আজ পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে তোহফাকে। কিন্তু পাত্রের স্থানে তার একমাত্র চক্ষুশূল দ্য গ্রেট বুয়েটিয়ান আরসালান খানকে দেখে আকাশ থেকে পড়ল তোহফা।
ফারুক আহমেদ এবং নাইসা আহমেদের একমাত্র সন্তান তোহফা। চঞ্চল প্রকৃতির মেয়েটার স্বভাবই হলো উড়ে উড়ে বেড়ানো। মেধাশক্তি ভালো হলেও পড়াশোনায় বড্ড ফাঁকিবাজি করত সে। ফলাফলস্বরূপ রেজাল্ট দিন কে দিন খারাপ হতে থাকে। তখনই তার জীবনে আবির্ভাব ঘটে আরসালান খান নামক সুদর্শন, গম্ভীর প্রকৃতির, অত্যন্ত পড়ুয়া এই বুয়েটিয়ান পুরুষের। এই ভদ্রপুরুষ তোহফার বাবার বাল্যকালের বন্ধু আনোয়ার খানের বড় ছেলে। সারাজীবন বাবা-মায়ের মুখে আরসালান নামক পুরুষের প্রশংসা এবং উদাহরণ শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে যাওয়া তোহফার টিচার হিসেবে রাখা হয় আরসালানকে। আরসালান ভীষণ ব্যস্ত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তোহফাকে পড়াতে রাজি হয়। তাদের বাসা একই রোডে এবং তার বাবার বন্ধুর মেয়ে বলেই হয়তো। কিন্তু বেঁকে বসে তোহফা। সে কিছুতেই আরসালানের কাছে পড়বে না। অন্যদিকে, তোহফার বাবাও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। একপ্রকার বাধ্য হয়েই আরসালানের কাছে পড়তে বসতে হয় তোহফার।
গম্ভীর প্রকৃতির আরসালানকে প্রথম প্রথম ভালোই লাগত তোহফার। কিন্তু এই ভালো লাগা, অ-ভালো লাগায় পৌঁছাল যেদিন প্রথমবারের মতো আরসালানের হাতে মার খেল সে। এসএসসি পরীক্ষা তখন সন্নিকটে। তবুও পড়াশোনা নিয়ে কিছুতেই সিরিয়াস হচ্ছিল না তোহফা। সেদিনও পড়া ফাঁকি দিলো সে। আরসালান পড়া ধরলে সে কিছুই বলতে পারল না। ধৈর্যের বাধ ভাঙল আরসালানের। হাতের কাছে থাকা স্টিলের স্কেল দিয়ে তোহফার হাতে পরপর কয়েকটা বারি মারল। মুহূর্তেই লাল হয়ে ফুলে উঠল তোহফার নরম তুলতুলে হাত দুটো। খুব কাঁদল সে। কিন্তু আরসালান নামক পুরুষের মনে বোধহয় মায়া জাগল না। সে মেরেই থামল না, অনেক অপমান করল তোহফাকে। এরপর থেকে নিয়মিত মার, বকা, কান ধরা, অপমানের উপরেই থাকতে হয়েছে তোহফার। জীবনটা তেজপাতা হয়ে গিয়েছে তার আরসালানের কারণে। বাবা-মায়ের সামনে হাজার কেঁদেকেটেও লাভ হয় নি। যদিও এসব মার এবং অপমান কাজে দিয়েছে। পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস হতে বাধ্য হয়েছে তোহফা। ফলাফলস্বরূপ এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে সে। এইচএসসি পরীক্ষাটাও বেশ ভালো হয়েছে তার। এখনো অবশ্য রেজাল্ট আসা বাকি।
তবে সেদিন থেকেই আরসালানকে সহ্য করতে পারে না তোহফা। বাবার জন্য বাধ্য হয়ে এই অবধি এই লোকের কাছে পড়লেও তাকে বড্ড অপছন্দ করে সে। তার অপছন্দের মানুষের লিস্টে এই পুরুষ সর্বপ্রথমে আছে, সর্বপ্রথমে। আর সেই ব্যক্তির সাথেই কিনা তার বাবা তাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছে! শিউরে উঠল তোহফা। ঘোর থেকে বেরিয়ে আসলো। খেয়াল করল শুভ্র রঙা পাঞ্জাবী পরিহিত আরসালান তাকিয়ে আছে তারই দিকে। কি শীতল তার দৃষ্টি! দ্রুত নজর হটাল তোহফা। এতক্ষন ওই রাক্ষসের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিল ভেবে ভয়ে ঢোক গিলল কয়েকবার। শাড়ির আঁচল খামচে ধরে মাথা নত করে গুটিশুটি মেরে পরে রইল সে সোফার এক কোণে, আরসালানের মা তাবাস্সুমের পাশে।
আজই শেষ পরীক্ষা ছিল তোহফার। প্র্যাকটিক্যাল এক্সাম শেষ করে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরল সে। কিন্তু বাড়ি ফিরতেই নাইসা আহমেদ তাড়াহুড়ো করে গোসল করতে পাঠালেন তোহফাকে। তোহফা তাড়াহুড়োর কারণ জানতে চাইলেও কিছু বলেন নি উনি। গোসল সেরে বেরোনোর পর তোহফা তার চাচাতো বোন শাম্মীকে দেখতে পেলো রুমে। শাম্মী নিজ হাতে সুন্দর একটা শাড়ি পড়িয়ে দিলো তোহফাকে। পুতুলের মতো সুন্দর, ছোট্ট এবং আহ্লাদী মেয়েটাকে শাড়িতে আরও আদুরে লাগছে দেখে খুব প্রশংসা করল শাম্মী। লজ্জায় লাল হলো তোহফা। বুঝল না এসবের কারণ। বারংবার জিজ্ঞাসা করার পর এক পর্যায়ে বোমাটা ফাটাল শাম্মী। তোহফার মাথায় চাটি মেরে বলল,
“আরে গাধী, আজকে তোকে দেখতে আসবে।”
তোহফা কি বলবে ভেবে পেলো না। কিছু বলার সুযোগটাই পেলো না সে। এরমধ্যেই পাত্রপক্ষ হাজির। তারপর আবার পাত্রের জায়গায় আরসালান নামক রাক্ষসকে দেখে আপাতত থতমত খেয়ে আছে সে।
“ছেলেটার তো পড়াশোনা শেষ। বুয়েটে শিক্ষকতা করছে প্রায় ছয় মাস হতে চলল। এবার বিয়েটা দেয়াই যায়। আমার তো ভাই একটা মেয়ের অনেক শখ ছিল। কিন্তু আল্লাহ দু দুটো ছেলে দিয়ে দিলো। তোহফা মাকে আমাদের আরসালানের জন্য নেয়ার ইচ্ছা তো বহু আগে থেকে। আপনারা তো জানেনই। আপনারা মজা ভেবেছেন কিনা, জানিনা। আমি কিন্তু শুরু থেকেই সিরিয়াস ছিলাম। তোহফার বয়স আঠারো হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। এখন আরসালানও সেটেলড। আর তোহফার বয়সও আঠারো হয়েছে। এবার আমি আর আরসালানের বাবা চাচ্ছিলাম বিয়েটা দিয়ে সম্পর্কটা জুড়ে দিতে। ভাই-ভাবি, আপনারা কি বলেন?”
কথাগুলো বলে থামলেন আরসালানের মা মিসেস তাবাস্সুম। স্ত্রীর কথায় সায় দিলেন আরসালানের বাবা আনোয়ার সাহেব। ফারুক আহমেদ এবং নাইসা আহমেদের যদিও আরসালানকে ভীষণ পছন্দ, তবুও দুজনের মনে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। নাইসা আহমেদ এবার একটু উসখুস করে বলে উঠলেন,
“কিন্তু আমাদের মেয়েটা তো এখনো অনেক ছোট…”
নাইসা আহমেদের মনের অবস্থাটা বুঝলেন আনোয়ার সাহেব এবং মিসেস তাবাস্সুম। আনোয়ার সাহেব বললেন,
“ভাবি, আপনার মনের অবস্থাটা আমরা বুঝতে পারছি। আমরা আপনাদের ফোর্স করব না। তবে এটারও সমাধান আছে। আমরা এখন ঘরোয়াভাবে কাবিনটা করিয়ে রাখতে পারি। ও নাহয় এখন আপনার কাছেই থাকলো। পরে যখন আপনাদের সঠিক সময় মনে হবে, তখন নাহয় সকল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধুমধাম করে মামনিকে আমাদের ছেলের বউ হিসেবে ঘরে তুললাম। আপাতত হালাল একটা সম্পর্ক জুড়ে রাখতে চাই।”
নাইসা আহমেদ এই প্রস্তাবে প্রসন্ন হলেন। এটাও বুঝলেন, আনোয়ার সাহেব এবং তাবাস্সুম কিছুতেই তোহফাকে হাতছাড়া করতে চাচ্ছেন না। খুশি হলেন উনি। ফারুক আহমেদও এই প্রস্তাবে খুশি খুশি রাজী হলেন।
তোহফার চোখ দুটো রাগে, দুঃখে টলমল করছে। সে অভিমানী চোখে একবার বাবাকে, আর একবার মাকে দেখল। দুজন কি খুশি! অথচ তার দিকটা ভাবল না! তার মতামতের কি প্রয়োজন নেই! তোহফাকে অনেকটা সময় ধরেই অবজার্ভ করছিলো শাম্মী। বয়সে বড় হলেও তোহফার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তার। সে খুব ভালো করেই জানে তোহফা কতটা অপছন্দ করে আরসালানকে। সে কিছু একটা ভেবে সামান্য গলা খাকারি দিলো। সাহস সঞ্চয় করে ফারুক আহমেদকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
“চাচ্চু, তোমরা তোমাদের আলাপ করো। ততক্ষণ নাহয় তোহফা, ভাইয়ার সাথে একটু আলাদাভাবে কথা বলুক।”
এই প্রস্তাবে কেউই অসম্মতি প্রকাশ করল না। হাফ ছেড়ে বাঁচল তোহফা। একটা সুযোগ পেয়েছে সে। যেভাবেই হোক বিয়েটা ভাঙতে হবে তার। আরসালানও যে তাকে একদমই পছন্দ করে না, এটা খুব ভালো করে জানে সে। বিভিন্ন পরিকল্পনা করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল তোহফা। পেছন পেছন নীরবে আসছে আরসালান। ছাদে যাচ্ছে তারা দুজন। শাড়ি পড়ে হাঁটতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে তোহফার। খুব একটা শাড়ি পড়া হয় না তার। তাই শাড়ি পড়ে হাঁটাচলার অভ্যাসটা নেই বললেই চলে। তার উপর মাথায় ঘুরছে নানান দুষ্টু পরিকল্পনা। অন্যমনস্ক হয়ে উঠতে উঠতে শাড়িতে পা বেঁধে হোঁচট খেল তোহফা। পড়ার ভয়ে চোখের পাতা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে আসলো। মৃদু চিৎকার করে উঠল সে। ভাবল এই বুঝি হাত-পা গেল। কিন্তু পরোক্ষণেই কোমরে শক্তপোক্ত পুরুষালি হাতের স্পর্শ অনুভব করল সে। হাতটা তার কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে। জড়িয়ে নিয়েছে নিজের সাথে।
নাকে পরিচিত একটা মিষ্টি সুবাস এসে ঠেকল তোহফার। বুকটা ধড়ফড় করছে তার। পিটপিট করে চোখ মেলল সে। নিজের খুব কাছে আবিষ্কার করল আরসালানকে। অজান্তেই কখন অপছন্দের পুরুষের বুঁকের কাছের পাঞ্জাবীর অংশটা খাঁমচে ধরেছে, সেই খেয়াল নেই তার। ছাদের খোলা দরজা থেকে শেষ বিকেলের রক্তিম আলোকছটা এসে পড়ছে তাদের দুজনের মুখের ওপরে। সেই আলোতে একদৃষ্টিতে আরসালানের গম্ভীর মুখপানে তাকিয়ে রইল তোহফা। আরসালানের ধূসরাভ চোখ দুটোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিও তার উপর নিবদ্ধ। না চাইতেও লাজে রাঙা হলো তোহফা। লাজের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল ফর্সা কপোলে। শেষ বিকেলের রক্তিম আলোয় মুখটা আরও রক্তিম দেখালো তোহফার।
আরসালান, তোহফাকে ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়াল। লজ্জায় দৃষ্টি নত হলো তোহফার। আরসালান একবার নিজের বুঁকের কাছটা দেখে নিলো। তারপর সোজা হয়ে শেষ দুটো সিঁড়ি ধরে উপরে যেতে যেতে বলে উঠল,
“হাঁটাচলাও অ্যাবনরমাল।”
কথাটা কানে আসলো তোহফার। লজ্জারা যেনো ছাদ থেকে ঝাঁপ মেরে পালাল। রাগে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে উঠল তার। অন্যমনস্ক থাকায় একটু নাহয় হোঁচট খেয়েছে। তাই বলে এভাবে বলবে! এভাবে! তার হাঁটাচলা অ্যাবনরমাল! তোহফার মনে হলো এমন পড়ার হাত থেকে বাঁচার চেয়ে পড়ে হাত-পা ভেঙে যাওয়া ভালো ছিল, অনেক ভালো। রাগে ফুলেফেপে দুই সিঁড়ি একসাথে টপকে ছাদে উঠে গেল সে। ধুপধাপ পা ফেলে এগোলো আরসালান নামক রাক্ষস পুরুষের দিকে।
চলবে?
প্রেমেরনিঃশব্দসূচনা
ইরিন_নাজ
পর্ব_১
Share On:
TAGS: ইরিন নাজ, প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE