প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_৩০
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
‘প্রিয় গুনগুন’ রেস্টুরেন্টের এই অদ্ভুত সুন্দর নামটা দেখে বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে আছে গুনগুন। ওর চোখ ছলছল করছে। চারদিকে করতালিমুখর শব্দ। গুনগুন এটা কল্পনাও করেনি যে, প্রণয় ওর নামে রেস্টুরেন্ট খুলবে। সবার ঠোঁটে হাসি। প্রণয় গুনগুনের হাত ধরে বলল,
“চলো, কেক কাটি।”
গুনগুন মাথা দোলাল। এখানে পরিচিত অনেক মুখ উপস্থিত আছে। বিপ্লব, কুলসুম, মাসুদ, রাধিকা, প্রণয়ের অন্যান্য বন্ধুরা, শেলী আন্টি, শিশির, শিহাব, শোয়েব শিকদার ও পমিলা বেগম। এখানে সবথেকে অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি ছিল শোয়েব শিকদারের। ভদ্রতাসূচক ও গুনগুনের কথা রাখতেই প্রণয় ঐ বাড়িতে গিয়ে মায়ের সাথে শোয়েব শিকদারকেও দাওয়াত দিয়েছিল। কিন্তু এটা আশা করেনি যে, তিনি সত্যিই আসবেন। সবাইকে একসাথে পেয়ে গুনগুনের যেমন আনন্দ হচ্ছিল, তেমনই আবার কিছুটা মন খারাপও হচ্ছিল। তার অবচেতন মন কেন জানি চাচ্ছিল ওসমান গণিও আসুক। প্রণয় তাদেরও বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত করে এসেছিল। বাবা কিংবা সৎ মা কেউ আসেনি। তবে শিহাব এসেছে শেলী আন্টিদের সাথে।
কেক কাটার পর্ব শেষ হলে সবাই খেতে বসল। প্রণয় তিনজন কর্মাচারী রেখেছে রেস্টুরেন্টের জন্য। ওরা সবাইকে খাবার সার্ভ করছিল। গুনগুন সবার সাথে কথা বলায় এত ব্যস্ত যে, মাসুদ ওকে একা পাচ্ছে না। অনেকক্ষণ পর যখন গুনগুনকে একটু একা পেল তখন দৌঁড়ে গিয়ে সামনে দাঁড়াল। গুনগুন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“কিছু বলবেন?”
মাসুদ ফাঁকা ঢোক গিলল। গুনগুনের মেজাজ এখন ভালোই মনে হচ্ছে। তবুও বলা যায় না কখন আবার ফট করে রেগে যায়। এই মেয়ের তো প্রতিটা শিরায় শিরায় শুধু রাগ। ভয়ে তটস্থ হয়ে মাসুদ বলল,
“তুমি না কইছিলা আমার জন্য সারপ্রাইজ আছে আজ? কই?”
মাসুদের ছটফট করা মন খুব করে চাচ্ছিল এই সারপ্রাইজটা যেন ইসরাতকে ঘিরে হয়। গুনগুন গম্ভীর হয়ে বলল,
“এত তাড়া কেন? আচ্ছা ঠিক আছে, এখনই দেবো সারপ্রাইজ। তার আগে নিচে গিয়ে আমার একটা পার্সেল এসেছে, ওটা নিয়ে আসেন।”
মাসুদ হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সুযোগ পেয়ে গুনগুন ঠিকই তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। মাথা নাড়িয়ে মাসুদ বলল,
“আইচ্ছা।”
একটু হতাশা ও একটু উচ্ছাস একজোট হয়ে মাসুদের মাথায়, ব্রেইনে ও মনে গেইম খেলছে। সে উদাসীন হয়ে ডেলিভারি বয়কে খুঁজতে গিয়ে ইসরাতকে দেখতে পেল। আকাশি রঙের একটা থ্রি-পিস পরে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখামাত্রই মাসুদের মুখটা হা হয়ে গেল। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে সে। সত্যিই এটা ইসরাত?
মাসুদকে দেখে ইসরাত এগিয়ে এলো। ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা লজ্জাও পাচ্ছে সে। লজ্জা এড়িয়ে যেতে ও নিজেকে স্বাভাবিক করতে মাসুদের চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলল,
“কী দেখছেন?”
মাসুদ নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,
“ক…কিছু না! আপনি এখানে?”
“আসা নিষেধ নাকি?”
“না, না! তা কেন হবে? আপনাকে দেখে সারপ্রাইজড হয়ে গিয়েছি।”
‘সারপ্রাইজ’ শব্দটা মস্তিষ্কে ঝংকার তুলল। তার মানে গুনগুন তখন এই সারপ্রাইজেই কথাই বলেছিল? ওহ গড! মেয়েটা কত ভালো! মনে মনে গুনগুনের প্রসংশা করতে করতে পঞ্চমুখ হয়ে গেল মাসুদ। ইসরাতকে অবশ্য মনের সেই উচ্ছাসটুকু বুঝতে দিল না একদম। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“ভেতরে চলুন।”
ইসরাত মাথা দোলাল। লিফটে উঠে মাসুদ বলল,
“আরো আগে আসা উচিত ছিল। কেক অলরেডি কাটা শেষ।”
“আসলে রাস্তায় এত জ্যাম! তাই আরকি।”
“বুঝতে পেরেছি।”
একটু থেমে বলল,
“আপনাকে একটা কথা বলি?”
“শিওর।”
মাসুদ কিছু বলার আগেই লিফটের দরজা খুলে গেল। কাঙ্ক্ষিত ফ্লোরে তারা চলে এসেছে। ইসরাত বের হয়ে দাঁড়াল। মাসুদ বের হওয়ার পর বলল,
“এবার বলুন।”
“কেমন আছেন?” ফাঁকা ঢোক গিলে বলল মাসুদ।
ইসরাত হেসে ফেলল। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাসতে হাসতে বলল,
“ভালো। আপনি?”
“আলহামদুলিল্লাহ্।”
ইসরাতকে দেখে গুনগুন এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল। দুজনে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর মাসুদকে ডেকে গুনগুন বলল,
“মাসুদ ভাই, আপনি ইসরাতকে নিয়ে খেতে বসে যান।”
“আপনি খাবেন না?” জিজ্ঞেস করল ইসরাত।
জবাবে গুনগুন বলল,
“খাব। প্রণয়ের সাথে পরে খাব। ও তো এখন ব্যস্ত। তোমরা খেয়ে নাও।”
ইসরাত হেসে বলল,
“ঠিক আছে।”
মাসুদ আর ইসরাত গিয়ে বিপ্লব ও কুলসুমের পাশে বসল। মাসুদ ওদের সাথে ইসরাতের পরিচয় করিয়ে দিল। কুলসুম মাসুদকে বলল,
“গুনগুন আসলো না খেতে?”
“পরে খাইব প্রণয়ের লগে। জামাই-বউ কেউ কাউরে ছাড়া কিছুই বুঝে না।”
“তুই আগে একটা বিয়ে কর। তখন দেখবি তুইও তোর বউকে ছাড়া কিছু বুঝবি না। তোর বউও তখন তোকে ছাড়া কিছু বুঝবে না। এটাই হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক।”
“হ কচুর সম্পর্ক! এত ভালোবাসা থাকলে গুনগুন তাইলে কেমনে প্রণয়রে রাইখা দেশের বাইরে যাইতে চাইতাছে?”
“তোকে কে বলল এসব?”
“প্রণয়ই বলছে। কালকে মন খারাপ দেইখা জোর কইরা কথা বাইর করছি। প্রথমে কইতে চায় নাই।”
বিপ্লব তখন জিজ্ঞেস করল,
“গুনগুন দেশের বাইরে যাবে মানে?”
“পড়তে যাইব। মাইয়্যা মাইনষের এত পড়নেরই বা কী দরকার? ভালো একটা জামাই পাইছিস, সুখে সংসার করতেছিস। আর কী দরকার? তাছাড়া গুনগুন যে দেশের বাইরে যাইয়্যা পাল্টাইয়া যাইব না তার কী গ্যারান্টি আছে? আমি বাবা আমার বউ ছাড়া থাকতে পারুম না। তাই প্রণয়ের মতো আমারও মত নাই যে, গুনগুন বাইরের দেশে যাক।”
ইসরাত বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে মাসুদের দিকে। বিপ্লব খেতে খেতে হাসল। হেসেই বলল,
“মানলাম, গুনগুন দেশের বাইরে গিয়ে বদলে যেতে পারে। বদলাবে না যে এর গ্যারান্টি কেউ কখনো দিতে পারবে না। কিন্তু তুমি কি কোনো গ্যারান্টি দিতে পারবে যে, প্রণয় কখনো বদলে যাবে না?”
মাসুদ বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলল,
“মানে?”
“ধরো, আজ গুনগুন প্রণয়ের কথা ভেবে নিজের স্বপ্ন স্যাক্রিফাইজ করল। দেশের বাইরে গেল না পড়তে। পরে একটা সময় গিয়ে প্রণয় বদলে গেল। তখন কী করবে? তখন গুনগুনই বা কী করবে? ও তো সারাজীবন আফসোস নিয়ে বেঁচে থাকবে। নিজেকে দোষারোপ করবে। স্বামী-সংসার, ক্যারিয়ার সব হারাবে। মানুষ বাঁচেই স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্নই মানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমরা কেউ কারো মনের খবর জানি না। ভবিষ্যৎও অগ্রিম বলতে পারব না। কারণ কী জানো? চোখের পলক যতটা না দ্রুত পড়ে, এরচেয়েও দ্রুত বদলে যেতে পারে মানুষের মন। তাই যে বদলে যাওয়ার সে কাছে থাকলেও একদিন বদলে যাবে, দূরে থাকলেও একদিন বদলে যাবে।”
“কুলসুম যদি কোনো সময় দেশের বাইরে যাইতে চাইত আপনি দিতেন?”
“অবশ্যই দিতাম। কবুল বলে ওকে আমার করে নিয়েছি মানে ওর সব স্বপ্নও তখন থেকে আমার। আমি ওকে বিশ্বাস করেই ওর স্বপ্ন পূরণ করতে দিতাম। এখন এরপর ও আমার বিশ্বাস রাখত কি না রাখত এটা ওর ব্যাপার।”
মাসুদ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“কী জানি ভাই! আমি আবার এত মহৎ না।”
ইসরাত দোনোমনা করছে। মানুষের চিন্তা-ভাবনা কত অদ্ভুত রকমের হতে পারে। মাসুদকে তার ভালোই লাগত। কিন্তু আজকে ওর কথাগুলো শুনে কেমন যেন স্বার্থপরের মতো লাগছিল। পুরো প্রোগ্রামে সে আর ওভাবে মাসুদের সাথে কথাও বলেনি।
বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে আছে প্রণয়। দুচোখ বন্ধ। কিন্তু ঘুমায়নি। গুনগুন ফ্রেশ হয়ে এসে লাইট অফ করে প্রণয়ের পাশে শুলো। ক্লান্ত লাগছে ভীষণ। প্রোগ্রামে এত ব্যস্ত ছিল দুজনেই যে, ভালোমতো ওরাই কথা বলতে পারেনি। গুনগুন শুয়ে প্রণয়ের বুকে মাথা রাখল। আলতো করে গলায় হাত বুলিয়ে ডাকল,
“ঘুমিয়েছেন?”
প্রণয় লম্বা শ্বাস নিল। চোখ খুলে তাকাল একবার গুনগুনের দিকে। ওর কোমরে হাত রেখে আরেকটু কাছে এনে বলল,
“না, বলো।”
“থ্যাঙ্কিউ।”
“কেন?”
“এত সুন্দর সারপ্রাইজটার জন্য।”
“তুমি খুশি হয়েছ?”
“ভীষণ!”
“তোমার খুশিতেই আমার আনন্দ।”
“আজও ঐ ব্লগারগুলোকে দেখলাম ভিডিয়ো করতে। আপনি ইনভাইট করেছিলেন?”
“হু! রেস্টুরেন্টের একটা প্রোমোশন হয়ে যাবে এই সুযোগে।”
“এটা ভালো আইডিয়া।”
প্রণয় কিছু বলছে না আর। গুনগুনও নিশ্চুপ। পিনপতন নিরবতা কাটিয়ে গুনগুন বলল,
“আচ্ছা কোনো কারণে কি আপনার মন খারাপ?”
“না তো! তোমার এমন মনে হচ্ছে কেন?”
“হঠাৎ-ই মনে হচ্ছে আপনি অনেকটা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছেন। কী হয়েছে?”
“কিছু হয়নি। সব ঠিকই আছে। তুমি কোন দেশে যেতে চাও?”
“ইচ্ছে তো আছে জাপানে যাওয়ার। আইইএলটিসের পাশাপাশি জাপানিজ ভাষা শেখার একটা কোর্সও করব ভাবছি। কেমন হবে?”
“ভালো হবে।”
“আপনিও জাপানিজ ভাষা শেখার কোর্সটা করে ফেলেন।”
“আমি কোর্স করব কেন?”
“ওমা! আপনাকে আমি নিয়ে যাব না পরে? কিছু কিছু জায়গায় ঐদেশে ইংরেজির চেয়েও জাপানিজ ভাষাই বেশি চলে। আমাদেরই সুবিধা হবে।”
“আচ্ছা।”
“পুরো জাপান শহর আমরা ঘুরে বেড়াব একদিন। আমার তো ভাবতেই ভীষণ আনন্দ হচ্ছে!”
প্রণয় কৌশলে গুনগুনকে আটকানোর চেষ্টা করে বলল,
“বাইরের দেশে তো পড়াশোনার অনেক খরচ গুনগুন! এত টাকা-পয়সা আমি…”
গুনগুন প্রণয়কে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। জাপানের ওসাকাতে আমার মামা আছে। মামা-ই সব ব্যবস্থা করে দেবে।”
প্রণয় অবাক হয়ে বলল,
“তোমার মামা আছে!”
“হ্যাঁ। মামা তো আরো অনেক আগে থেকেই যেতে বলছে। কিন্তু আমি চাইনি লং টাইম মামার ওপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে থাকতে। এখন মাস্টার্স করতে গেলে সব আমি নিজেই সামলে নিতে পারব। টাকা-পয়সা মামা-ই দেবে। যখন আমাদের অনেক টাকা হবে তখন না হয় মামাকে সব ফেরত দিয়ে দেবো। যদিও জানি, মামা কখনোই টাকা ফেরত নেবে না।”
প্রণয় আরো চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বলল,
“হুম!”
আকাশের আজ মন ভালো নেই। কালো মেঘ করেছে। একটুপরই হয়তো ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি নামবে। ক্যাশিয়ারে উদাসীন হয়ে বসে আছে প্রণয়। গুনগুন রাধিকার সাথে আইইএলটিসের কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছে। ক্লাসে গেছে সকালে। রাত-দিন খুব পড়ছে। প্রণয়ের মাঝে মাঝে গুনগুনকে দেখলে ভীষণ মায়া হয়। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য মেয়েটি কত চেষ্টা করছে! আবার নিজের কথা ভাবলে তখন নিজের জন্যও কষ্ট হয়। সে তো নিজেও গুনগুনকে ছাড়া থাকতে পারবে না। যতই বলুক গুনগুন ওকে নিয়ে যাবে, তবুও তো সেটা লম্বা সময়ের ব্যাপার। ৬ মাস থেকে ১ বছর! এতগুলো দিন গুনগুন বিহীন তো সে শেষ হয়ে যাবে। তার ভাবনাগুলো হয়তো স্বার্থপরের মতো হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে-ই বা কী করবে?
“দোস্ত?”
মাসুদের ডাকে হুঁশ ফিরল প্রণয়ের। সোজা হয়ে বসে বলল,
“বল।”
“ইসরাতের লগে কি গুনগুনের আর কথা হইছিল?”
“মনে হয় না। কেন?”
“না, এমনি! ঐদিনের পর আমার লগেও আর কথা হয় নাই। যাওয়ার সময় বলেও যায় নাই।”
“উলটা-পালটা কিছু বলছিস নাকি?”
“আরে না! কথাই তো হয় নাই ঠিকমতো।”
“ওহ।”
“গুনগুনের থেকে ওর নাম্বারটা নিয়ে আমাকে দিস তো।”
“আচ্ছা।”
প্রণয় উঠে দাঁড়াল। টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে বলল,
“তুই এদিকটা দেখিস। আমি আসছি একটু পর।”
“আইচ্ছা।”
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে প্রণয় সোজা কুলসুমের বাসায় গেল। মাসুদের সাথে কিছু শেয়ার করে লাভ নেই। কারণ প্রণয় যা-ই বলে, আর যেই সিদ্ধান্তই নেয় না কেন মাসুদ চোখ বুজে ওকে সাপোর্ট করে। প্রণয় এতে হালকা হতে পারে না। ভালোমতো কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারে না। তাই কুলসুমের কাছে এসেছে।
দরজা খুলে প্রণয়কে এইসময় দেখে কিছুটা অবাক হলো কুলসুম। ভেতরে যাওয়ার জায়গা দিয়ে বলল,
“কীরে হঠাৎ এই সময়? কিছু হইছে?”
প্রণয় সোফায় বসে থম মেরে রইল কিছুক্ষণ। এরপর অস্থির হয়ে বলল,
“আমার তো কিছু ভালো লাগছে না দোস্ত!”
কুলসুম জিজ্ঞেস করল,
“তোকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে?”
“গুনগুন দেশের বাইরে যেতে চাচ্ছে। আমি চাই না, আমাকে ছেড়ে ও চলে যাক। আবার ওর স্বপ্ন ভাঙার কথা বলতেও পারি না। ও কষ্ট পাবে এটাও আমি সহ্য করতে পারব না।”
“হ্যাঁ, যাওয়ার কথা বলেছিল আমায়। তোকেও তো নিয়ে যাবে পরে স্পাউজ ভিসায়।”
“আমি ওর সাথে গিয়ে কী করব?”
“কী করবি মানে? এটা আবার কেমন প্রশ্ন?”
“আরে বা’ল! আমি কি দেশের বাইরে গিয়ে বসে বসে খাব? আমার গ্রাজুয়েশনও কমপ্লিট না। আমি তো ভালো কোনো জবও পাব না। গুনগুনের ওপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে যাব? ও পড়াশোনা করবে নাকি আমার দায়িত্ব নেবে?”
কুলসুম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এখন তুই কী চাচ্ছিস?”
“আমি চাই, ওর মাথা থেকে দেশের বাইরে যাওয়ার ভূতটা নামুক। ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। আবার ওর সাথে আমি যেতেও পারব না। কারণ গিয়েও কোনো লাভ নেই।”
“তুই ওর স্বপ্ন নিয়ে ভাবছিস না একটাবার?”
“ভাবব না কেন? ও মাস্টার্স করুক। তাতে তো আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সেটা দেশেই করুক। দেশের বাইরে কেন যেতে হবে?”
“প্রণয়, এটাই ওর স্বপ্ন! ও দেশের বাইরে পড়তে চায়। তুই কেন ওর সেই স্বপ্নের মাঝখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিস? ওকে ছাড়া থাকতে পারবি না বলে নাকি নিজের অপারগতার জন্য?”
প্রণয় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কুলসুম বলল,
“তুই গ্রাজুয়েশন শেষ করিসনি। দেশের বাইরে গিয়ে কোনো ভালো জব পাবি না। ওর ওপর ডিপেন্ডেন্ট হতে পারবি না। আবার গুনগুনকে ছাড়া তুই থাকতেও পারবি না। এই সমস্ত কিছুই তোর অপারগতা, তোর ব্যর্থতা, তোর কমতি। গুনগুনের না। ও কেন তোর জন্য ওর স্বপ্ন বিসর্জন দেবে? ওর তো কোনো কমতি নেই। ওর তো যোগ্যতা আছে। সব যোগ্যতা থাকার পরও ওর স্বপ্ন বাদ দিতে হবে, শুধু এইজন্য যে ও এখন তোর বিয়ে করা বউ? মেয়েদের ভালো বউ হওয়া ছাড়াও অনেক স্বপ্ন থাকতে পারে। সবাই শুধু বউ হওয়ারই স্বপ্ন দেখে না প্রণয়। যারা এম্বিসিয়াস গার্ল, ওদের স্বপ্ন থাকে, গোল থাকে। স্বামী হিসেবে তোর উচিত এখন ওর পাশে থাকা।”
“যদি দেশের বাইরে গিয়ে ও আমাকে ভুলে যায়? আমাকে ছেড়ে দেয়? আমার থেকে বেটার অপশন পায়?”
“প্রণয় তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? তোর মাথায় এসব কথা কে ঢুকাচ্ছে? শোন আমার কথা, তুই কি এটা মানিস যে গুনগুনের হাতে এখনো বেটার অপশন আছে?”
“মানি।”
“ও চাইলে এখনো তোকে ছেড়ে দিতে পারে। মানিস?”
“হু।”
“তাহলে তোকে ছাড়ার জন্য ওর দেশের বাইরে যাওয়া লাগবে কেন? যে ছাড়ার সে যেকোনো জায়গায়, যেকোনো ভাবেই ছেড়ে চলে যাবে। আটকাতে পারবি না। সম্পর্কে যখন বিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন সেই সম্পর্কেও আস্তে আস্তে ভাঙন ধরতে শুরু করে। বিপ্লব আর আমার কথাই ধর। আমরা দুজন থাকি দুই জেলায়। আমরা কি চাইলে পারি না দুজন দুজনকে চিট করতে? ও তো চাইলেই পারে সিলেটে আরেকটা বিয়ে করতে, প্রেম করতে। কিন্তু আমার মাথায় এসব কখনোই আসে না। আবার আমরা একসাথে থাকতে পারি না। কেন বল তো? আমার জন্যই। আমার বাবা-মা থাকে এখানে। আর কোনো ভাই-বোন নাই যে ওদের দেখবে। আমি যেন ওদের দেখাশোনা করতে পারি তাই আমাকে এখানে রেখে গেছে। আব্বু-আম্মুকে আমার বাসায় চাইলে রাখতে পারতাম না? কিংবা আমি চাইলে ঐ বাসায় গিয়ে থাকতে পারতাম না? পারতাম। কিন্তু বিপ্লব কখনো চায়নি, কেউ আমার দিকে কিংবা আব্বু-আম্মুর দিকে আঙুল তুলে কথা বলুক। বিয়ের পরও যদি আমি তাদের বাসায় থাকি মানুষ কথা শোনাবে। আবার আব্বু-আম্মুকে আমার সাথে রাখলে বিপ্লবের পরিবার বাঁকা দৃষ্টিতে দেখবে। এসব ভেবে ডাবল খরচ হওয়া সত্ত্বেও আমাকে আলাদা একটা বাসায় রাখতেছে। ওদের বাসা কিশোরগঞ্জ। ওখান থেকে বাবা-মাকে দেখতে পারব না বলে আমায় ওদের বাসায়ও রাখেনি। এইযে এত স্যাক্রিফাইজ, আমার প্রতি এত সম্মান এসবের পর আমি কীভাবে কখনো ওকে অবিশ্বাস করতাম? ঠিক একইভাবে গুনগুনের কথাও ভাব। মেয়েটা তোকে চেয়েছে শুধু। ও যখন তোকে বিয়ে করতে রাজি হয় তখন তোকে ভালোওবাসে না। শুধু ওর মনে হয়েছিল, তুই ওর জন্য সঠিক মানুষ। যা-ই হয়ে যাক, তুই ওর পাশে থাকবি, ওর জন্য লড়বি। ওর বিশ্বাসটা নষ্ট করে দিস না।”
প্রণয় খুব মনোযোগ দিয়ে কুলসুমের কথাগুলো শুনল। অশান্ত মনটা অল্প কিছু সময়ের জন্য যেন বশ মেনে গেল। কুলসুম আরো অনেক কিছু বলে বাস্তবতা ও স্বপ্নের ফারাক বুঝাতে লাগল প্রণয়কে। প্রণয়ও সব বুঝেছিল। কিন্তু যেই মুহূর্তে বাড়িতে ফিরে সে গুনগুনকে দেখল, তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। বাড়ি ফিরলেই দৌঁড়ে এসে গুনগুনের দরজা খুলে দেওয়া, ওকে দেখে মিষ্টি হাসা, জড়িয়ে ধরা, দুজন দুজনকে খাইয়ে দেওয়া এসব কিছু তার থেকে দূরে চলে যাবে গুনগুন চলে যাওয়ার সাথে সাথে। প্রণয় তো এসব কিছুতেই মানতে পারবে না। সহ্য করতে পারবে না। অপরদিকে সে গুনগুনের কষ্টও সহ্য করতে পারবে না। সারাজীবন গুনগুন না পাওয়া নিয়ে ওর সাথে বেঁচে থাকবে, সংসার করবে এই কষ্টও তো প্রণয় মেনে নিতে পারবে না। তাহলে প্রণয় এখন কী করবে? কী করলে তার অশান্ত মন শান্ত হবে সে বুঝতে পারছে না।
রাত প্রায় দুটো বাজে। চারিদিক নিরব, নিস্তব্ধ। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রণয়ও ঘুমাচ্ছে। কোথাও কোনো টু-শব্দ পর্যন্ত নেই। কেবল ঘরের মধ্যে একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে গুনগুন নিরবে পড়ছিল। একাধারে অনেকক্ষণ বসে থাকায় পিঠ, কোমর একদম ধরে গিয়েছে। ঘাড়টাও ব্যথা করছে। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে আকাশমুখী হয়ে বসল। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রেখে, ঘাড় কাৎ করে ঘুমন্ত প্রণয়ের দিকে তাকাল একবার। বুকটা ধ্বক করে উঠল গুনগুনের। প্রণয়কে ছাড়া বিদেশ-বিভূয়ে এতগুলো দিন সে কী করে থাকবে? প্রণয় যে তার অভ্যেস হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতেও তো কষ্ট হয়ে যাবে প্রণয়কে ছাড়া। কিন্তু গুনগুন জানে, এই দূরত্ব ভীষণ কষ্টের হতে পারে কিন্তু এর মানে আলাদা হয়ে যাওয়া নয়। হতে পারে এই দূরত্ব দুজনের ভালোবাসা আরো বাড়াবে।
গুনগুনের হঠাৎ করে সবকিছু বিরক্ত লাগছে। প্রণয়ের জন্য মন কেমন করছে। পড়তে আর ভালো লাগছিল না। তাই বই বন্ধ করে সে বিছানায় গিয়ে বসল। দুহাত বুকে জড়ো করে কাৎ হয়ে ঘুমুচ্ছে প্রণয়। গুনগুনের বুকচিরে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে আলতো করে প্রণয়ের গালের ওপর হাত রাখল। সারামুখে হাত বুলিয়ে কিছুটা ঝুঁকে বসল প্রণয়ের দিকে। কপালে, গালে, ঠোঁটে চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল,
“আপনাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। যতটা প্রকাশ করি, তারচেয়েও অধিক বেশি।”
গুনগুনের বুকচিরে আবারও দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্পটা বন্ধ করে গুনগুনও পাশে শুয়ে পড়ল। তার হঠাৎ এত কান্না পাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে তত বেশি অস্থির হয়ে উড়তে মনটা। প্রণয়ের শূন্যতা যেন সে এখন থেকেই অনুভব করতে পারছে।
বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আকাশে মেঘ করল কখন? অবশ্য রাতের আঁধারে মেঘ বোঝারও কথা নয়। বাতাসও হয়নি তেমন। আবহাওয়া গুমোট হয়ে ছিল। হঠাৎ করেই বিশাল বিশাল শব্দ করে বাজ পড়ার সাথে সাথে তুমুল বৃষ্টি পড়তে লাগল। প্রণয় ঘুমের মধ্যেই বারবার চমকাচ্ছিল। গুনগুন তখন ওর গায়ের ওপর হাত রাখল। শোয়া থেকে উঠে বসে কাঁথা নিয়ে প্রণয়ের গায়ে দিয়ে নিজের গায়েও কাঁথা টেনে নিল। ঘুমের মধ্যেই প্রণয়ের এক হাত এসে পড়ে গুনগুনের বুকের ওপর। এতক্ষণের ক্লান্তি ও তন্দ্রাভাব মুহূর্তের মধ্যেই উবে গেছে গুনগুনের। শরীর শিরশির করছে। সে প্রণয়ের হাত সরিয়ে দিতে গেলে, প্রণয় এবার আরেক হাত গুনগুনের পিঠের নিচ দিয়ে নিয়ে, পেটে ধরে আরো কাছে নিয়ে এলো। গলায় মুখ ডুবিয়ে বলল,
“যেও না।”
প্রণয় সজ্ঞানে বলছে এসব নাকি ঘুমের ঘোরে বলছে, গুনগুন ঠিক বুঝতে পারছে না। প্রণয়ের স্পর্শ গাঢ় হচ্ছে। তার মানে ঘুম ভেঙে গেছে ওর। গুনগুন কিছু বলছে না। বলবেই বা কী? প্রণয়ের স্পর্শে তার শরীর, মন দুটোই সায় দিচ্ছিল। প্রণয় যখন ঝুঁকে গুনগুনের ওপর শরীরের অর্ধেক ভর ছেড়ে দিল, গুনগুন তখন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“ঘুমাননি?”
প্রণয় নেশা ধরানো ঘুমকাতুরে কণ্ঠে বলল,
“ঘুমিয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে কাছে এলে…”
গুনগুন মেকি রাগ দেখিয়ে বলল,
“এভাবে কথা বলবেন না তো! আপনার কণ্ঠটা কেমন যেন লাগছে।”
“কেমন?”
“নেশার মতো। ইচ্ছে করছে…”
“কী ইচ্ছে করছে?”
“ইচ্ছে করছে, টুপ করে আপনার কণ্ঠ খেয়ে ফেলতে।”
প্রণয় হেসে ফেলল। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল,
“খাও। নিষেধ করল কে? শুধু কণ্ঠ কেন? পুরো আমিটাই তো তোমার।”
গুনগুন লজ্জায় দুহাতে মুখ ঢেকে বলল,
“আপনি ভীষণ খারাপ!”
শার্ট খুলে ফেলে প্রণয় জোর করে গুনগুনের মুখের ওপর থেকে ওর হাত সরাল। গুনগুন লজ্জায় তাকাতে পারছে না। চোখ বন্ধ করে রেখেছে। অন্ধকারে অবয়ব আন্দাজ করা ছাড়া কেউ কারো মুখ দেখতে পাচ্ছে না। তবুও গুনগুনের লজ্জার শেষ নেই! প্রণয় গুনগুনের কামিজের পেটের অংশটুকু সরিয়ে পেটে হাত রাখতেই গুনগুন কেঁপে উঠল। প্রণয়ের হাত পেট ছাড়িয়ে গুনগুনের ধনুকের মতো বাঁকানো কোমরে চলে গেল। গুনগুন ধুপ করে প্রণয়ের হাত ধরে ফেলল। প্রণয় মাতাল করা হাসি দিয়ে গুনগুনের গলায় মুখ ডুবিয়ে বলল,
“তোমার শরীরের এই অংশটুকু এত সুন্দর, এত আকর্ষণীয়, বউপাখি! আমি তো পাগল হয়ে যাই। আমি…”
গুনগুন প্রণয়ের মুখ চেপে ধরে বলল,
“দয়া করে মুখে কিছু বলার প্রয়োজন নেই।”
“আমি তোমার প্রসংশা করছি।”
“আমার প্রশংসা চাই না।”
“তবে কী চাও? আদর?”
আবার জোরে শব্দ করে বাজ পড়ল। গুনগুন চমকে গিয়ে প্রণয়ের হাত খামচে ধরল তখন। প্রণয় দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। তবে চলো, আজকের রাতটা তোমায় আদর দিয়ে অতিষ্ঠ করে ফেলি।”
গুনগুনকে আর কিছুই বলার সুযোগ দিল না প্রণয়। এক হাত গুনগুনের গলায় রেখে ঠোঁটজোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিল। অন্য হাতে কাঁথাকে বানিয়ে নিল নিজেদের আবরণ।
চলবে…
[এই পর্ব লিখতে গিয়ে আমি লজ্জায় লাল-নীল হয়ে গিয়েছি। শিট!😑]
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৯
-
তুষারিণী পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৯
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৮
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮ (১ম অংশ)
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭