Golpo romantic golpo প্রেমতৃষ্ণা

প্রেমতৃষা পর্ব ৪৬(শেষ অংশ)


প্রেমতৃষা

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_৪৬ ( শেষ অংশ)

(রহস্য উন্মোচন পর্ব ২)

প্রেমের শরীরে এই তীব্র শীতেও ঘাম ঝরছে। এটা ডাবল বেডের কেবিন। তৃষার পাশে শুতে কষ্ট হচ্ছে না। তাছাড়া সিঙ্গেল বেড হলেও বউকে সে নিজের বুকের ওপর রাখত। শত হলেও বউ নামক হিটার বলে কথা। তৃষা প্রেমের বুকেই অভিমান নিয়ে শুয়ে আছে। হঠাৎ প্রেম তার কপালে চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ” সোনা কষ্ট হচ্ছে খুব?”

“আপনাকে বলেছিলাম রয়েসয়ে কাজ করুন। সব কিছুতে জলদি পনা।”

“শালীর ঘরে বউ, পরিশ্রম করলাম আমি আর কষ্ট লাগে তোর? তখন তো বাঁধা দেসনি। যত্তসব নাটকের বস্তা।”

তৃষা মুখ ভেংচি কাটতেই প্রেম তার ঠোঁটে চুমু খেয়ে কাছে আসতে নিলে তৃষা ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেয়। চেঁচিয়ে বলে, ” এই হাইব্রিড করলা! আরেকবার কাছে আসার চেষ্টা করলে করলার রস চিপরে তেতো ভাব দূর করে দেব।”

প্রেম ভ্রু কুঁচকে উঠে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ” ওই কচলাকচলি ছাড়া তুমি চুলও ফেলাতে পারবে না।”

“আসেন আপনার তা ফেলে দেখাই।”

“শালীর ঘরের বউ, তোর মুখের ওপর বোম মারার আগে ওয়াশরুমে যাহ্। আর হ্যাঁ দরজা আটকাবি না।আমিও আসছি একটু পর।”

” শালার ভাই তোমার ওয়াশরুম চাপলে তুমি যাও। কথায় আছে না, যার হাগা ধরে সে নিজেই দৌড়ায়।”

প্রেম কথা না বাড়িয়ে ওয়াশরুমে গেল। এই কনকনে শীতের মধ্যে শরীর ভিজিয়ে আসতেই দেখল তৃষা ঘুমিয়ে গেছে। প্রেম তৃষার পাশে এসে বসল। মুখের দিকে তাকিয়ে কি সব ভেবে হঠাৎ ঘুমন্ত তৃষার জামা উপরে উঠিয়ে ক্ষতর দিকে তাকালো। ওই জানোয়ারের বাচ্চার কতোবড় সাহস, প্রেমের জানের ওপর আঘাত করে ! ও ভেবেছে কি? মুক্ত হয়ে যাবে? কঠিন জীবন অপেক্ষা করছে ওর জন্য। জানের বদলে জান যাবে। প্রেম তৃষার ক্ষতর ওপর আলতো করে চুমু দিয়ে জামা নামিয়ে গায়ে চাদর টেনে দেয়। জানালার কাছে আসতেই পেছনের কিছু কথা মনে পড়ে যায়। প্রত্যুষের কাছে যাওয়ার আগের ঘটনা। থানাতে প্রেমের জন্য অপেক্ষা করছিল হেতিজা। কালুর বাপ অনেক কষ্টে সিদ্দিক নেওয়াজকে হোটেলে নিয়ে গিয়েছেন। থানায় কেবল হেতিজা আর প্রেমা ছিল। প্রেম থানায় ঢুকতে না ঢুকতেই হেতিজা তাকে আঁকড়ে ধরেন। কেঁদে কেটে চেঁচিয়ে আর্তনাদ করে বলেন, ” আমার ছেলেকে ছেড়ে আমায় বন্দী করো। সে অসুস্থ তাই এমন কাজ করেছে। ওর কোনো দোষ নেই। একজন অসুস্থ মানুষের কি কোনো শাস্তি হতে পারে? আমার ছেলে পাগল, সে অসুস্থ অন্তত এই উছিলায় তাকে ছেড়ে দেও। ছেলে ছাড়া আর কে আছে আমার বলো? “

“ছেলে অসুস্থ তুমি কি করে জানো? তার মানে কি প্রত্যুষ যা যা করেছে, সবই তুমি আগ থেকে জানতে ফুফি?” প্রেম এক মুহূর্তে থমকে যায়। তারপর পুনরায় বলে, “দেখো তুমি আমাদের সত্য বলে সাহায্য না করলে তোমার ছেলের শাস্তিও কমবে না, তাকে আর না পারবে কখনো দেখতে, না শাস্তি থেকে বাঁচাতে।”

হেতিজা একটা ঢোক গিলে কেবল। তারপর বলে, “বলছি বাবা, সব বলছি। কেবল ছেলেটাকে রেহায় করো প্রেম বাবা।” প্রেম হাত দুটো বুকের কাছে ভাজ করে বলল, ” একটু নিরিবিলি আলাপ করলে ভালো হতো না?”

তদন্ত কক্ষের বাল্বের হলুদাভ বাতির নিচে বসে আছে হেতিজা। শীতের মধ্যে ঘাম টিপটাপ করে পড়ছে কপাল বেয়ে। সেদিকে পাত্তা নেই কারো। সবাই কান পেতে চেয়ে আছে তার ঠোঁটের ফাঁক গলে বের হওয়া জবানের দিকে। হেতিজা প্রেমের দিকে একবার তাকালো। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে শুরু করল,

” প্রত্যুষের সঙ্গে তিথি নামক মেয়েটির সাত বছরের সম্পর্ক ছিল। দু’জনের মধ্যকার সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যা দেখে বিবাহিতই লাগত। সাধারণ বিবাহিত মানুষদের মধ্যে দীর্ঘ দিন যাবৎ সংসার করলে যেমন সম্পর্ক তৈরি হয় ঠিক তেমনই। প্রত্যুষ প্রায় তিথিকে বাড়ি নিয়ে আসত। আমরা এক সঙ্গে গল্প করতাম। প্রত্যুষের ইন্টেলিজেন্স অফিসার হওয়ার সেই ছোট থাকতেই খুব ইচ্ছে ছিল। মেধাবী ছাত্র বলতে পারো। প্রত্যুষ ঠিক করে রেখেছিল চাকরিটা পেলেই বিয়ের পিরিতে বসবে। আমার আর প্রত্যুষের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। এত ব্যস্ততা, পড়ালেখার চাপে প্রত্যুষ মানুষদের সঙ্গে মিশতে পারত না। আমার সঙ্গে দিন শেষে সব শেয়ার করত। আস্তে আস্তে আমরা ভালো বন্ধু হয়ে উঠি। ছেলের শান্ত মুখটার দিকে একবার তাকালে দুনিয়ার কোনো কষ্ট আর কষ্ট মনে হতো না বিশ্বাস করো। সেই ছেলে চাকরির প্রিপারেশন নেওয়ার সময় তিথি আচমকা তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তার মধ্যে টাকার লোভ জন্মায়। অনেকদিন আগ থেকেই হয়তো বুড়ো ব্যাটা হাতিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল। তাই তো আমার ওমন ছেলেটাকে কষ্ট দিয়ে বিয়ে করেছে। ওর জন্য আমার ছেলেটা অসুস্থ হয়। এত এত অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।”

প্রেমের মুখ দেখে মনে হলো এসব বানোয়াটি গল্প তার খুব একটা পোষালো না। সে আদিত্যের দিকে তাকাতেই আদিত্য বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আহাদের দিকে একবার তাকালো। মুহূর্তেই ওপাশের সেল থেকে ভেসে এলো প্রত্যুষের বেদনাদায়ক আর্তনাদ। হেতিজা অস্থির হয়ে উঠে ছেলের কাছে যাওয়ার জন্য দাঁড়াতেই আহাদ এসে বাঁধা দিলো। আদিত্য হেসে বলল, ” আপনি সত্য বলবেন কি? না কি আপনার ছেলেকে থেরাপির ডোজ বাড়িয়ে দেব?”

পাশ থেকে প্রেম তিতকুনি কেটে বলল, “আরে ভাই ডিম থেরাপি দিবেন নাকি? তাহলে কিন্তু আমি ডাইনোসরের ডিম কিনে নিয়ে আসব। এই শুনুন, কাজটার দায়িত্বে আমাকে রাখা হোক। আমি আবার থেরাপি স্পেশালিস্ট।” বলেই চোখ মেরে এক গাল হাসল প্রেম। তবে হেতিজার চোখ-মুখ জুড়ে আতঙ্কের পাহাড়। সে চোখটা একবার বন্ধ করে পুনরায় খুলল,” তিথি রূপে গুনে অপরূপা ছিল। তিথি শুরু থেকেই আমার ছেলেকে অনেক ভালোবাসতো। তবে সেই ভালোবাসাই তিথির জন্য কাল হয়। পাপী তো আমার ছেলে একা নয়, আমিও কম কোথায়? প্রত্যুষ যখন দশ বছরের ছিল তখন তার পাপা পাপন দেওয়ানের সঙ্গে এক সন্ধ্যায় বিরাট ঝগড়া হয়। পাপনের সঙ্গে সেই ঝগড়া মারামারির পর্যায়ে চলে যায়। আমি সারাটা জীবন একজনকে চেয়ে এসেছি, আর বাবা শেষে তার সম্মানের কথা রাখতে সম্পদ দেখে অচেনা কারো সঙ্গে জুটি বেঁধে দিয়েছেন। তবুও বছর চলে গেল প্রাক্তন ভুলতে পারলাম কই? পাপন আমায় যে ভালোবাসেনি তা বললে ভুল হবে, তবে সংসার করতে হবে, বাধ্য বাদকতা মানতে হবে তাই সবটা মেনে নিচ্ছিলাম। তাছাড়া আর কিছুই নয়। তখন প্রেমা কোলের শিশু। এক সন্ধ্যায় প্রাক্তনের কল আসে ফোনে। হঠাৎ এত বছর পরও যখন জানতে পারি, সে এখনো আমার অপেক্ষায়, আমায় ভালোবাসে সেই থেকে মাথা পুরো বিগড়ে যায়। প্রত্যুষের স্কুল ছুটির পর তাকে নিয়ে একদিন প্রাক্তনের সঙ্গে দেখা করতে যাই। প্রত্যুষ এত কিছু বুঝতো না। যা বুঝাতাম তাই বুঝতো।
এভাবে আমি আবারও প্রাক্তনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যাই। হঠাৎ একদিন পাপন বিষয়টা বুঝতে পারে। যেদিন তার কাছে প্রথম হাতেনাতে ধরা খাই সেদিন অনেক ঝামেলা হয় বাড়িতে। কিছু সময় কেটে যায়। তারপর একদিন ঠিক করি পালিয়ে যাব। পালানোর প্রস্তুতিও নেই। তবে পাপন ধরে আনে। সেদিন পাপনের সঙ্গে অনেক ঝগড়া হয়, এক পর্যায়ে লোহার রড দিয়ে পাপনের মাথায় আঘাত করতেই সে মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশে কেবল রক্ত আর রক্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। লাশ কি করব বুঝতে পারছিলাম না। প্রত্যুষ তখন নিজের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিল। ছেলে ছোট থেকেই মা ভক্ত। সেই ভক্তের জোড় কাজে লাগাই আমি। সেদিন উপায় না পেয়ে রুমের মধ্যেই পাপনের মরদেহ টুকরো টুকরো করি। প্রত্যুষকে বলেছিলাম, বাবা খারাপ মানুষ। যারা তোমার মনে কষ্ট দিবে তাঁদের এমন পরিণতিই করবে। ছেলেকে বুজিয়েছিলাম, বাবা অন্য মা আনতে চেয়েছিল তাই, আম্মু কষ্ট পেয়ে তাকে শাস্তি দিয়েছি। তাই ছেলেও হাতে হাতে সেদিন আমায় সাহায্য করে। কাজ শেষ করে ওইদিন বাসায় আমি বিরিয়ানি রান্না করেছিলাম, কিসের বিরিয়ানি জানো? পাপনের মাংসের বিরিয়ানি।” বলেই হাসল হেতিজা। “তারপর অনেক দিন চলে যায়, এক্সিডেন্ট বলে ঘটনা দামা চাপা দেওয়া হয়। খুন যে হয়েছে সেটা ভাবার কোনো বিষয়ই নেই। এমন ভাবে মাংস কাটা হয় দেখতে এক্সিডেন্টই মনে হয়েছিল। পাপনের মৃত্যুর পর বাবা এসে আমাকে সহ, আমার সন্তানদেরকে ঢাকায় নিয়ে আসে। তারপর আর প্রাক্তনের ফোন আসেনি। আস্তে আস্তে আমার চিন্তাধারার পরিবর্তন আসে। ছেলে-মেয়েদের দিকে মনোযোগী হই। আমি হেতিজা সত্যি অতীত ভুলে কেবল মাত্র আমার ছেলে-মেয়েদের কথা চিন্তা করি। আস্তে আস্তে প্রত্যুষ বড় হয়। আমার মতোই একদিন প্রেমে পড়ে। তিথি মেয়েটিও তো কম ভালোবাসত না তাকে। তবে আস্তে ধীরে বুঝতে পারি আমার ছেলেটা কেমন যেন টক্সিক হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছিল, তিথি একবার নিশ্বাস নিলেও তার কৈফিয়ত তাকে দিতে হতো। একটু ভুল হলে ভয়ানক ভাবে টর্চার করত। প্রথমত খারাপ কিছু আন্দাজ করলেও তারপর পুরান ঢাকার একটা পুরোনো বাড়িতে ছেলের টর্চার সেল আবিষ্কার করি। নানা ভাবে তিথিকে সেখানে অত্যাচার করা হতো। এমনকি শেষে এমন অবস্থায় চলে গিয়েছিল যে, তিথি তার পরিবারের মানুষেদর সঙ্গেও ঠিক করে কথা বলতে পারত না। শেষে একদিন তিথি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য বাবার পছন্দ করা ছেলের সঙ্গে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। তার উদ্দেশ্য ছিল একটা সুস্থ জীবন। সেই ছেলের যদিও অনেক টাকা পয়সা ছিল তবে আমি তিথিকে চিনি, ভালো পরিবারের মেয়ে। দরিদ্রটা দেখে বড় হয়নি তাই টাকার লোভ তার মধ্যে ছিল না। প্রত্যুষের জন্য সব কিছু করতে রাজি ছিল সে। তবে তার বিয়ে হওয়ার পর প্রত্যুষের মধ্যে আরো রাগ-ক্ষোভ বাড়ে, আরো ভয়ানক হয়ে উঠে। বিয়ের পরদিনই সে তিথিকে জিম্মি করে সকলের অগোচরে। প্রত্যুষ সব বিষয় আমার সঙ্গে শেয়ার করত, তার কোনো কর্ম আমার অজানা নয়। সেদিন যখন তিথিকে ধরে আনে তখনো আমি নিষেধ করেছিলাম কিন্তু শুনেনি। আমার সামনে তিথিকে খুন হতে দেখেছি, শরীর সব মাংস আলাদা করে রান্না করতে দেখেছি। তিথির লম্বা চুল ছিল। সেই চুল কেটে জীবিত অবস্থায় মাথা নেড়া করে দিয়েছে তিথিকে। আর মারার পর কি মেরেছে? মারার কাজ তো জীবিত থাকা অবস্থাতেই করে ফেলেছে। আচ্ছা তোমরাই বলো দোষ ওই তিথির না? আমার ছেলের সঙ্গে প্রেম করে অন্য কাউকে বিয়ে করলে তো পরিনতি এমনই হওয়ার কথা ছিল। মেয়েটা এখনো বুঝল না আমার ছেলে তাকে কত ভালোবাসত। কেবলমাত্র ওই মেয়েকে ভালো বেসে আমার ছেলে পাপ করেছে। তাই দোষী আমার ছেলে নয়, ওই মেয়ে তিথি।”

আদিত্য এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। জিজ্ঞেস করে, “তাহলে যে আপনার ছেলে বলল, তিথি মরেনি? ওই রুমে তিথিও ছিল? সেইসব কি?”

আদিত্য আরো কিছু প্রশ্ন করার আগেই হাসপাতাল থেকে ডাক্তারের কল আসে। আদিত্য কেবল জিজ্ঞেস করে, “লাশটা কার?”

” সেটা জানা যায়নি।”

হঠাৎ আহাদ দৌড়ে সেলের মধ্যে প্রবেশ করে। হেতিজা তখনো চুপ। তাকে করা প্রশ্নের এখনো কোনো জবাব তার কাছে নেই। আহাদকে বিচলিত হতে দেখে আদিত্য জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?”

“স্যার লাশের গলায় যেই লকেটটা ছিল তা খুলতে সক্ষম হয়েছি। সেখানে ছবি আছে। আই থিংক ভিক্টিমের ছবি।”

“কই দেখি।”

আদিত্য লকেটটা হাতে নেয়। ছবিটার দিকে তাকানোর আগেই লকেটটা টেনে প্রেম নিজের হাতে তুলে নেয়। ছবিটার দিকে তাকাতেই আওরায়, “ও মাই গড, তিথি?”

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply