Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪০


প্রেমবসন্ত ।৪০।

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

মাথার উপর সূর্যটা তখন হেলে পড়েছে।রিসোর্টের গ্রাউন্ড ফ্রোরে এসে দাঁড়িয়ে আছে শেহের।সাথে অবশ্য প্রেমও আছে।তারা অপেক্ষা করছে সবার জন্য।শেহের লাগাতার অর্ণকে কল করে যাচ্ছে,অথচ হতচ্ছাড়া কল ধরছেই না।

অর্ণর ঘরে অর্ণ তখনও ঘুমে।ছোট্ট বউটাকে চেপে ধরে ঘুমাচ্ছে।কিন্তু ঘুম নেই কায়নাতের চোখে।মেয়েটা দাঁত চেপে শুয়ে আছে।এত ভারী একটা মানুষ শরীরের উপরে সহ্য হচ্ছে না তার।একদিকে ফোন বাজছে তো অন্যদিকে অর্ণর কোনো সাড়া শব্দ নেই।কায়নাতের নড়াচড়ায় বোধহয় অর্ণ বিরক্ত হলো খানিক।ঘুমের ব্যঘাত ঘটতেই ধমকে উঠল সে,
“কী সমস্যা?বিরক্ত করছ কেন?”

কায়নাত ফুঁপিয়ে উঠল।ওকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করে বলল,
“আপনি কী মানুষ?আমার হাড়গোড় ভেঙে যাচ্ছে।”

অর্ণ কপাল কুঁচকে উঠে বসল বিছানায়।ফোন হাতে নিয়ে রিসিভ করে দাঁত চেপে বলল,
“তোর পেছনে জ্বলছে?কল করে বিরক্ত করছিস কেন?”

ওপাশ থেকে শেহের বলল,
“তুই তো রোমান্স করার মানুষ না।বিরক্ত করলেই বা কী?সবাই না আজ বিকেলে বের হব?রেডি তুই?”

অর্ণ একপলক কায়নাতের দিকে তাকাল। কায়নাতের চুলগুলো এলোমেলো, চেহারায় আগের সেই বিধ্বস্ত ভাবটা নেই, বরং এক ধরণের শান্ত অভিমান খেলা করছে। অর্ণ ফোন কানে রেখেই বলল,
“দশ মিনিট। নিচে আসছি।”

ফোনটা রেখে অর্ণ কায়নাতের দিকে হাত বাড়াতেই সে পিছিয়ে গেল। অর্ণর শান্ত দৃষ্টিতে এক ধরণের গভীরতা ফুটে উঠল। সে কায়নাতের গালের কাছে জমে থাকা একগুচ্ছ চুল কানে গুঁজে দিয়ে নরম গলায় বলল,
“এখন কী শরীর একটু ভালো লাগছে? না কী এখনও বাহানা করবে?”

কায়ানাত মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“আমি কোনো বাহানা করছি না। আপনি সত্যিই খুব নিষ্ঠুর।”

অর্ণ হালকা হাসল।
“আমি নিষ্ঠুর হলে তুমি এখন এখানে এভাবে বসে থাকতে পারতে না। ওঠো, ফ্রেশ হয়ে নাও। শেহেররা নিচে অপেক্ষা করছে। বিকেলের রোদটা বেশ মিষ্টি, বাইরে গেলে মন ভালো হয়ে যাবে তোমার।”

কায়ানাত দেখল অর্ণ এখন বেশ স্বাভাবিক আচরণ করছে। সে ধীরপায়ে বিছানা থেকে নামল। শরীরটা আগের চেয়ে অনেকটা হালকা লাগছে ওর। হয়তো দুপুরের সেই ঔষধ আর খানিকটা ঘুম ওর শরীরে শক্তি ফিরিয়ে এনেছে।
কায়ানাত ওয়াশরুমে যাওয়ার আগে একবার আয়নায় নিজের দিকে তাকাল। ওর গলার কাছে সেই নীলচে দাগটা এখনো ম্লান হয়নি। অর্ণর এই রহস্যময় চরিত্রটা বোঝা সত্যিই কঠিন। সে কখনো ঝড়ের মতো উত্তাল, আবার কখনো বিকেলের মিষ্টি রোদের মতো শান্ত।

অর্ণ ফোনটা বিছানায় আছড়ে ফেলে দিয়ে কায়ানাতের দিকে একবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। কায়ানাতের সারা শরীরে এখন অর্ণর দেয়া ‘চিহ্ন’। গলার নিচ থেকে শুরু করে হাতের কবজি, এমনকি গাল আর থুতনিতেও কালশিটে দাগগুলো এমনভাবে ফুটে আছে যে ও আয়নায় নিজের দিকে তাকাতেও লজ্জা পাচ্ছে। অর্ণ শরীরের কোনো জায়গাই বাকি রাখেনি।
অর্ণ ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে নিজের শার্ট ঠিক করতে করতে আয়নায় কায়ানাতকে দেখল। অর্ণ বলল,
“দশ মিনিটের মধ্যে নিচে এসো। শেহের আর প্রেম ওয়েট করছে। দেরি করো না।”

কায়ানাত মনে মনে গালি দিল লোকটাকে। এত কিছুর পর অর্ণর গলায় একটুও অনুশোচনা নেই। আয়নায় নিজের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে ওর কান্না পাচ্ছে। এই অবস্থায় কারো সামনে যাওয়া মানেই নিজের ইজ্জত বিলিয়ে দেয়া। কায়ানাত দ্রুত আলমারি খুলে ওর কালো বোরকা আর নিকাবটা বের করে নিল। আজ রোদ থাকুক বা গরম, এই বোরকা আর নিকাব ছাড়া ওর মুক্তি নেই। নিকাব দিয়ে মুখটা এমনভাবে বাঁধল যাতে শুধু চোখ দুটো দেখা যায়।

অর্ণ নিচে যাওয়া বাদ দিয়ে কায়নাতের দিকে একপলক তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা বোরকা আর নিকাব পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখ দুটো ঠিক করে নিচ্ছে। বোরকাটা কায়নাত সবসময়ই পরে, তাই এটা কারও কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু আজ এই কালো বোরকা আর নিকাব পরার পেছনে কারণটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অর্ণ কাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত কায়নাতের শরীরের একটা জায়গাও বাকি রাখেনি; ঘাড়, গলা, এমনকি গালের পাশেও দাঁত আর ঠোঁটের গাঢ় দাগ বসিয়ে দিয়েছে। বোরকার আড়ালে আজ কায়নাত সেই ‘চিহ্ন’গুলোই লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
নিচে রিসোর্টের গ্রাউন্ড ফ্লোরে শেহের আর প্রেম তখন অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। সাথে উপস্থিত সবাই। অর্ণকে নামতে দেখে শেহের মুখ ঝামটা দিয়ে বলল,
“কিরে শালা! দশ মিনিট বলে আধঘণ্টা পার করে দিলি?”

অর্ণ পকেটে হাত দিয়ে নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে রইল। ওর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত গাম্ভীর্য। শেহেরের কথার উত্তর না দিয়ে সে অর্ণর পেছনে তাকাল।
কায়নাত নিকাবের আড়ালে নিজের ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে অর্ণর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ওর শরীর তখনো মৃদু ব্যথায় থরথর করে কাঁপছে। অর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কায়নাতের বাহুটা জড়িয়ে ধরল। ওর বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শে কায়নাত শিউরে উঠল।
স্বার্থ আড়চোখে অর্ণর হাতের দিকে তাকাল। অর্ণর কবজিতে নখের হালকা কিছু আঁচড় এখনো স্পষ্ট। সে মুচকি হেসে নিচু স্বরে বলল,
“ঠান্ডা না কি অন্য কিছু তা তো বোঝা যাচ্ছে না। তবে অর্ণর শার্টের হাতা আজ একটু বেশিই নিচে নামানো মনে হচ্ছে!”

অর্ণ স্বার্থকে রাগী চাউনি দিয়ে থামিয়ে দিল। কায়নাত বোরকার আড়ালে নিজের লজ্জা ঢাকলেও অর্ণর হাতের ওই বাঁধন থেকে নিস্তার পেল না।
বিকেলের মিষ্টি রোদে যখন তারা রিসোর্টের বাইরে পা রাখল, শেহের আগে আগে হাঁটতে শুরু করল।দুষ্টু আদি তার সাথে। পেছনে নিশা আর স্বার্থ কিছু নিয়ে ফিসফিস করছে নিজেদের মধ্যে। আবার অন্যদিকে প্রেম আর নিধি। শুধু বাকি আছে আদাল। সে চুপি চুপি জারার পাশে হাঁটছে। সবাই সেখানে থাকলেও উপস্থিত নেই নাজনীন আর জয়া। নাজনীন বউকে নিয়ে আলাদা করে ঘুরতে বের হয়েছে একান্ত সময় কাটাতে। ব্যবস্থা অবশ্য অর্ণই করে দিয়েছে। বেয়াদব শালীটা কাছে থাকলে তারই ঝামেলা হয়। নিজে তো জামাইয়ের কথা শুনবেই না, আবার বড় বোনের ফাঁকা মাথাটা চিবিয়ে খাবে। হতচ্ছাড়ি শালী। অর্ণর সেই সুখ বোধহয় বেশিক্ষণ টিকল না। ওরা বড় গাড়িতে ওঠার ঠিক মিনিট তিনেক আগে পাশের চৌরাস্তা থেকে জয়া আর নাজনীনকে আসতে দেখা গেল। কায়নাত তখন ছোট বাসটার জানালা ঘেঁষে বসেছিল। অর্ণ গাড়িতে ওঠার আগেই জয়া হুড়মুড়িয়ে দৌঁড়ে এসে অর্ণকে বলল,

“দুলাভাই, সরুন দেখি। আমি আমার বোনের কাছে যাব।”

অর্ণ হতভম্ব হয়ে জয়ার দিকে তাকাল। এই মেয়েকে না সে নাজনীন ভাইয়ের সাথে পাঠাল? আবার কোত্থেকে উড়ে এলো? অর্ণর কপালে বিরক্তির ভাঁজ স্পষ্ট। জয়া যেভাবে অর্ণকে সরিয়ে দিয়ে কায়নাতের পাশে গিয়ে বসল, তাতে অর্ণর ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে গাড়ি থেকে আছাড় দিতে। জয়া তখন খুশিতে ডগমগ হয়ে কায়নাতের হাত জড়িয়ে ধরেছে। কায়নাতও বোনকে কাছে পেয়ে নিকাবের আড়ালে হেসে কুটিপাটি, কাল রাতের আর আজ সকালের সব যন্ত্রণা যেন মুহূর্তেই উধাও।
অর্ণর ঠোঁটে গা জ্বালানো হাসি ফুটে উঠল। তৎক্ষণাৎ পিছু ফিরল। দেখল নাজনীন পকেটে হাত দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। অর্ণ বাঁকা স্বরে বলল,
“কী ব্যাপার নাজনীন ভাই? তোমাকে না দায়িত্ব দিয়ে পাঠালাম তোমার বউকে নিয়ে আলাদা কোথাও ঘুরতে যেতে, একটু একান্ত সময় কাটাতে? তো, এই পাগলটাকে নিয়ে আবার এখানে ফিরে এলে কেন? আমার শান্তি কী তোমার সহ্য হচ্ছে না?”

নাজনীন কপাল কুঁচকে অর্ণর দিকে এক পা এগিয়ে এলো।
“শোন অর্ণ, আমার বউকে আবার ‘পাগল’ বলার আগে নিজের বউটার দিকে তাকিয়ে দেখ। ওটা তো আরেক পাগল।”

অর্ণ নাজনীনের পাল্টা যুক্তি শুনে হালকা কেঁশে উঠল। নাজনীন ভুল বলছে না। সে নাজনীনকে পাত্তা না দিয়ে সোজা জয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জয়া তখন কায়নাতের হাত জড়িয়ে ধরে বেশ আয়েশ করে বসেছে। অর্ণ নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব গম্ভীর আর ভারী করে জয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“শোনো জয়া, ভদ্র মেয়ের মতো নিজের স্বামীর কাছে গিয়ে বসো। নাজনীন ভাই একা বসে আছেন।”

জয়া কায়নাতের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“উঁহু, একদম না! আমি আমার বোনের কাছেই বসব। আপনি বরং আপনার ভাইয়ের কাছে গিয়ে বসুন। আমরা দুই বোন অনেকদিন পর সুযোগ পেয়েছি, এখন আমাদের মাঝখানে আসবেন না কিন্তু!”

অর্ণ হতভম্ব হয়ে একবার কায়নাতের দিকে তাকাল। কায়নাত নিকাবের আড়ালে চোখ নামিয়ে রেখেছে। জয়া কায়নাতের কাঁধে মাথা রেখে আড়চোখে অর্ণকে দেখে মুখ টিপে হাসল। অর্ণ দেখল নাজনীন দূর থেকে দাঁত বের করে হাসছে, যেন বলতে চাইছে— “কেমন বুঝলি?”
অর্ণ আর কথা বাড়াল না। সে জানে এই বেয়াদব শালীকে বলে লাভ নেই। সে কায়নাতের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে গটগট করে সামনের সিটে গিয়ে বসল। কায়নাত বোরকার ভেতর থেকে দেখল অর্ণর কান দুটো রাগে লাল হয়ে আছে।
পুরো গাড়ি হাসাহাসিতে মেতেছে, আর জয়া কায়ানাতের হাত ধরে এমনভাবে বসে আছে যেন তাকে এই সিট থেকে সরানো অসম্ভব। কিন্তু অর্ণ চৌধুরী হার মানার পাত্র নয়। তার ডিকশনারিতে ‘হার’ শব্দটা নেই, বিশেষ করে নিজের বউয়ের ব্যাপারে তো নয়ই।
গাড়িটা মিনিট পাঁচেক চলার পর হঠাৎ একটা পাহাড়ি মোড় আসতেই অর্ণ চালককে ইশারায় গাড়ি থামাতে বলল। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শেহের পেছন থেকে বলে উঠল,
“কী হলো অর্ণ? গাড়ি থামালি কেন? কোনো সমস্যা?”

অর্ণ গম্ভীর মুখে সিট থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর জয়ার দিকে তাকিয়ে একদম সোজাসুজি বলল,
“জয়া, তুমি বরং নাজনীন ভাইয়ের কাছে যাও। উনার নাকি একটু খারাপ লাগছে, মাথা ঘুরছে। উনি তোমায় ডাকছেন।”

নাজনীন অবাক হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“দুই পাগল এক জায়গায় হয়েছে থাকতে দে ভাই। আমার মাথার চুল এমনিতেই পেকে গেছে।”

অর্ণ দাঁত চাপল। জয়া সরল মনে নাজনীনের দিকে তাকাতেই দেখল নাজনীন কাষ্ঠহাসি দিচ্ছে। জয়া ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
“ওমা! নাজনীন ভাইয়া অসুস্থ? কই আগে বলবেন তো!”

জয়া তড়িঘড়ি করে কায়ানাতের হাত ছেড়ে নাজনীনের সিটের দিকে এগিয়ে গেল। কায়নাত তখনো কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। জয়া সিট ছাড়তেই অর্ণ কথা না বাড়িয়ে বিদ্যুৎবেগে এসে কায়নাতের পাশের খালি সিটটা দখল করে বসল। কায়নাত বড় বড় চোখ করে অর্ণর দিকে তাকাল।
অর্ণ চালককে আবার গাড়ি চালাতে বলে আয়েশ করে হ্যালান দিয়ে বসল। ওরা মূলত জারার বাবার বাংলো বাড়িতে যাচ্ছে। আজ রাত সেখানে থাকবে। গাড়ি যখন জারার বাবার বাংলো বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন বাড়ির দারোয়ান দৌঁড়ে এসে জারাকে দেখে বলল,

“ভালো আছো আম্মু?”

জারা মুচকি হেসে জবাবে বলে,
“ভালো আছি চাচা। আপনাকে বলেছিলাম বাড়ি পরিষ্কার করতে। করেছেন কী?”

“জি। সব কাজ শেষ। রাতের খাবার বসানো হবে একটু পরেই।”

ওরা সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকল। বিশাল বড় বাড়ি। চারপাশে ফুলের বাগান। আদি দৌঁড়ে গেল সেই বাগান দিকে। লাইটের আলোয় সব কিছুই স্পষ্ট। আদি বাগানের মধ্যে গিয়ে পা দাঁপিয়ে শেহেরকে বলল,
“ও বাবা, আমার প্যান্ট এর চেইন খুলে দাও।”

নুসরাত মুখ কুঁচকে ফেলল। শেহের ঠোঁট টিপে হেসে এগিয়ে গিয়ে ওকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়ে বলল,
“ভেতরে ওয়াশরুম আছে। চল নিয়ে যাই।”

ওরা সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকল। জারার বাবার এই বাংলোবাড়িটি যেন অরণ্যের গভীরে লুকানো এক রাজকীয় নিস্তব্ধতা। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই বিশাল এক হলের মতো ড্রয়িংরুম, যার উচ্চতা সাধারণ ঘরের দ্বিগুণ। ছাদ থেকে ঝুলে থাকা দামী ঝাড়লণ্ঠনের মৃদু সোনালী আলোয় ধবধবে সাদা মার্বেল পাথরের মেঝেটা আয়নার মতো চিকচিক করছে। দেয়ালের একপাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো দামী ওক কাঠের আসবাবপত্র আর অন্যপাশে বিশাল এক কাঁচের দেয়াল, যার ওপাশেই আদি যেখানে লাফালাফি করছিল সেই বাগানটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ড্রয়িংরুমের মাঝখান দিয়ে একটা প্যাঁচানো কাঠের সিঁড়ি উপরের তলায় উঠে গেছে। সিঁড়ির রেলিংগুলোতে হাত দিলে এক ধরণের প্রাচীন আভিজাত্য অনুভব করা যায়। উপরতলার করিডোর থেকে নিচে তাকালে পুরো বাড়িটাকে একটা ছবির মতো মনে হয় । ড্রয়িংরুমের বড় স্লাইডিং দরজাগুলো খোলা থাকায় বাগানের কামিনী আর রজনীগন্ধার তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণ হু হু করে ভেতরে ঢুকে পড়ছে। বাগানের লাইটের আলো আর চাঁদের আলো মিলেমিশে এক মায়াবী ছায়া তৈরি করেছে পুরো অন্দরমহলে । ড্রয়িংরুমের বাম পাশে একটা লম্বা বারান্দা পার হলেই বিশাল ডাইনিং টেবিল। চাচা টেবিলটা ঝকঝকে করে মুছে রেখেছেন। উপরের জানালা দিয়ে রাতের আকাশ আর নক্ষত্রপুঞ্জ সরাসরি দেখা যাচ্ছে।
কায়নাত বোরকার ভেতর থেকে বড় বড় চোখে এই রাজপ্রাসাদতুল্য বাড়িটা দেখছিল। প্রতিটি কোণায় যেন আভিজাত্য আর রুচির ছাপ। কিন্তু তার এই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ টিকল না। অর্ণ সবার আড়ালে ওর একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল। কায়নাত অনুভব করল অর্ণর বলিষ্ঠ শরীরের উষ্ণতা ওর নিকাব ভেদ করে ত্বকে এসে লাগছে।
অর্ণ কায়নাতের কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে গম্ভীর স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,
“বাড়িটা পছন্দ হয়েছে মিসেস অর্ণ? আজ রাতটা কিন্তু এই বিশাল বাংলোর কোনো এক নির্জন ঘরে আপনার সাথেই কাটবে।”

কায়ানাত শিউরে উঠে অর্ণর হাত থেকে নিজের বাহু ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু অর্ণর হাতের বাঁধন যেন আরও দৃঢ় হলো। কায়নাত অসহায় চোখে একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখল সবাই যে যার মতো ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত। কেউ তাদের এই গোপন খুনসুটি লক্ষ্য করছে না। মেয়েটার মনে হলো পুরুষ মানুষ নারী সঙ্গের পর বড্ড বেহায়া হয়ে যায়।

আদি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বলল,
“ও জারা আন্টি! এখানে কী ভূত আছে? ঘরটা এত বড় কেন?”

জারার হাসির শব্দে বাংলোর নিস্তব্ধতা খানিকটা ভাঙল। কিন্তু কায়নাতের বুকের ভেতরটা তখন ধকধক করছে। রাতের বাংলোবাড়িটা যেন এক মায়াবী রূপকথা। জারার চাচা বাগানের মাঝখানে ডিনারের রাজকীয় আয়োজন করেছেন। ঘাসের উপর বড় একটা কাঠের টেবিল পাতা হয়েছে, যার উপর ধবধবে সাদা টেবিল ক্লথ বিছানো। বাগানের চারপাশের কামিনী আর রজনীগন্ধার তীব্র সুবাস রাতের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। উপরের আকাশটা আজ পরিষ্কার, এক ফালি চাঁদের আলো সরাসরি ডাইনিং টেবিলের উপর এসে পড়ছে।
সবাই গোল হয়ে বসলেও অর্ণ ঠিক কায়নাতের পাশের চেয়ারটা দখল করে বসল। কায়নাত এখনো তার সেই কালো বোরকা আর নিকাবে নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছে। তার অস্বস্তি আর লজ্জা যেন কিছুতেই কমছে না। একদিকে বাগানের এই স্নিগ্ধ পরিবেশ, অন্যদিকে অর্ণর বলিষ্ঠ শরীরের উষ্ণতা তার একদম গা ঘেঁষে।
আদি চিকেন লেগ পিস চিবোতে চিবোতে চিৎকার করে বলল,
“ও মা! এখানে বসে খেতে খুব মজা! মনে হচ্ছে আমরা জঙ্গলের রাজা-রানি।”

অর্ণ সবার অলক্ষ্যে তার বাম হাতটা টেবিলের নিচে কায়নাতের থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতের উপর শক্ত করে চেপে ধরল। কায়নাত চমকে উঠে অর্ণর দিকে তাকাল। নিকাবের আড়ালে তার কাজল কালো চোখ দুটো তখন বিস্ময়ে বিস্ফারিত।
অর্ণ শান্ত গলায়, সবার সামনেই কায়নাতের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“নিকাবটা খোলো। এখানে সবাই নিজের মানুষ, আর খাওয়ার সময় এভাবে থাকলে তো খেতে পারবে না।”

কায়ানাত আমতা আমতা করে বলল,
“না… থাক না। আমি এভাবেই খাব।”

অর্ণর চোয়ালটা এবার শক্ত হয়ে এলো। সে কায়নাতের হাতের উপর নিজের চাপ বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“আমি কী বলেছি তোমাকে? নিকাবটা সরাও।”

কায়ানাত দেখল জয়া আর নিশা আড়চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে। জয়া টিপ্পনী কেটে বলল,
“কী দুলাভাই? আমার বোনকে বুঝি এক মুহূর্তও চোখের আড়াল করতে পারছেন না?”

অর্ণ জয়াকে একটা রাগী চাউনি দিয়ে থামিয়ে দিল। কায়নাত উপায় না পেয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে নিজের নিকাবটা আলগা করল। চাঁদের আলোয় কায়নাতের সেই বিধ্বস্ত মায়াবী মুখটা ফুটে উঠতেই অর্ণর দৃষ্টি স্থির হলো।
অর্ণ নিজের প্লেট থেকে এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে কায়নাতের ঠোঁটের কাছে ধরল। কায়নাত লজ্জায় জড়সড় হয়ে সবার দিকে একবার তাকাল। অর্ণর চোখেমুখে কোনো সংকোচ নেই।
“খাও।”

বাগানের এই শীতল রাতেও কায়নাতের সারা শরীর ঘামতে শুরু করল। সে বুঝতে পারছে, ডিনারের এই পরিবেশটা কেবল শুরু মাত্র; রাতটা তো এখনো বাকি।

(রেসপন্স করবেন সবাই।লেখালেখিতে মন বসছে না আমার।আপনাদের সাপোর্ট দরকার।)

চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply