। “কিন্তু তুই যখন এত করে বলছিস, আর আন্টিও চাইছেন থাকতে… তখন সিদ্ধান্ত নিলাম এই পনেরো দিন এখানেই থাকবো।” এই কথা শুনে নাভিদ নিজেই একটু থমকে যায়। সে তো ভেবেছিল প্রিতুল রেগে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই চলে যাবে।
কিন্তু অনুজার মা আর নেহার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
“আরে খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছো বাবা।” অনুজার মা খুশিতে বলে ওঠে।
অনুজা অস্বস্তিতে বলে, “না… আপনার যদি কোনো অসুবিধা থাকে তাহলে যেতে পারেন। আমাদের তো দেখা হয়েই গেছে।”
প্রিতুল স্থির চোখে তাকায়। “না, আমার কোনো সমস্যা নেই।” নাভিদ চেয়েছিল প্রিতুলকে নিজের বাসায় রাখতে, কিন্তু নেহার মা তাতে রাজি হয়নি। মনে মনে প্রিতুল খুশিই হয়। এই বাড়িতে অন্তত দুজন তার পক্ষে আছে।
অনুজা আর নেহা একই ঘরে থাকে। আর ঠিক পাশের ঘরটা প্রিতুলের থাকার জন্য গুছিয়ে দেওয়া হয়।
প্রিতুল বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দেয় ঢাকার বাইরে জরুরি কাজের জন্য যেতে হয়েছে। এই খবর পেয়ে তার পরিবার, এমনকি রুশদাও খানিকটা স্বস্তি পায়। সবাই চায় অনুজার কাছে গিয়ে সে যেন আবার কষ্ট না পায়।
রাত গভীর হয়। কিন্তু অনুজার চোখে ঘুম আসে না। বুকের ভেতর অজানা অস্থিরতা। নাভিদের সঙ্গে কথা বলতে সে ছাদের দিকে যায়। তবে প্রিতুলকে ম্যাসেজ করেছিল। জবাব আসেনি। রাগ করে সে একাই ছাদে চলে যায়। হঠাৎ পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে অনুজা ঘুরে দাঁড়ায়… আর তখনই সে দেখতে পায়
অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে এক চেনা ছায়া…যার অন্ধকারে অদেখা চোখ দু’টো কেবল হাজারটা কথা বলার জন তারই দিকে তাকিয়ে আছে।
চলবে?
শেষে কার সাথে অনুজার মিল হবে? কি মনে হয় আপনাদের?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, প্রেম আসবে এভাবে
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেম আসবে এভাবে গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪১
-
পরগাছা পর্ব ৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৯
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৩
-
প্রেমতৃষা সারপ্রাইজ পর্ব
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১১+১২
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৭