প্রেমবসন্ত_২ ।২০।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
শীতে থরথর করে কাঁপছে সপ্তদশী।অর্ণ ডাইনিং টেবিলে বসে চুপচাপ খাবার খাচ্ছে।সে আড়চোখে তাকাল মেয়েটার দিকে।
“সমস্যা হলে ঘরে গিয়ে ঘুমাও।”
কায়নাত তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়ে বলে,
“সমস্যা হচ্ছে নাতো!আপনি তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করুন।আমার ঘুমে মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
“আমি কী বলেছি দাঁড়িয়ে থাকতে?গিয়েও ঘুমাচ্ছ না কেন?”
“ঘরে যাব কী করে শুনি?ঘরের চাবি তো আপনার কাছে।”
“তোমার ঘরের চাবি আমার কাছে কেন থাকবে,ইডিয়ট?”
কায়নাত মুখ কালো করল।তার মনে হলো অর্ণ খুব বোকা।
“আপনার ঘরের কথা বলেছি আমি।”
“আমার ঘরে তোমার কাজ কী?”
“বাহরে!আমি না আপনার বউ?তাহলে জামাইয়ের সাথে থাকব না?বিয়ে হয়েছে ৭ বছর;অথচ এতদিন জামাই ছাড়া থেকেছি।কত কষ্ট হয়েছে জানেন?”
অর্ণ খুঁকখুঁক করে কেঁশে উঠল।নাকে-মুখে পানি চলে এসেছে।কায়নাত তাড়াহুড়ো করে পানি এগিয়ে দিল।অর্ণ দাঁত চেপে বলল,
“চুপচাপ নিজের ঘরে যাও।আমাকে জ্বালাবে না একদম।”
কায়নাত রাগ নিয়ে সত্যিই নিজের ঘরের দিকে হাঁটা ধরল।সিঁড়ির দিকে পা বাড়ানোর আগে একবার পিছু ফিরে রাগ নিয়ে বলল,
“আমার সাথে আপনি আর কথা বলবেন না।যদি শুনেছি কেউ আমাকে অর্ণর বউ বলেছে,তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বারণ করে বলব আমি সিঙ্গেল।”
•
সকাল দশটা বাজে বোধহয়।চৌধুরী বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা লেক আছে।সেখানে মূলত মানুষ হাঁটা-হাটি করার জন্যই যায়।ছোট্ট আদি মায়ের সাথে বের হয়েছে হাঁটবে বলে।নুসরাত প্রায় সময় ভাইয়েদের সাথে বের হয় হাঁটতে।আজ সবাই ঘুমে ডুবে আছে বলে ছেলেকে নিয়ে এসেছে।ছোট্ট আদি চোখে সানগ্লাস পরে গম্ভীর হয়ে হুডির পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটছে।সামনেই শেহের দাঁড়িয়ে আছে অফিসের পোশাক পরে।নুসরাত খেয়াল করেনি তাকে।কারোর সাথে সে ফোনে কথা বলছে।আদি শেহেরকে দেখেই ‘বাবা’ বলে দৌঁড়ে গেল তার দিকে।শেহের হাত বাড়াতেই বাচ্চাটা কোলে উঠে টুপ করে চুমু খেলো শেহেরের গালে।হেসে ফেলল সে।
“আজ সকাল সকাল বাইরে কী করছিস?”
“মায়ের সাথে এসেছি।”
শেহের সামনে তাকাল।নুসরাত কপাল কুঁচকে এগিয়ে আসছে নিকটে।সামনে আসতেই অবাক হয়ে বলল,
“তুমি এই সময়ে এখানে কী করছো?অফিসে যাচ্ছিলে নাকি?”
শেহের মাথা নাড়িয়ে আদিকে নিচে নামিয়ে দেয়।
“যাচ্ছিলাম তো অফিসেই,কিন্তু তোমাদের দেখে এদিকে এলাম।”
“দেরি হয়ে যাচ্ছে না?”
“হলে হোক।”
নুসরাত শুষ্ক ঠোঁট ভেজাল।সে চাইছে এই মুহূর্তে শেহের এখান থেকে চলে যাক।তার মুখের উপর কিছু বলতেও পারছে না সে।শেহের আদির হাত ধরে এগিয়ে গিয়ে একটা ব্রেঞ্চে বসল।নুসরাত গুটি গুটি পায়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“অনেক লেট হয়ে যাচ্ছে বোধহয়।তুমি নাহয় অফিসে যাও।”
শেহের কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,
“আমার উপস্থিতি তোমার বিরক্তির কারণ হচ্ছে রাত?”
“ছিঃ! কী বলছো এসব?”
“তাহলে এমন করছো কেন?আমার লেট হচ্ছে নাকি হচ্ছে সেটা আমার ব্যাপার।তোমার মাথা ব্যথা হচ্ছে কেন?”
নুসরাত শুকনো ঢোক গিলল।হঠাৎ পেছল দিক থেকে পুরুষালী কণ্ঠস্বরে ভেসে এলো নুসরাতের নাম।নুসরাত দাঁত চেপে চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল।শেহের তাকায় পেছনে।আদির বাবা,শাওন এগিয়ে আসছে এদিকে।আদি শাওনকে দেখেই শেহেরের বুকে গুটিয়ে এসে বলল,
“পঁচা লোক একটা।আমি যাব না উনার কাছে।”
শেহের স্তব্ধ হয়ে ফিরল নুসরাতের দিকে।মনে হচ্ছে নিজের চোখেই যেন ভুল দেখছে।অবিশ্বাস করতেই ইচ্ছে করছে না।শাওন হাসি মুখে এগিয়ে এসে নুসরাতের সামনে এসে দাঁড়াল।চোখে-মুখে আনন্দের ছাপ।সে দারুণ হেসে বলল,
“ভালো আছো নুসু?”
শেহের দাঁত চাপল।দাঁতের ঘর্ষণে এক অদ্ভুত শব্দ হলো।
নুসরাত ভীষণ বিব্রত হয়ে আড়চোখে শেহেরের দৃষ্টি বুলিয়ে বলল,
“ভালো আছি।কী দরকার?”
“দরকার মানে?তোমার সাথে আমি দেখা করতে পারি না?আমার ছেলে কোথায়?”
পাশ থেকে আদি নাক ছিঁটকে বলে,
“তুমি এসেছ কেন?”
শাওন পাশে ফিরে দাঁড়ায়।আদির সাথে শেহেরকে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে।আদিকে উপেক্ষা করে বলে,
“শেহের যে?আজ হঠাৎ একসাথে?”
শেহের উঠে দাঁড়ায়।জোরপূর্বক মুচকি হেসে শুধোয়,
“ভালো আছো?”
“আছি ভালো।তোমার কী অবস্থা?”
“আলহামদুলিল্লাহ।আজ হঠাৎ এখানে?”
“ছেলে আর ছেলের মায়ের সাথে দেখা করতে এলাম।”
শেহের হাসে।হেসে খোঁচা মেরে বলে,
“তোমার বউ তোমায় কিছু বলবে না?এক্স ওয়াইফের সাথে দেখা করতে এসেছ এটা সে জানে?”
শাওনের হাসিটা একটু শক্ত হয়ে এলো।মুখের কোণে জমে থাকা স্বচ্ছলতা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।তবু নিজেকে সামলে নিয়ে হালকা হেসে বলল,
“আমার বর্তমান বউ জানে আমি ছেলের খোঁজ রাখতে আসি।এটা নতুন কিছু না।”
শেহের ভ্রু কুঁচকে তাকাল।কণ্ঠে তাচ্ছিল্য,
“ছেলের খোঁজ আর এক্স ওয়াইফের জীবনে ঢুকে পড়া এই দুইটার পার্থক্য বোঝো তো?”
নুসরাত আর সহ্য করতে পারল না।দু’পা এগিয়ে এসে গলা নামিয়ে বলল,
“শেহের ভাই, প্লিজ।এখানে এসব কথা রাখো।”
শাওন এবার একটু চটে গেল।চোখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
“আমি আমার ছেলের কাছে আসতেই পারি,শেহের।কারো অনুমতির দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না।তুমি মাঝখানে কথা বলছো কেন?ও আমার ছেলে।”
শেহের ঠান্ডা চোখে তাকাল।কণ্ঠ নরম,কিন্তু ধারালো।
“ছেলে শুধু জন্ম দিলেই হয় না,শাওন।সন্তান জন্ম দিয়ে পাঁজরের সাথে বেঁধে রাখতে হয়।”
নুসরাতের চোখ ভিজে এলো।সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।চারপাশের মানুষজন কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে।পরিস্থিতি ভারী হয়ে উঠছে।
শাওন গভীর নিঃশ্বাস নিল।স্বরে জোর কমিয়ে বলল,
“আমি ঝগড়া করতে আসিনি।আদির ব্যপারে কিছু কথা ছিল।”
শেহের সোজা হয়ে দাঁড়াল।এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।লেকের পানিতে হালকা ঢেউ।শীতের রোদে বেঞ্চের ছায়া লম্বা হয়ে গেছে।
শাওন শেষমেশ বলল,
“আমি চাই সপ্তাহে একদিন আদি আমার কাছে আসুক।”
নুসরাত চমকে তাকাল।ঠোঁট কাঁপছে।
“না!এটা সম্ভব না।”
শেহের আদিকে নামিয়ে নুসরাতের পাশে দাঁড়াল।কণ্ঠে দৃঢ়তা,
“ওর মা না চাইলে কিছুই হবে না।ডিভোর্সের সময় তো তোমার কোনো দাবি ছিল না।”
“তুমি প্লিজ আমাদের মধ্যে কথা বলবে না।আমি নুসরাতের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলব।”
শাওন প্রস্থান করার পর নুসরাত কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।শেষে চোখ তুলে তাকাল শেহেরের দিকে।শেহেরের চোখ ক্রোধে লাল হয়ে এসেছে।মেয়েটা হাত বাড়িয়ে আদিকে ধরতে গেলে শেহের দাঁত চেপে বলে,
“এই সাতসকালে শাওনের সাথে দেখা করার জন্য বের হয়েছ আদিকে নিয়ে?”
“না।”
“তাহলে এসব কী?”
“আমি বাড়ি যাব শেহের ভাই।অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার।”
নুসরাত ফের হাত বাড়ালে শেহের গলা চওড়া করে ধমকে উঠল তাকে,
“তুমি কী চাইছ বলবে আমায়?শাওন এখানে কী করছে?ওর সাথে ফোনে তোমার কথা হয় রাত?”
নুসরাত চমকে উঠে।ফের শক্ত গলায় বলে,
“প্লিজ চিৎকার কোরো না।আমার লাইফ,আমাকে বুঝতে দাও।তুমি কেন এসবে জড়াচ্ছ?”
শেহের তাচ্ছিল্য হাসল।
“তুমি কী চাইছ বলো তো রাত?তার জীবনে ফিরে যেতে চাইছ?”
“আমি কিছুই চাইছি না।তুমি শুধু শুধু রিঅ্যাক্ট করছো।”
নুসরাত আদিকে জোর করে নিজের কাছে টেনে এনে বলল,
“এসব থেকে তুমি দূরে থাকলে বেশি খুশি হব।”
নুসরাত আদিকে নিয়ে পিছু ফিরে হাঁটা ধরল।পেছনে দাঁড়িয়ে রইল এক প্রেমিক পুরুষ।নুসরাত যখন চৌধুরী বাড়িতে আসে,তখন সে খুবই ছোট।এক ছোট্ট পাখি।চোখের সামনে বড় হয়েছে এই মেয়ে।কিশোরী জীবনে পা রাখার পর শেহেরের নজর আঁটকেছিল তার রাতপাখির দিকে।চেয়েছিল বড় হলে বউ করে নিজের ঘরে তুলবে।চেয়েছিল তার রাতপাখির সাথে তার একটা ছোট্ট চড়ুই পাখির সংসার হবে।একটুখানি একটা সংসারের বড্ড শখ ছিল তার।আজ এত গুলো বছর কেটে গেছে,তবু যেন এই নারীকে হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারেনি সে।এখন সেই নারীর ৬ বছরের একটা সন্তান আছে।বড্ড আদুরে সেই বাচ্চাটা।শেহের হঠাৎ হেসে ফেলল।ভালোবেসে বড্ড ভুল করে ফেলেছে সে।না এই দহন সইতে পারছে আর না কিছু করতে পারছে।আজ-কাল বিয়ের জন্য চাপ দেয়া শুরু হয়েছে বাড়িতে।মা দিন-রাত কানের কাছে এসে বিয়ে বিয়ে করতেই থাকেন।
শেহের বসল সেই ফাঁকা ব্রেঞ্চে।দৃষ্টি রাখল পানিতে।লেকের জল নিঃশব্দে ঢেউ তুলে আবার থেমে যাচ্ছে,ঠিক তার বুকের ভেতরের মতো।শীতের রোদে বসেও অদ্ভুত ঠান্ডা লাগছে তার।হাত দুটো পকেটের ভেতর ঢুকিয়ে মুঠো করল,তবু কাঁপুনি থামল না।
নুসরাতের শেষ কথাগুলো বারবার কানে বাজছে, “এসব থেকে তুমি দূরে থাকলে বেশি খুশি হব।”
খুশি? সে কি কখনো নিজের খুশির কথা ভেবেছে?
চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোট্ট নুসরাত।চৌধুরী বাড়ির উঠোনে লাজুক পায়ে হাঁটা,দু’চোখ ভরা ভয় আর কৌতূহল।রাতে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখত বলে সে ডেকেছিল ‘রাতপাখি’।সেই রাতপাখির ডানায় সে নিজের স্বপ্ন বেঁধেছিল।ভাবত একদিন সে-ই হবে তার ঘরের আলো।
আজ সেই রাতপাখির কোলে আরেকটা ছোট্ট প্রাণ।ছোট্ট চড়ুইটা তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকে।শব্দটা শুনলেই বুকের ভেতর কেমন জানি ব্যথা করে ওঠে।নিজের নয়,তবু কত আপন লাগে!
শেহের চোখ শক্ত করে বন্ধ করল।এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গালের উপর।লুকোনোর দরকার নেই,এখানে কেউ দেখছে না।
“ভালোবাসাটা যদি ভুল হয়,তাহলে শাস্তিটা এত বড় কেন?”
মায়ের মুখটা মনে পড়ল।দিনরাত একটাই কথা,বিয়ে কর।ঘরটা খালি পড়ে আছে।কাকে বিয়ে করবে সে?কোনো অচেনা মুখকে এনে বসাবে সেই জায়গায়,যেখানে এত বছর ধরে শুধু নুসরাতের অস্তিত্ব ছিল?
দূরে আদির হাসির শব্দ ভেসে এলো কল্পনায়।শেহের হালকা হাসল।হাসির ভেতর অসীম হাহাকার।
“তোমরা ভালো থাকলেই হলো।” সে নিজের মনকে বোঝাল।
“আমাকে আর দরকার নেই।”
সে উঠে দাঁড়াল।ব্রেঞ্চটা ফাঁকাই রইল;যেমন ফাঁকা হয়ে গেছে তার বুকের এক কোণা।অফিসের দিকে পা বাড়াল।ভালোবাসাকে বুকের গভীরে কবর দিয়ে বেঁচে থাকার অভিনয় তো শিখেই গেছে।
•
রোদ যখন একদম মাথার উপরে,তখন চৌধুরী বাড়ির গেট দিয়ে একটা কালো রঙের গাড়ি ঢুকল।হিনান গাড়ির দরজা খুলে দিতেই গাড়ির ভেতর থেকে নেমে এলো এক যুবতী।পরনে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ।সে গাড়ি থেকে নেমে হিনানকে দেখে গাল ভরে হাসল।মিষ্টি কণ্ঠস্বর তার।
“হিনান ভাই,কেমন আছো?”
হিনান হেসে বলল,
“খুব ভালো আছি।আপনি এতদিন পর আসলেন যে?”
“বাবার সাথে বাইরে গিয়েছিলাম জানো না?”
“আমি কিভাবে জানব?আপনার সাথে কেউ আসেনি?”
জারা মাথা নেড়ে বলল,
“মা-বাবা ঢাকার বাইরে আছে।”
হিনান গাড়ি থেকে সব জিনিস নিয়ে জারার সাথে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।ড্রয়িংরুমে বেহরুজ বেগম কিছু জিনিস প্যাক করছিলেন কায়নাতের সাথে খুলনা পাঠাবেন বলে।হঠাৎ জারার ডাকে চমকে উঠলেন তিনি।সদর দরজা দিয়ে একটা মিষ্টি মাখা মুখ এগিয়ে আসছে তার দিকে।তিনি ঘাবড়ালেন একটু।জারা এগিয়ে এসে সালাম দিল।বেহরুজ বেগম সালামের উত্তর নিলেন।
“এতদিন পর?”
জারা হেসে বলল,
“আমায় কী ভুলে গেছো?”
“ভুলব কেন?তোমার মা আসেনি?”
“মা তো বাবার সাথে চট্টগ্রাম গেছে।”
বেহরুজ বেগম সাঈমাকে কাজে দিয়ে জারাকে নিয়ে সোফায় বসলেন।জারা বেহরুজ বেগমের সম্পর্কে ভাগ্নি হয়।ভীষণ শান্ত স্বভাব মেয়েটার।যেমন ব্যবহার ঠিক তেমন চলা-ফেরা।জারা সবার কথা জিজ্ঞেস করল।বেহরুজ বেগম বললেন নিশা আর নিধি ভার্সিটি গেছে।আর বাকিরা বাড়িতেই আছে।জারা মুচকি হাসল।মুখে কেমন লাজুক আভা ভেসে উঠল।মেয়েটা খুব নিচু স্বরে বলল,
“উনি কী বাড়িতে নেই?”
বেহরুজ বেগম জানেন জারা অর্ণর কথা জিজ্ঞাসা করছে।তিনি শুকনো ঢোক গিলে প্রস্তুত করলেন নিজেকে।
“তোমাকে কিছু কথা বলার আছে জারা।”
জারা বলল,
“সব শুনব আন্টি।আগে আমি একটু ফ্রেশ হই?একদিনের জন্য নয়,বেশ কয়েকদিন থাকব আমি এই বাড়িতে।”
বেহরুজ বেগম মাথা নাড়লেন।তাকে গেস্টরুমে পাঠানো হলো।
এদিকে কায়নাত নিজের প্রয়োজনীয় সব কিছু গুছিয়ে রেখেছে।এবার গোসল সেরে রেডি হয়ে বের হবে।মেয়েটা আজ সালোয়ার-কামিজ বের করল।এটার উপর বোরকা পরে বের হবে সে।কাজ মতো সাদা প্রিন্টের সালোয়ার-কামিজ নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল।অর্ণর সাথে তার এখন অব্দি কথা হয়নি।বেহরুজ বেগম বলেছিলেন অর্ণর থেকে অনুমতি নিতে।খানিকক্ষণ পর সে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই চমকে উঠল ঘরে অর্ণকে দেখে।অর্ণ বিছানায় বসে ছিল।কায়নাত বের হতেই কপাল কুঁচকে ফেলল।কায়নাত দৌঁড়ে এসে বিছানার উপর থেকে ওড়না নিয়ে আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আপনি এখানে কী করছেন?”
“পুরো বাড়ি আমার।যেখানে খুশি সেখানেই যাব,তোমার কোনো সমস্যা আছে?”
থমথমে মুখে কায়নাত ওড়না চেপে ধরল মুখে।কিশোরীর শরীর ভিজে যাচ্ছে ভেজা চুলের পানিতে।অর্ণ চোখ সরিয়ে ফেলল বিরক্ত হয়ে।আদি তার ফোন এই ঘরে ফেলে রেখে গেছে।সেটাই নিতে এসেছিল।খুঁজে না পেয়ে চুপটি করে বসেছে বিছানায়।সে উঠে দাঁড়াল।গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আমার ফোন কোথায়?”
কায়নাত তার বালিশের নিচ থেকে বের করে সামনে ধরল।অর্ণ ফোন নিয়ে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল।মেয়েটা আঁটকে রাখা শ্বাস টুকু ছেড়ে দিয়ে মাথার চুল মুছল।
ভেজাভাব এখনও পুরো কাটেনি।আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।আজ বুকের ভেতরটা অদ্ভুত খালি খালি লাগছে।
ওড়নাটা ঠিক করে দরজা খুলে বেরোতেই হঠাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।
এক তরুণী সবে গেস্টরুমের দিক থেকে বের হচ্ছে।পরনে হালকা রঙের সালোয়ার-কামিজ,চুল খোলা,মুখে শান্ত এক ধরনের হাসি।দু’জনেরই একসাথে চোখা-চোখী হলো।
দু’জনেই অচেনা।
জারা আগে ভদ্রভাবে কথা বলল,
“ওহ! সরি আমি বুঝতে পারিনি কেউ আসছে।”
কায়নাত একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“না না, ঠিক আছে।”
“আমি জারা।এই বাড়িতে আজই এলাম।”
কায়নাত ভদ্রতার হাসি টেনে আনল।
“আমি কায়নাত।”
“তুমি কি এখানে থাকো?”
কায়নাত মাথা নাড়ল।
“জি।”
জারা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।কিন্তু চোখে কৌতূহল জমে রইল।কায়নাতও লক্ষ্য করল মেয়েটার আচরণে এক ধরনের সংযত আত্মবিশ্বাস।খুব চেনা কেউ না,তবু এই বাড়িতে সে যেন অতিথি হয়েও আপন।
“আমি আন্টির ভাগ্নি।” জারা হালকা স্বরে যোগ করল।
“কয়েকদিন থাকব।”
কায়নাত আবার মাথা নাড়ল।
“ওহ।”
আর কোনো কথা হলো না।কায়নাত সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।পেছনে জারা দাঁড়িয়েই রইল কয়েক সেকেন্ড।তার চোখে তখন একরাশ প্রশ্ন,এই মেয়েটা কে?বাড়ির মানুষ?
নিচে নেমে আসতেই কায়নাত বেহরুজ বেগমের সাথে কথা বলে নিল।বিকেল বেলায় বের হবে সে।জারার সাথে কায়নাতের পরিচয় করিয়ে দিলেন।এতক্ষণের অস্বস্থিবোধটা কেটে গেছে।জারা কায়নাতের সাথে খুলনা যেতে চাইল।এর আগেও একবার সে যেতে চেয়েছিল কিন্তু মায়ের জন্য পারেনি।বেহরুজ বেগম তার সাথে আলাদা করে কথা বলতে চেয়েছেন বেশ কয়েকবার।মেয়েটা সেই সুযোগ তাকে দেয়নি।আবার কায়নাতকেও বলতে পারছেন না অর্ণর সাথে একটা সময় জারার বিয়ে ঠিক হয়েছিল।
তৈরি হয়েছে কায়নাত।সব জিনিস গাড়িতেও রাখা হয়ে গেছে।সে অর্ণর সাথে দেখা করবে এখন।ঘরের বাইরে বেরিয়ে তিন তলায় যাওয়ার সময় নজরে এলো জারা অর্ণর ঘর থেকে বের হচ্ছে।কপালে ভাঁজ পড়ল তার।
কায়নাত এক মুহূর্ত থমকে গেল।জারার পেছন ফিরে যাওয়া পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড।বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।কেন জানি না,এই দৃশ্যটা চোখে লেগে রইল তার।
সে ধীরে ধীরে অর্ণর ঘরের দিকে পা বাড়াল।
দরজাটা আধখোলা।ভেতর থেকে অর্ণর গলা ভেসে আসছে।কাউকে ফোনে কিছু বলছিল।কায়নাত দরজায় দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করল।কথা শেষ হতেই সে হালকা করে দরজায় টোকা দিল।
কায়নাত ঢুকতেই অর্ণ তাকাল।এক সেকেন্ডের জন্য চোখে বিরক্তি,তারপর আবার সেই চেনা গম্ভীর ভাব।
“কী?”
“আমি…আমি খুলনা যাচ্ছি।আম্মু বললেন আপনাকে বলে যেতে।”
অর্ণ চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাছে গেল।বাইরে তাকিয়ে বলল,
“যাও।”
কায়নাত অবাক হয়ে তাকাল।এইটুকুই?আর কিছু না?সে সাহস সঞ্চয় করে বলল,
“আর কিছু বলবেন?”
অর্ণ ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কী বলব?”
কায়নাতের গলা ভারী হয়ে এলো।মেয়েটার গলায় কথা আঁটকে এলো অভিমানে।
“আমি গেলে আপনার কোনো অসুবিধা হবে?”
অর্ণ এক সেকেন্ড চুপ করে গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি গেলে আমার কী অসুবিধা হবে?”
কথাটা খুব স্বাভাবিক,খুব সোজা।কিন্তু কায়নাতের বুকের ভেতরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল।সে জোর করে হাসল।
“ঠিক আছে।”
পিছু ফিরে দরজার দিকে যেতে গিয়েও থামল।হালকা স্বরে বলল,
“আপনার ঘর থেকে একজন বের হচ্ছিল।”
অর্ণ বুঝল।চোখে একফোঁটাও বিস্ময় নেই।
“জারা।আত্মীয়।”
“ওহ,” কায়নাত মাথা নাড়ল।
“আপনাদের ভালোই কথা হচ্ছে মনে হলো।”
অর্ণ কণ্ঠ শক্ত করে বলল,
“অপ্রয়োজনীয় কথা নিয়ে মাথা ঘামিও না।”
কায়নাত আর কিছু বলল না।দরজার হাতল ধরে বেরিয়ে গেল।
ঘর থেকে বের হতেই বুকের ভেতরটা ভীষণ ভারী লাগল।কী যেন চাপা পড়ে আছে,কিন্তু তার নাম জানা নেই।সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবল,এই বাড়িতে সে বউ হয়েও যেন অতিথি।
•
[২.৫k পূরণ করবেন।গল্প একদিন পর-পর পাবেন।আপনাদের রেসপন্স দেখলে মাঝে মধ্যে এত খারাপ লাগে।দিন দিন পেইজের রিচ ডাউন হয়ে যাচ্ছে।ভেবেছিলাম এবার রেগুলার হব কিন্তু আপনাদের যা অবস্থা লিখতে গেলেও এখন লেখা আগায় না।কী করব বলুন তো?]
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২১