Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪৭


প্রেমবসন্ত_২ ।৪৭।

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

কায়নাত মাথা নত করে অর্ণর সামনে বসে আছে। অর্ণ বুকে হাত গুঁজে কপাল কুঁচকে সপ্তদশীকে পর্যবেক্ষণ করছে। কায়নাত হাঁসফাস করে উঠল। আবার চোখ তুলে একবার অর্ণকে দেখে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। অর্ণ ধমক দিয়ে বলল,
“সারাদিন খাওনি কেন তুমি? কিছু বলি না বলে মাথায় উঠে গেছ?”

কায়নাত অভিমান চেপে বলল,
“আমাকে নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না।”

“আমার মুখে মুখে তর্ক শিখেছ। বেয়াদব মহিলা, দিনদিন বাঁদরামি বাড়ছে তোমার?”

“আপনি আমায় বকছেন কেন? আপনাকে কিছু বলেছি আমি?”

“তুমি কী শপথ করেই নিয়েছ, জীবনে মানুষ হবে না?”

কায়নাত উত্তর দিল না। অর্ণ ফ্রেশ হয়ে এসে কায়নাতকে নিয়ে এক প্রকার টেনে নিচে নিয়ে গেল। জোর করে কয়েক লোকমা ভাত খাওয়াতে পারল। ঘরে ফিরে পড়ার টেবিলে বসাল। কায়নাত বিরক্ত হয়ে অর্ণর কাজ দেখছে। কোন জামাই এই রাত করে বউকে ভালো না বেসে এভাবে পড়ার টেবিলে বসায়? এই লোকের কী কোনো অনুভূতি নেই? নেই দেখেই তো এমন পাষাণ। প্রায় ঘণ্টা খানিক পেরোনোর পর অর্ণ ল্যাপটপ রেখে ওয়াশরুমে ঢুকল। কায়নাত এই ফাঁকে পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে এলো। একবার ওয়াশরুমের দিকে উকি মেরে আলমারি খুলে সামনে দাঁড়াল। কপাল কুঁচকে অর্ণর সব জামা কাপড় এলোমেলো করে মুখ বাকাল। তারপর নিজের জন্য কালো রঙের একটা নাইট ড্রেস বের করে তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে নিল। সব শেষে দৌঁড়ে গেল পড়ার টেবিলে। খবিশ লোক কতক্ষণ এমন গম্ভীর হয়ে থাকতে পারে সেও দেখে নেবে। অর্ণ খানিকক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বের হলো। হাত-মুখ ধুইয়ে বের হয়েছে একেবারে। সে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আড়চোখে একবার কায়নাতের দিকে তাকাল। মেয়েটা উল্টো ঘুরে কিছু একটা লেখছে। হঠাৎ শব্দ করে ওর ফোনটা বেজে উঠল। অর্ণ বিছানার উপর থেকে ফোন হাতে নিয়ে দেখল আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে। অর্ণ ধরল না। বেশ কয়েকবার বাজার পর কায়নাত বিরক্ত হয়ে ধমক দিয়ে বলল,

“ফোন কিন্তু ছুড়ে ফেলব। কল রিসিভ করছেন না কেন?”

অর্ণ থমথমে খেয়ে কল রিসিভ করল। রিসিভ করে বারান্দার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“কে বলছেন?”

ওপাশ থেকে এক নারীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। অর্ণর চোয়াল শক্ত হলো এতে। কায়নাত চোরা চোখে অর্ণর দিকে তাকিয়ে আছে।
অর্ণ গম্ভীর গলায় তখন বলছে,
“আমার নাম্বার কোথায় পেয়েছেন আপনি?”

ওপাশ থেকে ঈশা বলল,
“একসাথে কাজ করছি আর নাম্বার থাকবে না?”

“আমার জানা মতে আপনারা ডিল ক্যান্সেল করতে চেয়েছেন।”

“চেয়েছি, এখনও করিনি।”

“কল করার কারণ?”

“কাল আপনি ফ্রি আছেন নিশ্চয়ই?”

অর্ণ ঘাড় ঘুরিয়ে কায়নাতের দিকে তাকাল। কায়নাত গাল ফুলিয়ে টেবিলের উপর শব্দ করে এটা ওটা রাখছে। অর্ণ দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল,
“অফিসে এসে দেখা করে যাবেন। রাখছি এখন।”

এই বলে অর্ণ কল কেটে দিল। কপালে হাত স্নাইড করে লম্বা শ্বাস টেনে ঘরের মধ্যে ঢুকল। এগিয়ে গেল কায়নাতের পড়ার টেবিলের কাছে। কায়নাত গলা পরিষ্কার করে সোজা হয়ে বসল। অর্ণ কাছে এসে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াল। দৃষ্টি পড়ল ছোট্ট বউপাখির উপর। কায়নাত শুষ্ক ঢোক গিলে আড়চোখে অর্ণকে দেখে খোলা গুলো ঘাড়ের একপাশে এনে মুখে বিরক্ত ভাব ফুটিয়ে তুলল।
“গরম লাগছে আমার, এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিন।”

অর্ণ শুকনো ঢোক গিলে ঠাই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। কায়নাত কপাল কুঁচকে তাকাল তার দিকে। ওর কোনো নড়চড় না দেখে চেয়ার ঠেলে সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। বিছানার উপর রিমোর্ট রাখা দেখে সে ওইদিকে এগিয়ে গিয়ে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিল। পেছন থেকে অর্ণর নরম কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাল।
“এসব কী পরেছ? শরীরের সবই তো দেখা যাচ্ছে।”

কায়নাত পিছু ফিরে বলল,
“আপনিই তো সিলেট থেকে এসব কিনে দিয়েছেন। টাকা দিয়ে কেনা জিনিস না পরলে অপচয় হবে না? তাই তো পরেছি।”

“তাই হলে এখন কেন?”

“তাহলে কখন পরব? দিনে বেলা এসব পরে বাইরে ঘুরঘুর করব?”

অর্ণর কথা জড়িয়ে এলো। কায়নাতের দিকে পা বাড়ালে কায়নাত পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“পড়তে হবে আমার। এত পড়া বাকি, বাবাগো!”

অর্ণ ঘাড় চুলকে বলল,
“এখন পড়তে হবে না।”

“না, আমার অনেক পড়া বাকি।”

অর্ণর অস্থির লাগল। খানিকক্ষণ ঘরে পায়চারী করে পর্যবেক্ষণ করল কায়নাতকে। নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই বেয়াদব মহিলা, তাড়াতাড়ি পড়া বন্ধ করো।”

কায়নাত পলক পিটপিট করে পিছু ঘুরে বলল,
“কেন?”

অর্ণ বই খাতাগুলো একপাশে সরিয়ে দিয়ে কায়নাতের একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। ওর ঘন নিশ্বাস কায়নাতের কপালে আছড়ে পড়ছে। অর্ণ গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“অনেক পড়েছ, আর লাগবে না। রাত অনেক হয়েছে, এখন ঘুমানোর সময় হয়েছে।”

কায়নাত ঠোঁট উল্টে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“বাহ! একটু আগে তো বলছিলেন মানুষ হবো না, দিনদিন বাঁদরামি বাড়ছে। এখন আবার পড়তে মানা করছেন কেন? আমি আজ রাত জেগে মানুষ হয়েই ছাড়ব।”

অর্ণর ধৈর্য যেন দেয়ালে গিয়ে ঠেকেছে। সে কায়নাতের চেয়ারের হাতলে দুহাত রেখে ওকে এক প্রকার বন্দি করে ফেলল। নিচু স্বরে বলল,
“মানুষ হওয়ার জন্য কাল সারাদিন সময় পাবে। এখন আমি যা বলছি সেটা শোনো। চুপচাপ বিছানায় চলো।”

কায়নাত এবার দুষ্টুমিভরা হাসিতে অর্ণর দিকে তাকাল। সে বেশ বুঝতে পারছে এই পাষাণ লোকটার শক্ত বর্ম আজ নড়বড়ে হয়ে গেছে। সে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“বিছানায় গিয়ে কী হবে? আপনি তো ল্যাপটপ নিয়ে বসবেন আর আমি দেয়ালের দিকে মুখ করে ঘুমাব। তার চেয়ে পড়া অনেক ভালো। অন্তত জ্ঞান তো বাড়বে!”

অর্ণর চোখ দুটো এবার গভীর হলো। সে কায়নাতের অবাধ্য চুলের গোছাটা কানের পিছে গুজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আজ ল্যাপটপ খুলব না, কথা দিচ্ছি।”

অর্ণ কায়নাতের চেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোখজোড়ায় এখন শাসকের বদলে এক বুক হাহাকার। কায়নাত আবার খাতা টেনে নিয়ে বিরবির করে পড়া শুরু করল।
অর্ণ অসহায়ের মতো বলল,
“কায়নাত, অনেক হয়েছে। এবার নাটক বন্ধ করে চলো।”

কায়নাত খাতা থেকে মুখ না তুলেই উত্তর দিল, “কিসের নাটক? আমি তো মানুষ হচ্ছি। আপনিই তো বললেন আমি মানুষ হব না। আজ আমি মানুষ হয়েই ঘুমাব। আপনি যান, গিয়ে ল্যাপটপে ওই ‘ডিল’ সলভ করুন।”

“ ডিল পরে হবে, এখন তোমার সাথে আমার একটা ‘পার্সোনাল ডিল’ বাকি। উঠবে না?”

কায়নাত গাল ফুলিয়ে পা নাড়াতে নাড়াতে বলল, “নাহ! আমার ডিমান্ড আছে। রাজি হলে তখন ভেবে দেখব।”

অর্ণ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কপাল টিপে ধরল। তারপর ধরা গলায় বলল,
“আচ্ছা বাবা, তোমার কী চাই বলো? আকাশ থেকে চাঁদ পেড়ে আনতে হবে?”

কায়নাত এবার ঘুরে বসল। অর্ণর চোখের দিকে তাকিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
“চাঁদ লাগবে না। প্রথমত, কথায় কথায় ‘ছ্যাঁত’ করে ওঠা যাবে না। আমি কী আপনার অফিসের পিয়ন যে সারাক্ষণ ধমকের উপর রাখবেন?”

অর্ণ বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে, আর?”

“দ্বিতীয়ত, আমার সাথে ঝগড়া করার আগে এক হাজারবার ভাববেন। ভাববেন যে এই মেয়েটার সাথে আমি পারব কিনা। আর ওই যে কথায় কথায় ‘আছাড় মারব’ বললে, আমি কিন্তু সোজা বাপের বাড়ি চলে যাব!”

অর্ণ মনে মনে হাসল, কিন্তু মুখে সিরিয়াস ভাব ধরে বলল,
“আচ্ছা বাবা, এক হাজার না, দুই হাজারবার ভাবব। এবার তো চলো?”

কায়নাত এবার একটু বাঁকা হেসে বলল,
“উঁহু, শেষ শর্ত। কাল আমাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে। রাজি?”

অর্ণ থতমত খেয়ে বলল,
“আমি? আমি খুব ব্যস্ত। কয়েকদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকব। সময় নেই হাতে।”

কায়নাত আবার খাতার দিকে নজর দিল,
“তাহলে থাক। আমি পড়ি। আপনি যান।”

অর্ণ দ্রুত কায়নাতের হাত চেপে ধরল। করুণ গলায় বলল,
“আচ্ছা বাবা রাজি! শুধু ঘুরতে কেন, কাল আমি তোমাকে নিয়ে হানিমুনে যাব। এবার দয়া করে এই টেবিলটা ছাড়ো, আমার খুব একা লাগছে।”

কায়নাত এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। অর্ণর এমন ‘ভেজা বিড়াল’ রূপ দেখে বেশ মজা পেল। সে আলতো করে অর্ণর গাল টেনে দিয়ে বলল,
“এই তো লক্ষ্মী ছেলের মতো কথা!”

••

নিশা পা টিপে টিপে ঘর থেকে বের হলো। নিধিকে নিয়ে এখনও প্রেম বাড়ি ফেরেনি। এই খবর বাড়িতে জানাজানি হলে দুজনের খবর আছে। সে পা টিপে টিপে ছাদে এলো। অন্ধকারে ভয় লাগল খানিক। কাল বৃষ্টি হয়েছে বলে ছাদে পানি জমে আছে জায়গায় জায়গায়। নিশা ভীতু চোখে চারপাশে চোখ বুলিয়ে ফোন বের করল প্যান্ট এর পকেট থেকে। আশ্চর্য! স্বার্থ কল ধরছে না। খানিকক্ষণ পর ছাদের এক কোণা থেকে অদ্ভুত এক শব্দ ভেসে এলো। নিশা দৌঁড়ে গেল সেদিকে। ওদের দেয়াল ঘেঁষা বড় গাছ বেয়ে স্বার্থ উঠে আসছে ছাদে। নিশা হতবাক! আশ্চর্য হয়ে ঘাড় ঝুঁকিয়ে বলল,

“তুমি কী পাগল? এভাবে ছাদে আসছো কেন?”

স্বার্থ শেষ ধাপটা পেরিয়ে লাফ দিয়ে ছাদের কার্নিশে এসে দাঁড়াল। শরীরের টি-শার্টটা গাছের ডালের ঘষায় খানিকটা ছিঁড়েছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কিন্তু নিশার ভীতু মুখটা দেখামাত্রই ওর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বিজয়ী হাসি। চাঁদের আলো তখন মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে স্বার্থের মুখে আছড়ে পড়েছে, যেন কোনো রূপকথার অবাধ্য রাজপুত্র নিষিদ্ধ কোনো রাজ্যে হানা দিয়েছে।
স্বার্থ পকেট থেকে রুমাল বের করে হাত মুছতে মুছতে গাল ভরে হাসল। নিশার একদম কাছে এসে দাঁড়াল সে। ভেজা ছাদের উপর চাঁদের প্রতিবিম্ব কাঁপছে। স্বার্থ নিচু গলায় বলল,
“পাগল না হলে এই মাঝরাতে মরণফাঁদ পেরিয়ে তোর এই গম্ভীর মুখটা দেখতে আসি?”

নিশার বুকের ধুকপুকানি এখনো থামেনি। সে চারপাশে একবার তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“যদি কেউ দেখে ফেলত? আর গাছ থেকে যদি পড়ে যেতে? তোমার কী কাণ্ডজ্ঞান কোনোদিন হবে না?”

স্বার্থ এবার কার্নিশে হ্যালান দিয়ে দাঁড়াল। নিশার বিরক্তিমাখা মুখটার দিকে তাকিয়ে ও একটু ঝুঁকে এলো। ওর চোখের মণি দুটো চিকচিক করছে। রহস্যময় স্বরে বলল,
“পড়ে গেলে তো ভালোই হত। খবরের কাগজে আসত—‘প্রেমিকার রাগী লুক দেখতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে প্রেমিকের অকাল মৃ’ত্যু’।”

স্বার্থ নিশার কোমর জড়িয়ে ধরল। নিশা তার ছোট ছোট হাত দুটো স্বার্থর মুখে বুলিয়ে নিভু গলায় বলে,
“কেন এমন পাগলামি করো বলো তো? তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার কী হত? এত রাত করে এভাবে আসার কোনো দরকার ছিল? কাল সকালেই আমরা দেখা করতে পারতাম।”

স্বার্থ ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল,
“তোকে কোলে নিয়ে ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে সোনা।”

“ছাড়ো তো! আব্বু কিন্তু এই সময়ে জেগে থাকেন। ছাদে এলে কী হবে জানো? তুমি চলে যাও।”

স্বার্থ মুখ কুঁচকে ফেলল শ্বশুরের কথা শুনে। লোকটার জ্বালায় সে এখন ভালো করে প্রেমটাও করতে পারবে না? দুদিন আগেও তো ভালো ছিল, আর আজ আব্বু বলে ডেকেছে বলে কত গুলো কথা শুনিয়ে দিল।

স্বার্থ নিশাকে এমন ভাবে প্যাঁচিয়ে ধরেছে যে,নিশার ছোট ছোট হাত দুটো ওর বুকে মৃদু ধাক্কা দিলেও স্বার্থের অটল চাউনি দেখে সে থমকে গেল। স্বার্থ ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে এক বুক নিশ্বাস টেনে নিয়ে শুধোয়,
“তোর আব্বুর ভয় দেখাচ্ছিস? এই যে কাল বৃষ্টি হলো, আজ আকাশ পরিষ্কার—এমন মায়াবী রাতে তোকে ছাড়া থাকা মানে নিজের উপর জুলুম করা। সকালে দেখা করলে কী আর এই চাঁদের আলোয় তোকে এমন স্নিগ্ধ দেখাত?”

নিশা অসহায় দৃষ্টি মেলল।
“তুমি আসলেই একটা আস্ত পাগল! এখন কী আদর করার সময়? ছাড়ো বলছি।”

স্বার্থর কণ্ঠস্বর তখন আবেগে থৈ থৈ করছে, “জানিস নিশা, মাঝে মাঝে রাতে যখন ঘুম আসে না, তখন আমি চোখ বুজে আমাদের ভবিষ্যতের একটা ছবি দেখি। আমাদের ছোট্ট একটা সাজানো ঘর থাকবে। সেখানে একপাল পুঁচকে ছেলেমেয়ে আমাদের দুজনকে ঘিরে হুলস্থুল করবে। কেউ তোর আঁচল টানবে, কেউ আমার চুল ধরে ঝুলবে। আমাদের বাচ্চাগুলো দেখতে একদম তোর মতো হবে—এমনই গোলগাল মুখ আর ড্যাবড্যাব করা মায়াবী চোখ।”

স্বার্থর মুখে বাচ্চাকাচ্চার গল্প শুনে নিশা লজ্জা পেল। সে স্বার্থর বুকে মুখ লুকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“ছিঃ স্বার্থ ভাই! এসব কী কথা? আমরা এখনও বিয়ে করিনি আর তুমি এখনই বাচ্চার বাপ হওয়ার খোয়াব দেখছ? লজ্জা করে না?”

স্বার্থ নিশার কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বিয়ের আগে খোয়াব না দেখলে বিয়ের পর সেগুলো সত্যি করা যায়, সোনা? আর এই যে তুই আমায় ‘ভাই’ বলে ডাকলি, এর শাস্তি কিন্তু তোকে এখনই পেতে হবে। বাচ্চার বাপ হওয়ার আগে তোর এই মুখটা আগে বন্ধ করা দরকার।”

নিশা লজ্জায় ছটফট করে উঠল। স্বার্থর চওড়া বুকের উপর ছোট ছোট কিল মেরে অস্ফুট স্বরে বলল,
“অসভ্য লোক! ছাড়ো আমাকে। কেউ দেখে ফেললে কাল সকালেই আমার জানাজা পড়তে হবে।”

স্বার্থর দৃষ্টিতে গভীর নেশা গাঢ় হয়ে এলো। নিশা কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্বার্থ ঝটপট ওর দুহাত পিঠের পেছনে নিয়ে এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরল। নিশা অপ্রস্তুত হয়ে হাঁসফাস করে উঠল,
“স্বার্থ ভাই, কী করছ? লাগছে তো! ছাড়ো বলছি!”

স্বার্থ কথা শুনল না। নিশার ছটফটানি উপেক্ষা করে ওকে চেপে ধরল। নিশার অবাধ্য চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় ওর মুখে এসে পড়ছে। স্বার্থ অন্য হাত দিয়ে নিশার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। নিশা চোখ বন্ধ করে প্রবল ভাবে মাথা নাড়িয়ে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু স্বার্থ আজ নাছোড়বান্দা।
ওর তপ্ত নিশ্বাস নিশার নাসিকা দ্বারে আছড়ে পড়তেই নিশা স্থির হলো । স্বার্থ আজ অনুমতি ছাড়াই নিশার কাঁপতে থাকা ঠোঁটে নিজের অধর ডুবিয়ে দিল। প্রথমে নিশা শক্ত হয়ে থাকলেও স্বার্থর সেই গাঢ় আর গভীর ছোঁয়ায় সে নিস্তেজ হয়ে এলো। বৃষ্টির পর জমে থাকা ঠাণ্ডা বাতাসেও নিশার সারা শরীর যেন আগুনের মতো জ্বলছিল।
স্বার্থ অনেকটা সময় নিয়ে নিশাকে নিজের করে আগলে রাখল। নিশার হাতের মুঠি তখন স্বার্থের শার্টের পিঠের দিকটা খামচে ধরেছে। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে সেই ছাদের কোণে। দীর্ঘক্ষণ পর স্বার্থ যখন ওর ঠোঁট জোড়া মুক্তি দিল, নিশা তখন জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, চোখের পাতায় লেগে আছে একরাশ আবেশ আর লজ্জা।
স্বার্থ নিশার কপালে চুমু খেয়ে মুচকি হেসে শুধোয়,
“এখন বল, বাচ্চার বাপ হওয়ার খোয়াব দেখাটা কী খুব অপরাধের?”

নিশা উত্তর দিতে পারল না, লাজে ডুকরে উঠল। স্বার্থ ঠোঁট টিপে হাসল। হঠাৎ ছাদের দরজার সামনে থেকে এক ভারী পুরুষালী কণ্ঠস্বরে ডাক দিল কেউ।
“এই সময়ে ছাদে কে এসেছে?”

মাশফিক চৌধুরীর গলা শুনে নিশা কান্না রেখে স্বার্থর মুখ চেপে ধরল। ওরা যেহেতু ছাদের কিনারায় ছিল তাই তাদের দেখা যাবে না দরজার কাছ থেকে। স্বার্থ বিরক্ত হয়ে নিশার হাত মুখের উপর থেকে ছাড়িয়ে দাঁত পিষল।
“তোর বাপ-ভাই কেউ শান্তি দিল না আমাকে। শালার একটা প্রেমই তো করছি নাকি?”

নিশা আতঙ্কে ফের মুখ চেপে ধরল। মাশফিক চৌধুরী এদিক ওদিক কাউকে না পেয়ে কলে কথা বলায় ব্যস্ত হলেন।

••

জায়গাটার নাম ঠিক বলতে পারল না নিধি। গুলশান থেকে তারা বেশ দূরে এসেছে। সাহস করে প্রেমের হাত ধরে বের হলেও এখন বড্ড ভয় হচ্ছে। প্রেম পাশের দোকান থেকে একটা পানির বোতল এনে নিধির কোলের উপর রেখে বসল পাশে। তাদের থেকে কিছুটা দূরে একটা কাপল বসে ছিল। দেখে মনে হচ্ছে নতুন বিয়ে হয়েছে। নিধি সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে পানি খেল। প্রেম ফোনে সময় দেখে নিয়ে বলল,
“ম’রার আগে তোর শেষ ইচ্ছে কী?”

নিধি হকচকিয়ে তাকাল। হতভম্ব গলায় জিজ্ঞেস করল,
“মানে?”

“মানে, তোর ম’রার আগে শেষ ইচ্ছা কী? যেটা তুই পূরণ করে যেতে চাস।”

নিধি শুকনো ঢোক গিলে প্রেমের একহাত চেপে ধরে মিনমিন করে বলক
“আপনি আমায় মে’রে ফেলতে চাচ্ছেন?”

প্রেম ঠোঁট চেপে টেবিলের উপর রাখা নিধির ফোন হাতে নিয়ে নিধির সামনে ধরল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে সোহানের নাম। কল দিয়েই যাচ্ছে ছেলেটা। নিধি শুকনো ঢোক গিলে দূরুত্ব বাড়াল।
“আমি জানি না উনি কেন কল করছেন।”

প্রেম শান্ত স্বরে শুধোয়,
“রিসিভ করে কথা বল।”

নিধি ভীতু হয়ে মাথা নিচু করল। প্রেম এক ধমক দিতেই নিধি কল রিসিভ করল। প্রেম স্পিকারে দিয়ে ইশারা করল কথা বলতে। নিধি শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে সোহান বোধহয় হাসল। হেসে বলল,
“আপনাকে কী বিরক্ত করলাম নিধি?”

নিধি আড়চোখে প্রেমের শান্ত চাহনি দেখে বলল,
“কিছু বলবেন?”

“আপনার কথা মনে পড়ছিল খুব।”

“ওহ!”

“একটা কথা বলার ছিল।”

“বলুন।”

“আগামী সপ্তায় ঢাকা আসছি। আপনার সাথে একবার দেখা করতে চাই বিয়ের আগে।”

নিধি আড়চোখে প্রেমের দিকে তাকাল। প্রেমের চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি অস্বাভাবিক শান্ত—যা নিধির জন্য আরও বেশি ভয়ের। প্রেম ইশারায় নিধিকে কথা চালিয়ে যেতে বলল।
নিধি তোতোলাতে শুরু করল,
“আ… আগামী সপ্তাহে? কিন্তু হঠাৎ?”

ওপাশ থেকে সোহান বেশ উৎসাহের সাথে বলল,
“হঠাৎ না নিধি, আমাদের বিয়ের তো খুব বেশি দেরি নেই। ভাবলাম সামনাসামনি বসে একটু কথা বলা যাবে, আপনাকে আরও ভালো করে চিনি। তাছাড়া আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজও আছে।”

নিধির হাত কাঁপছে। প্রেমের স্থির দৃষ্টি যেন ওর কলিজার পানি শুকিয়ে দিচ্ছে। নিধি কোনোমতে বলল,
“আচ্ছা, পরে কথা বলি? আমি এখন একটু ব্যস্ত।”

“ব্যস্ত? এই রাত ১২টায়? কোথায় আপনি?” সোহানের গলায় এবার কিছুটা কৌতূহল।
নিধি অসহায় চোখে প্রেমের দিকে তাকাল। কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা কান থেকে সরিয়ে নিয়ে কলটা কেটে দিল। ফোনের স্ক্রিনটা কালো হয়ে যেতেই নিস্তব্ধতা যেন ভারী হয়ে উঠল। প্রেম এখনো একইভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে—সেই শান্ত, পাথরের মতো চাউনি।
প্রেম খুব নিচু স্বরে, দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করল,
“সোহানকে তোর পার্সোনাল নাম্বারটা কে দিয়েছে, নিধি?”

নিধি উত্তর দিল না। ভয়ে ওর জিব যেন তালুর সাথে আঁটকে গেছে। সে মাথা নিচু করে নিজের আঙুল কচলাতে লাগল। প্রেমের চোখের মণি দুটো রাগে চিকচিক করছে। সে আবার বলল,
“কথা কানে যাচ্ছে না? আমি জিজ্ঞেস করেছি ওই লোক তোর নাম্বার পেল কোথায়? তুই নিজে দিয়েছিস?”

নিধি এবারও নীরব। নিস্তব্ধতা সহ্য করতে না পেরে প্রেম হঠাৎ সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। নিধি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাতাসের বেগে প্রেমের হাতটা আছড়ে পড়ল নিধির বাম গালে।
চড়ের শব্দে আশেপাশের দু-একজন তাদের দিকে তাকাল। নিধি টাল সামলাতে না পেরে পাশের চেয়ারে গিয়ে ধাক্কা খেল। মুহূর্তের মধ্যে ওর ফরসা গালে প্রেমের পাঁচ আঙুলের দাগ বসে লাল হয়ে উঠল। নিধির চোখের কোণে জমে থাকা জল এবার আর বাঁধ মানল না, ডুকরে কান্না ছিঁটকে বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে।
“কাঁদছিস কেন? সোহানের সাথে কথা বলার সময় তো খুব আহ্লাদ হচ্ছিল। এখন সোহান এসে বাঁচাক তোকে! উত্তর দিবি, নাকি আরেকটা দেব?”

নিধি হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আম… আমি দিইনি। মাহি দিয়েছে। বিশ্বাস করুন, আমি উনার সাথে কথা বলতে চাইনি।”

প্রেম নিধির চিবুকটা জোরে চেপে ধরে বলল,
“মাহি দিয়েছে তো কী হয়েছে? তুই কেন কথা বলিস? তোকে কী আমি মানা করিনি যে আমার অবর্তমানে কারো সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবি না? আমার কথার কী কোনো দাম নেই তোর কাছে?”

(আজ ২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করবেন।😒 রিচ লাখ থেকে হাজারে চলে আধছে রেগুলার হয়ে। আগামী পর্ব থেকে সব জুটিকে রাখার চেষ্টা করব।)

চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply