Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১


সৎ মা নয়,তবে যার কাছে মেয়েটা বড় হয়েছে সে তার জন্মদাত্রী মায়ের থেকে কোনো অংশে কম নয়। “কায়নাত সুবাহ” নামের একটা মেয়ের জীবন কাহিনি শুরু হয় ঠিক এখান থেকেই।

“কায়নাত কই?আজ তার গায়ে হলুদ আর তার কোনো খোঁজ খবর’ই নাই?”

সোহেল মির্জার কথায় মিলি বেগম রেগে তাকালেন স্বামীর দিকে।হাতের সামনে বটি ধরে দাঁত চেপে বললেন,

“আর একবার আপনার ওই নোংরা মুখ দিয়ে বিয়ের কথা বের করলে জানে মে’রে ফেলব আপনাকে।”

সোহেল মির্জা মিলি বেগমের হাত থেকে ছোঁ মেরে বটিটা কেড়ে নিয়ে চুলের মুঠি শক্ত করে ধরলেন।
“মা’গি,মাইয়া মাইয়া করছ কারে?ওরে তুই পেটে ধরছস?”

মিলি বেগম চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেললেন।স্বামীর এই অত্যাচার আজকের নয়,বরং বিয়ের পর থেকেই এসব হয়ে আসছে।তিনি আহাজারি করে উঠলেন,
“আল্লাহর দোহায় লাগে,আমার পেটে তো আপনার সন্তান বড় হচ্ছে।এখন অন্তত এই অত্যাচার থেকে রেহায় দেন আমারে।”

“বা’ন্দির বাচ্চা আর একটা কথা কইলে তোর জিহ্বা টাইনা ছিরমু।ওই মাইয়া কই গেছে?”

সোহেল মির্জা মিলি বেগমকে ছেড়ে দিয়ে বাড়ির ভেতর তেরে গেলেন।হাতের বটি রেখে বড় একটা কাঠের টুকরো নিলেন হাতে।এক তলা দালান বাড়ির দক্ষিণ পাশের কোনার ছোট ঘরে লুকিয়ে ছিল এক নারী।বাবার কর্কশ কণ্ঠস্বর কর্ণদ্বয়ে পৌঁছাতেই শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ধরলো ভয়ে।ফুঁপিয়ে উঠল তৎক্ষণাৎ।সোহেল মির্জা দরজার সামনে এসে চিৎকার করে বললেন,

“তুই যদি আজকে ঘর থিকা না বাইর হইছস তাইলে তোর মায়রে মাইরা এই বাড়ি থিকা বাইর করমু।তাড়াতাড়ি দরজা খোল।”

কায়নাত মায়ের কথা শুনেই ভয়ে কেঁপে উঠল।হামাগুড়ি দিয়ে আলমারির পেছন থেকে বেরিয়ে কান্না কোনোরকম গিলে জড়াল কণ্ঠে বলল,

“আপনি মাকে আর মারবেন না দয়া করে।”

“মারমু না,তুই বাইরো।”

কায়নাত গায়ের শাড়ি টেনে টুনে ঠিক করে দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে খিল খুলে দিতেই সোহেল মির্জা খোঁপ করে কায়নাতের চুলের মুঠি ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলেন।ঊষা বেগম কলপাড়ে থালা-বাসন ধুতে ধুতে পিছু ঘুরে একবার তাদের দিকে তাকিয়ে কাজে মন দিলেন।কায়নাত বাবার পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

“আমাকে ওই লোকটার সাথে বিয়ে দিবেন না আব্বু।আপনি যা বলবেন আমি তাই শুনব,তবুও ওই লোককে বিয়ে করতে পারব না।”

মিলি বেগম রান্না ঘর থেকে মেয়ের আহাজারি শুনে হুহু করে কেঁদে উঠলেন।সোহেল মির্জা ঝাঁপটা মেরে কায়নাতকে সরিয়ে দিয়ে বিশ্রী ভাষায় গালাগালি শুরু করলেন।

“তোরে মাগনা মাগনা খাওয়ায় আমার লাভ কী?তোর মায় আইসা কী দুই টাকা দিয়া যায় আমারে?”

“আমি..আমি ওই লোককে বিয়ে করতে পারব না আব্বু।”

“তুই করবি তোর ঘাড়ও করব।তোরে এই বাড়ি রাইখা আমার টাকা নষ্ট করতে পারমু না আমি।এমনিতেই তো তুই নস্টা,তোরে ওই বুইড়া ছাড়া বিয়া করব কে?”

কায়নাত ছলছল চোখে বাবার দিকে তাকালো।
“আমি নস্টা না।”

সোহেল মির্জা মাটিতে থুথু ফেলে দাঁত চিবিয়ে বললেন,
“তোরে এক রাইত হুদাই রাইখা দিছিল?তোর লজ্জা শরম নাই?এই নস্টা শরীর নিয়া আমার বাড়িতে আইসা পইড়া আছস।”

মিলি বেগম রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কায়নাতকে টেনে দাঁড় করালেন।বুকের সাথে মেয়েকে চেপে ধরে বললেন,
“ও যখন বলেছে ওর সাথে কিছু হয়নি তার মানে সে সত্যি কথাই বলছে।আপনি কেন বারে বারে ওকে এসব কথা বলে গালাগালি করছেন?”

“গালাগালি করমু না?গ্রামের মানুষ তো আমারে দেখলে টিটকারি করে।তোর এই নস্টা মাইয়ার লাইগা আমি কাউরে মুখ দেখাইতে পারি না।ওর এত নাগর,যে কোনো একটারে ধইরা বাড়ি ছাইড়া যাইতে পারে না?”

সোহেল মির্জা হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।কায়নাতের হলুদ শাড়ি খানায় মাটি লেগেছে জায়গায় জায়গায়।মিলি বেগম যত্ন করে মেয়ের মুখ মুছিয়ে দিয়ে শক্ত করে গালে চুমু খেলেন।হাত মুঠোয় নিয়ে বললেন,

“ঘরে আয় মা।”

তিনি কায়নাতকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।দরজা বন্ধ করে পালঙ্কে গিয়ে বসলেন।কায়নাত মাথা নত করে বসলো।বলল,
“মা,আমি নস্টা না।”

মিলি বেগমের বুকটা কামড়ে ধরল।তিনি মেয়ের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বললেন,
“আমি জানি তুই পবিত্র।মা,এই অভাগী মায়ের একটা কথা রাখবি?”

কায়নাত মিলি বেগমের চোখে চোখ রাখলো।কৌতুহল ছিল সেই দৃষ্টিতে।মিলি বেগম চোখের পানি মুছে কম্পিত কণ্ঠে বললেন,

“তুই চলে যা।ওই লোকটা তোর জীবন শেষ করে ফেলবে।তুই..তুই তোর মায়ের কাছে চলে যা।”

কায়নাত চমকে তাকালো মায়ের দিকে।ঠোঁট ভেঙে এলো তার।
“আমি ওই বাড়ি গেলে অশান্তি হবে।”

“আমি সব ব্যবস্থা করে দিব।তুই শুধু এই বাড়ির মুখো হবি না।আমার কথা ভেবে পিছু ঘুরবি না কথা দে?”

কায়নাত মুখ ঘুরিয়ে নিল।ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“অসম্ভব!আব্বু তোমাকে মেরেই ফেলবে।”

“আমার কসম,তুই যাবি এই বাড়ি থেকে।আজই যাবি।”

“মা এটা হয় না।আমি চলে গেলে তোমাকে আব্বু আস্ত রাখবে না।”

মিলি বেগম মেয়েকে কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেলেন।
“আমার কিছু হবে না,তুই চলে যা।আমি পরশু তোর সাথে দেখা করতে চৌধুরী বাড়ি যাব।”

“আমি যাব না মা।”

“যেতে হবে।”

মিলি বেগম তাড়াহুড় করে কায়নাতের প্রয়োজনীয় সব কিছু গুছিয়ে ফেললেন।আলমারির কাপড়ের ভাঁজ থেকে ৭হাজার টাকা বের করে ব্যাগের এক কোনায় রেখে ধীর কণ্ঠে বললেন,

“এই টাকা তোর কাছে রাখ।দরকার হলে ভাঙবি আর যদি টাকা প্রয়োজন হয় আমাকে বলবি।আমার নাম্বার তোর মুখস্ত না?ওই বাড়ি কারোর ফোন দিয়ে ফোন করলেই হবে।”

কায়নাত নিষ্পলক চোখে মায়ের অস্থিরতা দেখল।মিলি বেগম নিজের ছোট বাটন ফোন বের করে আলমারি থেকে একটা নাম্বার খুঁজে সেই ফোনে ডায়াল করলেন।খানিকক্ষণ পর রিসিভ হতেই মিলি বেগম কী যেন ফিসফিস করে বলল কায়নাত কিছুই শুনতে পেল না।বিকেলের দিকে যখন গায়ে হলুদের জন্য টুকটাক তত্ত্ব পাঠানো হলো তখন শাড়ি বদলানোর নাম করে মিলি বেগম আড়ালে মেয়েকে নিয়ে বাড়ির বাইরে এলেন।হাতে মাঝারি সাইজের ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে।

শীতের শীতল বাতাসে কায়নাতের শরীর অবশ হয়ে এলো।মিলি বেগম মেয়ের গায়ে একটা শীতের চাদরও ঢেকে দিতে পারেননি।কায়নাত ভেজা চোখে মায়ের চিন্তিত বদন খানা দেখে বলল,

“তোমার কষ্ট হবে না মা আমাকে ছাড়া থাকতে?”

মিলি বেগমের বুকটা হুহু করে উঠল।কান্না আঁটকে মেয়েকে একহাতে কাছে টেনে নিয়ে বললেন,
“হবে,কষ্টে বুক ফে’টে যাবে তবুও তোকে আমার কাছে রাখতে পারব না।”

দূর পথ থেকে হঠাৎ একজন বয়স্ক লোক গায়ে সাদা শাল জড়িয়ে ধীর পায়ে হেঁটে এলেন।কায়নাতদের সামনে আসতেই মিলি বেগম সালাম করে কায়নাতকে বললেন,

“সালাম দে।”

কায়নাত নিচু স্বরে সালাম দিলো।লোকটা গম্ভীর মুখেও মুচকি হাসলেন।মিলি বেগমের হাত থেকে কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

“তুমি চিন্তা করো না।”

মিলি বেগম ছলছল নয়নে লোকটার দিকে তাকিয়ে অনুরোধস্বরে বলল,
“চাচা,আপনি আমার শেষ ভরসা।আমার মেয়েটাকে আগলে রাখবেন।কথা ছিল সময় হলে আপনার আমানত আপনার হাতে তুলে দিব।কিন্তু আমি যে আমার কথা রাখতে পারলাম না।”

“আমার বাড়ির সম্মানকে আজ আমি নিয়ে যাচ্ছি।তুমি কোনো চিন্তা করো না।”

লোকটা কায়নাতের দিকে তাকালেন।কায়নাত কাঁদছে,ফুঁপিয়ে কাঁদছে।হঠাৎ মেয়েটা মিলি বেগমকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
“আমি চলে গেলে বাবা তোমায় মারবে মা,আমি না যাই?”

মিলি বেগম লম্বা শ্বাস টানলেন।শাড়ির আঁচল দিয়ে নাক মুছে শুকনো ঢোক গিলে শান্ত স্বরে বললেন,
“আমার কিছু হবে না।আমি দেখা করতে যাব তোর সাথে মা।যা তুই,সময় নেই হাতে।”

কায়নাত মায়ের পেটে আদুরে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপু চলে যাই সোনা।আমাদের আবার দেখা হবে।”

সময়টা সন্ধ্যা সন্ধ্যা।চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে গেছে।শীতের কুঁয়াশায় মুড়িয়ে আছে পুরো গ্রাম।চৌধুরী বাড়ির পেয়ারা বাগান পেরিয়ে সরু রাস্তায় উঠলেন আজগর চৌধুরী।একহাতে কায়নাতের জামা কাপড়ের ব্যাগ অন্য হাতে মিষ্টির প্যাকেট।তিনি হাঁটতে হাঁটতে আড়চোখে কায়নাতের বদন পানে তাকালেন।মেয়েটার চোখ মুখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে কান্না কাটির ফলে।গায়ে হলুদ শাড়ি খানা প্যাঁচিয়ে হাঁটছে।তিনি নীরবতা ভেঙে বললেন,

“বনু,তোর কী শীত লাগতেছে?আমার শাল খানা গায়ে জড়ায় নিবি?”

কায়নাত ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না আমি ঠিক আছি।”

তারপর চুপ থেকে হঠাৎ বলল,
“আপনাকে আমি কী বলে ডাকব?”

আজগর চৌধুরী শব্দ করে হেসে উঠলেন।বললেন,
“দাদা ডাকবি।আমি তোর দাদা লাগি।আমারে কী ভুলে গেছিস বুড়ি?ছোট থাকতে না একবার আমার বাড়ি গিয়েছিলি?”

কায়নাত ভাবুক হয়ে বলল,
“আমার তো কিছু মনে নেই।”

“সমস্যা নেই।আবার চিনবি সব,নতুন করে।”

কায়নাত ব্যথাতুর মুচকি হাসলো।চৌধুরী বাড়ির সামনে এসে কায়নাত চোখ উঁচিয়ে পুরো বাড়ি পর্যবেক্ষণ করল।বিশাল বড় বাড়ি।চারপাশে মরিচ বাতি দিয়ে আলোয় আলোকিত করা।দেখে মনে হচ্ছে বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান আছে।বাড়ির গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই কায়নাতের চোখ জুড়িয়ে গেলো।বাড়ির সামনে বিশাল বড় বাগান দেখে মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল।সে এর আগেও এই বাড়ি এসেছে,তবে খুব ছোট থাকতে।সদর দরজার সামনে আসতে না আসতেই এক বৃদ্ধা মহিলা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলেন।আজগর চৌধুরী নিজের স্ত্রীকে দেখে গাল ভরে হাসলেন।হাতের মিষ্টির প্যাকেট গিন্নির সামনে ধরে বললেন,

“নাও গিন্নি তোমার বাড়ির রত্নরে নিয়ে আসলাম।”

আতিয়া বেগম কায়নাতের বদন দেখে বিড়বিড় করে ‘মাশাআল্লাহ’ আউড়ালেন।এ যেন হবুহু মায়ের মতো দেখতে মেয়েটা।কায়নাত ছোটো করে সালাম দিলো।আতিয়া বেগম মিষ্টির প্যাকেট না ধরে কায়নাতকে জড়িয়ে ধরলেন।কায়নাতের কম্পিত শরীর আঁকড়ে ধরে মায়া মাখা কণ্ঠে বললেন,

“তোর নাম কায়নাত সুবাহ তাই না?”

কায়নাত মাথা নাড়লো।তিনি কায়নাতকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই নিচ তলার কমন ওয়াশরুম থেকে বের হলেন লতা বেগম।ঠিক তখন সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির মেয়েরা নামছিল।বাড়িতে এক অচেনা নারী দেখে তারা কৌতুহল বশত এগিয়ে এলো।তবে বাড়ির বড় মেয়ে নিধি,সে ঠিকই চিনতে পেরেছে কায়নাতকে।রান্না ঘর থেকে রেখা বেগম ফারিয়াকে নিয়ে এগিয়ে এলেন।তা ছাড়াও বাড়িতে অনেক মানুষ ছিলেন,যাদের চেহারা কায়নাতের অপরিচিত।কায়নাত এত এত অচেনা মানুষ দেখে নিজেকে গুটিয়ে নিল।আজগর চৌধুরী লতা বেগমের দিকে তাকালে।লতা বেগম কায়নাতের দিকে তাকিয়ে রইলেন।আজগর চৌধুরী বললেন,

“নিয়ে এলাম বাড়ির মেয়েকে।”

রেখা বেগম কায়নাতকে দেখে গাল ভরে হাসলেন।ভেজা হাত শাড়ির আঁচলে মুছে কায়নাতের চিবুক উঁচিয়ে বললেন,

“লতার মেয়ে কিন্তু একদম লতার মতো দেখতে।কত বছর আগে দেখেছিলাম মেয়েটাকে,আজ কত বড় হয়ে গেছে।”

কায়নাত নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আমার মা কোথায়?”

পেছন থেকে লতা বেগম বললেন,
“হঠাৎ এই বাড়িতে?”

কায়নাত পিছু ঘুরে দাঁড়াল।জন্মদাত্রী মাকে দেখে দৌঁড়ে গিয়ে ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠল।সবাই হতভম্ব হয়ে তাকালো সেদিকে।বাড়ির মেয়েরা নিজেদের মুখ দেখাদেখি করছে।আজগর চৌধুরী ছোট বউমার এহেন আচরণে ভীষণ ক্ষিপ্ত হলেন।শক্ত গলায় বললেন,
“এখন কথা বাড়িয়ে অশান্তি করো না।”

আতিয়া বেগম চোখ রাঙিয়ে বউমার দিকে তাকালেন।রেখা বেগম লতা বেগমের এহেন রূপ দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আজগর চৌধুরী আতিয়া বেগমকে বললেন,
“ওকে নিয়ে উপরে যাও গিন্নি।”

আতিয়া বেগম কায়নাতকে নিয়ে প্রস্থান করলেন।আজগর চৌধুরী কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে চলে যেতেই রেখা বেগম বললেন,

“লতা,তোরই তো সন্তান সে।ওর সাথে এমন আচরণ করলি কেন?মেয়েটা এখনো বাচ্চা।”

লতা বেগম চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টানলেন।
“আপা তুমি এইগুলাতে নাক গলায়ো না।আমার ব্যাপার আমারেই বুঝতে দাও।”

“তোর ব্যপারে নাক গলানোর ইচ্ছেও আমার নেই,কিন্তু বাচ্চা একটা মেয়ের সাথে এমন আচরণ মানায় না।তা ছাড়া তার আরেকটা পরিচয়ও আছে,তুই বোধহয় ভুলে যাচ্ছিস।”

লতা বেগম বিরক্ত হয়ে হাঁটা ধরলেন নিজের ঘরের দিকে।বাড়ির ৪মেয়ে নিধি,সুহা,জয়া এবং মাহি ড্রয়িংরুমের এক কোণায় দাঁড়িয়ে সব কাহিনি দেখে বাকরুদ্ধ।জয়া নিধির হাত খামছে ধরে বলল,

“ওই মেয়েটা আমার বোন?কী সুন্দর দেখতে,একদম মায়ের মতো।”

নিধি মুচকি হাসল।বলল,
“শুধু বোন নয়,বংশের প্রথম বউ।”

সবাই কায়নাতকে চেনেন।বাড়ির তিন মেয়ে জয়া,সুহা ও মাহি কায়নাতকে সেইভাবে চেনে না।কায়নাত যখন এই বাড়ি এসেছিল তখন তার বয়স খুবই কম।জয়া লতা বেগমের ছোট মেয়ে।সে চৌধুরী বাড়ির মেয়ে।এতদিন শুনে এসেছে তার একটা বোন আছে,নাম কায়নাত সুবাহ।কিন্তু বোনের সাথে থাকা হয়নি কখনো।মাকে সাহস করে কখনো বলা হয়নি বোনের কথা।

নিধি ৩বোনকে নিয়ে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে দাদির ঘরে গেলো।কায়নাত বিছানায় কাপড় মুড়িয়ে জড়োসরো হয়ে বসে ছিল।আতিয়া বেগম আলমারি খুলে একটা মোটা সুয়েটার বের করে কায়নাতকে দিয়ে বললেন,

“এটা পড় ঠান্ডা কম লাগবে।”

কায়নাত সেটা গায়ে জড়িয়ে দরজার দিকে তাকালো।নিধিরা একে একে ঘরে প্রবেশ করতেই আতিয়া বেগম কায়নাতকে বললেন,

“এরা সবাই তোর বোন লাগে বুঝলি?চিনতে পারছিস কাউকে?”

কায়নাত মাথা নাড়িয়ে “না” বুঝালো।আতিয়া বেগম জয়াকে দেখিয়ে বললেন,
“এটা তোর মায়ের পেটের বোন।তোর থেকে কিছুটা ছোট কিন্তু ভীষণ পাকা।”

জয়া ভ্রু কুঁচকে গাল ফুলালো।
“কী সমস্যা দাদি?আমার বোনের সামনে তুমি আমাকে অপমান করছ?”

“অপমান করব কেন?ভুল কিছু বলেছি হ্যা?”

জয়া মুখ বাঁকাল।এগিয়ে গিয়ে কায়নাতের পাশে বসে বলল,
“তুমি নাকি আমার বোন?আচ্ছা তুমি এতদিন এই বাড়িতে আসোনি কেন?”

কায়নাত জয়ার দিকে অপলক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ।জয়া কায়নাতের থেকে উত্তর না পেয়ে হাত ঝাঁকিয়ে বলল,

“কথা বলোনা কেন?”

কায়নাত শুকনো ঢোক গিলল।সে সবার সাথে এত সহজে মিশতে পারছে না।গলায় কথা আঁটকে আসছে।জয়ার উৎফুল্লতা দেখে শান্ত গলায় জবাব দিলো,
“আমি অন্য জায়গায় ছিলাম এতদিন।”

“কোথায় ছিলে?”

“আমার আরেক মায়ের বাড়ি।”

জয়া চুপ করে গেলো।আতিয়া বেগম কায়নাতের ভেজা গলার স্বর শুনে জয়াকে ধমক দিলেন।ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আতিয়া বেগম কায়নাতের ব্যাগ খুলে তেমন ভালো কোনো জামা কাপড় পেলেন না।তিনি নিজের আলমারি খুলে বহু বছর আগের তুলে রাখা কিছু নতুন শাড়ি বের করলেন।ব্লাউজ লাগার কথা।তিনি সব কিছু বের করে কায়নাতের সামনে বিছানায় রেখে বললেন,

“এই ময়লা কাপড় ছেড়ে এখান থেকে যেটা ভালো লাগে পরবি এখন।আমি নিচ থেকে একটু আসছি।”

আতিয়া বেগম ঘরের দরজা চাপিয়ে ঘর থেকে বের হলেন।কায়নাত বিছানায় রাখা শাড়ি গুলোর মধ্যে একটা লাল খয়েরী রঙের শাড়ি বের করে গায়ে জড়িয়ে নিল ফ্রেশ হয়ে।তারপর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো ঘরের বারান্দায়।বাইরে দেখা যাচ্ছে অনেক মানুষ।হয়তো অনুষ্ঠানের জন্যই একত্রিত হয়েছেন সবাই।কুঁয়াশায় ঢেকে আছে সব কিছু।শরীরে কাঁপন ধরল তার।তবুও ঠাঁই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল শক্ত করে।এই কাঁপন তো জীবনের কাছে কিছুই নয়।


চৌধরী বাড়ি মানুষ দিয়ে গিজগিজ করছে।এই বাড়ির বড় ছেলের ছোট ছেলে,নাজনীন চৌধুরীর বিয়ে আগামী সপ্তায়।আজ থেকেই চলছে আয়োজন।আজগর চৌধুরীর মেজো ছেলের পুরো পরিবার ঢাকায় থাকেন।বিয়ের কারণে এসেছেন তারা।মাশফিক চৌধুরী তার ৬ ছেলে মেয়ে নিয়ে গ্রামে এসেছেন।

মাশফিক চৌধুরীর স্ত্রী বেহরুজ বেগম।তিনি ব্যস্ত হাতে বড় ছেলেকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছেন।কোত্থেকে মারামারি করে এসেছে কে জানে!হাতে ব্যান্জেজ করে বাড়ি ফিরেছে বন্ধুদের নিয়ে।বেহরুজ বেগম রাগে ফুঁসছেন।অর্ণ চুপচাপ খাচ্ছে।

“আমি কতবার বলেছি গ্রামে এসে ঝামেলা করবে না?তুমি আবার কাকে মেরেছো?এসব করে কী শান্তি পাও তুমি?”

অর্ণ গম্ভীর হয়ে শুধোয়,
“প্রশ্ন কোরো না মা!”

“থাপ্পড় চেনো?এসব তোমার দাদার কানে গেলে কী হবে ভেবে দেখেছ?”

অর্ণ বিরক্ত হয়ে খাবারের প্লেট ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“ঘর থেকে যাও মা।বিরক্ত করো না।”

“অর্ণ,আমরা একটা জায়গায় এসেছি কয়েকদিনের জন্য।তুমি কেন বুঝতে পারছ না?তোমার দাদা যদি এসব শোনেন কী হবে ভেবে দেখো।”

অর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কিছু হবে না মা।আমি ঘুমাব,ভালো লাগছে না।তুমি যাও।”

বেহরুজ বেগম কথা না বাড়িয়ে সত্যিই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।এই ছেলের সাথে তর্ক করা মানে বোকামি।তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে তাকিয়ে দেখলেন সেখানে মানুষ দিয়ে ভরা।
চৌধুরী বাড়ির চারপাশ আলোয় ঝলমল করছে।শীতের এই রাতে বাড়ির ছাদে ছেলেরা আড্ডায় ব্যস্ত।অল্প সংখ্যক মেয়েরাও আছে।রাত তো বেশি হয়নি।
প্রেম চৌধুরী,মাশফিক চৌধুরীর মেজো ছেলে।সে অর্ণর বন্ধু স্বার্থর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে সেখানে।আদাল প্রেমের পা টিপে দিচ্ছে।সে এক পর্যায় বিরক্ত হয়ে বলে,

“ঠান্ডায় শরীর জমে এলো,নিচে যাবা না তোমরা?”

স্বার্থ পা নাচিয়ে বলে,
“নিচে জায়গা আছে?কই ঘুমাবি তুই?মেয়েদের ঘরে?”

“বাড়িতে কী ঘরের অভাব?”

“তোকে আজ ছাদে রেখে যাব।নিচে তোর জন্য কোনো জায়গা নেই।”

“স্বার্থ ভাই,আমি মজা করছি না।একে তো নাজনীন ভাইয়ের বিয়ে দেখে কলিজা ফেটে যাচ্ছে, তারপর আবার এই শীতের মধ্যে এত রাতে এখানে বসে আছি।”

স্বার্থ নাক ছিঁটকে গলা উঁচিয়ে বলল,
“বলি যৌবনে যে এত জ্বালা পোড়া হয়,তোর বাপ মা জানে?বিয়ে টিয়ে করিয়ে দিব নাকি?”

“জ্বালা পোড়া তো হয়ই,কিন্তু আমার কপালে বিয়ে নেই।আমার আগেও দুই হাদারাম আছে,যারা এখনো কুমার।”

(সূচনা পর্ব)

প্রেমবসন্ত_২

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

স্টার্ট-২০-১০-২০২৫🕊️

(রেসপন্স করুন সবাই।রেসপন্স না করলে লেখার আগ্রহ হারায় ফেলব।পরে আমার লেখা সুন্দর হবে না।নেক্সট পর্ব পেতে অবশ্যই রিয়াক্ট কমেন্ট করুন।আবারও হুমকি দিচ্ছি রেসপন্স করুননননন। 🙂রেসপন্স করতে কীপটামি করলে আমি গল্প দিতে কীপটামি করব।)

চলবে….?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply