Golpo romantic golpo প্রণয়ে গুনগুন

প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৪


প্রণয়ে_গুনগুন

পর্ব_৪

মুন্নিআক্তারপ্রিয়া


গাল চেপে ধরে রাখার কারণে গুনগুন কথা বলতে পারছে না। প্রণয় ছেড়ে দিল ওকে। গুনগুনের ফরসা গাল লাল হয়ে গেছে। ব্যথাও করছে। হাত নাকি হাতুড়ি আল্লাহ্ ভালো জানে। প্রণয় গুনগুনের হাত ধরল এবার।

“এবার কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।” চিবিয়ে চিবিয়ে বলল গুনগুন।

প্রণয় একদম কোনো তোয়াক্কা করল না। আর একটা কথাও বলল না গুনগুনের সাথে। নিশ্চুপ থেকেই হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। বাড়ির সামনে গিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে একটি নাম্বারে কল দিয়ে বলল,

“হ্যালো কুলসুম? বাইরে বের হ তো।”

ওপাশ থেকে কী বলল গুনগুন শুনতে পায়নি। তবে প্রণয় বলল,

“দরকার আছে। বের হ। বলতেছি পরে।”

ফোন রেখে একবার গুনগুনের দিকে তাকাল প্রণয়। গুনগুন পারছে না শুধু ওকে পি’টি’য়ে হাত-পা ভে’ঙে দিতে! কটমট করে তাকিয়ে আছে। প্রণয়ের রাগের সাথে মজাও লাগছে। অন্তত আজকের জন্য হলেও তো সে গুনগুনকে কাবু করতে পেরেছে। প্রণয়কে মিটিমিটি হাসতে দেখে গুনগুন ধমক দিয়ে বলল,

“হাসছেন কেন?”

প্রণয় বলল,

“এমনি।”

“আমার হাত ছাড়ুন।”

“দেখো, সাপের মতো এমন ঠান্ডা হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো ইচ্ছে আমার নিজেরও নেই। একইসাথে তোমার সাথে দৌঁড়াদৌঁড়ি করার মুডও নাই। হাত ছাড়লেই তো চড়ুইপাখির মতো দিবা উড়াল। কে দৌঁড়াবে তখন তোমার পেছনে?”

“আমার পিছু আপনি নিচ্ছেন কেন?”

প্রণয় কাঁধ নাচিয়ে বলল,

“নিজেও জানিনা।”

গুনগুন আর কিছু বলতে পারল না। তার আগেই কুলসুম মেয়েটি চলে এসেছে। পাতলা গড়নের ধবধবে ফরসা মেয়েটি। হালকা নিয়ন বাতির আলোতেও কুলসুমের সৌন্দর্য যেন ঠিকরে বের হচ্ছিল। গুনগুন কয়েক সেকেন্ড পরখ করল ওকে।

কুলসুম ফিসফিস করে প্রণয়কে বলল,

“এত রাতে বাইরে আসতে বললি কেন? আর এই মেয়ে কে?”

এত বিস্তারিত কথায় না গিয়ে প্রণয় ডিরেক্ট বলল,

“আজকের রাতটা ওকে তোর বাসায় রাখ। বাকিটা পরে ফোনে বলব।”

এরপর গুনগুনের দিকে তাকাল। ওর ভাবগতি ভালো না। একদম যাওয়ার ইচ্ছে নেই ভেতরে। যদিও কুলসুম মেয়েটাকে ওর খারাপ মনে হচ্ছে না, তবুও ভয় লাগছে। শত হোক, প্রণয়ের ফ্রেন্ড বলে কথা! একদবার যদি ভেতরে নিয়ে…! না, গুনগুন আর ভাবতে পারছে না। প্রণয় ফের ধমক দিয়ে বলল,

“কোন টালবাহানা করবা না। যাও।”

প্রণয় নিজেই গুনগুনের হাতটা কুলসুমের হাতের মুঠোয় দিয়ে দিল। এতক্ষণ কুলসুম হতবাক ছিল এবার আঁতকে উঠে গুনগুনকে বলল,

“তোমার হাত এত ঠান্ডা কেন? র’ক্ত নাই শরীরে?”

গুনগুন জবাব দিল না। কুলসুম ওকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পর পুরো বাড়িটা এক নজরে দেখে নিল গুনগুন। জিজ্ঞেস করল,

“কে কে থাকে এখানে?”

দুই রুমের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট। একদম ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আর কেউ আছে নাকি বোঝা যাচ্ছে না। থাকলেও এতক্ষণে অবশ্যই ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত তো আর কম হয়নি!

কুলসুম গুনগুনের জন্য চুলায় চায়ের পানি বসাল। এরপর ওর পাশে বসে বলল,

“আমি একাই।”

“একা?” গুনগুনের কণ্ঠে বিস্ময়।

কুলসুম হেসে বলল,

“হ্যাঁ, আপাতত। আমার হাজবেন্ড আসে প্রতি সপ্তাহে।”

“ওহ ম্যারিড আপনি। কোথায় থাকে আপনার হাজবেন্ড?”

“ও সিলেটে জব করে। আচ্ছা তোমার নাম কী? নামটাই তো জানা হলো না এখনো।”

“গুনগুন।”

“ওয়াও! খুব সুন্দর নাম তো। তোমার মতোই মিষ্টি। কে রেখেছে এই নাম?”

গুনগুন এবার একদম দমে গেল। চেহারায় ফুটে উঠল একরাশ হতাশা। চোখ দুটো আবার ছলছল করছে। ওর নাম ওর বাবা রেখেছিল। খুব আদর করে রেখেছিলেন নামটা। এখন তো গুনগুন তার চোখের বি’ষ। কুলসুম হঠাৎ করে বিব্রত হয়ে গেল। থতমত খেয়ে বলল,

“গুনগুন? এনিথিং রং? আমি বোধ হয় তোমাকে কোনোভাবে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আ’ম সরি।”

গুনগুন আঙুলের ডগা দিয়ে চোখের পানি মুছে বলল,

“না, না ইট’স ওকে।”

“তুমি বসো আমি চা নিয়ে আসছি। এত রাতে যে তোমাকে কী খেতে দেবো!”

“আমি কিছুই খাব না, আপু। রাতে খেয়েছি। আর চা বানাবেন না প্লিজ! আমি চা খাই না।”

“যা বাব্বাহ্! চা খায় না এমন মানুষও আছে দুনিয়ায়! আচ্ছা তাহলে নুডলস্ বানিয়ে দেই?”

“না, আপু। কিছুই করতে হবে না। আপনি বসুন এখানে।”

একটু থেমে গুনগুন বলল,

“আপু, আপনার কি ল্যাপটপ আছে?”

কুলসুম ঠোঁট উলটে বলল,

“না গো! আমার হাজবেন্ডের আছে। কিন্তু এটা তো এখন ওর কাছেই সিলেটে।”

গুনগুন হতাশ হয়ে বলল,

“ওহ!”

“ল্যাপটপ দিয়ে কী করবে?”

“আমার সকালে একটা প্রেজেন্টেশন আছে। স্লাইড বানাতে হবে।”

কুলসুমের মনের ভেতর অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করবে কিনা বুঝতে পারছে না। তখন নামের কথা জিজ্ঞেস করাতেই যেভাবে কেঁদে ফেলল! যদি আবার কাঁদে?

আপাতত ওকে কোনো প্রশ্ন না করে কুলসুম বলল,

“ফোন দিয়ে বানাতে পারবে? তাহলে আমার দুটো ফোন। একটা তোমাকে দিচ্ছি।”

“চেষ্টা করে দেখতে পারি।”

“ঠিক আছে। কিছু যখন খাবেই না তখন রুমে চলো। ঠান্ডার মধ্যে এখানে আর বসে থাকতে হবে না।”

রুমে নিয়ে কুলসুম বালিশের নিচ থেকে একটা ফোন বের করে দিল গুনগুনকে। ফোন দিয়ে কীভাবে প্রেজেন্টেশন বানাতে হয় দেখার জন্য ইউটিউবে গেল গুনগুন। চোখ দুটো ঘুমে জ্ব’ল’ছে। সকাল হলে সে কী করবে, কোথায় যাবে কিছুই জানে না। তবে আপাতত সে কোনো বাড়তি দুশ্চিন্তাও করতে চাচ্ছে না। আগে সকালে প্রেজেন্টেশনটা দেবে। তারপর যা ভাবার ভাবা যাবে।

গুনগুনকে ঘরে রেখে কুলসুম আবার রান্নাঘরে গেল। ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে পানিতে ভিজিয়ে, নুডলস রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দুধ গরম করে দেবে আর নুডলস্ রান্না করে দেবে। ঐ সময়ে প্রণয় কল দিয়েছে। কুলসুম ফোন রিসিভ করে কাজ করতে করতে বলল,

“একটুপর আমিই তোকে কল দিতাম।”

“বিজি নাকি তুই?”

“না। বল।”

“বো’ম-টা কী করে?”

কুলসুম হকচকিয়ে বলল,

“বো’ম মানে?”

“আরে গুনগুনের কথা বলছি।”

কুলসুমের একটু খটকা লাগছে। সে বলল,

“কাহিনি কী বল তো? এই মেয়ের সাথে তোর পরিচয় কীভাবে? কী হয় তোর?”

“আরে বা’ল থাম! একসাথে এত প্রশ্ন করলে উত্তর দেবো কীভাবে? থেমে থেমে বল।”

“থামাথামির সময় নাই। প্রশ্নে মাথায় জট পাকিয়ে গেছে। কী অদ্ভুত মেয়ে! নাম শুনে জিজ্ঞেস করলাম, এত সুন্দর নামটা কে রেখেছে? কান্না করে দিল! আমি কি কান্না করার মতো কিছু বলেছি? আবার চা বানাতে চাইলাম, বলল চা নাকি খায় না! আবার জিজ্ঞেস করতেছে ল্যাপটপ আছে নাকি। স্লাইড বানাবে। এত রাতে ওকে কোত্থেকে আনলি তুই? স্লাইড বানাবে, প্রেজেন্টেশন আছে তাহলে তোর সাথে কেন? আমার কিন্তু মাথা ঘুরাচ্ছে, প্রণয়!”

প্রণয় দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,

“তোকে ঐদিন বললাম না এক মেয়ে মাসুদকে মে’রে’ছিল? এটাই ঐ মেয়ে।”

কুলসুম বিস্মিত হয়ে বলল,

“ওর সাথে তাহলে তোর কী চলে?”

“আজব! কী চলবে? এই মেয়ে অনেক ক্যাচাল করছে আমার সাথেও। সতর্ক করার জন্য ওর বাপরে বলছিলাম। পরে মনে হয় এই রাগেই বাড়ি থেকে বের করে দিছে।”

কুলসুম এবার আরো বেশি অবাক হলো। সে বিস্ময় আটকে রাখতে না পেরেই বলল,

“কী বলস এসব? এজন্য এত বড়ো একটা মেয়েকে এই মাঝরাতে বাড়ি থেকে বের করে দিবে? এটা কি আসল বাপ?”

“আমি কেমনে বলব? এত কিছু কি আমি জানি নাকি। আর আমিও তো বুঝি নাই যে, ওরে বাড়ি থেকেই বের করে দিবে। আমি ভাবছি, ধমক-টমক দিয়ে হয়তো সতর্ক করে দিবে।”

“কী এক কাহিনি! পরে ওরে পাইলি কই তুই?”

“সিগারেট কিনতে বের হইছিলাম। তখন দেখলাম ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে। এত রাতে আর কোথায় যাবে? তাই তোর কাছে নিয়ে এসেছি।”

“বাহ্ বাহ্ বাহ্! ঘর ছাড়া করে এখন আবার উপকার করা হচ্ছে?”

“আমার কোনো দোষ নাই এখানে। কোনো বাপ এমন হইতে পারে আমার ধারণাতেও ছিল না। আচ্ছা বাদ দে এখন এসব। ওরে ল্যাপটপ দিছিস?”

“কই থেকে দিমু? ল্যাপটপ তো তোর ভাইয়ের কাছে। এখন আমার ফোন দিলাম একটা। বলল চেষ্টা করে দেখবে বানাতে পারে কিনা।”

“প্রেজেন্টেশন কবে?”

“বলল তো সকালে।”

“আচ্ছা পাঁচ মিনিট পর ফোন দিলে নিচে নামিস। আমার ল্যাপটপ দিয়ে যাচ্ছি।”

কুলসুম মজা নিয়ে বলল,

“কী ব্যাপার মামা? বিষয় তো সুবিধার লাগছে না।”

“থা’প্প’ড় দিয়ে কান লাল করে ফেলব তোর। কোনো কাহিনি নাই। ফোন দিলে নিচে নামিস।”

ঠিক ঠিক পাঁচ মিনিট পর কল দিল প্রণয়। কুলসুম ল্যাপটপ এনে রুমে গেল। গুনগুনকে জিজ্ঞেস করল,

“বানাইতে পারতেছ?”

গুনগুন হতাশ হয়ে বলল,

“না! হচ্ছে না।”

কুলসুম শালের ভেতর থেকে ল্যাপটপ বের করে বিছানার ওপর রেখে বলল,

“নাও।”

গুনগুন অবাক হয়ে বলল,

“ল্যাপটপ কোথায় পেলেন?”

“প্রণয় দিয়ে গেল।”

গুনগুন এবার আরো বেশি অবাক হলো। তবে কুলসুমকে বুঝতে দিল না। আপাতত ওর কাজ করাটা জরুরী। ল্যাপটপ ওপেন করতেই হোয়াটসএপে একটা মেসেজ এলো। প্রণয়ের প্রাইভেসির কথা ভেবে মেসেজ সিন করেনি গুনগুন। কিন্তু বারবার মেসেজ আসার জন্য গুনগুন হোয়াটসএপে ঢুকল। সেইভ ছাড়া নাম্বার থেকে একই মেসেজ বারবার আসছে এখনো। গুনগুন ইনবক্সে ঢুকে মেসেজ দেখল,

“আমি প্রণয়। স্লাইড বানাতে ল্যাপটপ দিলাম। কাজ শেষ হলে ফিরিয়ে দিবা। নিজের মনে করে আবার রেখে দিও না।”

এই একটা মেসেজই মনে হয় ২০+ বার পাঠিয়েছে। সিন করার পর প্রণয় আরেকটি মেসেজ দিলল,

“রাগি হলেও তোমার ম্যানার্স আর পার্সোনালিটি আছে বলে মনে হয়েছে। আমার ল্যাপটপ বলে যদি আবার মেসেজ না দেখো তাই একসাথে এতগুলো মেসেজ পাঠিয়েছি। যাতে করে বাধ্য হয়ে অথবা বিরক্ত হয়ে হলেও মেসেজটা দেখো। যাই হোক, কাজ করো বাই।”

গুনগুন হতবাক হয়ে মেসেজটির দিকে তাকিয়ে আছে।

চলবে…

[গুনগুনের প্রেজেন্টেশন কেমন হবে জানি না। তবে কাল আমার একটা প্রেজেন্টেশন আছে। এরমধ্যেও আপনাদের জন্য গল্প লিখলাম। দোয়া করবেন। প্রেজেন্টেশন ভালো না হলে আবার প্রণয়কে মা’র’ব! আমার না, গুনগুনের প্রেজেন্টেশন খারাপ হলে আরকি!😛]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply