প্রেমবসন্ত_২
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
১২.
কায়নাত ঠোঁট কামড়ে অস্থির হয়ে দৃষ্টি নত করল।অর্ণ তার এত নিকটে যে শ্বাস নেয়াটাও কষ্টকর।অর্ণ আর একটু এগিয়ে এসে কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি ভীষণ বোকা।”
কায়নাত মৃদু মাথা নাড়িয়ে বলে,
“জানি।”
অর্ণ ভারী নিঃশ্বাস ফেলল।কপালে একটা বলদ মহিলা’ই জুটেছে।সে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই কায়নাত ছুটে দৌঁড়ে চলে যেতে চাইল।অর্ণ আজ প্রথম কায়নাতের হাত আঁকড়ে ধরে বাঁধা দিলো মেয়েটাকে।কায়নাত চমকায়।বিস্মিত দৃষ্টি পেছনে ঘোরায়।হঠাৎ সিঁড়ির দিক থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসে।কেউ বা কারা হয়তো এদিকটায় এগিয়ে আসছে।অর্ণ কায়নাতের হাত টেনে ধরে ঘরে নিয়ে যায়।কায়নাতের গলা শুকিয়ে এসেছে ভয়ে,লজ্জায়,আতঙ্কে।সে শুকনো ঢোক গিলে কম্পিত ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে বলে,
“ঘরে নিয়ে এলেন কেন?”
অর্ণ দরজাটা নিঃশব্দে চাপিয়ে দিলো।কায়নাত হেঁচকির মতো শ্বাস নিল।চোখ দুটো আতঙ্কে কাঁপছে।অর্ণ কোনো কথা বলল না।হঠাৎই তার খড়খড়ে,শক্ত হাতটা এগিয়ে এসে কায়নাতের উন্মুক্ত কোমর ছুঁয়ে গেল।মেয়েটা ঝাঁকিয়ে উঠল,যেন তাকে কেউ আগুন ছুঁইয়ে দিয়েছে।
“ইশশ” কায়নাত বাঁধা গলায় শব্দ করল,দুই হাত দিয়ে শাড়ি টেনে কোমর ঢাকতে গেলে অর্ণ তার আগেই শাড়িটা ঠিক করে জড়িয়ে দিলো গায়ে।
তার নিঃশ্বাস কায়নাতের গলা ছুঁয়ে যাচ্ছে।কণ্ঠটা আগের থেকে আরও গম্ভীর,নিচু,রাগে-দমে থাকা।সে ধমক দিয়ে বলল,
“শাড়ি পরতে পারেন না?অঙ্গ ঢাকতে না পারলে শাড়ি পরেন কেন?”
কায়নাতের চোখ ছলছল করে উঠল সাথে সাথে।
সে মাথা নিচু করে বলল,
“ইচ্ছে করে না।আমি খেয়াল করিনি!”
“দৌঁড়াদৌঁড়ি কম করবেন।আর নিজের দিকে খেয়াল রাখতে শিখুন।”
কায়নাত মাথা তুলে তাকাতেই অর্ণ মুখ ফিরিয়ে নিল।অর্ণ দরজার দিকে ইশারা করে বলল,
“যান,এখন বের হন আমার ঘর থেকে।”
কায়নাত এলোমেলো পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।অর্ণর হাতের ছোঁয়া পুরো শরীরে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।শরীর জ্বলছে তার।পায়ের পাতা শিহরণে শিরশির করছে।এই বুঝি শরীরের চামড়া ঝঁলসে যাবে।
সে ছুটে নিজের ঘরে গিয়ে দেখল মেয়েরা সেখানেই আড্ডায় মেতেছে।খুব সম্ভবত ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই আলোচনা হচ্ছে।কায়নাত ঘরে এসে ওদের পাশে বসল।নিশা বলল,
“এখন থেকে তো কায়নাতও আমাদের সাথেই থাকবে।”
নিধি মাথা নেড়ে বলল,
“ওর পরীক্ষা শেষ হলে আমাদের ভার্সিটিতেও ভর্তি হতে পারবে।”
কথায় কথায় ভালোই কথাই হলো।ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।সকালে ডিসিশন নেয়া হলো আগামী কাল তারা ফিরছে নিজেদের স্থায়ী ঠিকানায়।মাশফিক চৌধুরী কায়নাতের কলেজে কথা বলতে গেছেন বাবাকে নিয়ে।বিয়ের হইহুল্লোড় এখন আর নেই।আত্মীয়রা সবাই চলে গেছেন।বাড়ির ছাদে তেজবিহীন রোদে পাটি বিছিয়ে বসেছিল মেয়েরা।নিধি ফোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।জয়া সেদিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে নাক ছিঁটকে বলল,
“বড় আপা এমন করে হাসছে কেন?”
নিশা কায়নাতের কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিল।সে কপাল কুঁচকে পাশে ফিরে দেখল নিধির এদিকে কোনো ধ্যান’ই নেই।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“প্রেমের জালে ফেঁসে গেছে বেচারি।”
মাহি চিৎকার দিয়ে উঠল।
“আপা প্রেম করে?কার সাথে?কে সেই অভদ্র পুরুষ?”
সবাই চমকে উঠল।নিধি ভয় পেয়ে মাহির মুখ চেপে ধরে দাঁত চেপে বলল,
“আস্তে কথা বলতে পারিস না?চিৎকার করছিস কেন?”
মাহি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে বলল,
“দাদা তোকে ঢাকায় পড়াতে পাঠিয়েছে আপা।আর তুই সেখানে গিয়ে প্রেম করছিস?”
“একবারও বলেছি এ কথা?”
“বলতে হবে কেন?ফোনের দিকে তাকিয়ে এত লাজুক হাসি দেয়া হচ্ছিল কেন শুনি?”
নিশা খিলখিল করে হেসে উঠল।বলল,
“নিধি,আর কত চুরি করবি?দাদাকে গিয়ে এবার বলে দেই?”
নিধি চোখ গরম করল।
“চুপ হারামি।দাদার নাম নিবি না।তোরা আমার বোন নাকি শত্রু?”
“শত্রু লাগি শত্রু।”
বোনেরা মিলে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠল।কায়নাত অবাক হয়ে তাদের সুন্দর মধুর মতো মিষ্টি সম্পর্ক গুলোর বন্ডিং দেখল।এমন ভাই-বোনদের একটা ছোট দল পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।সে যতদূর জানতে পেরেছে,নিশা আর নুসরাত অর্ণর মায়ের পেটের বোন নয়।তবু এদের ভাই-বনেদের সম্পর্ক দেখলে কেউ কোনোদিনও বলতে পারবে না তারা আলাদা মায়ের পেটের সন্তান।কায়নাত নুসরাতের দিকে তাকাল।মেয়েটা সবার সাথে হাসি-তামাশা করছে।হাসতে হাসতে চোখের কোনায় পানি জমেছে।নিশা কায়নাতের কোলে মাথা রেখে খিলখিল করে হাসছে।বাকি বোনেরাও তাই।সে মুচকি হাসল।এইটুকু জীবনে যা সে চেয়েছে আল্লাহ তাকে তার থেকেও হাজার গুণ বেশি কিছু দিয়েছে।সে শুকরিয়া আদায় করতে ভুলল না।এই সুখটুকু আজীবন যেন এমনই থাকে।কিছুটা শীতের সকালের নরম মিষ্টি রোদের মতন।
•
দেখতে দেখতে সেই দিনটাও পার হলো কোনোরকম।অর্ণদের সব জিনিস গাড়িতে ওঠানো হচ্ছে।সকলে তৈরি হয়ে ড্রয়িংরুমে নেমে এসেছে।আতিয়া বেগম বেহরুজ বেগমের সামনে দাঁড়িয়ে অর্ণর হাত ধরে বললেন,
“তোমার ছোট একটা বউ দাদুভাই।আর যাই করো তাকে কখনো কষ্ট দিও না।তাকে যত্ন করে আগলে রাখবে।”
অর্ণ গম্ভীর চোখে সপ্তদশীর নিকাবের আড়ালে থাকা চোখ দু’টোর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।একে একে বাড়ি থেকে বের হলেন সবাই।কায়নাত গাড়িতে ওঠার আগে মায়ের কাছে এগিয়ে গেল।লতা বেগম আঁচলের গিট থেকে কিছু টাকা বের করে কায়নাতের হাতে দিয়ে বললেন,
“এটা রাখ।ভালো থাকিস।”
কায়নাত মাথা নেড়ে বলল,
“তোমরাও ভালো থেকো।”
কায়নাত জয়ার দিকে ফিরলে জয়া বোনকে জড়িয়ে ধরে।কায়নাত ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“দুষ্টুমি কম করে করবি।নাজনীন ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করবি না।এখন থেকে কলেজে যাবি প্রত্যেকদিন।মনে থাকবে?”
জয়া লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“থাকবে।আবার কবে আসবি?অপেক্ষায় থাকব আমি।”
“খুব শীঘ্রই আসব।”
ওদের গাড়ি ছাড়ল।গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে মেইন রাস্তায় গাড়ির চাকা ঘুরল।কায়নাত পেছনে অর্ণর পাশে বসেছিল।বড় গাড়ি হওয়ায় সবাই এক গাড়িতেই আসতে পেরেছে।মেয়েটার মন খারাপ।জীবনে কখনো শহরে যাওয়া হয়নি।আজ যেতে হচ্ছে।তাও আবার শ্বশুর বাড়ি।নতুন পরিবেশে।স্বামীর হাত ধরে।শেষবার মায়ের মুখ-খানা দেখা হলো না।চোখের কোণায় পানি জমল তার।গাড়িতে সবাই গল্প করতে করতে যাচ্ছে।কায়নাতের একপাশে অর্ণ আরেক পাশে নিশা আর আদি।মনের অজান্তেই অর্ণর কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল সে।খানিকক্ষণ পেরোতেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল।অর্ণ ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার ঘুমন্ত মুখ দেখে ঠোঁট কামড়ে ধরল।তার একহাত ঝাঁপটে ধরে তারপর আরাম করে ঘুমাচ্ছে।
ঢাকায় ফিরতে অনেক রাত হলো।অর্ণর বন্ধুরা আজ চৌধুরী বাড়ি’ই থেকে গেল।বেহরুজ বেগম এত রাতে যেতে বারণ করলেন।সবাই বাড়িতে প্রবেশ করলেন।
উপরের তলায় ওঠার সময় কায়নাতের পা টলমল করছিল।সারা রাস্তা দুশ্চিন্তায়,ক্লান্তিতে মাথা ভরা।অর্ণ একটু এগিয়ে ছিল,হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে দেখল কায়নাত ধীর পায়ে আসছে।সে কিছু বলল না।তবে কায়নাতের ধীর পা দেখে সিঁড়ির মাঝে থেমে গেল।তার মুখ গম্ভীর।
“এভাবে হাঁটলে তো মাঝপথেই পড়ে যাবেন।”
কায়নাত মাথা নিচু করে বলল,
“আমার মাথা ধরেছে একটু।”
অর্ণ ঠোঁট শক্ত করে বলল,
“তাই?গাড়িতে তো আমার কাঁধে মাথা রেখে খুব আরাম করে ঘুমালেন।”
কায়নাতের গাল লাল হয়ে এলো লজ্জায়।অস্থিরতা লুকিয়ে মিনমিন করে বলল,
“আমি…আমি বুঝিনি কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।”
সে কিছু না বলে সিঁড়ি বিয়ে উপরে উঠতে লাগল।চুপচাপ।কিন্তু ধীরে ধীরে—যেন কায়নাতের হাঁটার গতি অনুযায়ী।অর্ণ তিন তলায় চলে গেল হনহন করে।বেহরুজ বেগম দো’তলায় এসে একটা ঘরের দরজা খুলে দিয়ে কায়নাতকে বললেন,
“এই ঘর তোমার।এখন গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমাও।”
কায়নাত মাথা নাড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করল। রুমটা সত্যিই সুন্দর।বড় বিছানা,সাদা পর্দা,কোণে নরম লাইট।বিশাল বড় ঘর।মেয়েটার চোখ চিকচিক করল খুশিতে।ঘরের চারপাশ মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল।এত সুন্দর ঘর সে এর আগে কখনো দেখেনি।নিশ্চই বাড়িটাও বেশ সুন্দর হবে?রাত হওয়ায় তো বাড়িটাও দেখতে পেল না।সে ছুটে গেল বারান্দায়।দরজা খুলে দিতেই হাড়-কাঁপানো শীতল বাতাস ছুঁয়ে দিলো তার সর্বাঙ্গ।মেয়েটা বারান্দায় পা রাখল।বড় বারান্দার চারপাশে ছোট ছোট ফুলের টপ।বিভিন্ন ফুল গাছে ভরা।কায়নাত বাকরুদ্ধ।সে ঘরে ফিরে এলো।লম্বা একটা ঘুম না দিলে কাল মাথা ব্যথায় ছটফট করতে হবে।
•
ভোর সকাল বেলায় পাখিরা গান ধরেছে কণ্ঠে।তখন বোধহয় বাইরে আলো ফুটতে শুরু করেছে।নিশা ঘুমঘুম চোখে ঘরের দরজা খুলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।আজ তাকে ভার্সিটি যেতেই হবে।সকালে খাওয়া দাওয়া করে,গোসল করে,তৈরি হয়ে তারপর সে বাড়ির বাইরে যাবে।এক বান্ধুবীর বাসায় গিয়ে সেখান থেকে ভার্সিটি যাবে।তাই সকাল সকাল উঠতে হলো আজ।ক্লান্ত শরীর নিয়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে তার ছিল না,কিন্তু খুবই দরকার।নিশা এলোমেলো চুলে হাত দিয়ে মাথা চুলকে রান্না ঘরে গেল।এখন এককাপ চা খেয়ে নিজেকে তাজা বানাতে হবে।মেয়েটা চা বানিয়ে ড্রয়িংরুমের লাইট অন করে সোফার নিকট এগিয়ে এসে থমকে গেল।চোখের ঘুম পালিয়ে গেল।
নিশা প্রথমে ভেবেছিল চোখ ভুল দেখছে।
ড্রয়িংরুমের লাইট জ্বলে উঠতেই পরিষ্কার দেখা গেল
সোফায় লম্বাটে হয়ে গুটিশুটি মেরে একটা মানুষ ঘুমিয়ে আছে।না,মানুষ না—স্বার্থ।নিশার স্বার্থ ভাই!হ্যাঁ,সেই বেয়াদব,নাটুকে,অতিরিক্ত ড্রামাবাজ স্বার্থ।যে নিজেকে প্রেগন্যান্ট বলে দাবি করে,শেহেরকে ‘বাচ্চার মা’ বলে চিৎকার করে বেড়ায়,সে-ই এখন সাদা সোফার উপর আধা ঝুলে পড়া অবস্থায় নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।
নিশা এক হাত কোমরে রেখে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।এই লোক ঘর রেখে এখানে ঘুমিয়ে আছে কেন?
স্বার্থর মুখে চুল এলোমেলো,মাথার নিচে কুশনটা মাটিতে পড়ে গেছে,আর পা দুটো সোফা থেকে অর্ধেক বের হয়ে আছে।মুখ হাঁ করে ঘুমাচ্ছে।
নাকের ডাকে যেন পুরো বাসা কেঁপে উঠছে।
নিশা মাটিতে পড়ে থাকা কুশনটা তুলে সোফার দিকে যাওয়ার আগে একটু থামল।মেয়েটা চোখ সরু করে তাকাল স্বার্থর দিকে।সে ঠান্ডা ফ্লোরে বসে পড়ল।চায়ের কাপ টি-টেবিলের উপর রেখে স্বার্থর দিকে তাকাল।মুচকি হাসল মেয়েটা।সাহস করে একটা অবাক কাণ্ড করে বসল।আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে স্বার্থর চাপ দাড়ি ভর্তি গালে তার নরম ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো।কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি বড্ড বোকা,স্বার্থ ভাই!”
স্বার্থ হালকা নড়েচরে উঠল।নিশা তার এলোমেলো চুলের ভেজে আঙুল ঢুকিয়ে দিলো।চুল গুলো বেশ বড় হয়েছে।বকে বকে তারপর কাটাতে হবে।মেয়েটা ঘাড় বাঁকিয়ে স্বার্থর ঘুমন্ত আনন দেখল।মন তো চায় বুকের মাঝে ঝাঁপটে ধরে গোটা একটা জীবন পাড়ি দিয়ে দিতে।কবে এই অবাধ্য লোক বুঝবে তার হৃদয়ে লুকোনো অনুভূতি।কবে চোখে চোখ রেখে বলবে,”নেশার বাচ্চা,তোকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।”
নিশা স্বার্থর মুখের উপর ঝুঁকে আছে।চায়ের গরম ভাপে তার গাল জ্বলে উঠেছে,কিন্তু তবু সে সরল না।
লোকটার এই ঘুমন্ত মুখটাই তাকে দুর্বল করে ফেলছে।চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে নিশার বুকটা অদ্ভুতভাবে ধড়ফড় করতে লাগল।নরম আলোয় স্বার্থর শ্বাস-প্রশ্বাস,ঘুমন্ত চোখের নিচে হালকা কালি,অর্ধেক খুলে থাকা ঠোঁট—সব মিলিয়ে এক অচেনা শান্তিটা যেন নিশাকে জড়িয়ে ধরল।হঠাৎ স্বার্থর আঙুল নড়ল।মেয়েটার শ্বাস আঁটকে গেল প্রায়।খানিকক্ষণ পর স্বার্থ চোখ না খুলেই ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিলো,আর নিশার কাঁধের কাছে এসে থেমে গেল।হাতটা স্পর্শ করেনি,কিন্তু এতটা কাছে এসে যেন পুরো সর্বাঙ্গ শিরশির করছে মেয়েটার।।
নিশা পেছনে সরে যেতে চাইলো,কিন্তু পারল না।
দুই পা মেঝেতে সেঁটে গেছে যেন।স্বার্থ হঠাৎ ঘুমঘুম গলায় বলল,
“নেশার বাচ্চা,চা বানিয়েছিস?”
নিশার চোখ বিস্ফোরিত হওয়ার যোগাড়।লোকটা জাগল?জাগল নাকি অর্ধেক জেগে স্বপ্নে কথা বলছে?নিশা কোনোমতে কণ্ঠ খুঁজে পেল,
“হু..হ্যা বানিয়েছি।খাবে?”
স্বার্থ চোখ না খুলেই মিনমিন করে বলল,
“হুমমমম!কিন্তু আগে তুই একটা কাজ কর।”
স্বার্থর পুরুষালী ডিপ কণ্ঠস্বর শুনে মেয়েটা শুকনো ঢোক গিলল।ঘাম ছুটে গেছে কপালে।
“কি কাজ?”
স্বার্থ আধো-ঘুমে হাসল।একটা দুষ্টু,অর্ধেক পাগলা হাসি।
“আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দে।নইলে ঘুম ভাঙবে না।”
নিশার হৃদপিণ্ড লাফাচ্ছে।লজ্জায় নাকি আতঙ্কে?সে আমতা আমতা শুরু করল।
“ক..কী??”
স্বার্থ পুরো চোখ মেলে তাকাল।নিশা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে একটু পিছিয়ে গেল।স্বার্থ উঠে বসল সোফায়।নিশাকে ঠান্ডা ফ্লোরে বসে থাকতে দেখে ধমক দিয়ে বলল,
“নিচে বসে আছিস কেন?সোফায় উঠে বোস।”
নিশা তাড়াতাড়ি স্বার্থর পাশে এসে বসল।কাঁপা হাতে চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক দিলো সেখানে।স্বার্থ চোখ ছোট করে নিশার কাণ্ড দেখল।মেয়েটা ঠিক তার পাশে বসে আছে—চুল এলোমেলো,গাল লাল,চোখে ভয়-লজ্জা-মুগ্ধতার অদ্ভুত মিশ্রণ।স্বার্থ ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল।বলল,
“চায়ে চিনি কম হয়েছে?”
নিশা চমকে কাপটা নিজের দুই হাতে শক্ত করে ধরল।
“মনে হয় একটু কম হয়েছে।”
স্বার্থ মাথা কাত করল।ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টু,পাগলা,কেবল নিশার জন্য সংরক্ষিত হাসি।
“কম?”
সে নিশার হাত থেকে কাপটা নিয়ে নিজের ঠোঁটের কাছে তুলল।নিশা হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
তার চোখের পাতা কাঁপছে,বুক ধুকপুক করছে।স্বার্থ তার এটো চায়ের কাপ থেকে চা খাচ্ছে?মেয়েটা বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে বসে রইল।স্বার্থ খুব ধীরে, ইচ্ছে করে এক চুমুক নিল।চুমুকটা এমনভাবে নিল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা সে মুখে তুলেছে।
চুমুক শেষ হতেই সে নিশার চোখে চোখ রেখে বলল,
“উহুম,চিনি তো ঠিকই আছে।”
নিশা ভ্রু কুঁচকে বিস্ময়ে বলল,
“এটা তো আমি মুখে দিয়েছি।”
স্বার্থ থামল।মুহূর্তটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।তার চোখে গাঢ় ছায়া জমল—যেন গভীর কোথাও ডুবে যাচ্ছে।সে নিশার দিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকল।
ভোরের নরম শ্বাস এসে নিশার গাল ছুঁয়ে গেল মুহূর্তেই।
“জানি।”
নিশার ঠোঁট কেঁপে উঠল।মেয়েটা কাপড় মুঠো করে ধরল।মেয়েটারশরীরের ভিতরটা শিরশির করছে।সে লজ্জা জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“তা..তাহলে আমার কাপ থেকে কেন খেলে?”
স্বার্থ কাপটা টেবিলে রেখে,দুই কনুই হাঁটুর উপর রেখে নিশার দিকে তাকাল।তার চোখে এমন দৃষ্টি—যা থেকে পালানোর উপায় নেই।স্বার্থর দৃষ্টি এতটাই গাঢ়,নরম আলোয় এত গভীর লাগছিল যে নিশার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধরফড় করছিল।
স্বার্থ ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টানল।নিশা ঠিক অনুমান করতে পারল স্বার্থ এখন বাজে কথা বলে তাকে লজ্জায় ফেলবে।
“তোর কাপ থেকে চা কেন খেয়েছি জানিস?”
স্বার্থ সরাসরি তার ঠোঁটে এক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে আবার চোখে চোখ রাখল।
“কারণ তোর ঠোঁটে মিষ্টি বেশি।চায়ে চিনি কম হলেও,তোর ঠোঁটের চিনি দিয়ে আমার চলেই যাবে।”
নিশা হকচকিয়ে লাজে চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল।
মুখের রং লালচে,শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে যেন।স্বার্থ সামান্য এগিয়ে এসে আরও নিম্ন গলায় বলল,
“যাক,অন্তত চিনি কেনার টাকা বাঁচবে আমার।
তোর ঠোঁট থাকলে আর আলাদা করে চিনি কিনতে হবে না।”
নিশা চমকে উঠে বলল,
“কীসব বাজে কথা! আমি যাচ্ছি!”
মেয়েটা দৌঁড়ে গেল সিঁড়ির দিকে।সে হাসছে—একদম সেই পাগলাটে,উচ্ছল,অভদ্র,ভালোবাসায় ভরা হাসি।
(আজকে সারাদিন ঘুম দিয়েছি,তবু ঘুম ছাড়ে নাআআআআআ।পেইজের রিচ ডাউন গাইস,সবাই রেসপন্স করুন।বেশি বেশি কমেন্ট করুন।)
চলবে….?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৭(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২১