Golpo romantic golpo প্রণয়ে গুনগুন

প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৩


প্রণয়ে_গুনগুন

পর্ব_৩৩

মুন্নিআক্তারপ্রিয়া


সময়কে কেন বেঁধে রাখা যায় না এটা নিয়ে এই প্রথমবারের মতো খুব করে আফসোস হচ্ছে গুনগুনের। কীভাবে কীভাবে যেন চোখের পলকে সময়গুলো চলে গেল। আইইএলটিসের রেজাল্ট এলো, ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করল, ভর্তি হলো, সব প্রসেস শেষ করে আগামী সপ্তাহে তার ফ্লাইটের ডেটও চলে এলো। এর মাঝে অনেকগুলো দিন কেটে গেলেও, গুনগুনের কাছে মনে হচ্ছে সময় একদমই অল্প গিয়েছে। প্রণয়কে ছেড়ে যেতে হবে এই হাহাকার, শূন্যতা গুনগুনকে এখন সব থেকে বেশি পোড়াচ্ছে।

তবে প্রণয় খুব স্বাভাবিক আছে। বিজনেস সামলাচ্ছে, গুনগুনকে সময় দিচ্ছে। মাঝে মাঝে দুজনে একসাথে ঘুরতেও যাচ্ছে। এইযে তার এত স্বাভাবিকতা, এর মাঝেও যে কতটা অস্বাভাবিক অবস্থায় তার মনটা রয়েছে এটা প্রণয় ছাড়া আর কেউই জানে না। তার হঠাৎ হঠাৎ খুব করে বলতে ইচ্ছে করে, ‘তুমি যেও না।’ ঠিক তখনই আবার গুনগুনের হাসিমাখা মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সে কীভাবে গুনগুনকে দুঃখ দেবে? আর কীভাবেই বা নিজের হাতে ওর স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে মারবে? তার ভালোবাসা সত্য। কোনো ঠুনকো বিষয় নয়। এমনকি সে গুনগুনকেও নিজের থেকে অধিক বেশি বিশ্বাস করে। আর যা-ই হয়ে যাক না কেন, গুনগুন কখনো ওর বিশ্বাস ভাঙবে না এটুকু সে খুব ভালো করেই জানে।

গুনগুন চলে যাবে বলে আজ সবাইকে বাসায় দাওয়াত দিয়েছে প্রণয়। গুনগুন তাই সকাল সকাল উঠে রান্না করতে চেয়েছে। প্রণয় অবশ্য কোনো রান্না করতে দেয়নি। সব খাবার নিজের রেস্টুরেন্ট থেকে নিয়ে আসবে।

শোয়েব শিকদার, পমিলা বেগম, কুলসুম ও মাসুদ এসেছে। বিপ্লবের এখন ছুটি নেই বলে আজ আসতে পারেনি। গুনগুনের খুব আশা ছিল, আজ অন্তত বাবা আসবে। কিন্তু আসেনি! সবাই চলে আসার পর গুনগুন অনেকক্ষণ ধরে দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস নিল। হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুঃখটা আর কেউ টের না পেলেও প্রণয় ঠিকই টের পেয়েছে। তবে ঘরভরা মানুষজন আছে বলে তখন আর কিছু বলল না।

টেবিলে সবাইকে খাবার সার্ভ করার সময় বাড়ির কলিংবেল বাজার শব্দ শুনে গুনগুন গিয়ে দরজা খুলে দেখে, শিহাব এসেছে। হেসে বলল,

“এত দেরি করলি কেন?”

শিহাব জুতা খুলে ভেতরে ঢুকে বলল,

“সরি আপু, একটু দেরি হয়ে গেল।”

গুনগুন দরজা লাগিয়ে দিচ্ছিল শিহাব তখন বলল,

“দরজা লাগাইও না। আব্বু আসতেছে।”

নিজের কানকে ঠিক বিশ্বাস হলো না গুনগুনের। তাই আরেকবার জানতে চাইল,

“কী? কে আসছে?”

“আব্বু।”

শিহাব উত্তর দিতে দিতেই ওসমান গণি দুহাত ভরে মিষ্টির বাক্স নিয়ে লিফ্ট থেকে বের হলেন। গুনগুনের দুচোখে পানি টলমল করছে। সে প্রাণপণে চাইছে কান্না আটকে রাখতে। ওসমান গণিকে দেখে প্রণয় এগিয়ে গিয়ে সালাম দিল। মিষ্টির প্যাকেটগুলো নিজের হাতে নিল। ওসমান গণির মাঝেও কেমন যেন একটা জড়তা কাজ করছে। নিজের মেয়ের সামনেও সে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না। কিছুক্ষণ উশখুশ করে জিজ্ঞেস করলেন,

“কেমন আছিস?”

কান্নাটুকু গিলে ফেলে গুনগুন জবাব দিল,

“ভালো, তুমি?”

“ভালো।”

প্রণয় বলল,

“ভেতরে আসুন।”

ভেতরে নিয়ে বাবা-মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল প্রণয়। এই প্রথমবার দুই পরিবার পরিচিত ও মুখোমুখি হলো। শোয়েব শিকদারকে দেখে বোঝার উপায়ই নেই যে, তিনি প্রণয়ের আপন বাবা নন। বেশ অমায়িক ভঙ্গিতে তিনি ওসমান গণির সাথে হেসে হেসে কথা বলছেন। দুজনে বসেছেও পাশাপাশি। প্রণয় নিজেও অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখছে।

গুনগুনের সাথে প্রণয় সবাইকে খাবার সার্ভ করছিল। পমিলা বেগম বললেন,

“তোরাও বসে পড় আমাদের সাথে।”

গুনগুনকে বসিয়ে পাশের চেয়ারে প্রণয় বসল। সবাই খেতে খেতে গুনগুনের বাইরে যাওয়া নিয়ে কথা বলছে। ওসমান গণির কাছে খবরটা আরো আগেই গিয়েছে। তবুও এতদিন তিনি পাথর হয়ে ছিলেন। কিন্তু এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি। প্রণয়ের দাওয়াতকে অজুহাত বানিয়ে মেয়ের কাছে ছুটে এসেছেন। তিনি খেতে খেতে লক্ষ করলেন, প্রণয় নিজের হাতে তুলে গুনগুনকে খাইয়ে দিচ্ছে। কোনো সংকোচ নেই, জড়তা নেই। শুধু চোখে-মুখে আছে গুনগুনের জন্য অবাধ ভালোবাসা। প্রণয় ও গুনগুন মিলে সত্যিই তার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করতে পেরেছে।


গুনগুনের বাসার বারান্দায় একটা চেয়ার পেতে বসে আছেন ওসমান গণি। পাশেই মাঝারি সাইজের একটা দোলনা। আর্টিফিশিয়াল লতাপাতা ও ফুল দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। ছোটোবেলা থেকেই গুনগুনের দোলনা খুব পছন্দ ছিল। একবার কোথাও দোলনা পেলে না চড়তে পারা পর্যন্ত শান্ত হতো না। ছোটোবেলার কথাগুলো মনে হতেই তার বুকচিরে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

তিনি হাত ঘড়িতে সময় দেখলেন। বারান্দায় এসে দশ মিনিটের মতোন হবে বসে আছেন। গুনগুন এখনো আসছে না কেন? শিহাব দোলনায় বসে দোল খাচ্ছিল। তিনি ছেলেকে বললেন,

“যা তো তোর আপুকে ডেকে নিয়ে আয়।”

ডাকতে যাওয়ার আগেই গুনগুন চলে এসেছে। শিহাব উঠে গুনগুনকে বসতে বলল। গুনগুন বলল,

“তুই বোস।”

শিহাব খুশি হয়ে বলল,

“দোলনাটা খুব সুন্দর আপু। একদম তোমার মতো।”

গুনগুন মুচকি হাসল। বাবার সামনে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,

“চা খাবে? চা আনব?”

ওসমান গণি সংকোচ নিয়ে বসে আছেন। চোখে চোখ রাখতে পারছেন না মেয়ের। গুনগুন নিজেও এই অস্বস্তি টের পাচ্ছে। জড়তা কাটিয়ে ওসমান গণি মেয়ের হাত ধরে বললেন,

“আমার পাশে বোস।”

গুনগুনের বুকটা হুহু করে উঠল। চোখ টলমল করছে। শিহাবকে কোলে নিয়েই সে দোলনায় বসল। ওসমান গণি মেয়ের হাত ধরে বললেন,

“আমি খুব খারাপ বাবা তাই না রে?”

গুনগুন নিরুত্তর। তার গলা কাঁপছে। ওসমান গণি নিজেই বললেন,

“তোর সাথে, তোর মায়ের সাথে আমি অনেক অন্যায় করেছি। আমাকে যে তুই অনেক ঘৃণা করিস আমি জানি। অবশ্য আমি তো কাজ সব ঘৃণা করার মতোই করেছি। সবসময় ভাবতাম তোকে বাড়ি থেকে তাড়াতে পারলে হয়তো শান্তি পাব। তাই উঠেপড়ে লেগেছিলাম, তোর বিয়ের জন্য। আমার অপছন্দে, অমতে বিয়ে করলি। তবুও স্বস্তি পাচ্ছিলাম অন্তত বাড়ির অশান্তিটা তো কমেছে। কিন্তু বিশ্বাস কর মা, তুই বাড়ি থেকে চলে আসার পর বুঝতে পারলাম, বাড়ির সেই অশান্তিটাই এখন আমি মিস করি। তোর কড়া কড়া কথাগুলো মিস করি। মাঝে মাঝেই তোর রুমে গিয়ে চুপ করে বসে থাকি। তোর বই-খাতাগুলো ছুঁয়ে দেখি। কতবার তোকে আমি দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি তুই হয়তো জানিসও না। এতকিছুর পরও কখনো তোর সামনে আসতে পারতাম না। আত্ম-অহংকার, চক্ষুলজ্জা দুটোই কাজ করত। কিন্তু আর পারলাম না আটকে রাখতে নিজেকে।”

ওসমান গণির চোখে পানি। তিনি কাঁদছেন। গুনগুনও কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“এখন তাহলে কেন এসেছ? না আসতে। আমি একদম ম’রা’র পরই আসতে। তখন দেখতাম না, জানতামও না কিছু। তোমার আত্ম-অহংকার জিতে যেত।”

ওসমান গণিও কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“এভাবে বলিস না রে মা, আমি খারাপ বাবা আমি জানি। ক্ষমার অযোগ্যও হয়তো। কিন্তু সন্তানের লাশের ভার নেওয়ার ক্ষমতা আমার নাই।”

বাবা ও বোনকে কাঁদতে দেখে ছোট্ট শিহাবও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বারান্দার ঐপাশে আড়ালে দাঁড়িয়ে বাবা-মেয়ের মান-অভিমানের পারদ কীভাবে তরতর করে গলছে সেটাই দেখছে প্রণয়। সে উদ্দেশ্যজনিতভাবে দেখতে আসেনি। এসেছিল ওসমান গণির জন্য চা নিয়ে। কিন্তু তার উপস্থিতিতে যদি সব আবার এলোমেলো হয়ে যায়? তাই আর সামনে যায়নি। বাবা-মেয়েকে সময় দিয়েছে।

বিকেলের দিকে সবাই বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠে পড়ল। শোয়েব শিকদার চলে যাওয়ার সময় গুনগুনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“তুমি চন্দনের মতো, মা। যেখানে যাও সুবাস ছড়াও। এই যেমন হঠাৎ করে এসে আমার মা হয়ে গেলে। আমার কঠিন হৃদয়কে আচানক অজানা জাদুবলে নরম করে ফেললে। কিন্তু এখন আবার ঠিকই দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে চলে যাওয়ার জন্য রেডি হয়েছ। এক মা তো সারাজীবনের জন্যই চলে গেল। আর এখন আমার আরেক মা দেশ ছেড়েই চলে যাচ্ছে।”

গুনগুন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তিনি চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন,

“বোকা মেয়ে। না, সরি! বোকা মা আমার, কান্না কোরো না। আমরা সবাই তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকব।”

ওসমান গণিও যাওয়ার আগে গুনগুন ও প্রণয়কে বলে গেলেন,

“মেয়েকে জামাইসহ নিতে আসব বাড়িতে। দেশ ছাড়ার আগে মেয়েটাকে একবার নিজের বাসায় নিতে চাই। তোমার কোনো সমস্যা নেই তো প্রণয়?”

প্রণয় মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না। একদম না।”

“ঠিক আছে। তাহলে আগামীকাল আসছি তোমাদের নিতে।”

“আপনার আসতে হবে না কষ্ট করে। আমরাই চলে আসব।”

“সত্যি তো? কথা দিচ্ছ?”

“দিচ্ছি।”

“ঠিক আছে। আজ তাহলে আসছি।”

বাড়ির নিচ অবধি সবাইকে এগিয়ে দিতে নেমেছে প্রণয় ও গুনগুন। কুলসুম ওর অ্যাপার্টমেন্টে চলে গেছে। ওসমান গণি শিহাবকে নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন বিদায় নিয়ে। প্রণয় শোয়েব শিকদার ও পমিলা বেগমকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গিয়েছে। মাসুদ একা দাঁড়িয়ে আছে গুনগুনের পাশে।

বাড়িতে ঢোকার সময় হঠাৎ করে মাসুদের দিকে তাকিয়ে, থমকে গিয়ে বলল,

“কিছু বলবেন?”

মাসুদ মাথা চুলকাচ্ছে। সত্যি বলতে বাকি সবার মতো মাসুদেরও এখন খারাপ লাগছে। গুনগুনের সাথে তার সাপে-নেউলে সম্পর্ক থাকলেও সে গুনগুনকে পছন্দ করে। হতে পারে মেয়েদের সম্পর্কে তার ধারণা তিক্ত কিন্তু সে প্রণয়ের কথা ভেবেই চাইত, গুনগুন দেশের বাইরে না যাক, কিংবা প্রণয় রাজনীতি করুক। ইসরাতের সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার পরই মাসুদ ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছে, যেকোনো সম্পর্কের মূল ভিতটাই হচ্ছে বিশ্বাস ও সম্মান। যখন কোনো ব্যক্তির প্রতি বিশ্বাস থাকে না তখন সম্মানটাও ঠুনকো হয়ে যায়। নিজের ভুল বুঝতে বুঝতে গুনগুনেরও দেশ ছাড়ার সময় এসে পড়েছে।

লম্বা শ্বাস নিল মাসুদ। শার্টের কলার ঠিক করে, মাথা নতে করে বলল,

“আমারে তুমি মাফ কইরা দিও।”

গুনগুন বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“মাফ চাচ্ছেন কেন?”

“কত ভুল করছি, উলটা-পালটা কথা কইছি তার তো কোনো হিসাব নাই।”

গুনগুন কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণে শব্দ করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল,

“ধুর! এসব মনে রেখে বসে আছে কে? আমার বড়ো কোনো ভাই নেই। বিপ্লব ভাইয়া এবং আপনাকেই আমি বড়ো ভাইয়ের আসনটা দিয়েছি। হতে পারে আপনার সাথে আমার কথা কাটাকাটিই বেশ হয়, কিন্তু ভাই তো মানি।”

গুনগুনের মুখে এই কথাটা শোনার পর আরো বেশি অনুতপ্ত হচ্ছে মাসুদ। যেই মেয়েটা তাকে ভাইয়ের জায়গা দিয়েছে, তাকে নিয়েই কিনা মাসুদ কত উলটা-পালটা কথা বলেছিল প্রণয়কে! হায়রে! সবই নির্বুদ্ধিতা ও স্বল্প জ্ঞানের ফল।

বাবা-মাকে এগিয়ে দিয়ে এসে প্রণয় বলল,

“কী নিয়ে দুজনে এত হাসাহাসি করছ?”

মাসুদ বলল,

“তোর এতকিছু জানা লাগব না।”

“অবশ্যই জানা লাগবে। আমার বউ, আমি জানব না তো কে জানবে?”

“তুই চুপ থাক বউ পাগল।”

প্রণয়কে ধমক দিয়ে মাসুদ গুনগুনকে বলল,

“আমার বন্ধু তোমারে অনেক বেশি ভালোবাসে। কোনো সময় ওরে দূরে সরাইয়া দিও না। ওরে ওর মতো ভালো না বাসতে পারলেও একটু ভালোবাইসো। ও শুধু একটুখানি ভালোবাসার কাঙাল। ভালোবাসা ছাড়া আর কিচ্ছু চায় না তোমার কাছে।”

প্রণয় মাসুদকে ধমক দিয়ে কাঁধে হাত দিয়ে বলল,

“হপ ব্যাটা! চুপ থাক।”

গুনগুন লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিল। ঠোঁটে মেকি হাসি ঝুলিয়ে বলল,

“আপনার বন্ধু যতদিন দেশে থাকবে ততদিন ওকে দেখে-শুনে রাখার দায়িত্ব আপনার। খুব তো আমাকে সতিন, সতিন বলতেন। এবার দেখব আমার অবর্তমানে ওর কেমন দেখভাল করেন আপনি।”

মাসুদ হেসে ভাব নিয়ে বলল,

“তুমি কোনো চিন্তা কইরো না। আমি ওর লগেই থাকমু। এক লগে ঘুমামু। জামা-কাপড় ধুইয়া দিমু। রাইন্দা দিমু। খাওয়াইয়াও কি দেওয়া লাগব?”

প্রণয় ফের ধমক দিয়ে বলল,

“অ্যাই শা’লা তুই কি আমার বউ? নাকি আমারে তোর গে মনে হয়? খবরদার! তুই আমার সাথে থাকতে আসবি না।”

“এখন খুব ভাব ধরতাছোস না? ধর। দুইদিন পর কাইন্দা বুক ভাসানোর লেইগা খালি আমার বুকটাই পাবি বুঝস নাই?”

“ঐ তুই বাসায় যা। যা। ভাগ। কুইক। চোখের সামনে থেকে দূর হ।”

“হ, হ যাইতাছি। তোগো রাসলীলা দেখার লেইগা বইসা আছি নাকি? হুহ্!”

মাসুদ ভেংচি কেটে চলে গেল। গুনগুন হাসছে। প্রণয় ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ওয় এমন করে ক্যান?”

গুনগুন হাসতে হাসতে লিফ্টের দিকে আগাচ্ছে। বলল,

“আপনার বন্ধু আপনি ভালো জানেন।”

“বাদ দাও। তখন তোমরা এত হাসাহাসি করছিলে কেন?”

“হাসা বারণ?”

“না। কিন্তু কী নিয়ে হাসছিলে?”

“আপনার জানতে হবে না।”

বলে গুনগুন লিফ্ট থেকে নামল। প্রণয় ক্ষিপ্ত হয়ে পিছু পিছু এসে বলল,

“কেন জানতে হবে না হু?”

গুনগুন দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকল। প্রণয়ও এলো সাথে সাথে। সে তখনো গম্ভীর হয়ে আছে। গুনগুন সোজা বেডরুমে চলে গেল। প্রণয়ও এলো সাথে। বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে বলল,

“বলছ না কেন?”

গুনগুন মুখ ঘুরিয়ে মিটমিট করে হাসছে। প্রণয় তখনো বারবার জানার জন্য প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। গুনগুন প্রণয়ের দিকে ঘুরে মাথায় হাত রেখে বলল,

“এত কেন ভালোবাসেন আমায়?”

প্রণয় থমকে গেল। মাথায় হাত রাখাটা তার সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা। ওর মনে আছে, বিয়ের আগে একবার গুনগুনের কাছে আবদার করেছিল মাথায় হাত রাখার জন্য। কারণ তখন তার ছন্দহীন এলোমেলো জীবনে কেউ ছিল না একটুখানি মাথায় হাতের পরশ দেওয়ার জন্য। গুনগুন জীবনে বউ হয়ে আসার পর অনেক কিছু বদলে গিয়েছে। বদলে গিয়েছে স্বয়ং প্রণয় নিজেও। এই মেয়েটাকে সে কীভাবে বোঝাবে ওকে এতটা ভালোবাসার কারণ মেয়েটা নিজেই! এইযে ওর একটুখানি ভরসার স্পর্শ। কেউ তো দেয়নি আগে। তার যে নিজেকে বদলানো উচিত, বলেনি তো আগে কেউ। গুনগুনের আগে কেউ তো তাকে এভাবে ভালোবাসেনি।

উত্তর না পেয়ে গুনগুন হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,

“আচ্ছা আজ আমরা বাড়িতে নতুন কিছু রান্না করি চলুন? কী রান্না করা যায়? ওয়েট, ইউটিউবে সার্চ দেই।”

গুনগুন বিছানার ওপর থেকে ল্যাপটপ নিতে যাওয়ার সময় প্রণয় বলল,

“তুমি।”

গুনগুন কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। প্রণয় গুনগুনের হাতটা নিয়ে নিজের মাথায় রেখে বলল,

“তোমাকে এত ভালোবাসার কারণ তুমি নিজেই।”

গুনগুন মায়া মায়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। প্রণয় ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এভাবে কী দেখছ বলো তো? আমাকে কি বেশি সুন্দর লাগছে আজ? তোমার সিরাম মেখে মনে হয় লাভ-ই হচ্ছে।”

“ধুর!” বলে প্রণয়ের বুকে ধাক্কা দিয়ে হাসতে হাসতে গুনগুন সরে গেল।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply