হামিদাআক্তারইভা_Hayat
“এই রাত করে এখানে এলে কেন স্বার্থ ভাই?”
অনেকদিন পর নিশার সামনা-সামনি হয়েছে আজ স্বার্থ।অদ্ভুত শূন্যতায় বুক ভারী হয়ে ছিল এতদিন।সে জোছনার চাঁদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“এক রূপকথার পরীকে দেখতে এসেছি।”
নিশা বলল,
“তাকে দেখেছ?”
“হুঁ।”
“সে কোথায়?”
“দেখতে চাস?”
নিশা মাথা নাড়ায়।স্বার্থ হঠাৎ নিশার হাত ধরে পুকুর পাড়ের দিকে এগিয়ে যায়।লাইটের আলো আর চাঁদের আলোয় চারপাশ তখন একদম স্বচ্ছ।নিশা ভীতু হয়ে একবার পুরো বাড়িতে নজর বুলাল।বাড়ির প্রত্যেকটা ঘরের জানালা বন্ধ।ভাগ্যিস কেউ দেখেনি।
স্বার্থ নিশার হাতটা যখন শক্ত করে ধরল, নিশার হাতের তালু তখন ঘামছে। এক অদ্ভুত শিহরণ ওর সারা শরীরে বয়ে যাচ্ছে। স্বার্থ সচরাচর কারও হাত ধরে না, তার গম্ভীর ব্যক্তিত্বের আড়ালে এক ধরণের অদৃশ্য দেয়াল থাকে সবসময়। আজ সেই দেয়ালটা যেন জোছনার আলোয় গলে জল হয়ে গেছে।
পুকুর পাড়ের ঘাটে এসে স্বার্থ থামল। নিশা কিছুটা হাপিয়ে উঠেছে, ওর বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে উত্তেজনায়। স্বার্থ ইশারায় পুকুরের একদম স্থির, স্বচ্ছ পানির দিকে আঙুল তুলল। চাঁদের প্রতিবিম্ব পানির উপর এমনভাবে স্থির হয়ে আছে যেন কেউ রূপালি এক থালা রেখে দিয়েছে সেখানে।
স্বার্থ নিচু স্বরে বলল, “পানির দিকে তাকিয়ে দেখ নিশা, পেয়ে যাবি তোর পরীকে।”
নিশা উৎসুক হয়ে পানির উপর ঝুঁকে দাঁড়াল। চাঁদের আলোর প্রতিবিম্বের ঠিক পাশেই নিজের ছায়াটা দেখতে পেল ও। শান্ত পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিশা থমকে গেল। চুলে গোঁজা একটা বুনো ফুল আর ম্লান জোছনায় নিজের চেহারাটা আজ ওর কাছেই অচেনা মনে হলো।
নিশা ফিসফিস করে বলল,
“এখানে তো আমি… আমি কী সেই রূপকথার পরী?”
স্বার্থ ওর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। শিউলি ফুলের মিশ্রিত ঘ্রাণটা স্বার্থর নাকে এসে বারি মারল। স্বার্থ ম্লান হেসে বলল,
“হতে পারে।”
নিশার হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেল।বড় ভাই অর্ণর বন্ধু হিসেবে স্বার্থ এই বাড়িতে সবসময় গুরুগম্ভীর বড় ভাইয়ের মতোই ছিল। কিন্তু আজ স্বার্থর চোখে যে চাহনি, তা কোনো বড় ভাইয়ের নয়, বরং এক তৃষ্ণার্ত প্রেমিকের।
নিশা কোনো কথা বলতে পারল না,মাথা নিচু করে রইল। স্বার্থ ঘাটের সিঁড়িতে বসে পড়ল এবং পা দুটো ডুবিয়ে দিল হিমশীতল পানিতে। নিশা দ্বিধা কাটিয়ে ওর থেকে একটু দূরত্ব রেখে পাশে বসল। পা দুটো পানিতে ছোঁয়াতেই শীতল একটা অনুভূতি ওর মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করল।
চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝে মাঝে পানির উপর মাছের লাফিয়ে ওঠার শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।চৌধুরী বাড়ির অতিকায় অট্টালিকাটা পেছনের অন্ধকারে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির সবাই এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কেবল এই নির্জন পুকুরঘাটে দুটো আত্মা জেগে আছে।
ঝুম বাতাসে ভারী চারপাশ।মৃদু লাজুক অনুভূতি মিশ্রিত আখি জোড়া ফ্যালফ্যাল করে তাকাল স্বার্থর দিকে।স্বার্থ পেছনের সিঁড়িতে হাত ভর করে হ্যালান দিয়ে বলল,
“কিছু মানুষের সান্নিধ্য এক চিলতে রোদের মতো, যা সারাদিনের সব ক্লান্তি আর অন্ধকার এক নিমিষেই ধুইয়ে মুছে দেয়।”
নিশা লাজুক গলায় বলল,
“হয়তো।”
স্বার্থ নিশার দিকে ঘুরে বসল এবার।সামনে ছোট্ট বাচ্চা একটা মেয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।গলায় ঝুলে আছে নীল-সাদা রঙের একটা ওড়না।স্বার্থ তার ওড়না টেনে সুন্দর করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে বলল,
“বউ হবি নিশু?”
নিশা চমকে উঠে বলল,
“কার?”
স্বার্থ নিশার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি উপেক্ষা করে একটু নিকটে এগিয়ে এলো।তবে তাদের অঙ্গ স্পর্শ হলো না।নিশার দৃষ্টিতে তখন লাজ মিশে আছে।স্বার্থ হাসল।বলল,
“আমার বউ হবি নিশু?”
চমকে উঠল মেয়েটা।হতভম্ব হয়ে কিছু বলার আগেই স্বার্থ তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে টানা দমে বলল,
“আম্মু বলেছে একটা পুতুলকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘরে তুলে নিতে।ভাবছি এবার বিয়েটা করে ফেলব।রাজী থাকলে বল,কালই আমি তোর মা-বাবার সাথে কথা বলব।”
নিশা অবাকের চরম পর্যায়।স্বার্থ সোজা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে এই রাত করে?আদৌ এটা স্বপ্ন নাকি সত্যি?নিশা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল।আমতা আমতা করে লাজুক দৃষ্টি নত করতেই স্বার্থ ফের শান্ত গলায় বলল,
“আম্মু কিন্তু তোকে আমার বউ হিসেবে বেশ পছন্দ করেছে।”
নিশা চমকে উঠে বলল,
“কী বলছো!”
স্বার্থ হেসে উঠল।হঠাৎ সেই অন্ধকারের মধ্যে নিশার পেছন থেকে প্রেমের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“প্রেম হলে এবার আমার বোনকে ছাড়ো।”
নিশার দৃষ্টি ছিঁটকে পেছনে ফিরল।স্বার্থ বিরক্ত হয়ে সামনে তাকাল।প্রেমকে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিশা হুড়মুড়িয়ে উঠে কোনো বাক্য ব্যয় না করে দৌঁড়ে গেল বাড়ির ভেতর।স্বার্থ ফোঁস করে চাপা নিশ্বাস ফেলল।অতিষ্ট হয়ে বলল,
“তুই কী আমাকে একটু শান্তি মতো প্রেমটাও করতে দিবি না?”
প্রেম গম্ভীর হয়ে স্বার্থর পাশে বসল।ভাব খানা এমন যেন পারলে স্বার্থর কোলে উঠে বসে।
“এত প্রেম করে কী করবে সোনা?আমি আছি না?”
স্বার্থ হতবুদ্ধি হয়ে বলল,
“তুই থাকলেই কী?তোর সাথে আমি প্রেম করব এখন?”
প্রেম দুষ্টু হেসে শব্দ আওড়াল,
“না ছুঁয়ে তোমার বাচ্চার বাপ হলাম কী করে?”
স্বার্থ দাঁত কটমট করল খানিকক্ষণ।হতচ্ছাড়া তার প্রেমে বাম হাত ঢুকিয়ে এখন বাঁদরামি করতে এসেছে।
“প্রেমার বাচ্চা,তোর বোনকে শুধু একটাবার বিয়ে করতে পারলেই হলো, তখন হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দেব শ্যালক হওয়ার মজাটা কী!”
প্রেম উচ্চস্বরে হেসে উঠল। স্বার্থর কাঁধে হাত রেখে বাঁকা হেসে বলল,
“ততদিন তো আমায় সহ্য করতেই হবে, হবু দুলাভাই! আর মা কিন্তু এখনও আমার কথাতেই ওঠে বসে। আমি যদি একবার গিয়ে বলি যে স্বার্থ ছেলেটা মোটেও সুবিধের নয়, তবে তোমার ওই বিয়ের প্রস্তাব কাল সকালেই ডাস্টবিনে যাবে!”
স্বার্থ দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“তুই একটা আস্ত বিটকেল! বন্ধুর ভাই হয়ে পিঠে ছু রি মারছিস?”
“সে তুমি যা ইচ্ছে তাই করো।আমার বিয়ের আগে তোমাদের বিয়ে হচ্ছে না,হবেও না।”
নাজনীন জয়াকে নিয়ে অতিষ্ট।মেয়েটা একটা কাজও ঠিক মতো করতে পারে না।খানিকক্ষণ আগেই এক চোট বকা খেয়েছে নাজনীনের কাছে।মুখ ফুলিয়ে রেগে-মেগে ঠান্ডা ফ্লোরে বিছানা করে শুয়েছে।নাজনীন বুকে হাত গুঁজে বসে আছে বিছানায়।মেজাজটা প্রচুণ্ড খারাপ হচ্ছে এবার।সে ধমকে উঠল এক পর্যায়,
“তুলে কিন্তু আছাড় মারব জয়া।”
জয়া ঘুরে তাকাল।চোখ কটমট করে বলল,
“তুমি আমার বালের জামাই।শান্তি মতো একটা কথাও কী বলতে পারব না?বলতে যখন দাওনি,তখন বিরক্ত করো না আমাকে।”
“সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত আমি।এখন তোর নাটক আমার সহ্য হচ্ছে না।”
“সহ্য করতে বলেছি?যাও না!গিয়ে ঘুমাও তুমি।”
নাজনীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচে নেমে এলো।জয়া আঁতকে উঠে সরে যাওয়ার আগেই নাজনীন পাঁজা কোলে তুলে নিল ওকে।জয়া হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে বলল,
“ছাড়ো আমাকে।”
নাজনীন সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে বলল,
“চুপ করবি?বাড়ির মানুষ কী ভাববে?”
“তুমি নামাও আমাকে।নাহলে চিৎকার করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলব আমি।”
নাজনীন তবুও কথা শুনল না।বিছানায় এক প্রকার ছুড়ে মারল জয়াকে।এইটুকু পুঁচকে একটা মেয়ে তাকে জ্বালিয়ে মারছে,ভাবা যায়?জয়া গাল ফুলিয়ে বসল।চোখে টলমল করছে পানি।নাক টেনে অভিমানী গলায় বলল,
“আপনাকে বিয়ে করাটা বড্ড ভুল হয়েছে আমার।আব্বাকে আমি আজই বলব আপনার সাথে আমি সংসার করব না।”
নাজনীন বিরক্ত হয়ে বালিশে মাথা রেখে বলল,
“আমি ছাড়া আর কোন পাগল তোকে সহ্য করবে শুনি?”
“ছেলের কী অভাব হয়েছে?কত ছেলে আমার পেছনে ঘুরে জানেন?কলেজের কত বড় ভাইয়ে..”
হঠাৎ নাজনীনের হাতের থাবায় কথা ঠোঁটে আঁটকে গেল জয়ার।ব্যথায় গালটা টনটন করে উঠল তৎক্ষণাৎ।এবার চাপা কান্না গলা ফেটে বের হলো।নাজনীন উন্মাদ না হলেও বেপরোয়া পুরুষ।স্ত্রীর মুখে অন্য পুরুষদের নাম মুখে সহ্য করাও যেন দুষ্কর।নাজনীন দাঁত চেপেছে ততক্ষণে।জয়া ভয়ে গুটিয়ে আসতে চাইলে নাজনীন ধারাল গলায় বলে,
“মেরে মাটিতে পুঁতে রাখব তোকে আরেকবার অন্য পুরুষের নাম মুখে আনলে।তোর বালের পড়াশোনা আজকে থেকে বন্ধ।বাড়ির বাইরে পা রাখলে ঠ্যাং ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে রাখব।”
জয়া আজ প্রতিবাদ করতে পারল না।নাজনীনের রাগ সম্পর্কে সে জানে।কান্নার শব্দ হচ্ছিল বলে সেটাও কমিয়ে এনেছে ভয়ে।এক পর্যায় নাজনীন চোখ বন্ধ করলে জয়া গুটিয়ে বিছানার এক কোনায় গিয়ে শুয়ে পড়ে।তর্কে যাওয়ার সাহস পায় না আর।
ঘণ্টা কয়েক পেরোলেই আঁধার কেটে আলো ঘনিয়ে এলো ধরনি জুড়ে।একদম যে আলো ফুটেছে তাও নয়।মিটিমিটি আলোয় সবে অন্ধকার কাটছে।অর্ণর সেই বিশাল ঘরের পরিস্কার মেঝেতে মাথায় আঁচল পেঁচিয়ে জায়নামাজে বসে আছে কায়নাত।অর্ণর উপস্থিতির পর তার নামাজ কাজা হয়েছে অনেক।কাজের চাপেও তেমন সময় হয়নি।আজ ভোরে গোসল সেরেই দাঁড়িয়েছিল সালাত আদায় করতে।মনটা আজ বড্ড ফুরফুরে।মা আগে বলতেন,মন পরিষ্কার রেখে আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে কিছু চাইলে তিনি কখনও নিরাশ করেন না কল্যাণকর হলে।এর প্রমাণ সে পেয়েছে,এবং পাচ্ছে।আগে যখন অর্ণর সাথে তার কথা হত না,তখন কতই না মোনাজাতে তাকে রেখেছিল।এখনও রাখা হয়।শান্তি শান্তি অনুভূতি জেঁকে বসে হৃদয়ে।
কায়নাত ঘাড় বাঁকিয়ে অর্ণর ঘুমন্ত মুখ খানা দেখল।ভাবল অর্ণ সব সময় নামাজে দাঁড়ায় না।সে ঘড়িতে সময় দেখে হতাশার নিশ্বাস ফেলল।সময়ও তো নেই আর!জায়নামাজ উঠিয়ে জানালার সাদা পর্দা খুলে দিতেই হাল্কা আলোয় ঘর ভরে এলো।মৃদু বাতাসে ভরিয়ে দিল কক্ষজুড়ে।কায়নাত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।বাইরে দেখা যাচ্ছে দাদা আর দাদি হেঁটে হেঁটে বাগান ঘুরছেন।কী মিষ্টি মাখা সেই মুহূর্ত।প্রায় প্রত্যেকদিন তারা এভাবে সময় কাটান।কায়নাতের মনে হলো একদিন অর্ণ আর সেও ঠিক এভাবে পাশাপাশি হাতে হাত রেখে হাঁটবে,হাসবে।আসবে এমন একদিন?যেদিন অর্ণ কায়নাতের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলবে, “কায়নাত সুবাহ,তোমাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।”
কায়নাত ঘর থেকে বের হলো একটু পরেই।নিচে নামতে নামতে নজরে এলো শ্বশুর আর বড় চাচা শ্বশুরকে।তারা ড্রয়িংরুমে বসে কথা বলছেন।কায়নাত মাথায় কাপড় টানল।সিঁড়ির শেষ প্রান্তে নামতেই মাশফিক চৌধুরী গাল ভরে হেসে ডেকে উঠলেন তাকে,
“আম্মু,এখানে আসো তো।”
কায়নাত গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে সালাম করল মতিউর চৌধুরীকে।তিনি আশ্চর্য হলেন কায়নাতকে দেখে।কাল ভালো করে খেয়াল না করলেও আজ মনে হলো কালকের তুলনায় আজ একটু বেশি বাচ্চা বাচ্চা লাগছে তাকে দেখতে।তিনি সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
“তোমার নাম কীযেন মা?”
কায়নাত ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“কায়নাত সুবাহ।”
তিনি মাথা নাড়লেন।মাশফিক চৌধুরী ভীষণ আদুরে গলায় আবদার করে বললেন,
“বাবার জন্য চা বানাতে পারবে আম্মু?”
কায়নাত তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে ছুটল রান্না ঘরে।মতিউর চৌধুরী বললেন,
“নাজনীনের ব্যাপার নাহয় আলাদা।কিন্তু অর্ণর মতো একটা ছেলের সাথে বাচ্চা একটা মেয়ের বিয়ে দিয়েছিস কেন?”
মাশফিক চৌধুরী হেসে ফেললেন ভাইয়ের প্রশ্নে।উত্তর না দিয়ে বললেন,
“ছোট-বড় কোনো বিষয় নয় ভাইজান।আমার ছেলের বউ হিসেবে যোগ্য পাত্রী কায়নাত।যেমন গুন,ঠিক তেমন রূপ।”
“বটেই!যাক ভালো হয়েছে।আব্বা বললেন নিধির জন্য তিনি একটা ভালো পাত্র দেখেছেন?”
“আমিও তো তাই শুনলাম।আগামীকালই হয়তো আসবেন তারা।”
“ছেলের বাড়ি কোথায়?কী করে কিছু জানিস?”
“ছেলে কী করে বলতে পারছি না,তবে ফ্যামিলি নাকি খুবই ভালো।”
তপ্ত নিশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক।এমন সময় অর্ণ ঘুমঘুম চোখে নিচে নেমে এলো।ঘুমের রেশ এখন অব্দি যায়নি চোখ থেকে।কায়নাত চা নিয়ে এলো তাদের জন্য।হঠাৎ অর্ণর দিকে চোখ যেতেই কপাল কুঁচকে এলো তার।লোকটা ফ্রেশ না হয়েই নিচে চলে এসেছে?অর্ণ বাবা কিংবা চাচাকে দেখেনি।ঘরে ব্রাশ খুঁজে পাচ্ছিল না বলে চিৎকার করে কয়েকবার কায়নাতকে ডেকেওছে।তবে উত্তর মেলেনি।বাধ্য হয়ে নিচে নেমে এসেছে।অর্ণ কায়নাতকে দেখতে পেয়েই জড়াল গলায় বলল,
“বেয়াদব মহিলা,আমার ব্রাশ কোথায় রেখেছ?”
কায়নাত এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,
“ঘরেই তো আছে।”
অর্ণ শুনল তার কথা?সে খোঁপ করে কায়নাতের হাত চেপে ধরে ছুটল নিচ তলার কমন ওয়াশরুমের দিকে।কায়নাত হতভম্ব হয়ে পিছু ফিরে তাকাল একবার।মাশফিক চৌধুরী আর মতিউর চৌধুরী বিব্রত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছেন তৎক্ষণাৎ।কায়নাত দাঁত খিঁচে নিল অর্ণর কান্ড দেখে।বেহায়া লোক ইজ্জতটুকুও রাখতে দিল না।
ওয়াশরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কায়নাত।অর্ণ কোনোরকম ফ্রেশ হয়ে বের হলো।খানিকক্ষণ পর উপরে গিয়ে একেবারে ফ্রেশ হবে ভাবল।এখন অন্তত এক কাপ রং চা খাওয়া দরকার।সে বের হতেই কায়নাত মুখ কালো করে ঘাড় উঁচু করল।ভেজা মুখে পানি চিকচিক করছে অর্ণর।কায়নাত হাঁ করে কিছু বলার পূর্বেই অর্ণ আচঁল টেনে ধরল।ঝুঁকে এসে ভেজা মুখ মুছে আবার সুন্দর করে সেটা কায়নাতের মাথায় ঘোমটা দিয়ে আদেশের স্বরে বলল,
“এক কাপ রং চা দাও।”
কায়নাত আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আপনি চা খাবেন?”
“না!আমি তোমাকে খাব।”
“কী!”
অর্ণ বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে ড্রয়িংরুমে ফিরতেই সোফায় বাবা আর চাচাকে দেখে এগিয়ে গিয়ে বসল তাদের পাশে।কায়নাত চোখ পাঁকাতে পাঁকাতে রান্না ঘরে গেলেই মাশফিক চৌধুরী হাল্কা গলা কাঁশলেন।
“সিলেট যাচ্ছ কবে?”
অর্ণ যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে।বাবা যে তাকে একটা প্রশ্ন করেছে সেদিকে তার খেয়াল নেই।কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে রান্না ঘরের দিকে।বিরক্ত হলেন ভদ্রলোক।ছেলের এই বদঅভ্যাস তিনি ভীষণ অপছন্দ করেন।তিনি মুখ খোলার আগেই অর্ণ সোজা একদমে বলল,
“আমার বউয়ের শরীর ভালো না।ও সুস্থ হলে যাব।”
কেঁশে উঠলেন তিনি।মতিউর চৌধুরী হাঁ করে তাকিয়েছেন অর্ণর শক্ত চোয়ালের দিকে।কী সাংঘাতিক ছেলে!বাপ-চাচার সামনে কেমন বেহায়ার মতো বউ বউ করছে।তিনি ল্যাংটা দেখেছেন এই ছেলেকে,আর আজ সেই ছেলে তার সামনে বসেই বউ বউ করছে।
অর্ণ কপাল কুঁচকে বাবার দিকে তাকাল।বলল,
“চা-টাও ভালো করে খেতে পারো না নাকি?”
মাশফিক চৌধুরী শুকনো ঢোক গিলে বললেন,
“তুমি তো অফিসের কাজে যাচ্ছ।সেখানে কায়নাত গিয়ে কী করবে?”
“বউকে রেখে সেখানে আমি একা গিয়ে কী করব?তুমি তোমার বউ রেখে কোথাও যাও?”
থমথমে খেয়ে গেলেন তিনি।ভারী আশ্চর্য!যেই ছেলে কাল অব্দি বউকে বউ মানি না বলে চিৎকার করছিল,সেই ছেলে আজ বেহায়ার মতো বাবার সামনে বউ বউ করছে।তিনি নাক মুখ কুঁচকে ফেললেন।কায়নাত এলো চা নিয়ে।অর্ণর হাতে চা দিয়ে আবার ছুটল রান্না ঘরে।সেখানে কাজ চলছে এই মুহূর্তে।ভাগ্যিস বউমা এই কথোপথন শোনেনি।তিনি নাক ছিঁটকে উঠে গেলেন ভাইকে নিয়ে।তখন সেখানে উড়ে এসে উপস্থিত হলো স্বার্থ আর প্রেম।স্বার্থ সোজা অর্ণর শরীর ঘেঁষে বসে ফিসফিস করে বলল,
“আমার বাবা হতে ইচ্ছে করছে সোনা।”
অর্ণ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
“বিয়ে কর।”
“দে না সোনাপাখি।”
অর্ণ কপাল কুঁচকে বলল,
“কী দিব?”
স্বার্থ শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে মেয়েদের মতো নখ কামড়ে বলল,
“তোর ছোট বোনটাকে দিয়ে দে।বিয়েটা করে তাড়াতাড়ি তোকে মামা ডাক শোনাব।বিশ্বাস না করলে শুধু বিয়েটা দিয়ে দেখ,জাস্ট দুমাসের মধ্যে খুশির সংবাদ শোনাব তোকে।”
অর্ণ দাঁত কটমট করে তাকাল।স্বার্থ চুপসে যাওয়া মুখ নিয়ে অর্ণর পেটে আঙুল দিয়ে গুতো দিয়ে বলল,
“আচ্ছা আগে তুই বাপ হবি সোনা।তোর পরে আমি বাপ হব,তবুও বিয়েটা দে না!বউ ছাড়া রাতে ঘুম হয় না আমার।”
অর্ণ চায়ের কাপটা সশব্দে টেবিলে নামিয়ে রেখে স্বর্থের দিকে এক পলক তাকাল। তারপর পাশে প্রেমের দিকে ইশারা করে বলল,
“শুনলি তো? ও নাকি রাতে বউ ছাড়া ঘুমাতে পারে না। এক কাজ কর, আজকে রাতে তুই স্বার্থর সাথে গিয়ে ঘুমাবি। মশারির দড়ি ছিঁড়ে যাক বা খাট ভেঙে পড়ুক, ওকে একদম একা না রাখবি না।”
স্বার্থ চোখ বড় বড় করে বলল,
“আরে ভাই! প্রেমের সাথে ঘুমালে কী আর বাপের সাধ মিটবে? আমি চাই তোর ভাগ্নের আসল বাবা হতে!”
প্রেম এবার মাঝখানে নাক গলিয়ে বলল,
“ভাইয়া, কথা মন্দ বলেনি।তুমি তো বললে,বউ ছাড়া রাতে ঘুম হয় না’। তো বউ শব্দটার মানে কী? শান্তি! আর আমার পাশে ঘুমালে তুমি যে শান্তি পাবে, সেটা কোনো বউ দিতে পারবে না।”
স্বার্থ নিভু গলায় অর্ণকে বলল,
“তোর এই ভাই কী সত্যিই গে?শালা সব সময় এমন করে কেন?দেখ ভাই,আমি তোকে আমার মনের দুঃখের কথা বলেছি।তুই একটাবার ভেবে দেখ,আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।তোর বোনটাকে দিয়ে দে না সোনা।”
(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করার চেষ্টা করবেন।)
চলবে…?
প্রেমবসন্ত _বই প্রি-অর্ডার করেছেন?ছাড় মূল্য থাকতে অর্ডার করুন আপনার পছন্দের যেকোনো বুকশপে।
প্রেমবসন্ত_২ ।৩২।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
“এই রাত করে এখানে এলে কেন স্বার্থ ভাই?”
অনেকদিন পর নিশার সামনা-সামনি হয়েছে আজ স্বার্থ।অদ্ভুত শূন্যতায় বুক ভারী হয়ে ছিল এতদিন।সে জোছনার চাঁদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“এক রূপকথার পরীকে দেখতে এসেছি।”
নিশা বলল,
“তাকে দেখেছ?”
“হুঁ।”
“সে কোথায়?”
“দেখতে চাস?”
নিশা মাথা নাড়ায়।স্বার্থ হঠাৎ নিশার হাত ধরে পুকুর পাড়ের দিকে এগিয়ে যায়।লাইটের আলো আর চাঁদের আলোয় চারপাশ তখন একদম স্বচ্ছ।নিশা ভীতু হয়ে একবার পুরো বাড়িতে নজর বুলাল।বাড়ির প্রত্যেকটা ঘরের জানালা বন্ধ।ভাগ্যিস কেউ দেখেনি।
স্বার্থ নিশার হাতটা যখন শক্ত করে ধরল, নিশার হাতের তালু তখন ঘামছে। এক অদ্ভুত শিহরণ ওর সারা শরীরে বয়ে যাচ্ছে। স্বার্থ সচরাচর কারও হাত ধরে না, তার গম্ভীর ব্যক্তিত্বের আড়ালে এক ধরণের অদৃশ্য দেয়াল থাকে সবসময়। আজ সেই দেয়ালটা যেন জোছনার আলোয় গলে জল হয়ে গেছে।
পুকুর পাড়ের ঘাটে এসে স্বার্থ থামল। নিশা কিছুটা হাপিয়ে উঠেছে, ওর বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে উত্তেজনায়। স্বার্থ ইশারায় পুকুরের একদম স্থির, স্বচ্ছ পানির দিকে আঙুল তুলল। চাঁদের প্রতিবিম্ব পানির উপর এমনভাবে স্থির হয়ে আছে যেন কেউ রূপালি এক থালা রেখে দিয়েছে সেখানে।
স্বার্থ নিচু স্বরে বলল, “পানির দিকে তাকিয়ে দেখ নিশা, পেয়ে যাবি তোর পরীকে।”
নিশা উৎসুক হয়ে পানির উপর ঝুঁকে দাঁড়াল। চাঁদের আলোর প্রতিবিম্বের ঠিক পাশেই নিজের ছায়াটা দেখতে পেল ও। শান্ত পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিশা থমকে গেল। চুলে গোঁজা একটা বুনো ফুল আর ম্লান জোছনায় নিজের চেহারাটা আজ ওর কাছেই অচেনা মনে হলো।
নিশা ফিসফিস করে বলল,
“এখানে তো আমি… আমি কী সেই রূপকথার পরী?”
স্বার্থ ওর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। শিউলি ফুলের মিশ্রিত ঘ্রাণটা স্বার্থর নাকে এসে বারি মারল। স্বার্থ ম্লান হেসে বলল,
“হতে পারে।”
নিশার হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেল।বড় ভাই অর্ণর বন্ধু হিসেবে স্বার্থ এই বাড়িতে সবসময় গুরুগম্ভীর বড় ভাইয়ের মতোই ছিল। কিন্তু আজ স্বার্থর চোখে যে চাহনি, তা কোনো বড় ভাইয়ের নয়, বরং এক তৃষ্ণার্ত প্রেমিকের।
নিশা কোনো কথা বলতে পারল না,মাথা নিচু করে রইল। স্বার্থ ঘাটের সিঁড়িতে বসে পড়ল এবং পা দুটো ডুবিয়ে দিল হিমশীতল পানিতে। নিশা দ্বিধা কাটিয়ে ওর থেকে একটু দূরত্ব রেখে পাশে বসল। পা দুটো পানিতে ছোঁয়াতেই শীতল একটা অনুভূতি ওর মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করল।
চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝে মাঝে পানির উপর মাছের লাফিয়ে ওঠার শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।চৌধুরী বাড়ির অতিকায় অট্টালিকাটা পেছনের অন্ধকারে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির সবাই এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কেবল এই নির্জন পুকুরঘাটে দুটো আত্মা জেগে আছে।
ঝুম বাতাসে ভারী চারপাশ।মৃদু লাজুক অনুভূতি মিশ্রিত আখি জোড়া ফ্যালফ্যাল করে তাকাল স্বার্থর দিকে।স্বার্থ পেছনের সিঁড়িতে হাত ভর করে হ্যালান দিয়ে বলল,
“কিছু মানুষের সান্নিধ্য এক চিলতে রোদের মতো, যা সারাদিনের সব ক্লান্তি আর অন্ধকার এক নিমিষেই ধুইয়ে মুছে দেয়।”
নিশা লাজুক গলায় বলল,
“হয়তো।”
স্বার্থ নিশার দিকে ঘুরে বসল এবার।সামনে ছোট্ট বাচ্চা একটা মেয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।গলায় ঝুলে আছে নীল-সাদা রঙের একটা ওড়না।স্বার্থ তার ওড়না টেনে সুন্দর করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে বলল,
“বউ হবি নিশু?”
নিশা চমকে উঠে বলল,
“কার?”
স্বার্থ নিশার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি উপেক্ষা করে একটু নিকটে এগিয়ে এলো।তবে তাদের অঙ্গ স্পর্শ হলো না।নিশার দৃষ্টিতে তখন লাজ মিশে আছে।স্বার্থ হাসল।বলল,
“আমার বউ হবি নিশু?”
চমকে উঠল মেয়েটা।হতভম্ব হয়ে কিছু বলার আগেই স্বার্থ তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে টানা দমে বলল,
“আম্মু বলেছে একটা পুতুলকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘরে তুলে নিতে।ভাবছি এবার বিয়েটা করে ফেলব।রাজী থাকলে বল,কালই আমি তোর মা-বাবার সাথে কথা বলব।”
নিশা অবাকের চরম পর্যায়।স্বার্থ সোজা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে এই রাত করে?আদৌ এটা স্বপ্ন নাকি সত্যি?নিশা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল।আমতা আমতা করে লাজুক দৃষ্টি নত করতেই স্বার্থ ফের শান্ত গলায় বলল,
“আম্মু কিন্তু তোকে আমার বউ হিসেবে বেশ পছন্দ করেছে।”
নিশা চমকে উঠে বলল,
“কী বলছো!”
স্বার্থ হেসে উঠল।হঠাৎ সেই অন্ধকারের মধ্যে নিশার পেছন থেকে প্রেমের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“প্রেম হলে এবার আমার বোনকে ছাড়ো।”
নিশার দৃষ্টি ছিঁটকে পেছনে ফিরল।স্বার্থ বিরক্ত হয়ে সামনে তাকাল।প্রেমকে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিশা হুড়মুড়িয়ে উঠে কোনো বাক্য ব্যয় না করে দৌঁড়ে গেল বাড়ির ভেতর।স্বার্থ ফোঁস করে চাপা নিশ্বাস ফেলল।অতিষ্ট হয়ে বলল,
“তুই কী আমাকে একটু শান্তি মতো প্রেমটাও করতে দিবি না?”
প্রেম গম্ভীর হয়ে স্বার্থর পাশে বসল।ভাব খানা এমন যেন পারলে স্বার্থর কোলে উঠে বসে।
“এত প্রেম করে কী করবে সোনা?আমি আছি না?”
স্বার্থ হতবুদ্ধি হয়ে বলল,
“তুই থাকলেই কী?তোর সাথে আমি প্রেম করব এখন?”
প্রেম দুষ্টু হেসে শব্দ আওড়াল,
“না ছুঁয়ে তোমার বাচ্চার বাপ হলাম কী করে?”
স্বার্থ দাঁত কটমট করল খানিকক্ষণ।হতচ্ছাড়া তার প্রেমে বাম হাত ঢুকিয়ে এখন বাঁদরামি করতে এসেছে।
“প্রেমার বাচ্চা,তোর বোনকে শুধু একটাবার বিয়ে করতে পারলেই হলো, তখন হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দেব শ্যালক হওয়ার মজাটা কী!”
প্রেম উচ্চস্বরে হেসে উঠল। স্বার্থর কাঁধে হাত রেখে বাঁকা হেসে বলল,
“ততদিন তো আমায় সহ্য করতেই হবে, হবু দুলাভাই! আর মা কিন্তু এখনও আমার কথাতেই ওঠে বসে। আমি যদি একবার গিয়ে বলি যে স্বার্থ ছেলেটা মোটেও সুবিধের নয়, তবে তোমার ওই বিয়ের প্রস্তাব কাল সকালেই ডাস্টবিনে যাবে!”
স্বার্থ দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“তুই একটা আস্ত বিটকেল! বন্ধুর ভাই হয়ে পিঠে ছু রি মারছিস?”
“সে তুমি যা ইচ্ছে তাই করো।আমার বিয়ের আগে তোমাদের বিয়ে হচ্ছে না,হবেও না।”
নাজনীন জয়াকে নিয়ে অতিষ্ট।মেয়েটা একটা কাজও ঠিক মতো করতে পারে না।খানিকক্ষণ আগেই এক চোট বকা খেয়েছে নাজনীনের কাছে।মুখ ফুলিয়ে রেগে-মেগে ঠান্ডা ফ্লোরে বিছানা করে শুয়েছে।নাজনীন বুকে হাত গুঁজে বসে আছে বিছানায়।মেজাজটা প্রচুণ্ড খারাপ হচ্ছে এবার।সে ধমকে উঠল এক পর্যায়,
“তুলে কিন্তু আছাড় মারব জয়া।”
জয়া ঘুরে তাকাল।চোখ কটমট করে বলল,
“তুমি আমার বালের জামাই।শান্তি মতো একটা কথাও কী বলতে পারব না?বলতে যখন দাওনি,তখন বিরক্ত করো না আমাকে।”
“সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত আমি।এখন তোর নাটক আমার সহ্য হচ্ছে না।”
“সহ্য করতে বলেছি?যাও না!গিয়ে ঘুমাও তুমি।”
নাজনীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচে নেমে এলো।জয়া আঁতকে উঠে সরে যাওয়ার আগেই নাজনীন পাঁজা কোলে তুলে নিল ওকে।জয়া হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে বলল,
“ছাড়ো আমাকে।”
নাজনীন সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে বলল,
“চুপ করবি?বাড়ির মানুষ কী ভাববে?”
“তুমি নামাও আমাকে।নাহলে চিৎকার করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলব আমি।”
নাজনীন তবুও কথা শুনল না।বিছানায় এক প্রকার ছুড়ে মারল জয়াকে।এইটুকু পুঁচকে একটা মেয়ে তাকে জ্বালিয়ে মারছে,ভাবা যায়?জয়া গাল ফুলিয়ে বসল।চোখে টলমল করছে পানি।নাক টেনে অভিমানী গলায় বলল,
“আপনাকে বিয়ে করাটা বড্ড ভুল হয়েছে আমার।আব্বাকে আমি আজই বলব আপনার সাথে আমি সংসার করব না।”
নাজনীন বিরক্ত হয়ে বালিশে মাথা রেখে বলল,
“আমি ছাড়া আর কোন পাগল তোকে সহ্য করবে শুনি?”
“ছেলের কী অভাব হয়েছে?কত ছেলে আমার পেছনে ঘুরে জানেন?কলেজের কত বড় ভাইয়ে..”
হঠাৎ নাজনীনের হাতের থাবায় কথা ঠোঁটে আঁটকে গেল জয়ার।ব্যথায় গালটা টনটন করে উঠল তৎক্ষণাৎ।এবার চাপা কান্না গলা ফেটে বের হলো।নাজনীন উন্মাদ না হলেও বেপরোয়া পুরুষ।স্ত্রীর মুখে অন্য পুরুষদের নাম মুখে সহ্য করাও যেন দুষ্কর।নাজনীন দাঁত চেপেছে ততক্ষণে।জয়া ভয়ে গুটিয়ে আসতে চাইলে নাজনীন ধারাল গলায় বলে,
“মেরে মাটিতে পুঁতে রাখব তোকে আরেকবার অন্য পুরুষের নাম মুখে আনলে।তোর বালের পড়াশোনা আজকে থেকে বন্ধ।বাড়ির বাইরে পা রাখলে ঠ্যাং ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে রাখব।”
জয়া আজ প্রতিবাদ করতে পারল না।নাজনীনের রাগ সম্পর্কে সে জানে।কান্নার শব্দ হচ্ছিল বলে সেটাও কমিয়ে এনেছে ভয়ে।এক পর্যায় নাজনীন চোখ বন্ধ করলে জয়া গুটিয়ে বিছানার এক কোনায় গিয়ে শুয়ে পড়ে।তর্কে যাওয়ার সাহস পায় না আর।
ঘণ্টা কয়েক পেরোলেই আঁধার কেটে আলো ঘনিয়ে এলো ধরনি জুড়ে।একদম যে আলো ফুটেছে তাও নয়।মিটিমিটি আলোয় সবে অন্ধকার কাটছে।অর্ণর সেই বিশাল ঘরের পরিস্কার মেঝেতে মাথায় আঁচল পেঁচিয়ে জায়নামাজে বসে আছে কায়নাত।অর্ণর উপস্থিতির পর তার নামাজ কাজা হয়েছে অনেক।কাজের চাপেও তেমন সময় হয়নি।আজ ভোরে গোসল সেরেই দাঁড়িয়েছিল সালাত আদায় করতে।মনটা আজ বড্ড ফুরফুরে।মা আগে বলতেন,মন পরিষ্কার রেখে আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে কিছু চাইলে তিনি কখনও নিরাশ করেন না কল্যাণকর হলে।এর প্রমাণ সে পেয়েছে,এবং পাচ্ছে।আগে যখন অর্ণর সাথে তার কথা হত না,তখন কতই না মোনাজাতে তাকে রেখেছিল।এখনও রাখা হয়।শান্তি শান্তি অনুভূতি জেঁকে বসে হৃদয়ে।
কায়নাত ঘাড় বাঁকিয়ে অর্ণর ঘুমন্ত মুখ খানা দেখল।ভাবল অর্ণ সব সময় নামাজে দাঁড়ায় না।সে ঘড়িতে সময় দেখে হতাশার নিশ্বাস ফেলল।সময়ও তো নেই আর!জায়নামাজ উঠিয়ে জানালার সাদা পর্দা খুলে দিতেই হাল্কা আলোয় ঘর ভরে এলো।মৃদু বাতাসে ভরিয়ে দিল কক্ষজুড়ে।কায়নাত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।বাইরে দেখা যাচ্ছে দাদা আর দাদি হেঁটে হেঁটে বাগান ঘুরছেন।কী মিষ্টি মাখা সেই মুহূর্ত।প্রায় প্রত্যেকদিন তারা এভাবে সময় কাটান।কায়নাতের মনে হলো একদিন অর্ণ আর সেও ঠিক এভাবে পাশাপাশি হাতে হাত রেখে হাঁটবে,হাসবে।আসবে এমন একদিন?যেদিন অর্ণ কায়নাতের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলবে, “কায়নাত সুবাহ,তোমাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।”
কায়নাত ঘর থেকে বের হলো একটু পরেই।নিচে নামতে নামতে নজরে এলো শ্বশুর আর বড় চাচা শ্বশুরকে।তারা ড্রয়িংরুমে বসে কথা বলছেন।কায়নাত মাথায় কাপড় টানল।সিঁড়ির শেষ প্রান্তে নামতেই মাশফিক চৌধুরী গাল ভরে হেসে ডেকে উঠলেন তাকে,
“আম্মু,এখানে আসো তো।”
কায়নাত গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে সালাম করল মতিউর চৌধুরীকে।তিনি আশ্চর্য হলেন কায়নাতকে দেখে।কাল ভালো করে খেয়াল না করলেও আজ মনে হলো কালকের তুলনায় আজ একটু বেশি বাচ্চা বাচ্চা লাগছে তাকে দেখতে।তিনি সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
“তোমার নাম কীযেন মা?”
কায়নাত ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“কায়নাত সুবাহ।”
তিনি মাথা নাড়লেন।মাশফিক চৌধুরী ভীষণ আদুরে গলায় আবদার করে বললেন,
“বাবার জন্য চা বানাতে পারবে আম্মু?”
কায়নাত তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে ছুটল রান্না ঘরে।মতিউর চৌধুরী বললেন,
“নাজনীনের ব্যাপার নাহয় আলাদা।কিন্তু অর্ণর মতো একটা ছেলের সাথে বাচ্চা একটা মেয়ের বিয়ে দিয়েছিস কেন?”
মাশফিক চৌধুরী হেসে ফেললেন ভাইয়ের প্রশ্নে।উত্তর না দিয়ে বললেন,
“ছোট-বড় কোনো বিষয় নয় ভাইজান।আমার ছেলের বউ হিসেবে যোগ্য পাত্রী কায়নাত।যেমন গুন,ঠিক তেমন রূপ।”
“বটেই!যাক ভালো হয়েছে।আব্বা বললেন নিধির জন্য তিনি একটা ভালো পাত্র দেখেছেন?”
“আমিও তো তাই শুনলাম।আগামীকালই হয়তো আসবেন তারা।”
“ছেলের বাড়ি কোথায়?কী করে কিছু জানিস?”
“ছেলে কী করে বলতে পারছি না,তবে ফ্যামিলি নাকি খুবই ভালো।”
তপ্ত নিশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক।এমন সময় অর্ণ ঘুমঘুম চোখে নিচে নেমে এলো।ঘুমের রেশ এখন অব্দি যায়নি চোখ থেকে।কায়নাত চা নিয়ে এলো তাদের জন্য।হঠাৎ অর্ণর দিকে চোখ যেতেই কপাল কুঁচকে এলো তার।লোকটা ফ্রেশ না হয়েই নিচে চলে এসেছে?অর্ণ বাবা কিংবা চাচাকে দেখেনি।ঘরে ব্রাশ খুঁজে পাচ্ছিল না বলে চিৎকার করে কয়েকবার কায়নাতকে ডেকেওছে।তবে উত্তর মেলেনি।বাধ্য হয়ে নিচে নেমে এসেছে।অর্ণ কায়নাতকে দেখতে পেয়েই জড়াল গলায় বলল,
“বেয়াদব মহিলা,আমার ব্রাশ কোথায় রেখেছ?”
কায়নাত এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,
“ঘরেই তো আছে।”
অর্ণ শুনল তার কথা?সে খোঁপ করে কায়নাতের হাত চেপে ধরে ছুটল নিচ তলার কমন ওয়াশরুমের দিকে।কায়নাত হতভম্ব হয়ে পিছু ফিরে তাকাল একবার।মাশফিক চৌধুরী আর মতিউর চৌধুরী বিব্রত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছেন তৎক্ষণাৎ।কায়নাত দাঁত খিঁচে নিল অর্ণর কান্ড দেখে।বেহায়া লোক ইজ্জতটুকুও রাখতে দিল না।
ওয়াশরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কায়নাত।অর্ণ কোনোরকম ফ্রেশ হয়ে বের হলো।খানিকক্ষণ পর উপরে গিয়ে একেবারে ফ্রেশ হবে ভাবল।এখন অন্তত এক কাপ রং চা খাওয়া দরকার।সে বের হতেই কায়নাত মুখ কালো করে ঘাড় উঁচু করল।ভেজা মুখে পানি চিকচিক করছে অর্ণর।কায়নাত হাঁ করে কিছু বলার পূর্বেই অর্ণ আচঁল টেনে ধরল।ঝুঁকে এসে ভেজা মুখ মুছে আবার সুন্দর করে সেটা কায়নাতের মাথায় ঘোমটা দিয়ে আদেশের স্বরে বলল,
“এক কাপ রং চা দাও।”
কায়নাত আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আপনি চা খাবেন?”
“না!আমি তোমাকে খাব।”
“কী!”
অর্ণ বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে ড্রয়িংরুমে ফিরতেই সোফায় বাবা আর চাচাকে দেখে এগিয়ে গিয়ে বসল তাদের পাশে।কায়নাত চোখ পাঁকাতে পাঁকাতে রান্না ঘরে গেলেই মাশফিক চৌধুরী হাল্কা গলা কাঁশলেন।
“সিলেট যাচ্ছ কবে?”
অর্ণ যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে।বাবা যে তাকে একটা প্রশ্ন করেছে সেদিকে তার খেয়াল নেই।কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে রান্না ঘরের দিকে।বিরক্ত হলেন ভদ্রলোক।ছেলের এই বদঅভ্যাস তিনি ভীষণ অপছন্দ করেন।তিনি মুখ খোলার আগেই অর্ণ সোজা একদমে বলল,
“আমার বউয়ের শরীর ভালো না।ও সুস্থ হলে যাব।”
কেঁশে উঠলেন তিনি।মতিউর চৌধুরী হাঁ করে তাকিয়েছেন অর্ণর শক্ত চোয়ালের দিকে।কী সাংঘাতিক ছেলে!বাপ-চাচার সামনে কেমন বেহায়ার মতো বউ বউ করছে।তিনি ল্যাংটা দেখেছেন এই ছেলেকে,আর আজ সেই ছেলে তার সামনে বসেই বউ বউ করছে।
অর্ণ কপাল কুঁচকে বাবার দিকে তাকাল।বলল,
“চা-টাও ভালো করে খেতে পারো না নাকি?”
মাশফিক চৌধুরী শুকনো ঢোক গিলে বললেন,
“তুমি তো অফিসের কাজে যাচ্ছ।সেখানে কায়নাত গিয়ে কী করবে?”
“বউকে রেখে সেখানে আমি একা গিয়ে কী করব?তুমি তোমার বউ রেখে কোথাও যাও?”
থমথমে খেয়ে গেলেন তিনি।ভারী আশ্চর্য!যেই ছেলে কাল অব্দি বউকে বউ মানি না বলে চিৎকার করছিল,সেই ছেলে আজ বেহায়ার মতো বাবার সামনে বউ বউ করছে।তিনি নাক মুখ কুঁচকে ফেললেন।কায়নাত এলো চা নিয়ে।অর্ণর হাতে চা দিয়ে আবার ছুটল রান্না ঘরে।সেখানে কাজ চলছে এই মুহূর্তে।ভাগ্যিস বউমা এই কথোপথন শোনেনি।তিনি নাক ছিঁটকে উঠে গেলেন ভাইকে নিয়ে।তখন সেখানে উড়ে এসে উপস্থিত হলো স্বার্থ আর প্রেম।স্বার্থ সোজা অর্ণর শরীর ঘেঁষে বসে ফিসফিস করে বলল,
“আমার বাবা হতে ইচ্ছে করছে সোনা।”
অর্ণ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
“বিয়ে কর।”
“দে না সোনাপাখি।”
অর্ণ কপাল কুঁচকে বলল,
“কী দিব?”
স্বার্থ শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে মেয়েদের মতো নখ কামড়ে বলল,
“তোর ছোট বোনটাকে দিয়ে দে।বিয়েটা করে তাড়াতাড়ি তোকে মামা ডাক শোনাব।বিশ্বাস না করলে শুধু বিয়েটা দিয়ে দেখ,জাস্ট দুমাসের মধ্যে খুশির সংবাদ শোনাব তোকে।”
অর্ণ দাঁত কটমট করে তাকাল।স্বার্থ চুপসে যাওয়া মুখ নিয়ে অর্ণর পেটে আঙুল দিয়ে গুতো দিয়ে বলল,
“আচ্ছা আগে তুই বাপ হবি সোনা।তোর পরে আমি বাপ হব,তবুও বিয়েটা দে না!বউ ছাড়া রাতে ঘুম হয় না আমার।”
অর্ণ চায়ের কাপটা সশব্দে টেবিলে নামিয়ে রেখে স্বর্থের দিকে এক পলক তাকাল। তারপর পাশে প্রেমের দিকে ইশারা করে বলল,
“শুনলি তো? ও নাকি রাতে বউ ছাড়া ঘুমাতে পারে না। এক কাজ কর, আজকে রাতে তুই স্বার্থর সাথে গিয়ে ঘুমাবি। মশারির দড়ি ছিঁড়ে যাক বা খাট ভেঙে পড়ুক, ওকে একদম একা না রাখবি না।”
স্বার্থ চোখ বড় বড় করে বলল,
“আরে ভাই! প্রেমের সাথে ঘুমালে কী আর বাপের সাধ মিটবে? আমি চাই তোর ভাগ্নের আসল বাবা হতে!”
প্রেম এবার মাঝখানে নাক গলিয়ে বলল,
“ভাইয়া, কথা মন্দ বলেনি।তুমি তো বললে,বউ ছাড়া রাতে ঘুম হয় না’। তো বউ শব্দটার মানে কী? শান্তি! আর আমার পাশে ঘুমালে তুমি যে শান্তি পাবে, সেটা কোনো বউ দিতে পারবে না।”
স্বার্থ নিভু গলায় অর্ণকে বলল,
“তোর এই ভাই কী সত্যিই গে?শালা সব সময় এমন করে কেন?দেখ ভাই,আমি তোকে আমার মনের দুঃখের কথা বলেছি।তুই একটাবার ভেবে দেখ,আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।তোর বোনটাকে দিয়ে দে না সোনা।”
(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করার চেষ্টা করবেন।)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)