প্রেম আসবে এভাবে পর্ব_৪
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_৪
কিছুক্ষণ লোকটি বারান্দায় গিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। অনুজার দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকায় সে। তারপর কোনো শব্দ না করেই নিজের নিঃশব্দতা সঙ্গে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এতসব ঘটনার মাঝেও অনুজা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সবকিছুর অজান্তেই।
সকালে প্রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে অনুজা যখন তার ঘরে যায়, তখনই চোখে পড়ে ঘরটিতে প্রিয়ার বাবা-মা এবং আরেকটি মেয়ে বসে আছেন। প্রিয়া অনুজাকে দেখে বলল,”আয় অনুজা। আমার আব্বু-আম্মু এসেছে।” অনুজা সালাম দিতেই তারা খুব সহজে, খুব আপন ভঙ্গিতে তাকে গ্রহণ করে নেন। তাদের সঙ্গে থাকা মেয়েটিও ঠিক তেমনই।
“অনুজা, ওর নাম রুশদা। আমার কাজিন। আমরা যেই জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম, ও সেখান থেকে তিন মাস আগেই এসেছে।”
“তুমি প্রিয়ার ফ্রেন্ড, তাই না? তোমার বাসা কোথায়?” হালকা হাসি নিয়ে প্রশ্ন করে রুশদা।
“হুম। আমি অনুজা। আমার বাড়ি চট্টগ্রামে। তোমার বাবা-মা আসেনি?”
প্রশ্নটা শুনতেই রুশদার মুখের রং মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ঠিক তখনই প্রিয়া অনুজার কানের কাছে ঝুঁকে নিচু স্বরে বলে, “ওর বাবা-মা নেই। আমাদের সঙ্গেই থাকে। আংকেল-আন্টি অনেক আগেই এক্সিডেন্টে মারা গেছেন।”
অনুজা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। “আল্লাহ… সরি গো। আমি বুঝতে পারিনি।”
রুশদা হালকা হাসে। “আরে, সরি বলার কী আছে? রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। তাই একটু ক্লান্ত লাগছে। আমি রুমে যাই। রেস্ট নিলে শরীর ঠিক হয়ে যাবে।”
ঘর থেকে সবাই বের হয়ে যায়। ঘর থেকে বেরিয়ে অনুজা প্রিয়াকে টান দিয়ে নিজের ঘরের দিকে নিয়ে যায়। “চল, আমার রুমে যাবি এখন।”
প্রিয়া অনুজার রুমে আসতেই অনুজা তাকে বলল, “প্রিয়া, তোর বোনটা তো ভীষণ কিউট রে। বাইরে থেকেও কত শালীন!”
প্রিয়া একটু দুষ্টু হেসে বলে, “হুম রে। কত ভালো হতো যদি ও আমার ভাইয়ের বউ হতো। সারাজীবন আমাদের সঙ্গেই থাকতে পারত।” এই কথা শুনেই অনুজা থমকে যায়। চোখ বড় করে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, “কী বলছিস এসব?”
“আরে, এটা তো আমার মা-বাবার ইচ্ছে।”
“ও… আর তোর ভাইয়ের?”
প্রিয়ার মুখে একরাশ বিরক্তি। “সেখানেই তো প্রবলেম। সে বলে রুশদাকে সে বোনের চোখেই দেখে। এখন কী করব বল? এইবার আর রুশদাকে বিদেশ যেতে দেব না আমি। এখন তো তুইও আছিস। তুই কিন্তু আমাকে হেল্প করবি।” এইসব শুনে অনুজার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কষ্ট চেপে বসে। তবুও কোথাও একটা অজানা স্বস্তি আসে প্রিতুল রুশদাকে ভালোবাসে না, এই ভাবনাটা তাকে অকারণেই একটু হালকা করে দেয়। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ভাই, আমি এসব পারব না। আমি কি তোর মতো ঘটক নাকি?”
“দূর যা তো!”
“এই ন্যাকা!” এই বলে প্রিয়াকে রেখেই এক দৌড়ে অনুজা প্রিতুলের রুমের দিকে চলে যায় এবং নক করে। ভেতর থেকে কোনো শব্দ না আসায়, সে একাই ভিতরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু রুমে প্রবেশ করেই দেখে সেখানে কেউ নেই। “আল্লাহ! এই হ্যান্ডসম টা কোথায় গেলো? তাও আজ এতো সকালে?” মন খারাপ করে অনুজা রুম থেকে বের হয়ে প্রিয়ার সঙ্গে আবার দেখা করতে আসে।” কিরে? দৌড়ে কোথায় চলে গিয়েছিলি?”
“তোর ভাই কই গিয়েছে রে?”
“শুনেছি, মাঝ রাতে এমার্জেন্সি কাজে অফিসে যেতে হয়েছে।”
“ওওও… কি আর করার।” সন্ধ্যায় হঠাৎ বাড়ির ফোনে অফিস থেকে কল আসে। টেলিফোনের সামনে অনুজা বসে ছিল, তাই কাউকে না পাওয়ায় তাকে কলটা ধরতেই হয়। “হেলো! কে বলছেন?”
ওপাশে প্রিতুলের কণ্ঠ, সে জিজ্ঞেস করল, ” তুমি কেন ফোনটা ধরলে?”
“কেউ ছিলো না, তাই আমি ধরেছি। কেনো, কোনো প্রবলেম আপনার?”
“আরে না। বাসায় বলে দিও, গেস্ট রুম ঠিক করতে। আমার একজন গেস্ট আসবে আজ।”
“কত কত গেস্ট যে আপনাদের। সামলাবেন কেমন করে?”
“তোমাকে যেমন করে সামলাই চুন্নি।”
“দেখেন ভালো হবে না কিন্তু… খালি বাড়ি আসেন একবার। দেখে নিবো।” হঠাৎ করেই রুশদা চলে আসে সেখানে। “কার সাথে কথা বলছ?”
“প্রিতুল।”
“দাও আমার কাছে।” এই বলে রুশদা ফোন হাতে নেয়। কথা বলা শুরু করে, কিন্তু প্রিতুল ব্যস্ত থাকায় ফোনটি রেখে দেয়।
“অনুজা, প্রিতুল তোমার চেয়ে অনেক বড়। আর যেহেতু সে প্রিয়ার ভাই, তাই ওকে তুমিও ভাইয়া বলেই ডাকবে।”
“ওকে, আপু।”বলেই রুশদাকে বকতে বকতে অনুজা সেখান থেকে চলে যায়।
সন্ধ্যার দিকে অফিস থেকে প্রিতুল তার গেস্টকে সঙ্গে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। প্রিতুলের বাড়ি ফেরার খবর পাওয়া মাত্রই অনুজা দৌড়ে নিচে নেমে আসে। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকে সে। হৃদয়টা অকারণেই ধকধক করতে থাকে। হঠাৎ প্রিতুলের ঠিক পেছন পেছন করেই গেস্টটি বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে।
দৃশ্যটা দেখামাত্র অনুজা যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখে মুখে আতঙ্ক জমে ওঠে। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে যায়। খাওয়ার সময় হলেও অনুজা নিচে নামে না। অথচ এই বাড়ির নিয়ম গেস্ট ছাড়া কেউ খাবার শুরু করে না। তাই প্রিতুলের মা অনুজাকে ডাকার জন্য সার্ভেন্ট পাঠাতে উদ্যত হন। ঠিক তখনই প্রিতুল বলে ওঠে, “ওয়েট, আমি যাচ্ছি। এমনিতেও ফোনটা ভুল করে নিজের রুমেই ফেলে এসেছি। ওর রুম আমার পাশেই, আমিই না হয় নিয়ে আসি।”
কেউ এতে আপত্তি করে না। অনুজার রুমের দরজা ভেতর থেকে লাগানো ছিল। অনেকবার ডাক দেওয়ার পর ভেতর থেকে অনুজার কণ্ঠ ভেসে আসে, “কে আপনি?”
“আরে, আমি প্রিতুল। দরজা খোলো।”
“ও… আচ্ছা। ওয়েট, খুলছি।”
দরজা খুলতেই প্রিতুল বলে, “সবাই তোমার জন্য ওয়েট করছে। খাবে না?”
“না, খিদে নেই। আপনার গেস্ট কখন যাবে?”
“এক–দুই সপ্তাহ এখানেই থাকবে। কিন্তু কেন?”
“এতদিন থাকা লাগে নাকি? এখনই যেতে বলেন।”
“এগুলো কী কথা বলছো!” বলেই প্রিতুল হঠাৎ অনুজার হাত ধরে তাকে জোর করে নিচে নিয়ে আসে। অনুজা শুধু নিজের হাত ছাড়ানোর ট্রাই করছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। নিচে নামতেই গেস্টের দৃষ্টি অনুজার ওপর গিয়ে আটকে যায়। সেই দৃষ্টি ছিল নেশালো, অস্বস্তিকর—একটা মেয়েকে আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। হঠাৎ প্রিতুল গেস্টের দিকে তাকিয়ে বলে, “ওর নাম অনুজা। প্রিয়ার ফ্রেন্ড… ও এখানে…” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অনুজা হঠাৎ বলে ওঠে, “আমি প্রিতুলের ওয়াইফ।” এই কথা শুনে যেন সবার মাথায় বজ্রপাত হয়। একে একে সবাই প্রশ্ন করতে শুরু করে। প্রিতুল নিজেও কিছু বুঝে উঠতে পারে না।
অনুজা তাড়াতাড়ি বলে, “আসলে… ওয়াইফ বলতে… আমাদের আংটি বদল হয়ে গেছে। সরি, সবকিছু লুকিয়ে করা হয়েছে।” এই কথা শুনে প্রিতুল শক্ত গলায় বলে, “যাই হোক, আমার রুমে আসো। কথা আছে।”
কোনোমতে সবাইকে এড়িয়ে প্রিতুল অনুজাকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। “তোমার মাথা ঠিক আছে? এসব কী বলছো তুমি? আমার সঙ্গে তোমার আংটি বদল হলো কবে? আমাদের মধ্যে তো কিছুই নেই! তাহলে সবাইকে মিথ্যে বললে কেন?”
“আমাকে ভুল বুঝবেন না। নিজেকে বাঁচানোর জন্যই এসব বলেছি।”
“বাঁচানোর জন্য? তুমি কী বলছো? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। প্লিজ, সব খুলে বলো।”
অনুজা গভীর শ্বাস নিয়ে বলে, “নিচে যে লোকটা আপনার গেস্ট হয়ে বসে আছে, সে আর কেউ না। সেই ছেলেটাই, যার ভয়ে আমি চট্টগ্রাম থেকে মাঝরাতে ঢাকায় পালিয়ে এসেছিলাম।”
“হোয়াট! কেন? কী হয়েছিল?” এরপর অনুজা তার জীবনের প্রতিটা ভয়ংকর ঘটনা একে একে প্রিতুলকে খুলে বলে। সব শুনে প্রিতুল নিজেও দিশেহারা হয়ে পড়ে। তবু সে বোঝে—এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানো যায়। এতে করে অন্তত রুশদাকে বিয়ে করার চাপ থেকে সে বাঁচতে পারবে। পরে একদিন সত্যটা পরিবারকে জানানো যাবে। কিছু না ভেবে সে বলে ওঠে, “আমি তোমাকে সাহায্য করব। সবাইকে মিথ্যাটা স্বীকার করতেও রাজি। কিন্তু এর বদলে তোমাকেও আমাকে সাহায্য করতে হবে। রুশদাকে আমার জীবন থেকে দূরে সরাতে হবে।”
“সব পারব। প্লিজ, হেল্প মি।”
প্রিতুল মুচকি হেসে বুঝিয়ে দেয় সে সাহায্য করবে।
–
দুজনেই নিচে নেমে খাবার টেবিলে যায়। তারা সেখানে যেতেই নাভি১ নাভিদ প্রিতুলকে প্রশ্ন করে, “কিরে বন্ধু? আমাকে রেখে কোথায় চলে গিয়েছিলি? আর বাড়ির সবার রিঅ্যাকশন দেখেই বুঝছি তোরা মিথ্যে বলছিস।”
“আমরা মিথ্যে বলব কেন?”
“হয়তো কাউকে বাঁচাতে।” এই কথাগুলো শুনে প্রিয়ার মন যেমন খারাপ হয়ে যায়, তেমনি রুশদা কান্না করতে করতে নিজের ঘরে চলে যায়। প্রিয়া কিছুতেই এই ঘটনাগুলো মেনে নিতে পারে না। খাওয়া-দাওয়া শেষে নাভিদ যখন নিজের রুমে যায়, মনে মনে শুধু একটাই কথা বলে, “অনুজা, আমি কীভাবে তোমার থেকে দূরে থাকব? আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। সব ছেড়ে দিয়েছি। এখন তুমিও যদি আমাকে ছেড়ে দাও, তাহলে এই জীবনের আর কোনো মূল্য থাকবে না। এত ছলনা কেন করছো?”
রাতে প্রিতুলের কথা অনুযায়ী অনুজা দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়ে। হঠাৎ মাঝরাতে প্রচণ্ড পানির পিপাসা লাগে। আজ সার্ভেন্ট তার রুমে পানি দিয়ে যায়নি। বিপদ এলে চারদিক থেকেই আসে। ধীরে ধীরে অনুজা কিচেনের দিকে যেতে থাকে। কিন্তু প্রিতুলের রুম পার হওয়ার সময় বুকের ভেতর স্পন্দন বেড়ে যায়। একটাই ভয় যদি নাভিদ তাকে মেরে ফেলে! তবু সাহস করে সে রুমটা পেরিয়ে কিচেনে যায়। পানি খেয়ে একটু রিল্যাক্স ফিল করার জন্য সোফায় বসে। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা হাতের স্পর্শ টের পায় সে। অনুজা ঘুরে তাকাতেই চমকে যায়। শব্দ করার আগেই সেই হাত তার মুখ চেপে ধরে। “আপনি…?”
“চুপ। আমার রুমে চলো।” বলেই লোকটি অনুজাকে টেনে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। চিৎকার করার শক্তিও তখন তার নেই।
কিন্তু ঠিক তখনই সেই লোকটি……
চলবে?
( ৭ টায় চিত্রাঙ্গনা আসতেও পারে আবার না, আর #যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ গল্পটা সম্ভবত ডিলিট করে দেওয়া হবে। ৩k রিয়েক্ট উঠলে অবশ্যই রাখতাম। যাই হোক যা হওয়ার ছিল তাই হবে।)
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, প্রেম আসবে এভাবে
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৩
-
প্রেমতৃষা সমাপ্ত পর্ব (১ম অংশ+ শেষাংশ)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪১
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৯ ( প্রথম অর্ধেক+শেষ অর্ধেক)
-
পরগাছা পর্ব ৭
-
প্রেমতৃষা গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩১+৩২
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৭+১৮
-
পরগাছা পর্ব ৮