প্রেমবসন্ত_২
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
১৭.(প্রথমাংশ)
কায়নাত রান্নার ঘরের সামনে চুপটি করে দাঁড়াল।উদ্দেশ্য একটা নাড়ু খাওয়া।আতিয়া বেগম ঘাড় উঁচু করে দেখলেন,ছোট্ট কায়নাত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।তিনি ঠোঁট টিপে হাসলেন।কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,
“কিরে বুড়ি,দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করা হচ্ছে শুনি?”
কায়নাত বলল,
“আমি তোমার সাথে একটু কাজ করি দাদি?”
“কাছে আয়।”
কায়নাত ভেতরে প্রবেশ করে ঠাস করে বসে পড়ল কড়াইয়ের সামনে।আতিয়া বেগম তার ছোট হাতে সরিষার তেল দিয়ে দিলেন।কায়নাত সেই হাত দিয়ে কষ্ট করে একটা বড় নাড়ু বানাল।গরম থাকার কারণে নরম হয়ে ভেঙে যাচ্ছিল।মেয়েটা হঠাৎ করে গরম নাড়ু মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে খেয়ে ফেলল।আতিয়া বেগম আশ্চর্য হয়ে মেয়েটার কান্ড দেখলেন।কাজ রেখে আতঙ্কিত হয়ে বললেন,
“কী করলি এটা?এত গরম জিনিস কেউ মুখে দেয়?”
কায়নাত ঠোঁট চেপে বলল,
“আমায় দিচ্ছিলে না কেন?”
“হলে তারপর তো দিব?”
“তাহলে আমি আরেকটা খাই?”
আতিয়া বেগম কপাল চাপড়ে গলা ছেড়ে লতা বেগমকে ডাকলেন।লতা বেগম দৌঁড়ে এলেন শাশুড়ির ডাকে।এসে দেখলেন কায়নাত মেঝেতে বসে আছে।তিনি উপস্থিত হতেই আতিয়া বেগম বললেন,
“এই বুড়িকে নিধির কাছে দিয়ে এসো।এসে তাড়াতাড়ি এখানকার কাজ শেষ করো।”
লতা বেগম কায়নাতকে নিয়ে আগে উপরে গেলেন।শাড়ি ময়লা হয়েছিল বলে জেদ ধরে অন্য আরেকটা শাড়ি পরে মায়ের সাথে বাড়ি থেকে বের হলো সে।লতা বেগম বাগানে নিধির কাছে ওকে রেখে তাড়াতাড়ি ঢুকলেন বাড়িতে।নিধি তখন সদ্য ১২তে পা রেখেছে।মিষ্টি,মায়াময় চেহারার অধিকারী।সে কায়নাত আর ছোট ছোট বোনদের নিয়ে বাড়ির বাগানেই খেলা শুরু করল।মেয়েদের হাতের চুড়ির ঝনঝন শব্দে তখন মুখরিত চারপাশ।কায়নাতের খিলখিলিয়ে সেই হাসির শব্দে এক শুদ্ধ পুরুষের হৃদয় থমকেছিল।চৌধুরী বাড়ির বিশাল গেটের সামনে অর্ণ চৌধুরী দাঁড়িয়ে ছিল নিজের গাড়ি নিয়ে।পরনে তখন সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা।ছেলেটার বয়স তখন ২৫ এর ঘরে।বাড়ির ভেতর থেকে অচেনা নারীর খিলখিল করা হাসির শব্দ শুনে পা স্থির হলো সেখানেই।
কায়নাত দৌঁড়ে এসে অন্য বোনদের সাথে মিশে গেল।নিধি মাটিতে রঙ-বেরঙের কাঁচের গুটি ঢেলে দিল,আর সুহা,মাহি,জয়া মাটি ছুঁয়ে গুটিগুলো সাজাচ্ছে।হাসছে, আবার ঝগড়াও করছে।ফুলে ভরা বাগানের মাঝে কায়নাতের হাসিটা যেন আলাদা করে কেমন ঝলমল করছিল।
মাত্র দশ বছরের ছোট্ট মেয়ে—চোখে কচি নিষ্পাপ আলো,ঠোঁটে একফালি দুষ্টুমি।গায়ে আজ যে শাড়িটা জড়ানো হয়েছে, সেটা আসলে আতিয়া বেগমের বিয়ের পর আজগর চৌধুরী উপহার দিয়েছিলেন।যত্ন করে তিনি রেখে দিয়েছিলেন সেটা।হালকা বেগুনী রঙের, সুতার ঝলমলে কাজ।ফিট না হওয়ায় কোমরে গিঁট মেরে বাঁধা।মেয়েটা খেলতে খেলতেই মাঝেমধ্যে শাড়িটা ধরে টানছে, ঠিকঠাক করছে,কিন্তু তবুও অদ্ভুতভাবে মানিয়ে গেছে তার গায়ে।চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখে এসে পড়ছে।সে বিরক্ত মুখে ফুঁ দিয়ে সেগুলো সরাচ্ছে আবার দৌঁড়ে গিয়ে গুটি কুড়াচ্ছে।নিধি রাগ দেখিয়ে বলছে,
“এই কায়নাত! গুটিটা আমার ছিল!”
কায়নাত মুচকি হেসে বলল,
“এটা তোমার ছিল না,মাটির ছিল।”
তারপর খিলখিল করে আবার হেসে উঠল।সেই হাসির শব্দেই যেন বাতাস একটু থেমে গেল।চৌধুরী বাড়ির বিশাল লোহার গেট ঠেলে অর্ণ চৌধুরী ভেতরে প্রবেশ করছে তখনই।দীর্ঘদেহী, শান্ত অথচ কঠোর চোখের মানুষ।সাদা পাঞ্জাবি-পাজামায় তার উপস্থিতিই আলাদা।দারোয়ান তার গাড়ির পেছন থেকে ব্যাগ-বক্স নামাচ্ছে, কিন্তু অর্ণর দৃষ্টি সেদিকে নেই।হাসির শব্দটা কানে যেতেই তার পা ধীরে থেমে গেল।বাগানের দিকে তাকাতেই সে স্থির।এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় আঁটকে গেছে।
ফুল ফোটা বাগানের মাঝখানে বেগুনী শাড়িতে ছোট্ট এক মেয়ে।চোখে দীপ্যমান দুষ্টুমি, চুলগুলো এলোমেলো, মুখে এমন হাসি যা পরিষ্কার, উজ্জ্বল এবং অদ্ভুতভাবে পরিচিত নয়,তবু টান ধরে।
অর্ণর কপাল খানিকটা কুঁচকে এলো।
“কে এই মেয়ে?” মনে প্রশ্ন জাগল।
অর্ধেক চমক,কারণ আগে কখনো দেখেনি।অর্ধেক অদ্ভুত এক ঝিলিক,কারণ চোখ সরাতে পারছে না।
মেয়েটা আবার দৌঁড় দিল,শাড়িটা পায়ে প্যাঁচিয়ে যাচ্ছে,সে হোঁচট খেয়ে সামলে নিল নিজেকে।
ওদের হাসির শব্দ আবার মিলিয়ে গেল বাতাসে।
অর্ণর গলা যেন শুকিয়ে এলো।নরম বাতাসে বেগুনী শাড়ির কুচিটা দোল খাচ্ছে।মেয়েটার চোখে যে আলো,কোনো শিশুর চোখে এতটা উচ্ছ্বাস, মুক্তি,আর বেঁচে থাকার আনন্দ সে কোনোদিন দেখেনি।তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি খেলে গেল।
কি অনুভূতি সেটা?মনে হল যেন অচেনা কেউ তার শান্ত, কোলাহলহীন জীবনে হঠাৎ করে ঢুকে পড়েছে।
সে দৃষ্টি সরাতে চাইল, কিন্তু পারল না।বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্ণ চৌধুরী প্রথমবারের মতো দেখল ছোট্ট কায়নাত সুবাহ’কে।
বাগান থেকে নিধির হঠাৎ চোখ গেল অর্ণর দিকে।মেয়েটা চিৎকার করে বলল,
“অর্ণ ভাই চলে এসেছে।”
মেয়েদের লাফালাফি বন্ধ হলো তৎক্ষণাৎ।দুষ্টু কায়নাত কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে পিছু ফিরল হাঁপাতে হাঁপাতে।দেখল,লম্বা-চওড়া একজন সুন্দর লোক অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরনে।দেখতে অন্যরকম।
নিধিরা ছুটে গেল অর্ণর কাছে।বোনদের এভাবে ছুটে আসতে দেখে অর্ণ গম্ভীর হয়ে ওদের থামিয়ে দিয়ে বলল,
“লাফালাফি পছন্দ নয় আমার।চুপচাপ বাড়িতে আয়।”
সে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল হনহন করে।কায়নাত সেদিকে তাকিয়ে বলল,
“ওটা কে?”
পাশ থেকে নিধি বলল,
“অর্ণ ভাই।মেজ চাচার বড় ছেলে।”
কায়নাত ছোট্ট করে ‘ওহ’ বলে ওদের সাথে বাড়িতে প্রবেশ করল।ড্রয়িংরুমে অর্ণকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সবাই।অর্ণ গম্ভীর হয়ে সোফায় বসেছে।রেখা বেগম ঠান্ডা সরবত এনে দিলেন তাকে।সোফার কাছে যে ফ্যানটা ছিল,সেটা নষ্ট হয়েছে বলে লতা বেগম পাখা দিয়ে বাতাস করছেন।অর্ণর ফোন বেজে উঠল তখনই।সে পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল বেহরুজ কল করেছেন।সে কল রিসিভ করে দাদির নিকটে এগিয়ে দিল।আতিয়া বেগম ফোন নিয়ে অন্যপাশে যেতেই লতা বেগম পিছু ফিরে বড় মেয়েকে দেখে বললেন,
“এই কায়নাত,কাছে আয়।”
কায়নাত এগিয়ে এলো কাছে।রেখা বেগম নিধিকে টেবিল গোছাতে বলেছেন বলে সে কাজে লেগে গেছে।লতা বেগম কায়নাতের হাতে হাত-পাখা ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“বড় ভাইকে বাতাস কর। চুলায় তরকারি বসিয়ে এসেছি আমি।”
কায়নাত মাথা নেড়ে হাত-পাখা হাতে নিল।লতা বেগম প্রস্থান করতেই সে অর্ণর একদম সামনে এগিয়ে এসে ফ্লোরে বসে পড়ল।অর্ণ হতভম্ব হয়ে ধমক দিয়ে বলল,
“এই মেয়ে,কী করছো?”
কায়নাত চোখ ছোট ছোট করে মাথা উঁচিয়ে তাকিয়ে সোফার নিচ থেকে লাল রঙের একটা ছোট টুল বের করে পাশে রেখে সেখানে দাঁড়াল।অর্ণর দিকে পাখা ঘুরিয়ে পিটপিট করে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আপনি বুঝি শহরের বাবু?আমার লাটসাহেব?”
ছোট্ট মেয়েটার মুখে এমন কথা শুনে অর্ণ হতবাক।হাতে কাঁচের চুড়ির ঝনঝন শব্দে তার মাথা ধরে আসছিল।ছোট্ট চোখে চিকন করে কাজল আঁকা ছিল।ছোট্ট ঠোঁট জোড়া চেপে ফ্যালফ্যাল করে অর্ণর দিকে তাকিয়ে ছিল।অর্ণর থেকে উত্তর না পেয়ে সে ফের চঞ্চল গলায় বলল,
“আপনি টিভির নায়কদের মতো দেখতে।আপনি কী ছবি করেন?”
অর্ণ শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল।কায়নাত ভ্রু-কুঁচকে ভাবল অর্ণ বোধহয় কথা বলতে পারে না।মেয়েটার দুঃখ হলো।বাতাস করতে করতেই অর্ণর খাবারের ব্যবস্থা করা হলো।বাড়িতে এই মুহূর্তে কোনো পুরুষ মানুষ নেই।সবাই গেছে কাজে।আতিয়া বেগম অর্ণকে ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসতে বললেন।অর্ণ সেখান থেকে প্রস্থান করার পর কায়নাত গেল নিধির সাথে নিধির ঘরে।দুপুরে হয়তো সবাই আবার একসাথে খেতে বসবেন।কায়নাতকে আতিয়া বেগম নতুন নতুন শাড়ি দিয়েছিলেন পরার জন্য। “কায়নাত সুবাহ” মূলত চৌধুরী বাড়ি থেকেই শাড়ি পরা শুরু করেছিল।আতিয়া বেগম বলেন,নারীদের সৌন্দর্য এখানেই বাঁধা থাকে।তিনি নাতনিদের শাড়ি পরালেও সবার পোশাকে শালীলতা থাকে।গত দুই সপ্তা ধরে কায়নাত চৌধুরী বাড়ি এসেছে।এখানে আসার পরই আতিয়া বেগম তাকে চৌধুরী বাড়ির মেয়েদের মতো বানিয়ে ফেলেছেন।
•
চৌধুরী বাড়ির দুপুর মানেই যেন এক আলাদা রাজকীয় ব্যস্ততা।আরাম,গরম,আর রান্নার সুগন্ধে ভরা এক মহা-উৎসবমুখর শান্তি।আর আজ তো একটু বেশিই।বাড়িটার চারদিকই রোদে ঝলমল করছে তখন।দুপুরের আগুনরোদ ছাদ আর দালানের সাদা দেয়ালে পড়ে যেন চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল।
অন্দরমহলে আজ বাড়ির বউদের হাঁসফাঁস অবস্থা।
বাড়িতে নানান ধরনের রান্না হয়েছে।পাতলা ডাল, গরুর মাংস,চিংড়ি,বেগুন ভর্তা,শসা-পেঁয়াজের সালাদ,আর রান্নাঘরের কোণে বড় হাঁড়িতে পাকছে পায়েস।ঘরের ভেতর থেকে নারকেলের দুধ,ঘি,মরিচের তীব্র ঘ্রাণ মিলেমিশে চারদিকে ছড়িয়ে আছে।আতিয়া বেগম হাঁটাহাঁটি করতে করতে বউদের নির্দেশ দিচ্ছেন,
“জ্বালটা আরেকটু কমাও।ওদিকে পায়েসে চিনি কম দিয়ো,অর্ণ মিষ্টি কম খায়!”
রান্নাঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কায়নাত আবার উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।তপ্ত দুপুরেও মেয়েটার কৌতূহল কমে না।শাড়িটার কুঁচি কোমর থেকে খুলে যাচ্ছে, সে আবার গিঁট করে বেঁধে নিচ্ছে।চোখ বড় বড় করে পায়েসের হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“দাদি,আজ পায়েস আছে?”
আতিয়া বেগম গম্ভীর মুখে বললেন,
“আছে তো! কিন্তু আগে গোসল সারতে হবে,তারপর পায়েস।”
কায়নাত ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“আমি আগে খাব।গোসল তো করে এসেছি।দেখো না?”
আতিয়া বেগম মেয়েটার শাড়ির অবস্থা দেখে কপাল চাপড়ে সোফায় গিয়ে বসলেন।ইশারায় কায়নাতকে কাছে ডেকে শাড়ি খুলে দিয়ে কুচিবিহীন শাড়ি পরিয়ে দিয়ে বললেন,
“দাদা না এত চুড়ি কিনে দিল?পরিসনি কেন?”
কায়নাত বলল,
“ওইযে একটা সুন্দর ছেলে এলো না?উনিই তো বললেন,হাতে চুড়ি না পরতে।”
আতিয়া বেগম আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“অর্ণ বলেছে?কেন?ওর ঘরে গিয়েছিলি তুই?”
কায়নাত মাথা নাড়িয়ে বলল,
“গিয়েছিলাম।উনাকে দেখতে গিয়েছিলাম।নিধি আপু বলেছে উনি না এলে খেতে দিবে না কাউকে।তাই তো দেখতে গিয়েছিলাম।”
“গিয়ে কী দেখলি?”
“ঘরের ভেতরে যেতে দেয়নি তো!খুব খারাপ লোক,জানো?আমায় ধমক দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে।”
আতিয়া বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাড়া দিয়ে বললেন,
“যা,নিধিদের ডেকে নিয়ে আয়।খেতে দিব এখনই।”
কায়নাত দৌঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।খানিকক্ষণ পর অর্ণ আসতেই টেবিলে খাবার পরিবেশন করা হলো।আতিয়া বেগম এটা-ওটা জিজ্ঞেস করছেন অর্ণকে।অর্ণ বিদেশ থেকে ফিরেছে কিছুদিন আগে।বিদেশ থেকে ফেরার পর অবশ্য একবার পরিবার নিয়ে আসা হয়েছিল,তবে আজগর চৌধুরী বেশ কয়েকদিন ধরে অর্ণকে খুলনা আসতে বলছেন বলে আজ মাসখানেক পর সে গ্রামে এসেছে।আতিয়া বেগম অর্ণর প্লেটে ভাত বেড়ে দিতে দিতে গলা ছেড়ে ডাকলেন কায়নাতকে।নিধিরা সবাই এসে টেবিলে ইতোমধ্যে বসে পড়েছে।আতিয়া বেগমের ডাকে হঠাৎ সিঁড়ির উপর দিক থেকে কাঁচের চুড়ির শব্দে আতিয়া বেগম চোখ তুলে তাকালেন।অর্ণ বিরক্তকর চাপা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে হাত কপালে রাখে।কায়নাত ছুটে এসে বসে নিধির পাশে।সামনে অর্ণকে দেখে মুচকি হেসে বলে,
“চুড়ি খুঁজছিলাম দাদি।”
আতিয়া বেগম কায়নাতের খাবার বেড়ে ওর সামনে দিয়ে বলেন,
“আচ্ছা!এখন চুপচাপ খাবার খা।”
কায়নাত গরুর মাংস মুখে দিয়ে মুখ কালো করে বলে,
“একটুও ঝাল হয়নি।”
আতিয়া বেগম বললেন,
“অর্ণ ঝাল খায় না।”
“উনি খায় না বলে এমন করে রান্না করবে?”
লতা বেগম ধমক দিয়ে বললেন,
“চুপচাপ খা।সব সময় এত পকপক করিস কেন?”
(কিযে দুঃখের ভেতরে আছি ভাই।সময় পাচ্ছিইইইইইই না গল্প লেখার।আগামী পর্ব বড় করে দিব পাক্কা।😞💔)
চলবে…?
প্রেমবসন্ত_২
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
১৮.
মায়ের কথায় বেশ রাগ হলো কায়নাতের।কেন মা এমন করে বলল?সে কী বেশি কথা বলেছে?শুধু বলছে তরকারি ঝাল হয়নি কেন?এতটুকুতেই বকা খেলো সে।কায়নাত মুখ ভার করে খাবার খাচ্ছে।মেয়েটা খেতে ভীষণ ভালোবাসে।আর যদি হয় গরুর গোস্ত?তাহলে তো কোনো কথাই নেই।সে আড়চোখে অর্ণর সুন্দর মুখখানা দেখল।একসময় খাওয়া থামিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল।ফরসা গায়ের রং লোকটার।ঘন পাপড়ির চোখ,চোখ দু’টো একদম আর্ট করা।ছোট্ট কায়নাতের গাল গরম হয়ে এলো হঠাৎ।সে গালে হাত দিয়ে শুকনো ঢোক গিলে খাবার শেষ করল।খাওয়ার মাঝেই কম হলেও হাজারবার সামনের সুন্দর পুরুষটার দিকে তাকিয়েছে সে।কেন যে বারে-বারে চোখ চলে গেছে সামনে,সেটা তার জানা নেই।
সন্ধ্যায় বাড়ির সব পুরুষ বাড়ি ফিরল।অর্ণ সবার সাথে দেখা করল,কথা বলল,আড্ডাও দেয়া হলো।গম্ভীর অর্ণ দাদার ঘরে বসে আছে চুপচাপ।সামনেই ছোট্ট কায়নাত গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।অর্ণ কাপ হাতে নিয়ে মেয়েটার পায়ের দিকে তাকাল।শাড়ির ফাঁকে একটুখানি শব্দহীন নূপুরের দেখা মিলছে।অদ্ভুত সৌন্দর্যে ঘেরা কিশোরীর সর্বাঙ্গ।
কায়নাত অর্ণকে পায়ের দিকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে বলল,
“আমার পা অনেক সুন্দর তাই না?আমার মাও তাই বলে।জানেন আমার মা কী কী বলে?”
অর্ণ উত্তর না দিয়ে চায়ে চুমুক দিল।কায়নাত বিছানায় উঠে অর্ণর মুখো-মুখী হয়ে বসল।আঁচল কোলের উপর রেখে চঞ্চল গলায় বলল,
“আমার মা বলে কায়নাত অনেক সুন্দর।ছেলেরা এখনই কেমন পেছনে লেগে থাকে,বড় হলে একটা রাজপুত্রের সাথে বিয়ে দিব।সুন্দর দেখে একটা শহরের ছেলের সাথে বিয়ে করিয়ে দিব।”
অর্ণ কপাল কুঁচকে এই প্রথম মুখ ফুটে বলল,
“তুমি এত কথা বলো কেন?”
কায়নাত বলল,
“সত্যি মা এই কথা বলেছে।আপনিও তো শহরের তাই না?আচ্ছা আপনি কী আমায় বিয়ে করবেন?”
অর্ণ হতবাক।বিস্ময়ে মুখের ভেতর থেকে চা ছিঁটকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে।কায়নাত তাড়াহুড়ো করে অর্ণর পিঠে হাত বুলিয়ে দিল।অর্ণ কায়নাতকে ধমক দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“বিরক্ত করছো কেন,ইডিয়ট?ঘর থেকে বের হও।”
কায়নাত মুখ কালো করে বলল,
“আপনি আমায় বকছেন কেন?আমি কী খারাপ কিছু বলেছি?”
অর্ণ দাঁত চেপে বলল,
“বের হবে নাকি অন্য ব্যবস্থা করব?”
রাগে কায়নাত বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।কোমর সমান খোলা চুল গুলো তখন বাতাসে উড়ছে।উড়ে এসে অর্ণর মুখের সামনে খিলখিল করছে।কায়নাত চঞ্চল পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আজগর চৌধুরী ঢুকলেন ঘরে।কায়নাতকে এমন করে চলে যেতে দেখে বললেন,
“বুড়ির কী হলো?রেগে আছে মনে হলো।”
অর্ণ বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই পুঁচকু কে?নাকের ডগায় রাগ নিয়ে ঘোরে।”
“লতার বড় মেয়ে,কায়নাত সুবাহ।”
“উনার মেয়ে এই বাড়িতে কেন?”
“নিয়ে এলাম।চলে যাবে কিছুদিন পর।”
অর্ণর সাথে দাদার কিছুক্ষণ কথা হলো।দাদা সব কথায় কায়নাতকে টানছিলেন।অর্ণ একপ্রকার বাধ্য হয়ে দাদার কথা শুনছিল।রাতে যখন মেঘে আকাশ কালো হয়ে এলো,তখন অর্ণ ছাদে বসে ছিল একা।চারপাশটা ভীষণ শান্ত।অদ্ভুত এক ভালোলাগায় ঘিরে ছিল চারপাশ।অর্ণর হাতে গিটার।যেটায় থেমে থেমে হাত চালাচ্ছিল সে।হঠাৎ স্বর টেনে চারটে লাইন আওড়াল সে।
“যদি তুমি দূরে কভু যাও চলে,
শুধু মরণ হবে,আর কিছু নয়..!
তোমায় ছেড়ে বহু দূরে যাব কোথায়?
একজীবনে এত প্রেম পাব কোথায়?”
অর্ণ যেন নিজেই থমকে গেল এমন একটা গানের স্বর টেনে।সে হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল সেভাবেই।আশ্চর্য হলেও সে এমন কোনো গান এই জীবনে গেয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।হঠাৎ কানে বাচ্চা একটা মেয়ের খিলখিলিয়ে হাসির সেই শব্দটা বেজে উঠল।কিন্তু কোথাও সেই মেয়ে নেই।মনে হচ্ছিল কেউ কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছে, “আপনি বুঝি আমার লাটসাহেব?”
অর্ণর বিরক্তি যেন এক নিমিষে মাথার ভেতর জমাট বাঁধল।হঠাৎ সেই অদৃশ্য হাসিটা, সেই ‘আমার লাটসাহেব?’ এই ধরনের কল্পনা তাকে বিরক্ত করছে।সে দ্রুত উঠে দাঁড়াল।জোরে শ্বাস নিল কয়েকবার।তারপর বিরক্ত ভঙ্গিতে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করল।ঠোঁটের কোণে সিগারেটটা গুঁজে দিতে দিতে নিজের মনোভাবকেই গাল দিল মনে-মনে।
“হয়তো ক্লান্ত;অথবা ওই পাগল পুঁচকুর কথাবার্তায় মাথা নষ্ট হয়ে গেছে।”
হালকা বাতাসে তার সাদা শার্টের কলার নড়ে উঠল।লাইটার বের করে ক্লিক করতেই ছোট্ট আগুনের আলো ছাদের অন্ধকারে কাঁপল।আগুনটা সিগারেটের আগার কাছে নিয়ে গিয়ে এক টান দিতেই ধোঁয়া বেরিয়ে এলো ধীর,স্থির আর গম্ভীর ভঙ্গিতে,যেমনটা অর্ণ নিজেও।ধোঁয়ার মেঘ ছড়িয়ে গেল রাতের বাতাসে।অর্ণ চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকাল।কালো মেঘে ঘেরা আকাশ,একটু দূরে বিদ্যুতের ক্ষীণ ঝলক।সে গিটারটা পাশে রেখে রেলিংয়ে হ্যালান দিল।ঠিক তখনই তীক্ষ্ণ,ছোট্ট পায়ের শব্দ শুনতে পেল।
অর্ণ ঘুরে তাকাল না।সে জানে এই শব্দটা অন্য কারো হতে পারে না।দরজার কাছে দাঁড়ানো কায়নাত,মুখ মুছে ফেলে আবার নতুন রাগ জড়ানো চেহারা নিয়ে ছাদে উঠে এসেছে।চুলগুলো এলোমেলো,চোখে অভিমান, ঠোঁট ফুলে আছে রাগে।অর্ণ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুমি আবার এলে কেন?”
কায়নাত উত্তর না দিয়ে তার দিকে এগিয়ে এলো।চোখ টিপে বলল,
“আমার একটা কথা বলার ছিল।”
অর্ণ বিরক্তি লুকোতেই পারল না।ধমক দিয়ে বলল,
“তোমাকে কে বলেছে আমার সাথে কথা বলতে আসতে?”
কায়নাত কাঁধ ঝাঁকাল,
“আমার মন বলেছে।”
অর্ণ ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ঠান্ডা স্বরে বলল,
“মনকে বলো নিচে যেতে।”
“মন তো নিচে যাবে না।মন তো আপনার কাছে এসেছে।”
“যাবে তুমি?”
কায়নাত হাত গুটিয়ে দাঁড়াল।বিরক্ত হয়ে বলল,
“আপনি না খুব রাগী! আমি কিছু বললেও রাগ করেন,না বললেও রাগ করেন।”
অর্ণ এবার মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।যে দৃষ্টিতে চেয়ে আছে,তাতে বিরক্তি,বিস্ময় আর অদ্ভুত এক নজরবন্দী ভাব—যা সে নিজেও বোঝে না।
“তুমি এখনই নিচে যাবে।”
কায়নাত পেছনে না গিয়ে উল্টো সামনে এগিয়ে এলো।
“না গেলে কী করবেন?”
অর্ণ সিগারেট ফেলে দিল রেলিংয়ের নিচে।
“যা দরকার মনে হবে তাই করব।”
কায়নাতের হৃদপিণ্ড থমকে দাঁড়াল।মুখ শুকিয়ে গেল হুট করে।আকাশে তখন বিদ্যুতের আলো।
হাওয়ায় ভেসে আসছে বৃষ্টির গন্ধ।অর্ণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে যেন কিছু বলতে চাইছে।কিন্তু নিজেই নিজেকে আঁটকে রেখেছে।ছোট্ট কায়নাত তখন অর্ণর বুক অব্দিও আসেনি।মেয়েটা ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে আছে।দৃষ্টিতে যেন একটু একটু লাজ ছিল,ভয় ছিল আর ছিল একটুখানি দুষ্টুমি।রাত বেশি হয়নি।বাড়িতে খাওয়া দোয়া শেষ হয়েছে খানিকক্ষণ আগেই।অর্ণ এসেছিল একটু একা সময় কাটানোর জন্য।
কায়নাত একপা এগিয়ে গিয়ে অর্ণর পরনের সাদা শার্ট ধরে নিচে টানল।অর্ণ নিচে ঝুঁকছে না বলে কায়নাত রাগ দেখিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
“তালগাছ,নিচু হতে কষ্ট হয়?নিচু হন!”
অর্ণ একটু ঝুঁকে আসতেই কায়নাত অর্ণর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি আমায় বিয়ে করবেন,লাটসাহেব?”
অর্ণ পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল।কানের পাশে ছোট্ট কায়নাতের উষ্ণ ফিসফিস,
“আপনি আমায় বিয়ে করবেন,লাটসাহেব?”
বুকের ভেতরটা কেমন আচমকা ধক করে উঠল তার।রাতের বাতাস থমকে গেল যেন।বিদ্যুতের আরেকটা ঝলক আকাশ ছিঁড়ে নামল।অর্ণ ধীরে,খুব ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল পাশে দাঁড়ানো মেয়েটার দিকে।ছোট মুখ,চোখে কেমন দীপ্ত দুষ্টুমি,
আর ঠোঁটের কোণে সেই অভিমানী ভাঁজ।
অর্ণর বিরক্তি,রাগ,সবকিছু কোথায় যেন হারিয়ে গেল এক সেকেন্ডের জন্য।
এক সেকেন্ড।আবার পরের সেকেন্ডেই সে আগের অর্ণ।গম্ভীর,কঠোর,কাউকে কাছে না আসতে দেওয়া অর্ণ চৌধুরী।সে দ্রুত কায়নাতের হাতটা নিজের শার্ট থেকে সরিয়ে দিল।কণ্ঠস্বর নিচু,কঠোর,আর ভয়াবহভাবে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
“এগুলো তোমার বলা কথা?তোমার বয়স কত? মাথা ঠিক আছে?”
কায়নাত চমকে উঠল।দুটো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
“কিন্তু,আপনি তো শহরের ছেলে।মা বলে শহরের ছেলের সাথে বিয়ে দিব..”
অর্ণ থামিয়ে দিল হাত উঠিয়ে।
“চুপ।আর একটাও শব্দ নয়।”
বাতাসে যেন শব্দ থেমে গেল।কায়নাত ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল।তার গলা কাঁপছে।সাহস নিয়ে বলল,
“আমি খারাপ কিছু বলিনি তো!”
অর্ণ এবার রেলিং থেকে সরে দাঁড়াল।সে সামনে এগিয়ে এসে কায়নাতের দিকে ঝুঁকল।
কায়নাত ভয়ে একপা পিছিয়ে এলো।আকাশে হালকা বজ্র।অর্ণর কণ্ঠস্বর গভীর,ভারী,আর একটু ডিপ।
“শুনে রাখো,আমি তোমার কোনো কিছুই পছন্দ করি না।তোমার কথা বলা,তোমার চঞ্চলতা,তোমার এই পাগলামি কোনোকিছুই আমার পছন্দ নয়।সবাই তোমাকে আদর করে বলে বোধহয় পাগল হয়ে গেছো।ঠিক সময়ে বিয়ে করলে তোমার সমান আমার একটা মেয়ে থাকত,ইডিয়ট!”
কায়নাতের চোখের পানি টলমল করে উঠল।
সে ঠোঁট কামড়ে বলল,
“আপনি খুব বাজে! সবকিছুতে রাগ করেন।আপনার সাথে কথা বলাই ঘাট হয়েছে!”
অর্ণ ফিরেও তাকাল না।হ্যালান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“ঠিকই বলেছ।তোমার আমার সাথে কথা বলাই উচিত নয়।আর বিয়ে?সে কথা আবার মুখে আনলে
আগের মতই বকুনি নয়, এবার সত্যি শাস্তি দিব।”
কায়নাত অভিমানী চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর ঘুরে দৌঁড়ে নিচে নেমে গেল।রাত পেরিয়ে সকাল হলো।ভোরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে গ্রাম জুড়ে।বাড়িতে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্না হয়েছে।অর্ণর পছন্দ এটা।সকালে যখন একসাথে খেতে বসেছে,তখন আজগর চৌধুরী খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ বললেন,
“অর্ণ,খেয়ে একটু আমার ঘরে এসো তো!”
অর্ণ মাথা নাড়ল।কায়নাত অর্ণর পাশে বসেছে।ইচ্ছে করে।বেশ কয়েকবার খাওয়ার মাঝে এটো হাত দিয়ে অর্ণর প্লেট থেকে মাংস চুরি করেছে।অর্ণ হয়তো বুঝতে পারেনি,কিংবা বুঝতে চায়নি।
খাওয়া শেষ হতেই অর্ণ শান্তভাবে হাত ধুইয়ে মুখ মুছল।কায়নাত পাশ থেকে মাংস চুরি করতে করতেই নিজের মুখে সামান্য খাবার লাগিয়ে ফেলেছে।অর্ণ চোখের কোণ দিয়ে একবার দেখেই ভ্রু উঁচু করল।স্বাভাবিকভাবেই,কোনো মন্তব্য করল না।
আজগর চৌধুরী উঠে বললেন,
“চলো অর্ণ,একটু জরুরি কথা আছে।”
অর্ণ উঠে দাঁড়াল।কায়নাতও ওদের যাওয়া দেখছে।দৃষ্টি যেন বাসি রাগ, নতুন কৌতূহল আর একটু লুকোনো লজ্জায় মাখামাখি।
দুপুর বেলা সে গোসল করে যখন দাদির ঘরে উকি-ঝুঁকি দিচ্ছিল,তখন আতিয়া বেগম পালঙ্কে পা মেলে বসে ছিলেন।কায়নাতকে দেখে কাছে ডাকলেন।কায়নাত গুটি গুটি পায়ে ভেতরে গিয়ে বিছানায় উঠে দাদির পাশে গিয়ে বসল।ঠান্ডা লাগছে তার।দাদির পাতলা কাঁথা ছাড়িয়ে পাশে শুয়ে মাথা উঁচু করে তাকাল।বলল,
“তুমি একা একা কী করো দাদি?”
আতিয়া বেগম বললেন,
“দুপুর বেলা ঘুমাতে হয়।তুই পকপক না করে ঘুমা দেখি।”
কায়নাত বলল,
“আজ ঘুমাব না।আমি একটা গল্প বললে শুনবে তুমি?”
“গল্প বলবি?”
“হ্যা।”
“বল দেখি।”
কায়নাত ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“একদিন একটা জমিদার বাড়িতে ছোট একটা মেয়ে ঘুরতে এলো।মেয়েটার আত্মীয়র বাড়ি ছিল ওটা।খুব সুন্দর সে।তার মা বলত,সে পুতুলের মতো দেখতে।”
কায়নাতকে থামতে দেখে আতিয়া বেগম বললেন,
“থেমে গেলি কেন?”
কায়নাত আবার শুরু করল।
“একদিন মেয়েটা জমিদার বাড়ির বাগানে খেলছিল।হঠাৎ দেখে,এক শহরের সাহেব এসেছে বাড়িতে।কেমন রাগী-রাগী ভাব তার।নায়কদের মতো সুন্দর।হাসলে সুন্দর লাগে।কিন্তু সে কথা কম বলে।আর যদি কথা বলেও থাকে,তাহলে শুধু ধমকায়।তারপর কী হলো জানো?মেয়েটা দেখল সেই সাহেব তার দিকে অদ্ভুত নজরে তাকিয়ে আছে।কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার জমিদার বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়।মেয়েটা তার দেখা-দেখি বাড়ির ভেতরে ঢুকলে মেয়েটার মা তাকে বলে শহরের সাহেবকে বাতাস করতে।তুমি জানো,মেয়েটা ওই শহরের সাহেবকে কী বলে ডাকত?”
“কী বলে ডাকত?”
কায়নাত দাদির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“লাটসাহেব।”
কায়নাত খিলখিল করে হেসে উঠল।আতিয়া বেগম ঠোঁট কামড়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে।কিছু হলেও যেন বুঝতে পারছেন কায়নাত কার কথা বলছে।কায়নাত ফের বলল,
“ওই লাটসাহেব খুব রাগী।মেয়েটা যখনই কথা বলতে যায় তখনই বকা খায়।তুমি জানো,মেয়েটা বকা খেয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছিল খুব।”
আতিয়া বেগম বললেন,
“লাটসাহেবকে কী ওই মেয়েটা পছন্দ করত?”
কায়নাত বলল,
“জানি নাতো।কিন্তু ওই লাটসাহেবকে অনেক ভালো লাগত তার।লাটসাহেব ছিলো নায়কদের মতো সুন্দর।”
“সুন্দর বলে ভালো লাগত?”
“নাতো!লাটসাহেবের কথা গুলোও তার ভালো লাগত।”
আতিয়া বেগম বিস্ময়ে মুখ হা করে তাকিয়ে রইলেন কায়নাতের দিকে।মেয়েটার চোখ-মুখের ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছে,সে পুরো মন দিয়ে গল্পটা বলছিল।
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে দাদি ধীরস্বরে বললেন,
“তা ওই মেয়েটার লাটসাহেব কী করল শেষে?”
কায়নাত মাথা নিচু করে আঙুল নিয়ে খেলতে লাগল।তার স্বর এবার একটু নরম, একটু অভিমানী।
“ওই লাটসাহেব তো খুব রাগী।সবকিছুতেই রাগ করে।মেয়েটা যখন তাকে বিয়ের কথা বলেছে,তখন রাগ করে বকা দিল।মেয়েটা খুব কষ্ট পেয়েছিল দাদি।”
আতিয়া বেগম মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“তুই কষ্ট পাস কেন রে?”
কায়নাত চমকে মাথা তুলল।
“আমি? আমি কষ্ট পেয়েছি…মানে ওই গল্পের মেয়েটা!”
দাদি হেসে ফেললেন এবার।
“গল্পের মেয়ে মানে তুইই।”
কায়নাত তড়িঘড়ি মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“উহু দাদি,আমি কেন কষ্ট পাব?”
“হুম!ঠিক আছে।তোর গল্প শুনে মনে হলো লাটসাহেবের রাগের ভিতর কিছু একটা লুকিয়ে আছে।”
কায়নাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
“লুকিয়ে থাকবে কেন? উনি তো আমাকে পছন্দই করেন না।সবাই বলে ভালো মানুষ,কিন্তু আমার সাথে কেন এমন করে?”
“তোকে ভালো না লাগলে কী এত রাগ করত?”
কায়নাতের চোখ বড় হয়ে গেল।
“মানে??”
দাদি থুতনির নিচে হাত রেখে বললেন,
“যে মানুষটাকে আমরা গুরুত্ব দিই না,তার কথা শুনে কী রাগ হয়? হয় না।রাগ হয় তখনই,যখন মনে-মনেই হোক,একটু টান থাকে।”
কায়নাত থমকে গেল।এইটুকু মেয়ে বুঝেই বা কী?কেমন পাকা পাকা কথা বলছে আবার আশ্চর্যও হচ্ছে।সে বলল,
“টান? কে?”
দাদি হাসলেন।
“কার যেন?হুম…!তোর লাটসাহেবের।”
দুপুরের নরম আলো তখন জানলা দিয়ে ঢুকছে।
আতিয়া বেগম চুপচাপ শুয়ে পড়লেন।
কায়নাত পাশে তাকিয়ে দেখল,দাদির চোখ ধীরে ধীরে বুজে আসছে।কিছুক্ষণ পর দাদি ঘুমিয়ে পড়লেন।কিন্তু কায়নাতের ঘুম আসছে না।সে বিছানায় এপাশ–ওপাশ করছে,চুলের গোছা একটা বারবার নাকের সামনে এসে পড়ছে।
তার মাথার ভেতরে দাদির কথাটা ঘুরপাক খাচ্ছে।
“যার প্রতি টান থাকে তার উপরেই রাগ দেখায় মানুষ।”
বিকেল বেলা সোনালি রাঙা আকাশটা ঘুটঘুটে কালো হয়ে এসেছে।এখনই বোধহয় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে গ্রামের মাটিতে।ছোট্ট কায়নাত লাল শাড়ি ধরে খোলা চুলে ছুটে গেল ছাদের সিঁড়ির দিকে।পেছন থেকে লতা বেগম গলা ছেড়ে বললেন,
“এই,ছাদে যাসনা।”
কে শোনে কার কথা?খানিকক্ষণ আগেই মেয়েটা গোসল করেছে।এখন বৃষ্টি নামবে বলে ছুটে গেছে ছাদের দিকে।ছাদের দরজা ঠেলে দিতেই বৃষ্টির ঠান্ডা পানি ছিঁটকে এলো তার সঙ্গে।কিশোরী খিলখিল করে হেসে উঠল।লম্বা শাড়ির আঁচল চেপে দৌঁড়ে গেল ছাদের মধ্যখানে।মুহূর্তেই ভিজে এলো তার সারা সর্বাঙ্গ।গায়ের শাড়ি লেপ্টে গেল ভেজা অঙ্গে।গায়ের পাতলা অলংকার গুলো সেঁটে এলো গায়ে।
বৃষ্টি আরও ঘন হয়ে এলো।কায়নাত চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল।ভেজা চুল কপালে লেপ্টে আছে,শাড়ির লাল রঙটা বৃষ্টিতে আরও গাঢ় দেখাচ্ছে।স্বর্ণের পাতলা গয়নাগুলো পানিতে ভিজে মৃদু আলো ছড়াচ্ছে।দেখলে মনে হয় রূপকথার কোনো জলপরী হঠাৎ বৃষ্টির মঞ্চে নেমে এসেছে।
তার ছোট্ট মুখভর্তি হাসি,চোখে শিশুসুলভ বিস্ময়,
বৃষ্টি যেন তার নিজেরই ভাষা।কিন্তু কায়নাতের খেয়ালই ছিল না,সে মুহূর্তে বৃষ্টিতে সে একা নয়।
ছাদের এক কোণায়,আধো অন্ধকারে ভিজে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন,এক শুদ্ধ পুরুষ।কে ছিল সেই পুরুষ?
চারপাশ অন্ধকারে ডুবে গেছে।জোরে জোরে আকাশে মেঘ ডাকছে।বৃষ্টিতে ভিজে থাকা ছাদের সেই আধো-অন্ধকারে একটা ছায়া নড়ে উঠল।
ঝাপসা অন্ধকারের মাঝে মেঘের আলোয় হঠাৎই সেই ছায়াটার অবয়ব একটু স্পষ্ট হলো।অর্ণ চৌধুরী!
ছাদের উত্তর কোণে,যেখানে বৃষ্টির পানি রেলিং বেয়ে টুপটুপ করে পড়ছে,ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সে।
ভেজা সাদা শার্ট শরীরে লেপ্টে গেছে, হাতার ভাঁজে জমে থাকা বৃষ্টির পানি একফোঁটা করে পড়ে যাচ্ছে।
চুলগুলো কপাল বেয়ে নেমে এসেছে, বিদ্যুতের ছোট্ট আলোয় অর্ণকে দেখে মনে হচ্ছিল রাগী,নদীর মতো নীরব আর বৃষ্টির মতোই গভীর।সে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ।কিন্তু কায়নাতকে বৃষ্টিতে ছুটোছুটি করতে দেখে তার দৃষ্টি যেন আঁটকে এলো
একদম স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকল।সে বুঝতে পারছে না একজন ম্যাচিউর পার্সন হয়েও সে কিভাবে এসব উল্টো-পাল্টা ভাবনা-চিন্তা মাথায় আনছে।
কায়নাত তখনো জানে না,অন্ধকারের ভিতরে লুকিয়ে থাকা বৃষ্টিভেজা সেই পুরুষ তারই লাটসাহেব।হঠাৎ কায়নাতের চোখে পড়ল কোণের অন্ধকারে ভেজা এক অবয়ব।সে চোখ ছোট করে তাকাল সেদিকে।
“কে?”
অর্ণ ছায়া থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো।তার হাঁটার শব্দ বৃষ্টির ভেতরেও স্পষ্ট।জল ঝরে পড়ছে তার কাঁধ থেকে,গলার কাছে ভেজা শার্টে আলগা টান পড়ে আছে।চোখ দু’টো আরও গাঢ় নীলচে দেখাচ্ছে ভিজে যাওয়ায়।মুখে সেই চেনা গম্ভীরতা।
বৃষ্টি থেমে নেই,আকাশ মেঘে ভারী।দুই হাত প্যান্টের পকেটে,নিচু গলায় অর্ণ বলল,
“ছাদে কেন উঠেছ তুমি?”
কায়নাত চোখ উঁচু করে তাকাল।
চুল ভিজে গাল বেয়ে পানি পড়ছে,ঠোঁট ফুলে আছে ঠান্ডায়।অর্ণ কাছে এলো।তার ভেজা পদচিহ্ন ছাদের উপর গাঢ় দাগ রেখে যাচ্ছে।অর্ণর এমন অদ্ভুত চাহনি দেখে মেয়েটার নজর ভীতু হলো।দুরুদুরু করে কাঁপল বুকের ভেতরটা।
(কী হতে চলেছে সামনে?বলো তো দেখি👀
পোস্টে ২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করবা।১লাখ+ ভিউজ হওয়ার পরও এত কম রিঅ্যাক্ট কেন?)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৯