প্রেমবসন্ত_২ ।৫৪।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
জয়া মুখ বাকাল। বলল,
“আমার জামাই আমাকে কেন আবার বিয়ে দিতে যাবে শুনি?”
তারপর চোরা চোখে তাকিয়ে সন্দিহান চোখে বলল,
“আপনি আবার আপনার শালির উপর নজর দিচ্ছেন নাতো? আপনি কী আমাকে লাইন মারতে চাচ্ছেন দুলাভাই?”
অর্ণ থমথমে মুখে পলক পিটপিট করল। কায়নাত বাকরুদ্ধ। মেয়েটা হতবুদ্ধি হয়ে বোনের দিকে ফিরল। জয়া অভিনয় করে মুখে ওড়না চেপে হায়হায় করে বলল,
“শেষে আপনি আমাকে লাইন মারতে চাইছেন দুলাভাই? আমার তো ভাবতেও শরমে মরে যেতে ইচ্ছে করছে।”
অর্ণ নিজেকে স্বাভাবিক করে চোখ পাকিয়ে বলল,
“কী যা-তা বলছ এসব? আমি কেন তোমার সাথে লাইন মারতে যাব?”
“তাহলে আমাকে নিয়ে পড়েছেন কেন? আমায় কী আপনার ভালোলাগে? কিন্তু আমি তো সতীন নিয়ে সংসার করতে পারব না। ওসব চুল ধরে টানাটানি ঝগড়া আমার পছন্দ নয়। আমার মাথায় এমনিতেই চুল নেই, তার উপর কায়নাতের সাথে ঝগড়ায় আমি পারব না।”
অর্ণ ঠিক কী বলবে বুঝতে পারছে না। বেচারা শুকনো ঢোক গিলল। কায়নাত দাঁত কটমট করে ঘাড় উঁচু করে অর্ণর দিকে তাকাল। কিরমিড়িয়ে বলল,
“জয়া এসব কী বলছে?”
অর্ণ মুখ একটু করে বলল,
“তোমার বোনের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। ওকে পাবনা পাঠানোর ব্যবস্থা করো জলদি।”
জয়া বলল,
“আপনি যে ইনিয়ে বিনিয়ে আমাকে সব কিছুতে ইঙ্গিত করেন সেটা আমি বুঝি। নেহাত আপনি আমার দেবর হন নাহলে আমার জামাইকে বলে ইচ্ছে মতো মার খাওয়াতাম।”
অর্ণ রাগে গজগজ করতে করতে রান্না ঘর থেকে বের হলো। কায়নাত জয়ার মাথায় চাপড় মেরে বলল,
“দিলি তো লোকটাকে রাগিয়ে। এমনিতেই মুখ দিয়ে একটা কথা বের হয়, তারওপর আরেক কাণ্ড ঘটিয়ে দিলি।”
জয়া মুখ বাকাল।
“তোর জামাই বুড়ো হচ্ছে তবু ঘটে বুদ্ধি হচ্ছে না। উনি কোন আক্কেলে আমাকে অন্যত্রে বিয়ে দিতে চাইলেন?”
“উনি যে মজা করেছে সেটা বুঝিসনি? সর দেখি, পাগলামি করতে করতে আসলেই পাগল হয়ে গেছিস।”
কায়নাত জয়াকে সরিয়ে রান্না ঘর থেকে বের হলো। ডাইনিং টেবিলে একে একে সবাই এসে বসছেন। সকালের খাওয়া দাওয়া হলো ঠিক মতোই। তারপর ড্রয়িংরুমে বসলেন বাড়ির পুরুষরা। মহিলারা কাজে ব্যস্ত আছেন। সকাল ১১টা নাগাদ বাড়িতে এলো শেহের। সঙ্গে কেউ আসেনি আজ। প্রেম খানিক অবাক হলো বটে। স্বার্থর মতো ছেলে শেহেরকে একা ছাড়ার মানুষ নয়। আর যদি হয় চৌধুরী বাড়ি তাহলে তো প্রশ্নই আসে না।
শেহের এসে বসল অর্ণর পাশে। কায়নাত এসে সবার জন্য চা দিয়ে গেল। এখন নাকি চা খাবেন তারা। শেহের বোধহয় বাইরে থেকে কোনোরকম দৌঁড়ে এসেছে। ঘামে শরীর ভিজে একাকার। অর্ণ কপাল কুঁচকে বলল,
“এমন হাপাচ্ছিস কেন? কোথা থেকে এসেছিস?”
শেহের টি-টেবিলের উপর থেকে পানি খেয়ে বলল,
“রিকশায় এসেছি তো তাই এই অবস্থা। বাইরে বড্ড গরম পড়েছে।”
“তোর গাড়ি কই?”
“বাড়িতে।”
“বাড়ি থেকে আসিসনি?”
শেহের উত্তর দিল না। বাড়ি থেকে কী করে আসবে? সে তো এতক্ষণ ফুটপাতে বসেছিল। অত কড়া রোদের তাপে শরীরটা জ্বলে যাচ্ছিল। মাশফিক চৌধরী কথা বাড়ালেন।
“সে যাইহোক, শোনো শেহের। আজ তোমার সাথে প্রথম এবং শেষবার এই বিষয় নিয়ে কথা বলব।”
শেহের নিজেকে প্রস্তুত করল। পিঠ সোজা করে বলল,
“বলুন।”
“তুমি সিওর এই সম্পর্ক করতে চাও?”
“জি।”
“তোমার বাবা-মা রাজি হয়েছেন?”
“হয়নি, কিন্তু আমি রাজি করিয়ে নেব। প্লিজ আঙ্কেল, আপনি তাদের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত বদলাবেন না।”
মাশফিক চৌধুরী চাপা নিশ্বাস ফেললেন। নরুল সৈয়দের সাথে তার গতকাল রাতে কলে কথা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছেন ছেলের খুশিতেই সব। তবে মা বড্ড নারাজ এই সম্পর্কে। তিনি চান না নুসরাতের সাথে শেহেরের বিয়েটা হোক। মাশফিক চৌধুরী বললেন,
“তোমার মা যেখানে ওকে মেনে নিতে চাইছেন না সেখানে সম্পর্ক আগানো ঠিক হবে?”
শেহের উত্তেজিত হয়ে বলল,
“মা একদিন না একদিন মেনে নেবে আঙ্কেল। আমি নুসরাতকে হারাতে চাই না। আমায় দিয়ে দিন ওদের। আমি সত্যি খুব যত্নে রাখব ওদের।”
অর্ণ ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“রিলাক্স।”
শুকনো ঢোক গিলল শেহের। মাশফিক চৌধুরী ঠোঁট চোকা করে নিশ্বাস ফেলে বলেন,
“নুসরাতের সাথে আমার কথা হয়েছে। ও এই বিয়েতে রাজি। আমি চাইছি তোমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এক করে দিতে।”
শেহের খানিক্ষণ পাথরের মতো মাশফিক চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে রইল। বিয়েতে কী সবাই রাজি হয়ে গেছে? বিশ্বাস হচ্ছে না তার। নুসরাত তার বর্তমান স্ত্রী হলেও মোটেও এই বিয়েকে বিয়ে বলে মনে হয় না। আজ মনে হচ্ছে নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে অর্ধাঙ্গিনী রূপে দেখার সৌভাগ্য বুঝি তার হবে। এত গুলো বছরের অপেক্ষার অবসান হবে। হঠাৎ শেহের ঝাঁপিয়ে পড়ল মাশফিক চৌধুরীর বুকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমি ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না আঙ্কেল। আমার জীবনের সব চেয়ে বড় উপহারটা আজ আপনি আমাকে দিয়েছেন। আমি..আমি..”
ওকে থামিয়ে দিয়ে মাশফিক চৌধুরী গাল ভরে হেসে শব্দ করে বললেন,
“মিষ্টি মুখ করার সময় কান্না-কাটি কিসের? আমার হবু জামাই তুমি, বিয়ের আয়োজন শুরু করো।”
শেহের হেসে ফেলল। রেখা বেগম বড় প্লেটে করে মিষ্টি নিয়ে এলেন। সবাই মিষ্টি খেলেন খুশিতে। দোতলার কোণা থেকে নুসরাত সবটা দেখেছে। মেয়েটার বুক কাঁপছে দুরুদুরু। আবার সে কবুল পড়বে, বউ সাজবে—তবে এবার এক শুদ্ধ পুরুষের নামে। এবার আর ভয় নেই। যে মানুষটা তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য জীবনের এত গুলো বছর নষ্ট করে পরিবারের বিরুদ্ধে যেতে পারে, সেই পুরুষ অন্তত তাকে ঠকাবে না।
শেহেরের ছটফটে চোখ আটকে গেল দোতলার সেই ডান দিনের কোণায়। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে নুসরাত। শেহের মাথা নিচু ঠোঁট কামড়ে হাসল। বহু বছরের ভালোবাসা পূর্ণতা পেতে চলেছে। তারা এক হবে, এক বন্ধনে বাঁধা পড়বে। মাশফিক চৌধুরী বললেন নরুল সৈয়দ আজ বিয়ের তারিখ ঠিক করতে চৌধুরী বাড়ি আসবেন। শেহের জানতো না একথা। ছেলেটা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। অর্ণর ঠোঁটের কোণে তখন চাপা হাসি। লোকটা বোধহয় মন খুলে একটু হাসতেও জানে না। অর্ণ কায়নাতকে খোঁজার জন্য এদিক-ওদিক তাকাতেই চোখ গেল নাজনীনের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জয়ার দিকে। জয়া চোখ ছোট ছোট করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। থমথমে খেল সে। কপাল কুঁচকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মেয়েটা আজ জ্বালাচ্ছে তাকে।
দুপুরেই খবরের দাওয়াত দেয়া হলো নরুল সৈয়দকে। বাড়িতে সে-কী বিরাট আয়োজন। নুসরাতের ঘরে বাড়ির সব মেয়েরা। ওর থেকে বয়সে বড় কেউ নেই। জারা ওদের আনন্দ দেখে নিজেও যেন ভীষণ খুশি। সে নুসরাতের গম্ভীর মুখ দেখে বলল,
“তুমি অমন করে বসে আছো কেন? রূপ চর্চা শুরু করে দাও।”
নুসরাত বলল,
“রূপ চর্চা করে কী করব?”
“ওমাহ! রূপে,গুণে সব দিক দিয়ে জামাইদের আঁচলে বেঁধে রাখতে হয় জানো না?”
“তুমি দেখি সব জানো। তা আগে বিয়ে করেছ নাকি?”
জারা মুখ বাঁকিয়ে বলে,
“ভালো কথা বললাম সেটা তোমার ভালো লাগল না, তাই না?”
সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল। নিশা পায়ে ব্যথায় উঠতে পারছে না। কাল রাত থেকে স্বার্থ তার কল, মেসেজ কিছু দেখেনি। ছেলেটা এমন কখনও করে না তার সাথে। সবার কথা বলার মাঝে সে বলল,
“তোমরা কেউ স্বার্থ ভাইকে একটু কল করবে? উনি আমার কল ধরছেন না।”
নুসরাত নিজের ফোন খুঁজল, পেল না। নিশ্চয়ই আদি নিয়ে গেছে। জারা নিজের ফোন নিশার হাতে দিয়ে বলল কল করতে। নিশা বেশ কয়েকবার ট্রাই করেও ব্যর্থ হলো। মন খারাপ করে বলল,
“কল তো ধরছে না।”
কায়নাত বলল,
“আমি তোমার ভাইকে গিয়ে বলছি। চিন্তা কোরো না একদম।”
কায়নাত গুটি গুটি পায়ে অর্ণর ঘরে এলো। নিচে সবাই আড্ডা-আলোচনায় ব্যস্ত। খানিকক্ষণ পর দুপুরের খাবার দেয়া হবে। অর্ণ ফ্রেশ হতে উপরে এসেছিল একটু আগেই। সবে গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে। কায়নাত বিছানায় এত জামা কাপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা দেখে কপাল কুঁচকে বলল,
“এত কাপড় বের করেছেন কেন?”
অর্ণ বিছানায় বসে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“মাথা টা মুছে দাও।”
কায়নাত তোয়ালে নিয়ে ওর নিকট এগিয়ে এলো। মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে একবার পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে নিল। বলল,
“কী করছিলেন ঘরে? এসব বের করেছেন কেন?”
অর্ণ বলল,
“ঘরটা আমার অথচ আমারই কিছু খুঁজে পাই না। কাবার্ড ভর্তি তোমার শাড়ি। আমার কাপড় গুলো কোথায় রেখেছ?”
“আপনার সব কাপড় নিচে রেখেছি। আমার কাপড় রাখার জায়গা পাচ্ছিলাম না বলে।”
“এই অত্যাচার কবে বন্ধ করবে তুমি? বিছানায় ঘুমোতে এলেও তোমার পুরো খাট লাগে, ওয়াশরুমে তোমার জিনিস দিয়ে ভর্তি, ড্রেসিং টেবিলে আমার একটা জিনিস নেই। কবে যেন এই ঘর থেকেও বের করে দাও আমাকে।”
কায়নাত খিলখিল করে হেসে উঠল। বসল অর্ণর ঊরুর উপর। অর্ণ চোখ ছোট ছোট করে ফেলল।
“হাসছ কেন? আমার দুঃখ তোমার কাছে তামাশা মনে হচ্ছে?”
“হবে না? বউ চান আবার শান্তিও চান? এটা একটু বেশি-ই হয়ে গেল না?”
অর্ণ ওষ্ঠ কামড়ে খানিকক্ষণ ওকে দেখে হঠাৎ বিছানায় ফেলে দিল ওকে। কায়নাত হতভম্ব হয়ে তাকাল। আতঙ্কিত গলায় বলল,
“এখনই আমার প্রাণ বেরিয়ে যেত বেহায়া লোক।”
অর্ণ ওর নাক টেনে দিয়ে বলল,
“তোমার এত শান্তি আমার সহ্য হচ্ছে না।”
কায়নাত ঠেলে ওকে সরাতে চাইল, পারল না। অমন দানব শরীরটা ওকে দিয়ে সরানো সম্ভব? কখনোই নয়! দরজার সামনে তখন আদি এসেছিল। নিচ থেকে তাকে আব্দুর চৌধুরী পাঠিয়েছেন কায়নাতকে ডাকতে। কিন্তু মামুর ঘরে এসে মামু আর মামিকে অমন অবস্থায় দেখে কপাল কুঁচকে ফেলল সে।
“ও মামু, কী করো তুমি?”
অর্ণ হতাশ হয়ে সরে এলো দূরে। অসহায় চোখে তাকাল দরজার দিকে। আদি ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে আসছে কাছে। কায়নাত শুকনো ঢোক গিলে উঠে বসল। আদি সোজা কায়নাতের কাছে এসে ওর আঁচল টেনে ধরে বলল,
“তোমার বাবা তোমায় ডাকে।”
অর্ণ নাক কুঁচকে বলল,
“উনি যাবেন কবে? জীবনটা তো জাহান্নাম বানিয়ে ছাড়লেন। একটু যে শান্তিতে থাকব সে উপায় টুকু নেই।”
তারপর আদির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি কী আসার আর সময় পেলে না? মামুকে একা না ছাড়লে তোমার বউ আসবে কোত্থেকে?”
আদি বলল,
“আমার বউ তোমার বউয়ের পেটে। তুমি এত বেশি কথা বলো কেন?”
কায়নাত ঠোঁট টিপে হাসল। অন্যসময় হলে এতক্ষণে আদির সাথে তার ঝগড়া লেগে যেত, তবে আজ এসেছে বলেই বেঁচে গেছে। নাহলে বিকেলের আগে ঘর থেকে বের হওয়ার নাম মুখে নেয়া যেত না।
ওরা নিচে এলো খানিকক্ষণ পরে। ডাইনিং টেবিলে বাড়ির পুরুষরা খেতে বসেছেন। ব্যবসার খাতিরে নরুল সৈয়দের সাথে মাশফিক চৌধুরীর বেশ ভালো সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক আজ বেয়াই-এ পরিণত হতে যাচ্ছে। বাড়িতে বসে নরুল সৈয়দ কথা বলতে চাইলেন না। খাওয়া দাওয়া সারতে প্রায় বিকেল হয়েই গিয়েছিল। তাই বাগানে ঠান্ডা পরিবেশে বসেছেন সকলে। আজগর চৌধুরীর সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেছেন তিনি। যখন নুসরাতের কথা জানতে চাইলেন তখন নড়ুন সৈয়দ নিজের ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“আমি কোনোদিন শেহেরকে কোনকিছু নিয়ে জোর করিনি। এমন নয় যে সে অবুঝ ছেলে। যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটাকে আমি সম্মান করি। আমি চাই আমার ছেলে ভালো থাকুক। ও যদি সত্যি-ই নুসরাতকে নিয়ে সংসার গড়তে চায় এতেই আমার বিন্দু মাত্র আপত্তি নেই। বরং খুশি হব ছেলের সাহসিকতা দেখে।”
মাশফিক চৌধুরী বললেন,
“আর কিছু বলার নেই আমার। আপনি কী চাচ্ছেন, বিয়েটা কবে দেবেন? ভাবি আদৌ রাজি হবেন তো?”
নরুল সৈয়দ গাল ভরে হেসে বললেন,
“ও-চিন্তা আপনার করতে হবে না। বিয়ে যেহেতু হবে দেরি করে লাভ নেই। আগামী সপ্তার শুক্রবারেই নাহয় শুভ কাজটা সেরে ফেলা যাক?”
“আলহামদুলিল্লাহ। সময় তাহলে বেশি নেই। আয়োজন শুরু করি বেয়াই?”
হেসে ফেললেন দুজনেই। শেহের বোধহয় একটু লজ্জা পাচ্ছে আজ। পাশ থেকে প্রেম ওকে খোঁচাতে শুরু করেছে। ও অতিষ্ট হয়ে প্রেমের হাত চেপে ধরল। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“তোর বোনকে একটাবার বিয়ে করতে দে, তোর খবর করে ছাড়ব।”
প্রেম ওর কানে কানে বলল,
“অভিশাপ লাগবে গো। ভুলে যেয়ো না আমি ডাক্তার। একটা ভুল রিপোর্ট ধরিয়ে দিলে আজীবন বউয়ের সাথে ঝগড়া করেই কাটাতে হবে।”
“হারামজাদা।”
•••
যেহেতু বিয়ের বেশিদিন নেই তাই বেহরুজ বেগম আর কাউকে খুলনা যেতে দিতে চাচ্ছেন না। উল্টো হাসানকে বলেছেন বাড়ির সবাইকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসতে। বাড়ির মেয়ের বিয়ে আর বাড়ির মানুষ থাকবে না? তা হয় নাকি? আজ চৌধুরী বাড়িটা খুশিতে জ্বলজ্বল করছে। নুসরাত নিজের ঘর থেকে বের হয়নি লজ্জায়। আজ সবার সামনে যেতে লজ্জা লাগছে তার। সবাই নিশ্চয়ই ভাববে নুসরাতের সাথে শেহেরের আগে থেকেই সম্পর্ক ছিল! মধ্যরাত তখন। নুসরাতের চোখে ঘুম নেই। আজ আদিটাও তার কাছে ঘুমায়নি। বারবার বারান্দায় পায়চারী করছিল সে। হঠাৎ ফোনে নোটিফিকেশনের শব্দ শুনে ঘরে ফিরে ফোন নিয়ে দেখল হোয়াটস অ্যাপ-এ “Sheher Vai” ইনবক্স-এ দুটো মেসেজ ঝুলে আছে। মেয়েটা কাঁপা হাতে ইনবক্সে ঢুকল। সেখানে লেখা আছে, “Ei rat kore jege acho keno Ratpakhi? Ghum hocche na bujhi?” আরেকটায় লেখা, “Ektu barandar light ta jalao. Tomay boddo dekhte icche korche.”
নুসরাত চমকে উঠল। দৌঁড়ে গেল বারান্দায়। লাইট অন করে বারান্দার গ্রিল ধরে তাকাল বাড়ির বাইরে। কোথাও তো শেহের নেই। তাহলে সে জানল কী করে নুসরাত ঘুমায়নি? নুসরাত শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে কল করল ওর নাম্বারে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ হলো তা। ওপাশ থেকে মুচকি হাসির শব্দ ভেসে এলো। নুসরাত মিনমিন গলায় বলল,
“তুমি কোথায়?”
শেহের বলল,
“তোমার খুব কাছে।”
“এই রাত করে বাইরে কী করছ?”
“মা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।”
“ওমাহ! বের করে দিয়েছে মানে?”
“ওসব রাখো। তুমি ঘুমাওনি কেন?”
“ঘুম আসছিল না।”
“আমার জন্য?”
নুসরাতের হাঁসফাঁস লাগল। ফ্লোরে পা খুরিয়ে বলল,
“মোটেও না।”
“শোনো রাত, এখন যদি তোমার ঘরে আসি তাহলে কী খুব বেশি মাইন্ড করবে? আমি কিন্তু পর-পুরুষ নই। আমি তোমার তিন কবুলের স্বামী।”
নুসরাত থমকে দাঁড়াল। দুরুদুরু বুকটা চেপে ধরে উল্টো ঘুরে চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। এই আবদার বারণ করবে কী করে? কেউ না জানলেও সে তো জানে—তারা ইতোমধ্যে স্বামী-স্ত্রী। নুসরাতের নীরবতা দেখে শেহের খট করে কল কেটে দিল। চমকে উঠল সে। কলটা কেটে দিল কেন? রাগ করেছে কী? মিনিট কয়েক ভাবনার মাঝেই হঠাৎ দরজায় মৃদু শব্দ হলো। নুসরাত থমকে দাঁড়াল। শেহের এসেছে! নুসরাত দরজার কাছে গিয়ে লক খুলে দিল। শেহের ভেতরে এসে নুসরাতকে পাশ কাটিয়ে বিছানায় গিয়ে বসল। নুসরাত তাড়াতাড়ি দরজা আটকে পিছু ফিরে দাঁড়াল। দেখল, শেহের তার পরনের সাদা পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে এদিক-ওদিক কিছু খুঁজছে। নুসরাত বলল,
“এত রাতে বাইরে কেন তুমি?”
শেহের তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল। ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল,
“তোমার তোয়ালেটা কোথায়? গরমে চ্যাপচ্যাপে হয়ে গেছি। হাত-মুখ ধুতে পারব?”
নুসরাত ওর তোয়ালে এনে দেয়ার পর শেহের পরিষ্কার হয়ে এলো খানিকক্ষণের মধ্যে। নুসরাতের তোয়ালে তে নাক ঘষে বলল,
“এটা থেকে মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ আসছে। শরীরে মিষ্টি মেখে বসে থাকো নাকি?”
নুসরাত হতভম্ব হয়ে তাকাল ওর দিকে। লোকটা কী পাগল হয়ে গেছে?
“কী বলছ এসব?”
শেহের বসল বিছানায়। লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“আজ রাত তোমার কাছে থাকি? কথা দিচ্ছি, একটুও ছুঁবো না তোমায়।”
নুসরাত ঘনঘন শ্বাস ফেলল। এই মুহূর্তে মাটি ফাঁক করে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে। সারাদিন এত লজ্জার পর এখন শেহেরের রাত-বিরেতের কাণ্ড দেখে সইছে না আর।
নুসরাত বলল,
“তুমি এখানে ঘুমাও আমি নিশার কাছে যাচ্ছি।”
“কেন? ভয় পাচ্ছ আমায়?”
“ভয় পাব কেন?”
“তাহলে আমার থেকে পালাতে চাইছ কেন? কদিন পর তো আমার সাথেই থাকতে হবে।একই রুমে, একই বিছানায়, একই চাদরের নিচে।”
লজ্জায় কানটা গরম হয়ে এলো তার। কী বেহায়াপোনা কথা! এই মুহূর্তে পালাতে পারলে বেঁচে যেত সে। নুসরাতের এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে শেহের দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উঠে দাঁড়াল সোজা হয়ে। ওর নিকট পা বাড়ালে নুসরাত দু পা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“এসব এখন না। পারিবারিক ভাবে বিয়েটা হতে দাও।”
শেহের থমকে দাঁড়াল। কপাল কুঁচকে নুসরাতের ভীতু মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা কী ভাবছে বুঝতে পেরে আড়ালে ঠোঁট টিপে হাসল। বোকা মেয়ে! শেহের পা বাড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“কেন? আমাদের তো বিয়ে হয়েছে, তাহলে ভয় কীসের?”
নুসরাত বলল,
“তুমি যাও শেহের ভাই। তুমি না গেলে আমি এখন মরে যাব।”
“মরবে কেন? কাছে তো এখনও আসিনি।”
শেহের নুসরাতের খুব কাছে গিয়ে থামল। ওর নিঃশ্বাস নুসরাতের কপালে আছড়ে পড়ছে। নুসরাত চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, যেন প্রলয় দেখছে। শেহের নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
“এত ভয় পেলে চলে?”
নুসরাত কোনো উত্তর দিল না। ওর কাঁপুনি দেখে শেহেরের মায়া হলো, আবার হাসিও পেল।
“আচ্ছা বাবা, যাচ্ছি। এবারের মতো ছেড়ে দিলাম। কিন্তু বাসর রাতে একচুল পরিমাণ ছাড়ব না।”
একটু থেমে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে আবার ঘুরে তাকাল। চোখ টিপ দিয়ে বলল,
“আর শোনো, ‘শেহের ভাই’ ডাকাটা এবার বন্ধ করো। স্বামী হিসেবে এটা শুনতে কিন্তু বড্ড অদ্ভুত লাগে!”
এই বলে শেহের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নুসরাত ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। ওর বুকের ধুকপুকানি থামছেই না।
•••
বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে অর্ণ। তাদের মধ্যখানে শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছে আদি। আজ সে মামুর কাছে ঘুমাবে বলে বায়না ধরেছিল। আগে ব্যাপারটা ভিন্ন ছিল বলে অর্ণ কিছু বলত না কিন্তু আজ হাজারবার বারণ করেছে আদিকে। আদি কি আর কারোর কথা শোনে? ফ্লোরে হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিয়েছিল। এখন বাঁদরটা না ঘুমিয়ে ফোন টিপছে। তার নাকি পেটে ব্যথা করছে। অর্ণ উঠে বসল। আদির ওইপাশে তাকিয়ে দেখল কায়নাত বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। অর্ণ কায়নাতকে ডাকল কয়েকবার। কায়নাত বিরক্ত হয়ে ঘুমঘুম চোখটা খুলে অর্ণর দিকে তাকাল। কাঁচা ঘুম ভাঙায় তিরিক্ষি মেজাজে বলল,
“রাত করে বিরক্ত করছেন কেন?”
অর্ণ অসহায় কণ্ঠে বলল,
“রাত-বিরেতে মনটা বউ বউ করলে আমার দোষ কী?”
কায়নাত অর্ণর কথা শুনে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর বালিশটা টেনে নিজের মাথায় চেপে ধরল। আদির ফোন টেপা থামেনি, সে ফোনের আলোতে এক চোখ বন্ধ করে মামুর দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞের মতো বলল,
“মামু, রাত-বিরেতে মন ‘বউ বউ’ করলে পানি খাও।”
অর্ণর ইচ্ছা করল ভাগ্নেটাকে জানলা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিতে। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “তোমার পেটে না ব্যথা করছিল? এখন তো দেখছি কোথাও ব্যথা নেই! ঘুমাও বলছি!”
আদি একদমই ভয় পেল না। সে ফোনটা বালিশের নিচে রেখে কায়নাতের দিকে ঘুরে গিয়ে বলল,
“ভাবি, মামু তোমাকে কী যেন বলছে।”
কায়নাত এবার উঠে বসল। এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে অর্ণর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার কি লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই? বাচ্চাটার সামনে এসব কী বলছেন? আর আদি, তুমি তো আচ্ছা পাজি! মামুর সাথে ওরকম করছ কেন?”
অর্ণ বলল,
“আরে ও তো ঘুমাচ্ছেই না! দেখো না—মাঝখানে দেয়াল হয়ে শুয়ে আছে। একটু সরাও না ওকে।”
আদি সাথে সাথে কায়নাতকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি সরব না! মামু রাতে লাথি মারে।”
কায়নাতকে অর্ণ জোর করে মাঝখানে নিয়ে এলো। আদি কি আর মামুর সাথে পারে? বাচ্চাটা মামুর দেখাদেখি কায়নাতকে অন্যপাশ থেকে জড়িয়ে ধরল। কায়নাত দুই মহা-মানবের মধ্যে আটকা পড়ে হতভম্ব হয়ে বলল,
“কী করছেন আপনারা? রাত করে তামাশা শুরু করেছেন? ছাড়ুন বলছি!”
অর্ণ বলল,
“অনেক রাত হয়েছে বউ, এখন চুপচাপ একটু ঘুমাও।”
(ইয়া বড় পর্ব। রেসপন্স চাই সবার সাথে বড় মন্তব্য।😭🫶)
চলবে..?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ গল্পের লিংক
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৪.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২১