Golpo romantic golpo প্রণয়ে গুনগুন

প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩২


প্রণয়ে_গুনগুন

পর্ব_৩২

মুন্নিআক্তারপ্রিয়া


গতকাল রাত থেকে গুনগুন ভীষণ নার্ভাস ছিল। আজ তার আইইএলটিস পরীক্ষা আছে। এতদিন যতটা পরিশ্রম করেছে, এখন মনে হচ্ছে সব বৃথা যাবে। ভয় লাগছে ভীষণ। এতটাই ভয় সে পাচ্ছিল যে, তার কনফিডেন্স কমে যাচ্ছিল।

প্রণয় অনেকক্ষণ যাবৎ গুনগুনকে লক্ষ করছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের হাতা ভাঁজ করতে করতে দেখতে পাচ্ছে, গুনগুন কেমন যেন ছটফট করছে। প্রণয় এগিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গুনগুন তখন খাটের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে। প্রণয় খুব আলতো করে গুনগুনের মাথায় হাত রেখে বলল,

“এত টেনশন নিচ্ছ কেন?”

গুনগুন প্রণয়ের হাত ধরে বলল,

“জানি না। ভয় করছে কেন জানি। সব ঠিকঠাক হবে তো?”

“আরে সব ভালোই হবে। তুমি রাত-দিন এক করে এত পড়েছ, সব তো আর বিফলে যাবে না। তুমি কোনো চিন্তা করো না।”

গুনগুন একটু সাহস পেলেও স্থির হতে পারছিল না। প্রণয় হাত ঘড়িতে সময় দেখে বলল,

“চলো, আমাদের এখন বের হতে হবে।”

গুনগুন মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। প্রণয় ওকে পৌঁছে দিয়ে আবার রেস্টুরেন্টে আসবে। গুনগুনের পরীক্ষা শেষ হলে তখন আবার নিয়ে আসবে।

ব্রিটিশ কাউন্সিল সেন্টারের সামনে গুনগুনকে নামিয়ে দিল প্রণয়। বাইক থেকে নেমে পাসপোর্ট, কনফার্মেশন ই-মেইল আরেকবার চেক করে নিল গুনগুন। প্রণয় দেখছিল চুপচাপ। গুনগুন সব ঠিক আছে দেখে বলল,

“আসছি।”

প্রণয় মৃদু হেসে বলল,

“অল দ্য বেস্ট, বউ।”

জবাবে গুনগুনও মুচকি হাসল। যাওয়ার আগে বলে গেল,

“থ্যাঙ্কিউ, বর।”


প্রণয় রেস্টুরেন্টে এসে দেখে ভালোই লোকজন আজ। ব্যবসা এখন রমরমা চলছে। রেস্টুরেন্ট খুললেও মনে মনে একটু ভয় ছিল। যদি না চলে? তাহলে অনেকগুলো টাকার লসের মুখে পড়তে হতো। কিন্তু আল্লাহ্ সহায় ছিল। এবং এখনো আল্লাহ্ সহায় আছেন।

মাসুদ ক্যাশ কাউন্টারে বসে ছিল। প্রণয়কে দেখে উঠে পাশের চেয়ারে বসল। জিজ্ঞেস করল,

“আজ এত দেরি হইল ক্যান?”

“গুনগুনের আজকে পরীক্ষা না? দিয়ে আসতে গিয়েছিলাম।”

“ওরে এখনো বলস নাই রাজনীতির কথা?”

“না।”

“ক্যান?”

“রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে নাই। শুধু শুধু এখন ওকে বলা মানে এক্সট্রা পেইন দেওয়া। এমনিতেই এখন অনেক প্রেশারের মধ্যে আছে।”

“তুই কি ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিয়া নিছস?”

“হুম।”

“কারণডা কী?”

“গুনগুনের পছন্দ না।”

মাসুদ বাঁকা চোখে তাকাল। তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,

“তুই শা’লা বোকা না বলদ ক তো? তোর বউ তো একবারও তোর কথা ভাবল না। আর তুই ওর জন্য এত বড়ো সুযোগ পাইয়াও হাতছাড়া করবি?”

“ওর জন্য বিষয়টা এমন না। ও তো এখনো কিছু জানেই না। আমাকে নিষেধও করেনি। আমি নিজের ইচ্ছেতেই চাচ্ছি না। এখানে আমি ওর পছন্দ-অপছন্দকে প্রায়োরিটি দিচ্ছি। ও তো জোর করেনি।”

“আমি তোর ভালোর জন্যই বলতাছি। গুনগুনরে নিজের করে রাখার জন্য হইলেও তোর উচিত রাজনীতি করা।”

“যে থাকার সে সব অনিয়ম ভেঙে হলেও থাকবে, মাসুদ। তুই আমার জন্য এত চিন্তা করিস না।”

“তুই যা ভালো বুঝস কর। কিন্তু বন্ধু হিসাবে আমি তোর ভালোই চাইছি। মাইয়্যা মানুষ খুব স্বার্থপর স্বভাবের হয়। ওরা নিজের ক্যারিয়ারের লগে কোনোদিন কোনো কিছুতে আপোষ করে না। দরকার হইলে ওরা সব ছাইড়া দিব কিন্তু ক্যারিয়ার ছাড়ব না।”

প্রণয় হালকা হেসে বলল,

“ইসরাতের ওপর রাগ থেকে এসব বলতেছিস?”

মাসুদ নিরুত্তর। প্রণয় কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,

“বাদ দে। জেদ দেখিয়ে কিছু হয় না।”

“জেদ দেখাইতেছি না।”

“আচ্ছা। বিলটা নে।”

প্রণয় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। মাসুদ বিল নিচ্ছে কাস্টমারের থেকে। তার বুকের ভেতর বহ্নিশিখা জ্বলছে। ইসরাতের ওপর তার ভীষণ অভিমান। হতে পারে পরিচয়টা অল্প সময়ের, কিন্তু সদ্য জন্ম নেওয়া অনুভূতিটুকু তো আর মিথ্যে ছিল না। সেদিন রেস্টুরেন্ট ওপেনিং এর দিন, গুনগুনের বিরুদ্ধে মাসুদের বলা কথাগুলো ইসরাতের কাছে ভালো লাগেনি। গুনগুনের থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে যখন মাসুদ ইসরাতকে কল করেছিল, তখন ইসরাতের প্রথম কথাই ছিল,

“আমার সাথে আপনি কখনো যোগাযোগ করবেন না।”

মাসুদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,

“আমাকে আপনি চিনতে পেরেছেন? আমি মাসুদ।”

ইসরাতের কাছে মাসুদের ফোন নাম্বার আগে থেকেই ছিল। গুনগুনের থেকে নিয়েছিল সে। ভেবেছিল একদিন হঠাৎ করে কল দিয়ে সারপ্রাইজ দেবে। কিন্তু সেদিন মাসুদের কথা শুনে তার সেই ইচ্ছে ম’রে গেছে।

ইসরাত রুক্ষকণ্ঠে বলেছিল,

“চিনেছি। আর চিনেছি বলেই কথাটা বলেছি।”

“আপনি কি কোনো কারণে আমার ওপর রেগে আছেন?”

“রাগ করে মানুষ তার প্রিয় মানুষের ওপর। আপনি তো আমার প্রিয়, অপ্রিয় কেউ নন।”

“কী হয়েছে?”

“কিছু হয়নি। আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই না।”

“কিন্তু আমার অপরাধটা কী?”

“আপনার মানসিকতা। মেয়েদের সম্পর্কে আপনার চিন্তা-ভাবনা খুব জঘন্য। সেদিন কীভাবে আপনি গুনগুন আপুর স্বপ্নকে এত ছোটো করে কথা বলতে পারলেন? আমি আসলে এরকম মানসিকতার মানুষদের সাথে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। কাজেই আমাকে আর কখনো কল করবেন না।”

এটুকু বলেই ইসরাত কল কেটে নাম্বার ব্লক করে দিয়েছিল। মাসুদ সেদিন আবারও বুঝল যে, মেয়েরা কতটা স্বার্থপর হতে পারে! তাই সে চেয়েছিল, প্রণয় রাজনীতি করুক। ক্ষমতা যখন হাতের মুঠোতে থাকে তখন অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব হয়ে যায়। গুনগুনও তাহলে কখনো প্রণয়কে ছাড়ার কথা ভাবতে পারবে না।
.
.

রাত তখন গভীর। বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার আকাশে মিটমিট করে জ্বলতে থাকা তারাগুলোকে দেখা যাচ্ছে। অর্ধখণ্ড চাঁদও আছে। গুনগুন বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করা চাঁদ, তারা দেখছে।

প্রণয় বাসায় এসে আজ কলিংবেল বাজায়নি। নিজেই চাবি দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। রুম ফাঁকা দেখে বারান্দায় এসে গুনগুনকে পেয়ে গেল। নিঃশব্দে পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সে। ভরাট কিন্তু শান্ত কণ্ঠে বলল,

“মন খারাপ?”

গুনগুন শান্ত রইল। চমকাল না। দৃষ্টি না ফিরিয়েই বলল,

“উঁহু!”

প্রণয় এবার গিয়ে গুনগুনের পাশে দাঁড়াল। মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল,

“আমার হঠাৎ উপস্থিতিতে তুমি ভয় পাওনি?”

“আপনার উপস্থিতি হঠাৎ হতে পারে, কিন্তু নিরব তো নয়।”

“শব্দ পেয়েছিলে?”

“উঁহু। ঘ্রাণ পেয়েছিলাম।”

“ঘ্রাণ?”

“হু। আপনার শরীরের ঘ্রাণ, পারফিউমের ঘ্রাণ তো আমার চিরচেনা। তাই আগেই আপনার উপস্থিতি টের পেয়েছি।”

প্রণয় মৃদু হাসল। আঙুল দিয়ে গুনগুনের চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,

“পরীক্ষা সব ভালো হয়েছে তো?”

“হ্যাঁ। রেজাল্ট দিলেই এবার ভার্সিটিতে আবেদন করে ফেলব।”

প্রণয় দীর্ঘশ্বাস নিল। এই বিষয়ে কিছু না বলে অন্য প্রসঙ্গ টেনে আনল,

“চলো আজ বাইরে থেকে হেঁটে আসি?”

গুনগুনের মনটা একটু উদাস ছিল। বাবার কথা কেন জানি ভীষণ মনে পড়ে আজকাল। শিহাবের সঙ্গে দেখা হয়। মাঝে মাঝেই বাসায় আসে। কিন্তু বিয়ের পর ওসমান গণির সাথে গুনগুনের আর একটাবারও কথা হয়নি। একই এলাকায় থাকার দরুণ মাঝে মাঝে দেখা তো হয়ে যায়, কিন্তু কথা হয় না। বাবা-মেয়ে দুজনই দুজনকে এড়িয়ে যায়। ওসমান গণির কেমন লাগে তখন, গুনগুন তা জানে না, কিন্তু গুনগুনের বুকটা পু’ড়ে ছাড়খাড় হয়ে যায় তখন। খুব ইচ্ছে করে একটাবার ‘আব্বু’ বলে ডাকতে। কিন্তু সেই ইচ্ছে চাপা পড়ে যায়, যখন অতীত ভেসে ওঠে চোখের দৃশ্যপটে।

গুনগুন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,

“আব্বুর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে ক’দিন ধরে।”

“যাবে ঐ বাসায়?”

“উঁহু! যাব না।”

“কেন?”

“কারণটা কি আপনি জানেন না?

প্রণয় গুনগুনের দুই কাঁধে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে বলল,

“কোনো কিছু ইচ্ছে হলে এবং সেই ইচ্ছে পূরণ করা যদি সামর্থ্যের মধ্যে থাকে, তাহলে তা পূরণ করা উচিত। মান-অভিমান আর কতদিন পুষে রাখবে? কাউকে না কাউকে তো সামনে এগিয়ে যেতেই হবে।”

“আমি কেন যাব? আমি তো কোনো দোষ করিনি। তার উচিত আসা। আমি তো তার সব ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছি। আব্বু বলেছিল, আমি আপনার সাথে কখনো সুখী হবো না। কিন্তু হয়েছি তো? সে তো সব খবরই জানে। তাহলে আসে না কেন? নিজের ভুলটা কেন স্বীকার করে না? আপনি নিজে বাড়িতে গিয়ে রেস্টুরেন্ট ওপনিং এর দাওয়াত দিলেন। তাও আসলো না। আপনার মনে হয় আমি এরপরও যাব তার বাসায়?”

প্রণয় দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,

“এত জেদ করলে হয়?”

গুনগুন প্রণয়ের হাত কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল,

“হয়। চলেন বাইরে যাই। চা আর ফুচকা খেয়ে আসি।”

প্রণয় মিটমিট করে হাসছে। গুনগুন রুমে যাওয়ার আগে ওর হাসি দেখে থেমে গেল। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,

“হাসছেন যে?”

“এমনিই।”

“আপনি তো এমনি হাসার লোক না। বলুন কেন হাসছিলেন?”

“হাসছি এজন্যই যে, একসময় চা অপছন্দ করা মেয়েটি কীভাবে এখন চা-প্রেমী হয়ে গেল।”

“এখন চা-প্রেমী হওয়ার তো কারণও আছে। আগে আমার জীবনে ইফতেখার প্রণয় রেহমান ছিল না, তাই চা-ও পছন্দ ছিল না। এখন সে আছে, আর ঘুমেরও ভয় নেই। তাই এখন আমি চা-প্রেমী।”

প্রণয় মাথা দুলিয়ে বলল,

“বটে! তবে চা-প্রেমী না বলে স্বামী-প্রেমী বললে আমার বেশি ভালো লাগত।”

“এখন কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢং করবেন নাকি বাইরে যাবেন?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ চলো।”

দুটো গলি পার হলে, মেইন রোডের পাশে একটা ফুচকার দোকান আছে। দারুণ ফুচকা বানায় তিনি। রাধিকা ও গুনগুন প্রায়ই ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় কিংবা আসার সময় ঐ দোকানে গিয়ে ফুচকা খেত। প্রণয়ের সাথেও অনেকবার গিয়েছে। কিন্তু এরকম রাত করে কখনো যাওয়া হয়নি।

রাত বাজে এখন প্রায় নয়টা। মানুষজন এখনো অনেক আছে। প্রণয় ঘড়িতে সময় দেখে বলল,

“এখন খোলা পাব তো?”

“হ্যাঁ। এগারোটা পর্যন্ত ঐ দোকান খোলা থাকে।”

“তুমি জানলে কী করে?”

“একদিন কথায় কথায় আমি আর রাধিকা জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম।”

“ওহ আচ্ছা।”

বাইকে এসেছে বলে খুব একটা সময় লাগেনি। পাশেই বাইক রেখে দুজনে ফুচকার দোকানে গিয়ে কাঠের বেঞ্চে বসল। গুনগুনকে দেখেই ফুচকাওয়ালা মামা হেসে জিজ্ঞেস করলেন,

“কী অবস্থা মামা?”

জবাবে গুনগুনও হেসে বলল,

“আলহামদুলিল্লাহ্‌ মামা। দুই প্লেট ফুচকা দিয়েন।”

প্রণয় বলল,

“দুই প্লেট কেন? আমি খাব না।”

“জানি তো, আপনি ফুচকা পছন্দ করেন না। আমি একাই খাব। মামা, বোম্বাই মরিচ দিয়ে বানিয়ে দিয়েন।”

“না, ঝাল খাবে না। পেট জ্বলবে পরে।”

“উঁহু! কিছু হবে না। আপনি আমার জন্য একটা মোজো নিয়ে আসেন। ঐযে ঐপাশেই আছে।”

“ঠিক আছে। তুমি তাহলে বসো।”

প্রণয় যেতে যেতে ফুচকা চলে এসেছে। ঝাল টক দিয়ে ঝাল ঝাল ফুচকা একটা মুখে দিতেই, গুনগুনের মনে হলো সে অমৃত খাচ্ছে। ঝাল এবং টক ওর সবচেয়ে পছন্দের খাবার। পরপর তিনটা খেয়েই ঝালে ধরে গেছে গুনগুনের। তবুও সে খাচ্ছে। চোখও টলমল করছে। নাক-মুখ লাল হয়ে গেছে। আজ হয়তো মামা, একটু বেশিই ঝাল দিয়ে ফেলেছে।

একটু সময় নিয়ে আরেকটা ফুচকা মুখে দিতেই একটা ছেলে একদম গুনগুনের সামনে এসে দাঁড়াল। গুনগুন চোখ তুলে তাকাতেই একদম চমকে গেল। তার মুখের ভেতর তখনো ফুচকা। সে গিলতেও পারছে না। চোখও ফেরাতে পারছে না। মাহবুব এখানে কী করছে?

অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে গুনগুনকে দেখে থমকে গিয়েছিল মাহবুব। সামনে আসবে না, আসবে না মনে করেও কী ভেবে যেন আবার বাইক ঘুরিয়ে এখানে চলে এসেছে। কোনো ভনিতা ছাড়াই সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কেমন আছো?”

গুনগুন নিরুত্তর। ওর চোখ তখনো টলমল করছে ঝালে। মাহবুব ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে এগিয়ে দিল গুনগুনের দিকে। গুনগুন বোতলটা নিচ্ছে না। সে শুধু বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। তখন প্রণয় ফিরে এসে মাহবুবের হাত থেকে পানির বোতলটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। দোকানে আরো কয়েকজন ছিল। তারা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। ফুচকাওয়ালা মামাও অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে।

প্রণয় গুনগুনের হাতে মোজোর বোতল দিয়ে মাহবুবের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। চোখে-মুখে তার রাগ। চোয়াল শক্ত করে বলল,

“আমার ওয়াইফের থেকে দূরে থাকেন।”

মাহবুব কয়েক সেকেন্ড নিরব রইল। সে ভেবে পাচ্ছে না যে কী বলবে! নিরবতা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“আপনি কে?”

গুনগুন তখন পাশ থেকে বলল,

“আমার স্বামী।”

মাহবুবের চোখে বিস্ময়। গুনগুন বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“দয়া করে যখন তখন এভাবে আমার সামনে চলে আসবেন না। আপনাকে দেখলেও এখন ঘৃণা লাগে আমার।”

মাহবুব গম্ভীর হয়ে বলল,

“তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”

গুনগুন কিছু বলার পূর্বেই প্রণয় মাহবুবের কলার ধরে বলল,

“শুনিসনি গুনগুন কী বলেছে? আমি ওর স্বামী। ওর তোর সাথে কোনো কথা নেই। খবরদার ওর ত্রিসীমানায় যেন তোর ছায়াও না দেখি আমি।”

এরপর কলার ছেড়ে দিয়ে গুনগুনের হাত ধরে বলল,

“চলো।”

বিল দিয়ে প্রণয় গুনগুনকে নিয়ে হাইওয়ের দিকে চলে গেল। একটা ফাঁকা জায়গা দেখে সাইডে বাইক থামিয়ে একটু দূরে গিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল সে। রাগ হচ্ছে খুব। মাহবুব কেন আসছে বারবার?

গুনগুন কী করবে বুঝতে পারছে না। এতগুলো মানুষ কেমন বিস্ময় ও কৌতুক নিয়ে দেখছিল তখন ওদের। কী দরকার ছিল প্রণয়ের এরকম সিনক্রিয়েট করার? গুনগুন এগিয়ে গিয়ে প্রণয়ের হাত ধরে বলল,

“আপনি এমন করছেন কেন?”

প্রণয় জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল। একটু থেমে বলল,

“আমাকে একটু একটা সময় দাও প্লিজ!”

“এভাবে আপনি হিল হতে পারবেন? আমার সাথে কথা বলুন।”

প্রণয় এবার রেগে গেল। গুনগুনের ওপর রাগ দেখিয়ে চিৎকার করে বলল,

“কী কথা বলব তোমার সাথে? ঐ ছেলে বারবার কেন আসে তোমার কাছে?”

প্রণয়ের হঠাৎ এমন চিৎকারে গুনগুন ভয়ে কেঁপে উঠল। প্রণয় ফের একই কণ্ঠে বলল,

“তুমি কি ওর সাথে যোগাযোগ রেখেছ?”

“পাগল হয়ে গেছেন আপনি? আমি কেন ওর সাথে যোগাযোগ রাখব?”

“তাহলে ও জানল কী করে তুমি এখানে এসেছ? ওর সাথে কথা কেন বলছিলে?”

“সে জানল কীভাবে আমি জানিনা। আর ওর সাথে আমি কোনো কথাও বলিনি। আপনারও ঐভাবে সিনক্রিয়েট করা একদম উচিত হয়নি তখন।”

“আমি সিনক্রিয়েট করেছি?”

“হ্যাঁ।”

“এখনো দেখছি ওর প্রতি তোমার খুব মায়া?”

কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে গুনগুন। সে জানে, প্রণয় ওকে নিয়ে কতটা পসেসিভ। কিন্তু সবকিছুরই একটা সীমা থাকা প্রয়োজন। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত ভালোবাসাও জীবনে তিক্ততা নিয়ে আসে। প্রণয়ের ভালোবাসাও এখন সেই পথে চলছে।

গুনগুন এই প্রসঙ্গে কিছুই বলল না। রাগ-অভিমানটুকু গিলে ফেলে বলল,

“বাড়িতে যাব। চলুন।”

প্রণয় দীর্ঘশ্বাস নিল। দুকদম এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে গুনগুনের হাত টেনে ধরে বলল,

“সরি।”

গুনগুন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। প্রণয় অপরাধীর মতো মাথা নত করে বলল,

“সরি তোমাকে রাগ দেখানোর জন্য, তোমার সাথে উচ্চস্বরে কথা বলার জন্য। কিন্তু কী করব বলো? আমি যে ভয় পাই। তোমাকে হারানোর ভয়।”

“ভালোবাসলে হারানোর ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু সব কিছুতে আপনার এরকম বাড়াবাড়ি করা রিয়েক্ট কি ঠিক? ভালোবাসেন বলে কি এখন আমার জন্য পুরো দুনিয়া ধ্বংস করে ফেলবেন আপনি?”

প্রণয় দৃষ্টি তুলে তাকাল গুনগুনের দিকে। ওর বিরক্তিমাখা মুখটা দেখে মৃদু হাসল। গরমে কপালে মৃদু মৃদু ঘাম জমেছে। প্রণয় হাত দিয়ে গুনগুনের কপালের ঘামটুকু মুছে দিল। অদ্ভুতভাবে হেসে বলল,

“তোমার জন্য তো আমি পুরো দুনিয়া ধ্বংস করতে পারব না। তবে দুনিয়ার কেউ যদি তোমার দিকে হাত বাড়ায়, তোমার ক্ষতি চায়, তাহলে তাকে আমি চিরতরে ধ্বংস করে ফেলব।”

চলবে…

[বিঃদ্রঃ রেসপন্স কইরেন প্রিয় মানুষজন। তাহলে আর বেশি অপেক্ষা করাব না। নিয়মিত গল্প দেবো এই ছুটিতে।]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply