Golpo romantic golpo প্রিয়তার পূর্ণতা

প্রিয়তার পূর্ণতা পর্ব ১১


প্রিয়তার_পূর্ণতা

Nadia_Afrin

১১
শাশুড়িমা চিৎকার করে করে কাঁদছে।আহাজারি করছে।কেঁদে কেঁদে অবচেতন হচ্ছেন।
সুমা আপু জ্ঞান ফেরাচ্ছে।এই নিয়ে তিনবার জ্ঞান হারিয়েছেন তিনি।
আমি সোফায় বসে চুপচাপ।ফেসেছি চরম ভাবে।এদিকে থাকলে প্রলয়ের থেকে ঝাড়ি খাই,ওর দিকে গেলে শশুর বাড়ির লোকের কাছে কালার হই।এভাবেই চলছে আমার জীবন।
যাকগে সেসব!
এখন ঘটনা হয়েছে শাশুড়িমার গহনা চুরি গেছেন।এজন‍্য কেঁদে কেটে বুক ভাসাচ্ছেন তিনি।
প্রলয় সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে ফোন টিপছে।ওর মায়ের এমন হাই-হুতাসেও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

শাশুড়িমা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,”কে করলো আমার এই সর্বনাশ?তার যেন হাতটা জ্বলসে যায়।হাতে যেন পোকা পড়ে।”

প্রলয় ফোনের দিকে দৃষ্টি রেখেই বলল,”শকুনের দোয়ায় গরু মরেনা।”

মা এবার কান্না থামিয়ে দাঁত কটমট করতে করতে বলল,”তুই আমায় শকুন বলছিস মানে?”

“তোমায় কখন শকুন বলেছি?তুমি অভিশাপ দিচ্ছো এজন্য বললাম।”

সুমা আপু কথা ধরলো।বলল,”মা অভিশাপ দিচ্ছে তো তোর কেন গায়ে লাগছে?
কোনোভাবে চুরিটা তুই করিসনি তো?
তোকে পরসুদিন মায়ের ঘর থেকে বেরোতে দেখেছিলাম।”

প্রলয় শিতল দৃষ্টিতে সুমা আপুর দিকে তাকায়।
সুমা আপু কাশতে লাগে।প্রলয় উঠে দাঁড়িয়ে বলে,”কথা মেপে বল আপু।হয়ত তোর আমি ছোট।তবে বেশি বুঝিস না।
আর ঐ গহনাগুলো মাকে আমিই বানিয়ে দিয়েছিলাম।
আমার মায়ের ঘরে যাওয়ার রাইট আমার আছে।
তোরাও তো যাস।তোরা তো সারাদিন ঐ ঘরেই পড়ে থাকিস।তোরাও তো নিতে পারিস।”

“আমরা কেন নিতে যাবো নিজের মায়ের গহনা?
আমাদের কী নেই নাকি?”

“তাহলে আমায় কেন বলছিস?”

সুমা আপু চুপ যায়।
প্রলয় আমার দিকে তাকিয়ে বলে,”ড্রামাটা আজ শেষ হওয়ার নয়।
খাবার নিয়ে রুমে আসুন।ক্ষিদে পেয়েছে আমার।”

মা যেন এবার আরো তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে।
আমি কিছু না বলে চুপচাপ কিচেন থেকে খাবার নিয়ে ঘরে গেলাম।
প্রলয়কে খেতে দিয়ে পাশে বসলাম।
আমার প্লেটে শুধু মাছ-ভাত।প্রলয়ের প্লেটে মাংসও ছিল।সে আমার প্লেটে তার মাংস টুকু দিল।
বললাম খাবোনা মাংস।খেতে ইচ্ছে করছেনা।
প্রলয় কোনো জবাব দিল না।সে সুন্দর করে খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে উঠে বারান্দায় গেল।
আমি বসে থেকে চেয়ে রইলাম খাবারের দিকে।
তারপর খেতে লাগলাম।চিকেন আমার ভীষণ প্রিয়।ছোট থেকেই মাছ পছন্দ নয়।চিকেন লাভার।তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছি আমি।
প্রলয় বারান্দা থেকে উকি দেয় ঘরে।
আমার খাওয়া দেখে মুচকি হাসে।

খাওয়া শেষ করে বারান্দায় গেলাম।
জিজ্ঞেস করলাম,”পুলিশকে জানানো হয়েছে বিষয়টা?
আপনার কোন বন্ধু নাকি পুলিশ।তাকে বললেই তো হয়।বলেছিলেন আমার চুরি হওয়া গহনার ইনভেস্টিগেশন তিনিই করছেন সিক্রেটে।
তাহলে মায়ের গহনা চুরির বিষয়টিও তাকে জানান।”

প্রলয় এক কথায় জবাব দিল,”প্রয়োজন নেই।”

সে চলে যায় ঘরে।ওর ব‍্যবহারে আমি প্রচন্ড অবাক।মায়ের গহনা চুরি হয়েছে,এদিকে ওর কোনো হেলদোল নেই।
না থাকলে আমার কিছু করার নেই।চুপ থাকাটাই শ্রেয়।এ বাড়িতে এমনিতেই রহস্যের শেষ নেই।

চুপচাপ ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
প্রলয় বাইরে যায়।ওর ফোন বাজছে।পাশ ফিরে ফোনের দিকে তাকালাম।কলিগ দিয়ে সেভ করা নাম্বার।
টানা কল বেজে কেঁটে গেল।ধরিনি আমি।কারো ফোন রিসিভ করা উচিৎ নয়।
আবারো কল এলো।আবারো এলো।তিনবার এলো।এবার একটু নড়েচড়ে উঠি।এতোবার কল দিচ্ছে,নিশ্চয় দরকার কোনো।
কলটা রিসিভ কর‍ে সালাম পরিচয় দিয়ে কথা বললাম।প্রলয়কে এক্ষুনি দেখা করতে বলছে।আর্জেন্ট দরকার।
আমি জানাচ্ছি বলে কল রেখে দিলাম।
কল কাঁটতেই স্ক্রিনে একটি ছবি ভেসে উঠলো।
একটি মেয়ের হাস‍্যজ্জল ছবি।
বুকের ভেতরে ধ্বক করে উঠলো আমার।
মেয়েটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
ছবির নিচে লেখা,’Love my aditi’.

মনের মাঝে চাপা কষ্ট অনুভব করলাম।
চোখে পানি টলমল করছে।এমন সময় প্রলয় এলো।তার হাতে আমার ফোন দেখে কিছুটা চমকায়।কখনোই ওর ফোন আমি ধরিনি।
দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো।
আমি তখনও অদিতিকে দেখতে ব‍্যস্ত।
প্রলয় হালকা কেশে উঠলো।
ধ‍্যান ভাঙে আমার।চোখ মুছে ফোনটা প্রলয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলি,”আপনার কল এসেছিল বারবার।এজন‍্যই রিসিভ করেছিলাম।আপনাকে যেতে বলেছে আর্জেন্ট।”

প্রলয় ‘হুম’ বলে ফোন নিয়ে চলে গেল।আমি থম মেরে রইলাম।
রেডি হলো প্রলয়।
জুতো পড়তে পড়তে বলল,”আমার ফিরতে রাত হতে পারে অনেক।আপনি খেয়ে নেবেন।”

কোনো জবাব দিলাম না আমি।

প্রলয় চলে গেল।
ওর যাওয়া মাত্র রিপা এলো ঘরে।
বলল,”ভাবি আপনার সেই ভাইটাকে একটু জানান মায়ের গহনা হারানোর কথা।যদি ফিরিয়ে এনে দিতে পারে।”

“সে বলবো সমস্যা নেই।কিন্তু মায়েরও যেন কারা পুলিশ আছে শুনেছিলাম।তাদের বলেছো?”

রিপা আমতা আমতা করে বলল,”ঐ আসলে উনারা রিটায়ার।”

“তাহলে আমার গহনা চুরির বিষয়ে তাদের কেন বলা হয়েছিল?”

রিপা মাথা নিচু করে চুপ করলো।
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম কয়েকপল।
এরপর চোখ সরিয়ে নিলাম।
রিপা চলে গেল।সুমা আপু ডাকলো একটু পর।নিচে যেতেই সুমা আপু বলল,”আজকে মায়ের মন ভালো নেই।রান্নাটা তুমি করো।”

বললাম,”ঠিক আছে।কী রান্না করবো?”

“ভাত করো।মাছ,মুরগি,ডাল আর ভাজি করো।”

“ঠিক আছে।”

কিচেনে গেলাম।ইউটিউব ও মায়ের সহযোগিতায় রান্নাটা মোটামুটি হয় এখন।খাওয়া চলে আর কী!

রান্না করতে লাগলাম আপন মনে।
একটু পর সুমা আপু এলো।
এসে আমার রান্নাগুলো চাখতে চাখতে বলল,”এখন আর তেমন নিয়ম টিয়ম কেউ পালন করেনা।আমার বিয়ের সময় কতো নিয়ম পালন করেছে আমার মা।
বিয়ের পর মেয়ের রান্না করে খাওয়ার জন্য শশুর বাড়িতে হাড়ি-কড়া থেকে শুরু করে বালতি-মগ সব দিতে হয়।”

কথার সুরটা ধরতে পারলাম আমি।
বললাম,”তা আপু আপনার সেই হাড়ি-কড়াগুলো কোথায়?
না মানে আমিতো শুনেছিলাম আপনি বিয়ের পরপরই শশুর বাড়ি ছেড়েছিলেন।তাহলে ওগুলো নিশ্চয় নিয়েই এসেছেন।
তো সেগুলো কোথায়?একটু দেখতে চাচ্ছিলাম কেমন কী দিতে হয়।আমি না হয় আনলাম না।মেয়ে-টেয়ে হলেতো বিয়ে দিয়ে এসব দিতে হবে।এজন‍্য ধারণা রাখছি।”

আপু একটু আমতা আমতা করে বলল,”এখানেই আছে।কিচেনেই রেখেছি।মনে নেই সঠিক।”

“ওমা সেকি!এতো মূল‍্যবান জিনিস গুলো ভুলে গেলেন?সমস‍্যা নেই।আমি প্রলয়কে জিজ্ঞেস করে নেব।ওর মনে থাকলেও থাকতে পারে।”

আপু গলা উচিয়ে বলল,”সব কথা কেন স্বামীকে বলতে হবে তোমার?পেটে কথা হজম হয়না?”

“রাগ করছেন কেন আপু?
আমিতো জানার জন্য বলতে চাচ্ছিলাম।যেন ভুল করেও আপনার জিনিস নষ্ট করে না ফেলি।আপনার বিয়ের স্মৃতি বলে কথা!”

আপু যেন রাগে গজগজ করে উঠলো।
চলে গেল রান্নাঘর ছেড়ে।আমি সামান্য হাসলাম।
উচিৎ কথা বললে মাঝি নায়ে থেকে নামো।

রান্না শেষ করে সবে টেবিলে খাবার রেখেছি,যার যার মতো হাজির।টেবিলে সিরিয়ালবাই বসে গেল।
আমি বেড়ে দেওয়ার সবুর নেই।
যে যার মতো খাচ্ছে।আমি পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।মায়ের নাকি মন ভালো নেই।তবুও খেল দু-থাল।যাকগে!খেয়েছে ভালোই হয়েছে।
মা খেয়ে টেবিলে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলো।হুট করে কেঁদে উঠলো।আমি আৎকে উঠেছি।
সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
সুমা আপু হাড় চিবোচ্ছেন তখন।বললেন,”খেতে বসে পরো প্রিয়তা।
আমাদের খাওয়া শেষ।”

হয়ত বলতে পারতাম আপনাদের শেষে কেন আমি খাবো।
বা আগেই বসে যেতে পারতাম।কিন্তু বসিনি।কারণ খাওয়ার ইচ্ছে নেই আমার।
ওরা যেতেই টেবিলটা গুছিয়ে রাখলাম।ভাবলাম প্রলয়ের খাবার ঘরে নিয়ে যাই।আর নিচে আসতে হবেনা।
মাংসের বাটি সম্পূর্ণ খালি।অন‍্যমনস্ক থাকায় বিষয়টি খেয়াল করিনি আমি।
মাছের শুধু ছোট্ট একটা পিস আছে।ভাজি আছে বাটি ভর্তি।ডাল হাড়ি ভর্তি।এগুলো কেউ ছুঁয়েও দেখেনি।শুধু রান্না করিয়েছে আমাকে দিইয়ে।
এ কদিনে এটুকু বুঝেছি।এ বাড়ির মানুষের বিবেক কম। বিশেষ করে প্রলয়ের ক্ষেত্রে।
আমার ইদানিং সন্দেহ হয়,প্রলয় শাশুড়ির নিজের পেটের সন্তান তো?
নিজের পেটের সন্তান হলে তারা কীভাবে পারে ওর সঙ্গে এমন করতে?সবাই খেয়ে গেল।ওর কথা একবারো জিজ্ঞেস করলোনা।ও কোথায় আছে সেটাও জানতে চাইলোনা।নিজেরা গান্ডেপিন্ডে গিলে ঘরে চলে গেল।আর দুটো মানুষ খাবে কী সে চিন্তা করলোনা একবারো।
আমায় নিয়ে তো চিন্তা নেই ই।প্রলয়কেও যেন গোনায় ধরেনা।অথচ ওর টাকায় সবাই খাচ্ছে,পড়ছে।
আবারো কিচেনে গেলাম।ডিম ভেজে নিয়ে যাই।মানুষটা সারাদিন পর কাজ শেষে আসবে।একটু ভালো খাবার না হলে হয়!

গরম তেলে সবে ডিম ছেড়েছি।ছ‍্যাৎ ছ‍্যাৎ শব্দে ননদ-ননাস দুজনেই দৌড়ে এলো রান্নাঘরে।
ব‍্যাতিব‍্যস্ত হয়ে বলল,”ওমা আবার ডিম ভাজছো কেন?ডাল আর ভাজি তো আছেই।”

এবার আর চুপ থাকলাম না।
বললাম,”আপনার ভাইটা যে কাজে গেছে,ফিরে এসে শুধু এগুলো দিয়ে খাবে?”

আপু মুখ বাকিয়ে বলল,”না খাওয়ার কী আছে?
সবসময় ভালো খেতে হয় নাকি?”

“আপনারা খেলেন কেন তাহলে?
উনার টাকায় সবাই ভালো-মন্দ খাবে,আর উনিই বাদ যাবে?”

“এতো বড়ো সাহস তোমার।তুমি নতুন বউ,নতুন এসেই আমায় খাওয়ার খোটা দিচ্ছো?
জানো তুমি আমি এ সংসারের জন্য কতো কিছু করেছি?
ছোট ভাইয়ের টাকায় খেয়েছি তো ভুলটা কোথায়?
ওকে আমি ছোট থেকে মানুষ করেছি।কোলে নিয়ে ঘুরেছি।খাইয়ে দিয়েছি।আর তুমি কিনা আমায় খাওয়ার খোটা দাও।দুদিন সংসারে না এসেই সংসার একেবারে হাতের মুঠোয় নিতে চাও?
অথচ এই সংসার তৈরির পেছনে আমার অবদান কতটা জানো?ভাইরা এই বাড়ি করার সময় টাকা শর্ট পড়েছিল। তখন কে এগিয়ে এসেছিল?আমি এসেছিলাম।নগদ পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলাম।তুমি কোথায় ছিলে?এখন যে বড়ো বড়ো কথা বলছো!
এছাড়াও ওদের একবার সংসারে অভাব দেখা দিয়েছিল।সেবার আমি নিজের টাকায় এক বস্তা চাউল কিনে দিয়েছিলাম।
সব ধুয়ে গেল এখন না?”

আপু কাঁদতে আরম্ভ করলেন রীতিমতো।আমি বুঝলাম না কী এমন বলেছি যে উনার কান্নাকাটি শুরু করতে হবে।

বললাম,”তখন আমার অস্তিত্ব আপনাদের জীবনে ছিল না।থাকলে অবশ্যই সাহায্য করতাম সাধ‍্য মতো।আর ছোট ভাই-বোন থাকলে সবাই মানুষ করে।এটা অভাবনীয় কিছু নয়।”

”ভাই আজকে বাড়িতে আসুক।তার বউ আমায় এতো বড়ো কথা বলে।এর একটা বিহিত করা চাই।
নয় আমি এ বাড়িতে থাকবো।নাহয় ওর বউ।”

আপু কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।

আমি যেন বোকা বনে গেলাম।
ডিমটা ভেজে ঘরে নিয়ে গেলাম।মন খারাপ আমার।চুপচাপ বসে রইলাম।
মিনিট দুয়েক পর লক্ষ্য করলাম সুমা আপু আমার ঘরের সামনে দিয়ে গেল।
আবার মিনিট পাঁচেক পর রিপা এলো ঘরে।
এসেই সোজা আমার কাছে আলমারির চাবি চাইলো।ভ্রু কুচকে তাকালাম ওর দিকে।
ও আবারো চাইলো।
আমি আমতা আমতা করে ড্রয়ারের দিকটা দেখিয়ে দিলাম।
মেয়েটা গুনগুন করতে করতে চাবি নিল।
আলমারি খুললো।
আমার শাড়িগুলো নেড়েচেড়ে দেখলো।গ্রিন রঙের একটি শাড়ি বাহির করে গায়ে রাখলো।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নানান ভঙ্গিমায় দেখলো।
মুখ কুচকে ওটা বিছানায় ছুড়ে দিল।
এরপর আরেকটা নিল।ওটাও পছন্দ হলোনা।
এভাবে আরো দুটো সে ট্রায়াল দিল।শেষে পিংক কালার একটি শাড়ি তার পছন্দ হলো।
আমি এতোক্ষণ ফ‍্যালফ‍্যাল করে তাকিয়ে মেয়েটার কান্ড দেখছি।
রিপা আমার দিকে ফিরে বলল,”এটা কেমন লাগছে আমায় ভাবি?”

ক্ষীণ স্বরে বললাম,”হ‍্যা সুন্দর!
কিন্তু তুমি এভাবে আলমারি খুলে,,,,”

সে সরু চোখে তাকিয়ে বলল,”কেন ভাইয়ের আলমারি আমি খুলতে পারিনা?”

“পারো তবে আমার শাড়িগুলো,,,”

আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সে বলল,”এই শাড়িটা আমার পছন্দ হয়েছে ভাবি।কাল আমার কলেজে প্রোগ্রাম।এটা পড়ে যাবো আমি।”

“সেটা আমায় বলতে পারতে রিপা।এভাবে একজনের আলমারি খুলে শাড়ি নেওয়াটা কী ঠিক?”

“বেঠিকের কী আছে?
বাড়িটা আমার।বাড়িতে থাকা প্রতিটি জিনিস,আলমারি,তাতে থাকা জিনিস পত্র সবই তো আমারই তাহলে তাই না?”

“এভাবে কখনো অধিকার বোধ হয়?
এটা অযাচিত।”

“কেন ভাবি?
তোমার বাড়িকে তুমি আমার বাড়ি বলোনা?”

“বলি ঠিক আছি।তবে এটা তো কথায় কথায়।তাই বলে ঐ বাড়ির প্রতিটি জিনিস আমার ব‍্যক্তিগত হবে এটা নয়।”

রিপা এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,”সামান‍্য একটা শাড়ি নিয়েছি বলে এতো কথা?”

“ওটা সামান্য নয় রিপা।ওটা আমার মৃত দাদির দেওয়া।যিনি আমার বিয়ের দু-মাস আগে মারা গেছেন।
ওটা আমার খুব প্রিয়।দাদির স্মৃতি।তাকে আমি খুবই ভালোবাসতাম।
আমাদের জীবনে কিছু জিনিস থাকে যা ভীষণ স্পেশাল হয়।সেটা হোক কম দামি বা বেশি দামি।আর সেটা যদি হয় প্রিয় মানুষের দেওয়া এবং সে যদি হয় মৃত তাহলে তো কথাই নেই।
নিত‍্য প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস হলেও মনে হয় সেটা বুক দিয়ে আগলে রাখি।
ওটা আমি পড়িনি।মনে ভয় ছিল যদি নষ্ট হয়ে যায়।ওটা আমি গায়ে জড়িয়ে থাকি।কখনো বুকে আগলে বসে থাকি।অনেকের কাছে এসব পাগলামো লাগতে পারে কিন্তু এটা আমার আবেগ।”

বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা রিপা সেই শাড়িটা মাটিতে আছাড় দিয়ে নেকা কান্না কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়।
ইচ্ছে হয়েছে ওকে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় বসাই।ও শুনলো আমার এতো প্রিয় এই শাড়িটা,এতো আবেগের!
আর ও সেটা এভাবে ছুড়ে মারলো।
আমার কলিজায় এসে লেগেছে।
আমার নিজের বোন হলে অবস্থা খারাপ করে ফেলতাম।অবশ‍্য আমার বোন হলে এমন অভদ্র কখনোই হতোনা।
ছোট থেকেই মা-বাবা আমায় অতি সভ‍্যতা সহিত মানুষ করেছেন। ধৈর্য্য শিখিয়েছেন।এজন‍‍্য এখনো শান্ত আছি।তবে এরা যদি আমার ধৈর্য্যর পরিক্ষা নেয় তো ভুল করছে।
যেদিন আমি ধৈর্য্য হারা হবো,শুধু মুখ নয়,প্রয়োজনে হাত ও চালান দেব।
বলতে পারেন আমি বেয়াদব।আমার ওপর চরম জুলুম হলে এই বেয়াদবিটা আমি অবশ্যই করবো।

কঠোর মুখশ্রিতে মেঝে থেকে শাড়িটি উঠিয়ে নিলাম।ধুলো ঝেড়ে আলমারিতে রেখে দিলাম।

সবে বিছানায় বসবো এমন সময় সবাই হাজির।
মা আমায় ছোটলোক থেকে শুরু করে যা তা বলছে।
সামান্য একটা শাড়ির মায়া নাকি ছাড়তে পারছিনা।আমার মন ছোট।অপমান করে তার দু-দুটো মেয়েকে কাঁদিয়েছি।আমার কোনো সহবোধ শিক্ষা আমার মা-বাবা দেয়নি।

এবার আর চুপ থাকিনি।
বললাম,”সহবোধ শিক্ষা দিয়েছে বলেই এতোক্ষণ চুপ ছিলাম।এবার যেহেতু আপনি আমার মা-বাবার শিক্ষা নিয়েই কথা বলছেন তো বলি,আমাকে আমার মা-বাবা যথেষ্ট ভালো শিক্ষায় বড়ো করেছে।আপনি আপনার মেয়েদের দিকে দেখুন।যে কিনা বড়ো ভাবিকে অসম্মান করে।মুখের সামনে শাড়ি ছুড়ে মারে।”

“ভুলটা কী করেছে আমার মেয়ে?
একটা শাড়ি নিয়ে তুমি যা শুরু করেছো তাতে রাগতো হবেই।”

“ওর রাগ দেখানোর লোক আমি নই।
আমার সঙ্গে কথা বলতে হলে ওর অবশ্যই রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলতে হবে।”

মা একটার পর একটা বলেই গেলেন।
আমি আর জবাব দেইনি।কোমর বেধে ঝগড়া করার মতো শিক্ষা আমি পাইনি।
আমার উত্তর আমার দু-তিনটে জবাবেই।কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ অন‍্যকে ছোট করেনা।আঘাত দিয়ে কথা বলেনা।
এবং তর্কও করেনা।

ওরা বলল। আমি চুপ রইলাম।
শেষে সিদ্ধান্ত এলো প্রলয়কে বলে আমায় ভাত ছাড়া করার।
সামান্য হাসলাম আমি।ভাতের ভয় দেখায় আমায়।
অথচ আমার মতো দশটা মেয়ে পালার সক্ষমতা আমার বাবার আছে।তবে আমি আবার কারো টাকায় নয়,নিজে কিছু করতে চাই।ইনডিপেনডেন্ট হতে চাই।এ বছর পড়াটা শেষ হলে চাকরির খোঁজ করবো।

ওরা চলে গেল।
আমি এবার ভাবনায় পড়ে গেলাম প্রলয়কে নিয়ে।ওর দুটো বোন আমার জন্য কেঁদেছে।ও কী আমায় মেনে নেবে এবার?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply