প্রেমবসন্ত_২ ।২৫।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
কিছুমাস আগেই ঘটেছিল একটা ঘটনা।তখন কায়নাতের টেস্ট এক্সাম চলছিল।কলেজটা বাড়ি থেকে বেশ দূরে হওয়ায় তার বাড়ি ফিরতে লেট হত।সেদিন কাছে গাড়ি ভাড়াও ছিল না।বড় রাস্তার কাছে আসতেই প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল।তখন আকাশে মেঘ ডাকছিল তীব্র ছন্দে।চারপাশটা কেমন অন্ধকার হয়ে এসেছিল।মেয়েটা ভয়ে ভয়েই ছিল।এলাকার কিছু ছেলে তাকে বিরক্ত করত খুব।সেইদিন অন্ধকারে হঠাৎ ছেলে দুটো পিছু নেয় তার।যখন বড় রাস্তা থেকে বাড়ির মোড়ে ঢোকে,ঠিক তখন তাদের মধ্যে কেউ একজন মুখ চেপে ধরে পশ্চিম পাড়ার বড় রাস্তার জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়।মেয়েটার হাত-পা বাঁধা ছিল শক্ত দড়ি দিয়ে।টিনের একটা ছোট্ট ঘর আর সেখানে ছিল কায়নাত।
বাইরে এত বৃষ্টি হচ্ছিল যে তার চিৎকার বাইরে আসছিল না।ছেলে দুটো তাকে রেখে গিয়েছিল।হয়তো ম’দ-পানি খেতেই গিয়েছিল কোথাও।যখন বৃষ্টি থেমে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল,তখন ওই ছেলে দুটো ওই ঘরে ঢোকে।ভয়ে কায়নাতের শরীর অবশ হয়ে আসে।আল্লাহ সেইদিন হয়তো কায়নাতের সাহায্যের জন্য একজনকে পাঠিয়েছিল সেখানে।একটা ছেলে কায়নাতের দিকে এগিয়ে যেতে নিলেই কেউ পেছন থেকে মোটা লাঠি দিয়ে বারি মারে তার মাথায়।আপছা আলোয় কায়নাত কিছুই দেখতে পায় না।অর্ধ জ্ঞানে থাকা কায়নাত তখন হুঁশ হারাবে হারাবে ভাব।তবে হুঁশ হারানোর আগে সে ওই লোকটার কণ্ঠস্বর শুনেছিল একটু।তার গালে চাপড় মেরে ডাকছিল তাকে।কিন্তু কায়নাত রেসপন্স করতে পারেনি।লোকটা হচ্ছে অর্ণ।এই রাস্তা দিয়ে সে ঢাকা থেকে গ্রামে আসছিল,হঠাৎ এদিক থেকে কোনো মেয়ের গোঙানোর শব্দ শুনেই সে এসেছে দেখতে।কায়নাতের মুখে নিকাব।ছেলে দুটোকে মেরে তৎক্ষণাৎ পুলিশকে কল করে অর্ণ।পুলিশ এলে কায়নাতকে গাড়ির ভেতর ভসিয়ে নিকাবের উপর দিয়েই পানি ছিটিয়ে দেয়ার পর হুঁশ ফেরে তার।অচেনা এক পুরুষকে দেখে আরও ঘাবড়ে যায় সে।চমকে উঠে বলে,
“আপনি কে?”
ভীতু হরিণীর ন্যয় চোখ দুটো অর্ণর আঁখিকে নিবদ্ধ হতেই সে গম্ভীর গলায় বলে,
“আপনি কে?এত রাতে এদের পাল্লায় পড়লেন কী করে?”
কায়নাত উত্তর না দিয়ে ডুকরে উঠল ভয়ে।তখন মাঝরাত পেরিয়ে ভোর হচ্ছে।কায়নাতের কাছে ঠিকানা জানতে চাইলে সে ঠিকানা বলে দেয়।অর্ণ মির্জা বাড়ির সেই তালগাছের নিচে গাড়ি থামালে মিলি বেগম ছুটে আসেন বাড়ির ভেতর থেকে।তিনি যেন মেয়ের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।সেই ভোররাতে অর্ণ আপছা আলোয় তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল ঠিকই,কিন্তু বেশি সময় নষ্ট করেনি সে।মিলি বেগম তার মুখটা হালকা দেখতে পেয়েছিলেন।হয়তো তাই আজ এত গুলো মাস পর তার কাছে মুখটা চেনা চেনা মনে হয়েছিল।সেই ঘটনার পর গ্রামে কায়নাতের নামে একটা নোংরা দাগ লেগেছিল।তবে মিলি বেগম জানতেন—মেয়ের কোনো ক্ষতি হয়নি।আল্লাহই সেইদিন বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন তারই স্বামীর সাহায্যে।
অর্ণ কায়নাতের মুখে সেইদিনের কাহিনী শুনে আশ্চর্য হয়ে শুয়ে রইল।সেইদিন সে নিজের স্ত্রীকেই বাঁচিয়েছিল।সে যদি সময় মতো না যেত,তাহলে কী হত?কায়নাত অর্ণর বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে।অর্ণ গম্ভীর হলো এবার।
“বেয়াদব মহিলা!জানোই যখন ছেলেরা বিরক্ত করে,তখন বাড়ির কাউকে নিয়ে যেতে পারোনি?সেইদিন যদি আমি না থাকতাম কী হত তোমার?”
কায়নাত আশ্চর্য হয়ে মাথা তুলে তাকায়।নাক টেনে বলে,
“আপনি ছিলেন?কী বলছেন?”
অর্ণ কায়নাতের ফুলে আসা গাল দুটো আলতো করে চেপে ধরে বলল,
“মাথা মোটা,সেইদিন রাতের ওই লোকটা আমি ছিলাম।”
“আসলেই?”
কায়নাতের কণ্ঠে অবিশ্বাস আর বিস্ময় একসাথে মিশে গেল।অর্ণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।তুমি অচেতন ছিলে প্রায়।নিকাবের ভেতর তোমার মুখটা আমি পরিষ্কার করে দেখিনি।কেবল জানতাম একটা মেয়ে বিপদে আছে,আর তাকে বাঁচানো দরকার।”
কায়নাতের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।চোখ দুটো আবার ভিজে গেল।সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি তো আপনাকে চিনতেই পারিনি।”
অর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি তখনও জানতাম না—যাকে সেদিন বাঁচালাম,সে আমার স্ত্রী ছিল।”
কায়নাত সাহস করে সিটিয়ে এলো নিকটে।বিড়াল ছানার মতো স্বামীর বুকের কাছে এসে শুয়ে রইল।সেইদিন অর্ণ না এলে কী হত?ভাবলেও কায়নাতের ভয় হয়।লোক গুলোর ছোঁয়া তার শরীরে লেগে আছে এখনও।ধরেছিল তাকে।মাঝে মধ্যে মনে হয় শরীরের ওই জায়গা গুলো টেনে ছিঁ ড়ে ফেলতে।
•
আকাশ আজ ভীষণ স্বচ্ছল।আদি স্কুলের মাঠে বসে আছে একা একা।চারপাশে সব বাচ্চাদের মায়েরা এসেছে টিফিন খাওয়াতে।আদির স্কুল মাঠ বিশাল বড়।অনুমতি আছে এখানে সময় কাটানোর।নুসরাত তাকে টিফিন দিয়েছিল ঠিকই,কিন্তু সে খায়নি।নুসরাত আজ স্কুলে আসেনি, কারণ সে একটু দরকারে বেলি বেগমের বাড়ি গেছে।সে ভেবেছিল আদি হয়তো নিজে নিজেই খেয়ে নিবে।বাচ্চাটার মন খারাপ।সে ঘাড় ঘুরিয়ে স্কুল গেটের দিকে তাকাল।মনে হলো স্বার্থদের মতো কারা যেন এগিয়ে আসছে এদিকে।হ্যা,স্বার্থ আর শেহের এসেছে।আদি চোখ বড় বড় করে উঠে দাঁড়িয়ে দৌঁড়ে গেল সেদিকে।সোজা এক লাফে স্বার্থর কোলে উঠে চিৎকার করে বলল,
“তোমরা এসেছ?”
স্বার্থ কপাল কুঁচকে ওকে নিয়ে নিচে বসে।আদিকে পাশে বসিয়ে বলে,
“কাঁদছিলি কেন?”
“কাঁদছিলাম নাতো!”
শেহের খাবারের বক্স খুলে স্বার্থকে বলে আগে একটু পানি খাওয়াতে।আসার সময় শেহের খাবার নিয়ে এসেছে।বেচারা মানিব্যাগ আনতে ভুলে গিয়েছিল।প্যান্টের পকেটে খাবার কেনার টাকা থাকলেও পানি কেনার টাকা ছিল না।তারপর স্বার্থকে কল করলে সে টাকা পাঠানো বাদ দিয়ে সেও চলে আসে এখানে।আদি পানি খেতে শেহের হাত ধুইয়ে খাবারে হাত দিলে আদি বলে,
“তোমরা জানলে কী করে আমি এখানে?”
শেহের কপাল কুঁচকে খাবার মুখে তুলে দিয়ে বলল,
“তোর ক্লাসটিচার কল করেছিল।”
শেহের মাঝে মধ্যেই আদির ক্লাসটিচারকে কল করে ওর ব্যপারে কথা বলে।স্বার্থ শেহেরের দিকে তাকায়।শুদ্ধ পুরুষ মানুষের ভালোবাসা কত অদ্ভুত!সে শেহেরকে যত দেখে তত অবাক হয়।অন্যের বাচ্চাকে কেউ কখনও এত ভালোবাসে?যাকে সে ভালোবাসত তার সন্তানকেই কেমন বছরের পর বছর বুকে আগলে রেখেছে।তার কী দরকার ছিল অফিসের কাজ রেখে আদিকে খাওয়াতে আসতে?আদৌ কোন প্রয়োজন ছিল?
আদি তৃপ্তি করে পুরো খাবার শেষ করল।এখনও ২০ মিনিট বাকী আছে টিফিন টাইম শেষ হতে।আদিকে খাইয়ে দিয়ে শেহের হাত ধুইয়ে টিস্যু দিয়ে হাত মুছে গম্ভীর স্বরে বলল,
“তুই নাকি ক্লাস টেস্টে ফেল করেছিস?”
আদি মুখ কালো করে বলল,
“তুমি জানলে কিভাবে?”
“সেটা তোর জেনে লাভ কী?ফেল করলি কিভাবে?তাও আবার বাংলায়!”
“আমি তো অনেক লিখেছি।এখন যদি ফেল আসে তাহলে কী আমার দোষ?”
স্বার্থ শেহেরকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
“থাম তুই!এক বিষয়েই তো ফেল করেছে,সমস্যা নেই।পরেরবার আরও দুটো বিষয়ে ফেল করবি আদি।”
শেহের ধমক দিয়ে বলে,
“তুই ওকে বেশি ফাজিল বানাচ্ছিস।”
“ফাজিল বানাচ্ছি?তোর মনে হয় না বড় হয়ে ওর আমার মতো হওয়া উচিত?”
শেহের বিরক্ত হয়ে টিস্যু দিয়ে আদির মুখ মুছিয়ে বলল,
“ক্লাসে যা।বাড়ির ড্রাইভার এসে ছুটির সময় নিয়ে যাবে।”
আদি মাথা নাড়িয়ে দৌঁড়ে গেল স্কুলের ভেতরে।ও চলে যেতেই শেহেররা উঠে দাঁড়াল।স্কুলের বাইরে এসে একটা রিকশা ডাকল।আজ কেউ কারোর গাড়ি নিয়ে আসেনি।স্বার্থ বলল,
“আর কত?”
শেহের লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করল।বলল,
“আমার সংসার করার ইচ্ছে নেই।ইচ্ছে নেই অন্য নারীতে মত্ত হওয়ার।”
“এভাবে হয় না।”
“কেন হয় না?”
“দেখ,মন তো কারোর নিয়ন্ত্রণে থাকে না বল?”
“আমি তো কাউকে জোর করছি না—আমায় ভালোবাসতেই হবে।”
শেহের কথা শেষ করে ফোনে সময় দেখে নিল।এখন সে বাড়ি ফিরবে।মা বারেবারে কল করছেন।
•
তখন সময় গড়িয়েছে বেশ।কায়নাত আর অর্ণ চৌধুরী বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।মিলি বেগম থাকতে বললেও তারা থাকতে পারল না।বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটছিল সরু রাস্তা ধরে।অর্ণ পেছনে আর কায়নাত সামনে।বিকেলের মিষ্টি বাতাস দুজনের সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে দিচ্ছিল।কায়নাত আড়চোখে অর্ণকে দেখে প্রশ্ন করে,
“আপনি খুলনায় কেন এসেছেন এখন অব্দি বলেননি।”
অর্ণ তার পাশে এসে সমান তালে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“আমি আসায় কী আপনি খুশি হননি?”
“তা কেন হবে?তবে আজ-কাল আপনাকে ভীষণ অচেনা লাগে।”
“যেমন?”
“আমাকে তো আপনি সহ্যই করতে পারতেন না,সেখানে আমার পিছু আমার বাবার বাড়ি অব্দি চলে এসেছেন।আপনি কী প্রেমে পড়েছেন,লাটসাহেব?”
কায়নাতের মুখে আজ অনেকদিন পর অর্ণ এই ডাকনামটা শুনল।সে কপাল কুঁচকে জবাবে বলল,
“প্রেমে পড়া পুরুষ কেমন হয় জানেন?”
কায়নাত উত্তর দিল না।খোলা রাস্তায় সাহস করে অর্ণর হাত আঁকড়ে ধরে মিষ্টি করে হাসল।অর্ণ কিছু বলল না।তাদের বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হলো।বাড়ির বিশাল ড্রয়িংরুমে বাড়ির প্রত্যেকে তখন উপস্থিত।অর্ণদের দেখেই আতিয়া বেগম মুচকি হেসে এগিয়ে এলেন।
“শ্বশুর বাড়ি কেমন দাদুভাই?”
অর্ণর গম্ভীর মুখ দেখে কায়নাত মুখ বাঁকাল।দাদি উত্তরের আশায় আছেন বলে অর্ণ একটু ইতস্তত করে বলল,
“ভালো।”
সে সিঁড়ির দিকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে প্রস্থান করতেই
দাদি ঠোঁট টিপে হেসে ফেললেন।কায়নাতও গেল উপরে।আগামী পরশুই হয়তো বাড়িতে আয়োজন হবে মিলাদের।সব কিছুই চলছিল নরম মিষ্টি মধুর মতো।রাতে সবাই খাবার শেষে নিজ ঘরে অবস্থান নিলে কায়নাত আর জয়া ছাদে যায়।খোলা আকাশের নিচে দুইবোন বসে থাকে।কায়নাতের মনে হলো জয়ার একটু মন খারাপ।সে জানতে চাইল কারণ,
“কী হয়েছে তোর?মন খারাপ কেন?”
জয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“পড়াশোনা আমাকে দিয়ে হচ্ছে না।”
“কেন?”
“বিয়ে বিয়ে করেই তো সব পানিতে গেল।”
কায়নাত ওর মাথায় হাত রেখে মুচকি হেসে বলল,
“সংসারে তো তোর কোনো চাপ নেই।”
জয়া মুখ ফুলিয়ে কায়নাতের কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বলে,
“কোনো কিছুরই চাপ নেই।তবে শান্তিও তো কোথাও নেই।নাজনীন ভাই,লোকটা কেমন যেন।একটু অদ্ভুত!”
“মানিয়ে নিতে পারলে সব কিছুই সহজ।”
“আচ্ছা,অর্ণ ভাইয়া তোকে ভালোবাসে?”
কায়নাত কিছুক্ষণ নীরব থেকে মুচকি হাসে।
“মুখে তো বলে আমায় বউ বলেই মানে না,কিন্তু কাজ-কর্মে তো অন্য কিছু মনে হয়।”
“যেমন?”
“যেমন আমি সামনে না থাকলে পাগলের মতো ছুটে আসে আমার কাছেই।যেমন ধর গোসল শেষে তার ভেজা চুল মুছে দেয়ার বাহানায় দুই নয়ন আমায় খোঁজে অস্থির হয়ে।”
“আর?”
কায়নাতের গাল দুটো গরম হয়ে এলো লাজে।অর্ণর কথার কিছু কিছু মানে সে বুঝতে পারে।ভালোবাসা না হোক,হৃদয়ে যে একটা টান আছে,সেটা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারে।কায়নাত লাজ লুকিয়ে বলল,
“উনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারেন না।তবে আমি অনুভব করতে পার তার দৃষ্টি আমার দিকেই আঁটকে থাকে।”
“নাজনীন ভাই কেন এমন করেন না?বজ্জাত লোক একটা!”
কায়নাত খিলখিল করে হেসে উঠল।জয়া রাগ করে হাঁটা ধরল গেটের দিকে।দরজার সামনে জারা ছিল।কায়নাতের বলা সব কথা সে শুনেছে।জয়া তাকে পাশ কাটিয়ে গেলে জারা এগিয়ে এসে কায়নাতের পাশে বসে।কায়নাত তাকিয়ে দেখে মেয়েটার মুখটা ভীষণ মলিন।
“তোমার কী শরীর খারাপ আপু?”
জারা মাথা নাড়িয়ে বলে,
“উহুম!তোমার সাথে একটু গল্প করতে পারি?”
“কেন নয়?আমি তো তোমার বোনের মতোই।”
জারা মুচকি হাসল।হালকা হালকা শীত করছে তার।সে গায়ের শাল ভালো করে জড়িয়ে বলল,
“তোমাদের বিয়ে হয়েছে কবে?”
“সবাই তো বলে ৭ বছরের একটু বেশি হয়েছে।”
জারা অবাক হয় কায়নাতের কথা শুনে।সে এতদিন এক নিষিদ্ধ পুরুষের জন্য অপেক্ষা করেছে।অর্ণ একটাবারও তাকে এই কথা জানায়নি।বুকটা কেমন ভারী হয়ে এলো মুহূর্তেই।কায়নাত বলল,
“তুমি না ঘুমিয়ে ছাদে এলে যে?একা একা ভালো লাগছে না?”
“সত্যিই তাই।অদ্ভুত এক একাকিত্ব ঘিরে ধরেছে আমায়।”
“তাহলে ডানা ঝাঁপটে উড়ে যাও আকাশে।একাকিত্ব আঁকড়ে ধরতে নেই।”
জারা হাসল।হেসেই বলল,
“তুমি খুব পাকা।দোয়া করি আগামী দিন গুলো তোমার ভালো কাটুক।”
রাত ঘনিয়ে এলো।সবার চোখে ঘুম হানা দিলেও এক ভাঙা পাখির চোখে ঘুম এলো না।চোখটা আর বন্ধই হলো না।দুঃখ গুলো বন্ধ করতে দিল না।যা আমাদের ভাগ্যে নেই,সেগুলোই কেন মায়া দেখাতে আসে অল্প সময়ের জন্য?মায়া বড্ড খারাপ জিনিস!মায়া ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে বাধ্য করে।বাধ্য করে জীবনকে ধ্বংস করতে।
•
পরেরদিন খুব ভোরে আতিয়া বেগম উঠেছেন বাইরে হাঁটতে যাবেন বলে।আজগর চৌধুরী কপাল কুঁচকে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে স্ত্রীর কাণ্ড দেখছেন।আতিয়া বেগম গায়ে মোটা শাল জড়িয়ে মাথায় কাপড় দিয়েছেন।ঘুরে দাঁড়িয়ে বিছানাটা গুছিয়ে বললেন,
“তুমি কী যাবে না আমার সাথে?”
আজগর চৌধুরী শান্ত স্বরে মুচকি হেসে বললেন,
“তুমি কী দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছ আতিয়া?”
“ওমাহ!ছোট হব কেন?কী এমন করলাম যে তোমার কাছে আমায় বাচ্চা মনে হলো?”
“এইযে সকাল সকাল উঠেই বায়না ধরেছ আমার সাথে বাইরে ঘুরতে যাবে।যখন আমি থাকব না,তখন তোমার পাশে হাঁটবে কে গিন্নি?”
“সকাল সকাল এমন বাজে কথা বলবে না।”
আজগর চৌধুরী মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।গিন্নিকে নিয়ে বের হলেন বাড়ির বাইরে।চারপাশটা ভীষণ শান্ত থাকে ওই সময়ে।আজগর চৌধুরীর মনে পড়ে বেশ পুরনো দিনের কথা।আতিয়া বেগমকে বিয়ে করে আনার পর গিন্নি তার বাড়ির বাগান জুড়ে বাচ্চাদের নিয়ে খেলত।একটা ছোট্ট পুতুল বিয়ে করে এনেছিলেন তিনি।ভীষণ কোমল সেই নারীর হৃদয়।
বাড়ির বাইরের পথ ভোরের আলোয় ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে। আজগর চৌধুরী ও আতিয়া বেগম বাগানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বাতাসের ঠান্ডা স্পর্শ উপভোগ করছিলেন। পাখিরা গান গাইছিল, আর ঘাসের উপর ভেজা শিশির ছাঁয়ার মতো ঝলমল করছে।
“তোমাকে আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে গিন্নি।”আজগর চৌধুরী হালকা হাসি দিয়ে বললেন।
আতিয়া বেগম লাজুকভাবে মাথা নেড়ে বললেন,
“তুমি কি মনে করছো, বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ তার মাধুর্য হারায়?”
আজগর চৌধুরী চোখ মিটমিট করে তাকিয়ে বললেন,
“না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সৌন্দর্য আরও গাঢ় হয়।”
আতিয়া বেগম হেসে বললেন,
“ওমাহ! তুমি আজও একই পুরোনো চটুল কথাগুলোই বলছো!”
দুজনে বাগানের পথে হাঁটছিল, চারপাশে সবুজ গাছ আর ফুলের সুবাস। দূরে ছোট্ট পুকুরের ধারে মিষ্টি আলো পড়ছিল। আতিয়া বেগম হালকা বাতাসের সঙ্গে তার শাল ঠিক করলেন, আর আজগর চৌধুরী পাশে থেকে হাতটা আলতো স্পর্শ করলেন।
বাড়ির দোতলা থেকে অর্ণ দাদা-দাদির মিষ্টি ভালোবাসার মুহুর্ত দেখছিল।ভালোবাসা তো এমনই হওয়া উচিত!দিন যাবে,মাস যাবে,বছরও যাবে—কিন্তু ভালোবাসা কখনও বদলাবে না।অর্ণ পিছু ফিরে বিছানায় শুয়ে থাকা এলোমেলো ঘুমন্ত কায়নাতের দিকে তাকাল।শান্তি করে কম্বল জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে কিশোরী।না চাইতেও যেন অর্ণর ঠোঁটের কোণায় একটুখানি হাসি চলে এলো।ভোরের গুণগুণে কুঁয়াশারা যেন কায়নাতের লাটসাহেবের কানে কানে ফিসফিস করে বলছিল,
“এইযে লাটসাহেব,এই মধুর মতো মিষ্টি হাসির মানে কী?তুমিও বুঝি প্রেমে পড়েছ?এক অবুঝ কিশোরীর প্রেমে?”
অর্ণ বারান্দার দরজা চাপিয়ে ঘরে এলো।এত ভোরে বাড়ির কেউ উঠেছে বলে তার মনে হয় না।অর্ণ কায়নাতের কপালের সামনে চলে আসা চুল গুলো কানের কাছে গুঁজে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে মেয়েটার ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।কখন যে চোখ লেগে এসেছে,সে নিজেও জানে না।বেলা গড়িয়েছে অনেক।কায়নাত পিটপিট করে চোখ খুলতেই ফের সূর্যের আলোয় চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল।
সূর্যের আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকে পড়েছে। কায়নাত আবার চোখ মেলে তাকাল। পাশে অর্ণ গভীর ঘুমে। কপালে হালকা ভাঁজ, দাড়ির ছাঁয়া গালে নেমে এসেছে। এত কাছ থেকে তাকে আগে কখনও এভাবে দেখা হয়নি।
সে সাবধানে উঠে বসল। যেন নিঃশ্বাসের শব্দটুকুও অর্ণের ঘুম ভাঙিয়ে না দেয়। একটু ঝুঁকে তার মুখের দিকে তাকাল। এই মানুষটাই যে সবসময় গম্ভীর, রাগী, কথায় কথায় বকুনি দেয়—ঘুমের মধ্যে এত শান্ত কেন?
কায়নাত ঠোঁট কামড়ে সাহস সঞ্চয় করল। তারপর খুব ধীরে, খুব লুকিয়ে একটা ছোট্ট চুমু এঁকে দিল অর্ণের গালে। সঙ্গে সঙ্গেই বুক ধড়াস করে উঠল। সে দ্রুত সরে এলো, ভয়ে তাকাল অর্ণ নড়েছে কি না দেখার জন্য।না!ঘুম ভাঙেনি।
কায়নাত চোখ বড় বড় করে আবার তাকাল। মনে সাহস বাড়ল একটু। এবার কপালে। তারপর গালের অন্য পাশে। প্রতিটা চুমুতেই তার নিজের গাল জ্বলে উঠছে লজ্জায়। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি ধরা পড়ে যাবে।
“ইশ!”
নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল সে।
শেষে খুব আলতো করে অর্ণের ঠোঁটের কোণের কাছে একটা চুমু ছুঁইয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই লাফ দিয়ে উঠে পড়ল বিছানা থেকে। বুকের ভেতরটা দম বন্ধ করা উত্তেজনায় ভরে গেছে।কায়নাত দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকাতেই দেখল,অর্ণ চোখ মেলে তাকিয়ে আছে।
মুহূর্তেই কায়নাতের মুখ লাল হয়ে এলো।
“আপ…আপনি জেগে ছিলেন?”
(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করোওওওও।২ হাজার+ শব্দ লিখেছি আজকে।সত্যি করে বলো,আমার লেখা কী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?😒)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৭(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২০