প্রেমবসন্ত_২ ।৩৭।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
নুসরাত ঠোঁট কামড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।শাওন মেকি হাসল।শেহের সেই হাসি দেখ বলল,
“শুনলাম তোমার নাকি ডিভোর্স হচ্ছে শিগগিরই?”
শাওন শান্ত গলায় বলে,
“দিচ্ছি।”
“আবার নুসরাতকে ঘরে তুলতে চাইছ নাকি?”
“তা তো চাইছি।যতই হোক,মানুষ মাত্রই ভুল।তা ছাড়া আমার সন্তানের মা সে।”
শেহের হাত মুঠো বন্দি করল রাগে।নুসরাত ভয় পাচ্ছে।শেহেরের রাগ দেখেই ভয় হচ্ছে তার।শাওন বাঁকা হাসল।সে নুসরাতের দিকে ফিরে আদুরে গলায় বলল,
“চলো,আদি আর তোমাকে নিয়ে আজ একটু ঘুরে আসি।”
নুসরাত চোয়াল শক্ত করে বলল,
“তুমি তোমার লিমিটে থাকো শাওন।আদির সাথে দেখা করতে চেয়েছিলে,করেছ।আর কী চাই?আমার পিছু কেন ছাড়ছ না?তুমি আদির বাবা,তাই চাইলেও আমি কিছু করতে পারি না।তার মানে এই নয় আমি আমার প্রাক্তনের সাথে হেলে-দুলে ঘুরে বেড়াব।”
নুসরাতের স্পষ্ট কথাগুলো তাকে অপদস্থ করেছে, আর সেই অপমান ঢাকতেই সে আরও হিংস্র হয়ে উঠল। নুসরাতের চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“লিমিট? আমাকে লিমিট শেখাচ্ছ নুসরাত? ভুলে যেয়ো না, আজ তুমি যে আদিকে নিয়ে এত বড় বড় কথা বলছ, সেই আদির উপর আইনি অধিকার আমারও আছে। তুমি কী চাও আমি কোর্টে গিয়ে দাঁড়াই? বাচ্চার কাস্টডি নিয়ে টানাটানি শুরু করি?”
নুসরাত আর্তনাদ করে উঠল,
“তুমি এতটা নিচে নামতে পারবে শাওন? নিজের সন্তানের মানসিক অবস্থা একবারও ভাববে না?”
শাওন তাচ্ছিল্যভরে বলল।
“আমি আমার কথা ভাবছি নুসরাত।আদি আমার রক্ত। তাকে তোমার মতো একজন স্বার্থপর মহিলার কাছে আমি ছেড়ে দেব না, যে কিনা ডিভোর্সের রেশ কাটতে না কাটতেই অন্য পুরুষের ছায়ায় আশ্রয় খোঁজে।”
নুসরাত চেঁচিয়ে উঠল,
“মুখ সামলে কথা বলো শাওন! তুমি জানো আমি কেন তোমাকে ছেড়েছিলাম। তোমার ঐ মেকি ভদ্রতার আড়ালে কী ছিল সেটা আমি ভুলিনি।”
শাওন গলার স্বর নিচু করে অথচ বিষাক্ত ভঙ্গিতে বলল,
“ভুলো না নুসরাত, তুমি আদিকে নিয়ে আমার অবর্তমানে ঘুরে বেড়াবে আর আমি সেটা চেয়ে চেয়ে দেখব, অতটা উদার আমি নই। হয় তুমি নিজে থেকে আমার ঘরে ফিরবে, নয়তো আদির জন্য তোমাকে প্রতিনিয়ত আফসোস করতে হবে। আজ চললাম, কিন্তু মনে রেখো—আদি আমার তুরুপের তাস।”
শাওন আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে গটগট করে হেঁটে নিজের গাড়ির দিকে চলে গেল। নুসরাত নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। শাওনের শেষ কথাগুলো তার কলিজায় তীরের মতো বিঁধেছে। সে জানে, শাওন শুধু হুমকি দেয়নি, সে আদিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ছক কষতে শুরু করেছে।
শাওন চলে যেতেই শেহের নুসরাতের দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত, কপালে ভাঁজ। এতক্ষণ নিজেকে সংযত রাখলেও এবার তার গলার স্বরে কাঠিন্য ঝরে পড়ল। নুসরাতকে গম্ভীর গলায় প্রায় ধমক দিয়ে বলে উঠল,
“কী ভেবেছিলে তুমি? খুব তো ড্রেস-আপ করে নাচতে নাচতে রিসোর্ট থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছ, একবারও কী ভাবোনি বাইরে কে থাকতে পারে?”
নুসরাত হকচকিয়ে গেল। শেহেরের এই আকস্মিক রুদ্রমূর্তি আর গলার তেজ তার শরীরের কাঁপুনি বাড়িয়ে দিল। সে আমতা-আমতা করে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শেহের তাকে থামিয়ে দিল।
“তুমি জানো ওই লোকটা কতটা নিচ? তুমি নিজের জেদ বজায় রাখতে গিয়ে ভুলেই গেছ যে তুমি একা নও, আদির নিরাপত্তার দায়িত্বও তোমার। রিসোর্টের ভেতরে কী থাকার জায়গা কম ছিল যে এই নির্জনে ওর সামনে এসে দাঁড়াতে হলো?”
নুসরাত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।শেহেরের প্রতিটি কথা তীরের মতো বিঁধছে, কারণ সে জানে শেহের ভুল বলছে না। নুসরাত ধরা গলায় বলল,
“আমি তো শুধু একটু…।”
“একটু কী?”
শেহের কথা কেড়ে নিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে এলো।
“নিজের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করাটা কী তোমার শখ? শাওন যে ধরনের মানুষ, তাকে প্রশ্রয় দেওয়ার মানে জানো? তুমি বাইরে এসেছ সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু ওর সাথে তর্কে জড়িয়ে নিজেকে যে বিপদে ফেলেছ, তার দায় কে নেবে?”
নুসরাত এতক্ষণ শাওনের সামনে নিজেকে পাথরের মতো শক্ত করে ধরে রেখেছিল, কিন্তু শেহেরের ওই তীক্ষ্ণ ধমক আর ‘নাচতে নাচতে বের হওয়া’র অপবাদ তার সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেল। তার চোখ ফেটে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় আর্তনাদ করে বলল,
“সবাই শুধু আমার দোষটাই দেখে, আমার বুকের ভেতর জমানো ক্ষতগুলো কেউ দেখে না। যে মানুষটা আমার হাসিকে প্রতিদিন খু ন করত, তার সামনে আজ নিজেকে দাঁড় করানো কতটা যন্ত্রণার তা তুমি বুঝবে না। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমি এমন একলা এক আকাশ, যার বুকে হাজারটা তারা থাকলেও কোনো আলো নেই।”
নুসরাত থামল না, হাহাকার মেশানো কণ্ঠে বলতে লাগল,
“দুনিয়াটা বড় অদ্ভুত, শেহের ভাই। এখানে ‘অসহায়ত্বের সুযোগ সবাই নেয়, কিন্তু সেই অসহায়ত্ব দূর করার সাহস কেউ দেখায় না।’তুমিও আজ প্রমাণ করে দিলেন, আমার কষ্টের কোনো দাম তোমার কাছে নেই।”
নুসরাতের এই বাঁধভাঙা কান্না আর প্রতিটি শব্দ শেহেরের হৃদয়ে তীরের মতো গিয়ে বিঁধল। তার ভেতরের রাগটা মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। একরাশ অপরাধবোধ নিয়ে শুকনো ঢোক গিলল।আলতো হাতে নুসরাতকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল।
নুসরাত চমকে উঠল। তার কান্না থেমে গিয়ে শরীরে এক অদ্ভুত কম্পন সৃষ্টি হলো। সে ভাবতেই পারেনি এই কঠোর মানুষটি পরক্ষণেই এভাবে তাকে আগলে ধরবে। শেহের এক হাত দিয়ে নুসরাতের পিঠ জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে অতি যত্নে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার স্পর্শে কোনো রুক্ষতা নেই, আছে কেবল গভীর মায়া।
শেহের নিচু স্বরে একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ভুল হয়ে গেছে আমার,রাতপাখি। প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম তোমাকে হারানোর, আর সেই ভয়টাই রাগের মাথায় বের হয়ে গেছে। তোমার আকাশ কোনোদিন একলা হবে না, কথা দিচ্ছি।”
শেহের নুসরাতের আনন দুহাতের মুঠোয় নিয়ে নুসরাতের ভেজা চোখের দিকে দৃষ্টি রেখে আদুরে গলায় বলল,
“আমার ভুল হয়েছে।আর কোনোদিন তোমাকে বকব না।”
কান্নায় ফের নুসরাতের ঠোঁট ভেঙে এলো।শেহের ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিল।মাথায় হাত বুলিয়েও দিল।দূর থেকে আদি স্বার্থর কোলে উঠে বুকে মাথা রেখে শান্ত চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।আদাল চুপচাপ তাকিয়ে আছে।শেহেরের মতো একটা ছেলে কী করে নুসরাতকে ভালোবাসতে পারে তার ধারণা নেই।না টাকার কমতি আছে আর না মেয়ের।তবু কেন এই এক বাচ্চার মাকে এতটা ভালোবাসে?কেন এত গুলো বছর এই নিষিদ্ধ দহনে জ্বালিয়েছে নিজেকে?
স্বার্থ কপাল কুঁচকে খানিকক্ষণ ওদের পর্যবেক্ষণ করে আদালকে বলল,
“আমরা সিলেট আছি কতদিন?”
আদাল বলল,
“ভাইয়া বলেছে কাজ শেষে কয়েকদিন ঘুরবে ভাবিকে নিয়ে।ওরা আলাদা থাকবে নাকি তা তো জানি না।”
“তাও কতদিন?”
“সপ্তা খানিক কিংবা তার বেশি।”
স্বার্থ ঠোঁট টিপে হাসল।আদাল বুঝল না সেই হাসির কারণ।ওদের রিসোর্টে ফিরতে ফিরতে একটু বেলা হলো।দুপুর দুপুর সময় বলে সবাই গোসলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।ওদের ফ্লোরের এক পাশে বিশাল বড় সুইমিংপুল আছে।সেখানে সব মেয়েরা নেমেছে।কায়নাত এক কোণায় বসে পা ডুবিয়ে রেখেছে।
নুসরাত প্রথমে একটু দ্বিধায় ছিল, কিন্তু সবার টানাটানিতে সেও নামতে বাধ্য হলো। শেহেরের দেওয়া সেই আদুরে শাসন আর ভালোবাসার পর ওর মনের মেঘ কিছুটা কেটেছে, যদিও চোখের কোণে এখনো হালকা ফোলা ভাব রয়ে গেছে।
নুসরাত যখন কোমর সমান পানিতে নামল, তার মনটা হালকা লাগছিল। আদি ততক্ষণে ছোট একটা লাইফ জ্যাকেট পরে পানিতে আনন্দে দাপাদাপি শুরু করেছে। তার উচ্ছ্বাস দেখে অন্যদেরও ভালো লাগছে।কায়নাত ওকে দেখে কপাল কুঁচকে দৃষ্টি সরাল।দূর থেকে নিশা এসে ওর পা জড়িয়ে ধরল।কায়নাত আঁতকে উঠে বলল,
“আমি সাঁতার পারি না আপু।”
নিশা চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“সাঁতার না জানলেও সমস্যা নেই।গোসল করতে পারবে।”
“আমি রুমে করে নেব।”
“আচ্ছা,ভাইয়া আসবে কখন জানো?”
“তোমার ভাই আমার সতীন আনতে গেছে,তাই একটু দেরি হচ্ছে।”
নিশা ঠাট্টার স্বরেই বলল,
“যদি ভাইয়া সত্যি তোমার সতীন নিয়ে আসে তাহলে কী করবে?”
কায়নাত মুখটা কালো করে বলল,
“এক সতীনের সাথে সংসার করে হাঁপিয়ে উঠেছি,আরেকজন এলে আমাকে কবরে যেতে হবে।”
নিশা আশ্চর্য হয়ে বলল,
“এক সতীন মানে?তোমার সতীন কে?ভাইয়া আরেকটা বিয়ে করল কবে?”
কায়নাত নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
“তোমার বড় বোনের গুণধর ছেলের কথা বলছি।ফাজিল ছেলে আমার জামাইয়ের পিছু ছাড়ে না।ওকে তোমার ভাই বেশি ভালোবাসে।”
নিশা হতভম্ব কায়নাতের কথায়।এই মেয়ে বলে কী এসব?সে হালকা গলা পরিষ্কার করে বলল,
“তুমি কী আদিকে হিংসা করো?”
কায়নাত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
“ওসব আমি করি না।”
নিশা শব্দ করে হেসে উঠল।এক বাচ্চা আরেক বাচ্চাকে নিয়ে হিংসা করে।তাও আবার ভাগ্নেকে নিয়ে।সবার গোসল শেষে চলে গেছে ওখান থেকে।শুধু কায়নাত থেকে গেছে একা।ঝলমলে রোদের মাঝে একটু সাহস করে নামল সিঁড়ি বেয়ে।গায়ের শাড়ি লেপ্টে এলো সারা সর্বাঙ্গে।রোদের তাপ পানির উপর পড়ে এক অদ্ভুত আভা তৈরি করেছে, কিন্তু কায়নাতের বুক দুরুদুরু করছে। জীবনের এই প্রথম সে এমন খোলা জায়গায় সুইমিংপুলে একা নামার সাহস করল। সে আলতো করে রেলিং ধরে চারপাশটা দেখে নিল। সবাই চলে যাওয়ায় জায়গাটা এখন বেশ নিরিবিলি। পানির শীতল স্পর্শে তার শরীরে একটা শিরশিরানি খেলে গেল। একটু সামনে এগোতেই পা পিছলে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো, অমনি সে শক্ত করে রেলিংটা খামচে ধরল।সঙ্গে সঙ্গে শক্ত-পোক্ত একটা বাহু পেছন থেকে আঁকড়ে ধরল তার নরম শরীরটা।ভয়ে ভীতু নজরে পেছনে ঘাড় ঘুরাতেই অর্ণকে দেখে প্রায় প্রাণ ফিরে পেল যেন।আতঙ্কিত গলায় বলল,
“আপনি এলেন কখন?আমি ভেবেছি অন্য কেউ ধরেছে।”
অর্ণ গম্ভীর মুখে কপাল কুঁচকে কায়নাতের শরীরটা প্যাঁচিয়ে ধরে নিচে নেমে বলল,
“একা একা পানিতে নেমেছ কেন?”
লজ্জা লাগছে মেয়েটার।ভেজা শরীরটা অর্ণ ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরেছে বুকের সাথে।লাজে শরীর কাঁপছে তার।চোখ তুলে তাকানোর মতো সাহস হলো না।
অর্ণর গভীর চোখের দৃষ্টি কায়নাতের সারা মুখে বিচরণ করছিল। কায়নাতের কাঁপাকাঁপা ওষ্ঠ আর লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া গাল দেখে অর্ণের গাম্ভীর্য যেন কিছুটা শিথিল হলো।
“আমি থাকতে অন্য কেউ আপনাকে স্পর্শ করার সাহস পাবে না।”
কায়নাত কিছু বলতে চাইল, কিন্তু অর্ণর বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন আর উষ্ণ সান্নিধ্যে তার সব কথা হারিয়ে গেল। অর্ণ আলতো করে কায়নাতের চিবুক তুলে ধরল। সূর্যের আলোয় কায়নাতের ভেজা মুখটা হীরের মতো জ্বলজ্বল করছে। অর্ণ দৃষ্টি বুলাল সেই অধর জোড়ায়।হালকা গোলাপি রঙের লিপস্টিক লাগিয়েছে বোধহয়।হঠাৎ তার ঠোঁট দুটো কায়নাতের কম্পিত ওষ্ঠের দিকে ঝুঁকে এলো। কায়নাত দুচোখ বন্ধ করে শক্ত করে অর্ণর পাঞ্জাবীর কলারটা খামচে ধরল, যেন এক অজানা আবেশে সে তলিয়ে যাচ্ছে।চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু পানির কুলকুল শব্দ আর তাদের হৃৎস্পন্দনের আওয়াজ একাকার হয়ে যাচ্ছিল।
অর্ণর ঠোঁটের স্পর্শ কায়নাতের কম্পিত ওষ্ঠে মিশে যেতেই সময় যেন থমকে দাঁড়াল। কায়নাতের সারা শরীর দিয়ে একটা বিদ্যুত তরঙ্গ বয়ে গেল। ছটফট করল মেয়েটা।প্রখর স্পর্শে শরীর কাঁপছে তার। পানির নিচে অর্ণর অন্য হাতটা কায়নাতের কোমরে আরও শক্ত হয়ে চেপে বসল, যেন সে তাকে এই পৃথিবীর সবটুকু থেকে আগলে রাখতে চায়।
কায়নাত প্রথমে আড়ষ্ট হয়ে থাকলেও, অর্ণর তীব্র ভালোবাসার পরশে ধীরে ধীরে নিজেকে সঁপে দিল। তার দুহাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্ণর ঘাড় প্যাঁচিয়ে ধরল। রোদের সেই ঝলমলে আভা আর সুইমিংপুলের নীল জলরাশি তাদের এই একান্ত মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল। অর্ণ কায়নাতের ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে তার কপালে কপাল ঠেকাল। দুজনের তপ্ত নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে তখন।কায়নাত অর্ণর ভেজা জামা টেনে বুকে মুখ লুকালো লজ্জায়।অর্ণ ভেজা ঠোঁট মুছে নাক কুঁচকে বলল,
“তোমার লিপস্টিকের টেস্ট খুবই বাজে।এখন থেকে অন্য কিছু ব্যবহার করবে,বেয়াদব মহিলা।”
কায়নাত উত্তর দিল মিনমিন গলায়,
“কী ব্যবহার করব?”
অর্ণ ঠোঁট চেপে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল।বুকে তার ছোট্ট বউ লুকিয়ে আছে।উজ্জ্বল দুপুরে দুজন পাশাপাশি লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে ভেজা শরীরে।কেন যেন মুখটা ভীষণ ভারী।দুটো মিষ্টি কথা কেন বের হয় না মুখ দিয়ে?অর্ণ হালকা গলা কেঁশে নিচু স্বরে বলল,
“তোমার স্বামীর ঠোঁট।”
কায়নাতের হাতের বাঁধন শক্ত হলো।পারলে এখনই অর্ণর বুকের মধ্যে ঢুকে যায় সে।অর্ণ বেশি ঘাটল না।ছোট্ট বউকে পাঁজা কোলে তুলে উঠে এলো উপরে।সাদা তোয়ালে দিয়ে ওর পুরো শরীর প্যাঁচিয়ে আবার কোলে নিয়ে হাঁটা ধরল ঘরের দিকে।
কায়নাত কাপড় পাল্টে এলো সময় নিয়ে।ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখল,অর্ণ খালি গায়ে সোফায় বসে বসে ভেজা চুল মুছছে।মেয়েটা শুকনো ঢোক গিলে আয়নার সামনে দাঁড়াল।আয়নার দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে তাকাল নিজের দিকে।শরীরে শাড়ি জড়ালে বেশ বড় বড় লাগে।অর্ণর চোখে কী পড়ে না এটা?লোকটা ছোট বলে এড়িয়ে যায় নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?সে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাল।অর্ণর দৃষ্টি তখন জানালার বাইরে।কায়নাত হালাকা গলা কেঁশে পিঠের ভেজা চুল গুলো সামনে এনে বলল,
“শুনছেন?”
অর্ণ তাকাল।বলল,
“কী চাই?”
“আমি ব্লাউজের ফিতেটা বাঁধতে পারছি না।আপনি একটু সাহায্য করবেন?”
অর্ণ কায়নাতের পিঠের দিকে তাকাল।গাঢ় লাল রঙের পাতলা শাড়ি পরেছে।আর তার সাথে লাল রঙের ব্লাউজ।অর্ণ উঠে দাঁড়াল।
অর্ণ সোফা থেকে উঠে দাঁড়াতেই কায়নাত সোজা হয়ে দাঁড়াল। ধীর স্থির কদমে সে যখন কায়নাতের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল, কায়নাত আয়নার প্রতিবিম্বে দেখতে পেল অর্ণর সেই সুঠাম, অনাবৃত বুক। কায়নাতের হৃৎস্পন্দন যেন ঘড়ির কাঁটার চেয়েও দ্রুত ছুটছে। সে ভয়ে আর লজ্জায় দুই চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা চেপে ধরল।
অর্ণর ঠান্ডা হাত দুটো যখন কায়নাতের পিঠের উন্মুক্ত চামড়ায় স্পর্শ করল, কায়নাতের সারা শরীর দিয়ে এক তীব্র শিহরণ বয়ে গেল। অর্ণর আঙুলগুলো খুব সাবধানে ফিতে দুটো হাতে নিল, কিন্তু সে বাঁধতে দেরি করছে। ইচ্ছে করেই যেন তার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কায়নাতের মেরুদণ্ড বরাবর আলতো করে ঘষছে।
অর্ণ ঝুঁকে এলো কায়নাতের কানের কাছে। তার তপ্ত নিঃশ্বাস কায়নাতের ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে। অর্ণ নিচু এবং গম্ভীর স্বরে বলল,
“এতটুকু ফিতে বাঁধতে পারেন না, অথচ আমাকে প্রলুব্ধ করার মতো সাহস ঠিকই দেখাচ্ছেন।”
কায়নাত কোনো উত্তর দিতে পারল না,তার ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দই জানান দিচ্ছিল সে কতটা অস্থির। অর্ণ ফিতেটা টেনে গিঁট দিতে দিতে আরও খানিকটা কাছে চেপে এলো। তার খালি বুক এখন কায়নাতের পিঠের সাথে লেপ্টে আছে।
অর্ণ কায়নাতের কাঁধের উপর চিবুক রেখে আয়নার দিকে তাকাল। কায়নাতের বন্ধ চোখের পাতাগুলো কাঁপছে। অর্ণ ফিসফিস করে বলল,
“চোখ খুলুন ম্যাডাম।আপনার শরীরের এই কাঁপুনি,এটা কী ভয়ের, নাকি আমার ছোঁয়ায় আপনার তৃষ্ণার?”
অর্ণর হাত কায়নাতের কোমরের বাঁক ঘেষে সামনে এগিয়ে এলো। সে কায়নাতের গলার কাছে মুখ নামিয়ে নিয়ে খুব ধীর গলায় বলল,
“বেয়াদবি তো আপনি করছেনই, শাস্তিটা নাহয় আজ একটু কড়া করেই দিই?”
কায়নাতের মনে হলো সে এখনই জ্ঞান হারাবে। অর্ণর প্রতিটি শব্দ যেন আগুনের গোলার মতো তার শরীরে শিহরণ জাগাচ্ছে।থরথর করে কাঁপছে শরীর।অর্ণর ঠোঁট দুটো যখন কায়নাতের ওষ্ঠে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করল, কায়নাতের সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন অবশ হয়ে এলো। অর্ণর স্পর্শে এখন আর কেবল মায়া নেই, আছে এক তীব্র নেশা। কায়নাত দুহাতে অর্ণর খালি পিঠটা খামচে ধরল, তার সারা শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে অর্ণর প্রখর সোহাগে। ঘরের প্রতিটি কোণ যেন এই দম্পতির নিঃশ্বাসের শব্দে ভারী হয়ে উঠেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে, কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই হঠাৎ করে চাপানো দরজার হ্যান্ডেল ঘোরার শব্দ হলো এবং “খট” করে দরজাটা খুলে গেল।
“মামু! আমার চকলেট কোথায়?”
বাচ্চার গলার মিষ্টি আর উচ্চ স্বর শুনে কায়নাত যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে এক ঝটকায় অর্ণকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নিজের শাড়ির আঁচল টেনে ঠিক করতে লাগল।
অর্ণর অবস্থাও তথৈবচ। তার ঘাড় ত্যাড়া স্বভাবের কারণে সে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফিরল। দেখল দরজায় ছোট্ট আদি দাঁড়িয়ে আছে,চোখে একরাশ কৌতূহল। আদি তার ছোট ছোট পা ফেলে ঘরের ভেতর ঢুকে এলো।আদি অর্ণর দিকে তাকিয়ে বলল,
“মামু, তুমি মামির কানের কাছে কী বলছিলে?মামির গাল এত লাল কেন?”
অর্ণ এক হাত দিয়ে নিজের কপাল টিপে ধরল। তার রোমান্টিক মেজাজ এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তিমাখা স্বরে বলল,
“তোমার মামি বেয়াদব তো, তাই তাকে বকা দিচ্ছিলাম। আর তুমি যে এভাবে না বলে ঘরে ঢুকে আসো, তোমারও কিন্তু শাস্তি হওয়া উচিত,ফাজিল ছেলে।”
(রেসপন্স করুন সবাই।রোমান্টিক দিয়েছি আজকে।🌚
আমি খুবই দুঃখিত এতদিন অপেক্ষা করানোর জন্য।গ্রাম থেকে কাল রাতে ফিরেছি।এসে আর লেখার মতো শক্তি পাইনি।)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩১.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬