প্রেম আসবে এভাবে
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_২
অনুজা, প্রিয়ার কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই সে হেসে বলল,”ভয় নেই মজা করছি।, আসলে আমার মা–বাবা মালেশিয়া গেছেন, অনেক দিনের সফরে। আর আমার বড় ভাই… সে আজকাল–কালকের মধ্যেই বাড়ি ফিরবে। ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুর গিয়েছিল। তাই বাড়িটা এখন এতটা ফাঁকা লাগছে।”
“এত বড় বাড়িতে একা থাকতে তোর ভয় করে না?”
“ধুর! বোকা নাকি? ভয় কিসের? শোন, আমি কাল সকালে ভার্সিটি যাব। তুই নিজের খাওয়া–দাওয়া আর সব কিছুর দিকে খেয়াল রাখবি। ঠিক আছে?”
“ঠিক আছে… আচ্ছা, হয়তো তুই এমন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত বলেই এত বড় বাড়িতেও ভয় লাগে না। তাই না?”
“হুম… এখন তোকেও অভ্যস্ত হতে হবে।”
“আমার কথা বাদ দে। নাভিদের ঝামেলাটা শেষ হয়ে গেলেই আমি নিজের মতো করে কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেব।” অনুজা ভাবতে শুরু করল। নাভিদ তো নেশাগ্রস্ত, হয়তো তার কথা এখন তার মনেই নেই।
কিন্তু সব অনিশ্চয়তা যেমন ঝুঁকি নয়, তেমনি সব ধারণাও সবসময় সত্যি হয় না। অনুজা তো তার বাড়ির অবস্থা জানেই না। জানেই না তার বাড়ির সবাইকে নাভিদ গুদামঘরে আটকে রেখেছে। নাভিদের ধারণা এই পালিয়ে যাওয়ার পেছনে এদেরই হাত আছে। কারণ নিজের মেয়েকে বাঁচাতে বাবা–মা যেকোনো কিছু করতেই পারে। নাভিদ পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে লোড দিলো। তারপর বলল, “এই যে হবু শ্বশুর আব্বা আর আম্মাজান, আপনারা নিজেকে খুব চালাক মনে করেন, তাই না? আমি আপনাদের অসম্মান করতে চাই না। আর এটাও চাই না আপনাদের মান–ইজ্জত নষ্ট হোক। তাই ভালো হয়, দেরি না করে সত্যিটা বলে দেন। আপনারা আপনাদের মেয়েকে কোথায় লুকিয়েছেন?”
এই কথা শুনে অনুজার সৎ মা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে ওঠে, “আরে, ওই মেয়ে যে চুনকালি মেখে পালাবে, আমরা কী করে জানব? বরং আমি তো খুশিই হয়েছিলাম একটা আপদ বিদায় হয়েছে ভেবে।”
নাভিদের চোখ মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে যায়। “মুখ সামলে কথা বলুন। আমি অনুজাকে ভালোবাসি। আর একটা বাজে কথা বললে এখানেই সবাইকে জীবন্ত কবর দেব। আর মনে রাখবেন, পরে যদি জানতে পারি এই ঘটনার পেছনে আপনাদের হাত আছে তাহলে আমার চেয়ে ভয়ংকর মানুষ আর কেউ হবে না। সাবধান।” বলেই সে অনুজার সৎ বোনকে জোর করে নিজের সঙ্গে নিয়ে যায়। মেয়েটার বয়স সবে সতেরো। নাম নেহা। আদরের মেয়েকে নিয়ে যেতেই নেহার মায়ের আহাজারি শুরু হয়ে গেল। তার হাত পা বাঁধা। তবুও সে মিনতি করে বললেন,”দয়া করে আমার মেয়েটাকে নিয়ে যেও না… ওর কোনো ক্ষতি করো না, দয়া করে…”
নাভিদ ঠাণ্ডা গলায় বলে, “অনুজা আপনার মেয়ে না হয়েও এতদিন আপনি তার সাথে যা করেছেন, তার মা বেঁচে থাকলে হয়তো সেই কষ্টেই মারা যেত। আজ সেই কষ্টের একটু স্বাদ আপনিও নিন।” বলেই নেহাকে সে পাশের রুমে আটকে রাখল। চাইলে সে নেহার সম্মান নষ্ট করতে পারত। কিন্তু তার মন প্রাণ জুড়ে তখন শুধু একজনই—অনুজা।
পুরো চট্টগ্রাম শহর তন্নতন্ন করে অনুজাকে খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ বোরকা আর নিকাবকে সে হাতিয়ার বানিয়ে পালিয়েছে। এই বেশেই সে পালিয়েছিল, রাতের অন্ধকারে কেউ তাকে চিনতে পারেনি। রুমে ফিরে নাভিদ রাগের বশে সবকিছু ভাঙে চুরে নষ্ট করে। রাগে তার শরীর কাঁপছে। সে নিজের চুল নিজেই মুঠিতে চেপে ধরে বলল,” না অনুজা, তুমি এমন করতে পারো না… আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি। তোমার জন্য সব ছাড়তে রাজি আমি। টাকা, নেশা কিছুই চাই না। ফিরে এসো… আমার ভালোবাসা দেখানোর সুযোগটুকুও দিলে না তুমি…”
মদের বোতল ভাঙতে গিয়ে তার হাত কেটে যায়। রক্ত ঝরতে থাকে। সেই রক্তমাখা হাত নিয়েই সে পুরো রাত কাটিয়ে দেয়। রক্ত ঝরে মরবে সে, তবুও অনুজাকে তার যে করেই হোক লাগবে। অন্তত হাতের এই ক্ষত অনুজার স্পর্শে ঠিক করার জন্যও অনুজাকেই চাই তার।
–
সকাল সকাল এই শালিক কুঞ্জে ঘুম ভাঙে অনুজার। রুম থেকে দেখল প্রিয়ার ভাইয়ের ঘর সার্ভেন্টরা পরিষ্কার করছে। মুহূর্তেই কু বুদ্ধি চেপে বসল মাথায়। মনে মনে সুধাল, “সুযোগ যখন পেয়েছি, একবার দেখে আসি নবাবজাদাদের ঘর কেমন হয়! বলেই সে ধীরে ধীরে ঘরে ঢোকে। অনুজাকে দেখা মাত্রই কাজের মেয়েদের মধ্যে একজন বলে উঠল, “ম্যাম, আপনি? এই ঘরে?”
“ম্যাম?”
“আপনাকেই বলছি।”
“এই! আমি কোনো ম্যাম–ট্যাম না। আমাকে অনুজা বলে ডাকবে। তোমরা এমনিতেও আমার চেয়ে বড়। যাই হোক, ঘরটা একটু দেখতে এসেছি। কিন্তু এত পরিষ্কার কেন করছ? আমি তো দেখতে পাচ্ছি সবই পরিষ্কার।”
” পরিষ্কার তো করতেই হবে। ছোট সাহেব খুব রাগী। একফোঁটা ধুলো চোখে পড়লে চাকরি যাবে আমাদের। স্যারের ধুলোতে এলার্জি আছে। নোংরামি একদম অপছন্দ।”
“ওহ! তাহলে সে কি খুব শয়তান? রাগলে মাথায় দুটো শিং বের হয় নাকি?”
সার্ভেন্টরা কোনো উত্তর না দিয়ে তাড়াতাড়ি বলল, “আমরা নিচে যাচ্ছি, কাজ শেষ।”
“ঠিক আছে, আমি একটু পরে আসছি।”
এই কথা শুনে তারা ভয়ের চোখে অনুজার দিকে তাকায়। “এভাবে তাকাচ্ছো কেন? ময়লা করব না, কথা দিচ্ছি।” আর কিছু না বলে তারা চলে যায়। অনুজা ব্যালকনিতে যায়। সেখান থেকে পুরো এলাকা আরও সুন্দর লাগে। ইস! যদি সারাজীবন এমন একটা ব্যালকনিতেই কাটানো যেত… কিন্তু তার কপালে কি এসব লেখা আছে? অজান্তেই নাভিদকে নিয়ে কল্পনায় ডুবে যায় সে। নাভিদের বাড়িটাও তো এমনই। সেই বাড়ির বউ হলে হয়তো আজ সেও ব্যালকনিতে বসে এই দৃশ্য উপভোগ করত। “ধুর! কী সব ভাবছি আমি!”
নিজেই হেসে ওঠে সে।
শীতকাল। সকালের রোদ নরম হাতে অনুজাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। রোদে গা গরম হতে হতে কখন যে ব্যালকনির দোলনায় ঘুমিয়ে পড়ল, সে নিজেও জানে না। আজ প্রিয়াও আসেনি। সকাল সকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেছে। সার্ভেন্টরা ভেবেছে অনুজা নিজের ঘরেই আছে।
ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক একটা ছুঁয়েছে। হঠাৎ ঘরে কেউ একজন ঢোকে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় বসতেই তার চোখ পড়ে ব্যালকনিতে ঘুমিয়ে থাকা সেই ঘুমন্ত রূপকথার ওপর। ঘরে একজন মানুষ এসেছে। কিন্তু অনুজার কোনো হুঁশ নেই। দোলনায় সে গভীর ঘুম দিচ্ছে। যেন দশ বছরের জমে থাকা ঘুম। লোকটা ভ্রু কুঁচকে একবার অনুজার দিকে তাকায়। তারপর কী যেন ভাবে…আর ধীরে ধীরে নিজের শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করে…
চলবে…
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, প্রেম আসবে এভাবে
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৮+৯+১০
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪+৫
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৯+সারপ্রাইজ পর্ব
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৭+১৮
-
প্রেমতৃষা ৪২ ( শেষ অর্ধেক)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২+৩
-
প্রেমতৃষা সমাপ্ত পর্ব (১ম অংশ+ শেষাংশ)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৫+৩৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৩+২৪