Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৯


প্রেমবসন্ত_২ ।২৯।

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

আজ চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে চারপাশ।অদ্ভুত সৌন্দর্যে মুখরিত।জয়া নাজনীনের ঘরের বারান্দায় চুপটি করে বসে আছে।নিচে সবার হইহুল্লোড় দেখছে।তখন নাজনীন এলো ধীর পায়ে।পাশে এসে দাঁড়াল জয়ার।জয়া কথা বলল না।একটাবার ফিরেও তাকাল না।নাজনীন কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,

“এই রাত করে বারান্দায় কী করছিস?”

জয়া শান্ত চোখ জোড়া আকাশ পানে রেখে বলল,
“বারান্দায় আসা মানা বুঝি?”

“উহুম!”

জয়াও আর কথা বলল না।নাজনীন ব্যথাতুর ঘাড়ে হাত বুলিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“কী হয়েছে?”

জয়া আঁচল শরীরে মুড়িয়ে বসল বেতের চেয়ারে।মাথায় কাপড় টেনে বলল,
“ভাবছিলাম আবার প্রাইভেট পড়াটা শুরু করব।”

নাজনীনের মুখ গম্ভীর হলো।
“আমি বারণ করেছি কোনো ছেলে শিক্ষকের কাছে পড়াব না।”

“কেন?”

“সেটা তোকে বলতে ইচ্ছুক নই।”

জয়া চোখ তুলে তাকাল।বলল,
“পুরুষ মানুষের কাছে পড়তে চেয়েছি বলে আপনার এত জ্বলছে।অথচ অন্যদিকে আমার কবুল করা স্বামী অন্য এক মেয়ের সাথে বাইরে গিয়ে সময় কাটিয়ে আসছে,তাতে কোনো সমস্যা নেই?”

“এক থাপ্পড় মেরে চাপা ভেঙে ফেলব বেয়াদব।” নাজনীন হঠাৎ তীব্র কণ্ঠে ধমকে উঠল।
“কোন মেয়ের সাথে সময় কাটিয়ে এসেছি আমি?নাটক করছিস আমার সাথে?”

জয়া ভয় পেয়েছে নাজনীনের ধমকে।ভয়ে ইতোমধ্যে ভীতু হয়ে গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে।
“কে বলেছে এসব ফালতু কথা?”

নাজনীনের প্রশ্নে জয়া শুকনো ঢোক গিলে প্রেমের কথা বলল।নাজনীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত বুলিয়ে হঠাৎ জয়ার পায়ের কাছে বসল হাঁটু মুড়িয়ে।জয়ার চিকচিক চোখ জোড়া নজরে এলো নাজনীনের।বাচ্চা বউয়ের চোখে পানি দেখে আর চিৎকার করার সাহস হলো না।পুরুষালী ডান হাত জয়ার ছোট্ট মুখ আঁকড়ে ধরে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল,

“প্রেম যে মজা করেছে এটা তুই বুঝিসনি?আমি কেমন এটা তুই জানিস না?”

জয়া গাল থেকে নাজনীনের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
“সারাদিন বাড়ি আসোনি কেন?”

“কাজে ছিলাম।”

“দাদা বলেছে আজ কোনো কাজ ছিল না।”

“আমার কী একটাই কাজ?কিছু পার্সোনাল কাজ ছিল।”

“কী কাজ?”

নাজনীন উত্তর না দিয়ে জয়ার দিকে ভালো করে তাকাল।নীল শাড়ি গায়ে জড়িয়ে চোখে কাজল দিয়েছে।হঠাৎ নাজনীন জয়াকে টেনে নিজের কোলে বসাল।জয়া চমকে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না নাজনীনের বলিষ্ঠ হাতের ছোঁয়া পেয়ে।নাজনীনের হাত তখন অবাধ্য।জয়া লজ্জায় নাজনীনের গলা জড়িয়ে ধরে মিনমিন গলায় বলল,

“কী করছেন এসব?ছাড়ুন আমায়।”

জয়ার মিনমিন কণ্ঠে কথাটা শেষ হওয়ার আগেই নাজনীনের হাতটা শক্ত হয়ে উঠল। সে জয়ার কপালটা নিজের বুকে ঠেকিয়ে রাখল, যেন আর কোনো প্রশ্ন, আর কোনো অভিযোগ এখন এই মুহূর্তে দরকার নেই।

“চুপ।” নাজনীন খুব নিচু স্বরে বলল।
“একটু চুপ থাক।”

জয়া থমকে গেল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। নাজনীনের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা গলায় এসে লাগছে। মেয়েটা লাজে চোখ নামিয়ে রাখল।নাজনীনের এত নিকটে কখনও আসা হয়েছে?আজ তো লোকটা রুহুর মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলতে চাইছে।

নাজনীন একহাতে জয়ার থুতনিটা আলতো করে তুলে ধরল। চোখে চোখ পড়তেই মুহূর্তের জন্য দুজনেই স্থির হয়ে এলো। বারান্দার চাঁদের আলো যেন আরও নরম হয়ে নামল তাদের উপর।

কোনো কথা না বলেই,হঠাৎ নাজনীন ঝুঁকে এলো।
জয়া কিছু বলার আগেই তাদের অধর মিলিত হলো।ক্ষুদ্র, নীরব, অথচ ভারী এক মুহূর্ত।
রাগ, সন্দেহ, অভিমান—সব যেন ওই এক ফাঁকে থেমে গেল।জয়ার চোখ আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে এলো। হাত দুটো শক্ত করে নাজনীনের কাঁধ আঁকড়ে ধরল সে।

কিছুক্ষণ পর নাজনীন ধীরে সরে এলো।কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,
“আমি তোর। শুধু তোর।”

জয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না।চাঁদের আলোয় ভেজা এক বাচ্চা বউ,যার মনে বসন্ত আসছে,ভয় আর ভালোবাসা একসাথে নিয়ে।নাজনীনের মুখে স্বীকারোক্তি শুনে মেয়েটার চোখ কপালে।সে যেন স্বপ্ন দেখছে এই মুহূর্তে।বিশ্বাস, ভালোবাসা—সব একসাথে এসে জট পাকাল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নাজনীনের হাতের চাপটা একটু বদলে গেল। সে আরও কাছে টানতে চাইছে বুঝে জয়ার শরীর শক্ত হয়ে উঠল।

“না…!”জয়া খুব আস্তে বলল।
“এখন না।”

নাজনীন থামল না। কণ্ঠে আবেগ, চোখে অস্থিরতা মিশেল ছিল তার।
“ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তোই…”

সে হঠাৎ করে নাজনীনের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতেই এক পা পিছিয়ে গেল।

“আমার ভালো লাগছে না।” জয়া কাঁপা গলায় বলল।
“আমাকে একটু সময় দিন।”

নাজনীন এগোতে চাইল।
“জয়া…”

আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না সে।হঠাৎ ঘুরে দৌঁড়ে বারান্দা ছেড়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল।
চুড়ির শব্দ,নুপুর পায়ে দ্রুত ছুটে চলা,সব মিলিয়ে মুহূর্তেই নীরব রাতটা ভেঙে গেল। দরজার ভেতর ঢুকে জয়া পিছন থেকে খিল আঁটকে দিল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন কান ছাপিয়ে যাচ্ছে।ঘরের ভেতর অন্ধকার।দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে জয়া চোখ বন্ধ করল।সে ভালোবাসে।কিন্তু সে ভয়ও পায়।

বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে রইল নাজনীন। চাঁদের আলো এখন আর নরম লাগছে না।কেন যেন নিজের কাজে এখন রাগ হচ্ছে তার।জয়া কী ভাববে?আবার খারাপ না ভেবে বসে তাকে।

সেই রাতে,একই ছাদের নিচে থেকেও
দুজন মানুষ দু’দিকের অন্ধকারে নিজ নিজ ভাবনায় ডুবে রইল।এক ষোড়শী যুদ্ধ করছিল নতুন প্রেমের আগমন দেখে।আরেক শুদ্ধ শ্যামপুরুষ ভাবনায় ডুবে ছিল তারই হালাল ষোড়শী বধূকে নিয়ে।


আজ দুই বোনের মাথার জয়েন্ট ছিঁড়েছে বোধহয়।এসব বাজে কথা প্রেম ছাড়া আর কে রটাবে?কায়নাতও আজ মুখখানা ফুলিয়ে রেখেছে অভিমানে।খানিকক্ষণ আগে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেতে নেমেছে সবাই।টেবিলে পুরুষ মানুষ খেতে বসেছেন।কায়নাত রাগের চোটে অর্ণর ধারের কাছে অব্দি যাচ্ছে না।
আতিয়া বেগম একপাশে দাঁড়িয়ে খাবার পরিবেশন করা দেখছিলেন।লতা বেগম খাবার দিচ্ছিলেন সবাইকে।আজগর চৌধুরী হঠাৎ বললেন,

“কাল মতিউর আসবে সকালে।বাড়িতে থেকো সবাই।”

নাজনীন খাওয়া থামিয়ে দাদার দিকে তাকাল।নিধি পাশ থেকে বলল,
“উনি কেন আসবেন?”

আজগর চৌধুরী বললেন,
“যতই হোক সে তোদের বাবা হয়।এত বড় একটা আনন্দের সময় তার উপস্থিতি আবশ্যক।”

হাসান মাথা নেড়ে বলল,
“এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বাড়াবে না।”

কেউ আর কোনো কথা বললেন না।রেখা বেগম সব শুনে গেলেন শুধু।বুকে যে যন্ত্রণা পুষে রেখেছেন এত বছর ধরে,তা তিনি প্রকাশ করতে ব্যর্থ।প্রকাশ করার সময় যে শেষ।

আদিকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছিল নুসরাত।বাচ্চাটা আজ শান্ত পানির মতো নীরব।নুসরাত ছেলের নীরবতার মানে বুঝল না।বাচ্চাটা তার সাথে কথা বলে না অভিমান করে।বুকটা খাঁ খাঁ করে যন্ত্রণায়।পাশেই অর্ণ বসেছিল তার।নুসরাতের খাওয়া হয়নি আদিকে খাওয়ানোর জন্য।অর্ণ জানে আদিকে খাওয়ানো হলে নুসরাতও আর খাবে না।চারপাশে বাড়ি ভর্তি কত মানুষ,কত আত্মীয়।সব যেন অর্ণ চৌধুরীর কাছে তুচ্ছ।ভাত মাখিয়ে যখন যত্ন করে ছোট বোনের মুখে তুলে দিল,তখন কয়েক জোড়া চোখ অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে ছিল তাদের সঙ্গে।নুসরাত নাক কুঁচকে বলল,

“তুমি খাওয়া বাদ দিয়ে আমাকে খাওয়াচ্ছ কেন?”

অর্ণ গম্ভীর গলায় বলল,
“আমার চড়ুই পাখির সাথে খাব।”

অর্ণর কণ্ঠস্বর নিচু ছিল।নুসরাত ভাইয়ের কথা শুনে ঠোঁট টিপে হাসল।কায়নাতের অভিমান বাড়ল এবার।অর্ণ তার বোনকেও কত যত্ন করে;অথচ তাকে চোখেই দেখে না।সবার খাওয়া শেষে তখন অর্ণ বসেছিল।তার খাওয়া হয়নি তখনও।লতা বেগম কায়নাতকে বললেন,

“খেতে বোস।সকাল সকাল আবার উঠতে হবে।”

কায়নাত আড়চোখে অর্ণকে দেখে গম্ভীর হয়ে বলল,
“খাব না আমি।”

“খাবি না কেন?খেয়ে দেয়ে ঘুমো তাড়াতাড়ি।”

কায়নাত কিংবা অর্ণ কেউই রাতে আর খেল না।কিন্তু তার ঘাড়ত্যাড়ামির জন্য মায়ের কাছে বকাও খেয়েছে খুব।শাশুড়িও আজ গম্ভীর ছিলেন।রাতে কাজ শেষে কায়নাতকে দিয়ে খাবার পাঠালেন প্লেট ভর্তি করে।কায়নাত খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল,অর্ণ বিছানার এক কোনায় ল্যাপটপ নিয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা করছে।সে খাবার বিছানার এক কোনায় রেখে বলল,

“মা আপনাকে খাবার খেয়ে নিতে বলেছে।”

অর্ণ চোখ তুলে তাকাল তার দিকে।কিছুটা তীব্র কণ্ঠে বলল,
“ছুঁড়ে ফেলে দাও।”

কায়নাত কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“ফেলব কেন?না খেয়ে চলে এসেছেন বলে মা আমায় এত কথা শোনাল।খেয়ে এলে এত কথা আমায় শুনতে হত?”

কায়নাত খেয়াল করল অর্ণ বেজায় রেগে যাচ্ছে।সে গলা ভিজিয়ে বলল,
“রেগে যাচ্ছেন কেন?খাবারটা খেয়ে নিলেই তো হলো।”

“বললাম না ফেলে দিতে?” ধমকে উঠল অর্ণ।কায়নাত চমকে ওঠে ভয়ে।কায়নাত সত্যি সত্যি প্লেট তুলতে গেলে অর্ণ বিরক্ত হয় দ্বিগুণ।কায়নাতের হাত চেপে ধরে বসায় পাশে।বুকে হাত গুঁজে বলে,

“Finish all the food right now.”

কায়নাত ভাবল অর্ণ এবার তুলে আছাড় মারবে কথা না শুনলে।লক্ষ্মী মেয়ের মতন হাত ধুইয়ে এসে খাওয়া শুরু করল চুপচাপ।অর্ণ তখনও বুক টানটান করে বসে আছে তার সামনে।কায়নাতের মনে হলো অর্ণও তখন খায়নি কিছু।লজ্জায় একটু কাচুমাঁচু করে বলল,

“আপনাকে একটু খাইয়ে দিই?”

অর্ণ বিনাবাক্যে এগিয়ে এসে বলল,
“দাও।”

কায়নাত ঠোঁট কামড়ে তাকাল অর্ণর দিকে।সে ভেবেছিল অর্ণ খাবে না,কিংবা ধমক দিয়ে বলবে,” তোমায় এসব করতে বলেছি,ইডিয়ট?”

কিশোরীর ছোট হাতের মুঠোয় খুব অল্প ভাত উঠেছে।কায়নাত তার অভিমান ভুলে বসল এইটুকু সময়েই।খাওয়ার মাঝে মাঝে অর্ণ তার শাড়ির আঁচল টেনে মুখ মুছছে।অদ্ভুত অনুভূতি ঘিরে ধরেছে কিশোরীকে।মেয়েটা লজ্জায় না কিছু বলতে পারছে,আর না এই লাজ সইতে পারছে।
খাওয়া দাওয়া শেষে ঘটল আরেক কাণ্ড।কায়নাত নিচে সব রেখ আসার পর যখন ঘরের লাইট বন্ধ করে বালিশে মাথা রাখল,তখন অর্ণর ভারী শরীরটা নিজের ছোট্ট দেহের পাশ ঘেঁষে শুলো।তার ছোট্ট মাথাটা অর্ণ তার বুকে চেপে ধরে গম্ভীর গলায় বলল,

“ম্যাডাম,শরীরের শক্তি বাড়াতে হবে।দশটা বাচ্চা এখনও পৃথিবীতে আসেনি কিন্তু!”

(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করার চেষ্টা করবেন।আপনাদের রেসপন্স কমে যাচ্ছে কেন😩)

প্রেমবসন্ত_বই প্রি-অর্ডার করেছেন?

আপনার পছন্দের যেকোনো বুকশপে বইটি অর্ডার করে ফেলুন।

চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply