Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫০


প্রেমবসন্ত_২ ।৫০।

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

ঈদস্পেশালপর্ব

আজ দিনটা শুক্রবার। চৌধুরী বাড়ি কিছু আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ি ভর্তি মানুষ। কে কোথায় তা বলা মুশকিল। এই সকল ব্যস্ততার মাঝেও অর্ণর সেই ঘরে বন্দি ছোট্ট মেয়েটা। গত দুদিন ধরে এই ঘরই যেন হয়ে উঠেছে তার পৃথিবী। সেই রাতের পর থেকে অর্ণ এক পা তাকে ঘরের বাইরে বের হতে দেয়নি। উল্টো বাড়ির কেউ কিছু বলতে এলে উল্টো তাকেই কথা শুনিয়ে দিয়েছে। কে আর কীই বা করবে? যার বউ সেই যদি অধিকার দেখিয়ে বলে, “আমার স্ত্রীর ব্যপারে কেউ নাক গলাতে আসবে না।” সেখানে আর কারোর কিছু বলার থাকে আদৌ?

আজ কায়নাত লাল খয়েরী রঙের এক খানা জামদানি পরেছে। শাড়ি খানা শাশুড়ি দিয়ে গেছে সকালে। কায়নাত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার লম্বা চুল গুলো আগে আঁচড়ে খোঁপা করে শাড়ির আঁচল টেনে সুন্দর করে মাথায় টানল। চোখে আজ বহুদিন পর চিকন করে কাজল আঁকল। ঠোঁটে হালকা করে লিপস্টিক লাগিয়ে গলায়, কানে আর হাতে শাশুড়ির দেয়া পাতলা কিছু গয়না পরল। শাড়ি উঁচু করে পায়ে উকি দিয়ে দেখল, অর্ণর দেয়া সেই সোনালি রঙের পায়েল এখনও জ্বলজ্বল করছে। অভিমানী মুখ ফিরিয়ে নিল সে। সেও জেদ দেখিয়ে অর্ণর সাথে আর কথা বলতে যায়নি। দুজন একই রুমে থাকছে,ঘুমোচ্ছে অথচ কেউ কারোর সাথে কথা বলছে না।

কায়নাত চোখ সরিয়ে বিছানার দিকে তাকাল। বিছানার উপর অর্ণর জন্য সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা রাখা আছে। লোকটা বোধহয় এই পাঞ্জাবি পরিধান করবে। তৎক্ষণাৎ দরজা খোলার শব্দ হলো। ঘরে প্রবেশ করল অর্ণ। ব্যস্ত হয়ে ভেতরে ঢুকে সামনে কায়নাতের দিকে দৃষ্টি যেতেই স্থির হলো তার নয়ন জোড়া। চোখের মণিতে জ্বলজ্বল করে উঠল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লাল বধূর দিকে। কায়নাত মুখ কালো করে ঘুরে দাঁড়াল। অর্ণ খানিকক্ষণ সেভাবে দাঁড়িয়ে থেকে পাঞ্জাবি নিয়ে ঢুকল ওয়াশরুমে। খানিক বাদে গোসল সেরে বেরিয়ে এসে দেখল, কায়নাত বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে। নিচে খুলনা থেকে মানুষ এসেছেন। কীসের আয়োজন চলছে সেসব কায়নাতের জানা নেই। অর্ণ তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বিছানায় এসে কায়নাতের পাশে বসল। বলা চলে খানিক শরীর ঘেঁষেই বসল। কায়নাত যেন এতে বিব্রত হলো স্বল্প। ওদিকটায় সরে গিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “অসহ্য!”

কথা খানা অর্ণ শুনতে পেল। ভ্রু কুঁচকে বাচ্চা বউয়ের দিকে তাকাল। গরুগম্ভীর গলায় বলল,
“তুলে এক আছাড় মারব বেয়াদব মহিলা।”

কায়নাত নাক ফুলিয়ে বলল,
“আপনার সাথে তো আমি কথা বলছি না মিস্টার চৌধুরী। আপনি গায়ে পড়ে কথা বলতে আসছেন কেন?”

অর্ণ শুনল না ওর কথা। হঠাৎ মেয়েটার কোমর টেনে কাছে টানল। এতে কায়নাত আতঙ্কিত হয়ে অর্ণর কাঁধ চেপে ধরল। বলল,
“কী করছেন?”

অর্ণ তার ঠান্ডা হাত দিয়ে মেয়েটার মুখ মুঠোয় চেপে ধরে বলল,
“আমাকে এখন অসহ্য লাগে?”

কায়নাত ছটফট করছে তখন ছুটে পালানোর জন্য। অর্ণর বোধহয় এত ছটফটনি সহ্য হলো না। দুহাতে পাঁজাকোলা করে নিজের কোলে বসাল। কায়নাত অর্ণর পাঞ্জাবির কলার সরিয়ে সেখানে মুখ নিয়ে দাঁত বসাল শরীরের সব শক্তি খাটিয়ে। লোকটা একটু শব্দ অব্দি করল না। বৃথা চেষ্টায় কায়নাত মুখ তুলে অর্ণর কুঁচকে আসা চোখের দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলল,
“আমি আজই দাদার সাথে খুলনা চলে যাব। আর কোনোদিনও আপনার কাছে আসব না।”

অর্ণ কায়নাতের মাথার ঘোমটা সরিয়ে দিয়ে তার লম্বা কালো চুল গুলো ছেড়ে দিল। কিছুটা হিসহিসিয়ে বলল,
“এই অর্ণ চৌধুরী আপনার নিঃশ্বাসের সাথে মিশে আছে মিসেস। যার হৃদয়ে আমি রাজত্ব করি সেখান থেকে কার সাধ্যি আছে আমাকে মুছে ফেলার?”

কায়নাত শক্ত গলায় বলল,
“আমি সব পারি। চাইলে ভালোবাসতে পারি আবার চাইলে ছুঁড়েও ফেলতে পারি।”

“এই তেজটা সেদিন রাতে কোথায় ছিল? যখন ওই ছেলে তোমায় জড়িয়ে ধরেছিল তখন কেন প্রতিবাদ করোনি?”

কায়নাত এতেই মিইয়ে এলো। সেদিন তার কী হয়েছিল নিজেও জানে না। ভয়ে থরথর করে এক প্রকার কাঁপছিল সে। অর্ণ কায়নাতকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বিরক্ত হয়ে মাথার চুল ঠিক করে রেডি হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কায়নাত তাকিয়ে দেখল তার প্রস্থান। খানিকক্ষণ পর ঘরে এলেন বেলি বেগম। তিনি এসেছেন কাল রাতে।

“নাতবউ ঘরে বসে থাকো কেন? একা একা বিরক্ত লাগে না?”

কায়নাত এক গাল হেসে মাথার কাপড় ঠিক করে তাকে বসার জায়গা করে দিল। বলল,
“আপনার নাতি বাইরে যাওয়া পছন্দ করে না নানি।”

বেলি বেগম মুচকি হাসলেন।
“বউ পাগল হয়েছে খুব। যাক, কাল থেকে তোমার সাথে আমার কথা হয়নি একবারও। কাছে এসে বসো তো আমার।”

কায়নাত কাছে গিয়ে বসল মাথা নিচু করে। বেলি বেগম কায়নাতের চিবুক উঁচিয়ে ধরে “মাশাআল্লাহ” আওড়ালেন। বললেন,
“আমার নাতি বড় ভাগ্য করে তোমার মতো একটা বউ পেয়েছে। সোহাগ করে তো জামাই?”

কায়নাত লজ্জায় ঠোঁট চেপে ধরল। দাদি শাশুড়ি শরম লজ্জা কম দিলেও নানি শাশুড়ি এক চুল পরিমাণ ছাড় দেবেন না এসবে। দরজার সামনে থেকে আতিয়া বেগম ঢুকতে ঢুকতে বললেন,
“ওসব বলে আমার নাতবউকে শরম দেবেন না বিয়াইন। ভাই দিনে তিন বেলার বেশি ওকে গোসল করায় না।”

কায়নাত বিস্ফোরণ চোখে দাদির দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
“কী বলছো এসব? চুপ করো তোমরা।”

আতিয়া বেগম এসে ওর অন্যপাশে বসে বললেন,
“আমাদের সামনে এত শরম কীসের? আমরা তো নিজের চোখেই দেখি সব।”

“বাজে কথা বলবে না। তুমি কী এখানে আমাকে লজ্জা দিতে এসেছ?”

“ওমাহ! লজ্জা দিতে আসব কেন রে? জামাই যতটুকু লজ্জা দেয় তাতে তোর হয় না?”

কায়নাতের মুখ লজ্জায় কাঁদো কাঁদো হয়ে এলো।বলল,
“চুপ করো।”

দুই বিয়াইন মিলে শব্দ করে হেসে ফেললেন।
ওকে নিয়ে ঘর থেকে বের হলেন তারা। কায়নাত সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখল, পুরো বাড়ি কী সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। কাঁচা ফুলের গন্ধে ওর বুক ভরে এলো। বাড়ি ভর্তি কত মানুষ! অর্ণ সিঁড়ির প্রান্তে এগিয়ে এসে কায়নাতের হাত ধরল। টেনে নিল নিজের কাছে। কায়নাত অবাক হয়ে তাকাল স্বামীর দিকে। অর্ণ কায়নাতকে নিয়ে সোফার দিকটায় নিয়ে গিয়ে বসাল নিজের পাশে। সামনে জয়া আর নাজনীন বসেছিল। কায়নাত ওদের দিকে তাকানো মাত্রই জয়া চোখ টিপ মেরে বলল,
“আমাকে এত তাড়াতাড়ি খালা বানানোর জন্য তোকে ধন্যবাদ।”

কায়নাত হতভম্ব হয়ে নিজের পেটে হাত রেখে বলল,
“আমি প্রেগন্যান্ট?”

জয়া ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“তোর বাবুর জন্য আমি জামা কিনে নিয়ে এসেছি। তোর জন্য দুটো মেক্সি বানিয়ে এনেছি। আচার, নাড়ু সব এনেছি।”

কায়নাত কথা বলতেই ভুলে গেল। সে মা হবে অথচ সে নিজেই জানে না? অন্যদিকে বোন তার জন্য কত কিছু করে এনেছে।
নাজনীন বিরক্ত হয়ে মাথা চেপে বসে আছে। অর্ণ বোধহয় শালির এসব ফালতু কথা শুনে বেশ চোটে গেছে। কায়নাত অর্ণর হাত চেপে ধরে বলল,
“ও এসব কী বলছে? আমি মা হব?”

অর্ণ দাঁত চেপে বলল,
“তুমি প্রেগন্যান্ট আর তুমিই জানো না?”

“তাহলে জয়া এসব কেন বলছে?”

“তোমারই তো বোন। পাবনা থেকে এসেছে জানো না?”

জয়া মুখ কালো করল।
“নেহাত আপনি আমার দুলাভাই হন, নাহলে আপনার খবর করে ছাড়তাম। আপনি আমাদের পাগল বলতে চাইছেন?”

অর্ণ নাজনীনকে বলল,
“তোমার এই বউকে আনতে বারণ করেছিলাম। কেন এনেছ?”

নাজনীন বলল,
“সব সময় চিপকে থাকে। না এনে উপায় নেই ভাই।”

সব কিছু কায়নাতের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। হচ্ছেটা কী এসব? কেউ তো কিছু বলছেই না আবার কথা ঘুরিয়ে যাচ্ছে। বাইরের দরজা দিয়ে তখন স্বার্থ নিজের পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে সবে ভেতরে পা ফেলেছে, অমনি প্রেম তার সামনে এসে বুক টানটান করে দাঁড়াল। স্বার্থ কপাল কুঁচকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“আমি তো বর যাত্রী নিয়ে আসিনি। তুই এমন করে রাস্তা আঁটকে দাঁড়ালি কেন?”

প্রেম বলল,
“তোমাকে ইনভাইট করেছে কে?”

“এই বাড়ির হবু জামাই আমি। আমাকে কে ইনভাইট করেছে মানে কী?”

প্রেমের পেছন থেকে নিশা বলল,
“আমার জামাইকে বিরক্ত করছো কেন ভাইয়া?”

প্রেম ঘাড় বাঁকিয়ে ছোট বোনকে দেখে পলক পিটপিট করে বলল,
“বিয়েই হলো না এর মধ্যেই জামাই? তোর কী লজ্জা শরম নেই নিশু? বড় ভাইয়ের সামনে এসব কী বলছিস?”

নিশা বলল,
“বিয়ে হয়নি হবে তো?”

“নাও তো হতে পারে।”

নিশু মুচকি হেসে স্বার্থর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। একবার আড়চোখে স্বার্থকে দেখে বলল,
“আমার বিশ্বাস আছে স্বার্থ ভাইয়ের উপর। একদিন এই লোকটার হাত ধরেই তোমাদের বিদায় জানাব।”

প্রেম থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইল। স্বার্থ এমন সময় এমন উত্তর আশা করেনি। সে শুকনো গলা ভেজাল। নিশাকে আজ বাচ্চা মোটেও মনে হচ্ছে না। আজ মনে হচ্ছে এবার বিয়েটা করা উচিত। উচিত এই মেয়েকে নিজের করে নেয়া।
বাড়ি জুড়ে হইহুল্লোড় লেগে আছে। রাতের খাবারের কী সুন্দর বিরাট আয়োজন চলছে। প্রেম আশেপাশে নজর বুলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো। নিশার ঘরে নিধিকে না পেয়ে পা বাড়াল ছাদের দিকে। ছাদের দরজা খোলা। প্রেম ছাদে পা রাখতেই দেখতে পেল ওই দূরে ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে নিধি। চুপচাপ, কিছুটা একান্তে। কোথাও একটু খারাপ লাগল ওর। ওর নিকটে এসে পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“এখনও রেগে আছিস?”

নিধি উত্তর দিল না প্রথমে। কিছু সময় পর বলল,
“আমার মনে হয় আমার বিয়েটা করে ফেলা উচিত। আপনাকে আমি বিয়ে করতে পারব না।”

চমকে উঠল প্রেম।
“হোয়াট?”

নিধি লম্বা শ্বাস টেনে চোখের কোণার পানি টুকু ওড়নার কোণা দিয়ে মুছে ধরা গলায় বলল,
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আমি সোহানকেই বিয়ে করব, এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।”

রাগে প্রেমের চোয়াল শক্ত হলো। নিধির দিকে এগিয়ে আসতে চাইলে নিধি দুপা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“আপনি ভালোবাসার যোগ্যই নন। আমি তো আপনাকে ভালোবাসতাম না। কখনও আপনাকে নিজের করে পেতেও চাইনি আমি। কিন্তু আপনার পাগলামো গুলো আমায় বাধ্য করেছিল আপনাকে ভালোবাসতে, আপনাকে নিজের করে পেতে। যখন নিজেকে আপনাতে হারালাম, তখন মনে হলো আমি ভুল করেছি। এমন একটা মানুষকে ভালোবেসেছি যে মানুষটা আমার মূল্য বোঝে না। না আমাকে বোঝে আর না আমার মনটাকে।”

প্রেম শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করল। পারল না নিধির ফের কথায়।
“আপনি আমাকে কখনও আদৌ ভালোবেসেছেন কিনা আমার সন্দেহ হচ্ছে এখন। আমি একা একটা মানুষ এত গুলো দিন ধরে ফ্যামিলি সাথে লড়াই করে আসছি। কই, আপনি একটাবার আমার হাত ধরে সবার সামনে তো বললেন না, এই মেয়েটাকে আমি ভালোবাসি। আমি নিধিকে বিয়ে করতে চাই। উল্টো দিনের পর দিন আপনি অত্যাচার করে গেছেন আমার উপর। আপনার মতো একজন শিক্ষিত ম্যাচিওর মানুষ প্রেমিকার গায়ে হাত অব্দি তুলেছেন।”

প্রেম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। নিধির চোখের ব্যথা যেন সহ্য হচ্ছে না তার। মেয়েটা হাউমাউ করে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে। নাকের পানি চোখের পানি একাকার। বুকটা কেমন মুচড়ে উঠছে ব্যথায়। প্রেম নিধিকে জড়িয়ে ধরল। শান্ত করার জন্য মাথায় হাত বুলিয়ে বারবার বলতে লাগল,
“কাঁদিস না। প্লিজ কাঁদবি না নিধি।”

নিধি ধাক্কা দিয়ে ওকে সরিয়ে দিল নিজের থেকে। চিৎকার করে বলল,
“আপনার এই মুখ আমাকে আর কখনও দেখাবেন না। আমি খুলনা ফিরে যাব ভাইয়াদের সাথে। বিয়ে করে নেব ওই লোককে। সুখেও থাকব আর সংসারও করব। তবে আপনার নয়, অন্য এক পুরুষের।”

এই ছিল তাদের শেষ কথোপকথন। নিধি ছুটে গেছে নিচে। ছাদে প্রেম একা দাঁড়িয়ে। কেউ নেই চারপাশটায়। নিচে চলছে বাড়ির মানুষদের আনন্দ-উৎসব। অথচ প্রেম একা। বড্ড একা! সে কী সত্যিই প্রেমিক হিসেবে এত খারাপ? এতটা তুচ্ছ? নিধিকে ভালোবাসার মতো যোগ্যটা তার নেই? সত্যিই হয়তো নেই। তিক্ত বি’ষ মানুষ সহজে পান করতে পারে না। হজম করে নিতে বড্ড দেরি হয়। প্রেমের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই! হয়তো নিজের এই ব্যর্থতা তার চোখে এখনও ধরা পড়ছে না।

•••

কায়নাত এই মুহূর্তে বসে আছে ড্রয়িংরুমে। সবাই চারপাশে যে যেভাবে পেরেছে ওভাবেই বসেছে। অর্ণ কায়নাতের ঠিক পাশে বসা। বউয়ের ছোট্ট হাত নিজের হাতের মুঠোয়। খানিকক্ষণ আগে খাওয়া দাওয়া শেষ করেছেন সবাই। আদি মামুর কোল ঘেঁষে বসে আছে পাশে। সে কুটুরকুটুর চোখে সবাইকে দেখছে আবার অর্ণর ফোনে মনোযোগী হচ্ছে।

আতিয়া বেগম মুখে পান নিয়ে বললেন,
“আজ থেকে ৮ বছর আগে এই দিনে ঠিক এই সময়ে চৌধুরী বাড়ি খুব বৃষ্টি ছিল। সেই রাতে আমার প্রাপ্ত বয়স্ক নাতির সাথে কায়নাতের বিয়ে দিয়েছিলাম। কিযে সুখ সুখ লাগছিল দুটোকে একসাথে দেখে! অর্ণ তো বিয়ে করতে চায়নি, দাদার কথায় বিয়ে করেছিল। ছোট্ট মেয়েটা আমার শাড়ির আঁচল ধরে বায়না করেছিল সে শহরের লাটসাহেবকে বিয়ে করবে। বউ হবে তার। অতটুকু পাঁকা মেয়ের আবদার শুনে খুব হেসেছিলাম আমি। কিন্তু উপর ওয়ালা যে সত্যিই ওর মনের আশা পূরণ করে দেবেন কল্পনাও করিনি। সেই রাতে বৃষ্টিতে ভিজেছিল ওরা। বিয়ে পড়ানোর পর কায়নাতকে অর্ণর ঘরে দিয়ে এসেছিলাম। জ্বরে মেয়েটার শরীর পুড়ে যাচ্ছিল প্রায়। বউ মানি না বলেও অর্ণ কি সুন্দর সারারাত মেয়েটার খেয়াল রেখেছিল। মাথায় পানি ঢেলে কপালে ভেজা কাপড় রেখেছিল। আজ সেই বাচ্চা বধূ কত বড় হয়েছে। বিয়ের ৮ বছর কেটে গেছে। দুজনের সংসার হয়তো হয়নি এই ৮ বছরে, কিন্তু স্বামীর দায়িত্ব পালন করতেও অর্ণ এক পা পিছু হাঁটেনি। বউকে না মানলেও বউয়ের সকল খরচ বহন করেছে এত গুলো বছর। কেউ কি জানে সেসব খবর?”

কায়নাত চমকে উঠল। আজ তার বিবাহবার্ষিকী? আজ এপ্রিল মাসের ৩ তারিখ। অর্থাৎ এই দিনেই গত ৮ বছর আগে তার বিয়ে হয়েছিল অর্ণর সাথে। কায়নাত অর্ণর দিকে তাকাল পাশে। অর্ণ চুপচাপ বসে আছে। কোনো অনুভূতি নেই, কোনো রিঅ্যাকশন নেই। বড্ড অদ্ভুত লোকটা!

জারা আশেপাশেই ছিল। আতিয়া বেগমের কথা শুনে না চাইতেও চোখের কোনায় পানি এলো। মানুষের মন বড্ড অদ্ভুত! কিছু মানুষকে ভালোবেসেও ভিক্ষা চেয়ে পাওয়া যায় না। সে আড়ালে চোখের পানি মুছল। নিশা ফট করে বলে বসল,
“তাহলে ভাইয়া কী ভাবির খোঁজ খবর রেখেছিল এতদিন?”

আতিয়া বেগম বললেন,
“না। শুধু তোর দাদার মাধ্যমে ওর বাবার ব্যাংক একাউন্টে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল।”

কায়নাত মাথা নিচু করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইল। তার স্বামী তার খরচ বহন করেছে এত গুলো বছর, অথচ কত কষ্টেই না সোহেল মির্জা তাকে রেখেছিল। এমনও দিন পাড় করেছে সে দুই কাপড় দিয়ে গোটা একটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে। দিনে তিন বেলা কী কখনও ভালো-মন্দ খেতে পেরেছে? মা তবু লুকিয়ে লুকিয়ে খাইয়েছে। ভালোবেসে যত্ন করে বুকে আগলে রেখেছে। আজ এই গা ভর্তি দামি কাপড়, গয়না এসবের চেয়ে যেন সেই আগের নোংরা দুটো কাপড় বড্ড মূল্যবান তার কাছে। কায়নাত বহু কষ্টে গিলে ফেলল ব্যথাটুকু। বেহরুজ বেগম তাড়া দিয়ে বললেন,
“অনেক রাত হলো। ওদের এবার ঘরে যেতে দাও।”

তারপর নিশার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“সব শেষ করেছিস কাজ?”

নিশা বলল,
“হ্যা।”

তারপর তিনি অর্ণকে বললেন,
“কায়নাতকে নিয়ে ঘরে যাও। কিছু লাগলে বোনদের ডেকে নিয়ো।”

অর্ণ উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে টেনে দাঁড়াল করাল কায়নাতকে। ওকে নিয়ে সদর দরজার দিকে যেতে যেতে বলল,
“বাইরে যাচ্ছি। ফিরতে দেরি হতে পারে আবার নাও ফিরতে পারি।”

কায়নাত তাল মিলিয়ে যেতে পারল না। দৌঁড়ে গেল পাষাণ লোকটার সাথে।
বাড়ি শুদ্ধ মানুষ থমথমে খেলেন অর্ণর কাজে।
অর্ণ কায়নাতকে নিয়ে বাড়ির বাইরে এসে বাইক বের করল। কায়নাত আচঁল গুটিয়ে বাইরে বসার আগে মিনমিন করে প্রশ্ন করল,
“কোথায় যাবেন এই রাত করে?”

অর্ণ নরম গলায় বলল,
“আমাকে ধরে বসো।”

কায়নাত অর্ণর পেছনে বসে ওর শক্ত বুকটা জরিয়ে ধরল। কিছুটা আতঙ্কিত গলায় কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“আপনি অনেক জোরে বাইক চালান। দোয়া করে আজ একটু ধীরে চালাবেন। আমি এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই না।”

অর্ণ ঠোঁট বাঁকিয়ে বোধহয় একটু হাসল। দারোয়ান দরজা খুলে দিতেই বেরিয়ে এলো বাড়ি হতে। বাইক টানতে টানতে ঠিক কতদূর এলো বলা মুশকিল। বাইক থামার নাম নেই। কায়নাত আশেপাশে দেখল, তারা কিছুটা নির্জন জায়গায় এসেছে। আশেপাশের দূরদূরের বাড়ি ঘর থেকে লাইটের আলো দেখা যাচ্ছে। গুলশানের মতো উঁচু উঁচু বিল্ডিং নেই তেমন। বড্ড শান্তি অনুভব হলো তার। মিশে যেতে চাইল অর্ণর বুকের সাথে,পারল না সে। খানিক দূরে এসে অর্ণ বাইক থামাল। কায়নাত নামার পর অর্ণ ওর হাত ধরে একটা ছোট্ট বাড়ির ভেতর নিয়ে গেল। পুরো অন্ধকার চারপাশ। ভীতু মেয়েটা অর্ণর হাত চেপে ধরে বলল,

“আমার ভয় করছে। কোথায় নিয়ে এলেন আমায়? আপনি কী সত্যি আমাকে মেরে ফেলতে চাচ্ছেন?”

অর্ণ গম্ভীর গলায় বলল,
“তোমাকে আজ এখানে খু’ন করে রেখে যাব।”

ভয় পেল কায়নাত অর্ণর গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে। লোকটা কী সত্যি তাকে মারবে? মেরে ফেললে কেউ তাকে এখানে খুঁজতেও আসবে না। কেউ কোনোদিন জানবেও না কায়নাতকে খু’ন করা হয়েছে। ছটফট শুরু করল কায়নাত। অর্ণ বুঝতে পারছে কায়নাত ফুপিয়ে কাঁদছে। এত বলদ কেউ হয়? এতটা মাথা মোটা?

হঠাৎ পুরো বাড়ির লাইট জ্বলে উঠল। আলোকিত হলো পুরো বাড়ির উঠোন। সামনে মাটির একটা ঘর। ছোট্ট উঠোন জুড়ে দেয়াল ঘেঁষে বাগান বিলাস ফুল। সারি সারি খাঁচার মধ্যে নানানরকম নাম না জানা পাখি। কায়নাত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল পাখি গুলোর দিকে। পরপর চোখ ঘুরিয়ে পুরো বাড়ির দিকে তাকাল। ছোট্ট একটা মাটির ঘরের সাথে ছোট্ট একটা উঠোন। কী সুন্দর মায়াময় পরিবেশ! কায়নাত সেদিন ভোর সকালে সিলেটে আবদার করেছিল এমন একটা বাড়ির। সেখানে ছোট একটা বাড়ি থাকবে, খাঁচায় বন্দি পাখি থাকবে আর থাকবে একটুখানি শান্তি। মেয়েটা ভুলে বসল সব। এগিয়ে এসে খাঁচার দরজা খুলে দিতেই ঝরঝর করে বেরিয়ে গেলো শ’খানিক পাখি। উড়ে গেল তার মাথার উপর দিয়ে। কায়নাত অন্ধকারে তাদের মিইয়ে যেতে দেখল। হঠাৎ পেছন থেকে শক্ত দুটো হাত তার বাহু আঁকড়ে ধরল। ঘাড়ে চুমু এঁকে বলল,
“আপনি খুশি হয়েছেন ম্যাডাম?”

কায়নাত চোখ বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠল শব্দ করে। অর্ণ মৃদু হেসে ওকে কোলে তুলে নিল। নিয়ে গেল মাটির ঘরের ভেতর। ছোট্ট একটা ঘরের মধ্যে একটা বিছানা। আর তার পাশে একটা টেবিল। পুরো মাটির ঘরটায় ফুলের বাগান মনে হচ্ছে। অর্ণ কায়নাতকে বিছানায় বসাল। বিছানায় থাকা লাল গোলাপের পাপড়ি গুলোর দিকে কায়নাত দৃষ্টি বুলিয়ে লজ্জায় পা গুটিয়ে নিল। অর্ণ দরজা বন্ধ করে এসে বিছানায় বসল। পর-মুহূর্তে ছোট্ট অভিমানী বউপাখিকে ঠাঁই দিল নিজের কোলে। কায়নাতের মনে হলো তার শরীরটা বড্ড পাতলা। নাহলে এই লোক যখন তখন তাকে এভাবে টেনে এনে কোলে বসায় কী করে?

ওর ভাবনার বিচ্ছেদ ঘটল অর্ণর কথায়। লোকটার কণ্ঠস্বর কেমন জড়াল হয়ে আসছে।
“তোমাকে বিয়ে করে জীবনের অনেক গুলো বছর একা কাটিয়েছি। এই বয়সে এসেও সেই তোমার জন্য আমাকে একা থাকতে হচ্ছে।”

কায়নাত কপাল কুঁচকে বলল,
“একা মানে? আমি আছি না?”

অর্ণ কায়নাতকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর পেটে নাক ঘষল। সেথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“আমার বাবা ডাক শুনতে ইচ্ছে করছে খুব।”

অর্ণর গলার স্বরে আজ এক অদ্ভুত নেশা আর শিশুর মতো সরলতা। কায়নাতের পেটে মুখ গুঁজে সে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল,
“জানো? আমার অনেক বন্ধুদের এখন এক-একটা ছোট বাচ্চা আছে। ওরা যখন আড্ডায় বসে বাচ্চার গল্প করে, তখন আমি শুধু শুনি। আমাকে যখন ওরা ‘চাচ্চু’ বলে ডাকে, বুকটা হাহাকার করে ওঠে। আমারও তো ইচ্ছে করে অফিস থেকে ফেরার পর কেউ একজন আধো-আধো গলায় ‘বাবা’ বলে আমায় জড়িয়ে ধরুক। কেউ আমার কাছে হাজারটা বায়না ধরুক।”

কায়নাত স্তব্ধ হয়ে অর্ণর চুলে আঙুল চালাতে লাগল। এই শক্তপোক্ত, গম্ভীর মানুষটার ভেতরে এতখানি শূন্যতা জমে আছে, সে ভাবতেও পারেনি। অর্ণ এবার মুখ তুলে কায়নাতের চোখের দিকে তাকাল। সে কায়নাতের হাত দুটো নিজের গালে চেপে ধরে বলল,
“আমার একটা বাবু চাই। একদম তোমার মতো দেখতে একটা ছোট্ট কায়নাত। দেবে না আমায়?”

কায়নাতের শরীর তখন বরফ হয়ে জমে আছে। লজ্জায় শরীর শিরশির করছে। কায়নাতের মনে হলো ওর হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে ধকধক করছে। অর্ণর তপ্ত নিঃশ্বাস ওর পেটের পাতলা চামড়ার উপর আছড়ে পড়ছে। লজ্জায় কায়নাত দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। সারা শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে তার।
অর্ণ কায়নাতের হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে ওর দুজোড়া কম্পিত চোখের দিকে তাকাল। অর্ণ ওর কপালের অবাধ্য চুলগুলো কানে গুজে দিয়ে খানিক ঝুঁকে এলো। কায়নাতের কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি আর কতকাল অন্যের বাচ্চাদের দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলব? আজ আমি শুধু তোমাকে চাই না, আমাদের আগামীর একটা স্বপ্নকেও চাই। বলো না, দেবে না আমাকে একটা ছোট্ট কায়নাত?”

কায়নাত কোনোমতে অর্ণর পাঞ্জাবির কলারটা খামচে ধরল। ওর মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না, কেবল গলার কাছে একটা অস্ফুট আওয়াজ হলো। সে অর্ণর প্রশস্ত বুকে নিজের মুখটা লুকানোর চেষ্টা করল। অর্ণ কায়ানাতের এই মিইয়ে যাওয়া আর লজ্জাটাকে তার সম্মতি হিসেবেই ধরে নিল।
সে কায়নাতের থুতনিটা আলতো করে ধরে মুখটা তুলে ধরল। অর্ণ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“আমার একটা বাচ্চা চাই কায়নাত। আমাদের একদম নিজস্ব একটা পৃথিবী চাই।”

(আসসালামু ওয়ালাইকুম। সব লেখক ঈদ উপলক্ষে পর্ব দিয়েছে আমি বাদে। তাই আজ একটুখানি ভালোবাসাময় পর্ব দিলাম। সবার ঈদ কেমন কাটল?)

চলবে..?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply