Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৪.২


প্রেমবসন্ত_২ ।৩৪.২।

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

সোহানের ছোট ভাইয়ের নাম শুভম।খুব সম্ভবত দুই জন পিঠা-পিঠি।সোহানের বাবা জানালেন তার দুই ছেলের অবস্থাই বেশ ভালো।আজগর চৌধুরী ভেবেছিলেন ছেলের কোনো ভাই নেই।দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে ডাইনিং টেবিলে।বিশাল কাঁচ ঘেরা ডাইনিং টেবিল আর ভরপুর।ফারিহা অসুস্থ বলে সে কাজ করতে নিচে নামেনি।কায়নাতই মায়েদের সাথে কাজ করে দিচ্ছিল।সাথে নুসরাতও আছে।ছোট্ট আদি অর্ণর সাথে বসেছে খাবে বলে।লতা বেগম খাবার দিয়ে গেছেন এদিকে।কায়নাত খাবার দিচ্ছে ছেলে বাড়ির মানুষদের।অর্ণর মোটেও পছন্দ হলো না এই দৃশ্য।কায়নাত ভুলেও এদিকে আসলো না।শুভম ছেলেটা আড়চোখে বারে বারে কায়নাতকে দেখছিল,আর এটা ওটা চাচ্ছিল।অর্ণর চোয়াল শক্ত হলো এতে।আদি নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে ভাত মাখিয়ে আদুরে বিড়াল ছানার মতো অর্ণর পাঞ্জাবির হাতা টেনে ধরে বলল,

“ও মামু,হা করো আমি খাইয়ে দেই?”

অর্ণ ফেলতে পারল না তার আবদার।ঝুঁকে আসতেই আদি খাইয়ে দিল তাকে।শুভম মুচকি হেসে বলল,
“আপনার ছেলে নাকি?ভীষণ আদুরে।”

আদি এতে খুশি হলো।অর্ণ উত্তর দিল না।শুভম হয়তো ওর “মামু” সম্বোধন শোনেনি।সেখানে প্রেম উপস্থিত ছিল।বারবার সে সোহানকে দেখছিল।বিয়ে ঠিক হয়েছে নিধির সাথে।এই মুহূর্তে সে কিছু বলতে পারছে না।বাড়ির প্রত্যেকেই এই বিয়েতে মত দিয়েছেন।সোহান ছেলেটা ভালো।দেখতে শুনতে যেমন গোছাল,ঠিক তেমন ব্যাকগ্রাউন্ডও বেশ ভালো।তবে প্রেম তার রঙিলাকে অন্য এক পুরুষের কিছুতেই হতে দিতে পারবে না।

শুভম খেতে খেতে হঠাৎ কেঁশে উঠল।কায়নাত তাড়াতাড়ি গ্লাসে পানি এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আস্তে-ধীরে খাবার শেষ করুন।”

অর্ণ ঠোঁট চেপে তাকাল।নাকের পাতা ফুলছে একটু পর পর।স্বার্থ বোধহয় বুঝল অর্ণর অবস্থা।সে হাসি চেপে রাখল।এবার বেশ জমবে মনে হচ্ছে।খাওয়া দাওয়া শেষে হাত ধুতে উঠল শুভম।সেখানে বাড়ির মেয়েরা উপস্থিত ছিল না বলে কায়নাতরা যে কজন খাবার দিচ্ছিলেন,শুধু তারাই উপস্থিত ছিলেন।রেখা বেগম বললেন হাত মোছার কাপড় নিয়ে যেতে।টিস্যু শেষ হয়ে গেছে।কায়নাত মাথা নাড়িয়ে বেসিনের সামনে গেল।শুভম হাত ধুতেই সে সেটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনি ঠান্ডা কিছু খাবেন?”

শুভম মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।হালকা উজ্জ্বল রঙের পুরুষটাকে বেশ সভ্য মনে হলো কায়নাতের।সে ছুটল রান্না ঘরে।ছোট বাটিতে দই বেড়ে রান্না ঘরের দরজার সামনে আসতেই হাজির হলো অর্ণ।মেয়েটা কপাল কুঁচকে বলল,
“কী চাই?”

অর্ণ দাঁত চেপে বলল,
“এত লাফাচ্ছ কেন তুমি?”

“লাফাচ্ছি মানে?কাজ করছি চোখে দেখছেন না?”

অর্ণ এগিয়ে এসে ছোঁ মেরে কায়নাতের হাত থেকে বাটি নিয়ে তাকের উপরে ছুড়ে মেরে বলল,
“ওই ছেলের সাথে এত কথা কীসের তোমার?”

কায়নাত বিরক্ত হলো এই সময়ে অর্ণর খাম-খেয়ালি কথায়।গরমে কাজ করতে করতে তার মেজাজ বিগড়ে আছে এই মুহূর্তে।অর্ণ ওর উত্তর না পেয়ে ধমক দেয়ার আগেই সেখানে হাজির হলেন লতা বেগম।তিনি আসতেই অর্ণ দূরুত্ব বাড়িয়ে দাঁড়াল।তিনি অপ্রস্তুত হয়ে কায়নাতকে বললেন,
“ফ্রিজে ঠান্ডা রাখা হয়েছে।গ্লাস গুলো নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি।”

তিনি চলে যেতেই কায়নাত হনহন করে বের হলো গ্লাসের ট্রে নিয়ে।ছেলে পক্ষ বিদায় নিয়েছে খানিকক্ষণ আগেই।নিধিকে বেশ পছন্দ হয়েছে তাদের।আগামী মাসেই পবিত্র কাজটা সেরে ফেলতে চাচ্ছেন।এবং এটাও বলেছেন আকদ করার চেয়ে একদম তুলে নিয়ে যেতে চান।সোহানের মা বয়স্ক মহিলা,তিনি সংসারের ভার ছেলের বউয়ের হাত দিয়ে একটু নিশ্চিন্ত হতে চান।আজগর চৌধুরী রাজী হয়েছেন।নিধির হৃদয় ভেঙেছে আজ।দাদা একটাবারও তার মতামত নেয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না।এতে ভীষণ ব্যথিত হয়েছে সে।


সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমেছে। কায়ানাত সবে গোসল সেরে এসেছে। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক তখনই অর্ণ ঘরে ঢুকল। ঢুকেই পেছনের পা দিয়ে লাথি মেরে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল। বিকট শব্দে কায়ানাত চমকে উঠে তোয়ালেটা হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
অর্ণর গায়ের পাঞ্জাবিটা কুঁচকানো, কপাল দিয়ে ঘাম চুইয়ে পড়ছে।কায়নাত আড়চোখে তাকে দেখে বারান্দার নিকট এগিয়ে যেতেই অর্ণ শব্দ করে হাতের ঘড়ি খুলে ছুড়ে মারল ফ্লোরে।কায়নাত চমকে উঠে বলল,
“কী হয়েছে আপনার?এমন করছেন কেন?”

অর্ণ ধীর পায়ে কায়ানাতের সামনে এসে দাঁড়াল। তার শান্ত, তপ্ত চাউনি কায়ানাতের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে।অর্ণ গম্ভীর গলায় বলল,
“নিচে অত লোক থাকতে আপনাকে কেন ডাইনিংয়ে তদারকি করতে হলো ম্যাডাম? খুব কী শখ হয়েছে মেহমানদের তুষ্ট করার?”

কায়ানাত একটু থতমত খেয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“আমি তো শুধু মায়েদের সাথে একটু সাহায্য করছিলাম। শুভম ভাই কাঁশছিলেন,তাই পানিটা…”

“চুপ!” অর্ণর হুংকারে কায়ানাত কুঁকড়ে গেল। অর্ণ এক পা এগিয়ে কায়ানাতের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“শুভম ভাই! খুব তো ভাই সম্বোধন উথলে পড়ছে। ওই লোকটা আপনার দিকে কীভাবে তাকিয়ে ছিল সেটা কী আপনার চোখে পড়েনি? নাকি পড়েও না দেখার ভান করেছেন?”

কায়ানাত এবার মাথা তুলে মৃদু প্রতিবাদ করে বলল,
“উনি মেহমান, ওভাবে কেন বলছেন আপনি? আমি তো শুধু সৌজন্য দেখাচ্ছিলাম।”

অর্ণর নাকের পাতা রাগে ফুলছে। সে কায়ানাতের একটা বাহু শক্ত করে চেপে ধরে কাছে টেনে নিল।
“রাখুন আপনার সৌজন্য!এই কিশোরীসুলভ চপলতা আমার একদম পছন্দ না। আপনি কী মনে করেন, আপনি হাসিমুখে গ্লাস বাড়িয়ে দেবেন আর আমি সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব? আপনার কী কাণ্ডজ্ঞান বলতে কিছু নেই?”

কায়ানাত প্রথমে চুপ করে থাকলেও অর্ণর এই অযৌক্তিক ধমক আর হাতের শক্ত বাঁধনে তার মেজাজও বিগড়ে গেল। সে অর্ণর হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে চিৎকার করে বলল,
“আপনি সবসময় আমার উপর কেন রাগ ঝাড়েন? এতে আমার অপরাধটা কোথায়? আপনার যদি উনার তাকানোটা এতই অপছন্দ হয়, তবে উনাকে গিয়ে কেন বলছেন না? শুধু আমার উপরই জোর খাটানো যায়, তাই না?”

অর্ণ কায়ানাতকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে হিসহিস করে বলল,
“আমি কাকে কী বলব সেটা আমি ঠিক করব। আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি—নিজের লিমিটের মধ্যে থাকুন। মেহমানদের সামনে নিজেকে সস্তা করাটা সৌজন্য না, ওটা বোকামি। আজকের পর যদি আবার এমন কিছু দেখি, তবে আমি কী করতে পারি আপনার ধারণা নেই।”

কায়ানাত এবার রাগে ফুঁসে উঠল, চোখ দিয়ে টলমল করে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে ধরা গলায় বলল,
“ছাড়ুন,লাগছে আমার।”

অর্ণ ওকে ছেড়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“আমার ছোঁয়াই খালি লাগে।বেয়াদব মহিলা।”

জয়ার সাথে নাজনীনের ঝগড়া হওয়ার পর থেকে এখন অব্দি একটা কথাও তাদের মধ্যে হয়নি।অস্থির কিশোরীর পরাণ।নাজনীন এতটা রেগে যায়নি কখনও।জয়া কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।ছোট্ট মাথায় চাপ না নিতে পেরে বাবার ঘরে ছুটল।বাবাকে বলে যদি একটা উপায় বের করা যায়,তাহলে মন্দ কিসে?জয়া ভাবনা অনুযায়ী ছুটল নিচে।সোজা এসে থামল আব্দুর চৌধুরীর ঘরের সামনে।দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে অনুমতি এলো প্রবেশ করার।সময় নিয়ে ঢুকল জয়া।ঘরে ঢুকে দেখলবাবা সবে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন।আব্দুর চৌধুরী ছোট মেয়েকে দেখে কপাল কুঁচকে সময় দেখে নিলেন।রাত ঠিক ১২টার কাটা ছুঁয়েছে।তিনি কপাল কুঁচকে বললেন,

“এত রাতে এখানে কী?”

জয়া গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে বিছানায় উঠে বসল।দরজা চাপিয়ে দিলেন লতা বেগম।জয়া আড়চোখে মাকে দেখে বলল,
“তোমাকে কিছু কথা বলব বাবা।”

আব্দুর চৌধুরী বললেন,
“বলো।”

“তুমি একটু নাজনীন ভাইয়ের সাথে কথা বলবে?”

তিনি কপাল কুঁচকে বললেন,
“কেন?”

“উনি..”

বলতে গিয়েও মেয়েটা থেমে গেল।স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার মধ্যে বাবাকে টানা মোটেও ঠিক হবে না।এতে নাজনীনকে অপমান করা হবে আরও।আব্দুর চৌধুরী বললেন,
“বলছ না কেন?কী করেছে ওই ছেলে?”

জয়া কথা এড়িয়ে যেতে চাইল।ওকে বাঁচাতে ঘরে আগমন ঘটল কায়নাতের।সে দরজায় কড়া নেড়ে প্রবেশ করতেই আশ্চর্য হলেন আব্দুর চৌধুরী।এত রাতে দুই মেয়ের বিধ্বস্ত মুখশ্রী দেখে বিচলিত তিনি।কায়নাত আসতেই তিনি বললেন,
“তুমি আবার এত রাতে এখানে কী করছ?”

কায়নাতের মুখ ভার।সে উত্তর না দিয়ে জয়ার পাশে বসতেই খোলা দরজা দিয়ে অর্ণ এলো কঠিন চোয়াল নিয়ে।এসেই কারোর সাথে কোনো কথা না বলে কায়নাতের হাত চেপে ধরতেই আব্দুর চৌধুরী ফুঁসে উঠলেন।ধমক দিয়ে বললেন,
“এসব কেমন বেয়াদবি?কী করছ তুমি?”

অর্ণ কপাল কুঁচকে বলল,
“বিয়ে করা বউকে নিতে এসেছি।বাপের বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ি এক জায়গায় হওয়ায় বড্ড সুবিধা হয়েছে আমার।”

কায়নাত নাক ফুলিয়ে বলল,
“হাত ছাড়ুন আমার।”

আব্দুর চৌধুরীর মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব।তিনি উঠে বসলেন বিরক্ত হয়ে।তিনি মূলত নাজনীনকে নিয়ে ভীষণ বিরক্ত।ছেলেটার সাথে ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়ে তিনি আফসোস করছেন এখন।এত ছোট মেয়েকে অমন দাঁমড়া ছেলের সাথে বিয়ে দেয়া ঠিক হয়নি।তার মধ্যে দুইদিন পর পর ওই ছেলের সাথে মেয়ের ঝগড়া হয়।

অর্ণ কায়নাতকে টানতেই তিনি হায়হুতাশ করে বললেন,
“আরে বাপ,ছাড়ো ওকে।কী চাই তোমার?”

অর্ণ নিজেও বিরক্ত হয়ে বলল,
“রাত বেড়েছে,এখন আপাতত বউকে চাই।অনুমতি দিলে ঘরে নিয়ে যেতাম।”

তিনি দাঁত চেপে বললেন,
“থাপড়ে গাল লাল করব বেয়াদব ছেলে।আমি তোমার শ্বশুর হই জানো?কার সামনে দাঁড়িয়ে কী বলছো?মুখে লাগাম নেই?”

“লাগাম টেনে লাভ আছে?আপনি নিজেই সেই লাগাম টেনে বের করছেন।”

“বের হও ঘর থেকে।বউকে পাবে না,ও এঘরে থাকবে।”

অর্ণ ফোঁস করে চাপা নিশ্বাস ফেলে কায়নাতের দিকে তাকাল।দাঁত চেপে বলল,
“ঘরে যাবে না?”

কায়নাত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
“না।”

“শেষবার বলছি,যাবে নাকি না?”

“বললাম না, যাব না?”

অর্ণর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। কায়ানাতের ‘না’ শুনে তার চোখের মণি দুটো যেন স্থির হয়ে গেল। শ্বশুরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে—এই কাণ্ডজ্ঞানটুকুও যেন রাগের মাথায় উবে গেছে। আব্দুর চৌধুরী কিছু বুঝে ওঠার আগেই অর্ণ এক ঝটকায় কায়ানাতের কোমরে হাত দিয়ে তাকে পাঁজাকোলে তুলে নিল।
হঠাৎ এই কাণ্ডে কায়ানাত হকচকিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“কী করছেন আপনি? ছাড়ুন আমাকে! লজ্জাশরম কি সব ধুইয়ে খেয়েছেন?”

কায়ানাত তার ছোট ছোট হাত দিয়ে অর্ণর কাঁধে আর বুকে কিল-ঘুষি মারতে লাগল, পা ছুড়ে নিজেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করল। কিন্তু অর্ণর লোহার মতো শক্ত বাঁধন এক চুলও আলগা হলো না। তার কঠিন চোয়াল আর তপ্ত নিঃশ্বাস বলে দিচ্ছিল, এখন কেউ তাকে থামাতে পারবে না।
আব্দুর চৌধুরী চোখ বড় বড় করে বিছানা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। রাগে তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
“অর্ণ! এই বেয়াদব ছেলে! আমার চোখের সামনে দিয়ে ওকে এভাবে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? নামাও বলছি ওকে!”

অর্ণ শ্বশুরের দিকে একবার ফিরেও তাকাল না। দরজার দিকে যেতে যেতে অত্যন্ত গম্ভীর আর শীতল গলায় বলল,
“বউ আমার, আমি কোথায় নিয়ে যাব সেটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।আপনি আপনার বউ নিয়ে ঘুমান,বড়রা ঘুমানোর চেষ্টা করলে খুশি হব।”

কায়ানাত রাগে,অপমানে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে ছটফট করতে করতে বলল,
“আপনি একটা আস্ত অসভ্য! বাবার সামনে এসব কী ছিল? “

“আপনি কথা শোনেননি, তাই আমাকে আমার পথ বেছে নিতে হয়েছে। এখন মুখ বুজে থাকুন, নইলে বাড়ির সবার ঘুম ভাঙিয়ে দেব।”

অর্ণর এমন রুদ্রমূর্তি দেখে কায়ানাত এবার ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সে বুঝল, অর্ণকে এখন উসকানি দেওয়া মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। অর্ণ কায়ানাতকে নিয়ে হনহন করে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। করিডোরের আলোয় অর্ণর ছায়াটা যেন এক আদিম অধিকারবোধের প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে উঠেছে। নিজের ঘরে ঢুকে লাথি মেরে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিয়ে সে কায়ানাতকে বিছানায় এক প্রকার ছুঁড়ে ফেলল।

বিছানায় কায়ানাতকে এক প্রকার ছুঁড়ে দিয়েই অর্ণ দ্রুত হাতে দরজার লকটা ঘুরিয়ে দিল। কায়ানাত উঠে বসার আগেই অর্ণ তার উপর প্রায় ঝুঁকে এলো। কায়ানাতের এলোমেলো হয়ে যাওয়া ভেজা চুলগুলো বিছানায় ছড়িয়ে আছে, আর চোখের কোণে জমে থাকা জলবিন্দুগুলো ঘরের আবছা আলোয় মুক্তোর মতো চিকচিক করছে।
কায়ানাত ভয়ার্ত গলায় বলতে চাইল,
“আপনি আমার সাথে এমন…”
কিন্তু কথা শেষ হলো না। অর্ণ দুই হাতে কায়ানাতের গাল আগলে ধরে তাকে থামিয়ে দিল। তার দৃষ্টি এখন আর রুক্ষ নয়, বরং এক অদ্ভুত দহন আর আকুলতায় ভরা। অর্ণর তপ্ত নিঃশ্বাস কায়ানাতের ওষ্ঠ ছুঁই ছুঁই। সে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
“অনেক হয়েছে আপনার তেজ, এবার চুপ করুন। আপনার ওই অবুঝপনা সহ্য করতে করতে আমার ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে।”

কায়নাত মুখ ফিরিয়ে দূরুত্ব বাড়াল।মুখ গুঁজে দিল বালিশে।অর্ণর সাথে এখন একটা কথাও তার বলতে ইচ্ছে করছে না।


বাড়ির কাজ করতে করতে বেশ অনেকটা সময় কেটে গেছে।রেখা বেগম সবে লম্বা শ্বাস টেনে বসেছেন সোফায়।পুরো বাড়ি একদম নিশ্চুপ।কেউ বোধহয় জাগ্রত নেই এই সময়ে।হঠাৎ অনুভব করলেন,তার পাশে কেউ এসে বসেছে।তিনি পাশ ফিরতেই নজরে এলো মতিউর চৌধুরীর মুখশ্রী।চোয়াল শক্ত করে উঠে যেতে চাইলেই ভদ্রলোক বললেন,
“আসার পর থেকে তোমার সাথে একটা কথাও হয়নি রেখা।”

রেখা বেগম তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,
“কথা না বললেই বা কী?”

“অভিমান হয় না?”

“কী নিয়ে অভিমান হবে?একটা আস্ত জানো’য়ারের জন্য?একটা কাপুরুষের জন্য?নাকি একটা অযোগ্য সন্তানদের বাবার জন্য?”

মতিউর চৌধুরী অপরাধীর মতো মাথা নিচু করলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমি ভুল করেছি রেখা, আমি মানছি। কিন্তু সন্তানদের উপর তো আমার অধিকার আছে।”

“অধিকার?” রেখা বেগম এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন, যা এই নিস্তব্ধ বাড়িতে করুণ শোনাল। “অধিকার শব্দটা আপনার মুখে বড্ড বেমানান। যে সন্তানদের শৈশব আপনি কেড়ে নিয়েছেন, যাদের বড় হওয়াতে আপনার এক ফোঁটা অবদান নেই, তাদের উপর আজ অধিকার ফলাতে এসেছেন? হাসান,নাজনীন,নিধি—এরা আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আপনার কোনো ছায়া নেই। আপনি আজ ওদের কাছে একজন আগন্তুক ছাড়া আর কিছুই নন।”

রেখা বেগম থামলেন না, আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
“অন্য একটা মেয়ের মোহে পড়ে যে মানুষ নিজের সাজানো বাগান তছনছ করে দেয়, সে কেমন জানো’য়ার তা আপনার জানা উচিত। আপনার ওই দ্বিতীয় স্ত্রীর আঁচল ধরে পড়ে থাকার সময় কী একবারও মনে পড়েনি—একা এক মা কীভাবে এই সমাজে মাথা উঁচু করে পাঁচ-পাঁচটে সন্তানকে মানুষ করেছে? আজ বড় বড় কথা বলতে আসবেন না। এই বাড়িতে আপনার জায়গা ছেলে হিসেবে হতে পারে, কিন্তু বাবা বা স্বামী হিসেবে কোনোদিনও না।”

মতিউর চৌধুরী কুণ্ঠিত স্বরে বললেন,
“রেখা, পুরুষ মানুষের জীবনে কখনো কখনো পদস্খলন হয়। তাই বলে কী কোনো ক্ষমা নেই?”

রেখা বেগম যেন এই কথাটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
“পদস্খলন? বাহ! কী চমৎকার শব্দ চয়ন আপনার! একটা আস্ত জীবন ধ্বংস করে দিয়ে তাকে ‘পদস্খলন’ বলে জায়েজ করছেন? আপনি তো সেই নির্লজ্জ জানো’য়ার, যে নিজের পিঠের চামড়া বাঁচাতে পরনারীর আঁচলে মুখ লুকিয়েছিলেন। আজ আভিজাত্যের মুখোশ পরে ফিরে এলেই কী সব পাপ ধুইয়ে যাবে? আপনার শরীরে পুরুষের রক্ত আছে কি-না আমার সন্দেহ হয় মতিউর সাহেব। যে পুরুষ নিজের সন্তানদের হাহাকার ভুলে অন্য নারীর বিছানা গরম করে, সে আসলে একটা অমানুষ।”

মতিউর চৌধুরী আর্তনাদ করে উঠলেন,
“রেখা! মুখ সামলে কথা বলো!”

“মুখ সামলাব আমি?বাড়িতে ফিরে যখন ছোট মেয়ের সামনে দাঁড়ালেন, আপনি তো চিনতেই পারেননি ওটা আপনার নিজের রক্ত। নিজের ঔরসজাত সন্তানদের চেহারা যে বাবার স্মৃতি থেকে মুছে যায়, তার মতো অযোগ্য আর নিচ জানো’য়ার এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। আপনি তো সেই কাপুরুষ, যে বিপদের দিনে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়েছিল। আজ যখন সন্তানরা বটগাছের মতো বড় হয়েছে, তখন কী আপনি তাদের ছায়া নিতে এসেছেন? আপনার মতো পরগাছা আর স্বার্থপর পুরুষের ছায়া মাড়াতেও আমার ঘেন্না হয়!”

মতিউর চৌধুরী নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। রেখা বেগম এবার তাঁর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন।
“শুনে রাখুন মতিউর চৌধুরী, রক্ত কোনোদিন বিশ্বাসঘাতকতা করে না, কিন্তু মানুষ করে। আপনি নিজের রক্তের সাথে গাদ্দারি করেছেন। আপনার ওই দ্বিতীয় বিয়ের শয্যা যখন আপনার সন্তানদের চোখের জলে ভিজেছিল, তখন কী একবারও পুরুষত্ব জেগে ওঠেনি? আজ এ বাড়িতে আপনার অবস্থান একটা মৃতদেহের চেয়েও অধম। মেহমান হয়ে এসেছেন, দুবেলা খেয়ে আবার আপনার ওই ভাগাড়ের গর্তে ফিরে যান। আমার সন্তানদের উপর যদি অধিকার ফলাতে আসেন, তবে মনে রাখবেন—আমি তাদের মা, যে মা একাই একটা সমাজকে পিষে ফেলার ক্ষমতা রাখে!”

রেখা বেগম আঁচলটা সজোরে কাঁধে ফেলে দিয়ে একবারও পেছন ফিরে না তাকিয়ে গটগট করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। মতিউর চৌধুরী সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। তাঁর মনে হলো, আজ রেখা বেগম শুধু তাঁর ভুল ধরেননি, বরং তাঁর তথাকথিত ‘পুরুষত্ব’ ছিঁড়ে ফালিফালি করে পায়ের নিচে পিষে দিয়ে গেছেন।একজন নারীর মুখের ভাষা যেমন তুলোর মতো নরম,ঠিক তেমন প্রয়োজনে পাথর হতেও সময় নেয় না।কী ধারাল সেই বাক্য!

(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করার চেষ্টা করবেন।মন্তব্য করুন গল্প নিয়ে।)

চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply