Golpo romantic golpo প্রেম আসবে এভাবে

প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১১


প্রেমআসবেএভাবে

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_১১

মেসেজটা দেখেই প্রিতুলের বুকের ভেতর একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। অকারণ এক ভয় ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করতে লাগল। মনে হতে লাগল, যেন এই ছোট্ট কয়েকটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে কোনো ভয়ঙ্কর সত্য অথবা হয়তো নিছকই কারও নোংরা মজা। কিন্তু মনের ভিতর সন্দেহের যে বীজ একবার রোপিত হয়, তা সহজে আর উপড়ে ফেলা যায় না।
সেই রাতটা প্রিতুলের আর ঘুম হয়নি। বিছানায় শুয়ে সে বারবার ফোনটা হাতে নেয়, আবার রেখে দেয়। মেসেজের প্রতিটি শব্দ যেন নতুন করে তার মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
“কথাগুলো কি সত্যি?” নাকি কেউ ইচ্ছে করে তাকে অস্থির করে তুলছে? দুশ্চিন্তার অদৃশ্য কুয়াশায় ঢেকে যায় তার পুরো রাত। শেষরাতের নিস্তব্ধতায় হঠাৎ করেই সে উঠে বসে। তারপর উঠে দাঁড়ায়। পা দুটো যেন নিজের অজান্তেই তাকে নিয়ে যায় রুশদার রুমের সামনে। দরজাটা আধখোলা ছিল। ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ে খাটের পাশে রাখা একটি পুরোনো অ্যালবাম। প্রিতুল অ্যালবামটা হাতে তুলে নেয়। পাতা উল্টাতেই ভেসে ওঠে তার আর রুশদার বহু আগের কিছু ছবি। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, এই স্মৃতিগুলোর ভেতরে আজও একটা অস্বস্তি লুকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকল সে। তারপর হঠাৎ করেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল।
দ্রুত পায়ে নিজের রুমে ফিরে যায় প্রিতুল। আলমারি খুলে তাড়াহুড়ো করে কিছু জামাকাপড় ব্যাগে ভরে নেয়। কোনো পরিকল্পনা নেই, কাউকে কিছু জানানোরও প্রয়োজন বোধ করে না সে। কিছুক্ষণ পরই দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে প্রিতুল নতুন এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। সে গন্তব্য হয়তো তার পরিচিত।
আবার হয়তো সম্পূর্ণ অজানা।


নাভিদের শরীরের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। কিন্তু নিজের ভেতরের যন্ত্রণাকে সে নিঃশব্দে চেপে রাখছে। সকালে নাভিদ যখন অনুজার সাথে দেখা করতে আসে, তখন অনুজা তাকে দেখেই বিস্ময়ে থমকে যায়। কয়েকদিন আগেও ছেলেটার শরীর ছিল সতেজ, চোখে ছিল একরাশ আত্মবিশ্বাস। অথচ আজ তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বহুদিনের অসুখে জর্জরিত। চোখের নিচে গাঢ় কালচে দাগ, মুখে অদ্ভুত এক ক্লান্তি।
অনুজা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবশেষে বলল,
“তোমার এই অবস্থা কেন?”
নাভিদ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
“কই না তো। আজ তো আমাকে অনেক ফ্রেশই লাগছে।”
অনুজা ভ্রু কুঁচকে মাথা নাড়ল।
“আমার তো মনে হচ্ছে না।”
নাভিদ কথাটা এড়িয়ে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর বলল,
“যাই হোক, অনেক লেট করে এসেছ। এখনো কত কিছু কেনা বাকি জানো? মেয়েমানুষের যে কত কি লাগে, কীভাবে বুঝাই তোমাকে?”
অনুজা ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল তার দিকে।
নাভিদ হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল,
“ম্যাডাম, আমি বুঝে গেছি।”

দুজনেই বেশ সুন্দরভাবেই সব কেনাকাটা করে। অনুজা একের পর এক জিনিস দেখছে, আর নাভিদ কখনো মজা করে, কখনো বিরক্তির ভান করে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু হঠাৎ করেই নাভিদের বুকের ভেতর তীব্র ব্যথার ঢেউ উঠল। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বুকের কাছে হাত চেপে ধরে কয়েক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে রইল সে। আজ সঙ্গে কোনো লোকও আনেনি। অনুজা তা দেখে আতঙ্কিত হয়ে উঠল।
“নাভিদ, কী হলো? শরীর বুঝি আবার খারাপ করছে?”
নাভিদ কষ্ট লুকিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করল।
“অনুজা, আমি ঠিক আছি।”
অনুজা মাথা নাড়ল। তার চোখে উদ্বেগ স্পষ্ট।
“তুমি ঠিক নেই। অনেক ব্যথা করছে, তাই না? দেখাও তো কী হয়েছে।”
নাভিদ কষ্টে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
“সরি… তোমার জিনিসগুলো আর কেনা হলো না। আমার শরীরটা কেমন যেন করছে। বাড়ি যেতে হবে।”
অনুজা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“আমিও যাব তোমার সাথে।”
নাভিদ আপত্তি জানাতে চাইল।
“থাক না, তোমার যেতে হবে না।”
কিন্তু অনুজা তার কথা শুনল না। বরং আরও দৃঢ়ভাবে তার পাশে দাঁড়াল। মেয়েটা এবার সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। নাভিদকে বারবার এভাবে অসুস্থ হতে দেখে তার মন অস্থির হয়ে ওঠে। কী করলে মানুষটা ভালো হবে সে যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ডাক্তার তো স্পষ্ট বলেছিল, নাভিদের শরীরে নাকি তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে কেন সে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে? এই প্রশ্নটাই বারবার অনুজার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে।

বাড়িতে পৌঁছানোর পর দরজা খুলতেই অনুজা একেবারে থমকে দাঁড়াল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“তুমি এখানে?”
প্রিতুল শান্ত গলায় বলল,
“ওর কী হয়েছে, সেটা আগে বলো।”
অনুজা তাড়াহুড়ো করে বলল,
“অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”
প্রিতুল আর কোনো প্রশ্ন করল না। দ্রুত এগিয়ে এসে বলল,
“দাও, ওকে আমি ধরছি।”
এই বলে সে নাভিদকে সাবধানে ধরে রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর ড্রয়ার থেকে ওষুধ বের করে তাকে খাইয়ে দিল।
অনুজাও সেই রুমেই দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে তখন একগুচ্ছ প্রশ্ন জমে আছে।
প্রিতুল কেন এখানে?
সে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, ঠিক তখনই নাভিদ তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“অনুজা, তুমি কি একটু বাইরে ওয়েট করতে পারবে? আমার প্রিতুলের সাথে একটু পারসোনাল কথা আছে।”
কথাটা শুনে অনুজার বুকের ভেতর হালকা একটা ধাক্কা লাগল। কী এমন কথা—যা শুধু নাভিদ প্রিতুলকে বলতে পারবে, কিন্তু তাকে বলতে পারবে না? মুহূর্তের জন্য তার মনটা ভারী হয়ে উঠল।
তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে সে শান্ত স্বরে বলল,
“সমস্যা নেই। তোমরা কথা বলো। আমি এখন বাসায় চলে যাব। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
এই বলে কারো কোনো কথা শোনার সুযোগ না দিয়েই অনুজা ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই ঘরটায় নেমে এলো গভীর নীরবতা। এরপর অনেকক্ষণ ধরে নাভিদ আর প্রিতুল একে অপরের সাথে কথা বলল। প্রিতুলের কাছে আসা মেইলটা নাভিদেরই পাঠানো। কি এমন ছিল তাতে? যা প্রিতুলকে এক রাতেই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে এলো?

পরশু বিয়ে। হাতে আর মাত্র একটি দিন সময়। বাড়ির পরিবেশে আজ উচ্ছ্বাস। সবাই আনন্দে ভাসছে। নাভিদকেও আজ অনেকটা সুস্থ লাগছে। তাকে এভাবে স্বাভাবিক দেখতে পেয়ে বাড়ির মানুষগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। বাড়িতে এখন মানুষের ভিড় লেগেই আছে। আত্মীয়স্বজন, পরিচিত, দূরসম্পর্কের লোক সবাই একে একে এসে জড়ো হয়েছে। জন্ম, মৃত্যু আর বিয়ে এই তিন সময়েই যেন একটি পরিবার সত্যিকারের পূর্ণতা পায়। এমন অনেক মানুষকেও তখন দেখা যায়, যাদের হয়তো বছরের পর বছর দেখা মেলে না। নাভিদ আর অনুজার বিয়েতেও ঠিক তেমনটাই হয়েছে। কোলাহল, হাসি, গল্প, প্রস্তুতি সব মিলিয়ে আরেকটা দিন চোখের পলকেই কেটে গেল।
আজ গায়ে হলুদের দিন। সন্ধ্যার আকাশে হলুদের রঙ যেন মিলেমিশে গেছে বাড়ির আলো আর মানুষের হাসির সঙ্গে। গান, আড্ডা আর হাসির মধ্যে দিয়ে শেষ হয়ে গেল সেই হলুদ সন্ধ্যাটা। সবকিছু শেষ করে নিজের রুমে ফিরে এসে অনুজা ফোনটা হাতে নিতেই একটি মেসেজ তার চোখে পড়ল।
মেসেজটা নাভিদের।
সেখানে লেখা,

“বাইরে আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। একটু আসতে পারবে? আমার তোমাকে দেখতে খুব মন চাইছে। প্লিজ দয়া করে আসো। না করো না প্লিজ… প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ…” এত অনুরোধের পর আর না করতে পারল না অনুজা। নীরবে দরজা খুলে সে বাইরে এসে দাঁড়াল। সত্যিই একটি গাড়ি অপেক্ষা করছিল।
গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণ পরই তার মনে হলো, গাড়িটা যেন নাভিদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে না। সে ভ্রু কুঁচকে সামনে বসা ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
লোকটি শান্ত গলায় বলল,
“স্যার যেখানে বলেছে, সেখানেই নিয়ে যাচ্ছি।”
অনুজা আবার বলল,
“আচ্ছা বুঝলাম। কিন্তু জায়গাটার নাম কী?”
ড্রাইভার মাথা নাড়ল।
“এখনই বলা যাবে না। স্যার বারণ করেছে।”
অনুজা বিস্মিত হয়ে বলল,
“কী?” লোকটি আর কোনো কথা বলল না।
অনুজা বারবার একই প্রশ্ন করতে লাগল, কিন্তু প্রতিবারই নীরবতাই তার জবাব হয়ে ফিরল। সে বাড়িতে কাউকে কিছু বলেও আসেনি। তাছাড়া এত রাত। তার ওপর গাড়িটা কোথায় যাচ্ছে সে কিছুই জানে না। তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে অজানা এক ভয় জমতে লাগল। নাভিদের ফোন বন্ধ। সে অনলাইনেও নেই। এখন সত্যিই ভয়ের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। অনুজা কাঁপা গলায় বলল, “আমি বাড়ি যাব। আমাকে বাড়ি দিয়ে আসুন।” লোকটি কোনো জবাব দিল না। অনুজা বিরক্ত হয়ে আবার বলল,
“কথা কি কানে যাচ্ছে না?”
তবুও লোকটি নিশ্চুপ। এইবার তার ভয়টা সত্যিই বেড়ে গেল। কারণ গাড়িটা এখন ঢুকে পড়েছে ঘন গাছপালায় ঘেরা এক নির্জন বাগানের ভেতর। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। অনুজা কড়া গলায় বলল,
“আমি কিন্তু এখনই পুলিশে কল করব বলে দিচ্ছি!”
ঠিক তখনই গাড়িটা এসে থামল। একটি পুরোনো বাংলো বাড়ির সামনে। ড্রাইভার ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“ম্যাম, এবার নামুন।”
অনুজা বিস্মিত হয়ে বলল,
“এটা কোন জায়গা? আর কেন এখানে এনেছেন আমাকে?”
লোকটি শান্ত স্বরে বলল,
“আপনি নামলেই বুঝতে পারবেন।”
অনুজা বুক ধড়ফড় করতে করতে গাড়ি থেকে নামল।
নামার আগে সে আস্তে আস্তে দোয়া পড়তে লাগল।
“আল্লাহ… তুমি আমাকে রক্ষা করো, প্লিজ… আমি আবার কোনো ভূতের খপ্পরে পড়লাম না তো…”
গাড়ি থেকে নামতেই তার চোখ পড়ল বাড়ির সামনে দাঁড়ানো একটি ল্যাম্পপোস্টের দিকে।
ল্যাম্পপোস্টের নিচে একটি সাইনবোর্ড ঝুলছে।
সেখানে বড় অক্ষরে লেখা,
“অনুজা বাড়ির ভেতরে আসো।”
অনুজার বুকটা ধক করে উঠল। ভয়টা আরও ঘন হয়ে তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। সে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনিও আসুন আমার সাথে।”
লোকটি মাথা নাড়ল। “সরি ম্যাম। আমার কাজ ছিল আপনাকে এখানে নামিয়ে দেওয়া। এরপর আপনার কাজ শেষ হলে আবার আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া।” অনুজা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর গভীর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সাহস সঞ্চয় করল। আর ধীরে ধীরে সেই সাইনবোর্ডের নির্দেশ অনুসরণ করে বাংলো বাড়িটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল…

বাড়ির দরজাটা খোলাই ছিল।
অনুজা ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। বাড়িটা পুরোপুরি কাঠের তৈরি, কিন্তু আকারে বেশ বড়। একটা ডুপ্লেক্স বাংলো। ভেতরে ঢুকেই অনুজা খেয়াল করল ঘরের কোথাও কোনো লাইট জ্বলছে না। চারপাশে শুধু মোমবাতির আবছা আলো।
সেই নরম আলোয় দেয়াল আর আসবাবের ছায়া লম্বা হয়ে মেঝেতে পড়েছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে গোলাপের গন্ধ। অনুজা চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আল্লাহ… এখানে আবার জিন-টিন নেই তো? শুনেছি ওরা থাকলেই নাকি এমন সুন্দর গন্ধ পাওয়া যায়…”তার কণ্ঠে স্পষ্ট আতঙ্ক।
ঠিক তখনই সামনে আরেকটা বোর্ডে তার চোখ পড়ল। সেখানে লেখা, “ওপরে আসো, অনুজা।”
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তবু কৌতূহল আর অদ্ভুত এক টানের কারণে সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। আবছা আলোয় সে শুধু নিজের ছায়াটাকেই দেখতে পাচ্ছিল। কাঠের সিঁড়িতে পা রাখলেই মৃদু কড়মড় শব্দ উঠছিল। উপরে উঠে আরেকটা বোর্ড দেখতে পেল সে। সেখানে সামনে থাকা একটা দরজার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
দরজাটার গায়ে বড় অক্ষরে লেখা,
“ওপেন দ্য ডোর বেবি!” দরজাটা খোলাই ছিল।
অনুজা ধীরে ধীরে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই বাইরে আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো। যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই তার গা শিউরে উঠল। ঘরটা অনেক বড়। অথচ পুরো রুমে জ্বলছে মাত্র একটা মোমবাতি। সেই আলোয় ঠিক বোঝা যাচ্ছে না ঘরের ভেতরে কী আছে, কে আছে, আদৌ কেউ আছে কি না। হঠাৎ করেই পিছন থেকে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর বাইরে থেকে লক হওয়ার শব্দ। অনুজা ভয়ে চিৎকার করে উঠল,
“দরজা খুলুন! প্লিজ দরজা খুলুন! দেখুন, যে এসব মজা করছেন তার কিন্তু ভালো হবে না। আমি কিন্তু আপনাকে জেলে ঢুকিয়ে দেব!” ঠিক তখনই অনুজা খেয়াল করল বারান্দায় কি একটা যেন আছে। দূর থেকে কেবল সাদা কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না সেটা কী। সাহস সঞ্চয় করে সে ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগোল। হঠাৎ করেই তার চোখে পড়ল একটা ছায়া। মানুষের ছায়া। অনুজার বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়ে গেল। সে কাঁপা গলায় বলল,
“কে… কে আপনি?” ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। কিছুক্ষণ পর মনে হলো ছায়াটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছে… এবং তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
ভয়ে অনুজা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে সে আয়াতুল কুরসি পড়া শুরু করল। ঠিক তখনই ছায়াটা কাছে এসে স্পষ্ট হতে লাগল। মনে হলো সে কোনো অশরীরী নয়, একজন মানুষ। তবে মোমবাতির আলোয় তার মুখটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। লোকটা ধীরে ধীরে অনুজার পিছনে এসে দাঁড়াল।
তারপর আলতো করে অনুজার ঘাড় থেকে চুলগুলো সরিয়ে নিল। পরের মুহূর্তেই খুব আস্তে করে তার ঘাড়ে একটা কামড় বসাল। অনুজা ভয়ে তখনও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। তারপর লোকটা তাকে ধীরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। অনুজা কিছু বোঝার আগেই সে তার কপালে একটা নরম চুমু দিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই পুরো ঘরে হঠাৎ করে আলো জ্বলে উঠল। মিনি ইলেকট্রিক মোমবাতি আর লাইটগুলো একসাথে জ্বলে উঠতেই মুহূর্তের মধ্যে ভুতুড়ে সেই ঘরটা বদলে গেল। চারপাশে লাল গোলাপ আর রঙিন বেলুনে সাজানো একটা ভালোবাসার প্রাসাদ যেন দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। অনুজা বিস্ময়ে তাকিয়ে বলল,
“তুমি এখানে?”
নাভিদ মুচকি হেসে বলল,
“কেন? অন্য কাউকে আশা করেছিলে বুঝি?”
তারপর একটু কাছে এসে বলল,
“বাই দা ওয়ে, তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই এত কিছু করা।”
অনুজা অবাক হয়ে বলল,
“তাই বলে এমন ভুতুড়ে সারপ্রাইজ?”
নাভিদ হেসে বলল,
“জান… তুমি তো জানোই, নাভিদ মানেই আনকমন। আজ তোমাকে আমি আপন করে নেব। আমাদের মাঝে যে পর্দাটা আছে, আজ সেটা আমি সরিয়ে ফেলব।”
অনুজা থেমে গেল।
“কিন্তু…”
নাভিদ তার কথা থামিয়ে দিল।
“কেন কিন্তু? আজ আর আমি কিছু শুনব না। আজ শুধু আমি বলব। সবকিছু আমি করব। তুমি ভালো মেয়ের মতো আমার সব ইচ্ছে পূরণ করবে।”
বাইরে আবার বিদ্যুৎ চমকালো।
অনুজা অস্থির হয়ে বলল, “বাইরে বিজলি চমকাচ্ছে। আমাকে বাড়ি যেতে হবে। বাড়ির কেউ যদি জানতে পারে আমি বাড়িতে নেই, তখন তারা ভাববে আমি হয়তো আগের মতো আবারও পালিয়ে গেছি।”
নাভিদ ধীরে তার দুই কাঁধ ধরে বলল,
“না… আর পালানো হচ্ছে না তোমার। এইবার তোমাকে আর হারাতে দেব না আমি।”

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply