প্রেম আসবে এভাবে
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_৭
অনুজার চোখের সামনে হঠাৎ করেই প্রিতুলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে তার।
এই ঘরে সে কখন এলো? দরজার শব্দ তো পেল না!
হঠাৎ ভয় আর অস্বস্তিতে গলা শুকিয়ে আসে।
অনুজা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ” আপনি… এখানে?”
প্রিতুল শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, “কোথায় গিয়েছিলে?”
অনুজা এড়িয়ে গিয়ে বলল, “বাইরে… একটু।”
প্রিতুল সন্দেহ নিয়ে বলল, “শরীর ভালো হয়ে গেছে?”
অনুজা মৃদু হাসির চেষ্টা করল। ” হুম।”
প্রিতুল ধীরে কাছে এগোয়। ” নাটক করছো?
ভাবছো আমি বুঝি না?”
অনুজা চুপ করে থাকে। চোখ নামানো। “আপনি বুঝলেই বা কী…” প্রিতুলের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।
” শোনো, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।”
হঠাৎ বুক ধক করে ওঠে অনুজার।
প্রিতুল গভীরভাবে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”
অনুজা চমকে ওঠে। চোখে ভয় আর লজ্জা মিশে যায়।
“এসব কেন জিজ্ঞেস করছেন?”
প্রিতুল কঠোর, ভাঙা স্বরে বলল, “বলছি বলেই বলো।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। অনুজার ঠোঁট কাঁপে।
অনুজা অস্পষ্টভাবে বলল,” জানি না…”
প্রিতুল হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ে। ” মিথ্যে বলো না।”কারণ তোমার এই ডায়েরিটাই তোমার ভালোবাসার নিখুঁত প্রমাণ। অনুজা আতঙ্কে তাকায়।
“আপনি এটা কোথায় পেলেন?”
প্রিতুল সংক্ষিপ্তভাবে বলল,” সেটা জানার দরকার নেই।
এখন আর লুকিয়ে রাখতে পারবে না—তুমি আমাকে ভালোবাসো।”
অনুজার চোখ ভিজে ওঠে। সে কাঁপা গলায় বলল, “এখন কেন এসব বলছেন?”
প্রিতুল দৃঢ়ভাবে বলে ওঠে “কারণ আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”
অনুজা সেই কথা শুনে একেবারে চুপসে যায়। বলার মতো উত্তরের আজ এত অভাব কেন? “শুনুন… বিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত।”
প্রিতুল গভীর নিশ্চয়তায় বলল, ” জানি। আজ সারা রাত ভাবো। যতক্ষণ মন চায় ভাবো। তারপর আমাকে তোমার উত্তর দিও।।” একটু থেমে, নরম হয়ে যোগ করল, “আমি সিরিয়াস। কিন্তু তুমি না চাইলে কিছুই হবে না।” অনুজা আর কিছু বলে না।
শুধু মাথা নিচু করে তাকিয়ে থাকে। ভেতরে ঝড় বইছে।
এই নীরবতাই প্রিতুলকে সব বুঝিয়ে দেয়।
সে ধীরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
দু’দিন ধরে অনুজার ভেতর শুধু চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে।
কী করবে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। সময় যত গড়াচ্ছে, নাভিদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা ততই অজান্তে গভীর হয়ে উঠছে। এত প্রভাব, এত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নাভিদ কখনো তাকে কষ্ট দেয়নি। বরং প্রতিটি মুহূর্তে সম্মান আর যত্নে আগলে রেখেছে। তাহলে কি নাভিদকেই বেছে নেওয়া উচিত? নাকি প্রীতুল—যাকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল? নিজের মনের সব দ্বন্দ্ব অনুজা তুলে ধরে তার ডায়েরির পাতায়।
হয়তো এই যাত্রায় সে নাভিদের হাত ধরবে। তবু মনে হচ্ছিল চোখের দেখায় সব কিছু সুন্দর লাগলেও, সত্য সবসময় এত সহজ নয়।
পরদিন সকাল। নাভিদকে দেখে অনুজার মনে হলো সে বুঝি কোথাও যাবে। চেহারায় তার স্থির প্রস্তুতি। অনুজা জলদি জিজ্ঞেস করল, ” এত সকালে এত সাজগোজ কেন?”
নাভিদ হালকা হাসল। “চলে যাচ্ছি। তোমার থেকে অনেক দূরে। কাউকে কিছু জানাইনি। কিন্তু তোমার কাছে বিদায় না নিয়ে যেতে পারলাম না।”
“কেন?”
এক মুহূর্ত নীরব থেকে সে বলল, “কাল রাতে বুঝলাম… আমি হয়তো কোনোদিন আমার ভালোবাসার মানুষটাকে পাবো না। লোকেরা বলে না—যার, সে একদিন নিজেই ফিরে আসে। আমার ক্ষেত্রে বোধহয় তা হবে না।” তার কণ্ঠে চাপা কষ্ট। “তাই ঠিক করেছি, একতরফা ভালোবাসাতেই থাকব। আমার কল্পনায় তুমি শুধু আমার হবে। তাতে অন্তত না পাওয়ার যন্ত্রণা প্রতিদিন নতুন করে পোড়াবে না।”
সে অনুজার দিকে তাকাল শান্ত চোখে ” তুমি আমার সেই সুহাসিনী… যাকে আমি নিঃশব্দে ভালোবাসি।
কিন্তু তুমি আমার নাগালের বাইরে।” এই কথাগুলো অনুজার বুক ভিজিয়ে দিল। চোখ ভরে জল এসে গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু প্রশ্নটা একটাই
কেন তার এত কষ্ট হচ্ছে? তবে কি সে নিজের অজান্তেই ভালোবাসার পথে পা বাড়িয়েছে?
“পাগলি একটা… কাঁদছ কেন?” নাভিদ ঠোঁটে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ” নাভিদ, প্লিজ যেয়ো না… আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। হয়তো এটাই ভালোবাসা। আমি সত্যিই তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। তুমি আমার সঙ্গে থাকো… আমার পাশে থেকো…”এই বলে অনুজা কাঁপতে থাকা হাতে নাভিদের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল প্রিতুলের ঘরের দিকে।সকালের নরম আলোয় দুজনকে একসঙ্গে দেখে প্রিতুল থমকে গেল। “তোমরা এই সময়?”
অনুজার গলা স্থির। ” প্রিতুল, তুমি তো আমার কাছ থেকে উত্তর চেয়েছিলে, তাই না?”
প্রিতুলের বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধল। “হ্যাঁ… চেয়েছিলাম।”
অনুজা এক নিঃশ্বাসে বলল, “সত্যি কথা বলতে প্রথমে তোমাকে আমার ভালো লেগেছিল। কিন্তু পরে বুঝেছি সেটা ভালোবাসা ছিল না… ছিল শুধু আকর্ষণ। আমি নাভিদকে ভালোবেসে ফেলেছি। ওর সঙ্গেই আমি জীবন গড়তে চাই। “
প্রিতুলের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। “কী বলছ এসব? এসব কি নাভিদ তোমাকে শিখিয়ে দিয়েছে? ও তোমাকে বাধ্য করেছে, তাই না?”
” না। কেউ আমাকে বাধ্য করেনি। এটা আমার সিদ্ধান্ত।”
প্রিতুলের কণ্ঠ কেঁপে উঠল, “অনুজা, তুমি আমার ভালোবাসা কখনোই বোঝোনি। শেষমেশ একটা খুনিকেই বেছে নিলে?”
নাভিদ কিছু বলতে এগোতেই অনুজা কঠোর স্বরে থামাল,” চুপ করো। নাভিদ আর আগের নাভিদ নেই। মানুষের অতীত দিয়ে তাকে বিচার করা বন্ধ করো।”
” এখন তো এসব বলবেই…”
আমার ভালোবাসা আজ মূল্যহীন হয়ে গেল।
প্রিতুলের চোখে জমে থাকা কষ্ট শব্দ হয়ে ঝরে পড়ল।
” জানো, যেদিন তোমাকে প্রথম ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছিলাম, সেদিনই আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলি। দিন যত গড়িয়েছে, অনুভূতিটাও তত গভীর হয়েছে। ভেবেছিলাম তুমি নিজেই একদিন বুঝে যাবে।”
সে একটু থেমে কষ্ট গিলে নিল। “প্রায়ই রাতে তোমার ঘরে যেতাম… মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম, যেন তুমি শান্তিতে ঘুমাও। একদিন হঠাৎ তোমার ডায়েরি চোখে পড়ে যায়। সেখানে আমাকে নিয়ে লেখা তোমার অনুভূতিগুলো পড়ে বুঝে গিয়েছিলাম তুমিও আমাকে ভালোবাসো।”
অনুজার চোখ নামল মেঝেতে। ” সব ঠিকই চলছিল…
কিন্তু নাভিদ এসে আমাদের মাঝখানে সব বদলে দিল।”
প্রিতুলের কণ্ঠ ভেঙে গেল, ” ও আমার ছোটবেলার বন্ধু ছিল। বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু কখনো ভাবিনি সে আমার কাছ থেকে তোমাকে কেড়ে নেবে…”
“শোন প্রিতুল, আমি অনুজাকে জোর করিনি। মন থেকে ভালোবাসলে আল্লাহ সবসময় সাহায্য করেন।”
“তুই তো চুপই থাক। কোনোদিন লাইফে হ্যাপি হবি না। এমন ভালোবাসা কখনো টেকে না। এটা তুই নিজেও মিলিয়ে নিস। আজ যতটা কষ্ট আমি আমার ভালোবাসা হারিয়ে পাচ্ছি, তার দ্বিগুণ তুইও পাবি।”
“প্লিজ, তোমরা চুপ করো। আমাকে কেউ কারো কাছ থেকে কেড়ে নেয়নি। ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। আমি আজ নাভিদের সঙ্গেই যাব।”
নাভিদের চোখের উজ্জ্বল দৃষ্টিতেই বোঝা যাচ্ছিল—সে কতটা আনন্দিত। ভালোবাসা এমনই। একজনের মন রাখতে গেলে আরেকজন কষ্ট পায়। কিন্তু তাই বলে সবার মন রাখার জন্য তো সবাইকে ভালোবাসা যায় না।
জীবনসঙ্গী একজনই হয়। যেভাবে অনুজা আর নাভিদের জীবনে নতুন দিন শুরু হলো, সেভাবেই প্রিতুল তলিয়ে যেতে লাগল অন্ধকারে। অফিসের কাজ বন্ধ হয়ে গেল। রাত জেগে অনুজার ঘরের বারান্দায় বসে একের পর এক মদের বোতল শেষ করতে লাগল সে।
দিন যেতে থাকল। ভালোবাসা হারানোর শোকে প্রিতুল ধীরে ধীরে পাথর হয়ে গেল। টাকা-পয়সার কোনো অভাব ছিল না তার জীবনে। তবু প্রিয় মানুষটা নেই কেন? বাড়ির সবাই ভেঙে পড়ল। ওদিকে অনুজার সৎ মা-ও বদলে গেছে। নিজের মেয়েটা যখন নাভিদের কাছে বন্দি ছিল, তখনই সে বুঝেছিল সন্তান কী জিনিস। অনুজা এখন তাদের বাড়িতেই থাকে।
মন চায় নাভিদের কাছে ছুটে যেতে কিন্তু এখনো তো তাদের বিয়ে হয়নি। আর বিয়েটা সে ঠিক করেছে নিজের জন্মদিনেই। নাভিদকে স্পষ্ট বলেছে সেই দিনই সে তার সঙ্গে জীবনের বন্ধনে বাঁধবে। বাগদান হবে সামনের ফ্রাইডে। অনুজা ভীষণ হ্যাপি। কত সহজেই সে নাভিদকে পেয়ে যাচ্ছে। রাতে দুজন বাইরে ডিনারে যায়।
অনুজার জীবনে আর কোনো চাওয়াই নেই।
ফ্রাইডেতে সুন্দরভাবে দুই পরিবারের উপস্থিতিতে বাগদান সম্পন্ন হয়। সবাই ছিল ভীষণ খুশি। সেদিন রাতে নাভিদ বন্ধুদের নিয়ে একটি ব্যাচালার পার্টির আয়োজন করে। অনুজা নিজেই সেই অনুষ্ঠানে ছিল। তবে নাভিদের বন্ধুগুলোও না। কোলাকোলির সঙ্গে কে যেন এ্যালকোহোল মিশিয়ে দিয়েছিল। অনুজা বুঝি এতকিছু বুঝেছে? অনুজা এতটাই বেশি ড্রিংক করে ফেলেছিল যে কী বলছে না বলছে, নিজের খেয়াল নেই। পার্ট শেষে সবাই যখন চলে যায়। পরিবেশ যখন শান্ত হয়ে আসে তখন সে নাভিদের দিকে টলতে টলতে এগিয়ে এসে বলল, “ওই নাভিদ… আমার হ্যান্ডসাম হাজব্যান্ড… এসো, আজ আমরা একটা খেলা খেলব।”
নাভিদ হেসে বলল, “তাই নাকি? কী খেলা?”
অনুজা গাল ফুলিয়ে বলল, “বাচ্চা বাচ্চা।”
“ওটা আবার কোন খেলা?” নাভিদ বুঝতে পারল অনুজা ঠিক নেই। সে অনুজাকে সামলে বলল, আজকে তোমাকে একটা গোপন কথা বলি। শুনবে? “
“হুম।”
“আমার মা ছোটবেলায় কী বলত জানো?”
“কি বলত?”
“আমাকে নাকি ব্রিজের নিচে কুড়িয়ে পেয়েছে!”
অনুজা হেসে গড়িয়ে পড়ল, “আরে! আমার মাও তো আমাকে তাই বলত!”
“কি বলো! কী বলত?”
অনুজা ফিসফিস করে বলল,“আস্তে… এদিকে এসো, কেউ শুনে ফেলবে।”
“হুম ”
“আমাকে নাকি ময়লার ভেতর থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে!”
নাভিদ হেসে উঠল, “ছি ছি ছি! গা থেকে নিশ্চয়ই গন্ধ বের হয়েছে?” দুজনেই হেসে উঠল।
তারপর হাসতে হাসতেই তারা রুমের দিকে চলে গেল… অনুজা রুমের ভেতর গিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়ল চিৎপটাং হয়ে। নাভিদ তার দিকে একবার তাকালো। তারপর দরজার ছিটকিনি লাগাতেই হঠাৎ মাতাল অনুজা জিজ্ঞেস করল, “আমার অনেক গরম লাগছে। এই জামা এত ভারী। আচ্ছা দরজা লাগিয়েছো কেন?”
“গরম লাগছে? জামাটা আসলেই দেখছি ভারী।” সে মুচকি হেসে বলল, “মে আই হেল্প ইউ?”
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, প্রেম আসবে এভাবে
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩০(বিবাহ স্পেশাল পর্ব)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৬+৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১১+১২
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪১
-
পরগাছা পর্ব ৮
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ২
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৫+১৬